ছায়াপাখি — নীল হ্রদের তীরে, পর্ব ৩ (প্রথমাংশ)

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

চাতকপ্রা

বেরিয়ে এবার কোনখানে যাবে সেটা শানু বুঝতে পারছিল না। কী ভেবে বেরিয়েছিল, সেটা মাথার থেকে বেরিয়ে গেছে। অথচ কোথাও একটা পৌঁছে যাওয়ার জন্য মনটা বেশ আঁকুপাঁকু। কিন্তু পরিষ্কার কোনও নিশানা এখন আর মাথায় নেই। বাবার কথাগুলো শুধু মাথার মধ্যে হাতুড়ির মত নিরন্তর ঘা মারছিল। ধার ছিল না, ভার ছিল। মুখে কাগজ চাপা দিয়ে কিছু বললে যেমন কথার অন্তরে ভোমরার গুনগুন ঢুকে যায়, পরমেশের কথাগুলোও তেমনি অস্পষ্ট অবয়বে কানে এসেছিল শানুর। সাইকেলে প্যাডেল করতে করতে সেটাকে ধরাছোঁয়ার মধ্যে আনার চেষ্টা করছিল। কী বলতে চাইছিল বাবা? কী করতে হবে শানুকে? বেশি চিন্তা করলে শানুর কানের উপরে খুব ব্যথা করে। প্রথমে টিপটিপ, তারপরে অসহ্য যন্ত্রণা। একসময় ঘূর্ণিঝড়ের মত তার সমস্ত অস্তিত্বকে গ্রাস করে। তখন আর শানুর নিজের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সেই প্রলয়ের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় চিন্তাটাকে ঘরে ফেরা হাঁসের পালকে লেগে থাকা জলের মত গা ঝাড়া দিয়ে ফেলতে চাইছিল। এমন সময়ে পেছন পেছন একপাল বাচ্চা ছেলে গাছের ডাল আর ঢিল নিয়ে তাড়া করায় শাপে বর হল শানুর। সব ভুলে সে তারস্বরে চেঁচাতে থাকল। গলা ছেড়ে খিস্তি দিতে দিতে শানু প্যাডেল করছিল। সে যত গালাগালি দিয়ে স্বর উঁচুতে তোলে, ছেলের দল তত বেশি খুশিতে উচ্চকিত হয়ে ওঠে নিজেদের চেষ্টার সাফল্যে। শানুর সাইকেল ঝড়ের বেগে পাড়ার রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় এসে পড়েছিল। ছেলেগুলো গলির কুকুরের মত রাস্তার মুখে এসে থমকে গেল। পিছনে কেউ আর নেই, কিন্তু শানুর সাইকেল থামল না। কোনও গন্তব্যও নেই। শুধু পথ পেরোনোর আনন্দে দূর থেকে দূরে চলে যেতে থাকল।

যেতে যেতে চেনা রাস্তা ছাড়িয়ে অন্য রাস্তায়। শহরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে গড়জঙ্গলের পথে। জেনেবুঝে নয়, নাহলে সন্ধ্যা নামার মুখে অতদূর বনেজঙ্গলে কেন যাবে? নিজের থেকে নিজেকে দূরে সরানোর চেষ্টায় পালাচ্ছিল শানু। পাকা রাস্তা, কিন্তু জায়গায় জায়গায় ইট বেরিয়ে গেছে, এবড়োখেবড়ো পথ। সাইকেলের ওপর বসে প্রায় ঘোড়ায় চড়ার মত লাফাতে লাফাতে এগোচ্ছিল। শেষ সূর্যের রং ডানায় নিয়ে ঘরে ফেরা পাখিদের কিচমিচে চারদিক উচ্চকিত। উল্টোদিক থেকে গাড়ি আসছিল অনেক, ধুলো আর ধোঁয়া ছড়িয়ে শানুকে রাস্তার ধারে সিঁটিয়ে দিয়ে। রাস্তার দুপাশে শাল, নিমের জঙ্গল একটু একটু করে ঘন হচ্ছিল। চিমনি আর কারখানার শেড ছাড়িয়ে বের হয়ে পড়ছিল খোলা আকাশ। কিন্তু দূষণ থেকে গাছগুলো পুরোপুরি বাঁচতে পারেনি। তাই গাছের সবুজে এক কালচে আস্তরণ, শিল্পনগরীর বহু বছরের কর্মকাণ্ড প্রতিটা গাছের ক্লোরোফিল শুষে নিয়েছে রক্তচোষা ড্রাগনের মত। গাছের পাতায় পাতায় জীবনের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু প্রাণচাঞ্চল্য নেই। শানু বহু বছর এদিকে আসে না। আজ এতদিন বাদে এসে এই গাছগুলোর মালিন্যর সঙ্গে এক সখ্যতার সম্পর্ক আবিষ্কার করছিল। রাস্তায় গাছের গুঁড়িতে সাইকেল ঠেসান দিয়ে এবার হাঁটতে শুরু করেছিল শানু। এখানে গাছেরা অনেক ঘন হয়ে এসেছে। গাছের গোড়ায় গোড়ায় গুল্মলতা আর আগাছায় যাওয়ার পথটাকে আরও কঠিন করছিল। পাজামায় চোরকাঁটা বিঁধছিল ঘনঘন। তবু কী এক আকর্ষণী শক্তি ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল দূর থেকে দূরে। হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে পাজামার দড়ি আলগা হয়ে পাজামা নেমে আসছিল বারবার। বিরক্ত হয়ে শানু পাজামা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। চারপাশে আর কেউ ছিল না, থাকলেও শানুর ভ্রূক্ষেপ হত না। দূর থেকে অজয় নদীর বহতা জলের ধারা ডেকে নিচ্ছিল ওকে। আলো কমে এসে দিনটা জঙ্গলে অন্ধকারের থাবা বসিয়ে দিচ্ছে, সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।

শানু যত এগিয়ে যাচ্ছিল, কোনও এক সুদূর অতীত মাথা চাড়া দিচ্ছিল তার মনে। ভুলে যাওয়া কথারা বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে উঠে আসতে চাইছিল। কিন্তু পারছিল না। তার জীবনের কিছু কিছু কথা যেন পা পিছলে এক অতল কুয়োয় পড়ে গেছে। উঠে আসবার জন্য ওরা হাঁকপাঁক করে আর শানুর মাথায় কষ্ট হয়, অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ডাক্তার বলেছে ওকে সেইসব কথা নিয়ে বেশি না ভাবতে। যদি কখনও মাথায় এসেও যায় যেন সে দূরে ঠেলে দেয়। তাকে এই সমস্ত ভুলে থাকার ইঞ্জেকশান দিয়েছে কতদিন ধরে। তার স্মৃতিকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ভেজা ন্যাতা দিয়ে স্লেটের অক্ষর মুছে দিলে যেমন শুধু চকের ঝাপসা সাদাটে ধোয়াঁশা রয়ে যায় সেরকম।

কিন্তু আজ এই রাস্তায় এসে আবার যেন কোনও কথা, কোনও ভুলিয়ে দেওয়া ছবি নিশির ডাকের মত দরজায় ডাক পাড়ছিল। কেন মনে হচ্ছে এই পথে এসেছে আগে শানু, এরকমই এক আধছায়া সন্ধ্যায়। আর একটু বেশি আলো ছিল হয়তো বা সেদিন। আরও কিছু আলোঝরা মুহূর্ত বাকি ছিল দিনের জঠরে। বেঁচে থাকার মুহূর্তগুলো এখনকার চাইতে সম্ভাবনাময়। কিন্তু কেন এসেছিল? কার সঙ্গে? একা ছিল না তো শানু। সাইকেলের রডে বসা সেই মানুষীর ঘ্রাণ এক অদ্ভুত প্রবলতার সঙ্গে ফিরে এল শানুর নাসারন্ধ্রে। উদগ্রীব শানুর থুঁতনি মাঝে মাঝে ছুঁয়ে দিচ্ছিল সেই রূপবতীর কাঁধ। সে কি শানুর ইচ্ছাকৃত না শুধুই সাইকেলের ঝাঁকুনিতে? হাওয়ায় উড়ে আসা চুল মুশকিল-আসানি ঝালরের মত চোখমুখে শান্তির পরশ ছড়াচ্ছিল। এক অপরিসীম ভালো লাগায় আপ্লুত হচ্ছিল সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ ছেলেটি। কী আশ্চর্য সেই অনুভূতি, সেই স্পর্শ, সেই গন্ধ সব আজ এমন আচমকা ফিরে আসছে শানুর কাছে, কিন্তু মেয়েটির মুখ, নাম কিচ্ছু নয়। কেন নয়? জোরে জোরে মাথাটা ঝাঁকাল শানু। কে তুমি? মনে করার জন্য চোখ বুজে হাঁটছিল শানু, আর প্রাণপণে নিজের ক্ষয়ে যাওয়া মাথা হাঁটকে পুনরাবিষ্কার করতে চাইছিল সেই সন্ধ্যার স্থান, কাল, পাত্রীকে। যা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় শানু ছটফট করে উঠল। কিন্তু কী আশ্চর্য, কেন সেটা বারবার শুধু শিউলির মুখে হয়ে যাচ্ছিল? সে তো অত আগে শিউলিকে চিনত না। চোখ বুজে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চলেছিল শানু। যেন মাথা ঝাঁকালেই স্মৃতিগুলো বাধ্য ছেলের মত আবার পরতে পরতে বসে যাবে আর বইয়ের পাতার মত উল্টে পাল্টে শানু সব কথা ফিরে পেয়ে যাবে।

এই জঙ্গলে সন্ধ্যার পর এমনভাবে কেউ ঘুরে বেড়ায় না। এদিকে পিকনিক করতে অনেকে আসে গাড়ি নিয়ে, কিন্তু পিকনিক সেরে, দেউল ঘুরে সবাই ফিরেও যায় সন্ধ্যা নামার আগে। বড় জন্তুজানোয়ারের জঙ্গল এটা নয়। কিন্তু সাপখোপের অভাব নেই। আর একবার এই অন্ধকারে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়লে পথ খুঁজে আসতেও মুশকিল। শানুর মনে ফেরার ভাবনা ছিল না। তাই রাস্তা ছেড়ে দূর থেকে দূরে ঢুকে যাচ্ছিল। নেহাত সেই সময়ে রাস্তার ধারে এক মোটরবাইক আরোহী এসে থামল। থামেনি ঠিক, কারণ ইঞ্জিন তখনও বুমবুম শব্দে চলছিল। অন্ধকার হয়ে আসা জঙ্গলের ধুসর পটভূমিতে জাঙ্গিয়া পড়ে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে উদভ্রান্তের মত হাঁটা একজন মানুষকে দেখেই থেমেছিল। লোকটা বাইকের ওপর বসেই হাঁক দিল, অ্যাই! অ্যাই! কে রে? কী করছিস এখানে?

অনেক দূর থেকে এই শব্দ ভেসে এল শানুর কানে। কিন্তু নাড়া দিতে পারল না। সে তখন নিজের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল। মন্ত্রধ্বনির মত কবিতার স্ফূরণ হচ্ছিল তার ঠোঁটে। হাঁটতে হাঁটতে উচ্চৈঃস্বরে আউড়ে যাচ্ছিল—

ঊর্ধ্ব আকাশে তারাগুলি মেলি অঙ্গুলি
ইঙ্গিত করি তোমাপানে আছে চাহিয়া
নিম্নে গভীর অধীর মরণ উচ্ছলি
শত তরঙ্গে তোমা-পানে উঠে ধাইয়া।
বহুদূরে তীরে কারা ডাকে বাঁধি অঞ্জলি
“এসো এসো” সুরে করুণ মিনতি মাখা।
ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি অন্ধ, বন্ধ করো না পাখা।

লোকটার ডাক শানুর কানে ঢুকল না। সে লোক এবার অধৈর্য হয়ে একবার বাইকের ইঞ্জিনটাকে দিয়ে গর্জন করাল। তাতেও কিছু হল না দেখে এবার বাইকটা বন্ধ করে মাটিতে পা রাখল। নিচু হয়ে একটা পাথর কুড়াল। শানুর দিকে তাক করল, কিন্তু বোঝা যায় আঘাত করা তার উদ্দেশ্য নয়। কারণ ঢিলটা এমনভাবে ছুঁড়ল যাতে শানুর সামনের গাছটার ওপর এসে পড়ে। ঢিলটা পড়তেই ডালে বসে থাকা একটা পাখি তারস্বরে চেঁচিয়ে ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে গেল। সেটা লোকটার ভালো লাগেনি। আহা রে, সারাদিন পরে সন্ধ্যাবেলা নিজের ডেরায় ফিরেছে পাখিটা, তাকে খামোখা ঘরছাড়া করতে হল।

এবার হুঁশ হল শানুর। কেউ ঢিল মেরেছে। মনে হল সেই বাচ্চাগুলো তাড়া করে এতদূর পৌঁছে গেল। নিজেও একটা আধলা তুলে তাই হুঙ্কার ছাড়ল শানু, কোন শুয়োরের বাচ্চা ঢিল ছুড়তে এসেছিস, আয় তোর মাথা ফাটাই।

লোকটা এবার চিনে ফেলল। শানু পাগলা। শানুকে সে এমনিতেও চিনত। পাড়ায় মাঝে মাঝে আসতে দেখেছে ছোটবেলায়। সে তাই নিজেও হেঁড়ে গলায় চেঁচাল, এদিকে কোথায় যাচ্ছিস শানু? ভয়ডর নেই? সাপ থাকতে পারে, রাত্রিবেলা দেখতে পাবি না। ফিরে আয়।

শানু ঠিক বুঝতে পারছিল না। মাথার গুমোট ভাবটা এখনও কাটেনি পুরো। কিন্তু ধীরে ধীরে আধলা ইট ধরা হাতটা নিচে নামাল, হাত থেকে যদিও ফেলেনি। না যাব না। আসলে তার মনে হচ্ছিল, এই রাস্তা ধরে আর একটু হাঁটলেই তার মাথার পাতাছেঁড়া বইটা পুরোপুরি সাজানো হয়ে যাবে। আর অতীতের সেই সুবাসিত সন্ধ্যার লুকোনো ঝাঁপির ঢাকনা খুলে যাবে।

–কিচ্ছু করব না আমি, এদিকে আয়। আমি তোতন রে শানু। হীরুর সঙ্গে আমাকে দেখেছিস ছোটবেলায়। বলেই মনে হল, এ যা পাগল হীরুকেই মনে আছে কিনা ঠিক নেই, তার সঙ্গে দেখা কাউকে মনে থাকবে কী করে। হীরুকে মনে আছে তোর? না কি? দু পা এগোল তোতন। তার একটা পা পোলিওতে বাঁকা, লেংচে হাঁটে। হয়তো এই হাঁটা দেখেই মনে পড়তে পারে। ল্যাংড়া হওয়ার এই সুবিধার কথা ভেবে একটা শুকনো হাসি জেগে উঠল তোতনের মুখে।
–তুই হীরুকে চিনিস? কিছুতেই ফোন ধরছে না। ওকে একটু বলবি আমার কিছু দরকারি কথা আছে। হীরুর কথা শুনে পায়ে পায়ে এগিয়ে এল শানু।

এই খেলে যা! হীরুর সঙ্গে আমার দেখা নেই কত বছর। আমি ওকে কী বলব? এটা মনে মনে বলল তোতন। মুখে বলল, সে না হয় বলে দেব। কিন্তু তুই এই বনবাদাড়ে রাত্রিবেলায় ল্যাঙট বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন সেটা আগে বল।

হিন্দি সিনেমায় বন্দুক হাতে ধরা খুনির সঙ্গে কথা বলতে বলতে একটুও জানতে না দিয়ে পুলিশের লোক যেভাবে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে, এখানেও তোতন কথা বলতে বলতে শানুর দিকে ধীর পায়ে এগোচ্ছিল। যদিও লেংচে হাঁটার ছন্দপতনের ফলে হাঁটাটাকে পুরোপুরি উহ্য রাখাটা মুশকিল। চেষ্টার ত্রুটি করছিল না। জানে যদি শানু পাগলা হঠাৎ করে জঙ্গলের দিকে দৌড় দেয়, তার এই ল্যাংড়া পায়ে দৌড়ে ধরতে পারবে না। শানু অবশ্য ওর মতলবটা বুঝতে পারেনি। এগিয়েই আসছিল। আর বলিস না, এত চোরকাঁটা এখানে। পায়ে পায়ে পাজামায় বিঁধে যাচ্ছিল, এগোতেই পারছিলাম না। তাই খুলে ফেললাম।

–হ্যাঁ, একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট। পাখির পিছনে ঘুরতে ঘুরতে আমিও অনেকসময় এমন করি। কিন্তু পাজামা খুলে কোথায় যাওয়ার চেষ্টা করছিলি?

তার কথার হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মিলানোর লোক কম থাকে। তোতনের আচরণ বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ লাগল শানুর। তাই খোলসা করে বলল, আমি না কিছু পুরনো কথা খুঁজছি, কিছুতেই পাচ্ছি না। অনেকদিনের কথা, আমি এখানে আগে যে এসেছিলাম সেইসব কথা। কিন্তু কিছুতেই পাচ্ছি না। তুই কেন এসেছিলি রে? তোরও কি কোনও…

হা হা করে হেসে উঠল তোতন। তারপরেই নিজেকে সামলে নিল। পাগল যদি আবার বিগড়ে গিয়ে জঙ্গলের দিকে ছুট দেয় তাহলেই সেরেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। বাইকের হেডলাইটের আলোর থেকেই যা একটু দেখা যাচ্ছে চারদিকটা। আসলে জঙ্গলে ঘুরে কথা খোঁজার ভাবনাটা এমন অভিনব যে সামলাতে পারেনি। আমিও ওইরকম, তোরই মত কথা খুঁজছি রে শানু। তবে মানুষের না, পাখির।

পরনে জাঙ্গিয়া, নীল টি শার্ট, চোখভরা জিজ্ঞাসা নিয়ে শানু এখন একদম সামনাসামনি। তোতন জিজ্ঞেস করল, এখানে এলি কী করে?

এইবার মুখটা কাঁচুমাচু হয়ে গেল শানুর। সাইকেল করে এসেছিলাম। কোথায় রেখেছি এখন আর মনে নেই।

তাহলে তো মুশকিল শানু। এখন অন্ধকার হয়ে গেছে। সাইকেল পাওয়া খুব মুশকিল। আর পাজামাটা কোনখানে ছাড়লি? বলেই মনে হল সেসব কি আর মনে থাকবে এই পাগলের, না এই অন্ধকার ছেয়ে আসা জঙ্গলে সে ওর পাজামা খুঁজতে যাবে!

–অন্ধকারে এখানে আর কী করবি? আমার বাইকে আসবি, তোকে নামিয়ে দেব?

খুব চিন্তায় পরে গেল শানু। কথাটার যেন খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল আজ। আর একটু হলেই মনে পরে যেত। ছেড়ে চলে যাবে? সেই কথাটাই বলল। না রে, কথাটা না খুঁজে আজ যাব না।

মহা মুশকিল। একবার নিজের চোখে দেখে এই অন্ধকারে জঙ্গলে ছেড়ে রেখেও তো যাওয়া যায় না। আবার এই পাগলের সঙ্গে হারানো কথা খুঁজতে যাওয়ারও কোনও ইচ্ছা নেই তোতনের। শোন আমি বলি কী, আজ আমার সঙ্গে বাইকের পিছনে বসে ফিরে চল। কাল আবার এসে না হয় কথা খুঁজে বের করিস।

–আর সাইকেল? আমার সাইকেল? হঠাত খুব বিস্রস্ত বোধ করল শানু। সাইকেল না নিয়ে বাড়ি ফিরলে বাবার কাছে আবার অনেক হেনস্থা হবে। আমাকে সাইকেল খুঁজে বের করতে হবে, না হলে ফেরা যাবে না।
–কাল খুঁজে নিস না হয়। আমি তো কাল আবার এদিকে আসব, তোকে এখানে নামিয়ে দেব সকাল সকাল। তুই সাইকেল খুঁজে নিয়ে ফেরত যাস।

শানু এত সহজে মেনে যাবে সেটা তোতন বুঝতে পারেনি। বেশ বাধ্য ছেলের মত এসে বাইকে ওর পিছনে চেপে বসল। তোর নামটা ভুলে গেছি, কী যেন… আসলে আমার মাথাটা না অতটা ঠিক নেই বুঝলি। কিছু মনে রাখতে পারি না, কথাগুলো হারিয়ে যায়। কত দরকারি কথা হারিয়ে গেছে।

–তোতন। মনে না থাকতেই পারে। আমাকে হয়তো বারদুয়েক দেখে থাকবি স্কুললাইফে। হীরুর সঙ্গেই। আমরা এক পাড়াতেই তো। তোতন বলে ডাকতে পারিস। বাইকে চড়া অভ্যেস আছে তো? উঠে বস পিছনে।
–না রে, বাইকে ধাক্কা খেয়েছিলাম একবার। পিছনে চড়িনি কক্ষনও। শানুর এই নিপাট স্বীকারোক্তিতে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছিল না তোতন। মায়া হচ্ছিল খুব। যখন চিনত ছোটবেলায়, কী ফিটফাট ছিল ছেলেটা। খুব নামডাক, পড়াশোনায় এত ভালো। সেই ছেলের আজ কী অবস্থা।

বাইকটা আওয়াজ তুলে এখন শহরের পথে ফিরছিল। তোতনের কোমর জড়িয়ে বসেছিল শানু। তুই কালকেও এখানে আসবি?

–আমি তো রোজই আসি। বাইকের শব্দে কথা হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছিল। তাছাড়া যাদের মাথার একটু গোলমাল থাকে তারা বোধহয় কানেও কম শোনে। তোতনের তাই মনে হল। আমি পাখির কথা জমাই তো। ছবিও তুলি। তাই আসতে হয়। সব সময় এখানে নয়, অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়াই। পাখির ছবি তুলি, ওদের গান রেকর্ড করি। এইসব আর কী।
–আমাকে তোর সঙ্গে নিয়ে যাবি? পাখির ছবি তুলতে?

পাখির ছবি তোলা, গান রেকর্ড করা দলবল নিয়ে হয় না কক্ষনও। এমনকি একটু শুকনো পাতার শব্দ, অথবা গলাখাঁকারিতেও পাখি গান বন্ধ করে উড়ে যাবে। কিন্তু পাগলকে না বলার বোকামো করতে চাইল না তোতন। হ্যাঁ, যাস একদিন।

–কালকে? আনন্দে উত্তেজনায় বুক ঢিব ঢিব করছিল শানুর। কালকে যখন সাইকেল খুঁজতে আসব, যাব তোর সঙ্গে?

তোতন প্রমাদ গুনল। একটা বিশেষ প্রজেক্ট চলছে তার, শানুকে নিয়ে সব বরবাদ। কাল না রে, অন্য একদিন নিয়ে যাব, কেমন?

–একটু নিরাশ হল শানু। নিয়ে যাবি তো ঠিক? পরশু?

তোতন এইবার বুঝতে পারল কীরকম নাছোড়বান্দার পাল্লায় পড়েছে। আমি তোকে বলব, একটা দিন ঠিক করে জানাব।

শানুকে এমন অনেকেই অনেক কথা দিয়ে কথা রাখে না। এরকম কথা শুনে শানু আশায় বুক বেঁধে থাকে, কিন্তু কিছুই পায় না। এই যেমন হীরু। এল যখন কত ভালো কথা বলল, কিন্তু তারপর দরকারের সময়ে একদিনও ফোনে পাওয়া যায় না। একটা চিঠিরও উত্তর নেই। তোতনকে নিয়েও তেমনি সন্দেহ হল শানুর। আজ একবার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যাবে, তারপর আর কোনওদিন হয়তো দেখাও পাবে না। তার কাছ থেকে সবাই পালায়, যেমন শিউলিও পালাচ্ছে। কী ইচ্ছা করে দশটা মিনিট সামনে বসে কথা বলে, হয় না। সে কি বোঝে না কিছু, সে কি পাগল? এই কথাটায় নিজেরও হাসি পেল শানুর। সে তো পাগলই।

–তুই আমাকে পাগলা বলে কাটিয়ে দিচ্ছিস তাই না রে তোতন? আমাকে কোনওদিন নিয়ে যাবি না তোর পাখি দেখাতে।

লেংচে হাঁটতে হাঁটতে ছোটবেলা থেকে নিজেকে সবার থেকে নিচু দেখেছে তোতন। আর যন্ত্রণায় ছটফট করেছে। তবু তো নিজেকে নিজে ল্যাংড়া বলে সম্বোধন করতে পারেনি। তাই যে পাগল নিজেকে পাগলার খোপে ফেলে দিয়েছে, তার মনের কষ্টটা তীরের মত এসে বিঁধল তোতনের। গলাটা যথাসম্ভব নরম করে বলল, আমি সত্যি বলছি রে শানু, তোকে ঠকাচ্ছি না। আমার একটা কাজ চলছে, শেষ হোক। আমি শিগগির একদিন তোকে নিয়ে যাবো।

অন্ধকার আকাশে এতক্ষণে একটা হলদে রঙের চাঁদ উঠে গেছে। বাইকের পিছনে বসে তোতনের কাঁধের আড়াল থেকে চাঁদ দেখতে দেখতে এক অনাবিল আনন্দপরিক্রমায় আবিষ্ট হচ্ছিল শানু।

 

–কী খুঁজছ কাকু?
–এইখানে একটা গাছ ছিল রে, পলাশ গাছ। কোথায় যেতে পারে? ভেবে পাচ্ছিল না শানু। এই গাছটার সঙ্গে কোনও একটা স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার। গাছটা দেখতে পেলেই মনে পড়ে যেত।

চারদিকে চেয়ে দেখল। নেই। কেউ মেরে ফেলেছে হয়তো। পলাশ কাঠে ভালো চেয়ার টেবিল হয়। জানিস তো? দুষ্টু লোকেরা ওমনি গাছ মেরে নিয়ে চলে যায়।

সুকু শানুকাকুর কাছ থেকে অনেক অদ্ভুত কথা শুনে শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তবু প্রশ্ন করতে ছাড়ে না। গাছ কি মানুষ না কি কাকু, যে মেরে ফেলবে?

–বা রে, গাছের প্রাণ আছে না? গাছ মরে গেছে কথাটা শুনিসনি?
–কিন্তু গাছ তো কেটে নিয়ে যায়।

কথাটা ঠিক, তবে মনে কর যেন গাছেরা নিজের শরীরটা দান করে দেয়। মানুষের মত পুড়িয়ে নষ্ট করে না।

সুকুর সঙ্গে বেরিয়েছিল শানু। সুকু ওর ট্রাই সাইকেলে, সঙ্গে সঙ্গে শানু। একটু এগিয়েই গাছটা খুঁজে পেয়ে গেল। না, না আছে। ওই দেখ, ওই পশ্চিম ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। বড়টা। আগে দেখেছিলাম এই দুটো গাছ দূরে দূরে থাকত। এখন কেমন ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে দেখ।

খুব অবাক হয়ে তাকাল সুকু। গাছ কি হাঁটতে পারে? কাকুর সঙ্গে থাকতে থাকতে বুঝেছে কিছুই অসম্ভব নয়। কাকু যখন বলে বিশ্বাস করতেও কোনও অসুবিধা হয় না। তবু গাছের হাঁটা সুকু মানতে পারল না।

–পারে না? খুব দুরূহ চিন্তার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল শানু।
–পা কোথায় কাকু যে হাঁটবে? খিলখিল করে হাসল এবার সুকু। না, না কাকু আছে, কিন্তু মাটির ভিতর ঢুকিয়ে রেখেছে। শোনোনি তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে…
–রবি ঠাকুরও ভুলটা করেছিলেন। দরাজ হাসি হাসল শানু। গুলগুল করে একটা হাসি সারা শরীরে খেলে যাচ্ছিল। বল বল কবিতাটা বল দেখি কতটা জানিস।
–তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব মাথা ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে।

থমকে গেল সুকু। আর মনে নেই কাকু।

সুকুর সঙ্গে গলা মিলিয়েছিল, কিন্তু শানুরও আর মনে পড়ছিল না। দেখ, রবি ঠাকুর এই ভুলটা কেন করলেন জানিস? ওই তাল গাছের ডালপালাগুলো একদম টঙের ওপর মাথার মত গোল হয়ে আছে বলে। আমরা মানুষরা সব কিছুকে এমনি মানুষের সঙ্গে মিলাতে ভালোবাসি। কোনও প্রাণী দেখেছিস যার শুধু একটা পা আছে? একটা পায়ে হাঁটা যায় নাকি? মিনিমাম দুটো।

সাইকেলে না থাকলে সুকু এক পায়ে হেঁটে দেখার চেষ্টা করত। তবে কথাটা তো ঠিক। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে পড়ে যাওয়া শানুকে বলল, গাছের গুঁড়িটা যদি পা না হয় তাহলে ওটা কী?

–ধুর ওটা তো গাছের গলা, মাটির ভিতরে মাথা ডুবিয়ে বসে আছে। নাহলে খাবে কী করে? মাটির ভিতর মাথা ঢুকিয়ে জল খায় ওরা। পাগুলো তো ওপরের দিকে ছড়িয়ে রাখা। শীর্ষাসন।
–অতগুলো পা?
–হ্যাঁ, কেন নয়? কেন্নোর পা গুনেছিস কখনও? গাছের কেন থাকতে পারে না? হাত বলিস, পা বলিস সব ওই ডালপালাগুলো।

সুকু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। হ্যাঁ, হতেই পারে। এভাবে তো ভাবেনি কক্ষনও। মাটির নীচ থেকে খাবার খাবে বলে মুখ ঢুকিয়ে বসে আছে। কিন্তু কাকু তাহলে মাথায় ব্যথা করবে না? বছরের পর বছর এইভাবে থাকে।

চোখে ঝিলিক মারল শানুর। সুকুর সঙ্গে কথা বললে ওর মাথায় নতুন নতুন চিন্তাগুলো খেলে ভালো। সেই তৃপ্তির হাসিটা ছড়াল ওর মুখে। ওটা তো দিনেরবেলায়। যখন সূর্যের উনুনে খাবার বানায়। রাত্রে ওরা পায়ের ওপর দাঁড়ায়, আর মাথা থাকে উপরে।

–ধ্যাত, তাহলে আমরা কেন দেখতে পাই না?
–তুই ঘুমোস বলে।
–সত্যি বলছ কাকু? তাহলে আমি আর তুমি আজ সারারাত জেগে থাকব আর বসে বসে দেখব গাছগুলো পায়ের ওপর দাঁড়ায় কিনা।
–তোর মা আমাকে রাত্রে থাকতেই দেবে না, না হলে হ্যারিকেন জ্বেলে আমি আর তুই বসে বসে গাছের নাচ দেখতে পারি।
–ওরা নাচেও?
–না দেখলে জানবি কী করে? পা থাকলে হাঁটবে আর নাচবে না?

খুব মজা পাচ্ছিল শানু। তার যত কল্পনা আর ভাবনাচিন্তা এই ছেলেটার সামনে কেমন নির্দ্বিধায় খুলে দিতে পারে শানু। এমন নয় যে বাচ্চা ছেলেকে বোকা বানাবার জন্য বলছে কিছু। শানু এসব নিয়ে গভীরভাবে ভাবে। নিজে অনেকসময় রাতে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে বসে থাকে। তার নিজের জানালা দিয়ে তিনটে নারকেলগাছ, একটা বেলগাছ আর একটা কাঠগোলাপ দেখা যায়। ওদের হাঁটা এখনও দেখতে পায়নি, কিন্তু শানু নিশ্চিত ওরা কথা বলে। কত রকম অদ্ভুত আওয়াজ ওঠে রাত্রে। গাছের থেকে, আকাশ থেকে, বাতাস থেকে। নির্ঘুম শানু অপলক চেয়ে থাকে। কান পেতে শোনে। কখনও রাতজাগা কোনও পাখি ডেকে চলে যায়। পোকার কটকট আওয়াজ ওঠে। শানু সেইসব শব্দে বিভোর হয়ে থাকে। ও নিশ্চিত গাছেরা হাঁটে কিন্তু ওদের গতি এত স্লথ যে এমনি চোখে বোঝা যায় না। কোনও যন্ত্র যদি থাকত মাপার জন্য। শানু ঠিক জানে আজকের ওই পলাশগাছটা বছর দশেক আগে ওই জায়গায় ছিল, এখন হেঁটে হেঁটে পশ্চিম দিকে চলে গেছে। একবার এই কথাটা বিনয় স্যারকে বলতে গেছিল। স্কুলে পড়ার সময় ওকে ওরা ভিনি দ্য পু বলত। তখন শানুকে নিয়ে ওদের আদিখ্যেতার শেষ নেই। এখন গাছ নিয়ে ওর বক্তব্য শুনে ফুঁ ফুঁ করে উড়িয়ে দিয়েছিল। ওসব মাপাজোকার কাজ জগদীশবাবু অত বছর আগে করে গেছেন, তুমি আর ওর মধ্যে হাত লাগিও না শানু। পরমেশদা বলছিলেন তোমার বেশি চিন্তা করা বারণ। ছেড়ে দাও না এসব কথা। ফুল পাখি দেখো, মনটা ভালো রাখো। পিঠে বেশ জোরে জোরে থাবড়া দিয়েছিলেন ভিনি স্যার। শানুর মনে আছে। লোকটা ভালো নয় মোটেই। ওর কথা ভাবলেই শরীরটা কেমন কুঁচকে যায় এখনও।

ভাবতে ভাবতে শিউলিদের বাড়ি ফেরত এসে গেছিল। সুকু সাইকেল ফেলে দৌড় দিল— মা, মা কাকু কী বলছে জানো?

শানু সাইকেলটা মাটি থেকে তুলে টেনে টেনে নিয়ে আসছিল। ছেলেটা খুব ভালো ছোটে কিন্তু! কী ঝড়ের গতিতে দৌড়ে গেল এতটুকু ছেলে!

শানু ঢুকতেই শিউলি পাকড়াল। কী মতলব বলো তো তোমার শানুদা? গলায় রাগ ছিল, আবার ছিল না। হয়তো একটু বিরক্তি। আবার মজাও। খুব ভালো লাগল শানুর। এমন গলার স্বরের মধ্যে কী একটা আছে যেটা ওর ভিতরে টুংটাং একটা বাজনার সুর তোলে। মনের মধ্যে একটা খুশি পাক মারতে থাকে।

–এমন হাসি হাসি মুখে ফ্যারফ্যার করে চেয়ে আছ কেন? ছেলেটার মাথায় আজগুবি কথা ঢুকাচ্ছ কেন বলো তো? শিউলির গলা রাগের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছে। শানুর বুকের বাজনাটা এবার একটা নতুন গত ধরল। সঙ্গে দিড়িম দিড়িম। হাসিটা বুকের ভিতরে সাঁত করে টেনে নিয়ে একটা কাঁচুমাচু ভাব এল মুখে। শানু কোনও অভিনয় করল তা নয়, সেটা পারেই না। সত্যিকারের ভয় পেয়ে যায় শিউলি রেগে গেলে। একদিন খুব শিউলিকে আদর করতে ইচ্ছে হয়েছিল বলে গালে হাত দিয়ে ফেলেছিল। এমন নরম গাল, হাত বোলাতেই কীরকম শিহরণ হচ্ছিল শানুর। হাত দিয়েছে কী দেয়নি। কী রাগ মেয়ের! বলেই দিয়েছিল আর কোনওদিন বাড়িতে না ঢুকতে। অনেক তুতিয়ে পাতিয়ে, সুকুর আবদারে মিটেছিল সেটা। এখনও মাঝে মাঝে ওর মুখটা দু হাতে গ্রহণ করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ভয় লাগে, যদি বাড়ি থেকে বের করে দেয়। দুটো হাত সেই সময় প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দেয় শানু। নিজের ওপর ভরসা কম।
–তুমি নাকি বলেছ গাছ হেঁটে বেড়ায়?
–বলেছি। নির্দ্বিধায় স্বীকার করে শানু, একটু আত্মশ্লাঘাও মিশে থাকে এই কথনে।
–কেন এসব কথা ছেলেটার মাথায় ঢুকাচ্ছ? এমনিতেই রাত্রে ওর পেচ্ছাপ পেলে উঠোন পেরিয়ে বাথরুমে যেতে ভয়ে সিঁটোয়, গাছের আড়ালে নাকি পেত্নি দাঁড়িয়ে থাকবে। তুমি তার ওপর ভয় ধরিয়ে দিচ্ছ।
–ভয় কীসের? আমি তো কোনও ভয়ের কথা বলিনি। গাছ কি ভূত না পেত্নি? শানুর এমন অবাক হওয়ার ভঙ্গিটা গা জ্বলিয়ে দেয় শিউলির। এমনভাবে বলে যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। অনেক ঘাটের মানুষ চড়িয়েছে শিউলি, ছেলেদের চোখ তার অচেনা নয়। ওর চাউনিতে ভান নেই সেটা বুঝেই পুরো রেগে যেতে পারে না শিউলি। এমন পরিষ্কার চোখে তাকায়! এমন দামড়া লোকের কী করে এরকম বাচ্চাদের মত নরম চোখ হয় কে জানে। গা শিরশির করে। মাথায় ছিট আছে বলেই বোধহয়।
–তুমি গাছকে হেঁটে যেতে দেখেছ? জিভ দিয়ে গালের একদিক ঠেলে ধরে মুখে একটা অদ্ভুত সন্দেহ আর কৌতূহলের ছবি বানায় শিউলি। আয়নায় এমন করে দেখেছে, বেশ ভালো লাগে।

এবার মুচকি হাসল শানু। ভাবটা যেন খুব মজার কথা শুনেছে। খুব আড়ম্বর করে হাসল, রোজ দেখি।

হাততালি দিয়ে উঠল সুকু। বললাম না মা, কাকু গাছ হাঁটতে দেখেছে। আমিও দেখব।

–ভালো হবে না বলে দিচ্ছি শানুদা? তুমি কি ঠাট্টা করছ আমার সঙ্গে?

শানু এতক্ষণে মাটিতে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে গেছে। সুযোগ পেলেই এইভাবে বসে যায় শানু, যেন বলতে চায় ঘাড় ধরে না তাড়ালে যাচ্ছি না কোথাও। হাঁটু নাচাতে নাচাতে বলল, দেখি তো রোজ। একটা শিউলিগাছ হেঁটে চলে ঘুরে বেড়ায়।

–মরণ! ঠাট্টাইয়ার্কি করছে যত। ফিক করে হাসতেই রাগটা পড়ে গেল শিউলির। চা খাবে?
–খাব। দুটো বিস্কুট খাব সঙ্গে। আর খেতে খেতে সত্যিকারের গাছ হাঁটার কথা বলব। এইসব ছোট ছোট দাবিগুলো শানু করে। এর মধ্যে যে কী অনাবিল সুখ! মরুভূমিতে পড়া জলের ফোঁটার মত চোঁ চোঁ করে সেই আনন্দ শুষে নেয় শানু।
–তাহলে আর চা পেতে হচ্ছে না। চা নিয়ে আসছি, কিন্তু গাছ হাঁটার কথা আর একবার শুনলে গরম চা মাথায় ঢালব, এই বলে দিলাম। ভ্রূভঙ্গি করে উঠে দাঁড়াল শিউলি। চপল শরীরে নানাভাবে ঢেউ খেলে আর শানু পকেটে হাতদুটোকে শান্ত করতে মুঠি পাকায়। কাঁচুমাচু করে সুকুকে বলল, গাছের কথা আজ থাক বুঝলি। তার চেয়ে বরং সাপলুডো খেলি আয়।

শিউলি যখন চা নিয়ে ফিরল শানু আর সুকু ততক্ষণে সাপলুডো খেলায় ডুবে গেছে একদম। নিজের কাপটা দুই হাতের অঞ্জলিবদ্ধ করে ওদের দেখছিল শিউলি। বড় আপন করে নিয়েছে দুজনে দুজনকে। এই লোকটা অনেক কথা বলে। কোনটা ওর পাগলামি আর কোনটা ওর বিদ্যাবুদ্ধি তার ফারাক শিউলি করতে পারে না। কিন্তু গলার নরমটা চেনে। এই দিয়েই একটা সম্পর্কের ওম তৈরি হয়। দিনে দিনে সেটা ঠান্ডা পড়ে যায়, আবার কখনও গরম হয়ে তপ্ত তাওয়া। ঠান্ডা আর গরম দুটোই পেয়েছে স্বপনের সঙ্গে। দৌড়াত স্বপন, স্টেট চ্যাম্পিয়ান। তখন কত ওদের স্বপ্ন, আশা, সুখ। চারশো মিটার হার্ডলসের ন্যাশানাল মিটে ছিটকে না পড়ে গেলে! এক মুহূর্তের অমনোযোগ। সেই দিনটা, সেই মুহূর্তটা মনের মধ্যে একেবারে দেগে আছে। যেদিন স্বপনকে ওরা গলা কেটে খুন করল সেদিনটা অতখানি নয়। ততদিনে যে সব ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, শুধু পড়ে ছিল বহু আগে নিভে যাওয়া পোড়া ছাই।

–সুকু খুব ভালো দৌড়ায়। লুডোর চাল মেরে শানু বলল। এইটুকু ছেলে, তার পায়ে কী জোর। না রে সুকু?
–চুপ! হঠাৎ ফেটে পড়ল শিউলি। এই বাড়িতে দৌড়ের কথা বললে ঘাড় ধরে বের করে দেব। দুম দুম পদধ্বনি তুলে চলে গেল শিউলি। শানু বুঝতে পারেনি কী অন্যায় করল। খুব ভয় লাগছিল। সুকু নিজের তর্জনিটা ঠোঁটের ওপর ছোঁয়াল। দৌড়ানোর কথা বোলো না কাকু, মা খুব রেগে যায়।

সেরকমই চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল শানু, কেন রে? ভয় কেটে একটা লুকোছুপি খেলার মজা জন্ম নিচ্ছিল শানুর মনে।

–বাবাকে কেটে ফেলল যে। কালিদাদুর সামনেই হয়েছে সব। আমাকে বলেছে।
–তোর বাবা ভালো দৌড়াত?

মাথা ঝুঁকিয়ে হ্যাঁ বলল সুকু। কালিদাদুর কাছে দৌড় শিখত, দাদু বলেছে।

সাপলুডোর দান শেষ হলে রান্নাঘরে গিয়ে উঁকি মারল শানু। চৌকির ওপর বসে বঁটিতে আলু কাটছিল শিউলি। শানুর ছায়া পিঠে পড়তে চোখ তুলল শিউলি। এখানে কেন মরতে এলে? গলার মধ্যে এখনও বুদ্বুদ জমে, গালে শুকনো জল।

শানু হাঁটুর ওপর থুঁতনি ঠেকিয়ে বসল। হাতের পাতা হাঁটু আর থুতনির মধ্যিখানে বন্দি করে।

–কী চাই বলো দিকিন তোমার? আমার রান্নাঘরে কেন সিঁধিয়েছ?

শানু ফুট খানেক দূরে ছিল। পাছা ঘষটে নিজেকে আর একটু দূরে ঠেলে নিয়ে গেল। ঘুপচি রান্নাঘর, বেশি দূরে সরার জায়গা নেই।

মানুষ নিজের দুঃখ চেপে রাখে, বুকের মধ্যে জমে বরফ। কিন্তু ওম পেলেই গলতে পারে সব। শিউলির শরীরে বহু মানুষের হাত খেলা করেছে। কত লোক চোখ দিয়ে আরশোলার মত চেটেছে ওর শরীর। কখনও ঘিনঘিন করেছে, আবার কখনও নিজের শক্তির পরিচয়ে আত্মপ্রসাদ। কিন্তু এমন নরম চাউনি শীতল ছায়ার মত মেলে রেখে বসে থাকেনি কেউ। শিউলির মনে হল আরেকটা ঘা খাওয়া মানুষ, যাকে নিজের বুকের ভিতরটা উজাড় করে দেখানো যায়। আলোবাতাস খেলানো যায় ওই বন্ধ খুপরিতে। হাতের পিঠে চোখের জল মুছে বলল, দৌড়ের কথা কখনও বোলো না শানুদা, ওই আমার সব কিছু খেয়েছে।

–স্বপন ভালো দৌড়াত তো ছাড়ল কেন?

লম্বা শ্বাস বুকে চাপল শিউলি। ওই দৌড়েই মরণ গো। বলতে বলতে শিউলির চোখ অনেক দূরে ভেসে গেল যেন। পড়ে গেল যে। কালিদা বলেছিল ওই দৌড়টা জিতলেই ওর চাকরি বাঁধা। দেশবিদেশে নাম হবে। কিন্তু ওই যে পড়ল, মালাইচাকি সরে গেল। আর রেসের মাঠে নামতে পারল না। বলতে বলতে আবার চোখে জল এল শিউলির। স্বপনের জন্য কম, নিজের জন্য বেশি। তার সব কিছু ভেঙে পড়ার দিন ওটা।

শানু আবার ঘষটে ঘষটে সামনে এগিয়ে এসেছিল। ডান হাতটাকে আলতো করে শিউলির গালে ছোঁয়াল। মেয়েটা আজকে আর ছিটকে সরে যায়নি। আমিও এমনিভাবে রেসের মাঠে ছিটকে পড়ে গেছিলাম শিউলি। সব্বাই দৌড়ে বেরিয়ে গেল, আমি আর ফিরতে পারলাম না। খুব যন্ত্রণায় চোখের পাতা কাঁপে শানুর। তিরতির করে। ওই একটা পতনেই জীবনের রাশ কীভাবে আলগা হয়ে যেতে পারে সেটা শানুর থেকে আর কে বেশি জানে!

নিজের মনেই বিড়বিড় করছিল শিউলি। দৌড়ের মাঠ ওকে ছেড়ে গেল, কিন্তু আমি তো ছাড়তে পারলাম না। বাপে বাড়ি থেকে খেঁদিয়ে দিল। আমারও জিদ। এখন ভাবি সেদিন যদি গোঁ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে না আসতাম! ছেড়ে দিতাম স্বপনকে, ব্যস! বয়েসটা কম ছিল তো, পছন্দের মানুষটার জন্য বুকটা উথলে উঠল। নিজেকেই ভেঙিয়ে উঠল শিউলি। মনের ভিতরের পস্তানিটা আজ খোলের বাইরে মাথা বের করেছে। আসলে এই বয়সের শিউলি আর ওই যৌবনের মেয়েটা এক নয় যে। অথচ ওই মেয়েটার ঠিকভুলের দায়ভাগ এই শিউলিকে বয়ে বেড়াতে হয়, হবে সারাটা জীবন।

দাড়ি কাটার সময় ছাড়া শিউলির এতটা কাছে কোনওদিন আসেনি শানু। সেইসময় ভয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে, এখন চোখ খোলা। শিউলির শরীর থেকে তীব্র ভালোবাসার গন্ধ পাচ্ছিল শানু। ওর হাতটা শিউলির গাল থেকে নেমে ডান হাতের কনুই খামচে ধরেছিল। শরীরের ভিতর কিছু একটা হচ্ছিল শানুর। শিউলি ওর হাতটা ধরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। বঁটি খোলা আছে শানুদা, হাত কাটাবে নাকি নিজের? মনে পড়ে গেল ওমনি একটা বঁটি দিয়ে ওরা স্বপনের গলা দু ফাঁক করে দিয়েছিল। নিজের অজান্তেই দাঁত পিষে বলল সেই কথাটা শিউলি।

শিউরে উঠে নিজের গলায় হাত রাখল শানু। চোখের সামনে একটা মানুষের মাথা ছিন্ন হয়ে যেতে কেমন লাগে কে জানে। সেই শিহরণ নিয়ে প্রশ্ন করল, চোখের সামনে?

নিঃশব্দে মাথা নাড়ল শিউলি। ওই হারামিগুলো ওকে তাড়া করেছিল। ঢ্যামনা সুবলটা সবার আগে। আগেকার স্বপন হলে খচ্চরগুলো কোনওদিন ধরতে পারত ওকে? তখন ও হাওয়ার সঙ্গে উড়তে পারত। কিন্তু মালাইচাকি ঘুরে যাওয়ার পর একটু নেংচে চলত যে। দৌড়াতে দৌড়াতে প্রাণ বাঁচাতে কালিদার দৌড়ের মাঠে ঢুকে পড়ে। কালিদার সামনেই…

–কালিদার কাছে দৌড় শিখত স্বপন?
–হ্যাঁ। সেখান থেকেই তো। পা-টা যাওয়ার পরে কালিদা ওকে টুকটাক কাজ দেওয়ানোর চেষ্টা করেছিল। আমি ততদিনে ওর সঙ্গে উঠে এসেছি। খুচখাচ কাজ করে কি কিছু হয়? সুবলদের দলে জুটে গিয়েছিল। আর দেখো শেষমেশ ওই শকুনগুলোর হাতেই— গলায় দলা পাকাচ্ছিল এবার। জেনেও হজম করে নিতে হয়েছে সব।

দুটো ভেঙে যাওয়া মানুষ এইভাবে জুড়ছিল নিজেদের। ঢুকে পড়েছিল এক ছাউনির তলায়। আঙুলগুলো জড়িয়েছিল সেই কোমলতা নিয়ে।

 

(আবার আগামী সংখ্যায়)


ছায়াপাখির-র সব কটি পর্বের জন্য ক্লিক করুন: ছায়াপাখি — বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...