Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

সংস্কৃতি, যৌন মনন, সম্পর্ক ও হিংসা

হিমাদ্রী মন্ডল

 




লেখক বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উইমেন'স স্টাডিজ বিভাগে গবেষণারত, লিঙ্গবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের কর্মী।

 

 

 

কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের বা স্থানের সংস্কৃতির আঙ্গিকে লালিত যৌনতা, যৌনচেতনা, যৌনাচার, যৌনতার প্রকাশ ও ধরন এবং সংস্কৃতির ইতিহাসের গতিপথে তার অবস্থান নির্ণায়কের বহমান ধারক যদি সেই সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট সাহিত্য হয়, তাহলে সেই সংস্কৃতিস্থ যৌনতার বাহক অবশ্যম্ভাবীভাবে ওই বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ যাঁদের পরিচিতি সত্তা বা আইডেন্টিটির একটি বৃহৎ অংশ হিসাবে যৌন অভিরুচি, প্রকাশ ও যৌনচেতনার উপর উপরোক্ত কালেক্টিভ সংস্কৃতি-যৌনতার বিশেষ, প্রায় স্থবির প্রভাব রয়েছে। এভাবেই একটি বৃহত্তর সংস্কৃতি, তাকে বয়ে নিয়ে চলা ব্যক্তিমানুষের মধ্য দিয়ে যৌনতা সহ আরও বিভিন্ন একক ও আঙ্গিকে ক্রমশ বর্ধনশীল সম্প্রদায় ও প্রবহমান হয়ে ওঠে। সংস্কৃতি-যৌনতার এই গতিশীল মিশেল ও পারস্পরিকতা একটা বড় অংশে সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্তিমননের যৌনচেতনার অংশ হয়ে যেতে সক্ষম হয়, যা আইডেন্টিটি নির্মাণের মাধ্যমে ব্যক্তিমানুষকে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে প্রবোধ দেয়। ব্যক্তিমানুষের আইডেন্টিটি হিসাবে যৌনতার এক ক্ষুদ্র অংশ, যা কিনা সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়গত কালেক্টিভ সংস্কৃতি-যৌনতা দ্বারা প্রভাবিত তা ক্ষেত্রবিশেষে চূড়ান্ত হতাশার উদ্রেক করে বা বিশেষ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে পারে। কিছুদিন আগেই রতন কাহারের লেখা ‘বড়লোকের বেটি লো’ গানটির রিমেক হিসাবে বাদশা ‘গেন্দা ফুল’ গানটির মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করলে বিতর্ক শুরু হয়। যদিও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে গানের রচয়িতা হিসাবে রতন কাহারের বঞ্চনার কাহিনিই অধিক স্থান পেয়েছিল, তবুও আরেকটি দিকও উঠে এসেছিল, তা হল বাঙালি নারীকে স্রেফ ভোগ্যবস্তু হিসাবে উপস্থাপন করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বাদশা রচিত র‍্যাপটি যে নারীশরীরকে চূড়ান্ত রকমের অবজেক্টিফাই করে তা তাঁর ব্যবহৃত শব্দ ও ভিডিওর ধরনে স্পষ্ট। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষায় উঠে আসা ‘বাঙালি নারী’ শব্দবন্ধটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। রতন কাহারের মূল গানটিতে যেভাবে মৃদু যৌনতা বা যৌন আবেদনকে নির্মাণ করা হয়েছে তা সমকালীন বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির গতির আঙ্গিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে, এবং গানটি সাহিত্য হিসাবে বাঙালি মননে স্টিরিওটাইপ প্রেমিকার ও তার যৌন আবেদনের চিত্রকল্প তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। পরবর্তীতে স্বপ্না চক্রবর্তীর গায়কিতেও একই ভাব বজায় থেকেছে। কিন্তু বাদশার মিউজিক ভিডিও ‘গেন্দা ফুল’-এ কয়েকবার অভিনেত্রী জ্যাকলিন লালপাড় সাদা শাড়িতে ধুনুচি হাতে নাচলেও পরমুহূর্তেই পোশাক পরিবর্তন, পট পরিবর্তন এবং তাঁর শরীরী ভাষা বারবার রতন কাহারের তৈরি ‘বড়লোকের বেটি’র চিত্রকল্প এবং তার প্রেক্ষিতে বাঙালি মননে গড়ে ওঠা গণযৌনচেতনায় আঘাত করেছে। এই ভিডিওয় জ্যাকলিন বাঙালি নারী-উত্তর গ্লোবালি অ্যাকনলেজড একটি যৌন-নারীদেহ, যার মধ্যেকার বাঙালি সংস্কৃতি অর্থাৎ পোশাক বা ধুনুচি নাচ শুধুমাত্র যৌন আকর্ষণ নির্মাণের নিরিখে ব্যবহৃত হয়েছে, অর্থাৎ কিনা যার সিগনিফায়ার বাদশা সরাসরি বাঙালি লোকসংস্কৃতির ধারা থেকে ছিঁড়ে আনলেন কিন্তু সিগনিফায়েড নির্মাণ করলেন বিশ্বায়নের লিবিডোর দাবি মেনে আর ঠিক এখানেই আরেকবার ধাক্কা খেল পিতৃতান্ত্রিক বাঙালি পৌরুষ, কারণ লম্বা চুলের বড়লোকের বেটির অধিকারের সুখকল্পনায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল বিশ্বায়নের যৌনক্ষুধিত পৌরুষ, এক্ষেত্রে দৃশ্যমান চিত্রকল্প হিসাবে বাদশা নিজে। ভুললে চলবে না, এই মানসিক লড়াইটি কেবলই পৌরুষ বনাম পৌরুষের। জ্যাকলিনের চরিত্রটি না হতে পারলেন বাঙালি প্রেমিকার স্টিরিওটাইপ চিত্রকল্পের প্রতিভূ, না স্বীয় যৌনতা ও অস্তিত্বে স্বাধীন সাবজেক্ট।

এখন প্রশ্ন হল বাঙালি আইডেন্টিটির অন্তস্থ যৌনতার নির্মাণ শুধু রতন কাহারের বড়লোকের বেটি দ্বারা হয়নি, সেখানে মিশেছে আরও অজস্র লোকসাহিত্য, দর্শন, দেশ বিদেশের সাহিত্য, সিনেমা, শিল্প এমনকি ধর্ম, সমাজ, দেশাচার, পর্নোগ্রাফি ইত্যাদি। তাহলে জ্যাকলিনকে বাঙালি পৌরুষের কামনানিবৃত্তি হিসাবে মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়? যে বাঙালি গেন্দা ফুল দেখে বিরক্ত হচ্ছে, সে কি বেসিক ইন্সটিঙ্কট, বা পর্নহাব মায় চিকনি চামেলি দেখে উত্তেজিত হয় না? হয় তো বটেই। আসলে ব্যক্তিমানুষের আইডেন্টিটির যৌনতার অংশটি হাজার হাজার যৌন অভিব্যক্তি দিয়ে তৈরি হয়, এমনকি এরা বহুলাংশে পরস্পরবিরোধীও হতে পারে। কিন্তু আউটকাম হিসাবে কোনটি প্রকট হয়ে উঠবে তা নির্ভর করে কনটেক্সট বা বিষয়ের উপর। এক্ষেত্রে রতন কাহার নির্মিত লোকগীতির মাধ্যমে যে বাঙালি মনন নারী বা প্রেমিকার নির্মাণকে ব্যক্তিকামনার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে; ঐ একই শব্দমালা, ছন্দ ইত্যাদি দিয়ে নির্মিত বিশ্বায়নের পৌরুষের যৌনক্ষুধার ‘আদার’, উদগ্র যৌনতার সিম্বল হিসাবে উঠে আসা জ্যাকলিনের শরীরী লাস্যময়তার ভাষ্যকে বাঙালি মননে থাকা রতন কাহারের নারী-প্রেমিকাকে তৎক্ষণাৎ ডিসোশিয়েট বা পৃথক করেছে। এই ডিসোসিয়েশন বা পৃথকীকরণের বহিঃপ্রকাশই হল হতাশা, রাগ বা প্রতিক্রিয়াশীলতা। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হল এক্ষেত্রে অধিকাংশ বাঙালি পৌরুষ ডিকনটেক্সচুয়ালাইজড বিশ্বায়নের যৌনতার ধারণাকে নস্যাৎ করে সাংস্কৃতিক ইতিহাসপৃক্ত কালেক্টিভ সংস্কৃতি-যৌনতার ধারণাটিতেই স্থির থেকেছেন। এর কারণ হিসাবে বলা যায়, এই ধারণাটি একদিকে যেমন স্টিরিওটাইপ নারী প্রেমিকার নির্মাণ ও তার অধিকার প্রসঙ্গে বিশ্বায়নের প্রবল পৌরুষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে খারিজ করে, তেমনই অন্য দিকে বৃহত্তর সম্প্রদায় বা ভাষাগোষ্ঠী বা জাতি ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের সম্ভাবনাকেও নস্যাৎ করে।

অর্থাৎ দেখা গেল একক ব্যক্তিমানুষের মধ্যে সামাজিক যৌনতার ধারণা হিসাবে অজস্র যৌন অভিব্যক্তি, আকর্ষণ, প্রকাশ, ধরন ইত্যাদির সমাহার থাকে, যেগুলি কোনও না কোনও সামাজিক বিষয় বা ফ্যাক্টরের সঙ্গে সম্পর্কিত; এবং এদের কোনও একটির ফলাফল হিসাবে প্রকট হয়ে ওঠা নির্ভর করে পরিস্থিতি, ক্ষমতাকাঠামো ও তার বদল, সোশ্যাল স্টেটমেন্ট, ডিসকোর্স ইত্যাদির ওপর। ঠিক এই কারণেই শুধুমাত্র প্রবৃত্তি শব্দটি দিয়ে যেকোনও যৌন ধারণা, প্রকাশ, ব্যবহার বা আচরণের সর্বশেষ দৃশ্যমান অংশটিকে ব্যাখা করা সম্ভব নয়, কারণ ব্যক্তিমানুষের মধ্যে যৌনতার সূচনা থেকে পরিণতি অবধি সিংহভাগ অংশই শর্তনির্ভর, যার পোশাকি নাম হল কন্ডিশনিং। কাজেই একক ব্যক্তিমানুষের মধ্যেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-যৌনতা সমীকরণের প্রবৃত্তি জন্মায় এবং সঞ্চিত হয়। ব্যক্তি আইডেন্টিটির যতখানি অংশ যৌন পরিচয়বাহী, তার সবটুকু প্রকাশিত নয়, বরং অনেকাংশেই তা গোপন। উদাহরণ হিসাবে বর্তমানে ধর্ষণে অভিযুক্তদের কঠোরভাবে হত্যার দাবি উঠে আসে, যদিও এই স্যাডিস্ট রসাস্বাদনের পশ্চাতে তীব্র যৌন অবদমন বা আনস্যাটিসফায়েড লিবিডো রয়েছে, যা প্রকাশিত। আর পরক্ষণেই ধর্ষণের ভিডিও ক্লিপ পর্ন সাইটে বিপুল হারে সার্চ হওয়ার ঘটনাগুলি ঘটে, যা কিনা গোপনীয়। ভারতের মতো দেশে যেখানে সমাজের সিংহভাগ মানুষ যৌনতৃপ্তির অভাবে বা যৌনতা চরিতার্থ করার অভাবে ভোগেন, তাদের কাছে একান্ত গোপনে ধর্ষণের বা শিশু ধর্ষণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ খানিক হলেও কামনাকে উস্কে দিয়ে একধরনের যৌনতৃপ্তি প্রদানে সহায়ক হয়ে ওঠে। যে ব্যক্তি গোপনে ধর্ষণের ভিডিও সার্চ করে যৌনতৃপ্তি লাভ করছেন, মিডিয়ায় ধর্ষকের নাম বা পরিচয় ও কর্মকাণ্ড প্রকাশিত হওয়া মাত্রই তিনি ইমিডিয়েটলি ধর্ষকের পরিচিতি থেকে নিজেকে এবং নিজের সংশ্লিষ্ট সমাজকে ডিসোশিয়েট বা বিচ্ছিন্ন করছেন এবং প্রকাশ্যে হত্যার দাবি জানাচ্ছেন। একটি বড় অংশের মানুষ ধর্ষণের ক্লিপ বা বিবরণ থেকে যৌনতৃপ্তি লাভ না করলেও এই ইমিডিয়েট ডিসোশিয়েশনের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন, তার পশ্চাতে নীতিশিক্ষা, সংশ্লিষ্ট সামাজিক পরিস্থিতিতে সোশ্যাল স্টেটমেন্ট ইত্যাদি একাধিক কারণ বিদ্যমান থাকতে পারে। তবে নিজেকে ও সংশ্লিষ্ট সমাজকে এই আবশ্যিক বিচ্ছিন্ন করার পশ্চাতে একান্ত গোপন যৌন অভিরুচি প্রকাশজনিত ভয়ের তাড়া অন্যতম বড় কারণ এবং এই প্রবৃত্তিনির্ভরতা, প্রায় চিন্তা-ভাবনা বর্জিত বিচ্ছিন্নকরণের ফল এতটাই প্রতিক্রিয়াশীল ও ভয়ানক যে বিচ্ছিন্নকরণের সঙ্গে সঙ্গেই ডিসোশিয়েটেড বডি অর্থাৎ ধর্ষকের তৎক্ষণাৎ অ্যানিহিলেশন বা বিনাশ দাবি করে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে সময়ের ও পরিস্থিতির সাপেক্ষে প্রবৃত্তিচালিত ব্যক্তির যৌনতার প্রশ্নে নিজের কাছে স্বীকৃত বা অস্বীকৃত প্রকাশিত ও গোপন সত্তার দূরত্ব অনেক বেশি, দূরত্ব বেশি বলেই তা মূলত প্রবৃত্তিচালিত এবং তা ভাবনা-চিন্তা দ্বারা খুব বেশি সংযুক্ত নয়। প্রবৃত্তির সঙ্গে সামাজিক কন্ডিশনিং ফ্যাকটরগুলির সরাসরি সম্পর্ক থাকার ফলে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়া যে কোনও স্পেসে একই ব্যক্তির অসংখ্য যৌন আউটকামের সম্ভাবনা থাকে।

বর্তমানে চুড়ান্ত পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে বিবাহ বা পরিবার নামের সামাজিক ইন্সটিটিউশনটি ক্রমাগত তার প্রয়োজনীয়তা খুইয়ে চলেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, নিও লিবারাল ইকোনমির হাত ধরেই ভারতের মতো তৎকালীন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যৌনতার পরিসর ক্রমাগত মুক্ত হতে শুরু করে এবং সাবেকি একান্নবর্তী পরিবারের লিঙ্গভিত্তিক গৃহশ্রমের বিপুল বোঝার নিচে চাপা পড়ে থাকা অবদমিত যৌনতার পরিসর ক্রমশ একটু একটু করে উন্মুক্ত হতে থাকে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির হাত ধরে। পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে বিপুল কর্মের জগত ও খানিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসে মহিলাদের হাতে। প্রাথমিকভাবে পুরুষ সংখ্যাধিক্য সমন্বিত পরিবারের গণ্ডির বাইরের স্পেসে কর্মী হিসাবে মহিলারাও ঢুকে পড়ায় অস্বস্তিকর পরিবেশ ও যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধপ্রবণতা তৈরি হয় ঠিকই, যা বিভিন্ন ধারায় আজও বর্তমান, কিন্তু একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও ভোগবাদী ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা সামজিকভাবে যৌন অতৃপ্তিকে চিনতে শেখায়। ফলে বিবাহের পাশাপাশি লিভ ইন, সেক্স বাডিজ, ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিটস ইত্যাদি ছকভাঙা যৌনতাকেন্দ্রিক সম্পর্ক একের পর এক নির্মিত হতে থাকে। এর ফলে যেকোনও যৌনসহাবস্থানমূলক সম্পর্ক তা বিবাহ হোক বা লিভ ইন ক্রমাগত পারস্পরিক রিজিড ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে শুরু করে। অর্থাৎ সহাবস্থান বা যৌনতার প্রশ্নে পারস্পরিক এক্সপেক্টেড পারফরমেন্স বা কার্যগত শ্রমবিভাজনের অলিখিত চুক্তি সম্পর্কের নির্ণায়ক হতে শুরু করে। লিঙ্গগত ক্ষমতা পার্থক্যের অনেক প্যারামিটার বা স্থিতিমাপক তৈরি হয়, লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজনও শ্রেণিচরিত্রের বদল ঘটিয়ে নতুনভাবে অভিযোজিত হতে থাকে। এইভাবে নিও-লিবারাল অর্থনীতির আঙ্গিকে মূলত কনজিউমারকেন্দ্রিক সংস্কৃতি-যৌনতার আঙ্গিকে এক লিবারাল যৌনপ্রবৃত্তির নির্মাণ চলতে থাকে।

বিখ্যাত ঔপন্যাসিক উইলিয়ম গোল্ডিং তাঁর বিখ্যাত “লর্ড অব দ্য ফ্লাইস” উপন্যাসে সরলরৈখিক ইতিহাসের ধারণাকে নস্যাৎ করে দেখান কন্ডিশনিং ফ্যাক্টরগুলি একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্পেসে পরিবর্তিত হলে অতীত ইতিহাসের কোনও অধ্যায়ের ফিরে আসা ভীষণভাবে সম্ভব। লিঙ্গগত ক্ষমতার পার্থক্য, শ্রমের বিভাজন, সম্পর্কের মাধ্যমে যৌন অধিকার স্থাপন ইত্যাদি বৃহৎ সামাজিক ফ্যাক্টরগুলি যেমন আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত জীবনে লিঙ্গভিত্তিক হিংসা বা ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স তার বাহ্যিক রূপটি পরিবর্তন করে কবীর সিং-এর মতো প্রায় সর্বজনবিদিত সিনেমার ভাষ্য পরিগ্রহণ করে ঠিকই, কিন্তু সারা দেশে লম্বা লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে পরিবারের মধ্যে পরিবর্তিত স্পেসে পারস্পরিক এক্সপেক্টেড পারফরমেন্সের অলিখিত চুক্তিটি ক্রমাগত লঙ্ঘিত হয়, ফলে লিঙ্গভিত্তিক ভায়োলেন্স বা ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স তার হিংস্রতম রূপে আবির্ভূত হয়। প্রসঙ্গত ন্যাশনাল কমিশন ফর উওমেন-এর চেয়ারপার্সন রেখা শর্মা এ যাবৎ প্রাপ্ত ঊনসত্তরটি ইমেলের কথা জানিয়েছেন যার বিষয়বস্তু গৃহহিংসা সংক্রান্ত অভিযোগ। যদিও তাঁর আশঙ্কা প্রকৃত গৃহহিংসার শিকার নির্যাতিতার সংখ্যা আদতে অনেক বেশি, কারণ বেশিরভাগই ডাক মারফৎ অভিযোগ জানান। বর্তমানে ডাক অনিয়মিত হয়ে পড়ায় হয়তো সব অভিযোগ পৌঁছায়নি। লকডাউনের জেরে নির্যাতিতারা পুলিশি সাহায্যও ঠিকমতো পাচ্ছেন না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। মনে রাখতে হবে ভারতবর্ষের আপামর মহিলা কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত, তাঁদের মধ্যে কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাওয়া এক শ্রেণির মহিলারাই ইমেল ব্যবহারে সক্ষম। নিম্নবিত্ত বা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলিতে লকডাউনের জেরে গৃহহিংসার শিকার মহিলাদের সঠিক পরিসংখ্যান নির্ণয় করা প্রায় দুঃসাধ্য।

যে নিও লিবারাল ইকোনমি নিজের স্বার্থেই চূড়ান্ত আবশ্যিকভাবে আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদী স্বাধীনতার ধারণাকে লালন করেছে, বর্তমানে তা প্রফিট বা মুনাফার চূড়ান্ত বৃদ্ধি ঘটাবার জন্য সামগ্রিকভাবে তার কর্মী বা শ্রমিকদের জন্য কনজিউমারস লিবার্টি বা যৌনতার মুক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলিতে নিঃশব্দে বিনিয়োগ বন্ধ করছে। বরং কম খরচে আরও অধিক উৎপাদনের জন্য একটি প্রায় হোমোজিনিয়াস আইডেন্টিটি তৈরির লক্ষ্যে ধর্মীয় মৌলবাদ-কেন্দ্রিক ফ্যাসিবাদের হাত ধরতে সচেষ্ট হয়েছে আজকের পুঁজিপতিরা। শ্রমিকের সংখ্যা যেহেতু স্যাচুরেশান লেভেলের অনেক উপরে তাই তাদের ন্যূনতম বরাদ্দটুকুও দিতে দেশ হিসাবে বিনিয়োগের একটি বড় অংশ অযথা খরচ হয় এবং যা উৎপাদনের তুলনায় অনেকটাই বেশি হয়ে পড়ে। ফলে দমনপীড়ন নীতি নিয়ে খড়্গহস্ত ধর্মীয় মৌলবাদ, যার আবশ্যিক প্রথম কোপটি নারী স্বাধীনতা ও নারীর যৌন স্বাধীনতার উপর পড়ে। প্রসঙ্গত জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্সে ভারতের স্থান ১১২ নম্বরে এবং গ্লোবাল জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি ইন্ডেক্সে ভারতের স্থান ৯৫তম। আরও একবার এই পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত সংস্কৃতি-যৌনতার বাহক মানুষের গৃহহিংসা ও নারীর উপর তার প্রভাব সহজেই অনুমেয়।

একগামী একপতিপত্নী সম্বলিত পরিবারগুলিতে আবশ্যিক বিষমকামের লিঙ্গ-যোনি সম্বলিত রতিক্রিয়াকেই যৌনতার তৃপ্তি বলে চিহ্নিত করে এসেছে বেশিরভাগ আর্থসামাজিক ফ্যাক্টরগুলি, যা সংস্কৃতি-যৌনতা হিসাবে ব্যক্তির আইডেন্টিটি নির্মাণ করেছে। ফলে লিবিডোর নির্মাণ ও সর্বোচ্চ সন্তোষ বিষয়টি চিহ্নিত করা যায়নি। বাড়ির বাইরের পরিসর লকডাউনের ফলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যৌনতাভিত্তিক সম্পর্কগুলির ক্ষেত্রে চার দেওয়ালের বদ্ধ স্পেসে একগামী সঙ্গী ব্যতিরেকে লিবিডোর দৈনন্দিন অসন্তোষ বা অতৃপ্তি, রতিমোচন ব্যতিরেকেও সঙ্গীর প্রতি ক্রমান্বয়ে বিরক্তি উৎপাদন করে চলে, এই যৌনক্ষুৎকাতরতা একসময় গৃহহিংসার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে ক্রমবর্ধমান লিবিডোর তাড়না এবং অপরদিকে আবশ্যিক একগামিতার নীতিকে কেন্দ্র করে টিকে থাকা পরিবারগুলি এবং মাঝে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাধীনতার ধারণায় বাজারি ভোগবাদের চূড়ান্ত টানাপোড়েনে প্রতিনিয়ত ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে কোনওমতে চলতে থাকা পরিবারে আবদ্ধ যৌনতা সম্পর্কিত মানুষদের কাছে লকডাউনের ফলে হঠাৎ বদলে যাওয়া সময় ও স্পেসে ক্ষমতা সম্পর্কের ভাঙন ও পুনর্নির্মাণ নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা।

অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে পুরুষ লিঙ্গগত সামাজিক অবস্থানের জন্যই নারীর তুলনায় ঐতিহাসিকভাবে অধিক ক্ষমতা ভোগ করে এসেছে। পরিবারের চার দেওয়ালের বাইরে সামাজিক অধিকার উপভোগ করার জন্য নারীর অবাধ মুক্ত পরিসর ছিল, যা প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে হাল আমল পর্যন্ত লুণ্ঠিত হয়েছে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার, সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রের হাত ধরে। বরং পরিবারের পরিসর যত চার দেওয়ালের মধ্যে ছোট হতে থাকবে ততই বাড়তে থাকবে টক্সিক ম্যাসকুলিনিটির প্রভাব, যার অবশ্যম্ভাবী শিকার হবেন নারীরা।

ইউএন সেক্রেটারি আন্তোনিও গাতেররেস লকডাউনের কারণে পৃথিবীব্যাপী বেড়ে চলা বিপুল গৃহহিংসার শিকার নারীদের জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সমস্ত দেশের সরকারের কাছে নারীর প্রতি হিংসা বা ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিকে জাতীয় স্তরের গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করার জন্য অনুরোধ করেছেন। লকডাউনের প্রথম সপ্তাহে ভারতে লিঙ্গসংক্রান্ত হিংসার শিকারের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ইউএস, অস্ট্র্বলিয়া, তুর্কি, সাউথ আফ্রিকা, ফ্রান্সের মতো দেশগুলিতেও লকডাউন পিরিয়ডে গৃহহিংসার হার চরমে পৌঁছেছে। শুধুমাত্র আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রোটেকটিভ মেজরস বা দমনমূলক নীতি গ্রহণ করলেই হবে না, রাষ্ট্রীয় পিতৃতান্ত্রিক মননের ইউনিট হিসাবে গড়ে ওঠা পরিবার বা গৃহের স্পেস, ক্ষমতার বিনির্মাণ, অধিকারের নয়া সংজ্ঞা, যৌনতার সমানাধিকার ও যৌনতার মুক্তি ইত্যাদি নিয়ে বিশদে না ভেবে শুধুমাত্র নীতিশিক্ষার উদযাপন করলে হয়তো সাময়িকভাবে গৃহহিংসার মতো একটি ভয়ানক প্রবনতাকে আটকানো সম্ভব হলেও, অদূর ভবিষ্যতে পরিবর্তিত টাইম ও স্পেসে এটি আরও ভয়ানক মারাত্মক দুষ্প্রতিরোধ্য আকারে ফিরে আসতে পারে।