ঘর ঘর তিরঙ্গা

প্রবীর মুখোপাধ্যায়

 



প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

 

 

 

 

ভারতে এখন বারো মাসে তেরো পার্বন নয়— প্রতিদিনই কোনও না কোনও পার্বন। পুজো-খেলা এসব তো আছেই, এখন আবার লোকের ফ্ল্যাট থেকে হিসেবে-না-থাকা টাকা পাওয়া গেলে সেটাও সাড়ম্বরে পার্বন হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ঠিক এই সময়ে দেশে রমরমিয়ে চলেছে যে পার্বন তার নাম ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’। এখন থেকে পঁচাত্তর বছর আগে দেশের শাসনক্ষমতা ব্রিটিশ সরকারের হাত থেকে আমাদের মানে ভারতীয়দের হাতে এসেছিল। সেই কথা মনে রেখে ওই মহোৎসবের অঙ্গ হিসেবে পালন করা হচ্ছে ‘ঘর ঘর তিরঙ্গা’— স্বাধীনতার এই ৭৫-তম বর্ষে সব ভারতবাসী নিজের ঘরে স্বাধীন ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করে ধন্য হবে। স্বাধীনতা দিবস বা সাধারণতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে পতাকা উত্তোলন করাটা এতদিন ছিল একটা আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। আজ সেই পতাকার সঙ্গে ব্যক্তিগত একটা বন্ধন সৃষ্টি হবে এই ঘর ঘর তিরঙ্গা অভিযানের মধ্যে দিয়ে। দেশবাসীর মনের গভীর থেকে উৎসারিত হবে দেশপ্রেম। খুব ভাল কথা সন্দেহ নেই। কিন্তু যাঁরা এই কথাগুলো বলছেন স্বাধীন ভারতের এই ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা সম্বন্ধে তাঁদের গুরুজিদের কথাগুলো যে ইতিহাসের পাতায় এখনও লেখা আছে!

স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা কীরকম হবে সেই বিষয় নিয়ে ২২ জুলাই ১৯৪৭ কন্সটিট্যুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি-তে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বর্তমানে ত্রিবর্ণরঞ্জিত যে পতাকা আমাদের জাতীয় পতাকা সেটিকে গ্রহণ করার প্রস্তাব সভার সামনে আনেন জওহরলাল নেহরু। সভাপতির আসনে ছিলেন ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ। দীর্ঘ আলোচনায় যাঁরা যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁরা সবাই এই পতাকা-কে সাদরে ও সসম্মানে গ্রহণ করার পক্ষে মত দেন। বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম আর অঞ্চলের প্রতিনিধিদের সর্বসম্মতিক্রমে সেই প্রস্তাব গৃহীত হয়।

সংবিধান সভা বা কন্সটিট্যুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি-তে জনসঙ্ঘ বা হিন্দু মহাসভা বা রাম রাজ্য পরিষদ এদের সমর্থক কোনও একজন সদস্যও বিরোধিতা না করলেও সঙ্ঘ পরিবারের মুখপত্র ‘অর্গানাইজার’ পত্রিকায় ১৭ জুলাই ১৯৪৭-এর সম্পাদকীয়তে লেখা হয়— “‘ভারতের সব দল ও জনগোষ্ঠীর কাছে এই পতাকা গ্রহণযোগ্য হবে’ এই বক্তব্যের সঙ্গে আমরা আদৌ সহমত নই। এটা একেবারেই বাজে কথা। পতাকা জাতির প্রতিনিধিত্ব করে, আর হিন্দুস্থানে একটিই জাতি আছে, হিন্দু জাতি, যার ইতিহাস ৫০০০ বছরের বেশি সময় ধরে অবিরাম প্রবহমান।” [“We do not at all agree that the Flag ‘should be acceptable to all parties and communities in India.’ This is sheer nonsense. The Flag represents the nation and there is only one nation in Hindusthan, the Hindu Nation, with an unbroken history extending over 5,000 years…..”]

আসলে সঙ্ঘ পরিবার স্বাধীনতা আন্দোলনের পূরো সময় জুড়েই ব্রিটিশ সরকারের তাঁবেদারি করে এসেছে। ১৯২৯ সালেই লাহোর কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৯৩০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি তারিখটি স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালন করা হবে আর ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করা হবে। সেই থেকে প্রতি বছর যে পতাকা উত্তোলন করা হত সেটা ছিল কংগ্রেসের পতাকা। সেই পতাকার মাঝের সাদা অংশে চরকার পরিবর্তে সারনাথের অশোকচক্র বসিয়ে স্বাধীন ভারতের পতাকা সংবিধান সভায় অনুমোদিত হয়।

১৯৩০ সাল থেকে দেশে স্বাধীনতা দিবস পালনের এই আহ্বানের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ আরএসএস কী করল? সরসঙ্ঘচালক কেশব হেডগেওয়ার সার্ক্যুলার জারি করে সঙ্ঘের সব শাখাকে জানিয়ে দেন যে আরএসএস ‘ভাগোয়া ঝান্ডা’-কে জাতীয় পতাকা হিসাবে পূজা করবে। হেডগেওয়ারের পরবর্তী গুরু গোলওয়ালকর ১৪ জুলাই ১৯৪৬ তারিখে গুরুপূর্ণিমা সমাবেশে নাগপুরে ঘোষণা করেন— “ভারতীয় (ইন্ডিয়ান) সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত করে গেরুয়া পতাকা। এটি ভগবানের মূর্ত রূপ। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত একদিন এই গেরুয়া পতাকার নীচে সারা দেশ নতমস্তক হবে।” [It was the saffron flag which in totality represented Bharatiya (Indian) culture. It was the embodiment of God. We firmly believe that in the end the whole nation will bow before this saffron flag.”]

আরএসএস মহলে গুরুজি নামে বেশি পরিচিত গোলওয়ালকর তাঁর বিখ্যাত বই Bunch of Thoughts-এ লিখছেন— (যে বইয়ের নির্দেশ সঙ্ঘ পরিবারের সদস্যদের কাছে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য)— আমাদের নেতারা দেশের জন্যে এক নতুন পতাকা নিয়ে এসেছেন। কেন এমনটা তাঁরা করলেন? এটা উদ্দেশ্যহীনভাবে ভেসে চলা আর অন্যকে নকল করার মত একটা ঘটনা… আমাদের দেশ এক প্রাচীন দেশ যার অতীত গৌরবোজ্জ্বল। তাহলে, আমাদের নিজস্ব কোনও পতাকা কী ছিল না? এই শত সহস্র বছর ধরে আমাদের কোন জাতীয় প্রতীক নেই? নির্দ্বিধায় বলা যায়, আছে। তাহলে আমাদের মনে কেন এই অপরিসীম রিক্ততা, কেন এই বিশালাকার শূন্যতা?” [“Our leaders have set up a new flag for our country. Why did they do so? It is just a case of drifting and imitating… Ours is an ancient and great nation with a glorious past. Then, had we no flag of our own? Had we no national emblem at all these thousands of years? Undoubtedly we had. Then why this utter void, this utter vacuum in our minds?”]

আজকে যারা ঘর ঘর তিরঙ্গা আন্দোলনে নেমে পড়েছেন তাদের কী জানা আছে স্বাধীনতা দিবসের ঠিক একদিন আগে অর্থাৎ ১৪ অগস্ট ১৯৪৭ আরএসএস-এর ইংরাজি মুখপত্র অর্গানাইজারএ লেখা হয়েছিল— “ভাগ্যের পদাঘাতে যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা আমাদের হাতে এই তেরঙ্গা [পতাকা] তুলে দিয়েছে বটে, কিন্তু হিন্দুরা একে কোনওদিনই সম্মান করবে না আর স্বীকারও করবে না। ‘তিন’শব্দটিই অশুভ, আর যে পতাকায় তিনটি রং আছে তার খুব খারাপ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়বে এবং যে কোনও দেশের পক্ষে এটি ক্ষতিকর।” [The people who have come to power by the kick of fate may give in our hands the Tricolour but it will never be respected and owned by Hindus. The word three is in itself an evil, and a flag having three colours will certainly produce a very bad psychological effect and is injurious to a country.]

আসলে আজ যারা শাসনক্ষমতা করায়ত্ত করেছে তাদের একটাই লক্ষ্য— গেরুয়া পতাকার নিচে সারা দেশকে নতমস্তক করা। যেমনটা গুরু গোলওয়ালকর বলেছিলেন। সাধারণ মানুষকে ‘ঘর ঘর তিরঙ্গা’ এই স্লোগানের আড়ালে দেশপ্রেমের সুড়সুড়ি দিয়ে গেরুয়া পতাকার নিচে নতমস্তক করানোর খেলা চলছে সেটা বোঝার দিন এসেছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...