চামুণ্ডা চর্চা কালী— ক্ষেত্রসমীক্ষার নিরিখে

স্বপনকুমার ঠাকুর

 

বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবী নিঃসন্দেহে কালী। অনেকেই মনে করেন কালী শুধু জনপ্রিয় দেবী নয়; বাঙালির নিজস্ব সৃষ্টি। কালীর সঙ্গে কলকাতাও জড়িয়ে। কালীঘাটের কালী কলকাত্তাবালী। কালী করালবদনী। উলঙ্গিনী। অনন্তযৌবনা। ঘোর কালো। অথবা নবদুর্বাদলশ্যাম মেঘবর্ণা। লোলজিহ্বা। শিবের বুকে পা দিয়ে দণ্ডায়মান। মূলত চতুর্ভুজা। এক হাতে উদ্ধত খড়্গ। অন্য হাতে অসুরের ছিন্নমুণ্ড। অপর দু হাতে বরাভয় ও ভক্তকুলভয়হারিণী মুদ্রা। আবার কেউ বলেন কালী শুধু তমসাবৃত নয়, কাল বা সময়ের প্রতীক বলেই তিনি (কাল+ঈ) কালী।

সাধকের কাছে কালী সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের ব্রহ্মস্বরূপ। সাধকের ভাবনায় জগৎসংসারে যা কিছু সৃষ্টি হচ্ছে কাল বা সময় সবকিছু ধ্বংস করে দেবে। কালের হাত থেকে কা্রও নিস্তার নেই। কালীর গলায় নরমুণ্ডমালা যেন তারই প্রতীক। আবার সে বিশ্বপ্রসবিনী বলেই তার গলায় মুণ্ডমালা ৫১ বর্ণের প্রতীক। সে ধ্বংসের দেবী হলেও অভয় ও বরদমুদ্রাশোভিত শরণাগতের কাছে। এই মূর্তি মূলত পূজিত হত শশ্মানে-মশানে, জঙ্গলে, বাড়ির বাইরে চোর ডাকাত আর আঘোরপন্থী তান্ত্রিকদের দ্বারা। কথিত আছে সপ্তদশ শতকের নবদ্বীপের বিখ্যাত তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ বাংলায় কালীমূর্তি ও কালীপূজার প্রবর্তক। কেউ বলেছেন প্রাচীনকালে তামার টাটে কালীমূর্তি খোদাই করে দেবীর পুজো করা হত। আবার কা্রও কারও মতে যন্ত্রে বা বৃক্ষপ্রতীকে কালীপুজো করা হত যার নিদর্শন আজও রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। 

কালীর এই বহুলপ্রচলিত রূপটি যেমন হাল আমলের, তেমনই কালী কখন থেকে একেবারে অন্তঃপুরে পূজিত হতে লাগল এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। লক্ষ করার বিষয় হল দুর্গা তারা বা অন্যান্য দেবীর মতো কালীর কোনও প্রাচীন মূর্তি এ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়নি। অথচ কালী যে প্রাচীন দেবী সন্দেহ নেই। বৈদিক সাহিত্যে উল্লিখিত অগ্নির সাতটি জিভের মধ্যে কালী অন্যতমা। যেমন করালী সুধূম্রবর্ণা, লেলায়মানা, মনোজবা কালী ইত্যাদি। মহাভারতের সৌপ্তিকপর্বে কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও দেবীর কেমন রূপ ছিল সে সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। কেউ কেউ বলেন বৈদিক ‘রাত্রি’ বা নিঋতিদেবীর সঙ্গে কালীর নাকি গভীর মিল রয়েছে। তন্ত্রশাস্ত্রের মতে দশমহাবিদ্যার অন্যতম এই কালী।

মার্কেণ্ডেয় পুরাণে কালীর জন্মকথা আছে। ক্রোধান্বিত চণ্ডীর তৃতীয় নয়ন থেকে বেরিয়ে এল ঘোর কৃষ্ণবর্ণের এক ভয়ঙ্করী দেবী। তারই নাম কালী। রক্তবীজের সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ডের মাথা কেটে হাতে ঝুলিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সেই কালরূপী কালী। দেবী চণ্ডী সন্তুষ্ট হয়ে কালীর নাম দিল চামুণ্ডা। কালীর হাতে যে নরমুণ্ডটি ঝোলে সেটা এই চণ্ড অথবা মুণ্ডর। এই কাহিনি থেকে জানা যাচ্ছে কালীর পরবর্তী রূপ চামুণ্ডা, কিন্তু পুরাতাত্ত্বিকদের মতে কালীর পূর্ব রূপ চামুণ্ডা।

প্রত্নসাক্ষ্য অনুসারে কালী নয়, চামুণ্ডাই প্রাচীন। পাল সেন আমলের প্রচুর চামুণ্ডামূর্তি বাংলার অনেক স্থানে মিলেছে। বর্ধমানে কেতুগ্রামের অট্টহাসের দ্বিভূজা চামুণ্ডামূর্তি ভয়াল রূপের। খিদের চোটে শরীরের হাড় কঙ্কাল যেন বেরিয়ে আসছে। দ্বিভুজা দেবী উবু হয়ে বসে আছে। অধরে রহস্যময় হাসির ঝিলিক। মূর্তিটি বর্তমানে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। এটি পালযুগের মূর্তি। বর্ধমানের কাঞ্চননগরের চামুণ্ডামূর্তিটি অসাধারণ সুন্দর। দেবী লোলজিহ্বা। চক্ষু কোটরাগত। গলায় মুণ্ডমালা। অষ্টভূজা। ডানদিকের দুহাতে ত্রিশূল, অসি, নরমুণ্ড। বামদিকের দুটি হা্তে নরমুণ্ড, পরশু ও একহাতের অনামিকা কামড়ে ধরেছে দেবী। পদতলে শায়িত শব। দেবী নৃত্যরত, নতকুচ, শরীরের শিরা উপশিরা দৃশ্যমান। মন্তেশ্বরের বা দিগনগরের চামুণ্ডামূর্তি দুটিও অসাধারণ।

চামুণ্ডার রকমফেরের মধ্যে একটি জনপ্রিয় রূপ হল চর্চিকা বা চর্চা। শব্দটির অর্থ ভয় দেখানো। অর্থাৎ যে দেবী ভয়ঙ্করী। পালযুগে জনপ্রিয় দেবী ছিল চর্চিকা। সিয়ান শিলালেখে এ বিষয়ে উল্লেখ্য তথ্যাদি মেলে। সুকুমার সেনের মতে এই চামুণ্ডা-চর্চিকাদেবী থেকেই আধুনিক কালীর উদ্ভব হয়েছে।

মুর্শিদাবাদ জেলার সালার থানার শিমুলিয়া গ্রাম। এক অতি প্রাচীন জনপদ। প্রাচীন নাম সোমালিয়া। দ্বাদশ শতকের বল্লাল সেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে গ্রামটি মুদ্রিত হয়ে আছে সোমালিয়া নামে। এ গ্রামেই জন্মেছিলেন প্রাকচৈতন্যযুগের মহাভারত অনুবাদক কবি রামচন্দ্র খান। এই গ্রামেই রয়েছে পালযুগের একটি অপূর্ব বিরল ব্যতিক্রমী চামুণ্ডা-চর্চিকার প্রস্তরমূর্তি। সালার রেল স্টেশন থেকে নেমে বাস বা রিক্সা, ভটভটি ভ্যানে করে শিমুলেতে অনায়াসে পৌঁছানো যাবে। অঞ্চলটার চারিদিকে শুধু ইতিহাসের হাতছানি। সালারের রাজা শালিবাহন। আপা-দহ পুকুর থেকে প্রাপ্ত পুরাদ্রব্য দেখতে পাবেন। দেখবেন নানা সিলসিলার পিরতন্ত্রের পাশাপাশি একাধিক প্রাচীন বিষ্ণুবিগ্রহ। হামিদ হাটি পিলখুন্ডিতে রয়েছে হামিদ গাজির রওজা। সেখানে ভিড় করেন হিন্দু-মুসুলমান সম্প্রদায়ের প্রান্তিক নর-নারী। দত্তবরটিয়াতে পাটুলির রাজাদের বিলীয়মান স্মৃতি। হাল আমলে গড়ে ওঠা বড় বড় মন্দির। এদেরকে ছুঁয়ে আপনি একসময় পৌঁছে যাবেন প্রাচীন সোমালি গ্রামে।

গ্রামের পূর্বদিকে দত্তবরটিয়া, শিরপাড়া, পশ্চিমে বর্ধমান জেলার কচুটে-মালগ্রাম। উত্তরে আগরডাঙা আর দক্ষিণে এড়েরা জনপদ। রাজা আদিশূরের আমল থেকেই এই অঞ্চলটি উত্তর রাঢ়ীয় কায়স্থদের প্রাচীন ঘাঁটি। দত্তবরটিয়ায়  পঞ্চকায়স্থর অন্যতম দেবাদিত্যের বাসস্থান নির্দিষ্ট হয়েছিল। বহরানে হয়েছিল মথুরা-প্রত্যাগত পুরুষোত্তমের। শিমুলে গ্রামে কোনও রাজন্য স্মৃতি জড়িত না থাকলেও কায়স্থ কুলোদ্ভব কবি রামচন্দ্র খানের জন্মভূমি হিসাবে স্বীকৃত। এইগ্রামেই রয়েছে বিরল চামুণ্ডা-চর্চামূর্তিটি।

গঠনের দিক থেকে ভারী অদ্ভুত। উচ্চতায় প্রায় দেড় ফুট। চওড়া দশ ইঞ্চি। খানিকটা ভগ্ন হলেও অপূর্ব সৌন্দর্যময়। নীচে শায়িত শিব। সামান্য কাত হয়েযেন শুয়ে আছে। দেবী ঈষৎ কটি হেলিয়ে সমপাদস্থানিক ভঙ্গিমায় দণ্ডায়মান। দু পাশে দেবীর দুই সহচর-সহচরী। ডানদিকে নিঃসন্দেহে পুরুষ। বাম হাঁটুর ওপর এক হাত রেখে অপর হাতে অস্ত্র নিয়ে প্রদর্শিত। বামদিকের মূর্তিটি যতদূর সম্ভব সহচরী। মাথায় জটামুকুট কিংবা পাগড়ি পরা। চর্চিকা অষ্টভুজা। ডানদিকের চার হাতের ঊর্ধ্ব হস্তে অভয় মুদ্রা, মারণাস্ত্র, নরমুণ্ড আর এক হাত দিয়ে সে নরমাংস চিবিয়ে খাচ্ছে। বামদিকের চার হাতের ঊর্ধ্বহস্তটি ডান হাতের মতোই। নরমুণ্ডধরা এবং একটি দীর্ঘ গদা ধরে আছে। ডান ও বামদিকের দুটি হাত দিয়েই সে নরমাংস গোগ্রাসে খাচ্ছে। হাড়কঙ্কালসার দেহ। উদরে বৃশ্চিক চিহ্ন। মুখমণ্ডলে পুরুষালি ভাব। দেবী ত্রিনয়নী। মাথায় সর্পমুকুট। দেহের তুলনায় কান দুটি দীর্ঘ। পরেছে কুণ্ডল। একচালিতে দেবীমূর্তি খোদিত। পাদপীঠে পদ্ম নেই। চালির দুদিকে কোনও বিদ্যাধর বা বিদ্যাধরী নেই। নেই চালির শীর্ষবিন্দুতে কীর্তিমুখ। পরিবর্তে ডানা মেলা শকুনি। অভিনব মূর্তি পরিকল্পনা।

চর্চামূর্তিটি মনে হয় দশম বা একাদশ শতকের। দেবীর সেবাইত গ্রামের ভট্টাচার্য বংশ। নিত্যসেবা হয়। দেবীর অন্নভোগ হয়। সন্ধ্যাবেলায় শীতল ও আরতি। বাৎসরিক পুজো শারদীয়া একাদশী তিথিতে। পাঁঠাবলি হয় না। তার পরিবর্তে চালকুমরো বলি হয়। বলাবাহুল্য চর্চাপুজোর প্রাচীনত্ব এখান থেকে আর বোঝা যায় না। অবশ্য জৈন বা বৌদ্ধরা যে চামুণ্ডা বা চর্চা পুজো করতেন তা ছিল সম্পূর্ণ অহিংস রীতির। কে জানে এই চর্চিকা হয়তো তাঁদের পূজিত দেবীমূর্তি।

পালযুগে চর্চা অন্যতম জনপ্রিয় দেবী। একাদশ শতাব্দীর নয় পালের রাজত্বকালে মূর্তিশিবের বানগড় তাম্রলেখে ‘ওং নমশ্চর্চ্চিকায়ৈ” বলে প্রশস্তি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে দেবী চর্চিকা বা চর্চা যেন জগৎকে রক্ষা করে। লেখে চর্চাদেবী সম্পর্কে দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মেলে। দেবী চর্চা খাদ্যের অভাবে আকুল হয়ে শুষ্ক তনু ধারণ করেছে এবং নরমুণ্ডের মালা পরে জগৎ রক্ষা করছে। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় চামুণ্ডার সঙ্গে চর্চার মৌলিক পার্থক্য আছে। অর্থাৎ চামুণ্ডার মতো হাড়কঙ্কালসার শরীর হলেও দেবী কালীর মতো তার গলায় থাকে নরমুণ্ডের মালা। সিয়ান শিলালিপি থেকে জানা যায় নবম শতকের অন্যতম পালবংশীয় রাজা মহেন্দ্র পাল ছিলেন চর্চিকাদেবীর একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি সুবিশাল প্রস্তরমন্দিরে দেবী চর্চিকার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজা নয় পাল পরবর্তীকালে এই মন্দিরে একটি শিলাবলভী ও সোপান নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।

চামুণ্ডামূর্তি, মন্তেশ্বর
দাঁইহাট বাঘটিকরার মন্দিরে টেরাকোটা ফলকে বজ্রবারহী বা চর্চা

চামুণ্ডা চর্চা শুধু প্রস্তরমূর্তিতে নয়, টেরাকোটা মন্দির ফলকেও স্থান পেয়েছে। দাঁইহাট বাঘটিকরার মৌজার আটচালা শৈবমন্দিরে কয়েকটি বিচিত্র ফলক রয়েছে এলোমেলোভাবে। যেমন দ্বিভূজা সিংহবাহিনী, বংশীবাদক শ্রীকৃষ্ণ, উদাসীন যোগীরাজ শিব সহ ব্যতিক্রমী কালীফলক। ফলকটির আয়তন আনুমানিক ১০x৮ ইঞ্চি। দেবীর দেহকাণ্ড সর্পাকৃতি। হাত-পা মানবীসদৃশ। মুখমণ্ডল নেকড়ে, শিয়াল অথবা শূকরের মতো। দেবী চতুর্ভূজা। ওপরের ডানহাতে খট্টাঙ্গ। নিচের হাতে নরমুণ্ড। ওপরের বাম-হাতে নরমুণ্ড আর অপর হাতে ঈষৎ আলগা করে ধরা শিবের জটা। গলায় মুণ্ডমালা, কটিতে হাতমালা। দেবী নরমুণ্ড যেন চিবিয়ে খাচ্ছে। নিঃসন্দেহে ভয়ঙ্করী দেবী। শিবের উন্মুক্ত লিঙ্গটি যেন চরম যৌন উত্তেজনায় উত্থিত। এই মূর্তি অভিনব। দুটি নরমুণ্ডকে চণ্ড-মুণ্ডের বলে মনে হয়। আর তা যদি হয় নিঃসন্দেহে টেরাকোটা ফলকে উৎকীর্ণ প্রাচীন চামুণ্ডাফলকের দৃষ্টান্ত। অনেকেই আবার বজ্রবারহী কিংবা কোকামুখী চর্চাদেবী বলে দাবী করেন। মঙ্গলকোটের খেড়ুয়া গ্রামের রাধামাধব মন্দিরে অনুরূপ আরেক বজ্রবারহী চর্চা চামুণ্ডা কালীর সন্ধান মিলেছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3695 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...