Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ছায়াপাখি — দুই দিগন্ত, পর্ব ৮

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

চড়ুইবেলা

আমার নাম শানু। হাতের পিছনটা ঘন ঘন চুলকোতে চুলকোতে বলেছিল ছেলেটা। খুব থতমত ভাব, বুঝতে পারছিল না কি হচ্ছে। হাতের পিছনটা হঠাৎ করে কেন যে এত চুলকোচ্ছে, লাল লাল ডোগা ডোগা হয়ে গেছে। আসলে জানে না তো সামনে থেকে সবাই যখন জেরা করছে, পিছন থেকে বাপি আর পিকলু ওর হাতে বিছুটি পাতা ঘষে দিচ্ছিল। পুরনো টেকনিক।

পিছন ফিরে যে দেখবে ব্যাপারটা কী হচ্ছে সেটাও সাহসে কুলোচ্ছিল না। সবার মাঝখানে পড়ে ঘেমে নেয়ে একসা । জুলফিটা গালে একেবারে লেপ্টে গেছে। আকাশি নীল জামার উপর ঘামের ফোঁটা পড়ে পড়ে মেঘের পাহাড় তৈরী হচ্ছিল। ফরসা মুখটা প্রথমে অপমানে টকটকে লাল হচ্ছিল, এখন শুকিয়ে আমসি।

–শানু, তোর কি শান্ত নুনু? বীরুর এই প্রশ্নে হাসির ঢেউ উঠল।
–নারে না, অশান্ত। জানি রে, আমরা সব জানি। সেই জন্যেই তো লাইন লাগাতে এসেছিল। খিক খিক করে হেসে ওঠে পিকলু। ওদের এখন সেই বয়স যখন শরীর বা মেয়েঘটিত কোনও শব্দ বলতে পারলেও নিষিদ্ধ ফল চাটার আনন্দে দেহে এক আশ্চর্য শিহরণ জাগে।
–I am Shantayan, Shantayan Bose. ছেলেটা তার নামের বিশ্রী অন্ত্যমিল থেকে বেরোতে চেয়ে ইংরাজিতে ভরসা নিল। বিদেশে ছোটবেলাটা কাটানোয় এখনও ওটাতেই বেশি সড়গড়, উচ্চারণে আমেরিকান ছাপ এখনও মোছেনি। কিন্তু এর ফল হল উল্টো। বীরু ভয়ানক রেগে গেল। আরেব্বাস ইংরিজি ফলাচ্ছে আবার! ওই ঝেড়ে মেয়ে তুলতে এসেছিস?
–মালটা সন্ধ্যাবেলায় অন্য পাড়ায় হিড়িক দিতে এসেছে আবার ইংরাজি ঝাড়ছে! ফোড়ন কেটে বাপি আবার বিছুলি ডলে দিল।

শানু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল এই সব শব্দ ওর ভোকাবুলারির বাইরে।

–ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানিস না, না? এদিকে বেপাড়ায় এসে মেয়ে দেখার জন্য পাঁচিলের উপর দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছিস?
–কোন মেয়ে? আমি তো কোনও মেয়ে…
–চোপ! তুই বলতে চাস, রেখাকে তুই চিনিস না? বীরু ঝাঁপিয়ে পড়ল। রেখা সাতাশ নম্বরের বাড়ির সদ্য বুকফোটা মেয়ে, বীরুর খুব চোখে ধরেছে। গোপন করার ছেলে সে নয়, রেখাকে নিয়ে বীরুর দুর্বলতা তাই সবাই জানে। সবাই মানে ছেলেরা। ক্লাস সিক্সে পড়া রেখা সেটা জানে বলে খবর নেই। কিন্তু বীরুর দলবলের কারও রেখার দিকে চোখ তুলে তাকাবার হুকুম নেই।
–ন্যাকা, এই বয়সেই বেপাড়ায় মাগীবাজি করতে জুটে গেছে, কলির কেষ্ট! অথচ মুখ দেখ— দুধুভাতু ভাব।
–দুদুভাতু রে বীরু। আবার হাসির হুল্লোড় দমকা হাওয়ার মত এসে শানুর অন্তরাত্মাকে নড়িয়ে দিল।
–এই বীরু, ছাড় না। বাচ্চা ছেলে, ও এসব কী করবে?
–বাবা, ওসব ভেজা বেড়াল মার্কা মুখ দেখে ভোলার পাত্র বীরেন চ্যাটার্জি নয়। আবার শানুকে নিয়ে পড়ে। আচ্ছা মানলাম সব মেয়েরা তোর মা-বোনের মত, তুই এসব কিছু করতে এখানে আসিসনি। বল তবে কী করছিলি? ফাঁসির হুকুম দেওয়ার আগে তোকে একটা চান্স দিচ্ছি নিজের কথা বলার। বল। এটাই তোর লাস্ট চান্স।

ব্যাপারটা আরও গড়াত, কিন্তু এই সময় হাঁফাতে হাঁফাতে হীরু এসে হাজির। কিরে শান্তায়ন, তুই এদিকে?

শান্তায়ন যেন হাতে চাঁদ পেল। হ্যাঁ রে হীরক, তোর খোঁজেই তো এসেছিলাম। কাঁদো কাঁদো শোনাল শানুর গলা। তুই বলেছিলি সাতাশ নম্বর বাড়ি, সেখানে খোঁজ করতে গেছিলাম। দ্যাখ না, এরা আমাকে ধরে কী সব বলছে।

–কী হচ্ছে বীরুদা, ও আমার স্কুলের বন্ধু, কেন ওকে হেনস্থা করছ? তারপর শান্তায়নের দিকে চেয়ে বলল, না রে আমার বাড়ি ওল্ড নাম্বার সাতাশ, নিউ নাম্বার তো এইটটি এইট। ওটা ওপাশটায়।

বীরেন এবার শান্ত হল। বলবি তো সেটা । হীরুকে খুঁজছিলি যদি তবে রেখাদের বাড়িতে উঁকিঝুঁকি মারছিলি কেন?

মিনমিন করে শানু, সাতাশ নম্বর লেখা ছিল যে।

দুর্গাপুরে ও নতুন বীরুদা, খোঁজ করতে গিয়ে ভুল বাড়িতে ঢুকে পড়েছে হয়তো। তাই বলে তুমি এরকম করবে ওর সঙ্গে? তোমাদের অপরিচিত হলেই বেনাচিতিতে ঢুকতে পারবে না নাকি? চল শান্তায়ন আমার সঙ্গে।

বীরু এবার একটু লজ্জা পেয়ে মাথার চুলে কেত মারে। ঠিক আছে বাবা, আমার ভুল। সেমসাইড হয়ে গেছে। হাত মেলাল শান্তায়নের সঙ্গে। ওরে, ওকে একটু চুন ঘষে দে না কেউ। ভুল করে হাতে বিছুটি পাতা লাগিয়ে ফেলেছে ছেলেটা।

শান্তায়নের বাবা দুর্গাপুরের রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে নতুন এসেছেন। আগে ওরা থাকত আমেরিকায়। টেক্সাস। যদিও ওর বাবা অনেক আগে দুর্গাপুরে থেকেছেন, শান্তায়নের জন্য জায়গাটা নতুন। দেশটাও নতুন, সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলটাও। যেটা ওর ছোট্ট জীবনে আলোড়ন তোলার জন্য এমনিতেই যথেষ্ট। কিন্তু এই কয়েক মাসের মধ্যেই স্কুলে এক ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে উঠিয়ে দেওয়ায় তার সমস্যা আরও বেড়ে গিয়েছিল। আসলে বয়স অনুযায়ী ওর ক্লাস সিক্সে পড়ার কথা। কিন্তু পরীক্ষা নেওয়ার পর দেখা যায় ওর বুদ্ধি আর জানার সীমানাটা বেশ খানিকটা এগিয়ে। শান্তায়নের বাবা তাই চাইছিলেন ছেলে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাক। এই নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় যে ওকে ক্লাস সেভেনে তুলে দেওয়াটাই ঠিক হবে। যতদিন এই ব্যাপারটার ফয়সালা হয়নি, শানু ক্লাস সিক্সেই ছিল। প্রথম দুই-তিন সপ্তাহ ক্লাস সিক্সে কাটানোর পরে, বইপত্র পালটে সেভেনে।

কিন্তু শান্তায়নের দৈনন্দিন জীবনের জন্য এটা তেমন ভালো হল না। অনেক টিচার ওর এই এক ক্লাস ডিঙিয়ে যাওয়াটাকে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার এবং তার ফলে তাদের নিজেদের শিক্ষকতার উপর একটা অপমানের জীবন্ত নজির বলে ধরে নিলেন। ফলে সুযোগ পেলেই ক্লাসে তারা শান্তায়নকে কোনঠাসা করতে ছাড়তেন না। হয়তো অঙ্কের টিচার ব্রজেন স্যার বললেন, আচ্ছা শান্তায়ন তুমি তো বিদেশে পড়তে অনেক কিছুই আগে আগে শিখেছ। দেখো তো তুমি পিথাগোরাসের থিওরেমটা সবাইকে বুঝিয়ে দিতে পারো কিনা।

চারদিকে হাসির রোল উঠত।

শান্তায়ন অঙ্কে বেশ ভালো। অঙ্কটা তার কাছে গোয়েন্দা গল্পের বইয়ের মতই রোমাঞ্চকর। আমেরিকায় পড়েছে বলে না, বরং বাবা প্রোফেসর হবার ফলে বহুরকমের অঙ্কের মজার বই দিয়ে শুরু করে সে ক্লাসের অঙ্কও অনেক আগে আগেই করে ফেলত। তাই ব্রজেন স্যারের কথায় উঠে সে হয়তো সত্যিই সবাইকে ভালো করে বুঝিয়ে দিল এই আশায় যে এরপর সে স্যারের প্রিয় পাত্র হতে পারবে। শান্তায়ন বুঝতে পারেনি এরপর কেন স্যার এত রেগে গেলেন আর শুকনো হেসে সারা ক্লাসকে বললেন, তোমাদের এই বন্ধু আর বেশিদিন তোমাদের সঙ্গে নেই। এরপর ওকে ক্লাস এইটে তুলে দেওয়া হবে। আর তোমরা স্কুল ছাড়ার আগেই দেখবে শান্তায়ন স্যার তোমাদের অঙ্কের টিচার হয়ে গেছে।

আবার হাসির রোলের মধ্যে শান্তায়ন কুঁকড়ে ছোট হয়ে গেছিল। নতুন ক্লাসেও ওকে কেউ ভালো মনে নেয়নি। সবার ভাবটা ছিল যেন ফাঁকি দিয়ে ও তাদের ক্লাসে ঢুকে গেছে। যেখানে তারা পুরো একটা বছর ক্লাস সিক্সে কাটিয়ে তবে সেভেন উঠতে পেরেছে, সেখানে এই ছেলেটা এতগুলো পরীক্ষা, বেতের বাড়ি, কানমলাকে এমন সহজে বাইপাস করবে? শান্তায়নকে কেন আগে আগে উঠিয়ে দেওয়া হবে? আরও মুশকিল হল যে কদিন ক্লাস সিক্সে ছিল, তবু কিছু বন্ধু তৈরি হয়েছিল। হীরক তাদের মধ্যে একজন। কিন্তু শান্তায়ন হঠাৎ ক্লাস সেভেনে চলে যাওয়ায় তারাও এর মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ পেল। তাই ক্লাস সিক্সের নতুন বন্ধুরাও মুখ ফেরাল। তার একূল ওকূল দুকূল গেল।

শান্তায়ন-বিদ্বেষের এটাই একমাত্র কারণ ছিল না। যেহেতু সদ্য বিদেশ থেকে এসেছে, শান্তায়নের ব্যাগ, কলম বা জ্যামিতির বাক্স সব কিছুতেই বিদেশি গন্ধ মেশানো থাকত— ঝকঝক, সুন্দর। জামাকাপড়ে কোম্পানির লেবেল মারা। আর সবার জামাকাপড় তৈরি হত পাড়ার টেলারিং শপে। এমন কি শান্তায়নের স্কুলের ইউনিফর্মের জামাকাপড়ও আসত কলকাতার কোন দোকান থেকে। ও যে অন্যরকম এবং বিশেষ আদরে মানুষ, সেটা কারও চোখে ভালো লাগেনি। পরিপাটি পোশাকে স্কুলে আসা শান্তায়ন অন্য সবার সঙ্গে মানানসই হচ্ছিল না। সুযোগ পেলেই সবাই ওর পিছনে লাগত। ওর ব্যাগ হঠাৎ হঠাৎ খুঁজে পাওয়া যেত না। কিংবা টিফিনবাক্স খুলে কেউ হয়তো খাবার খেয়ে নিল। একমাত্র হীরক ছিল ব্যাতিক্রম।

তাই বলে হীরক যে প্রথমে ওকে খুব পছন্দ করত সেটাও নয়। শান্তায়ন যে নিজেকে সত্যিই আর সবার থেকে আলাদা ভাবত। সে যে ব্যতিক্রমী, সেটা ও নিজেই কথার ফাঁকে জানিয়ে দিত। জ্যামিতির বাক্সটা এমনভাবে ব্যবহার করত, যাতে সবার নজর তাতে পড়বেই। ওর বাবা ওকে নতুন কোনও বই কিনে দিলে সেটা টিফিনের সময়ে কোনও উল্লেখযোগ্য জায়গায় গিয়ে বসে পড়বে যেখান থেকে কারও চোখ এড়ানো খুব মুশকিল। ঠিক এইভাবেই একদিন দেশবিদেশের স্ট্যাম্প লাগানো বইটা এনে ক্লাসে দেখিয়েছিল। ওর বাবা ওকে অনেক জায়গার থেকে স্ট্যাম্প আনিয়ে দেয়, এই বয়সেই কয়েক হাজার স্ট্যাম্প জমে গিয়েছিল। হীরকও স্ট্যাম্প জমাতে ভালোবাসত, কিন্তু তার ছোট্ট বাক্সবন্দি শখানেক স্ট্যাম্প এই কালেকশনের কাছে কিছুই না। হীরকের খুব উৎসাহ ভালো করে ওর সব স্ট্যাম্প দেখবে। রতনলাল স্যারের ক্লাসে লুকিয়ে বসে দেখছিল দুজনে মিলে। কিন্তু স্যারের শ্যেনদৃষ্টি এড়ানো যায়নি। ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে শাস্তি নিতে নিতে শান্তায়ন বলেছিল স্ট্যাম্প দেখার জন্য ওর বাড়ি আসতে।

সেই কথামত রবিবার ওর বাড়ি পৌঁছে গেছিল হীরক। কিন্তু স্ট্যাম্পের খাতার কথা তোলায় শানুর চোখ ছলছল করে উঠল। জিজ্ঞেস করে জানা গেল তার আগের দিন রাতে শানুর বাবা রাগ করে পুরো খাতাটা নাকি জ্বালিয়ে দিয়েছে।

শুনেই চমকে উঠেছিল হীরক। বলে কি, অতগুলো স্ট্যাম্প! কী হতে পারে?

শানুর জীবনটা এক অন্য আলোয় ধরা দিয়েছিল সেদিন।

শানুর বাবাকে সেদিনই প্রথম চিনল হীরক। স্কুলে দু-একবার দেখে থাকবে, কিন্তু পরিচয় জানত না। দেখলে মনে রাখার মত চেহারা। লম্বা, ফরসা, ঝকঝকে। প্রশস্ত কপালের নীচের থেকে আসা তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে অজান্তেই কুঁকড়ে গেছিল হীরক। তার কথাবার্তাও কেমন একটা জেরা করার মত। হীরক কোন ক্লাসে পড়ে, আগের বছর কোন সাবজেক্টে কিরকম নম্বর পেয়েছিল, ক্লাসে তার পজিশন কী এসব বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। এইভাবে হীরকের কথা জানার মধ্যেই ওর বাবা এক অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন। তুমি রোজ পায়খানায় কতক্ষণ বসো হীরক?

হীরক অবাক, আমতা আমতা করছিল। কিন্তু ওর বাবাই বললেন, নিশ্চয় এক ঘণ্টা ধরে নয়? আজ শানু সকালবেলায় বাথরুমে বসেছিল পুরো পঁয়তাল্লিশ মিনিট।

শানুর মা থামাতে চেয়েছিল। তাই বলে তুমি এত বড় ছেলেকে বাথরুমের দরজা খুলে পায়খানা করতে বলবে?

হীরক আড়চোখে দেখছিল শায়ন্তনের চোখ মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে।

–হ্যাঁ, বলব। ছেলে বাথরুমে বসে আর কী করছে তুমি কী করে জানলে? নাহলে কারও পায়খানা করতে এক ঘণ্টা লাগতে পারে? বলে শানুর বাবা গটগট করে চলে গেলেন।

শানুর মা ব্যাপারটা একটু সামলানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হল— ওর বাবা একটু রাগী মানুষ, তুমি কিছু মনে কোরো না। তুমি আজ প্রথম এলে আমাদের বাড়ি, তোমাকে কিছু খেতে দিই আমি। তোমরা ততক্ষণ বসে গল্প করো।

শানু কাঁচুমাচু মুখে বসেছিল। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল আগের দিন সন্ধ্যাবেলায় খেলে বাড়ি ফিরতে ঘণ্টা খানেক দেরি হয়েছিল শানুর। সবচেয়ে বড় কথা কেন যে দেরি করেছিল সেটা বুঝিয়ে বলতে পারেনি। শানুর বাবা ছাড়ার পাত্র নন। পাশের বাড়ির সুরজিৎকে ডেকে খেলা কখন শেষ হয়েছিল জিজ্ঞেস করেছিলেন। জানা গেল যে খেলা রোজকার মতোই ছটায় বন্ধ হয়। অথচ তারপরেও বাড়ির পাশের মাঠ থেকে ঘরে ঢুকতে শানুর এক ঘণ্টা লেগে যায়। শানুর বাবা সেটা মেনে নিতে পারেননি। শানুও ঠিক বলতে পারছিল না যে ঠিক কী করছিল ও। ভাবনা কি কোনও করার জিনিসের মধ্যে পড়ে? সূর্যাস্তের আলোয় মাখা আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুটা সময় কেটে থাকতে পারে, কিন্তু সেটা কি এক ঘণ্টা? শানু নিশ্চয় কিছু লুকাচ্ছে সেটা ভেবে ওর বাবা আরও রেগে গিয়ে ওর যত প্রিয় জিনিস ছিল জ্বালিয়ে দিলেন, স্ট্যাম্পের বইটা শুদ্ধু। এই আশায় যে এরপরে শানু মুখ খুলবে আসলে কী হয়েছে বলার জন্য। সেটা যখন হল না, তখন শুরু হয়েছিল মার। নেহাত ওর মা এসে ওকে বাঁচায়।

শানুর বিষন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হচ্ছিল হীরকের। শানুর জীবনটা যতটা সুখের বলে মনে হত, আসলে ততটা তো নয়। তাই সেদিন বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিল হীরু।

এর কদিন পরেই শানু ক্লাস সেভেনে। তবু ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে দেখা হত। আর বিশেষ করে নতুন ক্লাসে সবার কাছে হেনস্থা হওয়ায় আরও বেশি ও হীরকের দিকে ঝুঁকছিল। দুদিন আগেই ক্লাসের মাঝখানে এসে হীরকের বাড়ির ঠিকানা জেনে নিয়েছিল। আসবে বলে। কিন্তু কি কপাল, এখানে এসেও আবার হেনস্থা।

সাইকেলে প্যাডেল করতে করতে এগোচ্ছিল দুজনে। হীরকের বাড়ি এসে গেল। ছোট একতলা বাড়ি। বাড়ির গেটের সামনে এসে হীরক বলল, এবার চিনলি তো? আমার বাড়ি। চল ভেতরে।

–রেখা কি তোদের এই বীরুকে পছন্দ করে?

হঠাৎ এই প্রশ্নে অবাক হল হীরক। গুলগুলিয়ে হাসল শানু, তোর বাড়ি চিনতে না পেরে খুব লাভ হয়েছিল আজ, তোদের রেখাকে দেখলাম।

–আমাদের রেখা কি রে? পাড়ার বল। ও তো কারমেল কনভেন্টে পড়ে।
–খুব ভালো দেখতে রে, বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিল। মনে হল আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। একবার আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিবি? শানুর উপচে পড়া হাসিটা শুধু মুখে নয়, যেন বুদবুদের মতো সারা শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। কিছু একটা মনে করে ভাবতে ভাবতে হাসা, যেন মনের ভিতরে কোনও খেলা চলছে আর সেই খেলার মজাটা হাসি হয়ে বেরিয়ে আসছে। ওর চোখটা খুশিতে চিকচিক করছিল, কোন ভাবনা থেকে কে জানে!

ঠিক রাগ না করলেও ওর এই ভাবনার ফলাফলটা কী দাঁড়াবে জানে বলে হীরক থামাল ওর দিবাস্বপ্ন। ক্ষেপেছিস? এই বয়সেই বীরেনের এক মারকুটে গ্যাং তৈরি হয়েছে। আবার উঁকিঝুঁকি মারতে দেখলে— কথা ঘুরিয়ে হীরক বলল, এখন চল আমাদের বাড়ি। এসব কথা পড়ে দেখা যাবে।

হঠাৎ যেন শানুর চমক ভাঙল। নিজেকে তার মনের ভিতরের খেলাঘর থেকে উপড়ে টেনে বের করে আনার মত সুরে বলল, এই রে, আজকেও আবার দেরি হয়ে গেল। এখান থেকে বাড়ি যেতে আরও কুড়ি মিনিট লাগবে রে! আমি পালাই আজ। নাহলে বাবা— বলে সাইকেলে জোরে প্যাডেল ঘোরাল। কিছুটা এগিয়ে আবার থামল শানু, আর শোন, বাবা আমাকে আবার নতুন স্ট্যাম্প অ্যালবাম কিনে দিয়েছে, অনেক স্ট্যাম্প। এরপর যেদিন আসবি দেখাব।

ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে শানুর সাইকেল মোড় ঘুরে মিলিয়ে গেল। হীরক তবুও দাঁড়িয়েছিল। ভাবছিল শানুর কথা। ভাবছিল ভালোই হয়েছে শানুর মত অ্যালবাম তার নেই। স্ট্যাম্পের ছোট্ট বাক্সটা একান্তই তার নিজের, সামান্য। হারানোর কোনও ভয় নেই।

 

সুচিত্রারা আসতে আসতে বেলা দশটা। সুতপার ছোটবোন। যদিও অমিত আর সুচিত্রার ছেলে অমিতাংশু আর শর্বাণী দুজনেই শানুর থেকে বড়। ছেলে আইআইটিতে পেয়েছে, কানপুরে চলে যাবে সামনের মাসে। সেইজন্য সাড়ম্বরে ডাকা হয়েছে। তাছাড়া সুতপারা আমেরিকা থেকে ফেরার পর ওরা আসেওনি কোনওদিন দুর্গাপুরে। ছেলের পড়ার চাপ, অমিতের ঘন ঘন ট্রাভেল— এইসব চলছিল। সুতপাও চাপাচাপি করেনি বেশি। বাইরে থেকে এসে একটু গুছিয়ে না বসে ছোট বোনকে বাড়িতে ডাকতে দ্বিধা ছিল সুতপার। অমিতের নিজের কন্সাল্টিং বিজনেস, হিন্দুস্থান পার্কে বিশাল বাড়ি। বাড়িটা যদিও পৈতৃক, কিন্তু আছে তো। তাই নিজের ছোট বাড়িতে আসতে দেওয়ার আগে ঘরদোর সাজানোর ছিল। দেখা হয়েছে কোথাও কোনও অনুষ্ঠানে। সুচিত্রার বাড়িতেও গেছে বারদুয়েক কলকাতায় গেলেই। কিন্তু সুচিত্রার আসা এই প্রথম।

এবার ছেলে এত ভালো রেজাল্ট করেছে, সুচিত্রা আনন্দে ডগমগ। দিদি বলতেই এককথায় রাজি। সেই থেকে সুতপার বাড়ি সাজানোর ধুম চলেছে। নিজের বোন আসছে, অত কি রাখঢাকের দরকার বলো তো? বিরক্ত হয়েছে পরমেশ। যদিও এই একটা ব্যাপারে স্বভাবশান্ত সুতপাকে দমাতে পারেনি। অতএব জানালায় নতুন পর্দা, নতুন চিনামাটির থালাবাসন, সোফায় নতুন কভার— সুতপা কিছু বাদ রাখেনি। ফুলদানিই কিনেছে দুইখানা। পরমেশ পয়সা খরচের কথা তুললে পাত্তাও দেয়নি। এমনিতেই লাগত, কদিন আগে আর পরে। ওরা তো আর রোজ রোজ আসছে না।

ছেলে অংশু আর মেয়ে শর্বাণীকে নিয়ে হইহই করে ঢুকে পড়ল সুচিত্রা। ওমা দিদি, কি সুন্দর তোদের বাড়িটা! কিরকম খোলামেলা চারদিক। পরমেশদা কোথায়?

সুতপার মুখ ঝলমল করে উঠল আনন্দে। ওকে কটা জিনিস আনতে পাঠিয়েছি। এক কথা বারবার না বললে মনেই থাকে না।

–সব বাড়িতে এই অবস্থা রে দিদি। মাসিকে প্রণাম করো অংশু, বাণী। শানু কোথায় দিদি?
–আহা থাক থাক। শানুও বাবার সঙ্গে গেছে, এই এলো বলে। কিন্তু আমাদের জামাই কোথায়?

ট্যাক্সির টাকা দিচ্ছিল। বলতে বলতে এসে ঢুকল অমিত। হাতে ব্যাগ আর মিষ্টির হাঁড়ি। পরমেশ আর শানুও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। হাত থেকে ব্যাগ নাবিয়ে পরমেশ রাগত গলায় বলল, এই শেষ সুতপা, আবার যেন বাজার যেতে বোলো না।

–এ বাবা, পরমেশদা তুমি অমনি রাগী আছ এখনও? আমার এত ভালো দিদিটাকে একেবারে আঙুলের ডগায় নাচাচ্ছ? এমন করে সুচিত্রাই বলতে পারে। ওর সামনে পরমেশ কেমন থতমত খেয়ে যায়। মনের রাগটা মুখে সহজে প্রকাশ করতে পারে না।
–বলো পান এনেছ, জর্দা পান?
–জর্দা?
–হ্যাঁ একশো বিশ। আনতে ভুলে গেছি, সারা রাস্তা ছটফট। বানানো পান আনতে পারো, আমি ওপর থেকে জর্দা ঢেলে নেব।
–কী করছ সুচিত্রা? পরমেশদা এখুনি বাজার থেকে এল, আবার দৌড় করাচ্ছ কেন? আমি বরং শানুকে নিয়ে খুঁজে আনছি।
–কেন পরমেশদা একমাত্র শালীর এই একটা আবদার রাখতে পারবে না? দিদির জন্যেই বুঝি সব ভালোবাসা, আমার জন্য এক ছটাকও রাখোনি? সুচিত্রার জোর করে আদুরেপনায় বড্ড অস্বস্তিতে পড়ে গেল পরমেশ। আচ্ছা, আচ্ছা যাব না হয়। লিস্টটা আর একটু লম্বা হোক তারপরে।

পরমেশের এমন হেনস্থা সুতপার মোটেই পছন্দ হয়নি। মজা করে হলেও। তোমাকে কোথাও যেতে হবে না। পান তো, শানুই পারবে। শানু যা তো বাবা তপনের দোকান থেকে মাসির জন্য পান জর্দা নিয়ে আয়।

–মাসি, আমি যাই শানুর সঙ্গে?
–নিশ্চয়, শানু সঙ্গে অংশুকেও নিয়ে যা। একটু দুর্গাপুরের রাস্তাঘাট দেখিয়ে আন। কিন্তু পাকামি করবি না, রাস্তায় অংশুর কথার অবাধ্য হবি না।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ অংশুদার সঙ্গে এই ফাঁকে ভালো করে জেনে নে কিভাবে আইআইটির জন্য প্রিপারেশান করতে হয়।

অমিত হাসল। শানু মোটে ক্লাস এইটে উঠেছে দাদা। এখন কি আইআইটির প্রিপারেশান নেবে বলো তো?

–নাথিং লাইক স্টার্টিং আর্লি। এরপর ওর অংশুদা সেই কোথায় কানপুর চলে যাবে, বেশি দেখা হবে না। তাছাড়া জানো তো শানু গতবার ডাবল প্রমোশন পেয়েছে। আবার পেলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তখন তৈরি হওয়ার সময় কমে যাবে না? বলতে বলতে একটা গর্বের হাসি ছড়িয়ে পড়ল পরমেশের চোখেমুখে।
–এমনভাবে ডাবল প্রমোশন করতে থাকলে তো গিনেসে নাম উঠে যাবে পরমেশদা।

পরমেশ খোঁচাটা হজম করে উত্তর দেওয়ার আগেই সুতপা অশনি সঙ্কেত দেখল। তাড়াতাড়ি ছেলের হাতে টাকা এনে দিল। যা তো শানু। তোর বন্ধুদের সঙ্গেও অংশুর আলাপ করিয়ে দিস। বাণী যাবি নাকি?

–না দিদি, থাকুক। ওর অত শরীর ভালো নেই, রাস্তা ঘাটে টইটই না করাই ভালো। বরং পারলে মাসির একটু হেল্প করুক।

পরমেশ যা রাগী, সুতপা ভয়ে ভয়ে থাকে কখন ঠোকাঠুকি লাগে। বিশেষ করে অমিত আর সুচিত্রার একটু জাহির করার অভ্যাস। পরমেশের আঁতে লেগে যায়। দুদিন সকলে মিলে হইহই করে কাটল। কোনও মনকষাকষি ছাড়াই। তবে এবারে সেই মানুষটা সুচিত্রাকে নিয়ে একটু বেশিই গলে পড়ছিল সুতপার মতে। সুচিত্রার বুকের ঠিক উপরটায় মাছ ভাজতে গিয়ে তেল ছিটকে পড়ে পুড়ে গেছে। শুনেই পরমেশের কী দরকার ছিল দেখতে চাওয়ার? ও কি ডাক্তার যে শালীর বুকের আঁচল সরিয়ে দেখতে হবে? মানুষটা মাঝে মাঝে এমন করে, ভাগ্যিস অমিত তখন স্নানে গেছিল। সুতপা বিরক্ত হয়েছিল। অন্যদিকে পরমেশ খুশি ছিল যেহেতু তার আমেরিকা থেকে ফিরে আসা নিয়ে বেশি কথা হয়নি। দুই বছর হয়ে গেছে, তাই ওসব অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে আর দাঁড়াতে ভালো লাগত না। এখানে এসে অংশু শানুর বন্ধুদের কাছে একটা মিনি সেলিব্রিটি হয়ে গেছে। আইআইটি, তাও আবার কানপুর। র‍্যাঙ্ক প্রথম একশোতে। সবাই অংশুকে একদম ঘিরে ধরেছিল। অমিত আর সুচিত্রা ছেলের এমন আদরে মুগ্ধ হয়ে মুখে একটা আলগা প্রশান্তি ঝুলিয়ে ঘুরছিল। ছোটখাট ত্রুটিবিচ্যুতি চোখেই ধরেনি। শুধু মেয়ে শর্বাণী কেমন গোমড়া মুখে ঘুরছিল, আর সুতপা লক্ষ করেছে তার বোন মাঝে মাঝেই মেয়েকে চোখ দেখাচ্ছে। অংশুর থেকে বছর দুয়েকের ছোট, কী হয়েছে কে জানে? সুতপা এসব কথা জিজ্ঞেস করে কোনও গোলযোগ করতে চায়নি। বাবা মা মারা গেছে, বোন ছাড়া কে আছে আর!

রাতে থেকে পরের দিন দুপুরের লাঞ্চ সেরে চলে গেল ওরা। পরমেশ আর সুতপা খুব ক্লান্তও ছিল। পরমেশ দুপুরের বাকিটা একটু গড়াগড়ি দিতে গেল। সুতপা রান্নাঘর গুছাতে।

শানুর জন্য এবার খোলা ছুট। লাফ দিয়ে তিন তিনটে সিঁড়ি একেকবারে টপকে পৌঁছে গেল ছাদের ঘরে। শানুর যত গোপন আনন্দ আর মজার আয়োজন এখানেই। এই ঘরটা ছোট, বাড়ির যত পুরনো আর ফেলনা জিনিসে ঠাসা। কিন্তু একান্তভাবেই তার নিজস্ব।

এদিক ওদিক জিনিস ঠেলে নিজের জন্য বেশ একটা জায়গা করে নিয়েছে শানু। তার নিজের সংগ্রহের কিছু জিনিস, এখানেই থাকে। মহার্ঘ্য কিছু না, কিন্তু কৈশোরের অমূল্য সম্পদ।

বাবা পছন্দ করে না সেসব বই। গোয়েন্দা গল্পের বই আর কমিকস। বাবা বলে পড়তে হলে কনান ডয়েল পড়ো। কিন্তু তার যে জয়ন্ত, দীপক আর ফেলুদায় মন। ফ্যানটম। বাবার থিওরি কমিকস পড়লে নাকি কল্পনাশক্তি কমে যায়! শানুর তাতে বয়ে গেছে।

একটা পুরনো রেডিও, লুকিয়ে শোনার জন্য। বাবা বলে এই বয়সে সিনেমার গান শুনে পেকে যাবে। শুনতে হয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনো। খুব আস্তে চালিয়ে সিনেমার গান শোনে মাঝে মাঝে। তার চাইতেও ভালো লাগে নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অজানা স্টেশন ধরতে। মাঝে মাঝে এমন অদ্ভুত সব স্টেশন ধরা যায়, কোন দেশীয় ভাষায় যে কথা বলে। ইন্ডিয়ার অন্য কোথাও, কিংবা একদম অন্য কোন দেশ। কে জানে কোনদিন হয়তো শানু সেখানে যাবে, তখন জানতে পারবে। বাবা তো বলে, বড় হলে শানু কত দেশবিদেশ ঘুরবে। কাজে, বেড়াতে।

একটা কার্ড। দুই বছর যখন আমেরিকা ছেড়ে আসছিল, অ্যালিস দিয়েছিল। এমন অদ্ভুত! মেয়েটার মুখটা আর ভালো করে মনে নেই। স্কুলের একটা ছবি আছে, সেখানে দেখতে হবে। তাহলেই মনে পড়ে যাবে। মনে না পড়ায় অবশ্য কোন অসুবিধা হয় না শানুর। ভাবনায় নতুন করে গড়ে নেয়। আসলে তার প্রথম দশ বছরের আমেরিকার স্মৃতি কিরকম দূর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। আসার আগে ভেবেছিল কীভাবে পারবে এখানে থাকতে। আছে তো বেশ।

কোন এক রাগের দিনে তার প্রিয় খেলনা বাবা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিলে সেগুলো উদ্ধার হয়ে এখানে স্থান পায়, অবশ্য যদি অক্ষত অবস্থায় ফেলা হয়ে থাকে। যেমন রিমোট দিয়ে চালানো গাড়ি। এখানে পাওয়া যায় না। একদিন অঙ্ক ছেড়ে এটা নিয়ে খেলছিল বলে এর জায়গা হয়েছিল ডাস্টবিনে। বাবা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ায় চোট পেয়েছিল, কিন্তু টুকরো টুকরো হয়নি। এখন চলার সময় কেমন হিঁচকে হিঁচকে চলে গাড়িটা।

এছাড়া আছে একটা নিজস্ব শতরঞ্চি। যেটা শানু ছাতের ঠিক মাঝখানে পেতে আকাশ দেখে। আকাশে দুচোখ রেখে হারিয়ে যাওয়ার কি যে মজা! আমেরিকায় থাকতে ছিল খোলা আকাশ, এখানে কোথায় যে হারিয়ে গেছে! শুধু ছাদে এলেই পাওয়া যায়। এমনিতেই অযথা সময় নষ্ট করার জন্য বাড়িতে শানুর খুব বদনাম। পায়খানায় গিয়ে তার বেশি সময় লাগে, সে যে আর কিছু করছে না সেটা প্রমাণ করতে দরজা খুলে রাখতে হয়। বাবা অঙ্ক দিয়ে টাইমপিস নিয়ে বসে, শানুকে ঝড়ের গতিতে অঙ্ক করতে হয়, কারণ স্পিড না আনলে কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় নাকি সময় কুলনো যায় না। শানুর একটা নার্ভের অসুখের জন্য হাতটা একটু কাঁপে। ও তাই বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতটা ধরে লেখে, এতে তাড়াতাড়ি হয়।

এইসব নিয়মকানুনের বাইরে শাসনছাড়া দিনের মজাই আলাদা। দিনটাকে আমসত্বের মত আস্তে আস্তে চেটে চেটে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে চাইছিল শানু। সময়ের কাঠগড়ার বাইরে। হয়তো সময়ের চোরকুঠুরিতে আটকা পড়ার জন্যই ঘড়ি জিনিসটার উপর জাত ক্রোধ জন্মে গেছে শানুর।

শতরঞ্চিটা নিয়ে ছাদের ঠিক মাঝখানে পেতে দিল। ছাতটা বেশ বড়। আর মাঝখানে পাতলে সব দিকের পাঁচিল থেকেই অনেক দূরে হয়। এরপর শতরঞ্চিতে শুলে পাঁচিলের সীমারেখা থাকে চোখের আড়ালে। একটা বিস্তীর্ণ খোলা জায়গার অনভূতিতে ভাসে শানু। দু পা ছড়িয়ে, দু হাত মাথার উপর দিক দিয়ে বাড়িয়ে শুয়েছিল শানু। যেন উড়ছে। অন্তত শীতের রোদ সারা গায়ে মুখে মাখামাখি হতে হতে মনের উড়ান দিতে বাধা নেই।

দুপুরবেলা এমনিতে চারদিক অনেক শান্ত, এখান থেকে নিঃশব্দ দুপুরের গোপন আওয়াজের আবহসঙ্গীত খুব ভালো লাগে। শুকনো পাতার সড়সড়, দূরে বসা কোন একলা ডাহুকের বুগবুগ, অনেক দূর থেকে আসা দূরপাল্লার ট্রেনের স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার হাঁসফাঁস— কান পাতলে এরকম আরও কত কি। এই সব শব্দ আর আকাশ ভরা আলোর মধ্যে দিয়ে কোন সুদূর ভাবনার জগতে চলে যায় শানু। কত কী যে ভাবে, নিজেও জানে না। এমনকি পরে সেই ভাবনার কোনও কূলঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায় না। এটা তার একটা বাজে স্বভাবের মধ্যে গণ্য। পরমেশ বলে, ভাববি যদি ভাব না, কিন্তু সেই ভাবনাগুলো এমন হবে যেন লিখে রাখার মত। বড় বড় বিজ্ঞানীরা তো এইভাবেই নতুন নতুন সব আবিষ্কার করেছে। ভাবনার মধ্যে হারিয়ে গেলে চলবে না, বরং চিন্তার অন্তর্যাসটাকে যত্নে গুছিয়ে রাখতে হবে, লিখে রাখতে হবে কী ভাবলি না ভাবলি— সব কিছু। তাকে এইজন্য ডায়েরিও কিনে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভাবনার ডুবসাঁতার থেকে যখন বেরোয়, কোথায় হারিয়ে যায় সব। ঠিক জল থেকে হাঁস ডুব মেরে ওঠার পর যেন। জলের ফোঁটাও থাকে না গায়ে। তাছাড়া সে তো কোন কিছু আবিষ্কার করবে বলে ভাবে না। নিজেকে আবিষ্কার করা ছাড়া।

বাবাকে বললে শুনবে? তাই পড়ে যা মাথায় আসে, আগড়ম বাগড়ম লিখে রেখে দেয় ওই ডায়েরিতে। এই একটা ব্যাপারে বাবা ধৈর্য হারায়নি। বলে এইভাবে শুরু। একদিন এমনি করেই হঠাৎ কোনও নতুন আবিষ্কারের কথা লেখা হয়ে যাবে। অভ্যাসটাই বড় কথা, আজ এই অভ্যাসটা ধরিয়ে দিচ্ছি। বড় হলে এর আসল বেনিফিটটা পাবি।

এইভাবে কত রকমের সুঅভ্যাসই যে করানো হচ্ছে শানুকে, অস্থির লাগে মাঝেমাঝে। কিন্তু বাবার মুখের উপর কিছু বলার সাহস এখনও হয়নি শানুর।

সন্ধ্যাবেলায় এমন হাওয়া চলে একটু ঠান্ডা লাগে ছাদে। শিরশিরে হাওয়া ঢুকে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল শানুর। নীচ থেকে একটা দোলাই নিয়ে আসলে ভালো হয়। উঠব না উঠব না করেও শেষ অবধি শতরঞ্চির মায়া কাটিয়ে উঠেই পড়ল।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে বাবার গলা পেয়ে থামতে হল। পরমেশের কণ্ঠস্বর গমগমে, তবুও তাতে যেন রেশমি চাদর জড়ানো আজ। এমনি সময়ের গলা নয়। বেডরুম থেকে আসছে। থমকে গেল শানু। বাবার গলা— তোমার বোনের দেমাকটা খুব বেশি।

–অত সুন্দর দেখতে, বরাবরের সুন্দরী ও। লোকের মুখে শুনে শুনে মাথা ঘুরে যায়ই কারও।
–তাতে কী, তুমি কি কিছু কম?
–উমম, কত যেন আমাকে দেখো। মার গলায় এমন অদ্ভুত আবদেরে বাচ্চাপনায় কেমন ধন্দে পড়ে গেল শানু।
–তাহলে এখন কী করছি? চকাত করে একটা আওয়াজ পেল।

এ কিসের আওয়াজ? ঠিক নয় জেনেও শানুর অবাধ্য চোখ ঘুলঘুলিতে চলে গেল, এখান থেকে বাবা মায়ের ঘরের একটা কোনা দেখা যায়। বাবার পেছনটা দেখা যাচ্ছে, খালি গায়ে— মার কী হয়েছে? বাবার শরীরের আড়াল ভেদ করে মাকে এক ঝলক দেখতে পেল শানু। বাবা কি মাকে মারছে? মার গলার আওয়াজেই বুঝল, না। মা হাঁফাচ্ছে, কিন্তু হাসছেও যেন।

–ইস জানি না যেন। তুমি তো সুচিকেই বিয়ে করতে চেয়েছিলে শুরু থেকে। ও চায়নি বলে…
–একদম নয়। বাবার গলা মোলায়েম রাস্তা থেকে ছিটকে গেল। ওরকম সারাদিন সাজগোজ করা মেয়ে আমার কক্ষনও পছন্দ ছিল না। বাবা মার থেকে সরে যাচ্ছে। একি, মার খালি গা? এক ঝলকের জন্য মায়ের অনাবৃত শরীর কেমন এলোমেলো করে দিল শানুকে। কিন্তু পরমুহূর্তে বাবার চুল ধরে মা মুখটা নাবিয়ে নিল নিজের কাছে, আর বাবার দীর্ঘ শরীরের পিছনে ঢাকা পড়ে গেল। কিন্তু বাবা নিচু হতেই মায়ের ছড়ানো বক পাখির পাখার মত সাদা বাঁ পাটা দেখতে পেল শানু। শাড়ির আড়াল থেকে মায়ের পায়ের গোছের বেশি কক্ষনও দেখেনি। কেন মা এমন করছে? বাবা মায়ের মধ্যে এমন অন্তরঙ্গতা, শারীরিক সংস্পর্শ শানু আগে কক্ষনও দেখেনি। ছোটবেলায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাবার গালে মাকে ঠোঁট ছোয়াতে দেখেছে, ব্যাস। তাও আজকাল আর দেখে না। কিন্তু এখন এরা এমন করছে, দুজনে মিলে যেন এক হয়ে যাচ্ছে, একই সঙ্গে দুলছে ওদের শরীর। খুব রাগ হচ্ছিল শানুর। নারীপুরুষের যৌন সম্পর্কটা স্বচ্ছ নয় শানুর কাছে। বুঝতে পারছিল না ওর শরীরের মধ্যে এমন একটা আলোড়ন কেন হচ্ছে, কিন্তু এটুকু বুঝল এমন কিছু দেখছে যেটা অন্যরকম, গোপন কিছু, তার দেখা উচিত নয়। কোনওমতে দৌড়ে আবার ছাদে ফিরে গিয়ে শতরঞ্চির মধ্যে নিজেকে নিয়ে ফেলল। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিল। কান দুটো গরম, একটু আগের ঠান্ডার কথা ভুলেই গেছিল।

কী জানি কেন ঠিক এই সময়ে রেখার কথা মাথায় চলে এল। সেদিন শুধু এক মুহূর্তের জন্য দেখেছিল, আর শুনেছিল মিষ্টি গলায় কাটা কাটা স্বর— হীরক এখানে থাকে না। এমনকি বলেও দেয়নি কোথায় থাকে। কিন্তু তবুও কেন যে ওর মাথায় মেয়েটা এভাবে রয়ে গেল! মাঝেমাঝেই মনে পড়ে। কখনও কখনও নিজেই জোর করে মনে পড়ায়। এখন আবার একটু আগে দেখা বাবা মায়ের ব্যাপারটা মাথা থেকে সরাতে চোখ বন্ধ করে মেয়েটাকে ভাবার চেষ্টা করল।

বন্ধ চোখের বাইরের রোদ কেমন করে চোখের ভিতরে রামধনু রং তৈরি করছিল। আলোর টুকরোগুলো মৌচাকের খোপের মত ছকোনা। খোপে খোপে মিলে বিশাল এক খাঁচা তৈরি হচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার আওয়াজ বানাচ্ছিল মৌমাছির গুনগুন। এবার শানু চোখ পিটপিট করতেই ছকোনা আলোর টুকরোগুলো গোলাকার হয়ে ফানুসের মত এদিক ওদিক উড়তে শুরু করল। ছাদের সীমানা পেরিয়ে ফানুসগুলো উড়ে যাচ্ছে একটা একটা করে। তারপর নামতে নামতে রাস্তায় পড়ে পড়ে একটা একটা করে ফানুস ফাটছে আর চারদিকে রং ছড়াচ্ছে। মজা লাগল শানুর। ভালো করে দেখার জন্য ছাদের পাঁচিল ধরে ঝুঁকে পড়তেই দেখল রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে রেখা। ও কি তাকে দেখতে পাচ্ছে? রেখা কি তাকে চিনতে পারবে? যাচাই করার জন্য শানু একটা ফানুস ধরে নিজেও পাঁচিল পেরিয়ে রাস্তায় নেমে এল।

রেখা কিন্তু ওকে দেখে একটুও অবাক হল না। ফানুস ধরে ঝুলতে ঝুলতে নামা সত্ত্বেও। যেন জানত এমনটাই হবে, হওয়া উচিত। হবে বলেই এই রাস্তা দিয়ে এখন এই মুহূর্তে হেঁটে যাচ্ছে ও। মিষ্টি করে হেসে বলল, তুমি কেন সেদিন পালালে? না, না বলল, তুই কেন সেদিন পালালি?

সেদিন শানু ভালো করে ওর দিকে তাকাতে লজ্জা পেয়েছিল। আজ একটুও পেল না। ওর মুখটা ভালো করে দেখল, হাল্কা ভেজা ঠোঁটের কোনায় তিল, কাজলটানা চোখ। গলার নীল শিরাটাও। শানুর চোখ পিছলে গেল রেখার বুকে— ও কি এইটুকু মেয়ে শাড়ি পড়েছে কেন? শাড়িটা হলুদ রঙের। যেন ওর গায়ের রঙের সঙ্গে প্রায় মিশে গেছে। আজকে কি সরস্বতী পুজা? রেখা কেমন করে ওর মনের কথা বুঝতে পেরে গেল। বলল, আজ তো দোল, তুই জানিস না? তাই তো চারদিকে এত রং।

তাই তো। শানু দেখল তার রংবেরঙের ফানুসগুলো ফেটে ফেটে চারদিক রঙিন করে দিচ্ছে। শানু হাওয়া থেকে দুটো ফানুস ধরে একটুও লজ্জা না পেয়ে বলল, আয় তোকে রং মাখাই। রেখা খিলখিল করে হেসে দৌড়াতে শুরু করল। দৌড়াচ্ছে আর একেকবার পেছন ফিরে তাকিয়ে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। শানুও ফানুস হাতে পেছন পেছন দৌড়াল। রেখার অনভ্যস্ত শাড়ি রাস্তায় লুটাচ্ছিল, শানু ভয় পেল ও যদি পড়ে যায়? ভাবতেই আঁচলে পা জড়িয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল রেখা। কিন্তু একটুও কি ব্যাথা পেল না? রাস্তার ধারে ঘাসের ওপর পড়ে তবুও কেন হাসছিল রেখা মেয়েটা? শাড়ি এলিয়ে পড়েছে, ওর লাল ব্লাউজে ঘেরা ছোট্ট বুক দুটো নিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে ওঠানামা করছে। গলার নীল শিরাটা তিরতির করে কাঁপছে। শানু মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ে রইল।

রেখা বলল, কিরে দেখছিস কি, আমাকে ওঠাবি না?

হাত বাড়াল শানু। রেখার হাত ধরতেই শিউরে উঠল সে। ভালো লাগার শিহরণ। যেন ছুঁয়ে দিতেই দুটো শরীরে অনুরণন হচ্ছে। কক্ষনও এমন হয়নি আগে। হওয়ার কথাও তো নয়। মা ছাড়া এই প্রথম কোনও মেয়ের হাত ধরা তার। হঠাৎ নিজের প্যান্টের দিকে চোখ পড়ল শানুর। অনুরণন তার শরীরের সর্বত্র পৌঁছে যাচ্ছে। তার প্যান্টটা ফুলে উঠে সেই শারীরিক উত্তেজনার জানান দিচ্ছে। একি! সে কি আজ জাঙ্গিয়া পড়তে ভুলে গেছে? রেখা কি বুঝতে পেরে হাসছে? ভয়ে লজ্জায় হাত সরিয়ে নিল শানু আর রেখা দড়াম করে পড়ে গেল। শানু এখন প্যান্টের ওপর দুহাত ঢেকে দৌড়াচ্ছে, পালাচ্ছে রেখার কাছ থেকে। শানু পালাচ্ছে আর চারদিকের রঙিন ফানুসগুলো রং বদলে বদলে কিরকম কালচে হয়ে মানুষের মাথা হয়ে যাচ্ছে। সবাই হাসছিল শানুকে দেখে। শানু ভয় পেল, সবাই এরপর তাকে নিয়ে মজা করবে। কী করবে সে এখন? ভাবতেই লম্বা পিচকিরি দিয়ে কেউ যেন হঠাত সব রং শুষে নিতে শুরু করল। শানু দেখল দ্রুত চারদিক অন্ধকার নেমে আসছে। অন্ধকারটা ভালো লাগল শানুর। ভয় না পেয়ে খুশি হল, জানে আর কেউ তাকে দেখতে পাবে না।

 

–আরে শান্তায়ন, তুমি এদিকে কী করতে? পিঠে স্কুলের ব্যাগ নিয়ে! তোমার বাড়ি তো এদিকে নয়।

বিনীত স্যার। স্কুলে ওর পিছনে সবাই ওকে ভিনি দ্য পু বলে ডাকে।

বিনীত স্যারকে দেখে শান্তায়ন গলায় জোর পেল। ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছিলাম স্যার, তারপর রাস্তা বুঝতে পারছিলাম না।

শানুর এমনি হয় মাঝেমাঝে। স্কুল থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। কিন্তু মাথার মধ্যে কতরকমের ভাবনা খেলতে থাকে। বুঁদ হয়ে যায়! কোন রাস্তা থেকে কোথায় যে চলে যায়। তারপর বাড়ির রাস্তাটা যে কোনদিকে সেটাই যায় হারিয়ে। আজকে যেমন হল। আসছিল বেশ, সাইকেল চালাতে চালাতে আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল মাঝে মাঝে। হঠাৎ আকাশে এক বিশাল পাখির ঝাঁক। পঞ্চাশ একশো নয়, তারও অনেক বেশি। অগুন্তি। ভি ফরমেশান করে চলেছে, আর না হলে হাজার। নিশ্চিত মরশুমি পাখি। সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে লম্বা গলা, আলো জড়িয়ে নিয়েছে ছড়ানো ডানাতেও। এমনই মনে হল শানুর, নাহলে অত উঁচুতে উড়ে যাওয়া পাখির কতটুকুই বা দেখা যায়!  হয়তো আসছে সাইবেরিয়া বা তার থেকেও কোনও দূর দেশ থেকে। ভাবলেই কেমন গায়ে কাঁটা দেয় শানুর। নিজের দেশ ছেড়ে, নিজের পরিচিত জলাশয় ছেড়ে বাচ্চা দিতে চলে আসে এত দূর এক দেশে। কোথায় যাচ্ছে ওরা? এরকম ভাবতে খুব ভালো লাগে শানুর। আরও দূরে কোথাও চলেছে, না কি দুর্গাপুরেই আস্তানা গাড়বে এই পাখির দল? শুনেছে দুর্গাপুরের কাছেই গড় জঙ্গলের দিকে একটা বড় দীঘি আছে, ওখানে শীতকালে পাখির মেলা বসে। সেখানেই যাচ্ছে কি? শানুর খুব ইচ্ছা হল ওদের সঙ্গে সঙ্গে যায়। যেমনি ভাবা, অমনি সাইকেলের স্পিড বাড়িয়ে মাটি থেকে ওদের অনুসরণ করা শুরু করেছিল। চাইলেই হয় নাকি? নীচ থেকে মনে হয় ওরা যেন কি আস্তে ভেসে যাচ্ছে আকাশের গায়ে। কিন্তু আসলে বেশ তাড়াতাড়ি পারাপার করছে। কী ডানার জোর! কিছুক্ষণ অবধি শানু কোনওমতে ওদের পিছনে এসেছিল, তারপর হাল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পরে জিভ বের করে হ্যা হ্যা করতে শুরু করল।

পাখিগুলোর সঙ্গে পারল না বলে এমন কিছু দুঃখ যে হয়েছে শানুর তেমন নয়। এই যে ওদের পিছন পিছন এতটা এল, ওদের সঙ্গী হয়ে, সেটাতেই কি কম আনন্দ? যদিও সেই আনন্দটা একটু কমে গেল যখন চারপাশে তাকিয়ে কোথায় এসেছে সেটা ঠিক ঠাহর করতে পারল না। কোথায় এসে পড়ছে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। অথচ এই পাখিগুলো বছরের পর বছর কোন দূর দেশ থেকে একবারও দিক ভুল না করে কেমন চলে আসে!

এমনিতেই এত দেরি! বাবা নিশ্চয় এতক্ষণে কলেজ থেকে ফিরে এসেছে। কতক্ষণে রাস্তা খুঁজে পেয়ে বাড়ি যাবে এই ভেবে একেবারে সিঁটিয়ে গেল শানু। বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই বাবা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চায়, কোথায় গিয়েছিল, কেন এত দেরি হল। সে যে নিজের জগতে হারিয়ে যায় এমন, বোঝানো মুশকিল। পরমেশ রেগে যায়, কী ভাবিস বল তো? একটা সোজা রাস্তা ধরে গেলেই স্কুল। সেখানেও হারিয়ে যাস কেমন করে? ফোকাস নেই কেন কোনও কিছুতে? কিচ্ছু হবে না জীবনে যদি ফোকাস না থাকে।

কোনও কোনও দিন সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। সেরকম দিন ঠ্যাঙানি নিশ্চিত। আজকের দিনটা ওইদিকেই গড়াচ্ছে দেখে ভয়ে কাঁপছিল শানু। এরকম সময়ে ভিনি দ্য পু যেন বরাভয় নিয়ে এগিয়ে এল।

–আপনি কোথায় গেছিলেন স্যার? শানুর মনে হল, কে জানে বিনীত স্যারও অমনি পাখির পিছনে এসেছে কি না!
–আরে আমার বাড়ি তো এদিকেই। বিকেলে একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। অত ঘাবড়াবার কিছু নেই। আমি পৌঁছে দিচ্ছি। তুমি রডে বোসো, আমি সাইকেল চালাচ্ছি।

শানু কিছু না বলে সাইকেলের সামনের রডে চেপে বসল। বিনীত স্যারের বিশাল চেহারায় যেন একেবারে ঢেকে যাচ্ছিল। সবচেয়ে মুশকিল বিনীত স্যারের ঘামে ভেজা বাঁ বগলটা নাকের এত কাছে যে বদ গন্ধে গা গুলিয়ে যাচ্ছিল। গন্ধের ঠেলায় বাবার মারের ভয়টাও কম মনে হচ্ছে এখন। তবুও এক্ষুনি এক্ষুনি স্যারের দয়ায় বাড়ি ফেরার রাস্তা খুঁজে পেয়েছে, শানু যতদূর সম্ভব গদগদ ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছিল।

–তুমি এদিকে কেন এসেছিলে?
–ইচ্ছা করে আসিনি স্যার। মুখ কাঁচুমাচু করে বলল শানু। আসলে কিছু একটা ভাবছিলাম, রাস্তার কথা মাথায় ছিল না। পাখির পিছনে ছোটার কথাটা বেমালুম চেপে গেল। নিজের মধ্যে এই গোপন জীবনটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে শানু, কাউকে বললেই তার স্বাদ কমে যাবে।
–বাহ বাহ, ভাবনাচিন্তা করা তো ভালো। এইভাবেই তো মানুষ নতুন কিছু আবিষ্কার করে। ডিপ থিঙ্কিং না থাকলে ওসব হয় নাকি?

বিনীত স্যার হায়ার সেকেন্ডারির ছেলেদের ফিজিক্স পড়ান, নাইন টেনেও ক্লাস নেন মাঝে মাঝে। শানুদের শুধু সপ্তাহে একদিন ফান সায়ান্সের ক্লাস, ছোট ছোট এক্সপেরিমেন্ট এসব। আর গল্প। বকবক করতে স্যারের জুড়ি নেই। আইনস্টাইন, নিউটন এইসব বড় বড় নাম, তাদের বড় বড় থিওরি— বেশিরভাগই শানুদের মাথার উপর দিয়ে চলে যায়।

গাছ থেকে আম পড়তে দেখেছিস তো? কেন পড়ে, উড়ে যায় না কেন? ভেবেছিস কখনও? ক্লাসে এসে এরকম আচমকা সব প্রশ্ন ছোড়েন বিনীত স্যার।

চুপচাপ থাকা ছেলেমেয়েগুলোর মুখ জরিপ করে বিনীত স্যার নিজেই বলতে থাকেন। ভাবিসনি কখনও, তাই তো? নিউটনের দেশেও এমনি আপেল পড়ত। সবাই দেখেছে কিন্তু কেউ ভাবেনি। একদিন নিউটনের মাথায় এমনিভাবে আপেল পড়েছিল— বলতে বলতে এগিয়ে এসে ফার্স্ট বেঞ্চে বসা শান্তায়নের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, তোর মাথায় একটা আপেল এসে পড়লে কী করতিস?

পিছনে বসা সুদীপ দাঁত বের করে হাসছিল, আমার মাথায় আম পড়েছিল স্যার, আমি অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম।

ক্লাস ভর্তি হাসির রোলের মধ্যে বিনীত স্যার বলেছিলেন, ওইখানেই তোর সঙ্গে নিউটনের ফারাক। তুই অজ্ঞান হলি। আর উনি অজ্ঞান মানুষকে জাগালেন আর বোঝালেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কথা।

কিছু জানা, কিছু অজানা এমনি সব কথা চলতে থাকে। মাধ্যাকর্ষণ শানুর আগেই জানা। একদিন যেমন আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরি নিয়ে বলতে শুরু করে দিলেন। সেটা শানুর জন্যে নতুন ছিল। বুঝুক না বুঝুক, স্যারের অদম্য উৎসাহের জন্যেই হোক বা গমগমে গলার অমোঘ আকর্ষণের জন্যে, সবাই খুব মনোযোগের সঙ্গে স্যারের কথা গিলতে থাকে। সাইকেল চালাতে চালাতেও বলছিলেন। ভীড়ের রাস্তা দিয়ে অসম্ভব আওয়াজ করে একটা মোটরসাইকেল চলে গেল। বিনীত স্যার বললেন— শোন শোন আওয়াজটা কেমন বদলে যাচ্ছে? বুঝতে পারছিস? একে বলে ডপলার এফেক্ট…

ডপলারের থিওরি বুঝতে বুঝতে বাড়ি এসে গেল। স্যার বললেন— চলো, প্রফেসর বোসের সঙ্গে একবার দেখা করে যাই।

পরমেশ বাড়িতে ছিল না, কিন্তু সুতপা ছিল। বিনীত স্যার তার সঙ্গেই আলাপে জুটে গেলেন।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন, আপনার ছেলে খুব শার্প।

–আমেরিকাতে পড়ত তো। ছেলের দিকে পরম স্নেহে তাকালেন সুতপা। ওইখানেও ক্লাসে সবার উপরে থাকত। আপনারা ওকে গাইড করবেন, এখানেও ভালো করবে।

বিনীত স্যার সিঙারায় কামড় দিলেন। দেখেই বুঝেছি! আর কিছু না, ভালো মেটেরিয়াল পেলে মাস্টারদের তো পড়িয়েও আনন্দ। ছাত্র গড়ার কাজ আমাদের।

উঠতে উঠতে বললেন, আমি চোখ রাখব ওর ওপরে। ভিনি দ্য পুকে দুলে দুলে চলে যেতে দেখে ফিক করে হেসে ফেলতেই মা ধমক লাগাল, হাসছিস কেন? এত ভালো টিচার! আজকালকার দিনে সবাই কোচিং ক্লাস খুলে বসে আছে, আর দ্যাখ এত ভালো, যে আগ বাড়িয়ে ছাত্রদের হেল্প করতে চায়। কজন পাওয়া যায় এরকম?

স্যার বলতেন, ওর মুখে তো আটকাত না কিছুই— আমিও গোয়াল খুলব রে ওই চিরঞ্জিত স্যার কিংবা গোপাল ভৌমিকের মত, যখন বিয়ে করব। টাকা চাই, নাকি? তখন কি আর ক্লাসে এসে এত পড়াব? তোদের নোট দিয়ে দেব, আর ক্লাসে বসে রেস্ট নেব। গলাটা বাঁচিয়ে রাখব আমার সন্ধ্যার ব্যাচের জন্য।

সবাই হো হো করে হাসত।

বিয়ে করেনি বলেই হয়তো, স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পরেও স্যার অনেকক্ষণ স্কুলের ল্যাবে বসে থাকত। শানুদের এখনও ল্যাব নেই। তাই ল্যাবের এই বন্ধ দরজার পিছনে কী আছে সেটা দেখার এক অদম্য কৌতূহল। ছুটির পর বেরোবার পথে ল্যাবের ঘোলাটে কাচের জানলা দিয়ে উঁকি মারছিল একদিন। শানু আর হীরক। স্যার হাতছানি দিয়ে ডাকলেন।

সাহস করে দরজা ঠেলে ঢুকতেই ভিনি দ্য পু সোৎসাহে হাঁক পাড়লেন, কী রে দেখবি না কি? আয়, আয় চলে আয়।

ঘরের একপাশে টেবিলের উপর সারি সারি বয়াম, লম্বা লম্বা কাচের নল, বিকারে কত রঙের তরল। কাচের বাক্সের মধ্যে ছোট ছোট দাঁড়িপাল্লা। আরেকটা টেবিলে মাইক্রোস্কোপ। চারদিকে রকমারি যন্ত্রপাতির মাঝখানে প্রবেশাধিকার পেয়ে দুজনেই এক অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করছিল। স্কুল ছুটির পরেও এই ল্যাবে বসে ভিনি দ্য পু কি গবেষণা করে সেটা নিয়ে ওদের অনেক জল্পনাকল্পনা চলে, আর আজ কিনা তারা সেখানেই!

ভিনি পট করে নিজের মাথার একটা চুল ছিঁড়ে মাইক্রোস্কোপের তলায় ফেললেন। শানু আর হীরক হুমড়ি খেয়ে মাইক্রোস্কোপে চোখ লাগাল। উপস, সরু চুলটা কি মোটা লাগছে! তারপর নানান রকম কেমিক্যাল মিশিয়ে হলুদ সবুজ রং বানানো হল। ভিনি দ্য পু শানুর কাঁধে হাত রেখে বললেন, কিরে কেমন লাগল? সায়ান্সে কত রকম মজা, তাই না?

শানু আর হীরক খুশিতে মাথা নাড়তে বলেছিলেন, আজ যা, অন্য একদিন সময় করে কিছু এক্সপেরিমেন্ট দেখাব। শানু আর হীরক লাফাতে লাফাতে বাড়ির পথে। বড়দের ল্যাবে ঢোকার এহেন সৌভাগ্যের কথা সবাইকে ফলিয়ে ফলিয়ে বলেওছিল।

আবার যে এমন সুযোগ হবে আশা করেনি। স্কুল থেকে ফেরার সময় একদিন ল্যাবের দরজায় দাঁড়িয়ে বিনীত স্যার। হাতছানি দিয়ে ডাকলেন। এক্সপেরিমেন্ট দেখবি?

দুবার বলতে হয়? মহোৎসাহে ল্যাবে ঢুকেছিল শানু।

বিনীত স্যার একটা বিকার নিলেন, সাদা সাদা ক্রিস্টালের মত কিসব ঢাললেন। এটাকে বলে হাইড্রোজেন পারক্সাইড। এইবার দ্যাখ, এতে ঢালছি পটাসিয়াম আয়োডাইড— বলতে বলতেই থকথকে সাদা ধোঁয়া বীকারের সরু মুখ থেকে বেরোতে শুরু করল এমন আচমকা! শানু স্যারের কেরামতিতে হাঁ হয়ে গেল।

–ইলেক্ট্রিসিটি কী জানিস?

মাথা নাড়াল শানু, হ্যাঁ। এটা কেন জানবে না?

–আসে কোথা থেকে? ওকে অন্য একটা টেবিলের দিকে নিয়ে যেতে যেতে চোখ নাচাল স্যার।
–ইলেকট্রিসিটি তো অনেকভাবেই তৈরি হয় স্যার। জলবিদ্যুৎ। তারপর কয়লা পুড়িয়ে। আজকাল তো আণবিক শক্তি থেকেও—
–বাহ, বেশ জানিস তো। এবার বল সেটা আমাদের বাড়িতে পৌঁছায় কী করে?
–তার দিয়ে, ওই যে রাস্তার পোলে তার ঝোলে, ওইখান থেকে…
–বাহ, গুড। এবার বল শুধু দূরে কোথাও তৈরি করে হাইটেনশান তার দিয়ে পাঠানো হলেই কি ইলেক্ট্রিসিটি? এমন যদি হত, যে মানুষের শরীরেও এটা প্রডিউস করা যেত?
–স্ট্যাটিক ইলেক্ট্রিসিটির কথা বলছেন স্যার? শানুর মনে পড়ল দরজার নবে আচমকা শক খেয়ে লাফ দিয়ে ওঠার কথা।

উত্তর শুনে ভিনি দ্য পু খুব খুশি। তার মানে তোর আমার শরীরে কারেন্ট আছে। আয় তবে সেটা মেপে দেখি।

–মাপা যায়?

একগাল হাসলেন স্যার। মাপা যাবে না? যা মাপা যায় না, গোনা যায় না, সেটা দিয়ে সায়ান্স চলে? এই দ্যাখ, এটাকে বলে ভোল্টমিটার, এটাতে মাপব। তোর জামাটা খোল। আর জুতোটাও।

শানু একটু ভয় পেল। ব্যথা লাগবে না তো? কিন্তু না বলারও সাহস পেল না। স্যার ভোল্টমিটারের একদিকের ক্লিপের সঙ্গে একটা টিনের পাতের মত লাগিয়ে মাটিতে রাখলেন। পা-টা রাখ এটার ওপর।

শানু যেন যন্ত্রচালিতের মত স্যারের কথা শুনে করে যাচ্ছিল। স্যার এবার আরেকটা তারের একটা ডগা ঠোঁটের ডগায় ছোঁয়ালেন, ভোল্টমিটারের কাঁটাটা কি লাফিয়ে উঠল? স্যার এবার গুঁজে দিলেন বগলে, সুড়সড়ি লাগছিল শানুর। বুকের বোঁটায় লাগাতে কেমন যেন শিউরে উঠল শরীরটা। সেটা কি স্যারের হাত ছুঁয়ে যাওয়ার জন্য! শানু কেমন ভেসে যাচ্ছিল, আর দূর থেকে স্যারের গলা ভেসে আসছিল যেন।

এবার প্যান্টটা খোল, নিচে নামা। স্যারের হাতে ধরা ক্লিপটা নেবে আসছিল নিচে। শানু তার শিশ্নতে ধাতব স্পর্শের সঙ্গে পেল চামড়ার ছোঁয়া। নিজের অজান্তেই সেটা ভোল্টামিটারের কাঁটার মত থরথর করে কাঁপতে লাগল। খুব ভয় লাগছিল শানুর। কানে বীরুর কথা ভেসে এল, কিরে তুই শান্ত নুনু, না অশান্ত?

–ভয়ের কিছু নেইরে, কিচ্ছু হবে না। এই দ্যাখ আমারটাও মাপছি। সটান নিজের প্যান্টটা নামিয়ে ফেলল ভিনি দ্য পু। নে, তুই ধর ক্লিপটা। সজোরে শানুর হাতটা টেনে নিয়ে জড়িয়ে দিল নিজের পুরুষাঙ্গে। শানুর হাতের মধ্যে থরথর করে কাঁপছিল বিনীত স্যার।

এই সময়ে স্যারের হাত ছাড়িয়ে শানু লম্বা ছুট দিল। ল্যাবের ছিটকিনিটা খুলে যখন রাস্তায় লাফ মারল খেয়ালও করেনি যে পায়ের জুতোজোড়া গলানো হয়নি। কোনওমতে নেবে যাওয়া প্যান্টটা উপরে টেনে তুলে ছুটতে থাকল বাড়ির দিকে।

অনেকক্ষণ অবধি ভয় লাগছিল শানুর। স্যার পেছনে আসছে না তো? কী করবে এবার? বাড়িতে কি কিছু বলবে? সেকি এমনি এমনি ভয় পেয়ে গেল নাকি সায়ান্স এক্সপেরিমেন্ট এমনটাই হয়? ওর মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। বাবাকে বললে মার খাবে। মাকে বলবে কি?

এইসব ভাবতে ভাবতে বাড়িতে ঢুকতেই শুনতে পেল ভিনি দ্য পুর দরাজ গলা, ওই তো এসে গেছে! শুধু শুধু চিন্তা করছিলেন আপনারা।

–স্কুল ছুটির পর এত দেরি হল কেন শানু, মার প্রশ্ন।

শানু কিছু বলার আগেই স্যার মুখের কথা কেড়ে নিলেন, আহা এই বয়সের ছেলে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল হয় তো। খেলার বয়স, তবে পড়াশোনাটাও করতে হবে। আমি তো এবার থেকে দেখিয়ে দেব, কোন চিন্তা করবেন না।

শানু কেমন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, কিছু বুঝতে পারছিল না। মা বলল— শানু, তুই তো বাবার কাছে পড়তে গাঁইগুঁই করিস এত। তোর বাবাও বলছিলেন কোনও প্রাইভেট টিউটর রেখে পড়াবেন এবার। বিনীত স্যার বলেছেন এবার থেকে তোকে প্রাইভেটে পড়াবেন, উনিই বাড়িতে এসে পড়াবেন। মা স্যারের দিকে মাথা হেলিয়ে বলল, আপনাকে যে কীভাবে ধন্যবাদ দেব। তবে ওর বাবাকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে। আসলে এসব ব্যাপার ওর বাবাই ঠিক করে।

ভিনি দ্য পু জোরে জোরে মাথা ঝাঁকালেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ সে তো নিশ্চয়। উনি নিজে প্রফেসার মানুষ। আমার চাইতে সায়ান্স অনেক বেশি জানেন। তবে হয় কি স্কুলের বাচ্চাদের পড়ানোটা একটু অন্যরকমের। তাছাড়া কলেজের পড়া পড়িয়ে ছেলের জন্য ওনার অত সময় কোথায়? সেই জন্যেই বলা।

শানুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। কী হবে এবার? মাকে কীভাবে বলবে এরপর? কেউ কি ওর কথা বিশ্বাস করবে? এই জাঁতাকল থেকে এবার বেরোবে কিভাবে? বাবাকে বলতে হবে। বলবে, বাবার কাছে ছাড়া আর কারও কাছে পড়তে চায় না সে। বাবা নিশ্চয় খুশি হবে শুনে। পড়তে বসে পরমেশের হাতে মার খাওয়াটাও এখন তুচ্ছ হয়ে গেছে শানুর কাছে।

চোখের সামনে বিনীত স্যারের ভালুকমার্কা চেহারাটা বেলুনের মত ফুলেফেঁপে উঠছিল, ঢেকে দিচ্ছিল চারপাশের সবকিছু, শুষে নিচ্ছিল সব আলোবাতাস আর থিকথিকে ধোঁয়াটে অবয়বে ছড়িয়ে যাচ্ছিল বাড়ির আনাচেকানাচে পটাসিয়াম আয়োডাইড আর হাইড্রোজেন পারক্সাইডের এক্সপেরিমেন্টের মত।

পরমেশ বাড়ি আসতে সুতপা যেই না বিনীত স্যারের কথা বলেছে, শানু লাফিয়ে উঠল। আমি ওর কাছে পড়ব না বাবা।

–কেন? ভুরু কুঁচকাল পরমেশ। শুনলাম তো খুব যত্ন নিয়ে পড়ান। অসুবিধাটা কী?
–পড়ানোর চাইতে গল্প করেন বেশি। ক্লাসে এসে একগাদা গল্প, একদম ফোকাস নেই বাবা।
–কদিন বাদে নাইনে উঠবি। এই চারটে বছর খুব ক্রুসিয়াল। একজন টিউটর থাকা তো খারাপ নয়।
–আমি তোমার কাছে পড়ব বাবা। তুমি থাকতে সায়ান্সের জন্য বাইরের টিচার দিয়ে কী হবে? বরং ইংরাজিটা একটু দেখিয়ে দেওয়ার কেউ থাকলে ভালো হয়।

পরমেশ অবাক হল। কিন্তু খুশির হাসিটা মুখে ছড়াতে দেরি হল না। কাছে এগিয়ে এসে শানুর মাথাটা নিজের হাতের তালুর মধ্যে টেনে নিল পরমেশ। সুতপার দিকে তাকিয়ে বলল, দেখেছ? তুমি বলো আমি নাকি কথায় কথায় ছেলেকে মারি, ছেলে আমাকে ভয় পেতে শুরু করেছে। আসলে মারের পিছনে যে ভালোবাসাটা থাকে সেটা এইটুকু ছেলেও বুঝতে পারে। আনন্দে জ্বলজ্বল করছিল পরমেশের চোখ। সত্যিই তো, আমি থাকতে সায়ান্সের সাবজেক্টের জন্য অন্য কোনও টিচার রাখার কী দরকার? আমিই ওকে নিয়ম করে পড়াব। বুঝলি শানু, এবার তোর জন্য একটা পাক্কা শিডিউল করে নেব। সামনের চারটে বছর তোর জন্য বড্ড ইম্পরট্যান্ট। দাঁড়া, আমি ইংরাজির জন্য একজন ভালো টিউটর ঠিক করছি।

–আমি স্কুলের টিচারদের কাছে ব্যাচে পড়ব না বাবা। ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাটেনশান না পেলে গোড়া শক্ত হয় না। মাধ্যমিকে ভালো করতে হলে ইংরাজিতেও লেটার পেতে হবে।

পরমেশের চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ছেলের নিজের থেকে চার হচ্ছে। ব্যস, আর কী চাই। মাথা ওর খুব ভালো, অভাব ছিল ফোকাসের। এইবার সেটা নিয়েও আর ভাবনা নেই। আচ্ছা, আমি খোঁজ নিচ্ছি। যদি কেউ থাকে তোকে বাড়িতে এসে পড়াতে পারে।

সুতপা হাসিমুখে রান্নাঘরে গেল। পরমেশের নাড়িনক্ষত্র তার জানা। এখন সারা সন্ধে খুব হাঁকডাক করে ঘুরবে। রাগ করে নয়, খুশির।

 

–কোথায় হাম্বার আর কোথায় বিএসএ! যাকে বলে খানদানি, নীল রক্ত। তোর ওই বিএসএ তো সেদিনকার চ্যাংড়া। বিমল এই তুলনাতেই যেন শিউরে উঠছিল।
–ঝন্টু, পিকলু সবার বিএসএ সাইকেল বাবা, নতুন ডিজাইনের।
–কিন্তু পলকা, নেহাতই পলকা। বাইরের মোড়ক দেখে ভুলিস না। থাকবে সেই সাইকেল তিরিশ বছর? তিন বছরেই ফক্কা। মুখ ফস্কে কথাটা বলেই আফসোস হল বিমলের, কিন্তু তখন দান বেরিয়ে গেছে। হীরক তিরিশ বছর শুনেই কঁকিয়ে উঠেছে, তিরিশ বছরের পুরনো সাইকেল? আমি কক্ষনও চালাব না অত পুরনো ঝরঝরে সাইকেল।

হীরক অনেক দূরে দূরে টিউশন করতে যাবে তাই এবার সাইকেল লাগবে। চিনু ছোট, এখনও সাইকেল চালাতে জানে না। ওর মতামতের কোনও মূল্য দিচ্ছিল না কেউ, তাই রাগ জমছিল। এই মওকায় তাই উল্টো দানে খেলে— কিন্তু দাদা বিদেশি সাইকেল, মজবুত হবে।

–তবে আর বলছি কী! নতুন চালাচ্ছিস, কতবার পড়বে, ভাঙবে। জোরদার সাইকেল না হলে চলে? আমিও কিনে দিতে পারি একটা বিএসএ। খুব সোজা, দোকানে যাও, টাকা দাও আর নিয়ে আসো। কিন্তু এমনটা আর পাব?

আসলে অত সোজাও নয়। একটা নতুন বিএসএ সাইকেল হাজার ছাড়িয়ে। কিন্তু এই হাম্বারটা জলের দরে পেয়ে যাচ্ছে। যতীনের রিপেয়ার শপে কথা হয়েছে, ও টুকটাক কিছু কাজ করবে, চেন বদলাবে, রডের মরচে ঘষেটসে দেবে শখানেক টাকায়।

হীরককে মানানোও তো কিছু সহজ না। বেশ কদিন ধরে চাপানউতোর চলেছিল, তারপর রফা হয়েছিল কদিন চালিয়ে পছন্দ না হলে এই সাইকেল ফেরত যাবে, আর বিমল কিনে আনবে বিএসএ সাইকেল।

নীলিমা শুনে আঁতকে উঠেছিল। বলো কী, তখন আবার আরেকটা কিনবে?

–ধুর, তুমিও যেমন। একবার হাতে পেলে ওটা ওর জিনিস, প্রাণে ধরে ফেরত পাঠাবে? ওকে তুমি চেনো না?
–কিন্তু পুরনো লোহালক্কড়ের দরে কিনছ, কতদিন টিকবে?
–ব্রিটিশের মাল, দুশো বছরের জন্য টেঁকসই। বিমল নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করে হেসে উঠেছিল। দেখো না আমরা থাকব না, তখনও এই সাইকেলটা সার্ভিস দিয়ে যাবে।

বিমলের কথাই ঠিক। সাইকেলটা যখন সারিয়ে, ঘষেমেজে এল আর তাতে চেপে দু-এক পাক মেরে চোখমুখে হাওয়া মেখে আসল হীরু, তখন আর মনেই নেই সাইকেলটা নতুন না পুরনো। নিজের সাইকেল, সেটাই বড় কথা। অন্যের সাইকেলে শিখেছে। শিখতে গিয়ে পড়েছে, নিজের পা ছড়ে গেলে ক্ষতি নেই কিন্তু চেয়ে নেওয়া সাইকেল টসকালে বেশি চিন্তায় থাকত। কথাও শুনতে হয়েছে সেজন্য। আজ সে চিন্তা নেই। বনবন করে চাকা ঘুরছিল, হাওয়ায় লতপত করছিল চুল। একেবারে বেনাচিতির মুখ থেকে ঘুরে আসল হীরক। এমন কপাল রাস্তায় বন্ধুদের কারও সঙ্গে দেখাই হল না, মজা হত ওদের নাকের ডগা দিয়ে নিজের সাইকেল হাঁকিয়ে চলে যেতে।

কাউকে কেন পাওয়া যায়নি, সেটা বোঝা গেল বাড়ির দরজায় এসে। কারণ ওরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিল হীরকের বাড়ির দরজায়।

রাস্তার ওপারে দুগাছা লাঠি আর চটের বস্তা হাতে নিয়ে বীরু। কি রে, সকাল নটায় হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল না?

–কেন? কোথায়? বলতে বলতেই মনে পড়ে গেল যদিও।
–আজ বুড়িপোড়া, আর বলছিস কোথায়— বিরক্তিতে পা ঠোকে বীরু। আর তুই নতুন সাইকেল হাঁকাতে বেরিয়ে পড়েছিস?

ঝন্টু, পিকলু, তোতন সবাই ওর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর কী।

–ও দাঁড়াও বীরুদা, এখুনি আসছি। আজ সকালে শুকনো পাতা জড়ো করতে যাওয়ার কথা, কেমন করে ভুলে গেল!
–শোন, কাকিমার কাছ থেকে দুটো বস্তা পেলে আনিস তো— বীরু মনে করিয়ে দেয়।

মার কাছ থেকে গুল কয়লার খালি বস্তা নিয়ে হীরক এক লাফে বাইরে।

–হীরু, আঁদাড়েপাদাড়ে ঘুরবি— যেন চটিছাড়া করবি না— আর সাপখোপ দেখে— পেছন থেকে নীলিমার হাঁক, কিন্তু পাঁচিল টপকে রাস্তায় লাফ মেরে হীরক তখন পাখি।

বুড়িপোড়ার দিন ওদের নোংরা ঘাঁটার একটা স্বাধীনতা আছে, এর ওর বাগানে ঘুরে শুকনো পাতা জোগাড় করে বস্তায় পোরা আর মাঠে যেখানে বুড়ির ঘর হবে সেখানে এনে ফেলা। মজাই আলাদা।

বীরু বুড়িপোড়ার লিডার, সে আগে থেকে বাঁশ দড়ি সব জোগাড় করে রেখেছে। প্রথমে চারটে গর্ত খুঁড়তে হবে— বুড়ির ঘরের খুঁটি পোঁতার জন্য। ওটা পিকলুর দায়িত্ব— শাবল চালাতে গায়ে জোর লাগে তো। ও ওর বাবার সঙ্গে বাগানের কাজ করে, তাই কোদাল-শাবল চালাতে দড়। মাঠের মাঝখানে পটাপট গর্ত খোঁড়া হল। চারটে বাঁশ পুঁতে বুড়ির ঘরের কাঠামোও তৈরি।

বিপ্লবদা আর সুবোধকাকু মাঠের ডান সীমানার পাঁচিলে দেওয়াল লেখায় ব্যাস্ত ছিল। ওরা লাল পার্টি করে, দেওয়ালে দেওয়ালে শ্রমিক শোষণ আর বিপ্লবের কথা লেখে। বিপ্লবদা সেখান থেকে হাঁক পাড়ল— বুড়ির ঘর কত উঁচু এবার তোদের?

এটা বীরুর একটা দুর্বল জায়গা। গেলবার পাশের পাড়ার সাতুদের বুড়ির মাচান তাদের থেকে কম করেও তিন হাত মত উঁচু হয়েছিল। আগুনের ফুলকি মাঝখানের গাছ, বাড়িঘরের মাথা ছাড়িয়ে এ পাড়া থেকেও দেখা গেছে, জ্বলেওছে অনেক বেশি সময় ধরে। এবারেও হারলে চলবে না।

–সাতুদের থেকে এবার বড় করব, বিপ্লবদা।
–আমি একবার দেখে আসব ওদেরটা? হীরু সাইকেল সওয়ার হয়ে যেতে চাইছিল।

বীরু নিজেই সকালবেলা ও রাস্তা ধরে সাইকেল নিয়ে একটা চক্কর মেরে এসেছে, ওদের খুঁটি পোঁতা দেখার জন্য। বেছে বেছে ওদের থেকে বড় বাঁশও সকাল সকাল জড়ো করে এনেছে ও আর পিকলুতে মিলে।

–আমাদের বুড়ি এবার ওই নারকেল গাছের মাথা ছাড়িয়ে যাবে বিপ্লবদা। বলতে বলতে পিকলুর মুখে বিশ্বজয়ের হাসি।
–অত পাতা কোথায় পাব বীরুদা? হীরু অবাক। নারকেল গাছ অবধি, সে তো অনেকটা।

বীরুর মুখে বেপরোয়া হাসি— হবে, হবে। সব ঠিক করা আছে, এখন শুধু কাজে লাগতে হবে।

পিকলু বীরুর ডান হাত, বলল— জগেনবাবুর বাঁশবাগান থেকে পাতা আনব, কাল আমি আর বীরুদা দুটো পাতার ঢিবি বানিয়ে এসেছি। আগে পাড়ার পাতা কুড়িয়ে নিই, তারপর।

জগেনবাবুর বাগান— ওদের পাড়ার থেকে বেশ দূরে, সে বিশাল বাঁশের ঝাড়। ভেবেই উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে হীরক— মা জানতে পারলে—

তোতন বেঁকে বসল— আমি অত দূর যাব না বীরুদা, বাবা শুনলে গায়ের ছালচামড়া তুলে নেবে।

তোতনের ছোটবেলায় পোলিও হয়েছিল, বাঁ পাটা একটু সরু আর ব্যাঁকা। নেংচে নেংচে হাঁটে। বীরু শুনে খুশিই হল। আচ্ছা আচ্ছা তোর অত দূর হেঁটে কাজ নেই, পায়ে লাগবে। বরং আমরা যখন যাব এখানে পাতা পাহারা দিবি।

এই কথায় তোতন খিঁচিয়ে উঠল। কেন, তোরা যেতে পারিস, আমার কেন পায়ে লাগবে? আমি ল্যাংড়া বলে?

বীরু দু হাত উল্টাল। যাব্বাবা! বিদ্যাসাগর বলেছেন ল্যাংড়াকে ল্যাংড়া বলিবে না। আমিও বলিনি। তুই নিজেই তো যাবি না বললি। বাপের ঠ্যাঙ্গা খেতে চাস তো চল না।

তোতন মুখ গোঁজ করে থাকল কিছুক্ষণ। কিন্তু একবার পাতা কুড়োনো শুরু হতে সব ভুলে গেল। দুটো দল হল— বীরু, তোতন আর কুকু একটা দল করে বেরোল শ্যামলদা, টুসিদি, মিত্তিরকাকুদের বাড়িগুলোর দিকে। ওগুলো দু পাড়ার সীমানায়— তাই আগে যেতে হবে। না হলে সাতুরা এসে যেতে পারে— পাতার দখলদারি নিয়ে অনেক সময় বচসা থেকে হাতাহাতিও হয়ে যায়। পিকলু, হীরক আর ঝন্টু চলল পাড়ার দক্ষিণ কোণা ধরে। নিজেদের বাড়ি থেকে সব শেষে নেওয়া হবে— যার যার বাড়িতে গত সাতদিনের ঝরা পাতা আগে থেকেই এককাট্টা করে রাখা আছে।

–বিপ্লবদা! যাওয়ার আগে বীরু হাঁক পাড়ল। আমাদের খুঁটিগুলোতে একটু চোখ রেখো। সাতুরা যেন আবার—

বুড়িপোড়ায় এরকম রেষারেষি হয়ে থাকে। এসে খুঁটি উপড়ে দিয়ে চলে গেল, কি অন্য পাড়ার বুড়ির ঘর আগে থেকে এসে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। তাই সাবধানে থাকতে হয়।

–কোনও চিন্তা নেই। আমি আজ এখানে সারাদিন। চোখ রাখব, তোরা পাতা কুড়োগে যা।

পাতা কুড়োতে গিয়ে কোথা দিয়ে যে সময় চলে গেল। এক জায়গায় পাতার তলায় কুকুরের গু ছিল, হীরকের হাতে লেগে মাখামাখি। চলল হাত ধুতে।

কেন যে ওই অবস্থায় পাড়ার মেয়েদের মুখোমুখিই পড়তে হয়! তাও আবার রেখা।

রেখা আর বীথি রাস্তার কলের দুপাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল।

ওকে দেখে হেসে কুটোপাটি— বেশ হয়েছে। পাতার সঙ্গে কুকুরের গুও পুড়বে, তোদের আলুপোড়ার টেস্ট খুব ভালো হবে।

নিঃশব্দে দাঁত পিষে হীরক গাম্ভীর্য বজায় রাখল— কালকে বলেছিলি একটু আলুপোড়া দিতে, দেব না তাহলে না হয়।

রেখা ছদ্মকাতর চোখে তাকাল এবার, তাই বলেছি নাকি? টেস্ট ভালো হবে সেটা বললাম তো। পরমুহূর্তে দ্বিতীয় দফার খিলখিলানি ছড়িয়ে পড়ে।

গলা পেয়ে মা ততক্ষণে বাইরের বারান্দায় উঁকি মেরেছে— এই যে! চেহারাটা কি ভূতের মত হয়েছে দেখেছিস? হাঁটু অব্দি ধুলো— বুড়িপোড়ার নামে তুমি হাতির পাঁচ পা দেখেছ আজ— ব্যস, ছ্যাবলা মেয়েগুলোকে মুখের মতন জবাব দিয়ে ওঠা হল না আর। মাঝখান থেকে আরও হেনস্থা হয়ে গেল। কদিন আগেও একসঙ্গে খেলেছে সবাই মিলে, কিন্তু এখন কেমন আধা অচেনাপনার বেড়া খাড়া হয়ে গেছে। আরও বেইজ্জত হবার আগেই হীরু লম্বা লম্বা দৌড়ে মাঠে। তাও তো মা জানে না সে সাইকেল চেপে জগেনবাবুর বাঁশবাগানে গেছিল। না হলে আরও কিছু কথা শুনতে হত এদের সামনেই।

দেখতে দেখতে বুড়ির ঘর বেশ উঁচু হল— মনে হয় সাতুদের থেকে বড়ই হবে। বীরু এবার ঝন্টুকে পাঠাল ওদেরটা চুপিচুপি দেখে আসতে— ঝন্টু তো ছোট, তাই ওরা খেয়াল করবে না।

শুধু পাতা আনলেই তো হবে না, ঘরের চারপাশে দড়ি দিয়ে ভালো করে বেড় দিতে হবে, না হলে আগুন জ্বালানোর পর আগুনে পাতা এদিক ওদিক ছিটকে যাবে। বিপ্লবদাও এসে ওদের সঙ্গে হাত লাগাল, ভালো করে টেনে বেঁধে দিল।

–এই, বুড়ি কোথায় তোদের? বুড়ি বানাবি না?

মাচানের মাঝখান দিয়ে একটা বাঁশ আরও উঁচুতে উঠে গেছে, ওটার মাথায় বুড়ির মুখ আটকানো হবে। যাতে সবার শেষে আগুন লাগে বুড়ির গায়ে।

বানাব বিপ্লবদা, একখানা দুকেজি দইয়ের খালি হাঁড়ি রেখেছি। বীরু সাহস করে চেয়েই ফেলল— তোমাদের থেকে একটু রং দেবে বিপ্লবদা?

–দেব রে দেব। বিপ্লবদার মুখে প্রশ্র্য়ের হাসি। আচ্ছা, আমিই না হয় তোদের বুড়ির মুখটা বানিয়ে দেব।

ওদের মধ্যে খুশির হুল্লোর। বিপ্লবদা খুব ভালো ছবি আঁকে। দেওয়ালের লেখার সঙ্গে সব শ্রমিক কৃ্ষকের ছবি বিপ্লবদাই তো আঁকে। বীরু গর্বিত মুখে হীরুদের দিকে তাকাল— যেন প্রস্তাবটা তার দিকে থেকেই এসেছে।

–শোন, ঘোষজেঠুর বাগানে লম্বা লম্বা ঘাস আছে, কিছু শুকনো ঘাস আনিস তো, বুড়ির চুল হবে। আর একটু— আচ্ছা ঠিক আছে। আমার কাছেই পোস্টার মারার আঠা আছে। আমি নিয়ে আসব।

বেলা অনেক হয়েছিল— হীরক বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। বীরু রয়ে গেল, একজনকে তো পাহারা দিতে হবে। পিকলু আর তোতন গেল ঘোষজেঠুর বাড়ি থেকে লম্বা লম্বা ঘাস জোগাড় করতে।

হীরুর ফিরতে একটু দেরিই হয়েছিল। মার কাছে বকার পাট চুকতে, রূপার তত্ত্বাবধানে ঘষে ঘষে সারা গায়ে সাবান দিতে হল।

–কী লাভ মা, আবার তো এখুনি যাবে আর কুকুর বিড়ালের গু লাগিয়ে আসবে— তার মানে ঘরে খবর পৌঁছে এই নিয়ে একদফা আলোচনা হয়ে গেছে এর মধ্যেই। রেখাটা না! নিষ্ফল আক্রোশে রূপার দিকেই হীরক নীরবে অগ্নিবর্ষণ করল।
–আবার বাঁশবাগানে গেলে ঠ্যাং ভেঙে দেব হীরু—

তার পেটে কথা থাকে না। বাড়ি এসে গর্ব করে রূপার কাছে ফাঁস করেছিল জগেনবাবুর বাঁশবাগানে যাওয়ার কথা। সে কথা মায়ের কানে যেতে বিন্দুমাত্র সময় লাগেনি— এখনও কানটা কটকট করছে।

স্নান করে, চোখে মুখে ভাত গুঁজে যখন মাঠে এসে পৌঁছাল, তখন সবাই এসে গেছে। বিপ্লবদা বুড়ির মুখ আঁকছিল— বীরু ভর্ৎসনার চোখে তাকাল। বুড়ির মুখ আঁকা নিয়ে সবাই খুব এক্সাইটেড, তাই মুখে কিছু বলল না।

বিপ্লবদা খুব মনোযোগ দিয়ে বুড়ির মাথাটা বানাচ্ছিল। নাকের জায়গায় মাটি দিয়ে লম্বা টিকাল নাকও লাগিয়েছে। ওরা কখনও এতটা করে না, এমনি সাদা রং দিয়ে এঁকে দেয়। এবারেরটা দারুণ হচ্ছে।

–দে দে, লম্বা ঘাস দে কগাছি— হাত বাড়াল বিপ্লবদা। আরে, ভেজা ঘাস মিশিয়েছিস কেন একসঙ্গে, আগুন ধরবে না ভালো। বুড়িকে ভালো করে পোড়াতে হবে না?

বীরু আর বিপ্লবদা মিলে শুকনো ঘাস আলাদা করে নিল। গঁদের আঠা দিয়ে সেই ঘাস মাথায় সেঁটে চুল তৈরি হল। তারপর সেই চুলে বিপ্লবদা কালো রং করল। শেষে আবার জায়গায় জায়গায় সাদা রং লাগাল, একধারে সিঁথি— ঠিক সেই সিঁথির দুধার দিয়ে। চোখ নাক মিলিয়ে একটা চেহারা নিল, বেশ চেনা চেনা যেন। হঠাৎ মনে পড়ল ইলেকশনের পোস্টারে ফেস্টুনে দেখেছে।

বীরু বলল— বিপ্লবদা, এটা…

মুচকি হাসল বিপ্লবদা, বুড়িপোড়া হচ্ছে জঞ্জাল সাফাই আর আপদ বিদায়ের দিন। এর থেকে বড় আপুদে বুড়ি আর আছে?

মইয়ে চড়ে গোরা বাঁশের টঙ্গে বুড়ির মাথা ঝুলিয়ে দিল। বাঁশের গায়ে ছেঁড়া শাদা কাপড় জড়িয়ে শাড়ি পরানো হল— বেশ লাগছিল হীরকদের। সাতুদের পাড়ায় এত ভালো কিছুতেই হয়নি।

বিপ্লবদা যাওয়ার আগে বলল— এত কিছু করে দিলাম, আমার জন্য পোড়া আলুমাখা রাখতে ভুলিস না যেন।

পাঁচটা বেজে গেছিল, আরও ঘন্টাখানেক বাদে সন্ধ্যা নামলে পোড়ানো হবে। ওরা জনে জনে গিয়ে সাতুদের মাচান দেখে নিশ্চিন্ত হল, এবার তাদেরটাই সবার ওপরে। ওরাও এসেছিল। সাতুটা কেমন মুখ কালো করে চলে গেল। পাড়ার কাকু-জেঠুরাও এসে দেখে গেল। বুড়ির চেহারা দেখে অনেকে হাসাহাসি করল। রেখার বাবা রতনকাকু হীরুকে জিগেস করল, বুড়ির মাথাটা এরকম কে বানিয়েছে রে? এটা কার হাতের কাজ?

–বিপ্লবদা বানিয়েছে কাকু, ভালো হয়েছে না?
–পাখনা গজিয়েছে ওর! পোস্টার লিখছিল লিখছিল, এখন এসব ডেঁপোমিও শুরু করেছে। রতনকাকু খুব একটা খুশি হয়নি মনে হল। ওকে না বললেও হত। বিপ্লবদাকে রতনকাকু পছন্দ করে না, অন্য পার্টির লোক।

বীরু বলল— যা, এবার যার যার আলু-টালু নিয়ে আয়। তাড়াতাড়ি আসবি। সাতুদের দল আশপাশে ঘুরছে, আঁতে লেগেছে ওদের— একটু ফাঁক পেলেই আগুন লাগিয়ে দিতে পারে। সামনের একটা ঘন্টা কড়া পাহারা দিতে হবে।

হীরক বাড়ি এল আলু নিতে। মা বলল, কিছু খেয়ে যা।

–না মা… এক মুখ হাসল হীরক— আজ সন্ধ্যাবেলা আলুপোড়ামাখা দিয়েই টিফিন করব। আজ একটু দেরি হবে মা।

মা প্রশ্রয়ের হাসি হাসল— ঠিক আছে। কিন্তু বাবা আসার আগে চলে আসিস।

আলু হাতে আসছে, নিজেদের বাড়ির জানলায় রেখা— আমি আলুমাখা খাব, আমার জন্য দুটো আলু নিয়ে নিবি?

রেখার হাত থেকে আলু নিতে নিতে ফিচেল হাসি হাসল হীরু— কুকুরের গু লাগা থাকবে কিন্তু, এখনও ভেবে দেখ।

রেখার এখনকার হাসিটায় আলোছায়ার স্নিগ্ধতা, হীরুর গলার কাছে কেমন শিরশির করে উঠল। তারপরেই মাঠের দিকে দৌড়।

সন্ধ্যা কখন হবে, সময় যেন কাটতেই চায় না। দেখতে দেখতে সন্ধ্যার আকাশে থালার মত চাঁদ উঠল। আলো মরে আসছিল। ওরা সবাই হাতে এক একটা লাঠি আর নিজেদের আলু নিয়ে তৈরি। লাঠি আছে, আগুন থেকে পোড়া আলু বের করার জন্য সবাই অধৈ্র্য্য হচ্ছিল, অন্ধকার নেবে এসেছে— কিন্তু বীরু আগুন জ্বালাতে দেবে না যতক্ষণ না সাতুদেরটাতে আগুন ধরছে।

যেই হট্টগোল শোনা গেল সাতুদের ওখান থেকে, ঝন্টু বলল— এবার জ্বালাই বীরুদা?

ফস করে দেশলাই জ্বালিয়ে ছুঁড়ে দিল বুড়ির মাচানে। দাউদাউ করে আগুন জ্ব্লে উঠল।

ওরা বুড়ির মাচা ঘিরে ঘিরে নাচ শুরু করল—

আজ আমাদের বুড়িপোড়া
কাল আমাদের দোল
পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে
বলো হরিবোল।

আগুন মাচানে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। আর ওরাও চরম উন্মাদনায় গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছিল— আজ আমাদের বুড়িপোড়া…। সব আলু ছুড়ে দেওয়া হয়েছে আগুনে, ওরা তাক করে লাঠিপেটা করছিল যাতে আলুগুলো ভালো করে আগুনের মধ্যে ঢুকে যায়।

এমন সময় একটা জিপ এসে থামল। পুলিস। সঙ্গে রতন ঘোষ।

–ডেঁপো ছেলে সব, এখানে এয়ারকি হচ্ছে? এসআই হুঙ্কার ছাড়ল।
–ক্যাডার তৈ্রি হচ্ছে, ক্যাডার! একরাশ ঘৃণার সঙ্গে বলল রতন। একেবারে ছোট বয়স থেকেই দল পাকাচ্ছে।

ওরা কিছু বুঝতে পারছিল না। গান থামিয়ে অবাক ভয়ে তাকিয়ে ছিল। বীরুও। কন্সটেবলগুলো বালতি বালতি জল ছুঁড়তে লাগল ওদের বুড়ির মাচানের দিকে। ওদের অবাক চোখের সামনে আগুন নিভে আধপোড়া বাঁশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। সাতুদের আগুন তখনও গাছপালা ছাড়িয়ে আকাশে উঁকি মারছিল।

চল সব, একরাত হাজতে বন্ধ থাকলে ফাজলামি করা বন্ধ হবে। রতন ঘোষ পুলিসের সাব-ইন্সপেকটরের দিকে তাকিয়ে বললেন— দেখেছেন তো, এই বয়স থেকে ওদের ট্রেনিং দেওয়া শুরু করেছে। এখুনি শায়েস্তা না করলে বড় হলে কী হবে বুঝতে পারছেন?

ওদের সবাইকে লাইন করে জিপে তোলা হল— হীরকের কান্না পাচ্ছিল, ঝন্টু তো কেঁদেই ফেলেছে। টঙের থেকে অক্ষত বুড়ির মাথা নামিয়ে রতনজেঠু নিয়ে নিলেন। জিপে উঠে দেখে বিপ্লবদা ভিতরে বসে। শুকনো মুখে বলল— আমার জন্য তোদের এমন হেনস্থা হল রে, সব আমার জন্যে।

ততক্ষণে পাড়ার লোকেরা জড়ো হয়ে গেছে। নীলিমাও ছিল সেই দলে। সবাই হাতেপায়ে ধরে অনুরোধ করল— বাচ্চাদের ব্যাপার, ছেড়ে দিন।

ঝন্টুর বাবা, কমল বিশ্বাস। বলল— রতনদা, আমার ছেলেটা এত ছোট। রাজনীতির কী বোঝে ও— আপনি ওকেও…

রতন ঘোষ তবুও নরম হলেন না। না, না, রাজনীতির প্রশ্ন এটা নয়। এটা হল ডিসিপ্লিনের কথা। এমারজেন্সি তো আর এমনি এমনি হয়নি, দেশটাকে উন্নতির পথে ফেরাতে হবে। এসব অ্যন্টি-সোশাল এলিমেন্টগুলো ছেলেধরার থেকেও সাংঘাতিক— বাচ্চাকে সামলে রাখো।

বিমল পিছন থেকে সামনে এগিয়ে এলেন এবার। রতনবাবু, কাজটা ভালো করলেন না। আপনার নিজের ছেলে থাকলে করতে পারতেন এরকম?

সবাইকে নিয়ে জিপ চলল থানায়। কম বয়স বলে ওদের লকআপে দিতে পারেনি, তবুও সেদিন উপোসী রাতের অনেকটাই থানাতে কেটেছিল, পেটে কিল মেরে। আলু আর পোড়েনি।

 

বাড়িতে পা রাখার আগে অবধি রতন ঘোষের ঠোঁটের কোণে হাসিটা লেগেছিল। একটা কাজের মত কাজ হয়েছে। বেয়াদপগুলোকে উচিত শাস্তি দেওয়া গেছে। এমন একটা ভঙ্গি নিয়ে না ঢুকলে নিশ্চয় সন্ধ্যাবেলায় এমন নিঝুম বাড়ির কারণ নিয়ে মাথা ঘামাতেন। এরকম সময়ে রেখা দুলে দুলে ‘বাবর ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট’ কিংবা ‘গাছের পাতার ক্লোরোফিল দিয়ে গাছ সূর্যের আলোয় খাবার বানায়’ এরকম কিছু পড়ত। লেখা ছোট, তার কলকল রব গেট থেকে পাওয়া যায়। রান্নাঘর থেকে মাধবীর খুটখাট আওয়াজ ভেসে আসে। আজ এসব কিছুই ছিল না।

রতনের প্রথম ঝটকা লাগল যখন বাইরের দরজাটায় টোকা দিতে এমনিই খুলে গেল। চড়াং করে উঠল মাথায়। এই ভরসন্ধ্যায় কেউ এভাবে দরজা খুলে রাখে? তাও যেখানে বাড়িতে দুটো ছোট মেয়ে আছে!

–মাধু! মাধু! গলা তুলে হাঁক দিল রতন।

কোনও সাড়া নেই।

–রেখা! লেখা!

চুপচাপ।

–মাধবী! চিত্ররেখা! লিপিলেখা!

কেন যে তার মনে হয়েছিল পুরো পুরো নাম ধরে ডাকলে উত্তর পাওয়া যাবে রতন নিজেও জানে না। কিন্তু এবারেও কোনও হেলদোল না পেয়ে কেমন গা ছমছম করে উঠেছিল। সবাই ঠিক আছে তো?

আসলে পাড়ায় পুলিশ আসার খবর বাড়ি অবধি পৌঁছাতে বেশি দেরি হয়নি। মাধবী উঠোনে বসে গুল কয়লার উনুনে ফুঁ দিচ্ছিল। বিকেলের রান্নার তোড়জোড়। সেই সময়ে পাশের বাড়ির হিমানী হাঁফাতে হাঁফাতে এসে হাজির। মাধুদি শুনেছ?

মাধবীর তখন চোখ লাল, গলা খুশখুশ। আগুনের তাত যত না, ভুসভুসে ধোঁয়া তার চারগুণ। লোকটার যদি একটু কাণ্ডজ্ঞান থাকে! এবারের কয়লাটা কোত্থেকে নিয়ে এসেছে কে জানে, আগুনই ধরতে চায় না ভালো করে। একেই রান্না শুরু করতে দেরি হয়ে গেছে! ব্যাস্ত মাধবী হিমানীর দিকে নজর ঘোরায়নি তখনও।

কিন্তু হিমানী কিছু জানাতে চাইলে ওকে আটকে রাখবে কে! আড়ালে সবাই ওকে বলে পাড়ার নিউজপেপার। সবার বাড়ি ঘুরে ঘুরে খবর সংগ্রহ করে আবার বাড়ি বাড়ি জানিয়েও আসে। কোনও খবর ছড়াতে হলে হিমানীর কানে একবার তুলে দিলেই হল। সেখানে আজকের এত বড় ঘটনা না জানিয়ে পারে? মাধবীকে দেখেই বুঝেছে কিছুই জানে না। তাই আবার চোখ গোলগোল করে বলল, জামাইবাবু কী করেছে জানো কি মাধুদি?

এইবার মাধবীর হুঁশ হল। রাগও। ওনার নামে কী বলতে এসেছে মেয়েটা? সাহস তো কম নয়! এমনিতেই উনুনে আগুন ধরছে না বলে মেজাজ গেছে খিঁচড়ে। হিমানীর কথায় আগুনে ঘি পড়ল।

–আমার কি তোর মতন এদিকওদিক ঘুরে খবর শোনার জো আছে হিমি। অমন ঝাড়া হাতপা হব আমার সেই কপাল না! বাড়িতে দু দুটো ধিঙ্গি মেয়ে, তাদের মুখে খাবার তুলব নাকি দশটা লোকের হালহকিকত জেনে বেড়াব?

কথাটায় অনেকগুলো ঠেস ছিল। হিমির বয়স তিরিশ পুরিয়েছে, কোলে কোনও বাচ্চা আসেনি। সেইজন্য যে ও এমন ঘরের খেয়ে পরের খবর খুঁজে বেড়াতে পারে, মাধবীর ইঙ্গিতটা সেদিকেই। অন্যদিন হলে এমন একটা কথায় ঠোকাঠুকি লেগে যেত। কিন্তু হাতে বোম থাকলে কে আর কালীপটকা ফাটাতে যাবে? হিমানী মাধবীর কথা উড়িয়ে দিল। রোজকার কাজের কথা ছাড়ো, দেখো গে জামাইবাবু কী কাণ্ড বাধিয়েছে।

লোকটা রাগী। রাজনীতিতেও মাথা গলায়। এদিকওদিক হাঙ্গামায় যে কখনও জড়ায়নি তা নয়। কিন্তু সেসব তো বাইরে, পাড়ার মধ্যে ঘটে না। তাহলে মাধবী জানার আগে হিমি জানল কী করে? এসবই মাধবীর মনে জেগেছিল, মুখে ফোটেনি। হিমানীর স্বভাব সে জানে, কাজের সময় অযথা ওকে ইন্ধন জুগিয়ে নিজের দেরি করাতে চায় না মোটেই। বরং ঘাড় ঘুরিয়ে ডাক পাড়ে, রেখা। বাবু রে, ঠাকুরের আসনে প্রদীপটা জ্বেলে দে মা আমার। এই পোড়া উনুনের জ্বালায় ঠাকুরকে সন্ধেটা দেখানো হয়নি। একটু শাঁখটাও বাজিয়ে দিস।

রেখা আর লেখা এতক্ষণ জানালা দিয়ে বুড়িপোড়া দেখছিল। মাঠটা এখান থেকে দেখা যায় না। কিন্তু আগুন্  ধরেদের বাড়ি ছাড়িয়ে উঠে যেতে দেখতে পাচ্ছিল বেশ। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের তারস্বরে চিৎকার— আজ আমাদের বুড়িপোড়া, কাল আমাদের দোল। সে আওয়াজ কেন যে হঠাৎ থেমে গেল আর দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুন ঝপ করে নিভেও গেল সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিল না। সন্ধে হয়ে গেছে। দেখে আসতে যাবে বললে মা চেলাকাঠ নিয়ে ধাওয়া করবে। উসখুস করছিল। এইসময় ঘর থেকে মার ডাক পেয়ে উঁকি মেরে দেখে হিমানীমাসি। রেখা গলা নাবিয়ে একান্তে বলল, আয় লেখি, পাড়ার আনন্দবাজার এসে গেছে। মাসি নিশ্চয় জানবে।

ভালো গল্পবলিয়ের সব গুণই হিমির আছে। প্রথমে লোক জড়ো করতে ঢ্যাঁড়া যেমন পেটে, আসর জমে গেলে তেমনি আমড়াগাছি করে উত্তেজনা বাড়ায়। একটু আগেই বলার জন্য উন্মুখ হিমানী জোরে দম নিয়ে আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মোছে। বুকের গলিপথে হাত রেখে নিজের উত্তেজিত হৃদস্পন্দনকে স্তিমিত করার প্রকাশ্য প্রয়াসে বসন্তসন্ধ্যার উষ্ণ বাতাসে উত্তেজনা রোপণ করবার নাটকটাও বেশ চমৎকার হয়। মাধবী অগ্রাহ্য করলেও ছোট মেয়েদুটির চোখমুখে আগ্রহের অভাব থাকে না।

–কী হয়েছে মাসী? বাপির কী হল? দুআঙুলে ফ্রকের খুঁট পাকাতে পাকাতে ত্রস্ত গলায় জিজ্ঞেস করে লেখা।

রেখা সরাসরি আসল কথায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। বীরুদের বুড়ির ঘরে কিছু হয়েছে? অমন লকলকে আগুন এত তাড়াতাড়ি নিভে গেল?

–নিভল কি এমনি এমনি? নিভিয়ে দিল।

এই ভয়টাই করছিল রেখা। নিশ্চয় সাতুরা এসে কিছু করেছে। হীরুর মুখে শুনেছে ওরা এসে জ্বালিয়ে দেওয়ার ভয় থাকে। কিন্তু নেভাবে কেমন করে? তাছাড়া বীরুরাও কিছু কম যায় না। সেরকম কিছু করলে এতক্ষণে পাড়া মাথায় তুলত।

হিমি হাঁ হাঁ করে উঠল। না রে না, আগুন নিভিয়েছে তোদের বাবা। জামাইবাবু দাঁড়িয়ে থেকে পুলিশ দিয়ে জল ঢালিয়ে আগুন নেভাল।

এতগুলো অবাক করা কথা একসঙ্গে শুনে রেখা, লেখার মুখের কথা আটকে গেল। তাদের বাপি? পুলিশ? কেমন সব তালগোল পাকানো ব্যাপার।

এবার মাধবীও হতভম্ব। ও কেন বাচ্চাদের বুড়িপোড়ার আগুন নেভাবে? বলছিস কী হিমি? আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। তাছাড়া পুলিশ কেন?

–সেটাই তো বলছি মাধুদি। মাথার দিব্যি দিদি, আমার চোখের সামনে সব হল। অন্য কারও কাছে শুনলে আমি একবর্ণ বিশ্বাস করতাম না। আমরাও কি কেউ জানতাম, না বুঝেছি! ছেলেরা আগুন জ্বালিয়েছে, মজা করছে— আমি মিত্তিরদের দোকান থেকে দুটো সদাই নিতে যাচ্ছিলাম। চিনি ফুরিয়ে গেছে। কাল দোল, মিষ্টি বানিয়ে রাখব। যাওয়ার পথে আগুন জ্বলছে দেখে দাঁড়িয়ে গেসলাম। আমরাও তো ছোটবেলায় করতাম এসব, বেশ লাগছিল। ওমা, কথা নেই বার্তা নেই একটা পুলিশের জিপ এসে দাঁড়াল। থানার বড়বাবুর সঙ্গে জিপ থেকে নাবল জামাইবাবু। অনেকটা একসঙ্গে বলে এবার দম নেয় হিমি।
–তারপর? ঠোঁটের কোণায় আঁচল চেপে চোখ দিয়েই জিজ্ঞেস করে মাধবী।
–তারপর আবার কী। হম্বিতম্বি। পুলিশের দুটো সেপাই বালতি বালতি জল ঢেলে সব আগুন নিভিয়ে দিল।
–এমনি এমনি? কেউ তো কিছু একটা করেছিল? তোদের জামাইবাবু তো আর পাগল নয়। পায়ের থেকে মাটি সরে যাওয়ার মত অনিশ্চয়তা ভরা গলায় বলল মাধবী।
–ছি ছি আমি কি তাই বলেছি? যা নিজের চোখের সামনে দেখলাম, শুধু সেটুকু বলছি তোমায় দিদি। আসলে গণ্ডগোল ওই বুড়ির মাথা নিয়ে। ওই যে দইয়ের হাঁড়িতে রং করে যেটা বানায় আর বুড়ির ঘরের টঙ্গে টাঙ্গিয়ে দেয় না? ওটা নাকি হুবহু ইন্দিরা গান্ধির মাথা।
–বাচ্চাগুলোর মাথায় কে এসব বুদ্ধি ঢোকায়? খুব অবাক হয়েছিল মাধবী।
–শুনলাম বিপ্লব নাকি বানিয়ে দিয়েছে। দেখেছ তুমি ছেলেটাকে। মুখে দাড়ি, খদ্দরের পাঞ্জাবি ছেলেটা যেটা লালপার্টির অফিসেই থাকে আর দেওয়াল লেখে। ওই।
–কিন্তু সেটাও কি এত বড় অপরাধ হল যে বুড়ির আগুন নিভিয়ে দিতে হল? মাধবীর মাথায় ঢোকে না মোটেই।
–সেটাই তো বলছি। পাড়ার অনেকে জড়ো হয়ে গেসল। ছেলেগুলোর বাবাকাকারা জামাইবাবু, দারোগাবাবু দুজনের হাতে পায়ে ধরল। কিন্তু ওরা কিছুতেই ছাড়ল না। সব কটাকে ধরে থানায় চালান করে দিয়েছে।

আঁতকে উঠল মাধবী। এ কী কাণ্ড বাঁধিয়েছে ও? ওইটুকু টুকু ছেলেকে থানায় ধরে নিয়ে গেল? কী দোষ করেছে ওরা?

–হীরুকেও নিয়ে গেছে মাসি?

রেখার প্রশ্নে পাত্তা না দিতে হিমি বলল, সবার মুখে ওই কথা মাধুদি। কিন্তু জামাইবাবু বলল, দেশের প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা না কি জানি জ্বালাচ্ছে, এটা কোনও ছোট কথা নয়। এই বয়সে এমন হলে, বড় হয়ে তো লোক খুন করবে। থানায় নিয়ে গিয়ে একটু শায়েস্তা হোক। জিপ নিয়ে চলে গেল। সবার সঙ্গে জামাইবাবুর বচসা এখনও চলছে। আমি তোমায় খবর দিতে এলাম।

রেখা লেখা কাঁদছিল। এটা বাপি কী করল? মাধবীর মুখ কঠিন। রতন বুড়ির আগুন নিভিয়েছে, মাধবী উনুনে জল ঢেলে দপ দপ করে ভিতরে ঢুকে শোবার ঘরে খিল দিল। রেখা লেখাও একটু মুখ চাওয়াচাওয়ি করে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে।

সবাই যে ঠিক নেই সেটা বুঝে রতনের মাথা গরম হল। কী ব্যাপার? এটা কি মানুষের বাড়ি না শ্মশান? এত ডাকছি কোনও সাড়া নেই কেন? বাড়িতে সবাই কি মরে গেছে?

ক্যাঁচ করে আওয়াজ করে শোবার ঘরের দরজা খুলল। মাধবী। এর মধ্যেই কেঁদে চোখমুখ ফুলে গেছে। কিন্তু গলায় তীব্র ঝাঁঝ। মারতে কি আর বাকি রেখেছ? বঁটিটা আনি, তিন কোপে সব শেষ করে দাও।

রতনকে বাড়ির বাইরে যতটা দোর্দণ্ডপ্রতাপপনা দেখায়, বাড়িতে ততটা নয়। ঘরে ঢুকলেই কলসির জল গড়িয়ে আওয়াজটা ক্রমে ফাঁপা হয়ে আসে। মাধবী প্রথাগত সুন্দরী। তার সুতীব্র চোখের দৃষ্টি, অহঙ্কারী নাক, দৃঢ় গ্রীবা সেই সৌন্দর্যের চারপাশে এমন একটা আভিজাত্যের আবরণ তুলেছে, যেটা ভেদ করে এই মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন সংগ্রামও কোনও আঁচড় লাগাতে পারেনি। তার দাঁড়ানো, কথা বলা, সযত্নে পরা সামান্য শাড়িতেও একটা স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠা করে, সম্ভ্রম আদায় করে নেয় সহজেই। তাই এমনিতে রতন যতই তড়পাক, মাধবী একবার গলা তুললে ধীরে ধীরে মিয়ানো মুড়ি। বাইরে দাপিয়ে বেড়ানো সবল পদক্ষেপকে জড়িয়ে ধরে দ্বিধা। একটু আগে বুড়ির আগুনে জল ঢালাতে পেরে জয়ের যে উত্তেজনা বোধ করেছিল, মাধবীর কথায় দপ করে বুজে গেল। আমতা আমতা করে বলল, কী করলাম আবার? বাড়িতে ঢুকে কাউকে দেখছি না, তাই ডাকছিলাম।

তাই বলে সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ঢুকে ষাঁড়ের মত গলা ফাটাতে হবে? কি রাজকার্য উদ্ধার করে এসেছ? পাড়ায় কি মাথা উঁচু করে বেরোতে পারব না আর? নীচু গলায় হিসহিসিয়ে ওঠে মাধবী।

–কী যা তা বলছ? হয়েছেটা কী? বুঝেও অবুঝের আড়ালে নিজেকে লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা রতনের।
–ন্যাকামি কোরো না। পুলিশ ডেকে ছোট ছোট ছেলেগুলোকে থানায় পাঠিয়েছ। কী ক্ষতি করেছিল ওরা তোমার? কার বাড়িতে চুরি ডাকাতি করেছিল?
–এটা চুরি ডাকাতির কথা নয় মাধু। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর। এই ছোট ছোট ছেলেগুলোর মাথায় রাষ্ট্রবিরোধিতা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একটা অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে মানুষকে উত্তেজিত করার চেষ্টা— ভারী ভারী কথার মোড়কে নিজের অবস্থানকে শক্ত করতে চাইল রতন।
–এইসব কথা তোমার মিটিং মিছিলে বোলো, আমি কিছু বলতে চাই না। অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার তো মুরোদ নেই, আমাকে শেষ দম ফেলা অবধি এই পাড়ায় থাকতে হবে। এক কথায় রতনের পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিয়ে ঘটনার রশি নিজের হাতে নিয়ে নেয় মাধবী। কোন মুখে বেরোব এর পরে রাস্তায়? কোন বুদ্ধিতে তুমি পুলিশের কাছে দৌড়ে গেছ? তোমার খারাপ লাগলে বাচ্চাগুলোকে বুঝিয়ে বলতে পারতে। না শুনলে ওদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে নালিশ করতে পারতে। তা না করে তুমি কিনা পুলিশের কাছে গেলে? এত ছোট ছোট ঘটনায় কেউ থানাপুলিশ করে? ভাবছ মল্লিকদা শুনলে তোমায় মাথায় তুলে নাচবে?

অনিল মল্লিক অঞ্চলের বড় কংগ্রেস নেতা। এমএলএ হওয়ার তোড়জোড় করছে। মল্লিকদার নাম শুনে জোঁকের মুখে নুন পড়ল। আগেপিছে না ভেবে কাজ হয়ে গেছে। মল্লিকদার সঙ্গে একটু কথা বলে নিতে হত। রতন এখন কী করবে বুঝতেও পারছে না। মল্লিকদা কি রাগ করবে? বাড়ানো হাতে মাধবীর কাঁধ ছুঁয়ে আমতা আমতা করে বলল, কী করব বলো মাধু, ছেলেগুলোর বেঁড়েপাকামি দেখে এমন রাগ হয়ে গেল! তুমি বুঝতে পারছ না এসবই তলে তলে লালঝান্ডা পোঁতার চেষ্টা। কচি অবস্থায় উপরে ফেলতে না পারলে সর্বনাশের ঝাড় তৈরি হবে।

মাধবী এক ঝটকায় রতনের হাত নাবিয়ে দিয়ে সরে গেল। ছোঁবে না তুমি আমায়! আমার জীবনটাকে মহানিশা করে সুললিতের বাণী দিতে এসো না। একবার ভাবলে না বাড়িতে তোমার দু-দুটো মেয়ে আছে, বড় হচ্ছে। পাড়ার ছেলেগুলোকে শত্রু তৈরি করে ওদের কী সর্বনাশটা করলে। এরপর ওদের যদি কিছু হয়ে যায়, আমি তোমাকে আস্ত রাখব ভেবেছ?

দুই বোন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। মাধু কথা না বলে গোঁজ হয়ে বসে আছে। রতন কী করবে বুঝতে না পেরে ঘর জুড়ে পায়চারি শুরু করেছে। আর একটু বাদে বাদে থেমে বউয়ের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। শেষে আর থাকতে না পেরে বলল, কিছু তো বলো মাধু। কাজটা যদি ভালো না করে থাকি বলো এবার কী করব। কী করলে তুমি খুশি হবে?

রতনের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণেও গলল না মাধবী। আমি কী বলব? এই কাণ্ড করার আগে আমাকে জিগেস করেছিলে?

–আচ্ছা এখন তো জিজ্ঞেস করছি। কাঁচুমাচু মুখে রতন হাত কচলায়।

কী করতে হবে সেটা নিয়ে মাধবীর মনে কোনও দ্বিধা ছিল না। তাহলে থানায় যাও আর এক্ষুনি ছেলেগুলোকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসো।

–দারোগা আমার কথা শুনবে কেন? অসহায়ভাবে বলে রতন।

এই মুহূর্তে মাধবী যে দৃষ্টিতে তাকাল সেটা সূর্যের আলো ধরে ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে কাগজ পুড়ানোর মত। উচ্চারিত প্রতিটা শব্দ তাদের আলাদা আলাদা ধার এবং ভার নিয়ে আছড়ে পড়ল। ধরার সময় তো তোমার কথা মেনে দৌড়ে এসেছে। তাহলে এখন কেন শুনবে না।

চুপসানো বেলুনের মত থম মেরে বসে রইল রতন। একটু আগে যে ঘটনায় আত্মপ্রসাদ পাচ্ছিল, এখন সেটাই যেন তার গলায় ফাঁস হয়ে ঝুলছে। সত্যিই কি ভুল হয়ে গেল তার?

–যাও মল্লিকদার কাছে। সব খুলে বলো। মল্লিকদা থানায় গেলে ওরা শুনবে। কী করতে হবে পুরো বুঝিয়ে বলে মাধবী।
–মল্লিকদা রাজি হবে?
–আমি বলছি, যাও। উনি রাজি হবেন। এতে ওঁরই সুনাম হবে। তুমি ওঁর যা ক্ষতি করেছ তার কিছুটা হলেও অন্তত শুধরাবে। দোষটা তোমার উপর দিয়ে কেটে যাবে, ওনার ভোটে থাবা বসাবে না।

রতনের ইতস্তত ভঙ্গি দেখে কড়া গলায় মাধবী বলে আবার, এখুনি যাও। এই খবর ওনার কাছে নিশ্চয় পৌঁছাবে। তোমার মুখে জানলেই ভালো, তোমার পক্ষে। একটা রিক্সা নিয়ে নিও। তাড়াতাড়ি হবে।

রতন অনুগত ভঙ্গিতে মাথা দোলায়। ঠিক আছে, তাই হবে। এখুনি যাচ্ছি।

–আর শোনো, শুধু তাই নয়। এরপর সব কটা ছেলের বাড়ি গিয়ে গিয়ে ওদের বাবা মার সঙ্গে কথা বলে আসবে।

এবার আঁতকে উঠল রতন। না, না সেটা পারব না। ছেলেগুলোর মধ্যে সুরেন চ্যাটার্জীর ছেলেও ছিল। সুরেন সিটু ইউনিয়নের লিডার, ওঁর কাছে এরকম কিছু বললে ফলাও করে সেটা রটাবে। আমার আর কোনও মানইজ্জত থাকবে না তাহলে। রতন তার কলেজে কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত। তাই তার দ্বিধার কারণ আছে।

দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট চিপে এক মুহূর্ত ভাবে মাধবী। ঠিক আছে, তোমার আর কারও বাড়ি গিয়ে কাজ নেই। কাল দোল। ছেলেগুলোকে ছাড়িয়ে ফিরে আসার সময় বেশি করে মিষ্টি নিয়ে আসবে। যার যার ছেলেকে আজ ধরে নিয়ে গেছে ততগুলো প্যাকেট গুনে। আমি নিজে কাল সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিয়ে কথা বলে আসব।

–তাই হবে। পায়ে চটি গলিয়ে আবার বেরিয়ে গেল রতন।

মেয়েটা ঠাকুরের ঘরে আলো দেয়নি তখন। মাধবী ঠাকুরের আসনের সামনে দুটো ধূপকাঠি জ্বেলে, শাঁখে বড় করে ফুঁ দিল। বারবার তিনবার। তারপর গলায় আঁচল দিয়ে মাটিতে কপাল ঠেকাল। মেয়েদুটোকে দেখো মা, ওদের যেন কোনও ক্ষতি না হয়। অনেক তো বয়স হল, লোকটার মাথায় একটু বুদ্ধি দাও এবার। এই সংসারটা তোমার ভরসায় মা।

মাধবীর কপালের ভাঁজগুলো এবার ধীরে ধীরে মসৃণ হয়ে আসছিল।

কিন্তু কিছু কিছু রাত শেষ হয়েও হয় না।

 

সন্ধ্যা নেবেছিল অনেকক্ষণ। বাইরের অন্ধকার ঘরের মধ্যে গুঁড়ি মারছে। কমলা বুঝতেও পারেনি কখন। আলো জ্বালা হয়নি।

আত্রেয়ী বাড়ি ফিরে খানিকটা বকাঝকা করল। কি গো মা তুমি? আলো না জ্বালিয়ে এমন ভূতের মত বসে আছ? সত্যি অন্ধকারে শুধু তার সাদা শাড়িটাই ভেসেছিল। আত্রেয়ী তো এমন বলবেই। একটা সময় ছিল সূর্য ডূবল কি ডুবল না, গলায় কাপড় জড়িয়ে ঠাকুরকে সন্ধ্যা না দেখাতে পারলে কমলা অস্থির বোধ করত। যেখানেই থাকুক ত্রস্ত পায়ে বাড়ি ফিরে ধূপ জ্বালিয়ে, ঠাকুরের রাতের খাবার দিয়ে, মশারি টেনে ঘুম পাড়ানো অবধি শান্তি নেই। যেদিন দূরে কোথাও যেত মেয়েকে পইপই করে বলে যেত, ঠিক সময়ে ধূপবাতিটা জ্বালিস মা, না হলে অমঙ্গল। পড়ায় ব্যস্ত আত্রেয়ী ভুলে গেলে বাড়ি ফিরে উথালপাথাল করেছে। এখন মনেও থাকে না।

অতীন বাড়ি আসে না তিন বছর। অতীনের বাবা মারা গেল সেও বছর দুই। তখনও আসেনি। খবর হয়তো পেয়েছে, কিন্তু দেখা মেলেনি। এখন শুধু কমলা আর আত্রেয়ী বাড়িতে টিমটিম করছে। মঙ্গল অমঙ্গলের দিক দিশা আর করতে পারে না কমলা। কিন্তু চিন্তা তো আসে। সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। কিন্তু কি ভাবছিল জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবে না। সব কেমন তালগোল পাকানো, ল্যাজামুড়ো একাকার হয়ে যাওয়া চিন্তা।

আলো জ্বালতে মার দিকভ্রান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আত্রেয়ী আর কিছু বলল না। বলতে পারত— মা তোমার তো আমি আছি, আমার কে আছে? আমার কি কোনও সাধ-আহ্লাদ থাকতে নেই? জীবনের থেকে কিছু পাওয়ার নেই? বলে না। এইসব উড়ো ভাবনা গিলে নিতে নিতে গলায় গরম দুধের ওম ছড়ায়, তোমায় কিছু খেতে দিই মা? মুড়ি? সঙ্গে দুটো বাতাসা?

স্বাভাবিক প্রশ্ন। কিন্তু কমলার ভাবনাতরঙ্গ থিতু হতে সময় নিল। ঝাঁঝি পড়া পুকুরের জলে ঢিল পড়ার আঁকিবুঁকি সারা মুখে। না রে, থাক। বরং এক কাপ চা দে।

জোর করে একমুখ হাসি আনল আত্রেয়ী। এই বাড়িটা টিকিয়ে রাখার সব দায়িত্ব তার কাঁধে। বুকের ভিতর যাই হোক মুখে হাসির পর্দা। মাকে বাঁচিয়ে রাখার। ভাই ফেরার জন্য দিন গোনা। হাঁফ ধরে যায়। নিজের মনের খবর রাখার জানালা নেই। নিভু নিভু জীবনের পলতেটা উসকে রাখা ব্যস! মনে পড়ল খুব গরম ছিল আজ। স্কুল থেকে ফেরার পথে আরও দুই বাড়ি পড়িয়ে এসেছে। ঘামে ছোট জামাটাও ভিজে গেছে। একটু গা ধুয়ে নিই মা। তারপর দুই কাপ চা নিয়ে বসে মা-মেয়ে গল্প করব।

আত্রেয়ী কাপড় নিয়ে কলঘরে গেল। কমলা একভাবে মোড়ায় স্থাণুবৎ। কে বলবে এই কমলা একসময় ছটফটে পায়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াত। সন্ধ্যাবেলা ছ্যাঁকছোঁক শব্দে একদিকে রান্না চলত, অন্যদিকে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার তদারকি। এখন সিগনাল না পাওয়া ট্রেনের মত অন্ধকার মাথায় নিয়ে দাঁড়ানো। মেয়ে স্নান সেরে আসা অবধি ওই ছোটখাটো চেহারাটা অমনি জবুথবু হয়ে বসেই থাকত। কিন্তু দরজায় হঠাত খুটখুট শব্দ। খুব নীচু তারে, কিন্তু দ্রুত লয়ে। যেন অপেক্ষার সময় নেই। কে? কে? বলে উঠতে গিয়েও মায়ের মন অন্য ডাক ডাকল। আত্রেয়ী ঘরে ঢুকে ছিটকিনি তুলে দিয়েছিল। কমলা পড়িমরি করে উঠে দরজা খুলল। খুলল বলাও ভুল। একটা পাট খুলতে না খুলতে চাদরে মাথা মুড়িয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল ছেলেটা। অতীন। কমলার গলা দিয়ে একটা আর্তস্বর বেরিয়ে আসছিল। অতীন তাড়াতাড়ি সেই মুখে একহাত চাপা দিয়ে, অন্য হাতে দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি তুলে দিল।

–অতীন তুই? কমলার ঠোঁটের বাইরে শব্দটা ঝুলছিল। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ায় বারণ ছিল না।

অতীন ডান হাতের তর্জনী ঠোঁটে ছোঁয়াল। শোবার ঘরে চলো মা। এখানে নয়। মার হাত ধরে চেনা পথে এগিয়ে গেল অতীন। যাওয়ার আগে বাইরের ঘরের আলোটা টুপ করে নিভিয়ে দিল।

শোবার ঘরে পৌঁছে কমলা ছেলের সারা মুখে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখছিল। যেন চোখ দিয়ে সবটা বিশ্বাস করতে পারছে না। চেনাও যে যায় না। একমুখ দাড়ি। গালের হনু বেরিয়ে গেছে। চোখ কোটরগত, যেন কতদিন ঘুমায়নি। এই তার ছেলে? ন মাস পেটে ধরে যে সৌম্যকান্তি ছেলের গরবিনী মা হয়েছিল কমলা, এ যে তার ছায়ামাত্র। কোন নিশির ডাক ডেকে নিয়ে গেল তার ছেলেকে!

আত্রেয়ী কোনওমতে শাড়ি গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল। কেউ এসেছে বুঝেছিল, কিন্তু ভাই! এত আলো, এত আনন্দ কতদিন তার আকাশে উঁকি দেয়নি। ভাই এসেছিস? কমলা তখনও তার দুই করতলে অতীনের মুখটা নিয়ে বসেছিল। অতীন ফিরে তাকাল। দিদি! এবার হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল অতীন।

–কী হয়েছে ভাই, কাঁদছিস কেন? তুই এবার বাড়ি এসে গেছিস, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা তো আছি। ভাইকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল আত্রেয়ী। বাইশ বছরের নকশাল করতে যাওয়া দুরন্ত ছেলেরা কাঁদে না।
–কিছু ঠিক হবে না রে দিদি। সব শেষ হয়ে গেছে। আমি কুকুরের মত পালিয়ে বেড়াচ্ছি। ভাবলাম সব শেষ হয়ে যাওয়ার আগে একবার তোদের সঙ্গে দেখা করে যাই।
–কী বলছিস তুই ভাই? কী হয়েছে? আজকাল গণ্ডগোল তো কম, সবাই বলে নকশাল আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে। আমরা ভাবছিলাম তুই সুযোগের অপেক্ষায় আছিস, এই বুঝি ফিরে আসবি। যদিও আত্রেয়ী বলল না যে মনে মনে সে ভেবেছিল নিশ্চই অতীনের কিছু হয়ে গেছে। তাদের চেনাজানা সব নকশাল ছেলেরা এখন শহীদবেদি। না হলে জেলে। যাদের বাড়ির খুঁটির জোর আছে তারা ছেলেকে উদ্ধার করে বাইরে পাচার করে দিয়েছে। যাদের একদম খোঁজ পাওয়া যায়নি, তারা কোনও অসনাক্ত ডেডবডি হয়ে পড়ে আছে কোনও মর্গে। ভাইয়ের মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল, আমি যে অধীরদার মুখে শুনেছি এখন সব শান্ত। এখন শুধুই ঘরে ফেরার অপেক্ষা।
–এখন নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি চলছে রে দিদি। আমরা সবাই সবাইকে ভয় পাই। একটা দলের ভিতর অনেকগুলো দল।
–তুই ছেড়ে দে এসব। দলাদলিতে কাজ কী? বাড়ি ফিরে আয়। পড়াশোনা শুরু কর।
–হয় না রে দিদি। আমি চাইলেও ওরা কেউ হতে দেবে না। আমি পালাচ্ছি দিদি। আমার এক বন্ধু তিনসুকিয়ায় থাকে। ওর কাছে চলে যাব। আজ রাতের ট্রেনে কলকাতা, ওখান থেকে ভোরবেলা কামরূপ ধরে আসাম।

খুব ভয় লাগছিল আত্রেয়ীর। তুই এখানে এসেছিস কেউ জানে?

–আমি তো কাউকে জানিয়ে আসিনি। কিন্তু কেউ পিছু নিলে অবাক হব না। আমায় কিছু টাকা দিতে পারবি দিদি? টাকা নিয়েই বেরিয়ে যাব।
–আজকেই টিউশানির কিছু টাকা পেয়েছি। যা আছে ব্যাগে দিয়ে দেব।
–তুই এখন কিছু খাবি অনু? দুটো ভাত মুখে দিয়ে যা।
–আমার সময় বড় কম মা। খাবার তৈরি থাকলে দাও। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি।

দুপুরের একটু ডাল চচ্চড়ি জলচাপা দেওয়া আছে। আমি ভাত চড়িয়ে দিচ্ছি ছোট বাটিতে, এখুনি হয়ে যাবে। কমলা দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে চলে গেল। শরীরের সব জড়তা উড়ে গেছে এক লহমায়। তার ছেলে বাড়িতে এসেছে। কিচ্ছু হয়নি তার। বেঁচে আছে। এর চেয়ে বড় চাওয়া আর কী থাকতে পারে মানুষের?

মা যেতে এবার ভাইকে নিয়ে পড়ল আত্রেয়ী। আমাকে সব খুলে বল ভাই। ভয়ের কিছু আছে? তুই রঘুকে কেন বলছিস না। শুনেছি ও এখন তোদের পার্টির খুব বড় পোস্টে আছে। দুর্গাপুরে তোদের কনভেনশান হল, শুনেছি ওর হাতে এখন অনেক দায়িত্ব।

শুকনো হাসল অতীন। রঘুদা অন্য ফ্যাকশনের দিদি। ওরাই আমাকে মারার খোঁজে আছে, কোথায় আছি জানতে পারলে সেখানেই লাশ ফেলে দেবে। আত্রেয়ীর অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, সব শেষ হয়ে গেছে রে দিদি। এখন আছে শুধু রক্তের ঋণশোধ।

আত্রেয়ী সজোরে ভাইয়ের মাথা বুকে চেপে ধরল। অতীনের চোখের জলে তার শাড়ি ব্লাউজ ভিজে যাচ্ছিল। ভাইয়ের শরীরের ভিতরের কাঁপুনি আত্রেয়ীকে ছেয়ে যাচ্ছিল।

কমলা থালা হাতে ঢুকল। তার শরীরে এত জোর যে হঠাৎ কীভাবে এসে গেল! তোর জন্য খাবার গরম করে এনেছি অনু। কড়কড়ে করে দুটো পোস্তর বড়াও ভেজে ফেললাম। তুই খুব ভালোবাসতিস। এখানেই খেয়ে নে বসে।

অতীন দিদিকে ছেড়ে মাটিতে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে গেল। চাদরের আড়াল ছাড়িয়ে তার মলিন জামাকাপড় আত্রেয়ীর চোখ এড়ায়নি। বেরোবার আগে তোর জামাকাপড়টা চেঞ্জ করে নিস অনু। ট্রেনে করে এত দূর যাবি, বাজে জামাকাপড় লোকের চোখ টানে।

–দিদি, এই দেশের বেশিরভাগ লোক এর চেয়েও ছেঁড়া জামাকাপড় পরেই বাঁচে।
–সে কথা ঠিক। কিন্তু তোর চেহারাটা তাহলে একদম তাদের মতন করতে হবে রে। গরীব মুটেমজুর ছেঁড়া জামাকাপড় পরলে কেউ ঘুরেও তাকায় না। কিন্তু চোখেমুখে লেখাপড়ার ছাপ থাকলে তার সঙ্গে ময়লা জামাকাপড় লোককে এই সময়ে অন্য কিছু ভাবায়।

অতীন আর তর্ক করল না। খাবারে হাত দিতে গিয়েও গুটিয়ে নিল। হাতে বড্ড নোংরা মা, ধোবার সময় নেই। তুমিই একটু মেখে খাইয়ে দাও না। ছোটবেলার মত।

কমলা স্যোৎসাহে ভাতে ডাল ঢেলে মাখতে শুরু করল। আত্রেয়ীর মনে হল অনু যেন মায়ের হাতে দু মুঠো খাবার জন্যই এমন বলল। ভেবেই বুকে কেঁপে উঠছিল আত্রেয়ীর। যেন ফাঁসির আসামী শেষবারের মত খেতে বসেছে। অতীন যে খুব বিপদে আছে সেটা আত্রেয়ী বেশ বুঝতে পারছিল। বিপদ মাথায় করেই তো ঘুরছে গত তিন চার বছর। কিন্তু এখন যেন শিয়রে মৃত্যুর পরোয়ানা। অন্তত অতীনের শরীরের ভাষায় সেই সঙ্কেত। অস্থির লাগছিল আত্রেয়ীর। বাইরের ঘরে এসে জানালার পর্দার আড়াল থেকে সামনের রাস্তাটা দেখতে গেল। কাল দোলপূর্ণিমা। বাইরে চাঁদের আলো থইথই করছে। কেউ লুকোতে চাইলেও তো পারবে না। অন্তত যতদূর চোখ যায় রাস্তায় কাউকে দেখা যাচ্ছে না। উঠোনের গন্ধরাজ গাছটার পিছনে কী যেন নড়ে উঠল। চমকে উঠতে গিয়েই বুঝতে পারল বিড়াল। বাইরে কেউ নেই দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে এবার শোবার ঘরের চৌকির তলা থেকে তোরঙ্গ টেনে বের করল। অতীনের জামাকাপড় ধুয়ে কমলা পাটপাট করে ওটাতেই রেখে দিয়েছে। এমনকি পুরনো ছোট হয়ে যাওয়া পোশাকও। ভাইটা যা রোগা হয়ে গেছে একটু ছোট জামাপ্যান্ট হলেই বোধহয় গায়ে ধরবে।

কমলা তখনও ছেলেকে খাইয়ে দিচ্ছে। মায়ের চোখেমুখে কী এক পরম সুখ। অতীন তার সমস্ত চোখ দিয়ে মায়ের প্রতিটা অঙ্গভঙ্গি যেন শুষে নিচ্ছে। দেখতে দেখতে খাবার শেষ। মা, চাঁচিপুছি? কমলার সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। তার ছেলে। যেন সেই ছোট্টবেলার অনু।

কিন্তু তার পরেই অতীন তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠল। দিদি, আমার পুরনো জামাকাপড় দিবি বললি। দে, চেঞ্জ করে নিই।

অতীন একটানে ঘামশুকোনো নোংরা জামাটা খুলে বিছানার উপর রাখল। শরীরের কী হাল করেছিস অনু? কমলা আঁতকে উঠল। হাড় কখানা যে গোনা যায়।

তোমার হাতের খাওয়া সাতদিন পেলেই সব পুরিয়ে যাবে মা। চট করে প্যান্টের পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলা জামার আড়ালে ঢুকিয়ে দিল। কমলার চোখ এড়ালেও আত্রেয়ী ঠিক দেখতে পেল। দেখে বরং একটু নিশ্চিন্ত হল। অন্তত আত্মরক্ষার ব্যবস্থা আছে।

–যাই মা। কমলাকে দুহাতে কষে জড়িয়ে ধরল অতীন। দিদি মাকে দেখিস। আমি পিছনের সিঁড়ির ঘর দিয়ে বেরোচ্ছি। তোরা এখানেই থাক। কিন্তু আমি বেরোলেই দরজায় খিল তুলে দিবি। বাইরে আসবি না।

অতীন আওয়াজ না করে খিলটা তুলল। আস্তে করে পাশে নাবাল। একটা পাল্লা একটু ফাঁক করে চোখ বুলাল বাইরে। তারপরে শেষবারের মত একবার পিছন ফিরে তাকাল মা আর দিদির দিকে। মিলিয়ে গেল দরজার ওপারে।

আত্রেয়ী আর কমলা এক জায়গায় দাঁড়িয়েছিল। হয়তো কয়েক মুহূর্ত, কিংবা কয়েক পল। কিন্তু পরক্ষণেই চমক ভেঙে আত্রেয়ী দ্রুত পায়ে দরজায় খিল তুলতে এগোল। সেই মুহূর্তে পিস্তলের দমফাটা আওয়াজ। কিন্তু সেই দমফাটা আওয়াজ ছাপিয়ে এক সুতীক্ষ্ণ চিৎকার। শুধু একবার। আরও দুটো গুলি। কিন্তু আর্তচিৎকারহীন।

হুড়মুড়িয়ে দৌড়াল কমলা। আত্রেয়ী। সঙ্গে সঙ্গে আবার একটা গুলির আওয়াজ। আর একটা আর্তনাদ। একটা সাইকেলের হুড়মুড়িয়ে পড়ার আওয়াজ। আত্রেয়ী মাকে পিছন থেকে জাপ্টে ধরল। যেও না মা, দাঁড়াও।

কমলা এক মুহূর্তের জন্য ঘুরে দাঁড়াল। জ্বলন্ত চোখ। যার হাতে বন্দুক তাকে পেলে যেন রক্তপান করতে পারে এমন ক্রোধের দাবানল সেই চোখে। ওটা অতীনের গলা, আমাকে যেতেই হবে।

ঠিক। বুকে গুলি নিয়ে অতীন রাস্তার মধ্যিখানে ছেতরে পড়ে আছে। উল্টোদিকের দেওয়াল অবধি চলে গেছে রক্তের ছিটে। দেওয়ালে লাল রঙে লেখা চীনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যানের অক্ষরগুলো ফিকে লাগছে।

অনু! বলে মরণান্তক চিৎকার দিয়ে কমলা ছেলের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আত্রেয়ীর পা যেন আটকে গেছিল। চমক ভাঙল গোঙানিতে। সাইকেল নিয়ে রাস্তার অন্যদিকে পড়ে থাকা লোকটার মুখ থেকে আওয়াজ আসছিল। এই তবে অতীনের ঘাতক। খুনির জিঘাংসা নিয়ে আত্রেয়ী ছুটে গেল।

–রতনকাকু!

রতন হাত তুলে রাস্তার অন্য পার দেখাল। ওইদিক দিয়ে পালাল। আমি দেখেছি। বলেই জ্ঞান হারাল।

রতন মাধবীর কথায় থানায় এফআইআর তুলতে গেছিল। ওখানে অনেকটা সময় লেগে যায়। সব কাজ সেরে তাড়াতাড়ি ফিরছিল। ভেবেছিল জিপ নিয়ে পুলিশের গাড়ি পাড়ায় ঢোকার আগেই এসে মাধবীকে খবরটা দিয়ে গৃহশান্তি ফেরাবে। গলির মোড়ে ঢুকতেই দেখে গুলি চলছে। বুঝতেও পারেনি কে কাকে মারছে। তার আগেই আততায়ী পালাতে গিয়ে রতনের মুখোমুখি পড়ে গেল। আর বিনা জিজ্ঞাসায় ছুটতে ছুটতে রতনকে গুলি করে ফেলে দিয়ে পালাল। গুলি রতনের পেটে লেগেছিল। সাইকেল থেকে হুড়মুড়িয়ে পড়তে পড়তে রতন বুঝতে পারল পড়ে থাকা শরীরটা নকশাল হয়ে নিরুদ্দেশে যাওয়া অতীনের। তারপর ধপ করে ওখানেই পড়ে গেল চোখে মাধুরীর ছবি নিয়ে।

কমলা ছেলের মাথা কোলে নিয়ে বসেছিল। গালের দুপাশ জুড়ে তার দুই হাত। ঠিক যেমন একটু আগে ঘরের মধ্যে ধরেছিল। কিছুই তো বদলায়নি। শুধু ওর বুক আর পেট এখন রক্তে চটচটে। আত্রেয়ী কী করবে বুঝতে পারছিল না। ভাই তো মারা গেছে। কিন্তু রতনকাকু এখনও বেঁচে। চারপাশের বাড়িতেও আওয়াজ গেছে। কিন্তু একটা আলো জ্বলেনি, কিংবা কেউ বাইরে আসেনি। যুদ্ধের সময়ের ব্ল্যাক আউট সিগনালের মত সবাই যে যার কোটরে। আত্রেয়ী খালি পায়ে ছুটল রতনকাকুর বাড়ির দিকে। অন্তত কাকিমাকে খবর দেওয়ার দরকার।

মাধবী যতক্ষণে এসে পৌঁছাল থানার জিপ বাচ্চাদের নিয়ে এসে পৌঁছেছে। পিছন পিছন ছেলেদের বাবারাও। আস্তে আস্তে পাড়ার কিছু বাড়ির দরজা খুলে আলো অন্ধকার রাস্তায় ছিটকে পড়তে শুরু করল। মাধবী মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছিল। কেন পাঠালাম এই আত্মদাহটাকে দূরে সরিয়ে বোঝার চেষ্টা করল রতনের অবস্থাটা। অনেক রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে। এখুনি হাসাপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

অতীনের দেহ ঘিরে লোকের ভিড় সরাতে ব্যাস্ত ছিল পুলিশ। মাধবী দৌড়ে এস আইয়ের কাছে গেল। গলা যতদূর সম্ভব শান্ত রেখে বলল— স্যার, আমি রতন ঘোষের স্ত্রী। ওনার খুব রক্তপাত হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স আনার সময় নেই, আপনার জিপে করে নিয়ে যেতে হবে।

ওসি একটু দোনামনা করছিল। মাধবী কঠিন গলায় বলল, গাড়িতে রক্ত লাগলে আমি ধুয়ে দেব, কিন্তু ওকে এখুনি নিয়ে যেতে না পারলে বাঁচানো যাবে না।

মাধবীর কথায় কিছু থাকে যা না করা ঘাঘু পুলিস অফিসারের পক্ষেও সম্ভব হয় না। দুই কন্সটেবল রতনকে জিপে তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেল।

অতীনের মাথা কোলে নিয়ে কমলা তেমনি বসেছিল। আত্রেয়ী পায়ের কাছে। হীরক, তোতন, পিকলু, বীরু ওরা ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। বিমল হাত ধরে টেনে হীরককে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু হীরক নড়তে পারেনি। চোখের সামনে এই প্রথম মৃত্যু দেখা তার। রক্তের ধারাস্রোতে পথের ধুলায় বিলীন হচ্ছে। অতীনদা তার খুব প্রিয় পাড়াতুতো দাদা। আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় যাওয়ার আগে অতীনদাদের বাড়ি যেত। ওদের বাড়ির রবীন্দ্র রচনাবলি, নজরুল সমগ্র কিংবা সুকান্তর ছাড়পত্র থেকে কবিতা টুকে নিত। মুখস্থ হয়ে গেলে অতীনদা ধরে ধরে বলতে শেখাত। কাকিমা গেলেই তার হাতে একটা নাড়ু গুঁজে দিত, কিংবা মুড়ির মোয়া। তারপর অতীনদা একদিন হঠাত নিরুদ্দেশ। এরপরেও গেছে। অতীনদা না থাকলেও বইগুলো ছিল। আত্রেয়ীদিকে জিজ্ঞেস করলে বলত, হ্যাঁ রে খুব শিগগির ফিরে আসবে তোদের অতীনদা।

এখন আর ফিরবে না। অতীনদার রক্ত মাখা শরীরের দিকে তাকিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিল হীরক। কেন এমনভাবে মরে গেল অতীনদা। কী করেছিল। নকশাল কথাটা চাপাস্বরে উচ্চারিত হতে শুনেছে অনেক। পুজোয় ক্যাপ বন্দুক নিয়ে নকশাল নকশাল খেলতে গিয়ে বড়দের বকাও শুনেছে। পুলিশের গাড়ি পাড়ায় ঢুকলে কিছুদিন আগেও পাড়ার একটু বড় ছেলেদের পায়খানায় ঢুকে লুকোনোর গল্প শুনেছে বীরুর কাছে। মজা পেয়েছে শুনে, কিন্তু ভয় পায়নি। আজ সন্ধ্যাবেলা থানা থেকে ঘুরে আসা। তারপরেই চোখের সামনে অতীনদার গুলি খাওয়া শরীর। জ্যোৎস্নার ধবধবে নিষ্ঠুরতায় কোনও আড়ালও রাখতে দেয়নি। বাইরের পৃথিবীটা এমনিভাবেই ছোটবেলার শুভ্রসকালটাকে হঠাৎ করে কেড়ে নিল হীরকের আকাশ থেকে।

কার্বন মনোক্সাইডের নিঃশব্দ বিষক্রিয়ার মত গুঁড়ি মেরে ভয় ঢুকে যাচ্ছিল শিরদাঁড়ায়। ধাপে ধাপে ভয় পেতে শেখার নামই বুঝি বড় হওয়া।

 

(ক্রমশ)