Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ভাষা চিন্তা মন: শারীরিক অবকাঠামো — একটি সহজপাঠ [৫]

অশোক মুখোপাধ্যায়

 

পূর্ব প্রসঙ্গ: মানবমস্তিষ্কের গঠন

মস্তিষ্কের কিছু কার্যকলাপ

প্রথমেই স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে নিম্নতর ও উচ্চতর স্নায়বিক কার্যকলাপ সম্পন্ন করে তা বুঝে নিতে হবে। স্নায়ুতন্ত্রের সাহায্যে একটা প্রাণী যে সমস্ত অঙ্গসঞ্চালন বা কাজকর্ম করে তার একটা ক্ষুদ্রতম একক আছে। আচরণগত এই একক ক্রিয়াগুলিকে বলা হয় পরাবর্ত (reflex) এবং পরাবর্ত ক্রিয়া (reflex action)।

এই পরাবর্ত বলতে কী বোঝায়?

প্রাণীদেহ বাইরের পরিবেশের কোনও ঘটনার প্রভাবে বা অভ্যন্তরীন কোনও জৈবনিক ঘটনায় যে তাৎক্ষণিক, স্বতস্ফূর্ত, সহজাত ও পূর্বনির্ধারিত সাড়া দেয় তাকেই পরাবর্ত বলে।

কিছু উদাহরণ দিলে বিষয়টা বোধ হয় সহজে বোধগম্য হবে।

প্রতিটি প্রাণীই সাধারণত তিন ধরনের পরাবর্ত ক্রিয়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। যথা: খাদ্যগ্রহণ, আত্মরক্ষা ও বংশবৃদ্ধি। ক্ষুধার্ত হলে যে কোনও প্রাণীই খাদ্য জোগাড় করতে সচেষ্ট হয়। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে মুখে খাদ্য গেলে লালাগ্রন্থি থেকে লালা নিঃসরণ শুরু হয়। সমস্ত প্রাণীই একটা নির্দিষ্ট বয়স থেকে বংশবৃদ্ধি করার তাগিদ অনুভব করে এবং প্রজননসঙ্গী খোঁজ করে ও তার সাড়া পেলেই যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হয়। আবার যে কোনও প্রাণীই অপর কোনও প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হলে শক্তিসামর্থ্যের অঙ্ক অনুসারে হয় নিরাপদ দূরত্বে পালিয়ে যেতে চায়, অথবা, আক্রমণকারীকে ফিরে আঘাত করার চেষ্টা করে। স্নায়ুতন্ত্রের সাপেক্ষে এইসবই হল পরাবর্ত ক্রিয়ার উদাহরণ।

একটা ঘুমন্ত কুকুর বা বেড়ালকে লাঠি দিয়ে হঠাৎ করে খোঁচা মারলে সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠবে। আমাদের কারও চোখের খুব কাছে আঙুল বা পেনসিল নিয়ে এলে বা চোখের উপর খুব জোরালো আলো ফেললে চোখের তারা সঙ্কুচিত হয়ে যায় এবং চোখ আপনা থেকেই বুজে যায়। এই সব কাজ আমাদেরও ভাবনাচিন্তা করে মাথা খাটিয়ে করতে হয় না। এগুলো সহজাত ক্রিয়া এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে হতে থাকে। উদ্দীপক এলেই দেহ সঙ্গে সঙ্গে তাতে সাড়া দেওয়ার কাজ করে। কী ধরনের বা কোন উদ্দীপক এলে সাড়া দেওয়ার কাজের চরিত্র কেমন হবে, তাও জন্মগতভাবেই নির্ধারিত। শরীর যেন আগে থেকেই জানে, এখন “কী করিতে হইবে”।

বেহুঁশ বা আহত অবস্থায় কোনও অচেতন রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে তিনি একটা রবারের হাতুড়ি দিয়ে হাঁটুর নীচে টোকা দেন। অথবা, একটা মোটা সূঁচের ফলা দিয়ে পায়ের তলায় আঁচড় কাটেন। দেখতে চান, রোগী পা দাপড়ায় কিনা। রোগী একেবারে কোমা স্তরে চলে না গেলে উভয়ক্ষেত্রেই সে পরাবর্ত ক্রিয়া হিসাবে পা ছুড়বে। সুতরাং এটা পরখ করে তার অবস্থা আন্দাজ করা যাবে।

সমস্ত প্রাণী এইরকম কিছু পরাবর্ত ক্রিয়ার সামর্থ্য নিয়েই জন্মায়। প্রচলিত ভাষায় এগুলোকে বলা হয়ে থাকে প্রবৃত্তি (instinct)। যেমন, ক্ষুৎপ্রবৃত্তি, যৌন প্রবৃত্তি, শিকারের প্রবৃত্তি, ইত্যাদি। আবার আমরা যে বৈশিষ্ট্যগুলিকে আবেগ বা প্রক্ষোভ (emotion) বলে থাকি, সেগুলিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরাবর্ত ক্রিয়া। যেমন, ব্যথার অনুভূতি, ভয়, আনন্দ, ইত্যাদি। এই দুই প্রকার পরাবর্তের মধ্যে পার্থক্য হল, প্রবৃত্তিগুলি জৈবনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি আবদ্ধ। খিদে মেটানোর জন্য খাওয়া, বংশবৃদ্ধির জন্য যৌনক্রিয়া, ও অন্যান্য। আবেগ এই জৈবনিক ক্রিয়াগুলির হ্রাস বৃদ্ধি ঘটায়, কোনওটাতে উৎসাহ জোগায়, ত্বরান্বিত করে; আর কোনওটাকে নিরুৎসাহ করে, মন্দীভূত করে দেয়, বা বাধা দেয়। যেমন, ব্যথা লাগলে বা ভয় পেলে আমরা ব্যথার উৎস বা ভয়ের কারণ থেকে সরে যাই। যার থেকে আনন্দ পাই, তার দিকে আমরা আরও বেশি করে ঝুঁকে পড়ি। আবেগ কেবল মানুষেরই বৈশিষ্ট্য নয়। বা সচেতন ক্রিয়াও নয়। প্রায় সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর আচরণেই নানারকম আবেগের সাক্ষাত মেলে। এও তাদের অভিযোজনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। অস্তিত্বের সংগ্রামে সহায়ক শক্তি।

কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে একটা প্রাণীকে শুধু মাত্র কয়েকটা সহজাত পরাবর্ত নিয়ে ঘুরলে হয় না, বহির্বাস্তবের নিত্যনতুন উপাদানের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হলে তাকে বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন বস্তু ও ঘটনার সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের পরিচয় ঘটাতে হবে, সম্পর্ক স্থাপন করতে শিখতে হবে। যাদের এই সামর্থ্য যত বেশি, তাদের— ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের সূত্রানুসারে— পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজ্যতার হারও তত অধিক। অর্থাৎ, তাদেরই জীবনযুদ্ধে খাদ্য সংগ্রহ করে ও যৌনসঙ্গী নির্বাচন করে টিঁকে থাকার এবং বংশবিস্তারের সম্ভাবনা অনেক বেশি। আর এই নতুন বস্তু ও ঘটনার সঙ্গে পরিচিতির ব্যাপারটা আসলে নতুন নতুন পরাবর্ত ক্রিয়ার সামর্থ্য অর্জনের প্রক্রিয়া। এর মধ্য দিয়ে তার আচরণ ক্রমাগত উন্নত ও জটিল হয়, সুসংবদ্ধ হতে থাকে।

পাভলভ সহজাত পরাবর্তগুলিকে শর্তহীন পরাবর্ত (unconditioned reflex) এবং অর্জিত পরাবর্তগুলির নাম দিলেন শর্তাধীন পরাবর্ত (conditioned reflex)। মনুষ্যেতর প্রাণীসমূহ বাস্তব জীবনযাপন প্রক্রিয়ায় যে সমস্ত আচরণ করে থাকে, তার সবই এই শর্তহীন ও শর্তাধীন পরাবর্তের সমষ্টি মাত্র।

বিবর্তনের কালসীমায় যে প্রাণী যত আদিম ও সরল, সে ততই সহজাত পরাবর্ত ক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। শর্তহীন পরাবর্তের অস্তিত্বের জন্য মস্তিষ্কের খুব একটা বিকশিত হওয়ার দরকার নেই। এমনকি অক্টোপাসের কেন্দ্রীয় স্নায়ুগ্রন্থির মানের মস্তিষ্কই এর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু মস্তিষ্ক যত উন্নত, শর্তহীন পরাবর্তগুলি ততই পশ্চাদমস্তিষ্কের দ্বারা পরিচালিত হয়। পক্ষান্তরে বিকশিত অগ্রমস্তিষ্কের সাহায্যে উন্নততর প্রাণীগুলি নতুন নতুন ধরনের পরাবর্ত ক্রিয়া অর্জন করতে পারে এবং করেও থাকে। অর্থাৎ, নানারকম বৈচিত্র্যপূর্ণ সংবেদন গ্রহণ বিশ্লেষণ ও সংযোজন ক্ষমতার বিকাশের সঙ্গেই শর্তাধীন পরাবর্ত ক্রিয়াশীলতা অর্জন ও বৃদ্ধির প্রশ্নটি জড়িত। এদের আচরণগত জটিলতা এর ফলে বৃদ্ধি পায়।

পরাবর্ত ক্রিয়া সম্পর্কিত ধারণার প্রথম আভাস পাওয়া যায় সপ্তদশ শতাব্দের ফরাসি যুক্তিবাদী দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ রনে দকার্ত-এর রচনায়। তাঁর মৃত্যুর এক বছর আগে প্রকাশিত Les Passions de l’Ame (আত্মার আবেগময়তা, ১৬৪৯) গ্রন্থ এবং মৃত্যুর পরে প্রকাশিত De l’Homme (মানুষ প্রসঙ্গে, ১৬৬৪) পুস্তকে মানুষের বাহ্যিক আচরণের সরলতম এককটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এরকম একটি ধারণার ইঙ্গিত ছিল। ঠিক তার পরেই ইংল্যান্ডে টমাস উইলিস (১৬২১-৭৫) তাঁর De Motu Musculari (পেশী সঞ্চালন প্রসঙ্গে, ১৬৭০) বইতে মস্তিষ্কের গঠন এবং ক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের বৈজ্ঞানিক প্রয়াস শুরু করেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের জগতে ধারণাটির জায়গা পেতে আরও প্রায় দুশো বছর লেগেছে। ঊনবিংশ শতাব্দের গোড়ায় চার্লস বেল (১৭৭৪-১৮৪২), জোহানেস ম্যুলার (১৮০১-৫৮), গুস্তাভ ম্যাগনাস (১৮০২-৭০), মাঝামাঝি সময়ে গ্র্যানভিল হল (১৮৪৬-১৯২৪), গেওর্গ এলিয়াস ম্যুলার (১৮৫০-১৯৩৪) এবং তারপর ইভান সেচেনভ, চার্ল্‌স স্কট শেরিংটন (১৮৫৭-১৯৫২), প্রমুখ ধীরে ধীরে এর স্নায়ুতান্ত্রিক শারীরস্থানীয় এবং শারীরতাত্ত্বিক ভিত্তি আবিষ্কার ও বিশ্লেষণ করে মনোবিজ্ঞানের ধারণা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এখন শুধু শারীরতত্ত্ব ও মনোবিজ্ঞান নয়, শিক্ষাবিজ্ঞান, ক্রীড়াবিজ্ঞান, ইত্যাদির তাত্ত্বিক চর্চায়ও পরাবর্ত ক্রিয়া সংক্রান্ত তত্ত্ব একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিয়েছে। মনঃসংযোগ ও পেশী সঞ্চালনের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। [Clarac and Barbara 2011]

শর্তহীন পরাবর্ত ক্রিয়ার স্নায়ুতান্ত্রিক ভিত্তি কী?

যেহেতু বহির্জগতের কোনও উদ্দীপকের প্রভাব থেকে শুরু হয়ে তাতে সাড়া দেওয়ার ঘটনায় একটা পরাবর্তের ক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তাই একে একটা শারীরতাত্ত্বিক বর্তনীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই বর্তনীর একেবারে শুরুতে থাকে একটা গ্রাহক (receptor), সাধারণত কোনও ইন্দ্রিয়, যে বাইরের পরিবেশের কোনও বস্তু বা ঘটনার দ্বারা উত্তেজিত হয়। এই উত্তেজনার ফলে গ্রাহকের নিকটবর্তী স্নায়ুতন্তু দিয়ে একটা তড়িৎ-রাসায়নিক অভিঘাত (electrical-chemical impulse) স্নায়ুকোষ দেহের দিকে ধাবিত হয়। এই অভিঘাতকে বলা হচ্ছে সংবেদন, এবং যে স্নায়ু একে বহন করে ভেতরে নিয়ে যায় তাকে অন্তর্বাহী (afferent) বা সংবেদক (sensory) স্নায়ু বলে। স্নায়ুতন্ত্রের প্রাথমিক যোগাযোগ ব্যবস্থাটি এমন যে ওই বিশেষ ধরনের সংবেদন যে স্নায়ু গ্রহণ করে সে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর একটি স্নায়ুকেও উদ্দীপিত করে। ফলে সেই দ্বিতীয় স্নায়ুকোষের দেহ থেকে তার স্নায়ুতন্তু দিয়ে একটা কাজের নির্দেশ উপযুক্ত দেহাঙ্গের কাছে আবারও সেই তাড়িত-রাসায়নিক অভিঘাতের আকারেই ছুটে যায়। এই স্নায়ুটিকে বলা হয় সঞ্চালক (motor) বা বহির্বাহী (efferent) স্নায়ু এবং যে দেহাঙ্গ পূর্বোক্ত উত্তেজনায় এইভাবে সাড়া দেয় তার নাম কারক (effector)। এখানেই বর্তনীর শেষ। উচ্চতর প্রাণীর ক্ষেত্রে জাগ্রত ও ক্রিয়াশীল অবস্থায় এই বর্তনীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, মস্তিষ্ক, এমনকি সেরিব্রাল কর্টেক্সেরও যোগাযোগ স্থাপিত হয় (চিত্র – ৫)। এবং সেক্ষেত্রে কাজের নির্দেশ অগ্রমস্তিষ্কের সঞ্চালক কেন্দ্র থেকেই আসে।

একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে এই ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরা যাক, ঘুমন্ত অবস্থায় আমার পায়ে একটা মশা (উদ্দীপক) বসেছে। আমি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছি, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মশার পক্ষে এমনিতে খুবই অনুকূল অবস্থা। যেই সে রক্ত চুষবার জন্য হুল ফুটিয়েছে, সেখানকার অন্তর্বাহী স্নায়ুপ্রান্তে (গ্রাহক) একটা উত্তেজনা জাগল। সেটি কাছাকাছি একটা বহির্বাহী স্নায়ুর প্রান্তে উত্তেজনাটা পৌঁছে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সেই বহির্বাহী স্নায়ু মশার হুল ফোটানোর আশপাশের পেশীগুলি (কারক)-কে সঙ্কুচিত প্রসারিত করে একটু নাড়িয়ে দিল। বেচারা মশা উড়ে যেতে বাধ্য হল। পুরো ঘটনাটা ঘটতে দু সেকেন্ড সময়ও লাগল না।

খাদ্য এবং লালা নিঃসরণের ঘটনা দিয়ে আর একটু জটিল পরাবর্ত বুঝতে চেষ্টা করি।

কুকুর তার মুখে এক খণ্ড মাংসের টুকরো ঢুকিয়েছে। কীভাবে জোগাড় করেছে সেই জানে। কিন্তু মুখে মাংস ঢোকালে জিভ থেকে তার স্বাদ গন্ধ ও অন্যান্য ভৌত বৈশিষ্ট্য সংক্রান্ত একটা সংবেদন অন্তর্বাহী স্নায়ুর মাধ্যমে চলে যাবে মধ্যমস্তিষ্কের সংবেদন অঞ্চলে এবং সেখান থেকে লালাগ্রন্থির সঞ্চালক কেন্দ্রে। লালাগ্রন্থি সংশ্লিষ্ট বহির্বাহী স্নায়ুর দ্বারা উত্তেজিত হয়ে মুখে লালা ঢালতে শুরু করে দেবে। এর ফলে কুকুর যখন খেতে শুরু করতে যাবে, মুখগহ্বর তখন খাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে যাবে। নরম মাংস বলে খুব বেশি লালা হয়ত আসবে না। দুধ মুখে দিলে লালা প্রায় আসতই না। কিন্তু যদি পাওরুটি হত, তবে অনেক বেশি লালা নিঃসরণ হত। আর যদি মাংসটা খেতে গিয়ে মুখ থেকে মাটিতে পড়ে যায় এবং আবার মুখে তুলে নেবার সময় তাতে ধুলোবালি লেগে যায়, তখন লালার পরিমাণ আরও প্রচুর পরিমাণে ঝরতে দেখা যাবে। সবই বিভিন্ন শর্তহীন পরাবর্তের ব্যাপার। যেমন খবর (সংবেদন) সেই অনুযায়ী লালা নিঃসরণের পরিমাণ নির্দেশনা। পুরো ঘটনাটিকে একটা প্রবাহ নকশার সাহায্যে দেখানো যেতে পারে (চিত্র – ৬)।

কিন্তু পাভলভ এর সঙ্গে শর্তাধীন পরাবর্তের যে ধারণা যুক্ত করলেন তা প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপ বোঝার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী মাত্রা। তিনি নিজে এ নিয়ে প্রচুর পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। সেই সঙ্গে এই বিষয়ে গবেষণার এক সুবিস্তৃত ক্ষেত্র প্রস্তুত করে গেছেন। শর্তাধীন পরাবর্তের তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করানোর জন্য তাঁর অতিখ্যাত ঘন্টা বাজাবার পরীক্ষার কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু তিনি কীভাবে এই পরীক্ষার ভাবনার দিকে প্রেরিত হয়েছিলেন, তা সম্ভবত অনেকেরই জানা নেই। আমরা সেই আদি কথা থেকেই শুরু করব।

একটা কুকুর (বা বেড়াল) গন্ধ শুঁকে খাদ্য খুঁজে বের করে কীভাবে?

প্রচলিত ধারণা ছিল (ছিল বললে ভুল হবে— এখনও অনেকের মধ্যেই আছে) দুরকম: এক, কুকুর বা বেড়াল চিন্তাভাবনা করে কোথায় খাদ্য থাকতে পারে আন্দাজ করে সেখানে চলে যায়; দুই, এলোমেলোভাবে ঘুরতে ঘুরতে দৈবাৎ ওরা খাদ্যের সন্ধান পায়।

পাভলভের এই দুটো ব্যাখ্যার কোনওটাই পছন্দ হয়নি। তিনি বস্তুবাদী দর্শনে গভীর আস্থা থেকে সমকালীন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আলোকে দুনিয়ার সমস্ত ঘটনার পেছনে কারণ-কার্য সম্বন্ধ বিদ্যমান বলে মনে করতেন। ফলে “এলোমেলো”-তত্ত্বকে তিনি এমনিতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কুকুর বেড়াল বা বানরের মতো উচ্চতর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আচরণ যে যথেষ্ট সুসংগঠিত ও সুসংবদ্ধ— তা তিনি অভিজ্ঞতা থেকেই জানতেন এবং তারই রহস্যভেদে তিনি তখন ব্যস্ত। কিন্তু তাই বলে তারা চিন্তাভাবনা করতে পারে— এটার পেছনেও তিনি যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অতএব তিনি নিজেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে ব্যবহার করে একটা তত্ত্বকল্প (hypothesis) খাড়া করলেন: এই প্রাণীগুলি তাদের নৈমিত্তিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মস্তিষ্কে খাদ্যের বিশেষ বিশেষ গন্ধের সঙ্গে নির্দিষ্ট খাদ্যের বাস্তব উপস্থিতির একটা সম্পর্ক স্থাপন করেছে। গন্ধ এখানে একটা সঙ্কেত (signal) হিসাবে কাজ করছে। সম্পর্ক স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত গন্ধের কোনও তাৎপর্য নেই তাদের কাছে। কিন্তু একবার সম্পর্ক হয়ে গেলে নির্দিষ্ট গন্ধ নির্দিষ্ট খাদ্য উৎসের সংবাদ নিয়ে আসে। সুতরাং এই তত্ত্বকল্প সঠিক হলে এই সম্পর্ক স্থাপনেরও ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে। কিন্তু এটা সঠিক কিনা তার আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার।

কীভাবে?

তখন তিনি একটা পরীক্ষার কথা ভাবলেন।

স্বাভাবিক অবস্থায় ঘন্টার শব্দ কোনও মতেই একটা প্রাণীর খাদ্যের সন্ধান বা জোগানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কিন্তু দেখা যাক, এরকম একটা সম্পর্ক কৃত্রিমভাবে স্থাপন করা যায় কিনা।

পাভলভ তাঁর পরীক্ষাগারে তাঁর একটি পোষা কুকুরের লালাগ্রন্থির সঙ্গে একটা মানাঙ্কিত পরীক্ষা নল জুড়ে দিলেন। শল্যবিদ্যার এই পাঠ তিনি অনেককাল আগেই, উনিশ শতকের শেষ দিকে, জার্মানিতে গিয়ে শিখে এসেছেন এবং তারপর পাকস্থলীর সঙ্গে পরীক্ষানল জুড়ে পরিপাক সংক্রান্ত বেশ কিছু চমৎকার পরীক্ষা করে যে সমস্ত চমকপ্রদ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তার জন্য ১৯০৩ সালে তিনি শারীরবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। এবারে সেটাই তিনি প্রয়োগ করলেন লালাগ্রন্থিতে। তাতে তিনি দেখে নিয়েছেন, কী ধরনের খাদ্য খেতে দিলে কুকুরের মুখে কতটা করে লালা নিঃসৃত হয়।

পরপর কয়েকদিন তিনি খাদ্য দেওয়ার অব্যবহিত আগে ঘন্টা বাজালেন। অর্থাৎ, ঘন্টা বাজিয়ে খেতে দিলেন। তারপরে একদিন ঘন্টা বাজালেন কিন্তু খাবার দিলেন না। দেখলেন, পরীক্ষানলে যথাপূর্বং একই পরিমাণ লালা এসে জমা হয়েছে। সাধারণভাবে ঘন্টার শব্দ শোনার সঙ্গে কুকুরের লাল নিঃসরণের কোনও জৈব বা সহজাত সম্পর্ক নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একটা যেন সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে।

এটা কী করে ঘটল?

পাভলভ এর ব্যাখ্যা হিসাবে বললেন: এখানে যুগপৎ পুনরাবৃত্তির ফলে দুটো এমনিতে-স্বতন্ত্র সংবেদনের মধ্যে মস্তিষ্কের সংবেদন অঞ্চলে একটা সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে। ঘন্টা বাজলে সেই শব্দের সংবেদন কান দিয়ে ঢুকে শ্রবণ অন্তর্বাহী স্নায়ুর মাধ্যমে পার্শ্বকপাল-পিণ্ডস্থ শ্রবণানুভব অঞ্চলে যাবে। আর খাদ্য মুখে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বাদ গন্ধের অনুভূতি সংশ্লিষ্ট সংবেদক অঞ্চলে যেতে থাকবে। এই দুই রকমের সংবেদন এক সঙ্গে বারবার মস্তিষ্কে যাওয়ার ফলে মধ্যমস্তিষ্কের লালাগ্রন্থি সঞ্চালক কেন্দ্র উভয়ের দ্বারাই উত্তেজিত হতে শুরু করবে। সেই কারণে দুই সংবেদনের পরিণতিতেই লালাগ্রন্থির কাছে লালা নিঃসরণের সঞ্চালন-নির্দেশ যাবে। এর একটা নকশা ওপরে দেখানো হল (চিত্র – ৭)।

এবার যখন কুকুরকে কোনও খাদ্য না দিয়ে শুধু ঘন্টা বাজানো হচ্ছে, তখনও তার ফলে তার লালাগ্রন্থিতে সঞ্চালক কেন্দ্র থেকে লালা নিঃসরণের নির্দেশ যাবে। এর মানে হল, লালা ঝরার সহজাত পরাবর্তটি এখন ঘন্টার শব্দের উদ্দীপক ও তার দ্বারা উৎপন্ন সংবেদনের সঙ্গেও সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। এই নতুন পরাবর্তই হল শর্তাধীন পরাবর্ত। এরও প্রবাহনকশা নীচে দেখানো হল (চিত্র – ৮)।

এরপর আরও নানা রকম উদ্দীপক (যেমন, বিভিন্ন ধরনের শব্দ, আলো, ইত্যাদি) নিয়ে বহু পরীক্ষা করে পাভলভ একটা সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন: “গুরুমস্তিষ্কের অর্ধগোলক দুটিতে নিয়মিত যে কাজকর্ম চলতে থাকে তার মূল শারীরতাত্ত্বিক ব্যাপার হল এই শর্তাধীন পরাবর্ত। প্রাণীদেহের নির্দিষ্ট কাজকর্ম আর তার গ্রাহক অঙ্গে বহির্পরিবেশ থেকে পাওয়া অসংখ্য উদ্দীপনার মধ্যে এ হল এক একটা অস্থায়ী সংযোগ।”[1]

এই ধরনের পরাবর্তগুলিকে শর্তাধীন বলার কারণ হল, কোনও একটা শর্তাধীন উদ্দীপক (যেমন, এখানে ঘন্টা)-এর সঙ্গে শর্তহীন উদ্দীপক (এখানে খাদ্য) পৌনঃপুনিক সংযুক্ত করার শর্তসাপেক্ষে, অর্থাৎ, ব্যবস্থাপনাতেই এই জাতীয় পরাবর্ত স্থাপিত হয়। এরকম শর্ত পূরণ না করে কোনও শর্তাধীন পরাবর্ত স্থাপন করা সম্ভব নয়। আর একে অস্থায়ী বা সাময়িক বলা হয়, কেন না, একবার স্থাপিত হওয়ার পর যদি শর্তহীন উদ্দীপক প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে শর্তাধীন পরাবর্ত দুর্বল হতে হতে এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যেমন, উপরের উদাহরণে, ঘন্টা বাজানোর পর যদি দীর্ঘদিন কুকুরটিকে খেতে দেওয়া না হয়, তখন আর ঘন্টা বাজালেও তার মুখে লালা ঝরবে না।

এটাই স্বাভাবিক। না হলে প্রাণীটির পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

আরও দুটো জিনিস এই সঙ্গে মনে রাখা দরকার।

প্রথমত, এক একটা শর্তাধীন পরাবর্ত গড়ে উঠতে কিছু সময় লাগে। সেটা এক একটা প্রাণীর ক্ষেত্রে এবং এক একটা সঞ্চালন ক্রিয়ার সাপেক্ষে ভিন্ন ভিন্ন হয়। দ্বিতীয়ত, শর্তাধীন পরাবর্ত প্রাণীর পক্ষে সহায়ক না হতে থাকলে তা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। এটা না হলে প্রাণীটির অভিযোজন ক্ষমতা কমে যেত। এইভাবে প্রতিটি প্রাণীকেই শর্তাধীন পরাবর্ত অর্জন ও বর্জন করে চলতে হয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই শর্তাধীন পরাবর্ত নিয়ে অসংখ্য পরীক্ষানিরীক্ষা হয়ে চলেছে। কুকুর বেড়াল ইঁদুর বানর গরিলা শিম্পাঞ্জি ইত্যাদি বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং নানা রকমের পাখি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। তাছাড়া শুধু শব্দের সঙ্গেই নয়, আলো, স্পর্শ, তাপ, তাপমাত্রা, ইত্যাদি শর্তাধীন উদ্দীপক নিয়ে যেমন কাজ হয়েছে, পাশাপাশি নানা রকম কম্পাঙ্ক বিশিষ্ট শব্দ, নানা বর্ণ ও তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো, এবং শর্তহীন ও শর্তাধীন উদ্দীপকগুলি প্রয়োগের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রার সময়ান্তর, ইত্যাদি— পরিবেশের মধ্যে নানা রকম বৈচিত্র্য এনে এই বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। পাখি এবং উচ্চতর স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলির নানা রকম জটিল আচরণ ব্যাখ্যা করা এর ফলে সহজ হয়ে গেছে।

শর্তাধীন পরাবর্ত গঠনের ক্ষমতা প্রাণীর মস্তিষ্কের বিকাশের মাত্রার উপরে নির্ভরশীল। কেন না, এর জন্য এমন সব সংবেদন ও সঞ্চালন ক্রিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয় যাদের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় কোনও সম্পর্ক নেই। এরকম একটা স্নায়ুতান্ত্রিক সংযোগ মস্তিষ্কের কোন জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? দেহের স্বচল (autonomic) ও প্রান্তীয় (peripheral) স্নায়ুতন্ত্রের কাজকর্ম— যেগুলো সবই বাঁধাধরা জৈবনিক ক্রিয়া, যেমন, চলাফেরা, আহার, শ্বসন, রেচন, ঘুম, অনৈচ্ছিক পেশী সঞ্চালন, ইত্যাদি সুষুম্নাকাণ্ড, নিম্নমস্তিষ্ক এবং মধ্যমস্তিষ্ক থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু শব্দ উৎপাদন, শ্রবণ, দর্শন জাতীয় যে কাজগুলি সরীসৃপ পর্যায় পর্যন্ত হয় ছিল না অথবা খুব অনুন্নত অবস্থায় ছিল এবং যেগুলো পাখি এবং স্তন্যপায়ী পর্যায়ে এসে ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে, সেই সংবেদন ও সঞ্চালন ক্রিয়া এদের বেলায় অগ্রমস্তিষ্কই পরিচালনা করে। আর শর্তাধীন পরাবর্ত গঠনের ক্ষেত্রে এই জাতীয় সংবেদন ও সঞ্চালনগুলির ভূমিকাই প্রধান। তাই দুটো সম্পর্কহীন সংবেদন ও সঞ্চালনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের কাজটা অগ্রমস্তিষ্কই একমাত্র করে দিতে পারে। এ অনেকটা বড় বড় অফিসে বিভিন্ন ছোট ছোট বিভাগীয় কাজের মধ্যে সমন্বয় স্থাপনে ও রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরিচালক ভূমিকার মতো ব্যাপার। এই কারণেই যে প্রাণীর মস্তিষ্ক তথা অগ্রমস্তিষ্ক যত উন্নত, তার নতুন পরাবর্ত অর্জন ও বর্জনের ক্ষমতা সেই অনুপাতে বেশি।

 

[ক্রমশ]


[1] Pavlov n. d.b, 283