Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

‘জয় শ্রীরাম’ জন্ম থেকেই রাজনৈতিক

প্রসূন মজুমদার

 

যেকথা সবাই জানেন, সম্ভবত সারা বিশ্বই এখন কমবেশি জেনে ফেলেছে, সেই ‘মধুর ধ্বনি’ নিয়েই দুচার কথা, যা না বললেই নয়। ধ্বনিটা নিশ্চয় এতক্ষণে প্রায় সকলেই আন্দাজ করে ফেলেছেন। যাঁরা এখনও টালবাহানায়, তাঁদের জন্য আর একটু ‘হিন্ট’ দেওয়ার ছলে বলি, এই ধ্বনি ইতিধ্যেই এই বাংলার মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে একাধিকবার রাস্তায় নামিয়ে ছুট করিয়েছে। শুধু তাই না, এই ধ্বনির দার্ঢ্য গ্রামবাংলায় বেশ কয়েক জায়গায় রাজনৈতিক আকচাআকচি থেকে সশস্ত্র গুণ্ডামিতে ঘুরপাক খেয়েছে, খেয়েই চলেছে, এবং আগামী আরও কয়েক বছর ধ্বনির মধুর অনেককেই বেদনাবিধুর করে তুলবে বলে বিরলে বিশ্বাস করি। সেই বিশ্বাস যখন জটিল আশঙ্কায় মোড় নেয়, তখন সেই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনির ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে একটু উল্টেপাল্টে দেখে নিতে ইচ্ছে করে বৈকি!

বাংলার অভিভাবক, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যের সারসংক্ষেপ করলে দেখা যাবে যে, তিনি বলতে চান এই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি একটি ধর্মীয় ধ্বনি বটে, কিন্তু এই ধ্বনি ১৯৯২ সাল থেকে রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। ওই সালে ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর ধর্মীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় ঘটনা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পৈশাচিক ক্রিয়াসাধন করতে-করতে ভাজপা দলের মাতৃপ্রতিম সংগঠনের করসেবকেরা এই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়েছিলেন। ঘটনা বাস্তব যে, এই বাবরি মসজিদ ভাঙা আর তার পরবর্তী দাঙ্গায় অজস্র মুসলমানকে খুন, ধর্ষণ, গৃহহারা করার সময় এই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি বজরংবাহিনীর কণ্ঠে অশ্লীলভাবে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। কিন্তু আমার কথাটি এখানেই ফুরোবার নয়। আমার কথা হল, ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি রামায়ণ নামের মহাকাব্যের জন্মলাভের সময় থেকেই যত না ধর্মীয়, তার থেকে অনেক বেশি রাজনৈতিক। রামায়ণ অনুসারে এই ধ্বনি ব্যবহার করত শ্রীরামচন্দ্রর বানর ও ভল্লুক সেনাবাহিনী। সেনারা যখন কোনও ধ্বনি যুদ্ধক্ষেত্রে স্লোগান হিসাবে ব্যবহার করে তখন সেই ধ্বনি যে ধর্মীয় না হয়ে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহৃত হয়, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাহলে এখন এই ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত যে, ‘জয় শ্রীরাম’ ১৯৯২ সালে নয়, বাল্মীকির কলমেই রাজনৈতিক ধ্বনি হয়ে উঠেছিল। এখন, প্রশ্ন হল এই ধ্বনিটি ধর্মীয় না রাজনৈতিক এই ধরনের চিন্তাভাবনার অবকাশ কখন তৈরি হয়? তখনই, যখন ধর্ম আর রাজনীতি একই চেয়ারে ভাগাভাগি করে বসতে চায়। এদিকে স্বাধীনতার পরে ভারত সংবিধান তৈরি করে ঘোষণা  করেছে যে, সে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। এখন কথা হল, ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ধর্ম শব্দটার জন্যেই ধর্মনিরপেক্ষতা ব্যাপারটা গিলতে গেলে শব্দের ওই মুড়োর দিকটা গলায় কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। তার চেয়ে বরং ইংরেজিতে যে শব্দটা আছে সেই সেকুলার শব্দটার আভিধানিক অর্থটা একটু দেখে নেওয়া যাক। সেখানে সেকুলার বলতে তাকেই বোঝাচ্ছে যা,  ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিষয়ের সঙ্গে সংযুক্ত নয় (not connected with religious or spiritual matters)। তাহলে আমাদের দেশের সংবিধান অর্থাৎ দেশের যে নিয়ম এবং যে নিয়মে রাষ্ট্র চলবে সেটা ঘোষিতভাবেই ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক বিষয় থেকে মুক্ত। তাহলে কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এই মুহূর্তের প্রধান পরিচালক দল অকম্পিত কণ্ঠে দাবি করতে পারে ‘জয় শ্রীরাম’ একটি ধর্মীয় স্লোগান! যদি সেই শাসকদলের দাবি মেনে ধরে নেওয়া হয় এই স্লোগান ধর্মীয়, তবে দেশের সংবিধান অনুসারেই ধর্মীয় এই স্লোগান ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত নয় কি? অথচ আমাদের অনুপম দ্বিচারিতার কারণেই ‘জয় শ্রীরাম’, ‘আল্লাহু আকবর’ জাতীয় যে ধ্বনিগুলি ব্যক্তিগত স্তরে বা উপাসনালয়ে দেওয়া উচিত সেগুলিকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার স্লোগানে আমরাই পরিণত করতে দিয়েছি। এই ‘আমরা’ শব্দটি শুনে কেউ হয়তো বলবেন আমরা কিছুই করিনি, রাষ্ট্র এর জন্যে দায়ী। হ্যাঁ রাষ্ট্র দায়ী তো অবশ্যই। কিন্তু ভারতদেশের রাষ্ট্র তো সংবিধান-মতে গণতান্ত্রিক। অর্থাৎ রাষ্ট্রের শরীর তো আমাদের শরীর, রাষ্ট্রের চেতনা তো আমাদেরই চেতনা। এই আমরার মধ্যেই তো আসলে প্রধান ভূতের উৎপাত। আমরা গণতন্ত্র বলতে বুঝি পাঁচ বছর অন্তর ভোট দিতে যাওয়া। আর একটু এগিয়ে বুঝলে নিজের ভোট নিজে দেওয়া। যদিও, নিজের ভোট নিজে দেওয়া নামক ব্যাপারটার মধ্যে যে কতবড় শূন্যতা লুকিয়ে আছে সেকথা একটু খতিয়ে ভাবলে, যেকোনও বিচার-বিবেচনাকারীই হেসে কুল পাবেন না।

ধরা যাক গণতন্ত্র দিব্যি চলছে। তাহলে এক একজন গণকে দিয়ে রাষ্ট্রের তন্ত্রটা তৈরি হয়েছে। এখন এই একজন ব্যক্তি যে সত্যিই একটা মানুষ সেটা খুঁজে এবং বুঝে দেখতে গেলে কী দেখতে হবে? মানুষের মতো শরীর হলেই কি সে মানুষ এবং গণের তন্ত্রনির্ধারক? তা তো হতে পারে না। মানুষের মৃতদেহকেও তো তাহলে ভোট দেওয়ার অধিকার দিতে হয়! তাহলে জীবন থাকতে হবে মানুষের দেহে। জীবন থাকলেই কি সে গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে?  শিশুরাও তো তাহলে ভোট দিতে পারত! তাহলে শুধু দেহ আর দেহের ভিতর জীবন থাকলেই সে গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে না। যে জিনিসটা আবশ্যিক সেটা হল চেতনা।

পরিণত চেতনা ছাড়া মানুষের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এবার কথা হল, আমি কিছুক্ষণ আগেই লিখেছি যে, নিজের ভোট নিজে দেওয়ার ধারণাটাই আমাদের দেশে হাস্যকর। অনেকে তখন হয়তো ভেবেছিলেন, ভোটপ্রক্রিয়াকে এই  দেশে যেভাবে লুম্পেনায়িত করা হয়েছে আমি হয়তো সেই ভোট কেনা, ভয় দেখানো, ভোটলুঠ এইসব কারসাজির কথা বলতে চাইছি। সেইসব লুঠেরাবৃত্তি তো আছেই, কিন্তু ভোটপ্রক্রিয়া এই মুহূর্তে যদি স্ফটিকস্বচ্ছও হত তবুও আমি বলতে বাধ্য হতাম এই প্রক্রিয়া হাস্যকর। কারণ একটু আগেই আলোচনা করে আমরা বুঝেছি যে, ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্রের মর্যাদা পেতে গেলে ব্যক্তিকে পরিণত চেতনাশীল হতেই হবে। এইবার ভাবুন দেখি, দেশের কত শতাংশ লোক নিজস্ব চেতনায় বাঁচে? অধিকাংশই রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া চেতনায় গড়ে ওঠে। এই চেতনার দাসদের এক একজনকে গণতন্ত্রের সাংগঠনিক একক হিসেবে ধরে নিলে অঙ্কটা প্রথম ধাপেই ভুল হয়ে যায়, আর যে অঙ্কের প্রথমধাপে ভুল, তাকে পরবর্তী ধাপগুলোতে যতই সংশোধন করার চেষ্টা করা হোক না কেন, সে আর সঠিক হয়ে উঠতে পারে না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ‘আমরা’ বলে যে ব্যাপারটা, সেটা গণতন্ত্রের সম্পদ হয়ে ওঠার কথা ছিল, কিন্তু হয়ে উঠেছে সাক্ষাৎ বিপদ। এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনও তাড়া কারও নেই, তার কারণ আবার উল্টোক্রমে সত্য। তার কারণ হল, এই বিপদটাই গণতন্ত্রের নামে ভোটের শাসন চালিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পদ। সুতরাং চেতনার দাসত্ব করতে থাকা মানুষের মতো দেখতে এই ‘গণ’-এর মাথায় যা ইচ্ছে তাই প্রোগ্রামিং করে দেওয়া হয়। আর সেইমতো ‘গণ’, রোবটোচিত ভঙ্গিমায় দলীয় ভাবানুগত্য দেখিয়ে চলে। সংবিধান নামক বস্তুটির কোনও প্রস্তাবনাই সে বোঝে না। বুঝতেও চায় না। খামোকা ‘জানিবার গাঢ় বেদনার ভার’ সে কেন নেবে? তাই তার দিলীপ ঘোষদাদা যখন তাকে বুঝিয়ে দেয় যে ‘জয় শ্রীরাম’ বললে মুখ্যমন্ত্রী তেড়ে আসছে, তাই মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ির মুখে এই স্লোগান দিতে হবে, তখন সে স্লোগান দিয়ে মজা নেয়। তার চেতনায়  এটা  ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘জয় শ্রীরাম’ শুনে মুখ্যমন্ত্রীর তেড়ে আসা খুব অশ্লীল রকমের মজাদার, কিন্তু সুকৌশলে এটা শেখানো হয়নি যে, কাউকে, এমনকী কোনও পাগলিকেও তার অপছন্দের কোনও শব্দ বলে রাগিয়ে দেওয়া, ওই রেগে যাওয়ার থেকে আরও বেশি অনৈতিক এবং অশ্লীল। তাই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিটা একটা বিশেষ প্রকারের রাজনৈতিক অশ্লীলতায় মোড়া স্লোগান হয়ে উঠে পশ্চিমবাংলার বাতাসে অনপসারণীয় জঞ্জালের মতো ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। অদূর ভবিষ্যতে এই স্থুল সার্কাসবাজির রাজনীতি থেকে এবঙ্গের নিস্তার নেই বলেই মনে হয়।