শহীদ মিনার

শহীদ মিনার -- দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ-এর পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকীতে আমরা ফিরে দেখলাম সেই পুণ্য জন্মক্ষণটিকে, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'রিপোর্টাজ'-এর আয়নায়। রিপোর্টাজটি প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক কালান্তর-এ, ভাষা শহীদ দিবসের ঠিক আগের দিন, ১৯৭১ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি।

আমি একবারই পূর্ব-পাকিস্তানে গিয়েছিলাম।

১৯৫৪ সাল। নির্বাচনে পাকিস্তানের স্রষ্টা মুসলিম লিগকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয়েছে। সারা দেশে মুক্তির উল্লাস।

কার্জন হলে কয়েকদিনের এক ঐতিহাসিক সাহিত্য সম্মেলন হয়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে মনোজ বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ কয়েকজন যোগ দিতে যান। সেই দলে আমিও ছিলাম।

বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা একটুকরো সবুজ মাটির কাছে ওরা আমাদের নিয়ে গেল। ১৯৫২ সালে এইখানে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং একজন রিকশাওয়ালাসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে পুলিসের গুলিতে প্রাণ দেয়।

মানুষ কয়েকবারই সেখানে হাতে হাতে শহীদস্তম্ভ গড়বার চেষ্টা করে। মুসলিম লিগের পুলিস প্রতিবারই এসে লাথি মেরে ভেঙে দেয়।

বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা সেই তীর্থভূমির চারপাশে আমরা গোল হয়ে দাঁড়ালাম। এক নূতন যে এইখানে ভূমিষ্ঠ হয়েছে তা ঢাকায় নেমেই বুঝতে পেরেছি।

হঠাৎ চট্টগ্রামের উর্দু কবি নাজ পারভেজ, তাঁর বাঁধানো খাতাটি খুলে ধরলেন। কপালে চুল এসে পড়ছে, চোখে চশমা, ছিপছিপে যুবক চিৎকার করে শহীদদের উদ্দেশে সুকান্তর একটি উর্দু কবিতার তরজমা পড়তে লাগলেন।

আশ্চর্য সেই মুহূর্তে আমি ধ্রুব বুঝলাম নূতনের জন্ম হয়েছে।

ওরা বলেছিল, এইখানে আমরা শহীদ মিনার করব।

তখন একুশে ফেব্রুয়ারি।

আমি একবার ‘বাংলাদেশ’-এ গিয়েছি, এই বছর, স্বাধীনতার ঠিক একমাস পরে।

তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্ত আর দু’লক্ষ ধর্ষিতা রমণীর অশ্রুমাখা বাংলাদেশে সেই নূতনকে স্পষ্ট করে প্রত্যক্ষ করলাম।

নূতন পতাকা উড়ছে, নূতন জাতীয় সঙ্গীত। মানুষগুলিও চাইছে নূতন হয়ে উঠতে।

পাক মিলিটারি জুন্টা বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন আর বাংলা দেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে চেয়েছিল। চারিদিকে তাদের পৈশাচিকতার নিদর্শন।

ওরা শহীদ মিনার গড়েছিল।

এই সতেরো বছরে সেটি গিয়ে দেখার সুযোগ আমাদের হয়নি। এবারও হল না। ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা সেই পবিত্র স্তম্ভ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

ওরা বলল, আবার আমরা শহীদ মিনার গড়ব। তবে একটু সময় লাগবে। তার আগেই ২১ ফেব্রুয়ারি। আসবেন।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিকসন একুশে ফেব্রুয়ারি পিকিং-এ মাও সে তুং-এর সঙ্গে করমর্দন করবেন।

সেই দুটি হাত গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নামে বাংলাদেশে হিটলারকেও লজ্জা দিয়েছে, তারা ওইদিন মিলিত হবে।

আর, সমস্ত পৃথিবীর বিবেক ও শুভবুদ্ধি তীর্থযাত্রা করবে বাংলাদেশে।

ভারতবর্ষ, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং গণতান্ত্রিক বিশ্ব ঐদিন সমস্বরে গান ধরবে, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।

আমি বিশ্বাস করি উর্দু কবি নাজ পারভেজও সেই দলে থাকবে। বাংলাদেশে নাজ পারভেজও সেই দলে থাকবে। বাংলাদেশের নতূন জাতীয়তাবাদ কোনও ভাষা, কোনও ধর্মকেই প্রত্যাখান করবে না।


*বানান অপরিবর্তিত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5413 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. লকডাউনের বর্ষপূর্তি: চতুর্থ বর্ষ, দ্বাদশতম যাত্রা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.