Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বাংলা নাটকের দর্শকদের হিন্দি নাটক দেখতে হলে টেনে নিতে পেরেছিলেন ঊষাদি

খেয়ালি দস্তিদার

 



লেখক অভিনেতা ও নাট্য-পরিচালক

 

 

 

ঊষাদির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় আমার মায়ের সূত্রে। আমার মা অর্থাৎ চন্দ্রা দস্তিদারের সঙ্গে ঊষাদির খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল। সেই কারণে ঊষাদির সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও একেবারেই পারিবারিক ছিল। ঊষাদির সঙ্গে আমার প্রথম স্মৃতির কথা বলতে একদিনের কথা মনে পড়ছে। আমি তখন ছোট, মা আমাকে স্কুলে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। ঊষাদিও ওই পথে কোনও একটা কাজে যাচ্ছিলেন। আমি, মা, ঊষাদি আমরা একই গাড়িতে ছিলাম। সেদিন মা আর ঊষাদি অনেক গল্প করছিলেন— নানা পারিবারিক কথা, ওঁদের জীবনের অনেক লড়াইয়ের কথা। কথাগুলো আবছা মনে পড়ছে।

আমাদের আলাপের সেই শুরু। এরপর কয়েক বছর পর থেকেই ঊষাদির নাটক দেখতে শুরু করলাম। ঊষাদির প্রোডাকশনেই আমি প্রথম হিন্দি নাটক দেখলাম। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। বস্তুত, কলকাতার বুকে হিন্দি নাটককে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ঊষাদির অবদান অসামান্য। শ্যামানন্দ জালানও হিন্দি নাটক নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, তবু আমার কাছে কলকাতায় হিন্দি নাটক বলতে ঊষাদির নামই মনে আসে। যে মঞ্চে এতদিন শুধু বাংলা নাটক হত, সেই মঞ্চে উনি হিন্দি নাটক করেছেন। বাংলার বুকে দাঁড়িয়ে বাংলা নাটকের দর্শককে হিন্দি নাটক দেখতে হলে টেনে নিয়ে আসা কম কথা নয়। এটা ঊষাদি করতে পেরেছিলেন। বাংলার নাট্যমঞ্চে উনি হিন্দি নাটককে আলাদা মর্যাদার জায়গায় পৌঁছে দিয়ে গেছেন। একের পর এক উঁচুমানের প্রোডাকশন, সঙ্গে ঊষাদির ডিরেকশন ও পাশাপাশি ওঁর বলিষ্ঠ অভিনয়, সবমিলিয়ে ঊষাদি ছিলেন একেবারে অন্যদের থেকে পুরোপুরি আলাদা।

আমার সঙ্গে আলাপের যে ঘটনাটা বললাম সম্ভবত তার কিছুদিন আগেই ঊষাদি কলকাতায় এসেছেন। ওঁর বাংলায় তখনও একটু হালকা হিন্দি টান ছিল। মুখে সবসময় একটা হাসি লেগে থাকত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হত কী শান্ত একজন মানুষ, অথচ ভেতরে কী ভীষণ জেদ বা রাগ, যেটা সমাজের প্রতি ওঁর দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আসত। সবমিলিয়ে ঊষাদিকে আমার অসাধারণ ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ বলে মনে হয়েছে। একইভাবে স্টেজের ওপর নিজেও ভীষণ বলিষ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করতেন। ওঁর বেশিরভাগ প্রোডাকশনই আমাদের দেখা৷ প্রতি শোয়ের আগে ফোন করতেন, “চন্দ্রাদি আসবেন নাকি?”, “জোছনদা আসুন”। ওঁর প্রথম দিককার নাটকগুলির মধ্যে ‘মহাভোজ’, ‘কোর্ট মার্শাল’ দেখার স্মৃতি মনে আছে। তবে এর কিছু পরের দিকের নাটক ‘রুদালি’, ‘হিম্মত মাই’, ‘মুক্তি’ এইসব নাটকগুলো ঊষাদিকে বাংলার নাট্যমোদী দর্শকদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল।

শেষবার যখন ঊষাদির সঙ্গে আমার দেখা হয়, তখন হাঁটুর ব্যাথাটা ওঁকে বেশ কাবু করে দিয়েছিল। তাও ওঁর মুখের হাসিটা একইরকম অমলিন দেখেছিলাম। লেখালেখি, বক্তব্য, নাটকের কাজ সবই চলছিল। ওইদিন অবশ্য অন্য একটা কাজে ওঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওঁর নাটকের প্রোডাকশন নিয়ে খুব বেশি কথা হয়নি। ওখানে বসে সাধারণ গল্প হচ্ছিল, নিছক পারিবারিক কথা। তখনও জানতাম না এটাই আমাদের শেষ দেখা।

এরকম অনেকদিন গেছে ঊষাদি আমাদের বাড়িতে মায়ের সঙ্গে গল্প করতে এসেছেন। আমিও ওঁদের সঙ্গে বসছি, কিছু কথা বলছি, কিছুক্ষণ পরে উঠে যাচ্ছি, আবার এসে বসছি। মা আর ঊষাদির কথা কানে আসছে। একটা সময় দুজনেই নারীর সম্মান ও অধিকার নিয়ে কথা বলছেন। নাট্যজগতে কী করে মেয়েদের আরেকটু সম্মানের জায়গা দেওয়া যায়- তা নিয়ে সবসময় চিন্তা করতেন ঊষাদি। যে সময়ের কথা বলছি, তখন তো মেয়েদের অবস্থা আরও একটু খারাপ ছিল। মা হয়তো বলছেন, “আপস করলে চলবে না। এই জায়গাটা তোমাকে কেউ সহজে দেবে না।” ঊষাদি শুনছেন, রাজি হচ্ছেন। অর্থাৎ আমি আমার জীবনে দেখা দুজন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বময়ী নারীকে মেয়েদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শুনছি। সেই কথাগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সেদিনও মেয়েদের লড়াই করতে হয়েছে, আজও হচ্ছে। ওঁদের দুজনের সাহসটা আমার জীবনকে খুব প্রভাবিত করেছে, আজও করে। ঊষাদি এই লড়াইটাই সারাজীবন তাঁর নাটকের মধ্যে দিয়ে দেখিয়ে গেলেন।