অভ্রদীপ ঘটক
বাংলার প্রেতচর্চার ইতিহাস বিরাট বিস্তৃত। বাংলা বরাবরই একাধারে বিপ্লবী আবার একাধারে ওঝা। তবে বাংলার প্রেতচর্চার ইতিহাসে যেমন রহস্যময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আবার অন্ধবিশ্বাসী প্যারীচাঁদ মিত্রও ছিলেন
উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে যখন বাংলায় রেনেসাঁ রানিং, অর্থাৎ বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথের উত্থান, এদিকে রামকৃষ্ণ প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করছেন, বিদ্যাসাগরের প্রভাব বিশেষ উল্লেখ্য, ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লব জন্মাচ্ছে বাংলার ঘরে ঘরে এবং জগদীশ বোস বিজ্ঞানে জ্বলজ্বল করে আছেন, এহেন সময়ে, বাংলার এই সো-কলড নবজাগরণ ছিল মূলত পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদ এবং প্রাচ্যের আত্মিক এবং আধ্মাত্মিক দর্শনের মেলবন্ধন।
এই সময়কালটি কেবল সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মানুষের প্রসারিত মনস্তত্ত্ব, এবং অজানার প্রতি আকর্ষণের বিশ্বায়ন ঘটেছিল বলা চলে।
নবজাগরণের সমসময়ে একটি অত্যন্ত চর্চিত এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক ছিল পরাবিদ্যা বা Parapsychology, অতিপ্রাকৃত এবং পরলোকচর্চার প্রতি সেকালের বুদ্ধিজীবীদের গভীর আকর্ষণ। বাংলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলে, একই সঙ্গে বাঙালি অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ করছে, সাহেব ঠেঙাচ্ছে, সাহিত্যচর্চা করছে, আবার সবেগে পরলোকচর্চা করে যাচ্ছে।
বাংলার নবজাগরণের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাওয়ার সময়কালে, ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মহীরুহের মতো দাঁড়িয়েছিলেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একই সঙ্গে আবার দেখা যায়, কিশোর বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথের প্রেততত্ত্ব নিয়ে অশেষ আগ্রহ ছিল। বৃদ্ধ বয়সে গিয়ে সেই আগ্রহ লেখায়, রেখায় এবং প্রয়োগে রূপান্তরিত হয়।
কৈশোরে রবীন্দ্রনাথ একটি যন্ত্রের সাহায্যে সে সময় সদ্যপ্রয়াত মাইকেল মধুসূদন দত্তের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের প্রভূত চেষ্টা করেছিলেন। মধুসূদনের মৃত্যুর সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল মাত্র বারো বছর। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীতে এই প্ল্যানচেট করার আজব যন্ত্রটির নাম দিয়েছিলেন— প্রেতবাণীবহ চক্রযান।
প্ল্যানচেটের কাজে-অকাজে ব্যবহৃত নানা বিচিত্র যন্ত্র বিদেশে বহুকাল থেকেই পাওয়া যায়। আমরা ওউজা বোর্ডের কথা জানি। ১৮ শতকের শেষের দিকে ফ্রাঞ্জ অ্যান্টন মেসমের ব্যাকেট নামক একটি কাঠের যন্ত্র বিরাট জনপ্রিয় ছিল। বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিশেষ এক পেন্ডুলাম দিয়ে, তাতে স্ফটিক ঝুলিয়ে, হ্যাঁ বা না বলার যন্ত্র, ক্রিস্টাল বল, এরকম নানা যন্ত্রের বিজ্ঞাপন এবং তার সরাসরি লাইভ প্রদর্শন এই কলকাতা শহরেই চলত রমরমিয়ে।
সেই আকর্ষণীয় এবং লোভনীয় লাইভের হাতছানি স্বয়ং রবি ঠাকুরও এড়িয়ে যেতে পারেনি।
সেই সময়ের এক আশ্চর্য তথ্য পাওয়া যায় সেই ঠাকুরবাড়ি থেকেই প্রকাশিত তাদের নিজস্ব পত্রিকা ভারতী-তে। ১৩০১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যায় একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল, যেখানে প্ল্যানচেট করার জন্য এক অদ্ভুত যন্ত্রের প্রচার করা হয়।
নির্মাতা শরৎচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, ১০৮ আপার চিৎপুর রোড, গরাণহাটা, কলিকাতা। মূল্য আড়াই টাকা, প্যাকিং ও ডাকমাশুল বারো আনা।
ইউরোপে তখন স্পিরিচুয়ালিজম এবং স্পিরিট কলিং-এর ঢেউ উঠেছে। যদিও এর শুরুটা প্রধানত আমেরিকায়, ১৮৪৮ সালে ফক্স বোনেদের হাত ধরে হলেও, খুব দ্রুতই তা আটলান্টিক পেরিয়ে ইউরোপে, বিশেষ করে গ্রেট ব্রিটেন এবং ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে।
এই রমরমা বাজারের একটা কারণ হিসেবে দেখা যায় সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং মূলত স্প্যানিশ ফ্লু-মহামারির পরপরই ইউরোপে প্রায় কোটির কাছাকাছি মানুষের মৃত্যু হয়। মৃত আত্মীয়দের সঙ্গে শেষবার কথা বলার আশায় মিডিয়ামদের কাছে দলে দলে ছুটতে শুরু করেন ইউরোপের অনেক শিক্ষিত মানুষ।
এ দিকে কলকাতার বিখ্যাত থিওজফিকাল সোসাইটির উদ্যোগে নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে সমিতির মুখপত্র দ্য থিওজফিস্ট।
প্যারীচাঁদ মিত্র আর তাঁর কয়েকজন সমমনস্ক বন্ধুবান্ধব মিলে কলকাতার বুকে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইউনাইটেড অ্যাসোসিয়েশন অব স্পিরিচুয়ালিজম’। পরলোকতাত্ত্বিকদের অন্যতম হীরেন্দ্রনাথ দত্ত লিখছেন,
১৮৮১ সাল থেকে শুরু করিয়া ডাক্তার জেমস মার্টিন পিবলস এবং বিখ্যাত ব্রিটিশ মিডিয়াম উইলিয়াম এগলিনটন-এর মতো বিখ্যাত প্রেততাত্ত্বিকেরা কলকাতায় আসিয়া আশ্চর্য সব কাণ্ড ঘটাইয়াছিলেন।
১৮৮১ সালে এগলিনটন যখন কলকাতায় আসেন, তিনি মূলত তাঁর স্লেট-রাইটিং— অর্থাৎ মিডিয়াম বলছেন, আত্মা স্লেটে লিখছেন— এই প্রক্রিয়ার জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন।
বন্ধ স্লেট খুললেই দেখা যেত মৃত আত্মীয়দের বা কোনও স্পিরিট গাইডের বার্তা।
যেমন এগলিনটনের কলকাতানিবাসী স্পিরিট গাইডের নাম ছিল ‘আর্নেস্ট’। আর্নেস্টবাবু ছিলেন অনেকটা শীর্ষেন্দুর মনোজদের অদ্ভুত বাড়ির পুরোহিতমশাইয়ের পোষা ভূত হাঁদুভুদুর মতো। এগলিনটনের কথায় সেই ভূত ওঠাবসা করত, এবং লোকে তা দেখে রীতিমত ক্ল্যাপ দিত!
আর ছিল মেটিরিয়ালিজম, যাতে প্রেতাত্মা সশরীরে হাজির হত প্রেতচর্চার আসরে। প্যারীচাঁদ মিত্র, মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, দেশপূজ্য শিশিরকুমার ঘোষ প্রভৃতি ওই সকল ঘটনার প্রত্যক্ষকারী ছিলেন, তা ইতিহাস এবং সমসাময়িক সংবাদপত্র ঘাঁটলেই পাওয়া যায়।
এই সিরিজ অফ ঘটনা কলকাতার বুকে ঘটাতে এক গোটা বাংলায় চূড়ান্ত আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এগলিনটন ভারত সফর শেষে এসএস ভেগা নামক একটি জাহাজে করে দেশে ফিরছিলেন। সেই সময়ে থিওজফিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাত্রী ম্যাডাম ব্লাভাটস্কি ছিলেন বোম্বেতে। এগলিনটন নাকি এক অলৌকিক চিঠি টেলিপোর্টেশনের মাধ্যমে তার জাহাজ থেকে অলৌকিক উপায়ে বম্বেতে তাঁর বাড়িতে এবং কলকাতার কর্নেল গর্ডনের বাড়ির ছাদ থেকে সরাসরি পাঠিয়ে দেন!
সে-সময় ভারতবিখ্যাত পত্রিকা ইন্ডিয়ান মিরর-এর সম্পাদক ছিলেন নরেন্দ্রনাথ সেন। এগলিনটন, ম্যাডাম ব্লাভাটস্কি বা কর্নেল ওলকটের এই অলৌকিক এবং আজগুবি কার্যকলাপ প্রায় প্রতিদিনের নিখুত বিবরণ অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে এই পত্রিকায় ছাপা হত।
এসএস ভেগা জাহাজের ঘটনাটিও তারা বেশ রোমাঞ্চকরভাবেই পরিবেশন করেছিল।
অমৃতবাজার এবং ইন্ডিয়ান মিরর দুই পত্রিকাতেই সম্পাদকীয় বিভাগে এই ইউরোপীয় স্টাইলে প্ল্যানচেটের বিবরণ সম্পর্কে হিন্দু স্পিরিচুয়ালিজম, প্রাচীন হিন্দু দর্শনে অলরেডি বিবৃত আত্মার অবিনশ্বর রূপ ইত্যাদি ব্যাখ্যা করে ধারাবাহিকভাবে প্রবন্ধ আকারে ছাপা হয়েছিল। এবং এই দুই পত্রিকার ধারাবাহিক স্পিরিচুয়াল পোস্টিং স্বভাবতই তৎকালীন বঙ্গসমাজে চরম বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছিল।
অবশ্য পরবর্তীকালে লন্ডনের ‘সোসাইটি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চ’ রিচার্ড হজসন নামের এক ভয়ানক যুক্তিবাদী এবং কড়া গবেষককে ভারতে পাঠায়। হজসনের রিপোর্ট পুরো থিওজফিক্যাল সোসাইটির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
এগলিনটনের সিয়ঁসে যে আত্মারা সাদা ধোঁয়া বা কাপড়ে মোড়া অবস্থায় আবির্ভূত হত, সেগুলোও ভুয়ো প্রমাণিত হয়। একবার আর্চডিকন কোলি নামের এক ব্যক্তি একটি সিয়ঁস চলাকালীন ‘প্রেতাত্মা’-র দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
তিনি দেখেন, আত্মার ছদ্মবেশে থাকা ব্যক্তিটি আসলে সেই এগলিনটনেরই এক সহযোগী, যে ফেক দাড়ি এবং সস্তা মসলিন কাপড় জড়িয়ে-টড়িয়ে ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করেছিল।
এই ঘটনার পর এগলিনটন এতটাই অপদস্থ হন যে তিনি মিডিয়ামের কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
এই ভুয়ো প্রমাণিত হওয়ার খবর অবশ্য ইন্ডিয়ান মিরর কিংবা অমৃতবাজারে ছাপা হয় না!
অর্থাৎ সেই সময়ে বাংলায়, বিশেষত কলকাতায় সারা বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্পিরিচুয়ালিটির চর্চা অত্যন্ত বিশ্বাসের সঙ্গেই রমরমিয়ে চলত।
সেই স্পিরিচুয়ালিজমের সুনামি-সম ঢেউ এসে পৌঁছেছিল বাংলার নবজাগরণের কেন্দ্রে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। এই বাড়িতে প্রায়শই প্রেতচক্রের আসর বসত।
যদিও এই সময়েই আবার হুতোম প্যাঁচার নকশায় এই প্রেতচর্চাকেই ‘বুজরুকি’ বলে গাল পেড়েছিলেন স্বয়ং কালীপ্রসন্ন সিংহ।
অন দ্য আদার হ্যান্ড, শোনা যায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি নিয়মিত কথা বলতেন তাঁর মৃতা স্ত্রী গৌরীর সঙ্গে! তিনি যে বিদ্যালয়ে পড়াতেন, সেই বিদ্যালয়েরই নানা উৎসাহীদের নিয়ে বিভূতিবাবু প্ল্যানচেটের আসর বসিয়েছিলেন। এবং তাঁর জেরে স্কুলকর্তৃপক্ষ আর জেলাপ্রশাসনের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন। এবং শেষপর্যন্ত প্রেতচর্চার প্র্যাবল্যের জেরেই তাঁকে খোয়াতে হয়েছিল হুগলি জেলার জাঙ্গিপাড়ার দ্বারকানাথ হাইস্কুলের চাকরিখানা।
শুধু তা-ই নয়, প্ল্যানচেটে বিভূতিবাবুর মা মৃণালিনীদেবীর ভার্চুয়াল সম্মতি পেয়ে সদ্য স্ত্রীহারা বিভূতিভূষণ এক্কেবারে রাজি হয়ে যান তাঁর চেয়ে সাতাশ বছরের ছোট কল্যাণীদেবীর সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়েতে! এবং সত্বরই সে বিবাহ সম্পন্ন হয়!
বিভূতিবাবু প্রেতলোক নিয়ে তাঁর দেবযান বইটি লেখেন ইমানুয়েল সুইডেনবার্গের বিখ্যাত বইটির অনুকরণে, যা ১৭৫৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। বইটির মূল নাম Heaven and its Wonders and Hell From Things Heard and Seen।
সেই বইতে সুইডেনবার্গ দাবি করেছিলেন যে তিনি প্রায় ১৩ বছর স্বর্গ ও নরক ভ্রমণ করেছেন এবং আত্মা ও দেবদূতদের সঙ্গে কথা বলে যা যা দেখেছেন তা-ই এই বইতে লিপিবদ্ধ করেছেন। এবং সুইডেনবার্গের প্রেতলোকের বা স্বর্গের সেই অদ্ভুত বর্ণনার সঙ্গে বিভূতিবাবুর ১৯৪৪ সালের দেবযান উপন্যাসের আশ্চর্য হুবহু মিল লক্ষ করা যায়!
১৮৭৯ সালে প্রকাশিত হল বাংলার প্রেতচক্রের নোটবুক ইহলোক পরলোক। সেই বইয়ে নির্দিষ্ট করে বলাই ছিল রাস্তা বা গলি থেকে দূরে ঠিক কেমন হবে চক্রকক্ষের পরিবেশ অথবা তার মাপ। ক্ষমতাশালী মিডিয়াম না হলে বড় ঘরে চক্র না বসানোর, এবং সেই চক্রে দু-একজন মহিলা বা কোমল প্রকৃতির মানুষকে, তুলা রাশির প্রেফারেবল, রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নবারুণের কাল্ট উপন্যাস হারবার্ট-এও উত্তর কলকাতার এই প্রেতচর্চা নিয়ে এক বিস্তারিত খানিক ব্যঙ্গাত্মক অধ্যায় রয়েছে। সেই সময়ের এক নামকরা এক যুক্তিবাদী সংস্থার সঙ্গে উপন্যাসের নায়ক হারবার্টের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কথা নবারুণ লিখেছিলেন।
শ্রীমৃণালকান্তি ঘোষ ভক্তিভূষণ প্রণীত ‘পরলোকের কথা’-সংশোধিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ। মূল্য দুই টাকা মাত্র। বইটি রয়েছে ১৭১ পাতা থেকে। তাই শুরুতেই দেখা যায় মহারাজ বাহাদুর সার যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর কে.সি.এস.আই.-এর ফটো। ছবিতে প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে ১৯০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি ৭৭ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন— বইটি এইভাবে শুরু— “লিখিলেন,— ‘মা, তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়াছি, আমাকে ক্ষমা কর। আমিও অনেক যন্ত্রণা ভোগ করিয়া এখন বেশ শান্তিতে আছি।’ এইরূপ আরও অনেক কথা লেখার পর শিবচন্দ্রের স্ত্রীর আবেশ ভাঙিয়া গেল। তিনি কন্যার জন্য কাঁদিতে লাগিলেন…” ইত্যাদি।
এবং উল্লেখ ছিল কালীবর বেদান্তবাগীশ প্রণীত পরলোক-রহস্য-এর।
এই কাল্পনিক ব্যাঙ্গাতক বই দুটির কথা কেন নবারুণ উল্লেখ করেছিলেন তা নতুন ক্যাফে-কলকাতার গলিঘুপচির মধ্যে মিশে থাকা প্রাচীন গলির মধ্যে টিমটিমে বাল্ব জ্বলতে থাকা কলকাতার কোনও এক অতৃপ্ত আত্মাই বলতে পারবে।
১৯২৯ সালের শেষের দিকে মূলত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস নাগাদ প্রায় ৬৮ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে আবার বেশ নিয়মিতভাবে প্রেতচক্র বা প্ল্যানচেটের আসর বসাতে শুরু করেন।
সেই সময় শান্তিনিকেতনে শরতের শেষ দিক, শান্তিনিকেতনের আশ্রম প্রায় জনশূন্য। রবীন্দ্রনাথ একাই ছিলেন উত্তরায়ণ ভবনে। এই সময় তাঁর অতিথি হয়ে সেখানে আসেন তাঁর পুরনো বন্ধু ও বহু কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক মোহিতচন্দ্র সেনের মেয়ে উমা দেবী। উমা একাধারে ধারালো কবি এবং সো-কলড অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী এক মিডিয়াম।
উমা দেবী যে দক্ষ মিডিয়াম, এই খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথের আবার সেই ছোটবেলার আকর্ষণ, নেশা, প্যাশন সব একসঙ্গে ট্রিগার করে। উমার সঙ্গে কোল্যাবে শুরু হয় নিয়মিত প্রেতচক্র।
ঠিক যেমন সেই সমসাময়িক সময়ে ইউসাপিয়া পাল্লাদিনো নামের ইতালির এই মহিলা ছিলেন একজন বিখ্যাত ফিজিক্যাল মিডিয়াম।
তাঁর আসরে অদ্ভুত শব্দ হওয়া, টেবিল শূন্যে ভেসে ওঠা এবং ‘একটোপ্লাজম’ (Ectoplasm— এক ধরনের ধোঁয়াটে বা আঠালো পদার্থ যা মিডিয়ামের শরীর থেকে বেরোত বলে দাবি করা হত) নির্গত হওয়ার ঘটনা ঘটত। পিয়েরে এবং মারি কুরির মতো নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরাও তাঁর ক্ষমতা পরীক্ষা করতে সিয়ঁসে অংশ নিয়েছিলেন এবং বেশ অবাক হয়েছিলেন বলে তাঁর বিবৃতিও আছে।
আবার এই একটোপ্লাজম তত্ত্ব নিয়ে আমাদের স্বামী অভেদানন্দ তাঁর মরণের পারে বইতে অনেক কিছু ব্যাখ্যা করেছিলেন আত্মার জৈব অস্তিত্ব সম্পর্কে, যা ইউরোপীয় প্রেততত্ত্বের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়! যদিও অভেদানন্দ এই সব থিওরি বেদান্ত দর্শন বলে দাবি করেছিলেন!
প্রেতচর্চায় যাঁরা সে সময় অতি আগ্রহী ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ড আর আমেরিকায় গিয়ে কিছু দিন প্রেতবিদ্যা চর্চা করার উৎসাহ দিয়ে বলা হয়েছে, “তথায় ছয় মাসে আমরা যা শিখিব ও দেখিব তাহা এদেশে দশ বৎসরেও সম্ভব হইবে না।”
জানা যায়, রাজা দিগম্বর মিত্র ছিলেন চরম পরলোকবাদী। কেশবচন্দ্র সেনও আমেরিকায় গিয়ে পরলোকবাদীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন।
১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কেশবচন্দ্র সেনের বই পরলোকের সন্ধানে।
স্বামী অভেদানন্দ ১৮৯৭ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় আমেরিকা ও ইউরোপে বেদান্ত প্রচারের সময় এই বিষয়গুলি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন বলে জানা যায়।
পাশ্চাত্যে থাকাকালীন এই স্বামী অভেদানন্দ নিজেই নিয়মিত স্পিরিচুয়ালিস্টদের আসরে বসতেন। পারলৌকিক সত্তা বা মৃত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের যে দিকটি নিয়ে মানুষের প্রবল আগ্রহ রয়েছে, তাঁর কথা অনুযায়ী তাঁর নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং “বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা” তিনি এই বইতে দিয়েছেন।
তিনি লিখেছিলেন—
নিউ ইয়র্কের অন্তর্গত লিলি-ডেলে এক আধ্যাত্মিক সম্মেলনে বক্তৃতা দেবার জন্য আমন্ত্রিত হয়ে আমি ‘হিন্দুধর্ম’ সম্বন্ধে বলি। একটা অডিটোরিয়মে সভার আয়োজন হয়েছিল, তার চারদিক খোলা ছিল ও প্রেততত্ত্ববাদে বেশ আগ্রহশীল শ্রোতার দ্বারা আসনগুলি ভর্তি ছিল। একটা বাৎসরিক উৎসবদিনের উপলক্ষে আমি ছিলাম বক্তা। ফটকে গণনা করে দেখা গেল যে, যে-সব শ্রোতা শুনতে এসেছিল তাদের সংখ্যা ছিল সাত হাজার। এই সভায় অনেক মিডিয়ম উপস্থিত ছিলেন।
এদের কেউ-কেউ আমায় বলেছিলেন যে, আমি যে-সব কথা তাঁদের বলছি সে-সব কথা তাঁরা তাঁদের প্রেতাত্মা নির্দেশকদের কাছ থেকেও শিখেছেন। তাঁরা তাঁদের এক উপবেশনে যাবার জন্য আমায় আমন্ত্রণ করলেন।
১৮৯৮-এর ৪ঠা আগষ্ট, সেরকমই এক উপবেশনে থেকে এক টাইপ্-রাইটারে আপনা-আপনি টাইপরাইটিং হতে দেখলুম। সকলেই আপন-আপন মৃত আত্মীয়-বন্ধুদের নাম দিলেন। আমিও আমার গুরুভাই যোগেনের নাম দিলাম।
নীল পেন্সিলে লেখা যোগেনের নাম পাওয়া গেল। এতে আমার কৌতূহল জাগলো; কে লিখলেন আমার জানতে ইচ্ছা হ’ল।
এমনকি অভেদানন্দ এমন কিছু চক্রের কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে একটি টিনের চোঙা শূন্যে ভাসতে ভাসতে প্রেতচর্চার অংশগ্রহণকারীদের কানের কাছে এসে মৃত আত্মীয়দের গলায় কথা বলত। এর বিস্তারিত বর্ণনাও তিনি দিয়েছেন।
তারপর উনি এও লিখেছেন,
অন্তত প্রেতাত্মাদের কুড়িটা হাত আমার পিঠের ওপর, অর্থাৎ কুড়িটা বিদেহীর হাত আমার পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করছে। কেউ কেউ আমার জামার কলার কিংবা পকেট ধরে টানছে, অথবা একইসঙ্গে অনেকগুলো হাত আমার পিঠে দিয়েছে। এ’সব আমি স্পষ্টভাবে অনুভব করেছি। তারপর একজন আত্মা হয়ত আমায় জিজ্ঞাসা করল: ‘আপনি কি মনে করেন…?’
—মরণের পারে, পৃষ্ঠা ১৩৮-৩৯
অভেদানন্দ এ-ও বলেন— “একে বলে মেটিরিয়ালাইজিং মিডিয়নশিপ। বিদেহী আত্মার ঐ তেজোময় পদার্থকে প্রেততত্ত্ববাদীরা ‘একটোপ্লাজম’ বলেন। স্যার আর্থার কোনান ডয়েল বলেছেন: সাক্ষ্য পাই যে, কতগুলি লোক তারা প্রেতাত্মার পার্থিব শরীর-ধারণের-সহায়ক মিডিয়ম এবং এর মধ্যে অনেক অসাধারণ শারীরিক বিকাশ দেখা যায়। দেহ থেকে তাঁরা আংশিক তরল ও খাদহীন একরকম স্বচ্ছ পদার্থ নিঃসৃত করতে পারেন। যে কোন জড়পদার্থ থেকে সেই তরল বাষ্পীয় পদার্থটি দেখতে সম্পূর্ণ পৃথক, অথচ তা আবার জড় আকার ধারণ করতে পারে, দেহ থেকে নির্গত ও অন্তপ্রবিষ্ট হয়, কিন্তু কাপড়ে কোন দাগ হয় না। সেই বাষ্পীয় তরল অর্থাৎ ধোঁয়ার মতো পদার্থটিকে একজন গবেষক আবিষ্কৃত করেন। তিনি পরীক্ষা করে বলেছেন সেটি একরকম নমনীয় পদার্থ, ইচ্ছা করলে তাকে রবারের মতো বাড়ানো-কমানো যায় অথচ বেশ সচেতন বলে মনে হয়। সেই পদার্থকেই ‘একটোপ্লাজম’ বলে।”
অর্থাৎ স্বামী অভেদানন্দ নিজে তাঁর মরণের পারে বইতে দাবি করেছেন যে, সিয়েন্সের সময় মিডিয়ামের শরীর থেকে একটোপ্লাজম নামের এক ধরনের ধোঁয়াটে বা আঠালো বায়বীয় পদার্থ বেরিয়ে আসে, যা দিয়ে আত্মারা রূপ ধারণ করে। তাঁর বইতে তিনি এই একটোপ্লাজম-এর ছবিও দিয়েছেন।
কিন্তু সেই সময়ে ইউরোপের এক গবেষক দল সিয়েন্সের সময় মিডিয়ামরা অন্ধকারে মুখ বা শরীর থেকে যে একটোপ্লাজম বের করতেন, হঠাৎ আলো জ্বেলে বা সেই পদার্থ চেপে ধরে দেখা গেল সেগুলো আসলে চিজক্লথ, মসলিন কাপড়, তুলো, বা ডিমের সাদা অংশ দিয়ে তৈরি। অনেক সময় কাগজ চিবিয়ে বা কাপড় গিলে রেখে সিয়েন্সের সময় তা বের করে আনা হত। অন্ধকারে ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় সেগুলোকে ধোঁয়াটে বা ভৌতিক মনে হত।
আর সেই পূর্বে বর্ণিত শূন্যে ট্রাম্পেট ভাসানো, টেবিল নড়াচড়া করা (Table-turning) বা অদ্ভুত শব্দ করার জন্য মিডিয়ামরা কালো সুতো, লুকানো তার, পা বা হাঁটুর কৌশল এবং হাইলেভেলের ভেন্ট্রিলোকুইজম ব্যবহার করতেন। পুরোটাই অন্ধকার বা আধো-অন্ধকার ঘরে করা হত, যাতে মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম ঘটে।
স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত মিডিয়াম হেলেন ডানকানকে ১৯৪৪ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে প্রমাণিত হয়, তিনি গিলে রাখা চিজক্লথ বমি করে বের করে তাকে একটোপ্লাজম বলে চালাতেন।
অভেদানন্দ যখন নিউইয়র্কে, ঠিক সেই সময়েই, ইংল্যান্ডের ফ্লোরেন্স কুক মূলত বিখ্যাত হয়েছিলেন ‘মেটেরিয়ালাইজেশন’ বা আত্মাকে সশরীরে রূপ দেওয়ার জন্য। তাঁর সিয়ঁস চলাকালীন একটি আত্মা রক্তমাংসের মানুষের মতো আসরে ঘুরে বেড়াত। বিখ্যাত রসায়নবিদ স্যার উইলিয়াম ক্রুকস তাঁর এই ক্ষমতার দীর্ঘ তদন্ত করেছিলেন। মিডিয়াম ফ্লোরেন্স কুকের আসরে যে আত্মাটি সশরীরে হাজির হত বলে সেই সময়ের পত্রপত্রিকা দাবি করত, তার নাম ছিল কেটি কিং। বলা হত, এই কেটি কিং ছিলেন সপ্তদশ শতকের এক জলদস্যুর মেয়ে।
কেটি সিয়ঁস অর্থাৎ প্রেতচর্চার কক্ষে হেঁটে বেড়াতেন, দর্শকদের সঙ্গে কথা বলতেন, এমনকি তাঁকে স্পর্শও করা যেত। এটি প্রেতচর্চার ইতিহাসে অন্যতম বড় এক রহস্য ও রোমাঞ্চকর আখ্যান হয়ে আছে।
যদিও ফ্লোরেন্স কুকের এই জালিয়াতি পুরোপুরি এবং চূড়ান্তভাবে প্রকাশ হয় ১৮৮০ সালের ৯ জানুয়ারি। ফ্লোরেন্স কুক এবং তার ডেকে আনা প্রেত কেটি কিং-এর চেহারার মধ্যে হুবহু মিল ছিল। অন্ধকার বা আবছা আলোর ঘরে ফ্লোরেন্স নিজেই সাদা চাদর বা পোশাক পরে আত্মা সেজে আসতেন। ভিক্টোরিয়ান যুগের এই সিয়েন্সগুলোর নিয়মই এমন ছিল যে, মিডিয়াম একটি বন্ধ ক্যাবিনেট বা পর্দার আড়ালে থাকবেন এবং সেখান থেকে দুম করে আত্মা বেরিয়ে আসবে। ফ্লোরেন্স দড়ির বাঁধন বন্ধ এবং খোলার নানা কৌশল জানতেন, যা ব্যবহার করে তিনি পর্দার আড়ালে বাঁধন খুলে আত্মা সেজে বাইরে আসতেন এবং আবার দ্রুত ভেতরে গিয়ে নিজেকে বেঁধে ফেলতেন।
পরবর্তীতে অনেক গবেষক এবং মূলত জাদুকর হ্যারি হুডিনি সর্বসমক্ষে প্রমাণ করেছেন যে, ফ্লোরেন্স কুকের এই কেটি কিং-এর আত্মা নামানো আসলে কোনও প্যারানরমাল ঘটনা ছিল না, বরং অত্যন্ত সুনিপুণ একটি থিয়েট্রিক্যাল ইল্যুশন ছিল।
এইভাবে ইউরোপে একের পর এক স্পিরিচুয়াল সিটিং বা সিয়েন্স মিথ্যে প্রমাণিত হতে থাকে।
যদিও অভেদানন্দের সেই একটোপ্লাজমীয় বই মরণের পারে কিন্তু এখনও বাংলায় বেস্টসেলার!!
রবীন্দ্রনাথ অবিশ্যি সিয়ঁস-এর প্রচলিত নিয়ম ভেঙে একটি ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করেন। সাধারণত প্ল্যানচেটে সবাই গোল হয়ে বসে যন্ত্রের ওপর হাত রাখে। কিন্তু এখানে রবীন্দ্রনাথ উমাদেবীর মুখোমুখি বসে সরাসরি প্রশ্ন করতেন।
উমাদেবীর হাতে থাকত কাগজ ও পেন্সিল। তিনি যেন অদৃশ্য কোনও উৎস থেকে উত্তর শুনে দ্রুত তা লিখে কবিকে দেখাতেন। এই লেখালেখিতে তাঁকে সাহায্য করতেন অমিয় চক্রবর্তী ও মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। ওঁদের পরবর্তী বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
সেই ঘরে আরও অনেকে উপস্থিত থাকতেন, কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার ছিল একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই।
এইভাবে জাস্ট কয়েক দিনের মধ্যেই আটটি ফুলস্কেপ কাগজের মোটা খাতা ভরে ওঠে। অক্টোবরের শুরুর দিকে প্রাথমিক অধিবেশনগুলির কোনও পূর্ণ বিবরণ কোথাও পাওয়া যায় না, কিন্তু নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে, উমাদেবী যতদিন শান্তিনিকেতনে ছিলেন, ততদিন নিয়মিত প্রেতচক্র বসেছিল। এই সব ঘটনার লিখিত বিবরণ আজও শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত রয়েছে।
এই প্রেতচক্রে কবির আহ্বানে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন তাঁর বহু প্রয়াত আত্মীয় ও বন্ধু। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নতুনদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, বড় মেয়ে মাধুরীলতা, ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ, প্রিয় ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ও হিতেন্দ্রনাথ।
শুধু পরিবার নয়, রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চায় এসেছিলেন কবির ঘনিষ্ঠজনদের আত্মা, যেমন সুকুমার রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, অজিত চক্রবর্তী, সন্তোষ মজুমদার, সতীশ রায় প্রমুখ।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, বহুবার ডাকা সত্ত্বেও কখনও আসেননি কবির পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাতা সারদাদেবী, বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা মেজমেয়ে রেণুকাদেবী।
এঁদের না আসার কথাও রবীন্দ্রনাথ খাতায় টুকেছিলেন।
যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা কবির প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন বলেই সেই খাতায় উল্লেখ আছে। এমনকি তাঁরা তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছার কথাও প্রকাশ করেছিলেন।
যেমন, সুকুমার রায় তাঁর একমাত্র পুত্রকে অর্থাৎ সত্যজিৎ রায়কে শান্তিনিকেতনের আশ্রমে রেখে মানুষ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আবার রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রয়াত স্ত্রী মৃণালিনীর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বালবিধবা প্রতিমাদেবীর বিয়ের বিষয়েও।
একজন রহস্যময় আত্মাও বারবার উপস্থিত হয়েছিলেন, যিনি কখনও নিজের পরিচয় দেননি। রবীন্দ্র-গবেষকদের অনুমান, তিনি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী।
যথারীতি রবীন্দ্রনাথের এই প্রেতচর্চা সবাই যে খুব আনন্দিত হয়ে মেনে নিয়েছিলেন তা একেবারেই নয়।
রবিবাবু তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,
পৃথিবীতে কত কিছু তুমি জানো না, তাই বলে সে সব নেই? কতটুকু জানো? জানাটা এতটুকু, না জানাটাই অসীম। সেই এতটুকুর ওপর নির্ভর করে চোখ বন্ধ করে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া চলে না। যে বিষয় প্রমাণও করা যায় না, অপ্রমাণও করা যায় না, সে সম্বন্ধে মন খোলা রাখাই উচিত। যে কোনও একদিকে ঝুঁকে পড়াটাই গোঁড়ামি।
এই প্রেতচক্রের কেন্দ্রবিন্দু উমাদেবী কিন্তু বেশিদিন বাঁচেননি। ঠিক এক বছর পরে, ২২ ফেব্রুয়ারি, মাত্র সাতাশ বছর বয়সে তিনি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। নিয়মিত মিডিয়ামরা এমনিতেই দীর্ঘজীবী হন না এটা প্রেতচর্চায় বহুল কথিত আছে।
উমাদেবীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চার অধ্যায়ও শেষ হয়ে যায়। পড়ে থাকে শুধু সেই প্রেতচক্রের খাতাগুলি যেখানে লেখা ছিল অদ্ভুত অলৌকিক কথোপকথন।
রবীন্দ্রগবেষক অমিতাভ চৌধুরী তাঁর বই রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা (১৯৭৩) প্রকাশ করে সেই নথির কিছু অংশ প্রথমবার জনসমক্ষে আনেন।
২০ কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জামাই, শ্রী মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের নতুন ছাপাখানা। ‘কান্তিক প্রেস’। সেই ছাপাখানার দোতলার ঘরে বসত কলকাতার এক নামকরা প্ল্যানচেটের আসর। সেই আসরেই থাকতেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সাহিত্যিক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখরা।
প্রেতচর্চার বিষয়ে সেই কান্তিক প্রেস থেকে ছাপা মণিলালের বই ভুতুড়ে কাণ্ড সারা বাংলায় সে-সময় তুমুল জনপ্রিয় হয়।
সেই মণিলালের বিখ্যাত প্রেতচক্রে হাজির হওয়া এক আত্মা একবার বলেছিল,
দেখো, আজ তোমরা প্রেতাত্মা লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছ, অনেককে তোমরা শাস্তির ভাগী করিতেছ; যখন তোমাদের মৃত্যু হইবে, তখন সেই সব আত্মা তোমাদের উত্যক্ত করিবে, তোমাদের লইয়া ছেঁড়াছিঁড়ি করিবে।
বাংলার প্রেতচর্চার ইতিহাস বিরাট বিস্তৃত। বাংলা বরাবরই একাধারে বিপ্লবী আবার একাধারে ওঝা। তবে বাংলার প্রেতচর্চার ইতিহাসে যেমন রহস্যময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আবার অন্ধবিশ্বাসী প্যারীচাঁদ মিত্রও ছিলেন।
বাংলার ইতিহাস বরাবরই রহস্যে ঘেরা, সে প্রেতচর্চা হোক কিংবা নকশাল আন্দোলন, সতীদাহ হোক কিংবা ফেরারী ফৌজ। বাংলার সামগ্রিক ইতিহাস বরাবরই শিক্ষিত এবং ধারালো। একাধারে যুক্তি এবং একই সঙ্গে রহস্যে ঘেরা।

