Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

মনসার গান ও অনুপ্রবেশ

মধুময় পাল

 

বেহুলা রান্না সারিয়া স্বামীরে জাগাইলেন। লোহার বাসরঘরে নিজ হাতে চাউল ডাইল দু মুঠা ফুটাইছেন। সঙ্কটের রাত্রি। মহাসঙ্কটের অমারাত্রি। পিরথিমি ঘুমায়। বেহুলা রন্ধন করি উলাইলা ভাত/ গা তোলো ভোজন করো ওহে প্রাণনাথ। দেবী মনসার মায়ায় প্রাণনাথ তখন নিদ্রাচ্ছন্ন। জ্ঞানহীন প্রায়। বেহুলা নিজেও অসাব্যস্ত। ঢলিতে ঢলিতে রামা প্রভুরে জাগায়। এই অমারাত্রি পার হইতে হবে। পার হইতে পারবে কি? কী বলেন আপনেরা? দেবীর সঙ্গেতে লড়াই। বড়ই কুটিলা সে দেবী। সর্বঅঙ্গে বিষ তার জ্বলে অহর্নিশ।

বৃষ্টি হয়েছে এক পশলা খানিক আগে। পাতা থেকে জল ঝরার শব্দ। অন্ধকারের শব্দ। আকাশ থেকে নেমে আসা ক্ষয়াটে চাঁদের শব্দ। শ্রোতারা নীরব। এই নীরবতারও একটা শব্দ আছে। কেউ ভাঁজ করা হাঁটু একবার টান করে নেয়। কেউ শাড়ির আঁচল ঠিক করে আনমনে। কেউ হাতের ভর পালটায়। কেউ হাত ঘষে। কেউ সরে বসে বাঁশের খুঁটিতে হেলান দেয়। কেউ কোমর থেকে গামছা খুলে মুখ মোছে।

পিরথিমি ঘুমায়। কে ঘুমায়? পিরথিমি। কে জাগে? রাজবাড়িতে জাগে চান্দ সদাগর। লোহার বাসরে জাগে বেহুলা। বাইরে একশো পাহারাদার। ধন্বন্তরি বেজি শিখি কঙ্ক কুরল। কিন্তু জাগে কি? দেবীর মায়ায় হল নিদ্রায় বিকল।

মধুর মা এক গ্লাস জল দিবা। জল বিনা স্বরের না হয় বিস্তার/ জল বিনা আদি স্বর হয় নিঃসাড়। কাঁধ থেকে গামছা টেনে গলা মুখ মোছে মিলন কথক।

দূরের বাদল বাতাস আসে সীমান্ত পেরিয়ে। কাঁটাতারের এপারে ওপারে বনবাগানের ছোঁয়া নিয়ে। ছেঁড়া ফাটা তেরপল চুঁইয়ে ভেজা সামিয়ানা থেকে দু-এক ফোঁটা জল পড়ে৷

মিলন কথক বলে, এবার সাপ প্রবেশ করবে। অনুপ্রবেশ। কালনাগিনীর অনুপ্রবেশ। জয় মা বিষহরি।

লোহার বাসরের ভিতরে বাইরে সর্বত্র পাহারা বসাইছেন চান্দ সদাগর। দেবীর আদেশে কালী শেষ-ভাগ রাতি/ সাঁতালি পর্বতে গিয়া উঠে শীঘ্রগতি।/ অঙ্গারের গুঁড়ি ওড়ে কালীর নিঃশ্বাসে।/ সুতার সঞ্চারে কালী বাসরে প্রবেশে। বাসরে প্রবেশ কৈল সে কালনাগিনী। কালনাগেরও হৃদয় বলিয়া একটা নরম কোমল পদার্থ আছে৷ হইতে পারে সে নাগ। কিন্তু সে ছ’কুড়ি নাগের মাতা। কী বুঝলেন আপনেরা? সাপেরও হৃদয় হয়। জয় মা বিষহরি। মধুর মা, আমাগো একবার শান্তিজল দাও। শান্তি বিনা কে বাঁচে জগৎ মাঝারে।/ শান্তিরে দংশাইব এবে এ কোন সাজা রে।

শ্রোতা আসে আরও এক এক করে। রাত বাড়ে। কেউ কেউ দুধকলা নিয়ে আসে৷ সর্পদেবীর সামনে রাখে।

…সাপিনী নিজের অন্তরে কষ্ট পায়। কষ্ট পায়। কিন্তু তাহার তো করার কিছু নাই। সে আদিষ্ট। প্রভুর আদেশ তাকে পালন করতেই হইবে৷ সে একটা বাহানা খুঁজিতেছিল। পাশ ফিরিতে গিয়া লখিন্দরের পা সাপের মাথায় লাগে। কালনাগিনী বলে, চন্দ্র সূর্য সাক্ষী হও সকল দেবতা। বিনা অপরাধে মোর মুণ্ডে মারে লাথি। আপনেরা প্রশ্ন করিতেই পারেন, তুমি কেন লখিন্দরের পায়ের নীচে নিজেরে গুঁজাইলে? কেন তুমি অনুপ্রবেশ করিলে? তুমিই তো অপরাধী। আপনেরা একটা উত্তর জানিবেন। অনুপ্রবেশ তো বিধির লিখন। দেবীশক্তি নিজের ক্ষমতা বিস্তারের স্বার্থে, পূজা পাইবার স্বার্থে, শাসক হইবার স্বার্থে অনুপ্রবেশের প্রেরণা ও পথ রচনা করিয়াছেন।…

হাত ধুইয়া নেন, দিদি। দেরি করলেন কেন? আমরা সাঁতালি পর্বতে বেহুলা লখিন্দরের বাসরে প্রবেশ করেছি। লোহার বাসর, নাই অবসর, দংশাইতে হবে হায়, রাত্রি পোহায়। তো যা বলিতেছিলাম। কালনাগিনী দেখে, বেহুলা লখাই কোলে যেন কলানিধি।/ যেমন কন্যা তেমন বর মিলাইল বিধি।/ কালিনাগিনী ভাবে, এ হেন সুন্দর গায়ে কোনখানে খাইব।/ দেবী জিজ্ঞাসিলে তারে কী বোল বলিব।/ বিষম আরতি দেবী কেন দিলা মোরে।/ লখিন্দরে খাইতে মোর শক্তি নাহি পুরে। সাপিনী নিজের অন্তরে কষ্ট পায়। কষ্ট পায়। কিন্তু তাহার তো করার কিছু নাই। সে আদিষ্ট। প্রভুর আদেশ তাকে পালন করতেই হইবে৷ সে একটা বাহানা খুঁজিতেছিল। পাশ ফিরিতে গিয়া লখিন্দরের পা সাপের মাথায় লাগে। কালনাগিনী বলে, চন্দ্র সূর্য সাক্ষী হও সকল দেবতা। বিনা অপরাধে মোর মুণ্ডে মারে লাথি। আপনেরা প্রশ্ন করিতেই পারেন, তুমি কেন লখিন্দরের পায়ের নীচে নিজেরে গুঁজাইলে? কেন তুমি অনুপ্রবেশ করিলে? তুমিই তো অপরাধী। আপনেরা একটা উত্তর জানিবেন। অনুপ্রবেশ তো বিধির লিখন। দেবীশক্তি নিজের ক্ষমতা বিস্তারের স্বার্থে, পূজা পাইবার স্বার্থে, শাসক হইবার স্বার্থে অনুপ্রবেশের প্রেরণা ও পথ রচনা করিয়াছেন। জয় মা বিষহরি। জাগো ওগো বেহুলা সায়বেনের ঝি।/ তোরে পাইল কালনিদ্রা মোরে খাইল কী।

জনশ্রুতি এই যে, এখানে থেমে যেতে হয়েছিল মিলন কথককে। সেই রাতে। মানিক মাঝি খবর এনেছিল, ন্যাপা, পোচা, গোদু, খোচারা বর্ডার পেরিয়ে ঢুকেছে। ফের ঝামেলা হবে। মাসখানেক আগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকড়াও করেছিল জনতা। পুলিশে দিয়েছিল আইনকানুন মেনে। ঠিকঠাক জায়গায় খরচা করে, সেটিং করে বেরিয়ে গেছে ন্যাপা-পোচারা। এবার বদলা নিতে এসেছে হয়তো। মানিক মাঝি এত কিছু বলেনি। শুধু সংবাদটা দেয়। সংবাদের সঙ্গে লেগে থাকে ইতিহাস ও সম্ভাবনা। বর্ডারের মানুষকে এসব দেখতে হয়, জানতে হয়। ন্যাপা-পোচারা যে নির্ভুল ন্যাপা-পোচা নয়, করিমুল-সলিমুল হতেই পারে, সেটাও মোটামুটি সবাই জানে। আসলে এরা অনুপ্রবেশের শতনাম করিডর। একই সঙ্গে অনুপ্রবেশ ও পাচার এদের ক্রিয়াকলাপ। জাতিতত্ত্বের ভেদাভেদ নেই এদের। এরা সীমান্তবান্ধব। মানিক মাঝির ভাষায়, বর্ডার সিকিউরিটির নাতজামাই।

ক্ষীরনাই গ্রামের দিকে ছুটেছিল মিলন কথক। তখনও মনসাগানের আসরে আর্তনাদ হয়ে ঘুরছে, জাগো ওগো বেহুলা সায়বেনের ঝি।/ তোরে পাইল কালনিদ্রা মোরে খাইল কী।

মিলন কথক নেতা নয়। সে মানুষের কাছে যায়, মানুষের কাছে থাকে। সব বিষয়কে পোলিটিকালি কারেক্ট করে দেখার কায়দা সে জানে না। পাচারের দল ঢুকলে তাদের সঙ্গে আরও কত কী ঢুকবে, এবং পাচারের দল বেরোলে তাদের সঙ্গে কত কী বেরিয়ে যাবে এই আশঙ্কায় সে বিচলিত হয়। পাচার এখন আর অন্ন বস্ত্র খাদ্য পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়, হয়তো ঢুকবে একশত বন্দুক আর তিনশত ক্রিমিনাল আর বেরিয়ে যাবে দুইশত অসহায় নারী। মিলন এইসব ঘটনায় পুলিশ বা পার্টিম্যানদের মতো নির্বিকার থাকতে পারে না। সে উদ্বিগ্ন হয়, আতঙ্কিত হয়।

মনসার গান মিলন কথক বড় ভালো বলে। ভালো গায়। ভক্তি আসে। যদিও সেখানে বাঁকাতেরা কথা গুঁজে দেয় সে, শ্রোতারা মান্য করে, গ্রহণ করে। বলার একটা প্রবেশগুণ থাকে, ভিতরে ঢুকে পড়ে। যেমন, চান্দ সদাগর যখন হেন্তালের লাঠি দিয়ে মনসাকে তাড়া করে, আর মনসা বনবাদাড় ঝোপঝাড় পেরিয়ে, জলে কাদায় আছাড় খেতে খেতে পালায়, শ্রোতারা বেশ মজা পায়। সত্যিই তো, লোকটা পুজো দেবে না বলে তাকে জলে ডোবাতে হবে, চোবাতে হবে? ভিখারি বানাতে হবে? জীর্ণদেহ ছিন্নবেশ সাধু পথে পথে চলে/ অনাহারে দিনমান কাহারে কিছু না বলে/ ডুবিয়াছে সাগরে সোনার সাত তরী/ সাধু তবে দৃঢ়পণ, পূজিব না কানি চ্যাংমুড়ি। শ্রোতাদের সমর্থন পায় হেন্তালের লাঠি। জবরদস্তি কেন? কে কাকে পুজো করবে সেটা মানুষের অধিকার। চাপিয়ে দেবে কেন? চাপিয়ে দিতে ভয় দেখাবে? হেনস্থা করবে? মিলন কথক যখন বলে, চলো চলো সাধুরাজা আছি তব সাথে/ হেন্তালের লাঠি হব চরম সাক্ষাতে। শ্রোতারাও গেয়ে ওঠে, চলো চলো সাধুরাজা…।

অনুপ্রবেশের কথায়ও মিলন কথক বাঁকাতেরা। ক্ষীরনাই গ্রামে অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ সভা ডেকেছিল। সেখানে সে বলে, অনুপ্রবেশ তো আমাদের স্বাধীনতার সন্তান। যে চুক্তি করে স্বাধীনতা এল, দেশভাগ এল, দেশত্যাগ এল, সেই চুক্তির ঔরসেই অনুপ্রবেশের জন্ম। মানে কী? আপনারা ভাববেন। বুঝবেন। দেশ টুকরা করিয়া যারা গদিতে বসিল, ক্ষীর খাইবে বলিয়া মন্ত্রীউন্ত্রী হইল, তারা কি একবারও আমাগো জিগাইছিল, এই স্বাধীনতা তোমরা চাও কিনা? দেশের মানুষরে জিগাইছিল, ভাগের স্বাধীনতা তোমরা মানো কিনা? একবারও কি ভাবিছিল, ভাগাভাগির মানুষগুলো কীভাবে বাঁচিবে? ধর্ম দিয়ে যখন ভাগ করিলা, দুই ধর্মের মানুষরে পাশাপাশি রাখি দিলা কোন বুদ্ধিতে? মুখে বলো, সুপ্রতিবেশী। এ কোন তঞ্চকতা? এক ধর্ম যখন আরেক ধর্মরে ডরায়, এক ধর্ম যখন আরেক ধর্মরে দেখিয়া পালায়, তখন সুপ্রতিবেশী থাকে কেমনে? এ কোন বদমায়েশি? ক্ষীরননী খাইবা বলিয়া লক্ষ লক্ষ লোকেরে রক্তনদীতে ভাসাইলে, লজ্জা নাই? তারপর সুন্দর সুন্দর শব্দ কুড়াইয়া গলার খেল দিয়া জাতিরে ভাষণ শুনাও। লজ্জা নাই? একবারও ভাবিলা না যারা সংখ্যালঘু তারা নিজ দেশে নিজ ঘরে থাকিতে না পারিলে যাইবে কোথায়? মানুষ নিজের মাটি, নিজের ভিটা ছাড়ে অনেক দুঃখে। আপনেরা তাগোরে জিগান, স্বাধীনতার পর লাখে লাখে মানুষ ভিটা ছাড়ে কেন? জবাব চান। অনুপ্রবেশের জন্ম দিলেন তো ন্যাতারা। কাউরে অনুপ্রবেশকারী বলার অধিকার ন্যাতাগো নাই। আমি বাঁচনের লাগিয়া, আমার সন্তানের বাঁচনের লাগিয়া দেশ ছাড়ছি, বাঁচনের মাটিতে আসছি। অনুপ্রবেশের তো স্বাধীনতার বিধিলিখন। তাগোরে জিগান, মানুষরে দেশভিখারি বানাইয়া এখন অনুপ্রবেশকারী বলেন কোন মুখে?

সেই সভা মিলন কথকের কথা সবটা বুঝতে পারেনি। ঠিক না বেঠিক একটা ধন্দে ছিল। কারণ পাচার আর অনুপ্রবেশ ঘেঁটে দেওয়া হয়েছে। সমার্থক করে দেওয়া হয়েছে। হয়েছে রাষ্ট্রের সুবিধার্থে। শ্রোতারা একটু একটু করে আলো ফুটে উঠতে দেখেছিল সেদিন। অনুপ্রবেশের মানুষ আর পাচারের মানুষের মধ্যের তফাৎটা অল্প হলেও বুঝতে পেরেছিল।

জনশ্রুতি এই যে, মিলন কথকের এই তেরাবেঁকা কথাটার পরই বেঁচে থাকাটা কিছু সমস্যায় পড়ে। তাকে পাচারকারীদের লোক বলে চিহ্নিত করে প্রশাসন। এবং পাচারের গণপ্রতিরোধ ভেঙে দেবার চেষ্টা করে। মনসার গানের আসর থেকে সেই যে ক্ষীরনাই গ্রামে গেল, এবং সেখানে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে নদীর দিকে গেল, যে-নদীর নাম ঝরুয়ালি, যে-নদী সারা দিনমান প্রাণের আদর, যে-নদী রাতের অন্ধকারে কুকর্মের সদর দপ্তর, সেইখানে গুলিবিদ্ধ হল মিলন কথক এবং মারা গেল অনতিকালেই। কারা গুলি করেছিল, চিরআবছা। সেটাও হয়তো স্বাধীনতার বিধিলিখিত। নদীতীরে মিলন কথকের মূর্তি হল। অজ্ঞাত সূত্রের টাকায়। লোকে বলে, ওটা ভয় দেখানোর স্ট্যাচু। বাগড়া দিলে মিলন বানিয়ে দেব!

মিলন কথকের ঘটনা কতদিন আগে এ-বিষয়ে দ্বিমত আছে। কারও মতে, বহুদিন আগেকার। ওই যে স্ট্যাচু একটা আছিল, তা কবে ভাইঙা চুইরা মাটি হইয়া গেছে। ওইখানে সিকিউরিটির চৌকিটাও তো বুড়া হইয়া গেল। মাথায় প্লাস্টিকের ছাউনিটা সারাদিন ফরফরায়। কারও মতে, এই তো সেদিনের ঘটনা। পাচারের ঘটনায় মৃত্যু কম। হলেও জানা যায়। মিলন কথকের দেহটা ঝরুয়ালির পাড়ে সারারাত পড়েছিল, অনেকেই দেখেছে। কথা বটে একটা, মিলন কথক মাঝে মাঝেই উঠে আসে। কাঁটাতারে যখন ফেলানিরা ঝোলে, যখন সারসার সাইকেল পার হয়ে যায় নদী, যখন নৌকো চেপে অস্ত্র আসে, যখন কীর্তনিয়ার ছদ্মবেশ ডাকাতেরা আসে, যখন গ্রাম-গ্রামান্তরের ঘর থেকে কিশোরীরা উধাও হয়ে যায়, যখন পাচার নিয়ে প্রশাসন কড়া কড়া বাতেলা করে, তখনই ভেসে ওঠে মিলন কথক। জাগো ওঠো বেহুলা সায়বেনের ঝি/ তোরে পাইল কালনিদ্রা মোরে খাইল কী।

মিলনের ছেলে মধুমঙ্গলও কথক হয়েছে। বাপ-ঠাকুরদার কথকবাড়ি এখনও কিছু আদর সম্মান পায়। মানুষের জীবনে দুঃখের অভাব নেই। যতদিন যায়, দুঃখ বাড়ে। মানুষ যে ক্রমে আরও বেশি মন্দের দিকে হাঁটে। দুঃখ কিছু ভাষা পায়, সঙ্গ পায় ঠাকুরের কথকতায়। প্রভুশোকে তনু দহে/ সর্বলোকে তারে কহে/ তুমি বড় খণ্ডকপালিনী। বেহুলার কষ্টে আরও অনেকে কষ্ট পায়। অনিন্দ্যসুন্দর যুবতী তার কোলে মৃত পতি। তোরে বিড়ম্বিল ধাতা/ বিপরীত কহ কথা/ জলে ভেসে যাবে একাকিনী। বেহুলা ঠিক করেছে সে জলে ভাসবে মান্দারের ভেলায়। কাঁদিয়া বেহুলা বলে/ প্রাণনাথ করি কোলে/ যাব আমি ছয় মাস পণ।/ পূর্বের সাধন ফলে/ ঈশ্বরীর অনুবলে/ যদি কান্ত পুনঃ পায় প্রাণ।

বাড়ির ভেতর থেকে কান্না ভেসে আসে। মধু, তোর বাবাও সাপের কামড়ে মরল। কত বলেছি, অন্যরকম কথা বোলো না। কে শোনে। খালি দেশভাগ আর উদ্বাস্তু আর নেতাদের গালমন্দ। কী হল! কেউ তোমার কথা শুনল? তোমাকে মনে রাখল? নদীর পাড়ে বডি পড়েছিল। ছুঁতে দেয়নি। কোন সাপে কামড়াল, সেটাও জানলাম না।

মধুমঙ্গল বলে, বাবা কিন্তু পুজো দেয়নি! হেন্তালের লাঠি শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছিল।

একটা কোলাহল ভেসে আসে। এখন আর তেমন গাছপালা নেই এখানে। রাস্তা পাকা হয়েছে দূর তক। কনস্ট্রাকশনের উন্নয়ন। একটি নারীকণ্ঠ শোনা যায়। প্রায় চিৎকার করছে।

মধুমঙ্গল বলে, আজ গান এটুকুই থাক। বেহুলা জলে ভাসিবে। কত সমস্যা আসিবে। কত বিঘ্ন। নেতা ধোপানির সাহায্য পাইবে। পিরথিমিতে সব খারাপ হবার নয়। আপনেরা জলের শব্দ শোনেন। জলে ভাসে বেহুলার ভেলা। জয় চান্দ সদাগর।

কোলাহল বাড়িতে ঢোকে। ভিড় বাড়ি পৌঁছয়।

কী হল, মাধুরী? এরা কারা? মধুমঙ্গল জিজ্ঞাসা করে।

আর বোলো না দাদা। যত উটকো ঝামেলা। এনআরসি-তে এদের নাম নেই। তো আমি কী করব? নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে না পারলে নাম বাদ যাবে। মাধুরী বলে।

বোন, এটা উটকো ঝামেলা নয়। বাবা বলত…। মধুমঙ্গল আরও কিছু বলতে চেয়েছিল।

শোনেন, শোনেন। আপনে কী বলেছিলেন তখন? ভিড়ের একজন এগিয়ে এসে বলতে শুরু করে। আপনে বললেন, অ্যানার্সি হলে অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানো হবে। অনুপ্রবেশকারীরা চলে গেলে জায়গা ফাঁকা হবে। সরকারি চাকরি হবে। মাস্টারি হবে। ঘরবাড়ি দখল হবে। দোকানপাট দখল হবে। বিদেশিদের সম্পত্তি বলে কিছু হতে পারে না। তাই তো আমরা আপনেদের জন্য লড়লাম। এখন দেখি আমাদেরই নাম নাই।

একজন বলে ওঠে, আমারগেরা বিদেশি? অনুপ্রবেশী? আমারগেরারেও ক্যাম্পে ঢুকাইবেন?

মাধুরী চিৎকার করে, আমি বলিনি। আমার হাজব্যান্ড বলেছে। আমাকে বলতে বলেছে।

তো আপনে পলাইয়া আসলেন কেন? আপনের হাজব্যান্ড তো আগেই সটকান দিছে। পরিষ্কার বলেন, আমারগের কী হবে? ভিড় জানতে চায়।

মধুমঙ্গল উঠে দাঁড়ায়। বলে, শোনেন, আমাদেরও নাম নাই। মিলন কথক এদেশের মানুষ না। সব মানুষের কাছের মানুষ হলেও দেশের মানুষ না।

ভিতর ঘর থেকে ভেসে আসে, মধুর বাপেরে সাপে কাটিছিল। আপনেরা জানেন। কিন্তু জানেন না কোন সাপে কাটিছিল। যেহেতু সাপের পরিচয় জানা নাই, তাই মধুর বাপের দেশ নাই। মধুর মা-বইনেরও নাই। আমরা মৃতদেহ। মড়া। জলে ভাইসা আসছি। আবার জলে ভাসুম। সাপ ঢুকিছে। সাপ। মধুর বাপে বলত, স্বাধীনতার বিধিলিপি। নিজের দেহ লইয়া জলে ভাসো গো! ভাসো! জয় মা বিষহরি!