কমনওয়েলথ গেমস ২০২২: উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দ্যুতি চাঁদ প্রাইড পতাকা উত্তোলন করলেন

প্রিয়দর্শিনী

 

 


ফটোগ্রাফার, লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী

 

 

 

 

ভারতীয় স্প্রিন্টার দ্যুতি চাঁদ বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমস ২০২২-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে প্রাইড পতাকা উত্তোলন করেন। ব্রিটিশ সাঁতারু টম ডেলি তার ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করেছেন যেখানে তিনি অন্যান্য ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে নিজের একটি ছবি শেয়ার করেছেন। এই ছবিতে, লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের বহু ক্রীড়াবিদদের, তাঁদের সম্প্রদায়ের উপর ঘটে চলা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংহতি প্রকাশ করবার জন্যে এবং এখনও কমনওয়েলথ গেমসের অনেক প্রতিযোগী দেশগুলিতে এই নির্যাতনের প্রবলতার উপর আলোকপাত করার জন্যে একসঙ্গে প্রাইড পতাকা উত্তোলন করতে দেখা যায়। দ্যুতি চাঁদ হলেন ভারতীয় জাতীয় দলে প্রথম প্রকাশ্য সমকামী ক্রীড়াবিদ। তিনি ২০১৯ সালে তাঁর যৌনতা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছিলেন এবং তারপর থেকে তিনি লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের অধিকারের পক্ষে আরও কথা বলা শুরু করেন। তিনি তাঁদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছেন যাঁরা বিভিন্ন ভ্রান্তির জন্যে নিজের লিঙ্গ-যৌনতার বিষয়ে সবার সামনে খোলাখুলি কথা বলতে পারেন না এবং বিশ্বের কাছে তাদের আসল পরিচয় প্রকাশ করতে ভয় পান।

দ্যুতি এবং টম ছাড়া আরও পাঁচজন ক্রীড়াবিদ যোগদান দেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন নাইজেরিয়ার বিসি আলিমি। ইনি নাইজেরিয়ার টেলিভিশনে প্রথম সমকামী পুরুষ যিনি জনসমক্ষে তাঁর লিঙ্গ-যৌনতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি এখন ‘বিসি আলিমি ফাউন্ডেশন’-এর নির্বাহী পরিচালক। এই সংস্থা নাইজেরিয়ার লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের লোকেদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ত্বরান্বিত করার জন্যে কাজ করে। জামাইকার গ্লেনরয় মারে হলেন ‘জে ফ্ল্যাগ’-এর নির্বাহী পরিচালক। ‘জে ফ্ল্যাগ’ এমন একটি সংস্থা যারা লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করেন। এই সংস্থা জামাইকার সমস্ত ক্ষেত্রে লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক মানুষদের অন্তর্ভুক্তির জন্য কাজ করে। জিম্বাবোয়ের মউদ গোবা, মাইক্রো রেনবোতে জাতীয় ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন। মাইক্রো রেনবো লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক আশ্রয়প্রার্থী এবং নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের সমর্থন করে, এবং ইংল্যান্ডে নিরাপদ আবাসন এবং একীকরণের জন্যে সহায়তা করে। ত্রিনিদাদ ও টোবাগো-র জেসন জোন্স হলেন একজন লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক মানুষদের অ্যাডভোকেট যিনি ২০১৮ সালে ত্রিনিদাদ এবং টোবাগোতে প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিমূলক সমকামী ঘনিষ্ঠতাকে অপরাধমুক্ত করার জন্য একটি সফল আইনি লড়াই করেছিলেন। উগান্ডার প্রসি কাকুজা লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিকতা নিয়ে কাজ করেন এমন একজন অ্যাক্টিভিস্ট এবং মানবাধিকার রক্ষাকারী। উনি লেসবিয়ান ইমিগ্রেশন সাপোর্ট গ্রুপের সঙ্গে কাজ করেন, যারা গ্রেটার ম্যাঞ্চেস্টারে এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে তাদের যৌনতার ভিত্তিতে আশ্রয়প্রার্থী নারীদের সমর্থন করেন।

কমনওয়েলথ দেশগুলির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি দেশে, সমকামিতা এখনও একটি অপরাধ এবং এদের মধ্যে তিনটি দেশে সর্বোচ্চ শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড। এই আইনগুলি ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার। এই ৭ জন লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের ক্রীড়াবিদদের জন্যে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ছিল এই সম্প্রদায়ের দৃশ্যমানতা দেখানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ভারতে, সমকামিতার বিরুদ্ধে আইন আনে ইংরেজ উপনিবেশকারীরা। সমকামিতাকে দণ্ডনীয় অপরাধ করে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল, ‘আমাদের সভ্য করার’ বর্ণবাদী আচরণ। ভারত ছাড়ার ২০ বছর পর, ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশরা সমকামিতাকে অপরাধমুক্ত করে। কিন্তু ভারত বহু বছর পর, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮-তে সমকামিতাকে অপরাধমুক্ত করে। কমনওয়েলথ অফ নেশনস-এর সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলি, যা পূর্বে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ নামে পরিচিত ছিল, এখনও একই লিঙ্গের প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতি এবং যৌন অভিযোজন, লিঙ্গ পরিচয় এবং অভিব্যক্তির অন্যান্য রূপের মধ্যে যৌন ক্রিয়াকলাপকে অপরাধী তকমা দেয়। কমনওয়েলথের ৫৪টি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে ৩৫টিতে সমকামিতা একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে রয়ে গেছে; এবং শুধুমাত্র ১৯টি দেশে এটি বৈধতা লাভ করেছে।

এটিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের “প্রধান ঐতিহাসিক প্রভাব” বা উত্তরাধিকারের ফলাফল হিসাবে ধরা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, উনবিংশ শতাব্দীতে এবং তারও আগে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক প্রশাসকরাই সমকাম-বিরোধী আইন বা সোডোমি আইন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলি স্বাধীনতা লাভ করার পরেও এই আইনগুলো ধরে রেখেছে। অনেক প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশে ঐতিহাসিক দণ্ডবিধির সাধারণ উৎপত্তির কারণে, সমকামিতা নিষেধাজ্ঞা, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে যৌনক্রিয়া, ৪২টি প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় প্রদান করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই আজ কমনওয়েলথ-এর সদস্য।

কমনওয়েলথের বেশ কয়েকটি দেশে সমলিঙ্গের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ব্যক্তিগত, সম্মতিমূলক যৌনক্রিয়ার কঠোর শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জামাইকায় ১০ বছরের কারাদণ্ড, কেনিয়ায় ১৪ বছর এবং মালয়েশিয়ায় ২০ বছরের বেশি বেত্রাঘাত। সদস্য রাষ্ট্রগুলির একটি গুচ্ছের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড রয়েছে: বাংলাদেশ, বার্বাডোস, গায়ানা, পাকিস্তান, সিয়েরা লিওন, তানজানিয়া এবং উগান্ডায়। এদিকে, ব্রুনেই এবং উত্তর নাইজেরিয়ায় সমকামী পুরুষদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড। ক্যামেরুনের মতো কিছু দেশে, সমকামিতার কারণে গ্রেফতার এবং কারাদণ্ডের খবর প্রায়শই পাওয়া যায়।

১৮৬০ সাল থেকে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তার উপনিবেশ জুড়ে একটি নির্দিষ্ট আইনি কোড এবং আইন ছড়িয়ে দেয়, যার মধ্যে পুরুষদের সমকামী যৌন সম্পর্ককে নিষিদ্ধ করা হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একটি নৈতিক, ধর্মীয় মিশন মাথায় রেখে এই দণ্ডবিধির খসড়া তৈরি করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় খ্রিস্টানদের “দুর্নীতি” থেকে রক্ষা করা এবং সঠিক খ্রিস্টান করার “নেটিভ” প্রথা। এই ঘটনার দুটি বিশিষ্ট উদাহরণ হল ভারত এবং কুইন্সল্যান্ডের ঔপনিবেশিক ফৌজদারি কোড, যে দুটিই বিশেষভাবে পুরুষদের সমকামী যৌন সম্পর্ককে অপরাধী করেছে— যদিও তারা উভয়েই মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের শাস্তি নির্ধারণ করে।

ব্রিটিশ অভিজ্ঞতার বিপরীতে, অন্যান্য প্রধান ঔপনিবেশিক শক্তি সমকামী আচরণের অপরাধীকরণের ক্ষেত্রে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার ছেড়ে যায়নি। এই কারণেই প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে অন্যান্য ইউরোপীয় রাজ্য বা সাধারণভাবে অন্যান্য রাজ্যগুলির প্রাক্তন উপনিবেশগুলির তুলনায় এই আইনগুলি এখনও কার্যকর থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে এই ধরনের আইনগুলি এখনও যেখানে রয়েছে, সেগুলি যে মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়েছে তা বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যেখানে উগান্ডা সক্রিয়ভাবে এবং ঘন ঘন লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষদের নিপীড়ন করে, সিঙ্গাপুর তাদের থেকে অনেক কম নিয়মিত শাস্তি দেয়। তবে যা অনস্বীকার্য তা হল যে এই ধরনের আইনগুলি সারা বিশ্বে লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষদের কলঙ্কিতকরণকে দীর্ঘায়িত করেছে এবং কেন তাদের মধ্যে অনেকগুলি আজ টিঁকে আছে তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কমনওয়েলথ গেমস ২০২২ ‘সকলের জন্য ক্রীড়া’ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং দাবি করে যে এটি ‘বিশ্বের সবচেয়ে ইনক্লুসিভ’ মাল্টি-স্পোর্ট ইভেন্ট, কিন্তু এই বক্তব্যের সঙ্গে সবাই সহমত নয়। লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়, ক্রীড়াবিদরা সহ যাঁরা নিজেদের গেমে মত প্রকাশ করেছেন, তাঁরা কমনওয়েলথ দেশগুলির সমকাম-বিরোধিতার নিন্দা করছে এবং সমকামী সম্পর্ককে বৈধ করার আহ্বান জানিয়েছে৷ কমনওয়েলথ গেমস ফেডারেশন দাবি করা সত্ত্বেও যে গেমগুলি সবার জন্য উন্মুক্ত, একজন পরিচিত লিঙ্গ-যৌনতা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের ক্রীড়াবিদকে প্রতিযোগী কমনওয়েলথ দেশের দুই-তৃতীয়াংশের জাতীয় দলের জন্য নির্বাচিত করা অসম্ভব। তাঁদের হাজতবাস হতে পারে এবং নির্বাচিত করা হবে না— তাঁরা যতই ভাল হোন না কেন! এই কারণেই, টম ডেলি, দ্যুতি চাঁদ, বিসি আলিমি, গ্লেনরয় মারে, মউদ গোবা, জেসন জোন্স এবং প্রসি কাকুজা, কমনওয়েলথ দেশগুলিতে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যের দিকে আলোকপাত করবার জন্যে কমনওয়েলথ গেমসের উদ্বোধনে প্রাইড পতাকা উত্তোলন করেছেন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...