হত্যা দৃশ্য

কল্পর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়

 

(১)

তারপর এখানে আর ভালোবাসা হবার নয়, নয় বলেই যেন ইনফিনিটিতে প্রাণবল্লম গুটিয়ে ফিরছেন জাদুকর। তার দীর্ঘ ছায়া পড়ছে মাঠে। ক্রমে গাছে গাছে কমে আসছে সালোকসংশ্লেষ, বাতাসে শ্বাসবায়ু কমছে কি? সে বড় করে শ্বাস নেয়, ঠিক বুঝতে পারে না। ভালোবাসার হত্যা দৃশ্য দেখবে বলে সে একটা হুইসেলের শব্দে রেল লাইনের পাশে এসে দাঁড়ায়। এখন বিকেলের রং পটুয়াপাড়ার মেটে হাড়ির মতো লাল, বাস্তবিক এরকম আলোতেই ঋচিকার কানের লতি এক এক দিন লাল হয়ে যেত, হাসলে টোল পড়ত দুই গালে, কপালে অলক চূর্ণ। ১৯৯২ সালে বিম্বওষ্ঠে যন্ত্রণার দাগ করে দেওয়ায় তার কত অনুতাপ হয়েছিল সে মনে ভাবে আর ভাবতে পারে না, ঝমঝম শব্দে দ্রুত চলে যায় ট্রেন, সে সম্বিত ফিরে পায়, ওই তো রেল লাইনে চিকচিক করছে মৃতার সিন্দুর চূর্ণ। আবার সব ব্যর্থ, শান্ত ও কি ধীর, সে আবিষ্কার করে যে সে ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে প্রেমের বারুদ গুণ, যেন দেশলাই জ্বলে গেছে বহুকাল আগে, এখন অন্তরলোকে শুধু অনন্ত চিতাকাঠ দাউ দাউ জ্বলে, তবে আগের মতো তাপ বিলোয় না।

 

(২)

–তোমার ভালো লাগছে?

উত্তরে খারাপ ছেলে, মাথা নাড়ে, খারাপ মহিলা তার হাত বুকে টেনে নেয়।

তুমি একটা আস্ত আনাড়ি, মহিলা নিজেই উদ্যোগী হয়।

সে ভাবে রমণীরা আসলে এক যৌন উট, তাদের ছায়ায়, শরীরের সমুদ্র গর্জন স্তব্ধ মরুভূমি হয়ে যায়…

তোমার পছন্দ হয়েছে?

খারাপ ছেলের পছন্দ হয় না, পৃথুল স্তন তার পছন্দের তালিকায় নেই।

কিন্তু এসব কথা সে বিবসনাকে মুখের ওপর বলতে পারে না, ফলে আবার মাথা নাড়ে।

তবে এসো।

সে ভাবে নিষিদ্ধ পিপাসা নিয়ে, পুরুষেরা ঘোড়ার কঙ্কাল…

ক্রমে তার কোমর ব্যথা ব্যথা করে, সেই কবে তার বাবা তাকে মহাবীর ব্যায়াম সমিতিতে ভর্তি করে দিয়েছিল, তার ডন দিতে ভালো লাগত না, যেমন এখন ভালো লাগছে না ঋচিকার এই আরও চাই… আরও চাই ভাব… সে কল্পনার সুবিধার জন্য আলো নিভিয়ে দেয়।

সে সব জায়গায় হেরে যায়, আজ সে হারবে না, সে বরং অন্যমনস্ক হতে চেষ্টা করে, একটা সবুজ মাঠ, ফুটবল ম্যাচ, উত্তেজনা, স্নায়ু, বার বার গোলে আছড়ে পড়ছে বল, আর সে একবার ডান দিকে ঝাঁপিয়ে একবার বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে, ফিস্ট করে ক্রসবারের ওপর দিয়ে উঁচু করে বল পাঠিয়ে দিচ্ছে মাঠের বাইরে।

 

(৩)

তুমি আবার ঘুমের ওষুধ খেয়েছ?

হ্যাঁ, খুব লো ডোসের কয়েকটা…

জেনেও আমি রাগ করি…

নেশা তো করিনি… শুধু একটা পরীক্ষা…

বিবাহিতা ঋচিকা এসব কথা শুনতে পায় না, সে তার ঠোট কামড়ে রক্ত বার করে।

তারপর সেখানে অন্ধকার এতটাই নিশ্ছিদ্র যে উঠে আর হেঁটে আসা যাবে না, তারপর সেখানে অন্ধকার এতটাই কালো যে গর্ভস্থ শিশুও গুলিয়ে ফেলবে পায়ু ও জনন দ্বারের মধ্যে নিষ্ক্রমণের সঠিক পথ। তারপর অন্ধকার ক্রমে আরও সূঁচালো হয়ে আসে ও তার চোখ উত্পাটন করে। ফলে চোখ চিরদিনের মতো মুগ্ধতা হারায়। সে আচ্ছন্ন পশুর মতো মুগ্ধবোধহীন চোখে পাহাড় পর্বত গিরিখাত অরণ্য উপত্যকায় একা একা ঘোরে, ঘুরে বেড়ায়, কখনওবা বমি ও মাথাখারাপের মধ্যে পালাতে চেষ্টা করে আর পড়ে যায়। কেননা তার নাগালের মধ্যে রক্তমাখা ঠোঁট, স্পর্শ হতেই ঘৃণায় ঘৃণায় লেখা হচ্ছে বিদ্যুৎ, পাতায় পাতা ঝরে যাচ্ছে, জমা হচ্ছে স্তুপ, রক্তচোষা জোঁক চলছে সরসরিয়ে। কেননা তার মাথার মধ্যে জ্বলে উঠছে সম্পর্ক সাবধান আলো, আলোর প্রজাপতি আঁকা নতুন কোনও বিবাহ ঋতু, যেখানে আদিরসের মধ্যে চুবিয়ে আবার নতুন করে আঁকা হচ্ছে ঠোঁট, নতুন করে আবার কেউ চিবুক তুলে ধরছে আর ঘন পল্লব দিচ্ছে চোখে। আর সেই ব্যক্তিত্বহীন মেয়েটি আপ্রাণ খুশি থাকার চেষ্টা করছে আর খুব হাসছে আর খুব ইয়ার্কি মারছে, অর্থাৎ আর একটু বাদেই আগুন জ্বেলে আবার নতুন করে শুরু হবে “আমরা চিরদিন বিশ্বস্ত থাকব” নাটকের মহড়া।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...