Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আদিবাসীরা আদি-বাসী— নিছক বনবাসী নন, স্রেফ একটি ভোটব্যাঙ্কও নন

ইপিল বাস্কি

 

দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসীদের কেবল একটি ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে দেখা হয়েছে— এমন একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে, যাদের সহজে প্রভাবিত ও শোষণ করা যায়। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। একসময় মূলধারার রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণী পরিসরে আদিবাসীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু আজ তাঁরা নিজেদের কণ্ঠস্বর আরও সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরতে শুরু করেছেন। নিজস্ব পরিচয়, সংস্কৃতি এবং জল, জঙ্গল ও জমির অধিকারের জন্য তাঁদের সংগ্রাম আজ আগের যে-কোনও সময়ের তুলনায় আরও জোরালো

 

‘আদিবাসী’ শব্দটি এসেছে ‘আদি’ (প্রাচীন) এবং ‘বাসী’ (অধিবাসী) শব্দদ্বয় থেকে। এটি ভারতের সেইসব জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যাদের দেশের আদিবাসী বা স্বদেশীয় জনগণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮.৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি ৪২ লক্ষ মানুষ এই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ভারতীয় রাষ্ট্র অবশ্য আদিবাসীদের ভূমির আদি অধিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বরং বিশেষত হিন্দুত্ববাদী বিজেপির শাসনামলে তাঁদের ‘বনবাসী’ (অর্থাৎ বনাঞ্চলের অধিবাসী) বলে উল্লেখ করা হয়। এর মাধ্যমে আদিবাসীদের এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী হওয়ার ঐতিহাসিক দাবিকে খর্ব করার চেষ্টা করা হয় এবং তাঁদের পরিচয়কে কেবলমাত্র বনাঞ্চলে বসবাসকারী একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়।

ভারতে আদিবাসীরা সমাজের সবচেয়ে নিপীড়িত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলির অন্যতম। সাধারণভাবে আদিবাসীরা প্রকৃতিপূজক। ২০১৪ সালের পর, যখন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তখন দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। জাতপাতের কুফলে দীর্ঘদিন জর্জরিত ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষও ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। বিজেপি, যা নিজেকে আরএসএস-এর আদর্শের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করে, ‘ঘর ওয়াপসি’ বা ‘নিজের মূল পরিচয়ে প্রত্যাবর্তন’-এর ধারণার ওপর বিশেষ জোর দেয়। এই ধারণাটি সাধারণত আদিবাসীদের উদ্দেশ্য করেই ব্যবহার করা হয়, কারণ হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ অনুযায়ী আদিবাসীরা মূলত হিন্দু এবং তাঁদের ‘হিন্দু শিকড়ে’ ফিরে আসা উচিত। সঙ্ঘ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন তাদের ছাতার তলায় থাকা বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের মাধ্যমে পরিকল্পিত মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তার করে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ইতিহাসের পুনর্লিখনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে আদিবাসীরা হিন্দু।

রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি একজন আদিবাসী নারী হলেও, এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না যে আদিবাসীরা এখনও শোষিত এবং মূলধারার রাজনীতিতে তাঁদের প্রতিনিধিত্বও অপর্যাপ্ত। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই আদিবাসীদের মূলত একটি ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে দেখে; তাঁদের সমস্যা সমাধান বা উন্নয়নের জন্য গঠনমূলক উদ্যোগ খুব কমই নেওয়া হয়।

এই দেশে আদিবাসীদের অন্যতম প্রধান সংগ্রাম হল তাঁদের জল, জঙ্গল ও জমির অধিকার রক্ষার লড়াই। আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি মূলত বননির্ভর জনগোষ্ঠী, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতি ও পরিবেশকে রক্ষা করে এসেছে এবং নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনাচারকে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই গড়ে তুলেছে। কিন্তু কর্পোরেট মুনাফালিপ্সা এবং সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প, দুর্নীতি ও ব্যাপক শোষণের ফলে বহু আদিবাসীকে তাঁদের পৈতৃক ভিটেমাটি ও পূর্বপুরুষের ভূমি থেকে উৎখাত করা হয়েছে। এর ফলে তাঁদের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক অস্তিত্ব ক্রমাগত সংকটের মুখে পড়েছে।

 

ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলিতে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক হারে বন উজাড় চলছে। ছত্তীসগড়ের হাসদেও অরণ্য, যা কোরবা, সুরজপুর এবং সুরগুজা জেলায় বিস্তৃত প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার হেক্টর বনভূমি জুড়ে অবস্থিত, বহু দশক ধরে সরকারি মদতপুষ্ট কর্পোরেট সংস্থাগুলির অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বনধ্বংসের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। এর ফলে হাসদেও অরণ্যের ভেতরে ও আশপাশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অঞ্চল মূলত গোন্ড ও ওরাঁও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পুরুষানুক্রমিক আবাসভূমি, যাদের জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবন বনসম্পদের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। বনভূমির বৃহৎ অংশ, যার মধ্যে পার্সা ইস্ট ও কানতা বাসান (PEKB) কয়লাখনি ব্লক অন্যতম, রাজস্থান রাজ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগম লিমিটেড (RRVUNL)-এর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে এবং এটি পরিচালনা করে আদানি এন্টারপ্রাইসেস। খনি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বনভূমি পরিষ্কারের অনুমতিও কর্তৃপক্ষ দিয়ে চলেছে। ছত্তিশগড় উচ্চ আদালত ঘটবারা-র মতো কয়েকটি গ্রামের কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস বা সমষ্টিগত বন-অধিকার বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। আদালতের মতে, এই অধিকারগুলি প্রাথমিকভাবে যে প্রক্রিয়ায় প্রদান করা হয়েছিল, তাতে নাকি আইনি ত্রুটি ছিল।

ছত্তিশগড়ের, বিশেষত বস্তার অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি দীর্ঘদিন ধরে কর্পোরেট সংস্থার ভূমি দখল, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে আসছে। এই অঞ্চলটি ভারতের সবচেয়ে বেশি সামরিকীকৃত এলাকাগুলির অন্যতম। সন্ত্রাসদমনমূলক অভিযানের নামে পরিচালিত বিভিন্ন নিরাপত্তা অভিযানের ফলে বহু আদিবাসী গ্রামবাসী ও মানবাধিকারকর্মীর গণগ্রেপ্তার, বেআইনি আটক এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। ধ্বংসাত্মক খনি প্রকল্প এবং নিরাপত্তা শিবির স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কারণে হাজার হাজার আদিবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে অথবা UAPA-র মতো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কারাবন্দি করা হয়েছে।

এছাড়া, বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প এবং নিরাপত্তা শিবির স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রায়শই বনাধিকার আইন (Forest Rights Act) এবং পঞ্চায়েত (তফসিলভুক্ত এলাকায় সম্প্রসারণ) আইন (PESA)-এর বিধান উপেক্ষা করা হয়। অথচ এই আইনগুলি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির ওপর অধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার এবং স্বশাসনের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রদান করে।

ঝাড়খণ্ডেও আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি কয়েক দশক ধরে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বনভূমির অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে চলেছে। ভূমি থেকে উৎখাত, বৃহৎ আকারের খনন প্রকল্প, নগরায়ণ এবং তথাকথিত উন্নয়নের ফলে আদিবাসীদের পৈতৃক জমি ও বনভূমি থেকে ক্রমাগত বঞ্চিত করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তার প্রধান আঘাত বহন করতে হয়েছে আদিবাসী সমাজকেই। জাদুগোড়া-র মতো অঞ্চলে ইউরেনিয়াম খনন ও প্রক্রিয়াকরণের কারণে আদিবাসী এবং আশপাশের গ্রামের অন্যান্য বাসিন্দারা তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাবের প্রত্যক্ষ শিকার হয়ে উঠেছেন। খনির জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ ও দখল করা হয়েছে, এবং এই অঞ্চল নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নগরকেন্দ্র গড়ে ওঠার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এর ফলস্বরূপ আদিবাসীদের ভূমি থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বনাধিকার আইন-এর মতো আইন কার্যকর থাকা সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে আদিবাসীদের বনভূমির ওপর তাদের ঐতিহ্যগত অধিকার স্বীকৃত হয় না। ফলে তাঁরা নিজেদের প্রথাগত বাসস্থান ও জীবনধারার ওপর আইনি সুরক্ষা থেকেও বঞ্চিত হন। শিল্পায়ন ও খনিশিল্পের সম্প্রসারণ আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের চিরাচরিত জীবিকা ও অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এর ফলে নিজেদের জন্মভূমিতেই বহু আদিবাসী ভূমিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছেন।

ওডিশা এবং পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসীরাও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়ে চলেছেন। দ্রুত শিল্পায়নের ফলে কর্পোরেট সংস্থাগুলি বিপুল পরিমাণ আদিবাসী বনভূমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, যার ফলে ব্যাপক হারে উচ্ছেদ ও স্থানচ্যুতি ঘটছে। ২০০৬ সালের বনাধিকার আইন অনুসারে আদিবাসীরা যে বনভূমিতে বসবাস করেন, তার ওপর আইনি স্বত্ব বা পাট্টা পাওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, জেলাস্তরের সরকারি কমিটিগুলি অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছ শুনানি ছাড়াই আদিবাসীদের দাবি খারিজ করে দেয়। এর ফলে তারা উচ্ছেদের ঝুঁকির মুখে পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার মতো এলাকায় আদিবাসী সংগঠনগুলি তথাকথিত ‘সন্দেহজনক ভূমি হস্তান্তর’-এর বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইন, ১৯৫৫-এর ১৪সি ধারায় আদিবাসী জমি হস্তান্তরের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে কোনও তফসিলি জনজাতিভুক্ত ব্যক্তি তাঁর স্ব-অর্জিত বা পৈতৃক জমি কোনও অ-আদিবাসী ব্যক্তি বা কর্পোরেট সংস্থার কাছে রাজ্যের রাজস্ব আধিকারিকের স্পষ্ট লিখিত অনুমতি ছাড়া আইনত বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারেন না। কিন্তু আইনগত এই সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও জাল নথি তৈরি, প্রতারণা এবং শারীরিক ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বহু ক্ষেত্রে আদিবাসী সম্প্রদায়কে তাদের জমি থেকে উৎখাত করা হচ্ছে। ফলে নিজেদের ভূমির ওপর তাদের ঐতিহাসিক ও আইনগত অধিকার ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে।

১৯৯৬ সালে ভারতীয় সংসদ একটি সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসী-অধ্যুষিত গ্রামগুলিকে তাদের এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিশেষ অধিকার প্রদান করে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আদিবাসী-প্রধান অঞ্চলগুলিতে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে তাদের জীবন, ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অধিকার দেয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এমন আইন প্রণয়ন করেছে, যাতে অ-আদিবাসীরা আদিবাসীদের তাঁদের ভূমি থেকে উৎখাত করতে না পারে। আদিবাসীদের জীবন, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ বিপদের মুখে পড়লে ভারতের রাষ্ট্রপতিরও বিশেষ হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এইসব সাংবিধানিক বিধান, আইন এবং রক্ষাকবচ থাকলেও ভারতের আদিবাসীদের সামগ্রিক অবস্থা খারাপ থেকে কেবলই খারাপতর হয়েছে।

 

আদিবাসীদের কাছে জল, জঙ্গল ও জমি কোনও পুঁজি সঞ্চয়ের উপকরণ নয়; বরং এগুলিই তাঁদের অস্তিত্ব, পরিচয় এবং জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলি সাধারণত এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয় না। বারবার এমন আইন প্রণয়ন, সংশোধন বা পরিবর্তন করা হয়, যার ফলে আদিবাসীরা তাঁদের জমি হারাতে বাধ্য হন। এর বিনিময়ে যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয় এবং হারানো জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের বিকল্প হতে পারে না।

‘উন্নয়ন’-এর নামে বারবার সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে আদিবাসীদেরই। তাঁদের ক্রমাগত সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, এমন এক অবস্থায় যেখানে পৈতৃক ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ফলে তাঁদের পরিচয়বোধ ও মর্যাদাবোধ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ যে উন্নয়নের জন্য এই ত্যাগ স্বীকার করতে বলা হয়, তার সুফলও খুব কম ক্ষেত্রেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে— এই উন্নয়ন আসলে কার জন্য? যখন দ্রৌপদী মুর্মু ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তখন বহু আদিবাসী মানুষের কাছে তা আশার প্রতীক বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে আদিবাসী অঞ্চলে আরও বেশি নতুন খনি ইজারা অনুমোদিত হয়েছে এবং খনন কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ঘটেছে।

দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসীদের কেবল একটি ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে দেখা হয়েছে— এমন একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে, যাদের সহজে প্রভাবিত ও শোষণ করা যায়। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। একসময় মূলধারার রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণী পরিসরে আদিবাসীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু আজ তাঁরা নিজেদের কণ্ঠস্বর আরও সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরতে শুরু করেছেন। নিজস্ব পরিচয়, সংস্কৃতি এবং জল, জঙ্গল ও জমির অধিকারের জন্য তাদের সংগ্রাম আজ আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় আরও জোরালো। আদিবাসীরা ক্রমশ নিজেদের দৃশ্যমান করে তুলছেন এবং মূলধারার সমাজ ও রাজনীতির কাছে দাবি জানাচ্ছেন যে তাঁদের কথা শোনা হোক— শুধু নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার স্বার্থেও।

 

Exit mobile version