Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ভয়ের গ্যাসচেম্বার ও আমরা

ভয়ের গ্যাসচেম্বার ও আমরা : অয়নেশ দাস

অয়নেশ দাস

 

The people don’t want war, but they can always be brought to the bidding of the leaders. This is easy. All you have to do is tell them they are being attacked, and denounce the pacifists for lack of patriotism and for exposing the country to danger. It works the same in every country.

–Hermann Göring, Nazi leader 

ভয় পাওয়ানোর তত্ত্ব

এই তত্ত্ব গোয়েরিং প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন এমন নয়। যত দীর্ঘকাল ক্ষমতার রাজনীতি প্রভুত্ব করেছে মানবসভ্যতার ইতিহাসে তত প্রাচীন এই তত্ত্ব। প্রতিটি সবুজ উপত্যকায়, উষর ভূখণ্ডে, উর্বর সমতলে পরিশ্রমনির্ভর ক্ষমতাহীন মানুষের ওপর সহস্র সহস্র বছর রাজত্ব কায়েম রাখার চেষ্টা করে গিয়েছে এই তত্ত্ব। এবং আমরা, এই সমাজ অবশেষে, ধনতন্ত্রের শেষ কয়েকটি দশকে এক চূড়ান্ত সামাজিক ত্রাসের সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছি।

যে মুহূর্তে আমরা জন্মাই সেই মুহূর্ত থেকে আমাদের ওপর ভয় চাপিয়ে দেওয়া হয়। পিতা-মাতার হাত ধরে, শিক্ষালয়ের অলিন্দ ধরে ভয় আমাদের মনের চারপাশে জাঁকিয়ে আসে। শিশুকাল থেকেই আমরা ভয়ের মধ্যে বাঁচাটাকে নিজেদের জীবনে স্বাভাবিক করে নিতে থাকি।

আদিম সমাজে ভয়ের উপস্থিতি ছিল মানুষের মৌলিক অস্তিত্বকে ঘিরে। প্রকৃতিকে ভয় পাওয়াই ছিল নিয়তি। তাই প্রাথমিক অবস্থায় মানুষ আর প্রকৃতির সম্পর্ক ছিল হয় বৈরিতায় নয় আত্মসমর্পণে। কিন্তু মানুষ আপন সৃষ্টিশীলতা দিয়ে ভয়কে বুঝতে শিখছিল। প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতার বদলে মানুষ ক্রমশ অভ্যস্ত হচ্ছিল এক ধরনের অনন্যোজীবী বাঁচায়। কিন্তু ততদিনে তৈরি হয়ে গেছে সমাজ এবং সেই সঙ্গে অবধারিতভাবে একটি শাসকশ্রেণি। এবং ক্ষমতার প্রথম লগ্নেই সেই শাসকশ্রেণি বুঝে ফেলেছিল যে ‘ভয়’ সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার পক্ষে একটি সর্বোৎকৃষ্ট অস্ত্র। চিন্তাবিদ এডমন্ড বার্কের ভাষায়— “ভয়ের মতো আর কোনও আবেগই মানুষের যুক্তিনির্ভর চেতনাকে ধ্বংস করে দিতে পারে না।” আমরা যদি ভালো করে ভাবি তাহলে দেখব যে প্রায় প্রতিটি ধর্মে যে আরোপিত বিধানগুলি রয়েছে তা প্রায় প্রত্যেকটিই কোনও না কোনও ‘ভয়’কে সামনে রেখে সৃষ্ট। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কর্মফলের ভয়।

বর্বর রাজতন্ত্রের যুগ থেকে ক্রমে আমরা প্রবেশ করলাম নেশান স্টেটের যুগে। জাতীয়তাবাদী আবেগে মিশে গেল ভয়ের ব্যবহার। শাসকযন্ত্রের রূপ বদলাল, ক্ষমতার রূপ বদলাল কিন্তু মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার মূল চাবিকাঠি একই রয়ে গেল। এরপর পুঁজিবাদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে এই ভয়ের ব্যবহার সামাজিক চেতনায় অন্য মাত্রা পেয়ে গেল।

 

অ্যামিগডেলার দখল

মস্তিষ্কের প্রতিটি গোলার্ধে অ্যামিগডেলা নামে একটি বাদামদানা থাকে। সমস্ত আবেগসঞ্চারী উত্তেজনার প্রতিক্রিয়ার (ইমোশনাল রেসপন্স) আঁতুরঘর বলা যায় তাকে। এখন এই অ্যামিগডেলার দখল নিয়েই যত কাণ্ড। এমনভাবে রেটরিক যদি তৈরি হয় যা এই অতিসক্রিয় বাদামের দানার ওপর সম্পূর্ণ দখল কায়েম করতে পারে তখন এমন সম্ভাবনা তৈরি হয় যেখানে ইমোশনাল মস্তিষ্ক, লজিক্যাল মস্তিষ্ককে ছাপিয়ে যায়। লেখক ড্যানিয়েল গোলম্যান একেই বলেছেন— ‘অ্যামিগডেলা হাইজ্যাকিং’।

নিউরোসায়ান্টিস্ট জোসেফ ডিল্যুজের মতে আবেগ প্রকৃত প্রস্তাবে একটি অতি জটিল বিষয়। তা রূপান্তরিত এবং পরিবর্তিত হয়, অগ্র-পশ্চাৎ যাতায়াত করে এবং মানুষ তার কল্পনা অনুসারে যত খুশি আবেগ প্রাপ্ত হতে পারে।

মানুষের কল্পনা! তাকেও কি নিয়ন্ত্রণ করা যায়? তাকেও কি একটি বিশেষ গণ্ডির মধ্যে আটকে দেওয়া যায়? তাও সামাজিকভাবে? জ্ঞানকে যদি উধাও করে দিয়ে তার বদলে গেলানো হয় রাশি রাশি একমাত্রিক লজেন্সের গুলি, তা হলে? প্রকৃতিবিচ্যুত মানুষ, সামাজিকতাবিচ্যুত বিচ্ছিন্ন, ঘরের কোণে কুঁকড়ে থাকা বোতাম টেপা মানুষের খর্ব, বিচ্যুত, অশিল্পিত মানুষের কল্পনার বিস্তার হয়ে আসে এমনকি সেই বাদামের দানার থেকেও ক্ষুদ্র। সেই খর্ব, বিচ্যুত, অশিল্পিত কল্পনার ফসল যে আবেগ তা হয় অতিযান্ত্রিক না হয় তা প্যারানোইয়ার নামান্তর। এই আত্মমুখীন আবেগ জন্ম দেয় আত্মসর্বস্ব এক অবিমিশ্র উদাসীনতার। অযুত একক কনসেন্টের মাধ্যমে তা পরিণত হয় সামাজিক কনসেন্টে। প্লেটো যথার্থ বলেছিলেন— ‘উদাসীন অজ্ঞতা আসলে দুর্ভাগ্যের মূল।’ সেজন্য মহম্মদ আখলাকরা যখন নির্মম গণপিটুনিতে খুন হয়ে যান তখন আমরা বাড়িতে বসে ইন্টারনেটে গেম খেলি। লকডাউনের রাস্তায় ১২ বছরের শিশু যখন হাঁটতে হাঁটতে খিদের জ্বালায় প্রাণ হারায়, আমরা তখন ফেসবুকে বাড়িতে বানানো বিরিয়ানির ছবি পোস্ট করি।

 

নজরদারির বোতল

অথচ ১৯১৭ সালে পৃথিবীতে এক অন্য ইতিহাস লেখা হয়েছিল। ভাবা হয়েছিল বোধহয় ধনতন্ত্রের পায়ে বেড়ি পরানো গেছে। পুঁজিবাদ তখন অন্য এক ইতিহাসের পটভূমি রচনা শুরু করে দিয়েছিল। সে অনেক সূক্ষ্ম চিন্তা, সে অনেক শিল্পিত প্রক্রিয়া। একটি অগ্রণী প্রজাতির বামনত্বকরণের শিল্পিত প্রক্রিয়া। এতটাই সূক্ষ্ম সে প্রক্রিয়া যে মাপার আগেই দেখা গেল হাতে ধরে থাকা মাপের স্কেল শরীরের থেকে বড় হয়ে গেছে। সে যাই হোক। মানুষ শুধু বামন হলেও যজ্ঞ পূর্ণ হয় না। মুনাফার প্রান্ত যে অসীম। নিত্যনতুন মুনাফার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা— তার সমস্ত সম্ভাবনাকে যে কো্নও মূল্যে বাস্তবায়িত করা— এবং সেই সম্ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমন যে কোনও সম্ভাবনাকে দুরমুশ করা বা অকল্পিত দূরদৃষ্টির মাধ্যমে আগে থাকতেই তার ব্যবস্থা করা— এই চলেছে খেলা। দিনের শেষে মানুষ তো মানুষ। প্রকৃতির নিয়মেই মানুষ সাধারণভাবে স্বাধীন থাকতে চায়। শিক্ষা ও অর্থনীতিবিদ ফ্লয়েড আর্থার হার্পার বলেছিলেন— ‘যে মানুষ স্বাধীনতার মানে জানে সে সর্বদাই স্বাধীন হওয়ার উপায় খোঁজে।’ তাহলে? তার জন্য চাই আরও, আরও নিয়ন্ত্রণ। চাই আরও আরও ভয়ের কারবার।

পুঁজিবাদ বহুদিন হল আর রাষ্ট্রের নির্ভরতায় বসে নেই। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-এর রূপায়ণের সঙ্গে সঙ্গে এক একটি বৃহৎ কর্পোরেশান নিজেরাই সমান্তরাল ভার্চুয়াল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা যতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার চেয়েও অধিকতর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে ফলিত হল ‘সার্ভালেন্স ক্যাপিটালিজম’। অবরুদ্ধ কল্পনার আর দৌড় কদ্দুর! একদিকে পণ্য-সম্মোহনে চোবানো ‘ডেভেলপমেন্ট’-এর স্বপ্ন; অন্যদিকে একক, বিভাজ্য অতিগণতন্ত্রে ভাসানো ‘ডিজিটাল’ স্বপ্ন। মুনাফাসর্বস্ব ‘ডেভেলপমেন্ট’-এর তোড়ে প্রকৃতি, সমাজ, সংস্কৃতি এমনকি এই গ্রহটাই আজ বিপন্ন। কিন্তু মানুষ একেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে। স্বপ্নে ভেসে মেনে নিয়েছে অন্যটিকেও। মানুষ ভেবেছিল গুগল-এ সে সার্চ করছে; উলটে গুগলই তাকে আগাপাশতলা সার্চ করে ফেলছে— এটা ধরতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাবৎ সমাজকে দেশ, মহাদেশের সীমানা নির্বিশেষে বোতলের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলা গেছে। বোতল থেকে বেরনোর আর উপায় নেই। সে ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র করতে ‘সার্ভালেন্স ক্যাপিটালিস্ট’-রা এমনকি ‘ফেসিয়াল রেকগনিশান সিস্টেম’-এরও হুকুম দিয়ে বসে আছেন। উঠতে-বসতে, এমনকি রমণকালীনও আপনি নিশ্ছিদ্র নজরদারির অধীন। এই সর্বাত্মক নজরদারির বোতলের মধ্যে ভয়ের মাত্রা বাড়িয়ে বা কমিয়ে নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া একটি স্বাধীন মানুষের তুলনায় বোতলবন্দি আপনার আমার ওপর ঢের বেশি কার্যকরী। বোতলে একবার ঢুকে পড়লে আর মুক্তি নাই।

‘দি কালচার অফ ফিয়ার’-এর লেখক ব্যারি গ্লাসনারের কথাই ধরা যাক— ‘আমরা মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ত্রাস উৎপাদনকারী সময়ে বসবাস করছি। এর কারণ অপর্যাপ্ত ক্ষমতা ও অর্থ কুক্ষিগত হয়েছে কিছু ব্যক্তি তথা সংস্থার হাতে যারা এই ভয়ের কারবারটিকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে পারে।’

ভয়ের অভিজ্ঞতা সচেতন মস্তিষ্কেই ঘটে। উৎকণ্ঠা (অ্যাংজাইটি) আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী। ফলে দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকরী। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আপনি একটি বাঘের খাঁচায় পড়ে গেলেন। তখন আপনার ক্ষেত্রে যা হবে তা হল— ভয়। আর আপনাকে একটি নড়বড়ে দরজার জীর্ণ ঘরে রাতের পর রাত রেখে দেওয়া হল আর আপনাকে জানিয়ে দেওয়া হল যে বাইরে একটি মানুষখেকো বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে যে দরজা ভেঙে মানুষ শিকার করতে সিদ্ধহস্ত। এবার আপনার ক্ষেত্রে যা হবে তা হল অনিঃশেষ উৎকণ্ঠা। এটা আরও সহজ ও কার্যকরী কারণ দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতে সত্যিকারের বাঘ না হলেও চলে। ডিল্যুজের কথায়— ‘অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা— এ এমন কিছুর জন্য দুশ্চিন্তা যা আদতে নেই অথবা কখনওই হবে না।’ এমত সোনার অস্ত্রটিকে ব্যবহার করায় কার্পণ্য করেনি কেউই— না রাষ্ট্র, না কর্পোরেশানস।

 

রাজনীতির রেটরিক

এক শ্রেণির রাজনীতিকরা বরাবর এই ভয়ের রেটরিকের খেলা খেলে এসেছে। সেই বিখ্যাত ‘ডেইজি অ্যাটাক’ বিজ্ঞাপনটির কথা উল্লেখ করতেই হয়। যেখানে ছবির মতো পটভূমিতে একটি ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে একটি একটি করে তার পাপড়ি ছিঁড়ছে আর মুখে নয়, আট, সাত… এভাবে গুনছে। গোনাটা কাউন্টডাউন হয়ে যায় আর শূন্য গোনার সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্য বদলে গিয়ে পর্দাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে পারমাণবিক বিস্ফোরণের বীভৎসতা। ভয়ে দর্শকের বুক যখন হিম হয়ে আসে তখনই পর্দায় ফুটে ওঠে আসল উদ্দেশ্য— ‘ভোট ফর প্রেসিডেন্ট জনসন অন নভেম্বর ৩’। ১৯৬৪-র নির্বাচনে লিন্ডন জনসনকে হারিয়ে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যারি গোল্ডওয়াটার জিতলে আমেরিকা অবধারিতভাবে পারমাণবিক ধ্বংসলীলার দিকে এগিয়ে যাবে— এই ছিল বিজ্ঞাপনটির রেটরিক।

আজ ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ব্যাপারে মাস্টারি করে ফেলেছেন। প্রকৃতপক্ষে এই অস্ত্রের সার্থক প্রয়োগেই তাঁর ক্ষমতায় আগমন। সারা পৃথিবীতে চালু ইসলামোফোবিয়ার একজন পতাকাবাহক তিনি। সারা আমেরিকাকে আতঙ্কে ভুগিয়ে ছেড়েছে ট্রাম্পের সংখ্যাহীন রেটরিক— অনুপ্রবেশকারীরা গোটা দেশে ড্রাগস আর হিংসা ছড়িয়ে ফেলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিস্টানদের বিপুল সংখ্যায় সংহার করা হচ্ছে, ইসলামি টেররিস্টরা আবার আমেরিকা আক্রমণ করতে চলেছে ইত্যাদি। এর আগে জর্জ ডব্লিউ বুশ ৯/১১-র ঘটনাটির পরে বেশ কয়েকবছর আমেরিকা যে কোনও মুহূর্তে আক্রান্ত হতে পারে বলে ভয় দেখিয়ে গেছেন। আর তাকে পুঁজি করে আমেরিকা কীভাবে তার অর্থনৈতিক তথা ভূরাজনৈতিক লাভ ঘরে তুলেছিল তা আজ জলের মতো পরিষ্কার।

গোয়েরিং-এর উক্তি দিয়ে শুরু করেছিলাম। নাৎসি জার্মানির উত্থানের পেছনে ছিল অসীম ভয়ের ব্যবহার। সমস্ত জার্মান জনতাকে এই ধোকার টাটি গেলানো হয়েছিল এই বলে যে জার্মানি বিপন্ন। যে কোনও মুহূর্তে আক্রান্ত হতে পারে সীমানা। বারংবার এই মিথ্যা প্রোপাগান্ডা গিলিয়ে গোয়েবেলস বিষয়টিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে চলে গেছিলেন। ফলাফল যা হয়েছিল তা পৃথিবী দাম দিয়ে বুঝে নিয়েছে।

ভারতের মানুষ বিষয়টির সঙ্গে একান্তভাবে পরিচিত। ভারতের সীমানা বিপন্ন ও তার খলনায়ক পাকিস্তান নামক একটি দেশ— ছেদহীন এই রেটরিকটিকে আমরা আমাদের চেতনার অন্তঃস্থলে গ্রহণ করে নিয়েছি। কগনিটিভ সাইকোলজিস্ট রবিন হোগার্থ বলেছিলেন— ‘যখন আমাদের চেতনায় মিথ্যা জরুরি অবস্থার সৃষ্টি করা হয়, তখন যে সব সংশ্লিষ্ট তথ্য আমাদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে ভয় সেসব থেকে আমাদের চোখ দূরে সরিয়ে দেয়। যখনই আমরা ভয় পাই তখনই প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কোনওরকম যথার্থ অনুসন্ধান না করেই হয়-মারো-নয়-মরো প্রবৃত্তি আমাদের চেতনার দখল নিয়ে নেয়।’ সাম্প্রতিক দুনিয়ায় একটা দীর্ঘ সময় ধরে আরএসএসের মতো এত নিপুণভাবে ভয়ের ব্যবহার করতে বোধহয় আমরা বোধহয় খুব একটা দেখিনি। এখানে তাই একইভাবে মুসলিমদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেশি করে দেখানো হয়, হিন্দুরা কিছুদিনের মধ্যেই সংখ্যালঘু হয়ে যাবে, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীতে দেশ ভরে গেছে— নিরন্তর এই ভয় দেখানো হয়।

মোদি সরকার সাফল্যের সঙ্গেই এই ভয় ভারতীয় জনমানসে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। সাভারকর-গোলওয়ালকরের সময় থেকে যার সূত্রপাত এখন তা ভারতীয় সমাজে খোলাখুলি চর্চায় পরিণত হয়েছে। যত্রতত্র লিঞ্চিং ও যে কোনওরকম বিরুদ্ধস্বরকে সামাজিকভাবে রাষ্ট্রবিরোধী তকমায় পুরে ফেলা এখন তাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরাও তাতে অবিরত কনসেন্ট জুগিয়ে চলেছি।

 

পর্দাজুড়ে ভয়

সিনেমা দীর্ঘকাল ব্যবহৃত হয়ে এসেছে ভয় দেখানোর একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে। সিনেমার পর্দায় বিচিত্র এলিয়েনের ভয়, ভাইরাসের ভয়, আমেরিকার মাটিতে ট্যারান্টুলার ভয়, কম্যুনিজমের ভয়, ইস্লামিক টেরোরিজমের ভয় সাধারণ সব ব্যাপার। হলিউড তো এ ব্যাপারে আলাদা জঁর তৈরি করে ফেলেছে। ঠান্ডা যুদ্ধের যুগে অসংখ্য ছবি আমেরিকানদের কম্যুনিজমের ভয় দেখিয়ে এসেছে। সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর একমেরু পৃথিবীতে সিনেমাতে অদৃশ্য শত্রুও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যেমন ‘ইন্ডিপেনডেন্স ডে’ নামের ছবিটিতে এলিয়েন আক্রমণে পৃথিবীর বিপন্নতার রেটরিক নিয়ে আসা হয়েছে। এবং একইসঙ্গে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রই যে পৃথিবীর রক্ষাকর্তা সেটাও প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। শাসক শত্রুও ঠিক করে দেয় আবার রক্ষাকর্তাও ঠিক করে দেয়। আমাদের কিছু করার থাকে না। শুধু অজানিত সেই ভয় মনের মধ্যে গেঁথে থেকে যায়। এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। আবার সাম্প্রতিক ডিজিটাল মিডিয়ামের জন্য তৈরি ছবি ও সিরিজগুলোর পর্যালোচনা করলে দেখা যায় হরর, অ্যাপোক্যালিপটিক, থ্রিলার, সাস্পেন্স— এই জঁরগুলির বাজারে সবচেয়ে বেশি কাটতি। তবে আমরা কি ভেবে নিতে পারি না যে সুদীর্ঘকাল ভয়ের মধ্যে বসবাস করতে করতে মানুষ ভয় পেতে একান্তভাবেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে?

অন্যদিকে বিজ্ঞাপনও চিরকালই মানুষকে ভয় দেখিয়ে এসেছে। ভয় দেখিয়েই সে মানুষকে পণ্যের দাস করে তুলেছে। বিজ্ঞাপনের জগতে সকলি উৎকণ্ঠাময়। বিশেষ পণ্যটি না কিনলেই পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা, সমাজচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা, ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, অসুখে ভোগার আশঙ্কা, এমনকি মৃত্যুর আশঙ্কা। সামাজিক মানও তৈরি করে দেয় বিজ্ঞাপন। দেদারে বিক্রি হতে থাকে ফর্সা হওয়ার ক্রিম, টক্সিক মেকআপ দ্রব্য, কম্বিনেশন ড্রাগস, মৃত্যুকালীন বিমা। ‘জাস্ট’ নামের একটি স্যানিটাইজার সাবান ব্র্যান্ডের প্রিন্ট বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ছে। একটি সদ্যোজাত শিশুকে দুহাতে তুলে নিতে যাচ্ছে মা। ফ্রেমের মধ্যে শুধু মায়ের দুটো হাতই দেখা যাচ্ছে। মায়ের হাতদুটির চামড়ার কোনও অংশই কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। কারণ তা পুরোটাই অসংখ্য আরশোলা ও অন্যান্য পোকায় ঢাকা। নীচে লেখা ‘If you aren’t totally clean, you are filthy.’ ‘টোটালি ক্লিন’ শব্দবন্ধটির যথার্থতাকে প্রশ্ন করার বদলে মায়েদের মনে ঐ আপাত ভয়ঙ্কর ম্যাগনিফায়েড দৃশ্যকল্প এক লহমায় প্রচণ্ড ভয় ঢুকিয়ে দেয়। করোনা আবহের অনেক অনেক আগের বিজ্ঞাপন এটি। কয়েক যুগ ধরে পাগলের মতো হাত ধুতে ধুতে আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি অসংখ্য ভাল মাইক্রোবস। নষ্ট করে ফেলেছি আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা। নষ্ট করে ফেলেছি আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে অনন্যোজীবিতা। ভয়ের আবহে যুক্তিকে দূরে সরিয়ে এইভাবেই একটু একটু করে মুনাফার শ্রীচরণে নিবেদিত আমরা অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বোতলবন্দি বামনে পরিণত হয়েছি। যদিও তাতেও রেহাই নেই।

এখন সবার আগে আপনাকে গিলিয়ে দেওয়া হবে একটি মোবাইল ফোন। সার্ভেল্যান্সের মাধ্যম হিসেবে অতি উন্নত একটি মোবাইল ফোন যখন আপনার কাছে বর্তমান তখন আপনাকে শুধু বোতলে ভরে ফেলাই নয়, বোতলের মধ্যে আপনি কটা আঙুল নাড়াতে পারবেন সেটাও বিজ্ঞাপনই ঠিক করে দেবে। বোতলবন্দি বামন পরিণত হবে প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন, সামাজিকতা-বিচ্ছিন্ন, চেতনা-বিচ্ছিন্ন এক জড়পিণ্ডে।

 

শেষের কথা ও সত্যিকারের বাঘ

কখনও কখনও যদিও সত্যিকারের বাঘ আমদানি করতে হয়। এবং সে বাঘ মারার ওষুধও আগে থেকেই স্থির ও বিক্রি হয়ে যায়। তার দামও আগেই স্থির করা থাকে। কারও কারও মতে ৯/১১-র ঘটনা তার একটি ক্লাসিক উদাহরণ।

পৃথিবী এখন করোনা আতঙ্কে থরথরায়মান। সে আতঙ্কের দাম কত আমরা জানি না। এই আবহে গবেষক জুডি মাইকোভিটস সবার চর্চার মধ্যে আছেন। তিনি অনেকদিন ধরেই মুনাফাকেন্দ্রিক গবেষণা ব্যবস্থা এবং অনৈতিক ভ্যাক্সিন ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছেন। তাঁকে থামিয়ে দেওয়ার হাজারো চেষ্টাও আমাদের জানা। আমি এই বিষয়ে নিতান্তই অজ্ঞ। কিন্তু জুডি যখন বলেন, কোভিড ১৯ ভাইরাসটির তার প্রাকৃতিক অবস্থান থেকে মানুষকে আক্রান্ত করার মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়াটি ঘটতে স্বাভাবিকভাবে অন্তত আটশো বছর সময় লাগে, যদি না ম্যানিপুলেট করা হয়— তখন খটকা লাগে। যখন ভ্যাক্সিন তৈরি করে এমন কিছু বৃহৎ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির লাভের অঙ্ক পর্যালোচনায় আসে, যখন বিল গেটস নামক এক ব্যবসায়ীর যাঁর কোনও মেডিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, অথচ তিনি অধিকাংশ ইমিউনোথেরাপি গবেষণাগারগুলির নিয়ামক হয়ে থাকেন এবং সাতটি করোনা ভাইরাসের পেটেন্ট তাঁরই দখলে থাকে, তখন খটকাটা আরও বেড়ে যায়। খটকাটা আরও বেড়ে যায় যখন শুনি উহানে অবস্থিত বিতর্কিত ল্যাবটির প্রাপ্ত ফান্ডের অধিকাংশটাই আমেরিকান। খটকাটা আরও বেড়ে যায় যখন শুনি অতিমারির সময়ে বৃহৎ পুঁজিগুলোর জন্য বেল আউট প্ল্যান কোভিড ১৯-এর নাম শোনার ঢের আগেই সম্পন্ন হয়ে আছে। তবে কি জঙ্গলে বাঘ ও বাঘ শিকারের বন্দোবস্ত দুটোই করা আছে? এখন সে বাঘ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যথাসময়ে তার শিকারেরও ব্যবস্থা হবে?

কোভিড ১৯… পৃথিবীব্যাপী লকডাউন… ভয় দেখানোর বৃত্তটা আবার ঘুরে ফিরে সম্পূর্ণ হতে চায়। লকডাউনে থাকাটা বোধহয় সেই বোতলের প্রথম স্থূল বাস্তবায়ন। সংক্রামক ব্যাধির আতঙ্কের আবহে পাশের মানুষটিকেও অবিশ্বাস করতে শেখানো হয়ে গেল এই অজুহাতে। সাবানের বিজ্ঞাপনে মায়ের হাত যেমন স্নেহের বদলে নোংরা পোকায় বিজবিজ করছিল তেমনি পাশের প্রিয় মানুষটির অস্তিত্বও যেন ভয়ঙ্কর ভাইরাসে বিজবিজ করছে। দিনের পর দিন নিজেদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার তেরোটা বাজিয়ে ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিজেদের স্যানিটাইজ করতে করতে প্রতিদিন একটু একটু করে দুর্বলতর হয়ে পড়ব। ভুলে যাব শেষ কবে আকাশ দেখেছি। এখন থেকে কয়েক কোটি প্রকৃত প্রস্তাবে বোতলবন্দি আণুবীক্ষণিক বামনকুল জড়পিণ্ডের মতো আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বেঁচে থাকবে। মাথাটা ঝিমঝিম করে। বুঝতে পারছি স্নায়ুগুলো বিকল হতে হতে জড়ত্বের দিকে এগিয়ে চলেছে। শিশুরাও আর জেগে নেই। চারিদিক নিস্তব্ধ। শুধু জীর্ণ দরজায় করোনা নামক বাঘটির আঁচড়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।