রোহণ ভট্টাচার্য
তিনি কখনও শুধু শিল্পী হয়ে ওঠেননি। ইরানে নারীর অধিকার, রাষ্ট্রীয় দমননীতি, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি বারবার কথা বলেছেন। নির্বাসনে থেকেও নিজের দেশকে ছেড়ে যাননি; বরং দূরত্ব থেকেই তাকে আরও স্পষ্টভাবে দেখেছেন। বিশ্বাস করেছেন, স্বৈরশাসন ইতিহাসের বই বদলাতে পারে। পাঠ্যক্রম বদলাতে পারে। মূর্তি ভাঙতে পারে। পতাকা বদলাতে পারে। কিন্তু স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারে না। ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশা, বিপ্লব কিংবা যুদ্ধের নয়। বরং, স্কুলে যাওয়া একটি মেয়ের গল্প। বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া একজন অভিবাসীর গল্প। মায়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের গল্প। সম্ভবত এই কারণেই সাত্রাপিকে পড়তে বসলে ইরানকে যতটা জানা যায়, তার চেয়েও বেশি জানা যায় মানুষকে
সাত্রাপির মৃত্যু ভারী। তার চেয়েও ভারী, মৃত্যুর কারণ। একজন মানুষ মারা গেলেন দুঃখে। রোগ নয়। অপঘাত নয়। বার্ধক্য নয়। দুঃখ, স্রেফ দুঃখ। ৪ জুন, মারজেন সাত্রাপির পরিবার জানাল, তিনি ঘুমিয়েছেন চিরবিষাদে। জানার পর আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল, মানুষ কি সত্যিই দুঃখে মারা যেতে পারে? তারপর মনে হল, হয়তো সাত্রাপির জীবনই সেই প্রশ্নের দীর্ঘ উত্তর।
গড়পড়তা ভারতীয়দের মতন আমারও ইরানকে দেখা, মানচিত্রে, চলচ্চিত্রে ও সাহিত্যে। দেখেছি তেলের কূপ ও মরুভূমি। শুনেছি পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস। কিন্তু তার ভিতর বসবাসকারী মানুষের স্পন্দন শোনা হয়ে ওঠেনি।
মারজেন সাত্রাপির আত্মজীবনীমূলক পারসেপোলিস চিত্রকাহিনি পড়ে মনে হয়েছিল, ইতিহাসের বই আসলে কত কম কথা বলে। একটা মেয়ে। তেহরানের মধ্যবিত্ত পরিবার। বাড়িতে বই আছে, গান আছে, রাজনীতি আছে। ছোটবেলায় সে ভাবত, বড় হয়ে নবি হবে। তারপর একদিন তার শৈশবের উপর নেমে এল বিপ্লব। তার বাবা একজন প্রকৌশলী। দাদু ছিলেন ইরানের কাজার রাজবংশের সঙ্গে যুক্ত এক অভিজাত পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ। পরে শাহ-বিরোধী রাজনীতির জন্য কারাবন্দি হন। ফলে রাজনীতি মারজেনের কাছে খবরের কাগজের বিষয় ছিল না। ডাইনিং টেবিলের বিষয় ছিল। ছোটবেলায় সে চে গেভারা আর মার্কসের ছবি যেমন চিনত, তেমনি চিনত পরিবারের সেই আত্মীয়দেরও, যাঁরা কারাগারে গিয়েছেন বা আর ফিরে আসেননি।
পারসেপোলিস-এর একটা অংশ বড় ভাবায়। বালিকা মারজেনের সঙ্গে তার কল্পনায় দেখা ঈশ্বরের কথোপকথন। দেশে তখন কট্টরপন্থী ইসলামিক ধর্মীয় শাসন শুরু হয়েছে। হারামের অজুহাতে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে সিনেমা হল, অডিটোরিয়াম। আর অন্ধকার ঘরে, বালিকা মারজেন কথা বলছে তার ঈশ্বরের সঙ্গে। মাথায় টুপি পরে তাকে জিজ্ঞেস করছে, আমাকে কি চে গেভারা কিংবা ফিদেল কাস্ত্রোর মতো দেখাচ্ছে? অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন নিরুত্তর ঈশ্বর। আর বালিকা মারজেন আবিষ্কার করছে তার কল্পনার ঈশ্বরকে দেখতে অনেকটা কার্ল মার্কসের মতো। শুধু চুলের স্টাইল একটু আলাদা।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবকে পৃথিবীর অনেক মানুষ এখনও বিজয়ের গল্প হিসেবে দেখেন। শাহের পতন হয়েছিল। পশ্চিমাপন্থী স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছিল। কিন্তু বিপ্লবের গল্প কখনও একরঙা নয়। যে বিপ্লব স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই বিপ্লবের পরেই শুরু হল নতুন কট্টরপন্থী নিয়ন্ত্রণ। মেয়েদের মাথায় বাধ্যতামূলক হিজাব। পোশাকের বিধিনিষেধ। সেন্সরশিপ। নৈতিক পুলিশ। রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে। মারজেন তখন শিশু। রাষ্ট্র কখনও শিশুদের জিজ্ঞেস করে না, তারা কোন পৃথিবীতে বড় হতে চায়।
তারপর এল ইরান-ইরাক যুদ্ধ। বোমা। সাইরেন। মৃত্যুসংবাদ। শহিদের পোস্টার। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের ভিতরে ঢুকে পড়া যুদ্ধ। একদিন তাদের প্রতিবেশী ইহুদি পরিবারের বাড়িতে আছড়ে পড়ল ক্ষেপণাস্ত্র। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি ছিন্ন হাতের কব্জিতে পরিচিত ব্রেসলেট দেখে মারজেন বোঝে, তার বন্ধুটি আর নেই। ইতিহাসের বই এমন যুদ্ধকে সংখ্যা দিয়ে লেখে। শিশুদের স্মৃতি তাকে লেখে শরীর দিয়ে। ইতিহাসের বইয়ে যুদ্ধের মানচিত্র দেখি। কোন বাহিনী কোথায় এগোল, কোন জেনারেল কোন কৌশল নিল, কত হাজার মানুষ মারা গেল। কিন্তু একটি শিশুর ঘুম ভাঙার শব্দ, একটি মায়ের আতঙ্ক, একটি বন্ধুর হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া— এসবের উল্লেখ কোথায় থাকে?
ইতিহাসের এই অপারগতায় জন্ম নেন, মারজেন সাত্রাপি। তিনি যুদ্ধকে জেনারেলদের চোখ দিয়ে দেখেননি। দেখেছেন এক কিশোরীর চোখ দিয়ে। একদিকে আকাশে বোমারু বিমান, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ধর্মীয় পুলিশের কঠোর নজরদারি। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্যেই কিশোরী মারজেন তার স্বাধীনচেতা মনোভাব ধরে রাখে। সে গোপনে পশ্চিমা ব্যান্ডের ক্যাসেট কেনে, জিন্স পরে এবং স্কুলের কট্টর নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। তার এই বিদ্রোহী আচরণের কারণে যে-কোনও সময় তার বড় বিপদ হতে পারত, যা তার বাবা-মাকে ভীষণ চিন্তায় ফেলে দেয়। তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল অস্ট্রিয়ায়। বয়স তখন মাত্র চৌদ্দ। বাবা-মা জানতেন, দেশে থাকলে মেয়েটির স্বাধীনভাবে বড় হওয়া কঠিন হবে। বিদায়ের সেই দৃশ্য পারসেপোলিস-এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলির একটি হয়ে ওঠে। বিমানবন্দরে শেষবার পিছন ফিরে তাকিয়ে সে দেখেছিল, তার মা অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন।
নিজের দেশে সে যথেষ্ট মানানসই ছিল না। ইউরোপে সে যথেষ্ট ইউরোপীয় ছিল না। নতুন দেশে সে বর্ণবিদ্বেষ দেখেছে, সাংস্কৃতিক অবজ্ঞা দেখেছে, নিঃসঙ্গতা দেখেছে। একসময় বন্ধু হারিয়েছে। প্রেমে পড়েছে। প্রেম ভেঙেছে। এমনও সময় এসেছে যখন তার থাকার জায়গা ছিল না। কয়েক সপ্তাহ রাস্তা আর আশ্রয়কেন্দ্রে কাটাতে হয়েছিল। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরে এসেছিল সে। এই অবস্থাকে হয়তো একটাই শব্দে ধরা যায়— নির্বাসন। যেখানে মানুষ দেশ হারায় না শুধু, নিজের অস্তিত্ব হারাতে শুরু করে। বুঝতে পারে না, সে ঠিক কোথাকার মানুষ। অভিবাসনের সবচেয়ে গভীর একাকিত্ব সম্ভবত এখানেই। মানুষ একসময় বুঝতে পারে, সে দুই জায়গাতেই খানিকটা বহিরাগত। নিজের ভাষায় পুরোপুরি ফেরা যায় না। নতুন ভাষাতেও পুরোপুরি বাসা বাঁধা যায় না।
ইরানে ফিরে গিয়েও সে শান্তি পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, বিয়ে করেছে, আবার সেই বিয়ে গড়িয়েছে বিচ্ছেদে। পরে সে বুঝেছিল, তার জীবন আর রাষ্ট্রের নির্ধারিত ছকে আঁটবে না। তখন, আবার দেশ ছাড়ে। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
বিস্ময় জাগে বইটির সাদা-কালো ছবিগুলো দেখে। পৃথিবী তখন রঙিন হয়ে উঠছে। কমিকস রঙিন। সিনেমা রঙিন। বিজ্ঞাপন রঙিন। কিন্তু সাত্রাপি ফিরে গেলেন সাদা আর কালোয়। সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবেই। হয়তো ভেবেছিলেন, ইতিহাসকে খুব বেশি রঙিন করলে অনেক সত্যি আড়াল হয়ে যায়। রাষ্ট্র সবসময় মানুষের জীবনকে সাদা-কালো করে দেখতে চায়। তুমি হয় অনুগত, নয়তো দেশদ্রোহী। তুমি হয় ধর্মপ্রাণ, নয় ধর্মদ্রোহী। তুমি হয় প্রেমিক, নয়তো বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু মানুষের জীবন কখনও ততটা সরল নয়। সাত্রাপির কাজের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই। তিনি আমাদের ধূসর অঞ্চলগুলো দেখান।
পরে আসে পারসেপোলিস চলচ্চিত্র। আসে চিকেন উইথ প্লামস। আসে দ্য ভয়েসেস। লেখক, চলচ্চিত্রনির্মাতা, চিত্রশিল্পী— বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে ঘুরে বেড়ান তিনি। কিন্তু তিনি কখনও শুধু শিল্পী হয়ে ওঠেননি। ইরানে নারীর অধিকার, রাষ্ট্রীয় দমননীতি, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি বারবার কথা বলেছেন। নির্বাসনে থেকেও নিজের দেশকে ছেড়ে যাননি; বরং দূরত্ব থেকেই তাকে আরও স্পষ্টভাবে দেখেছেন। বিশ্বাস করেছেন, স্বৈরশাসন ইতিহাসের বই বদলাতে পারে। পাঠ্যক্রম বদলাতে পারে। মূর্তি ভাঙতে পারে। পতাকা বদলাতে পারে। কিন্তু স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারে না। ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশা, বিপ্লব কিংবা যুদ্ধের নয়। বরং, স্কুলে যাওয়া একটি মেয়ের গল্প। বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া একজন অভিবাসীর গল্প। মায়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের গল্প। সম্ভবত এই কারণেই সাত্রাপিকে পড়তে বসলে ইরানকে যতটা জানা যায়, তার চেয়েও বেশি জানা যায় মানুষকে। আর শেষ পর্যন্ত, তাঁর মৃত্যু যেন তাঁর সকল কাজের শেষ অধ্যায়।
তিনি লিখেছেন হারিয়ে ফেলা নিয়ে। শৈশব হারানো। দেশ হারানো। নিরাপত্তা হারানো। পরিচয়ের নিশ্চয়তা হারানো। তারপর একদিন হারালেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকেও। হয়তো মানুষ সত্যিই দুঃখে মারা যায় না। হয়তো মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে যেতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পতাকা বদলায়। সরকার বদলায়। মতাদর্শ বদলায়। বিপ্লব আসে, বিপ্লব ফুরোয়। কিন্তু এক কিশোরী মেয়ের স্মৃতি থেকে যায়, সাদা-কালো আঁকায়। দুঃখের ভিতর। সাত্রাপি সারাজীবন এই দুঃখকে এড়িয়ে যাননি। তাকে দেখেছেন। এঁকেছেন। লিখেছেন। ব্যক্তিগত ক্ষতি, নির্বাসন, দেশহারা মানুষের নিঃসঙ্গতা, রাষ্ট্রের সহিংসতা— সবকিছুর সাক্ষ্য বহন করেছেন।
সাত্রাপি যেভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন, তাঁর সেই জীবন সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এমনকি আমরা তাঁর মৃত্যুর কারণকেও গ্রহণ করতে পারছি না। আমরা অসুখ বুঝি। দুর্ঘটনা বুঝি। কিন্তু দুঃখ বুঝি না। কারণ দুঃখের কোনও এক্স-রে নেই। কোনও রক্তপরীক্ষা নেই। কোনও ময়নাতদন্ত নেই। অবয়ব নেই। দুঃখ সেই নিরাকার ঈশ্বর, যাকে কার্ল মার্কসের মুখোশ পরিয়ে গল্প করত বালিকা মারজানে। তাই মারজানের সঙ্গে আমাদের আর দেখা হল না। যেমনটি বলেছেন কবি— “যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের— মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা।”

