Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বর্বর হওয়ার ইচ্ছেতেই মোদি-অমিত শাহদের বর্বরতা 

শৈলেন সরকার

 



লেখক  গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক। প্রাক্তন শিক্ষক।

 

 

 

মাস ছয়েক আগের কথা, যাব জিয়ারুলদের বাড়ি। জয়নগর স্টেশন থেকে কিলের মোড়। কিলের মোড়ে নেমে সিপাইপাড়া। দেখি জনা কুড়ি লোক রাস্তায় পড়ে থাকা এক লাইটপোস্টের উপর বসে। এত লোককে ওখানে বসা দেখে অবাক আমি ‘আসসালাম ওয়ালেকুম’ জানিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার?’ ওদের নাকি কাগজ দেখাদেখি চলছে। জমির কাগজ। এপাড়ায় সবাই সিপাই। জিয়ারুলের আব্বা আহাদ আলি সিপাই বলল, ‘ঠাকুর্দার বাবারা ছিল তিন ভাই।’ সেই লোক নাকি লাটদারের কাছ থেকে জমি নিয়ে জঙ্গল হাসিল করে—। হাতের কাগজ দেখাল। সন ১৯৩২। বললাম, হঠাৎ করে এত পুরনো কাগজ দিয়ে কী হবে? পাশ থেকে নুরুল সিপাই বলল, ‘কেন, আপনারা শহরে করছেন না কিছু?’ অর্থাৎ এনআরসি। নুরুল বলল, আমাদের সিপাইদের সবারই কিছু না কিছু আছে, নেই শুধু মোল্লাদের। কী হবে ওদের কে জানে? সেই কালে জঙ্গল হাসিলের সময়, এক ভিখারি গোছের কেউ তার বউ আর তিন ছেলে নিয়ে আশ্রয়ের জন্য নাকি হাজির হয়েছিল ঠাকুর্দার বাবার কাছে। গ্রামের বাঁদিকের খালপাড় দেখিয়ে বলল, ওই যে পাড় জুড়ে মোল্লাদের ঝুপড়িগুলি দেখছেন, সব সেই ঠাকুর্দার বাবার আশ্রয় দেওয়া সেই ভিখারি মানুষটার বংশের। এত বছরে ওরাও বৃদ্ধি পেয়ে তাও বিশ-পঁচিশ ঘর। প্রায় চার-পাঁচ পুরুষের বাস হলেও ওদের কাগজ নেই কোনও। ‘ভুল করে গেছে আমাদের ঠাকুর্দারাই, ওদের থাকতে দিয়েছে, বাড়ির কাজ করিয়েছে, চাষ করিয়েছে, কিন্তু জমি লিখে দেয়নি কোনও।’ আহাদ সিপাই বলল, ‘দিলীপ ঘোষ নাকি বলেছে মুসলমানদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবে।’ বলল, ‘কিন্তু ওরা পাকিস্তানের নামই শোনেনি কোনও দিন।’

কদিন পর শহরের এক সাংবাদিক বন্ধু একদিন বললেন, ‘এনআরসি-এনআরসি করে চিৎকারটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না খুব?’

আমাদের দেশ যে দুভাগে বিভক্ত, তা আর তো নতুন কথা নয়। ইন্ডিয়া আর ভারত। সিপাই বা মোল্লারা যে দেশে বাস করে তা ভারত। এই ভারতের মানুষজন কিন্তু বিজেপি জেতার পর থেকেই কাগজ-কাগজ করে আতান্তরে। ভারতের হিন্দুরাও। মুসলমানদের অনেকের যদিও বা পুরনো কাগজ আছে বেশিরভাগ হিন্দুরই তা কিন্তু নেই। ভারতের মানুষ কাগজের অভাবে পাগল হচ্ছে, সুইসাইড করছে। হ্যাঁ, এনআরসি আতঙ্কে এই বাংলায় সুইসাইড বা হার্ট ফেল করে মৃত্যুর সংখ্যা জনা কুড়ি হবেই। কিন্তু আমার সাংবাদিক বন্ধুর মতো শহর কোলকাতা লাগোয়া ইন্ডিয়ার মানুষ ভাবছিল, ‘তাতে আমাদের কী?’

ফ্যাসিবাদী হিটলারি জমানার বর্ণনায় ব্রেখট লিখেছিলেন, ‘প্রথমেই ওরা জিপসিদের ধরল/ ভাবলাম, ঠিকই হয়েছে, ও শালারা ছিল ছিঁচকে চোর।/ এরপর ওরা ধরল ইহুদিদের, আমি গা করলাম না/ ইহুদিরা আমার দু চক্ষের বিষ।/ এবার ওরা ধরল সমকামীদের/ আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, ওরা ছিল খুবই বিরক্তিকর।/ এবার কমিউনিস্টদের পালা/ আমি আর কী বলব, আমি তো কমিউনিস্ট ছিলাম না।/ এবার একদিন ওরা আমাকে ধরতে এল/ আমার পাশে এবার আমি কাউকেই পেলাম না।’

পাঁচ তারিখ সেই সাংবাদিক ভদ্রলোকের সঙ্গে সন্ধেবেলা দেখা। বললেন, জেএনইউ-এ কী কাণ্ড হয়েছে দেখেছেন? ওখানকার ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ঐশী ঘোষের মাথা—। অর্থাৎ জেএনইউ-এর ঐশী ঘোষের উপর আঘাত আসায় ইন্ডিয়ার মানুষ হিসাবে এই এতদিনে বিজেপি-র ফ্যাসিবাদী চরিত্রটাকে উনি টের পেলেন।

তা হোক, ভারত আর ইন্ডিয়ার সব মানুষ জাতি-ধর্ম-ভাষা নির্বিশেষে এখন ফ্যাসিবাদী হিংস্রতার বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ লাগিয়েছে, এটাই খুব বড় পাওনা।

আবার সেই ব্রেখট, ‘একটা বিদেশিকে ধরা হল, এক দেশদ্রোহীর পাওনা মতোই তার হিসেব মেটানো হল। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, বর্বরদের সঙ্গে বর্বরের মতোই তো ব্যবহার করা উচিত। আর সরকারকে এই বর্বর হওয়ার ইচ্ছেতেই শত্রুদের বর্বর বলে চিহ্নিত করতে হয়।’ হ্যাঁ, ঠিক হিটলারের মতো করে বর্বর হওয়ার ইচ্ছেতেই মোদি-অমিত শাহদের এখন মুসলমানদের বর্বর দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলতে হচ্ছে। বা নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বসে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ধন্য গুন্ডাদের হাতে আক্রান্ত ঐশী ঘোষদের বিরুদ্ধে বর্বর হাঙ্গামাকারী বলে এফআইআর করতে হচ্ছে।

আর গোরুর দুধ থেকে সোনা বের করা দিলীপ ঘোষ? লোকটার কথায়, ঐশীর মুখে ওটা রক্ত না কি রং? আচ্ছা ওই লোকটার গায়ের চামড়া কি মানুষের না কি—।