Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

স্বপ্ন দেখার মহড়া

ঋতু সেনচৌধুরী

 

“আমরা চিৎকার করি

রাতের বাগান থেকে সাড়া দেয় ফুল …

এভাবে কোথাও গেলে রাত হয়ে যাবে …”

সন্ধে সন্ধে ফিরে আসি আমরা। প্ল্যাটফর্মের নির্দিষ্ট জায়গায় থেমে যায় লেডিজ কম্পার্টমেন্ট। তারপর বাস-রাস্তা, রিক্সা-গলি পেরিয়ে বাড়ি। রোজ। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা। একদিন (হয়তো অন্যদিনেও) ঝমঝমিয়ে গড়িয়ে যায় রেলগাড়ি। থামে না। চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে উল্টো দিকে। মহিলা কামরা। তুমুল চ্যাঁচামেচি। ট্রেন থামছে না। সবাই দাঁড়িয়ে হাততালি-হিহি-হাহা। তারপর ছাতা, ব্যাগ, পেন, লবঙ্গ-কৌটো, মোবাইল– ছোঁড়াছুঁড়ি এ ওর দিকে। উড়ে যাচ্ছে। মাসি এতক্ষণ কুচিকুচি করে লালশাক কাটছিল– এখন হাসতে হাসতে উড়িয়ে দিচ্ছে কুচোনো শাক। আজ একটাও নখপালিশ বিক্‌কিরি হয়নি– এদিকে শান্তাদি সবার গায়ে নখপালিশের উল্কি করতে লেগেছে… লাল, হলুদ, সবুজ, কালো, গোলাপি উল্কি, নখ পালিশ– একটার পর একটা রামধনুর মতোএখানে টানেল এল কোত্থেকে? হঠাৎ সব চুপ মেরে গেল। কী যেন সব হচ্ছে– নাচ? ঠাহর করা যাচ্ছে না– কী হচ্ছে যদি বোঝাই না যায় তো কিসের বলাবলি? ট্রেনটা চলে যাচ্ছে। দূরে। নাগালের বাইরে।

কে যায়? কার লাগালের বাইরে? সাজানো গোছানো কার্যকারণ– একই ভাবে হতে হতে ফেটে যায়– চারিদিকে ছড়িয়ে পরে পা, হাত, বুক, কোমর। কী ধরব? কোথায় ভরব? আশ্চর্য – ইতস্তত – লক্ষ্যহীন। আকাশ জুড়ে লক্ষ লক্ষ পতাকা – উড়তে উড়তে – জড়িয়ে যাচ্ছে একটার সঙ্গে অন্যটা – আলাদা করে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। হয়ত যা ঘটেছে তা আমাদের চেনা নয়। হয়ত আমরা সবসময় এসব ভাবি না। তাই রোজকার সাদামাটা ভাষায় এই ধরনের অসম্ভব চিন্তাকে ঠাঁই দেওয়ার জায়গাও নেই। ভাষা-চালনার এই ব্যর্থতাকে উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে অনেকগুলো কথা উঠে আসে। যা নেই (অন্য একটা রঙ) বা যা আছে অথবা যে ভাবে আছে সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না (চার নম্বর প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে যে ট্রেন তার মধ্যে যা যা হচ্ছে…) তাকে বর্ণনা করার ঠিকঠাক ভাষাও আমাদের নেই। ভাষা, যা কিছু ঘটে বা যা কিছুটা কল্পনা করা যায় তার মধ্যে, সীমাবদ্ধ। সাধারণ এই কথাটার অন্তরালে নিরন্তর এক দমন কাজ করে। এই মুহূর্তে আমাদের সামনে যা যা কিছু আছে, বা আগে ছিল, বা পরে থাকবে বা অন্য কোথাও আছে– তা ব্যক্ত করা যাবে– কিন্তু যা নেই তা ভাষাতেও নেই। “যা নেই” তার দিকে এত “ঝোঁক”ই বা কিসের?

এমন করলে, “যা আছে” তা যে… ঘুচে যাবে জানি। প্রশ্ন হল যা আছে তাতে কার লাভ? একটু রকমফেরে কিছু মানুষের (উচ্চবিত্ত/ বর্গ/ জাত/ শ্রেণী, সাদা/ খয়েরী/ হলদে/ মোলায়েম চামড়া, খ্রিস্টান/ হিন্দু, পুরুষ-বিষমকামী-পূর্ণাঙ্গ, প্রাপ্তবয়স্ক, শিক্ষিত, শহুরে) লাভ আর অন্য সব কম-মানুষের (নিম্ন বিত্ত/ বর্গ/ জাত/ শ্রেণী, কালো/খসখসে চামড়া, মুসলমান, মহিলা, সমকামী, বিকলাঙ্গ, বৃদ্ধ, শিশু, পাগল, অশিক্ষিত, গ্রাম্য) ক্ষতি। আমরা সবাই রোজকার জীবনে শ্রেণী, বর্ণ, জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, যৌন-প্রবণতা, বয়স, স্বাস্থ্য কেন্দ্রিক ছোট বড় নানান বৈষম্যের শিকার। মজার কথা এই যে কেউ এর বাইরে নয়– বঞ্চনার মধ্যে দিয়ে আমাদের নিত্য যাতায়াত। মানব সভ্যতার ভালো-মন্দ সমস্ত উপাদান বঞ্চনায় ভর করেই তৈরি হয়েছে। বঞ্চনা সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে আমরা বেশিরভাগ সময় তার প্রত্যেকটি আকরকে পৃথক করে ভাবি। মানুষ যেহেতু আলাদা করে শ্রেণী-বর্ণ-লিঙ্গ-জাতি ভেদে আক্রান্ত হয়, আমরা ভাবি বঞ্চনার সার্বিক ঘেরাটোপ, যাকে পেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব, ভেদাভেদের রাজনীতিকে প্রতিহত করে। মনে রাখার– বৈষম্যের কোনও প্রকাশই বিচ্ছিন্ন নয়– উচ্চাবচ বিন্যাসের এক বৃহত্তর পরিসরে মানুষ বিভিন্ন কারণে নিপীড়িত হয়। শোষণ-নিপীড়নের অক্লান্ত ইতিহাস প্রতিফলিত হয় আমাদের প্রত্যেকটি চিন্তায়, কাজে, ভাষায়, প্রকাশ-ভঙ্গিমায়।

আজকের আলোচনা মূলতঃ ভাষা নিয়ে– ভাষার মধ্যেকার অসাম্য অপমান নিয়ে। আমি প্রাণপণ অন্যরকম ভাবতে চাইলেও চলতি ভাষার টানে আহ্লাদে-আনন্দে, রাগে-দুঃখে, উচ্চারণ করি এমন সব কথা (বা না-বলা ইঙ্গিত) যা আমি কখনও বলতে চাই না। ইতর–চামার, কুত্তা-জানোয়ার, শালা, তুই-তোর বোন-মা-মাকালী, একশ আটবার, মেয়েলী-শরীরী, ডাইনি-লক্ষ্মী, শাড়ী-চুড়ি, তালি-খিস্তি, কাটা-গোটা, খোজা-বাঁজা, নাচ-মুজরা… ছাড়াও কত আপাত শান্ত, শাশ্বত– নদ-নদী, লতা-মহীরুহ, সুয়োরানী-দুয়োরানী, ঐক্য-একতা, করুণা-সম্মান, জাতীয়-দলীয়, সূচক-ব্যঞ্জক, ঋণ-ভর্তুকি, রাষ্ট্র-সন্ত্রাস, প্রথম বিশ্ব-তৃতীয় বিশ্ব-দুনিয়াদারির শব্দে শব্দে গ্লানি-অপমান।

এইমতো অবস্থায় কেউ কেউ ভূতগ্রস্ত ঘুরে বেড়ায় যা নেই তার সন্ধানে। কল্পনাই পরিত্রাণ, কল্পস্বর্গই পথ। বৈষম্য-বিরোধী রাজনীতি সর্বতই কল্পনাশ্রয়ী– শ্রেণী, রাষ্ট্র, পরিবার, ধর্ম, লিঙ্গের অসহ প্রকল্প পেরিয়ে ক্রান্তিকারী দেশে দেশে আলোর উৎসব। এমন উৎসবে সামিল হতে চান নারীবাদীরা। নারীবাদী কল্পস্বর্গ অন্যান্য সাম্যকামী আন্দোলনের জন্যেও নতুন পথের নিশানা এঁকে দেয়। জনপরিসরে সমানাধিকার– প্রথম তরঙ্গের দাবি– যা নারীবাদী চিন্তা-আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যায় দ্বিতীয় তরঙ্গে– শেখায় আইনত অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে পিতৃতন্ত্রের প্রাধান্যকারী বয়ান নিয়েও ভাবতে হবে– ভাবতে হবে যৌনতার কথা। সমানাধিকারের আশ্বাস নিয়েও ঘরে-বাইরে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে মেয়েরা। একদিকে গায়ের জোরে বা প্রেম-ভালোবাসায় তার অস্তিত্বকে মা/স্ত্রী/বোন/কন্যার ছাঁচে বেঁধে ফেলার সর্বব্যাপী চেষ্টা– অন্যদিকে পারিবারিক ভূমিকাকেই মুখ্য মেনে জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে নারীকে পরিবারের বিধি-নিয়মে বিচার করা। এসবের গোড়ায় পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ আর তার বদ্ধমূলে নারীবিদ্বেষ (misogyny)। বলাবাহুল্য নারীবিদ্বেষ হিংসার ভয়াল দিকগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। খুঁটিয়ে দেখলে হিংসাত্মক ঘটনাগুলো দৈনন্দিন। লিঙ্গ-হিংসার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ছাপ আমাদের প্রতিটা কাজে। এই নিয়ে বিশদে বলার অবকাশ থাকলেও ফিরে আসি ভাষা প্রসঙ্গে।

কোন ভাষায় কথা বলি আমরা, ভাবি, স্বপ্ন দেখি, গান গাই…? ভেবে দেখি না এই ভাষার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যৌন হিংসা-নারীবিদ্বেষ। হাসি-তামাশা, গালি-গালাজ, প্রবাদ-প্রবচন, সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেও ঘুরে ফিরে সেই একই নির্দেশ। সমাজে যা কিছু ঘটছে– যেভাবে ঘটে আসছে তারই প্রেক্ষিতে তৈরি হয় ভাষা। শব্দের গায়ে গায়ে শ্যাওলা– লেগে থাকে নানান অনুষঙ্গ, সামাজিক ব্যবহারের ছাপ। সমাজ পরিবর্তনের তালে তাল মিলিয়ে হয় শব্দ-বদল। নতুন চুনকামের পরেও পুরনো দেওয়ালে ফুটে ওঠে সবুজ আভা। শব্দের ইতিহাস সহজে মুছে ফেলা যায় না। ভাষা কি তাহলে অবরুদ্ধ করে মুক্তির পথ? তাহলে নারীবাদী বা অন্যান্য মুক্তিকামী মানুষ কীভাবে কথা বলবে? সমস্যাটি গভীর– চটজলদি কোনও উত্তর নেই।

কীভাবে পৌঁছব এমন একটা দিনে যেখানে কোনও বৈষম্য নেই! এই মুহূর্তে তার রূপরেখা দিতে পারছি না কেউ। নির্দিষ্ট রূপরেখা দিলেই– তা আবার এসে পড়বে চলতি ভাষার কবলে। এ এক আশ্চর্য কূটাভাস। যে মুহূর্তে কর্তৃত্বকারী ভাষায় বলতে চাইব কল্পনার কথা– সেই মুহূর্তে কল্পনা খর্ব হবে– পরিণত হবে বাস্তব ভাষায়। তাহলে কীভাবে নির্দিষ্ট হবে রাজনীতির পথ? নারীবাদীরা বলবেন রাজনীতির পথ পুরোটাই নির্দিষ্ট হতে পারে না। প্রতি মুহূর্তের চিন্তা-কাজের মধ্যে দিয়ে ঠেকে ঠেকে, মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে পথ চলা। আমাদের ম্যানিফেস্টো আছে– অসংখ্য ম্যানিফেস্টো– কিন্তু তার ভার নেই– চোখ রাঙানি নেই। প্রচলিত ভাষার মধ্যে দিয়ে নিরন্তর একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া– প্রত্যেকটি দিন গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেকটি মুহূর্ত রাজনৈতিক।

দৈনন্দিনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ভাষার দমনকে পেরিয়ে যাওয়া– আবার ফিরে আসা– সে ফিরে আসা কখনওই আগের মতো নয়– আগের মতো আক্রান্ত হই না আর– একটু একটু করে সরে যাই– দূরে। লেখার মধ্যেও অনেক সময় এমন সব দূরবর্তী মুহূর্ত তৈরি হয়। বিশেষ কোনও কোনও ঘরানার নারীবাদীরা বলবেন ‘মেয়েদের লেখা’, ভাষার মধ্যে পিতৃতন্ত্রের দখলদারি থেকে মুক্ত হবার সম্ভাবনা বহন করে। ভাষা-ব্যবস্থার দমনমূলক নিয়ম-বিধিকে অগ্রাহ্য করে মেয়েলি ভাষা আমূলে বদলে দিতে পারে চিহ্ন-তত্ত্বের প্রতিটি শর্ত। অ-সম্ভব এই দাবি। নিয়ে যেতে চায় সেই কল্পনার স্বর্গে। “যারে যায় না পাওয়া তারই হাওয়ায়” পাল তুলে এক নিরুদ্দেশ যাত্রা। এখানে ‘মেয়ে’ ধারণাটি শারীরিক নয়। মেয়ে বা মেয়েলি বাঁধাগতে পুরুষালি আগ্রাসনের বাইরে অন্য কোনও সম্ভাবনার ইঙ্গিত। এই বিশেষ সংখ্যাটিতে লিখতে গিয়ে ‘মেয়েদের লেখা’-র বৃহত্তর ক্ষেত্রটি মনে করে নিতে চাইছি।

তবে তার আগে একবার স্মরণ করে নেওয়া লেখালেখির জগতে ‘মেয়েদের’ লেখাকে কেন্দ্র করে নানান রাজনীতির কথা। সাধারণত ভাষা/সাহিত্য/সমাজ/বিজ্ঞানচর্চায় মেয়েদের লেখাকে সঠিক গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাদের রচনাগুলি লঘু, অযৌক্তিক, আবেগপ্রবণ বলে খাটো করা হয়েছে বারবার। হাস্যকর যুক্তিতে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে চিন্তাশীলতার পরিসর থেকে। এই ধরনের বাধা বিপত্তি পেরিয়ে মেয়েরা তাদের লেখার ক্ষমতাকে প্রমাণ করেছেন। প্রচলিত বয়ানের মধ্যে তাদের লেখা জায়গা করে নিয়েছে নিজ নিজ গুণে। এর ফলে ব্যক্তি লেখিকারা সফল হলেও নারী-পুরুষ বৈষম্যের সর্বব্যাপী কাঠামোর তেমন হেরফের হয়নি। ভাষার নির্মিতিতেও বৈষম্য-বিরোধী কোনও রদবদল হয়নি। কারণ মেয়েদের লেখা মানেই নারীবাদী নয়, অধিকাংশ মেয়েরাই ভাষার লিঙ্গমূলক অবদমন নিয়ে চিন্তা না করে– মানিয়ে গুছিয়ে– কিছুটা স্থান অর্জন করে নিতে চান। স্থান অর্জন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বলবার মতো জায়গা তৈরি না হলে বলা যায় না কিছুই। শুধু সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে যাওয়া– যে স্থানটি অর্জিত হল সেটা কেমন? তা যদি ভেদাভেদপূর্ণ হয়– বদলে ফেলতে হবে। বদলের ভাষা খুঁজতেই স্বপ্নের অবতারণা। যা নেই তার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন মেয়েরা দেখতে পারে। আগেই বলেছি ‘মেয়ে’ এখানে একটি ধারণা– যা শরীরের মধ্যে আবদ্ধ নয়। মেয়েদের লেখা– শুধুমাত্র নারী লিঙ্গের লেখা নাও হতে পারে। ভাষার আগ্রাসন, যা গঠনগতভাবে পুরুষালি, পেরিয়ে স্বপ্ন দেখার মহড়ায় অনেক লেখাই মেয়েলি হয়ে ওঠে।