এবার বাদ ডারউইন: সিলেবাসে সংঘের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 



প্রাবন্ধিক, শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী

 

 

 

গরুর নিঃশ্বাসে অক্সিজেন, দুধে সোনা বা গর্ভসংস্কারের মত আজগুবি কথা এই নতুন ভারতে বিনা লজ্জায় উচ্চারণ করা যায়। হিন্দুরাষ্ট্র এই পশ্চাৎপদ চেতনা ছাড়া গড়ে উঠতে পারে না। অন্ধভক্তি, কুসংস্কার আর ঘৃণার সংস্কৃতিতে যে ভারত গড়ে উঠবে, সেখানে ডারউইনের উপস্থিতি শাসকের পছন্দ হবে না তা বলাই বাহুল্য

 

সিলেবাসকে যৌক্তিক (rationalised) করা ও শিক্ষার্থীদের উপর পাঠ্যক্রমের বোঝা কমানোর দোহাই দিয়ে দশম শ্রেণির সিলেবাস থেকে এনসিইআরটি এবার বাদ দিয়ে দিল ডারউইনের যুগান্তকারী তত্ত্ব ‘বিবর্তনবাদ’। এই একই যুক্তিতে এর আগে ইতিহাসের সিলেবাস থেকে বাদ পড়েছিল হিন্দুত্ববাদীদের চক্ষুশূল মুঘল রাজতন্ত্র, দেশভাগ, গান্ধিহত্যা, শিল্পবিপ্লব এবং ঠান্ডা যুদ্ধের মত বিষয়গুলি। বংশগতি ও বিবর্তনবাদ মিলিয়ে এতদিন একটা পাঠ-একক থাকলেও নতুন সিলেবাসে বিবর্তনবাদের নাম ও নিশান থাকবে না। এখন থেকে এটাই বাস্তবতা যে ডারউইন ও তাঁর তত্ত্ব সম্পর্কে না জেনেই একজন শিক্ষার্থী দশম শ্রেণির পরীক্ষা পাশ করবে। মজার কথা হল, যে করোনা অতিমারির দোহাই দিয়ে সিলেবাস থেকে ডারউইন বিদায়পর্ব ঘটানো হল সেই অতিমারির কারণ হিসাবে নোভেল করোনা ভাইরাসকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ভাইরাসের জন্ম কিন্তু সেই প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদেরই ফসল যা ডারউইন তার বৈপ্লবিক তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন।

বিবর্তনের ধারণা শুধু একটা পাঠ-একক নয় বরং যে মৌলিক ধারণার উপর আধুনিক জীববিজ্ঞান দাঁড়িয়ে রয়েছে তার অন্যতম। তাই আজ মানবসমাজের অস্তিত্বের কাছে যে সমস্ত চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে তাকে অতিক্রম করতে ডারউইনের বিবর্তনবাদ এক অবিচ্ছেদ্য ধারণা। আবহাওয়ার পরিবর্তন বা জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠা বা ভবিষ্যতের অতিমারি— বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করে এক পাও এগোনো সম্ভব নয়। আমরা এই তুঘলকি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশের ১৮০০ জন বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানকর্মী যে খোলা চিঠি লিখেছেন তাকে সমর্থন করে তাদের সুরে বলতে চাই—

Knowledge and understanding of evolutionary biology is important not just to any sub-field of biology, but is also key to understanding the world around us.

 

ধর্মের ধ্বজাধারী ও পুরোহিততন্ত্রের হাতে ডারউইন-তত্ত্বের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নতুন নয় বরং তার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বাইবেলের জীব সৃষ্টির আখ্যান যেহেতু বিবর্তনবাদের বিপ্রতীপে অবস্থান করে তাই এই তত্ত্ব প্রকাশিত হওয়ার পর প্রথম বিরোধিতা আসে চার্চতন্ত্রের পক্ষ থেকে। খ্রিস্টধর্মে জীবসৃষ্টির ইতিহাস (creationism) বলে যে, পৃথিবীতে যে-সমস্ত জীব রয়েছে তা সেইভাবেই ইশ্বর সৃষ্টি করেছেন। এই ইশ্বর-সৃষ্টি তত্ত্বে বিবর্তনের এবং যোগ্যতমের উদবর্তনের কোনও প্রশ্নই নেই। আজকের ইউরোপে ডারউইন-তত্ত্ব পড়ানো হলেও তার বিরোধিতাও প্রবলভাবে আছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে এই বিরোধিতার প্রাবল্য আরও বেশি। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের যে সমস্ত রাজ্যে দক্ষিণপন্থী রিপাবলিকান ও কনজারভেটিভদের প্রভাব বেশি সেখানে ডারউইন-তত্ত্বকে সিলেবাস থেকে সরানোর জন্য একাধিক মামলা হয়েছে। মুসলিম দুনিয়ার ছবিটাও আলাদা কিছু নয়। মধ্য এশিয়ার সৌদি আরব, ওমান, আলজেরিয়া, মরক্কো ও পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তক থেকে ডারউইন বহু আগেই বাদ। মিশর ও তিউনিসিয়াতে একটি অপরীক্ষিত, অপ্রমাণিত হাইপোথিসিস হিসাবে বিবর্তনবাদকে সিলেবাসে রাখা হয়েছে। বহু জায়গায় এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে ফতোয়া পর্যন্ত জারি করা হয়েছে।

ভারতে এনসিইআরটি কর্তৃক সিলেবাসকে যৌক্তিককরণের নামে ডারউইন-তত্ত্বকে বাদ দেওয়ার অনেক আগে থেকেই এই বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রচার চলছে। ২০১৮ সালে বিজেপি সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের (এখনকার শিক্ষামন্ত্রক) মন্ত্রী সত্যপাল সিং সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘Darwin theory is scientifically wrong.’ সত্যপালের বয়ান অনুযায়ী ইশ্বর পঞ্চভূত থেকে মানব সৃষ্টি করেছেন। এজন্য প্রথম দিন থেকে মানুষ ‘মানুষ হিসাবে’ বিরাজমান। আর কেউ বানর থেকে মানুষে রূপান্তরিত হতে দেখেননি তাই শিক্ষার্থীদের স্বার্থে সিলেবাস সংশোধন করে ডারউইন তত্ত্বকে বাদ দেওয়া উচিত। এই ‘স্ববিজ্ঞাপিত’ বিজ্ঞানবোদ্ধার এহেন কথার পেছনে আর একটা সূত্র লুকিয়ে আছে যা আমাদের জানা দরকার। ডারউইনের তত্ত্বের বিপরীতে এক সনাতনী জীব সৃষ্টির রহস্য ও তার ব্যাখ্যা প্রথম উপস্থিত করেন অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর জি নাগেশ্বর রাও বিজ্ঞান কংগ্রেসে এক প্রবন্ধের মধ্যে দিয়ে। সেখানে কোনওরকম যুক্তি, তর্ক ও প্রমাণ ছাড়া বিবর্তনবাদের হিন্দু তত্ত্ব উপস্থিত করেন যার আনুষ্ঠানিক নাম দশাবতার তত্ত্ব।

হিন্দু ধর্মে বিষ্ণুর দশাবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আখ্যান। অতি সহজ কথায়, হিন্দু ধর্মে জগৎসংসারের পালনকর্তা ভগবান শ্রীবিষ্ণু যুগে যুগে (সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি) বিবিধ অশুভ শক্তি ও বিপদ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে দশবার বিভিন্ন অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেছেন (বা করবেন)। এই দশ অবতার হল— মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নরসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ, গৌতম বুদ্ধ, কল্কি (আঞ্চলিক তারতম্যে এই তালিকায় কখনও কৃষ্ণের পরিবর্তে বলরাম, গৌতম বুদ্ধের পরিবর্তে জগন্নাথের নাম ব্যবহার করা হয়)। জি নাগেশ্বর রাও-এর মত মানুষেরা এই দশাবতার তত্ত্বের মধ্যে দিয়ে সূক্ষ্মভাবে ডারউইনের বিকল্প ভাষ্য তৈরি করার চেষ্টা করছেন। তাঁদের মতে মৎস্য জলজ প্রাণী, কূর্ম জলে ও স্থলে অর্থাৎ উভচর, বরাহ জঙ্গলের— তুলনায় উন্নত প্রাণী, বামন খর্বকায় আদিমানব, পরশুরাম প্রাচীন অস্ত্রধারী মানব, রাম প্রথম উন্নত মানব, কৃষ্ণ সর্বগুণসম্পন্ন মানব ইত্যাদি। এই প্রমাণ ও যুক্তিহীন গল্পকে হিন্দু বিজ্ঞান ভাবনা বলে প্রচার করা হচ্ছে।

 

বিষয়টা আজ আর শুধু সিলেবাস থেকে ডারউইনের বিবর্তনবাদ সরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংঘ পরিবারের মতাদর্শ মেনে ‘প্রাচীন ও সনাতন ভারতের সমৃদ্ধ জ্ঞান ও পরম্পরায় আলোকিত’ এক বিজ্ঞানভাবনাকে ছাত্রদের সামনে উপস্থিত করা হচ্ছে যা বিজ্ঞানচর্চার মূলগত ভাবনা অর্থাৎ ‘পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ-সিদ্ধান্ত’-কে অস্বীকার করে। এই নতুন ভাবনার নাম দেওয়া হয়েছে ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম যা যুক্তির পরিবর্তে বিশ্বাসকে জ্ঞানচর্চার মাপকাঠি মানে। এই বিজ্ঞানভাবনার একদিকে রয়েছে মেঘনাদ সাহা কথিত ‘সব ব্যাদে আছে’ সিনড্রোম। পশ্চিমি দেশগুলোর থেকে যে-কোনও মূল্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে আধুনিক সভ্যতার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারকে আত্মসাৎের নির্বোধ চেষ্টা। গান্ধারীর শতপুত্র টেস্টটিউব বেবি, গণেশের মাথা প্লাস্টিক সার্জারি, পুষ্পক রথ প্রথম বিমান, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সঞ্জয়ের ধারাবিবরণী দূরদর্শন, ইত্যাদি। কোনওরকম সাক্ষ্য-প্রমাণ,প্রত্নতাত্ত্বিক বা পুথিগত আলোচনা ছাড়াই এই ধরনের আজগুবি ভাবনাকে সনাতন ভারতের ‘অভূতপূর্ব’ বিজ্ঞান উৎকর্ষতা হিসাবে চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে রয়েছে কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ, বিভিন্ন আইআইটি, ইউজিসির মত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অপবিজ্ঞানকে গবেষণার বিষয়বস্তু বানানো। গোমূত্র, গোবর, জ্যোতিষশাস্ত্র, পঞ্চগব্যের গুণাগুণ বিচার আজ নতুন ভারতের বিজ্ঞানচর্চার প্রতীক। প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের নামে সংঘ পরিবারের অ্যাজেন্ডাকে প্রতিষ্ঠা করা যায় তার আদর্শ উদাহরণ হতে পারে খড়্গপুর আইআইটি প্রকাশিত ক্যালেন্ডার (২০২২) যেখানে ১২ মাসে বারোটি গল্পকথা বলে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে আদিকাল থেকে ভারতে বৈদিক সভ্যতা রয়েছে, আর্যরা এদেশের আদি বাসিন্দা। এই ক্যালেন্ডার অনুসারে দ্রাবিড় ও আর্য সভ্যতা আলাদা কিছু নয়। ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের নতুন ‘আবিষ্কার’ বৈদিক গণিত। গরুর নিঃশ্বাসে অক্সিজেন, দুধে সোনা বা গর্ভসংস্কারের মত আজগুবি কথা এই নতুন ভারতে বিনা লজ্জায় উচ্চারণ করা যায়। হিন্দুরাষ্ট্র এই পশ্চাৎপদ চেতনা ছাড়া গড়ে উঠতে পারে না। অন্ধভক্তি, কুসংস্কার আর ঘৃণার সংস্কৃতিতে যে ভারত গড়ে উঠবে, সেখানে ডারউইনের উপস্থিতি শাসকের পছন্দ হবে না তা বলাই বাহুল্য।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4584 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...