Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ছায়াপাখি, এক আকাশের নিচে— পর্ব ৩ (শেষাংশ)

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

চাতকপ্রাণ

পাঁচ.

সাহস করে একবার এগিয়ে গেলে পরে নিজেরই অবাক লাগে এতদিন কীসের এত ভয় ছিল। পরমেশের কোনও কথার উপর দিয়ে কক্ষনও যেতে পারেনি, মাথা নিচু করে সব কিছু মেনে নেওয়ার অভ্যাস জারিয়েছিল শিরায় শিরায়। আজ মরিয়া হয়ে ধাক্কা দিতেই সেই দেওয়াল চুরচুর করে ভেঙে পড়েছে। নিজেকে জীবনে প্রথমবার একজন স্বাধীন মানুষ মনে হচ্ছিল। সেই উদ্যম নিয়েই পথে বেরিয়েছিল। বছরের পর বছর কেটে যায়, কোথাও যাওয়া হয় না। একা তো নয়ই। আজ নিজের জন্য ভয় পাওয়ার অবকাশ ছিল না। সব চিন্তা, আশঙ্কার কেন্দ্রবিন্দু শানু। ওর গায়ে যেন আঁচ না লাগে। তবু কীভাবে পৌঁছাল, থানায় গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে শানুকে উদ্ধার করল সব কেমন একটা ঘোরের মধ্যে। কালীপদ বলে একটা লোক ছিল। সেও দুর্গাপুরের, শিউলি মেয়েটার জন্য এসেছিল। ওই বলল, শানুকে বারবার বলা সত্ত্বেও সঙ্গে এসেছে জোর করে। থানায় এসে শিউলিকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বিস্তর চেঁচামেচি করেছে। পুলিশের কাছ থেকে ওকে বাঁচানো যেত না। নেহাত ওর মাথার অবস্থা বুঝিয়ে বলাতে দয়া হয়েছে। ওদিকে কালীপদর হয়েছে মুশকিল। এসেছিল শিউলির কী ব্যবস্থা করা যায় দেখতে, কিন্তু শানুকে সামলাতেই হিমশিম। সুতপার সঙ্গে শানু চলে আসায় ও এখন ঠান্ডা মাথায় শিউলির ব্যবস্থা করতে পারবে। শনি রবিবার পড়ে যাওয়ায় কোর্টে নিয়ে যায়নি, সেটা হবে সোমবার। ততক্ষণ কালীপদ কলকাতাতেই।

মার সঙ্গে শানু আসতে রাজি তো হল, কিন্তু মুখ গোঁজ করে বসে রইল গাড়িতে।

—কাল থেকে কিছু খেয়েছিস?

শানুর চোখ রাখা ছিল জানালার বাইরে। চোখ না সরিয়েই বলল, শিউলিও খায়নি।

কথাটা টং করে লাগল সুতপার। কী জাদু করেছে মেয়েটা! কিন্তু নিজেকে সামলিয়ে নিল।

—খায়নি কী করে জানলি? তোর সঙ্গে কথা হয়েছে?
—না। দেখব কী করে? বাচ্চা ছেলের মতো গাল ফোলাল শানু। আমাকে একবারও ভেতরে যেতে দিল না তো।
—যদি যেতিস দেখতে পেতিস। পুলিশ কাউকে ধরলে খাবার খেতে দেয়, ওকেও নিশ্চয় দিয়েছে।

অবাক হয়ে তাকাল শানু। তুমি কী করে জানলে? তুমি এসেছ আগে কখনও থানায়?

—তোর পিসির মুখে শুনেছি। কাকু থানায় ছিল না?

এটা সুতপার মনগড়া কথা। থানার সম্বন্ধে কোনও অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু টপ করে মাথায় আসায় বলে দিল, যেমন করে হোক শানুকে বুঝিয়েসুঝিয়ে খাওয়াবার চেষ্টায়। শানু হয়তো বিশ্বাস করল। অন্তত মুখে কিছু বলল না।

—তুই এবার কিছু খেয়ে নে।
—মা, আমাকে দেখার তুমি আছ। শিউলিকে দেখার কেউ নেই।

শিউলির দেহব্যবসার কথা শুনে অবধি সুতপার গা ঘিনঘিন করছিল। কিন্তু ছেলেকে এখন বোঝাতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। সেটা জেনেই চুপ রইল। শানু বলছিল। পুলিশের লোকগুলো কী বাজে মা। কী খারাপ খারাপ কথা বলছিল। যেমন আমাকে সবাই বলে।

—রুটি আর আলুর তরকারি এনেছি সঙ্গে। খাবি? আমিও কিন্তু কাল থেকে কিছু মুখে তুলিনি শানু।

উত্তরের অপেক্ষা না করে টিফিন বাক্স খুলল সুতপা। রুটি ছিঁড়ে আলু ভরে শানুর মুখে তুলল। শানুর দাঁতে খাবার ভরতে ভরতে কেমন শিহরন হচ্ছিল সুতপার। যেন ছোট্ট ছেলেটা তার। গাড়ির ঝাঁকুনিতে হাত চলকে খাবার নাকে লেগে গেছে শানুর। আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিল সুতপা। কতদিন এত কাছ থেকে শানুর মুখ দেখেনি। এই বয়সেই কতগুলো পাকা চুল ওর মাথায়। ভাল করে স্নানও করে না ছেলেটা। ছোট হলে নিজের হাতে স্নান করিয়ে দিতে পারত সুতপা।

—আমায় ওরা মেরেছে।
—কে? আঁতকে উঠল সুতপা।
—পুলিশ। আমি এসে শিউলিকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলাম। পুলিশের একটা লোক আমাকে চড় মারল। তারপর মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিল।

শিউরে উঠল সুতপা। পুলিশের অত্যাচার কী ভয়ানক হতে পারে কুমারেশকে দেখে জানে। ওখানে বললি না তো। আমি তাহলে…

—আমার তো অভ্যাস আছে মা। বাবার কাছে ওরকম কত মার খেয়েছি। হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়েই তো মেরেছে বাবা আমাকে কতবার। শানুর স্থির নৈবর্তিক গলা কাঁপিয়ে দিল সুতপাকে। তুমি তো জানো, তোমার সামনেই তো হয়েছে।

চোখে জল এসে গেল সুতপার। তাদের বাড়িতে শানুর কোনও ভুল করার অধিকার ছিল না কক্ষনও। ওকে জেতার জন্য তৈরি করা হচ্ছিল। ওর ভালর জন্যেই হয়তো। শুধু একসময় ছেলের ভালটা গৌণ হয়ে গেল। ওর ভবিষ্যতের যে ছবি পরমেশ-সুতপার মনে ছিল সেটাই হয়ে গেল আসল, তার থেকে কোনও বিচ্যুতি মেনে নেওয়ার স্থৈর্য তাদের ছিল না। যা নিজেরা পেল না, তার সব শানুকে পাইয়ে দেওয়ার উন্মাদনায় ছেলেটা যে একটা আলাদা মানুষ, যার ভুল করবার, ভুল থেকে শিখবার অধিকার আছে সেটাই ভুলে গেল। শুধু পরমেশকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সুচিত্রার সঙ্গে নিজেকেও কি তুলনা করেনি সুতপা? বোনের জীবনের উত্তরোত্তর অগ্রগতি তাকে জ্বালা ধরায়নি? অংশু শর্বাণী ওদের সাফল্যে কেন নিজেকে ছোট মনে হয়েছে! সবমসয় মনকে সান্ত্বনা দিয়েছে, শানু বড় হবে, এত নাম করবে যে জীবনের সব না-পাওয়ার বেদনা ভরাট করে দেবে। জীবনের সেই নতুন পারে বসতি গড়বে সুতপা। যখন সেই স্বপ্নের প্রাসাদে চিড় ধরল আর সেই ভগ্নস্তূপের তলায় পড়ে শানু দিশেহারা হয়ে গেল তখনও পারেনি নিজের ছেলের পাশে থাকতে। পরমেশ যত ক্ষোভ বিদ্বেষ ছেলের উপর উগড়ে দিয়েছে। রুখে দাঁড়াতে পারেনি কোনওদিন। বরং চুপ থেকে সেটাতেই ইন্ধন জুগিয়েছে। পরমেশের সঙ্গে বসে নিজেদের জীবনের হতাশা একসঙ্গে জড়ো করতে করতে জিইয়ে রেখেছে সেই আগুন। সেই সময় যদি নিজেকে ভুলে শানুর দিকে একবার চেয়ে দেখত! কোনঠাসা হয়ে যাওয়া ছেলের মনের আশ্রয় হতে পারত। মুখ ফুটে একথা বলেনি কোনওদিন ছেলেটা। কিন্তু ওর দিশেহারা চোখ কি সেকথা বলেনি? সেটা তো এড়ায়নি সুতপার কাছ থেকে, কিন্তু নিজের অবস্থান একবার ছেড়ে দিলে সেটা ফিরে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায়নি।

শানুর চোখের দৃষ্টি উদ্দেশ্যবিহীন। ভাবছিল। আচ্ছা মা। আমি যখন জন্মালাম, যদি তখন তুমি একা হতে কী করতে?

—হয়তো চাকরি করতাম। হয়তো বাবার কাছে গিয়ে থাকতাম।
—আর নিজের বাবা মা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে কী করতে?
—থাক না এখন সেসব কথা শানু।

বুঝতে পারছিল শানু নিজের মনে যুক্তি সাজাচ্ছে, কিন্তু সুতপা শুনতে চাইছিল না। এক পাগল ছেলেকে নিয়ে দশটা লোকের কথা শুনতে হয়, এখন শিউলির কাদা নিজেদের গায়ে ছিটকালে আর দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না।

—শিউলির একটা ছেলে আছে মা। ওই ছেলের জন্য সবকিছু করতে পারে। করেও।

শিউলির সঙ্গে নিজের তুলনা শুনতে হল। মুখে আঁচল চাপা দিল সুতপা। তোরা শুধু আমার দোষই দেখবি শানু, আমার বুকের মধ্যে যে কী হয়…

জিটি রোড ধরে গাড়ি ঢিক ঢিক করে এগোচ্ছিল। সন্ধ্যা নেমে গেছে অনেকক্ষণ। অন্ধকারে এখন আর শানুর মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। মাঝেমাঝে দোকানের আলো এসে চলকে পড়ছে নাকে, মুখে, গালের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে।

—আমি শিউলিকে বিয়ে করব মা।
—কী যা তা বলছিস শানু? নিজের অজান্তেই পরমেশ ভর করল সুতপার গলায়। এমনভাবে যাকে তাকে বিয়ে করা যায় নাকি?
—শিউলি খুব ভাল।

কীভাবে ছেলেকে বলবে সুতপা? ওর কাছে ভালর যা সংজ্ঞা তার সঙ্গে সংসারের আর দশটা লোকের কথা মিলবে না যে। তবুও চেষ্টা করে। দেখছিস পুলিশ মেয়েটাকে ধরে নিয়ে গেছে, এরপর জেলে দেবে। কীভাবে বিয়ে করবি!

—কাকুকেও জেলে দিয়েছিল। কাকু বিয়ে করেনি?
—কাকু রাজনীতি করত। কিন্তু এই মেয়েটা একটা নোংরা কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, তুই তো সব বুঝিস না।

কথাটা খুব সাবধানে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল সুতপা। শানু যখনতখন খুব রেগে যায়। পরমেশের ওই দোষটা শানুর মধ্যেও তো আছে। তাছাড়া ডাক্তার বারবার বলেছে ওকে উত্তেজিত না করতে। অথচ এই কথাগুলো বলা দরকার। শানুকে বোঝানো দরকার। পরমেশের সামনে সেটা করা আরও বেশি মুশকিল। কাকে সামলাবে তখন সুতপা?

—আমি সব বুঝি মা। পুলিশের লোকগুলো ওইসব বলেই তো চেঁচাচ্ছিল। বেশ্যা, খানকি আরও কত বাজে বাজে কথা। মা! হঠাত আর্ত চিতকার ওঠে শানুর গলায়। গাড়ি ঘোরাও মা। আমি ফিরে যাব। ওরা শিউলিকে মারবে। আমি জানি, ওরা ওকে আমার মতই মাটিতে ফেলে মারবে। আমি যাব। শানু সামনের সিট আঁকড়ে এগিয়ে আসে। এই যে ভাই, গাড়িটা সামনে রাখো তো।

অন্ধকার রাস্তার পাশে ক্যাঁচ করে গাড়িটা থেমে গেল। দিশেহারা সুতপা জাপটে ধরল শানুকে। শানুর শরীর থিরথির করে কাঁপছে। সেই কাঁপুনি সুতপার শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। এমন করিস না বাবা, একটু শান্ত হ। আমি তো শুনছি তোর কথা।

শানুর গলা এখন কান্নাভেজা। ওকে ওরা মারবে, আমি জানি।

—তুই গিয়ে কী করতে পারবি বল। তোকে তো পুলিশ ঢুকতেও দেয়নি। শানুর মাথার চুলে আসতে আসতে হাত বোলাতে থাকে সুতপা। কালীপদ বলছিল কালকে কোর্টে নিয়ে গেলে জামিন পেয়ে যাবে ঠিক। ওদের উকিল আছে। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
—যদি না ছাড়ে কাল?
—তাহলে আমরা আবার আসব। আমি নিজে তোকে নিয়ে আসব।

গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছিল। শানুর হাত এখনও সুতপার হাতের মধ্যে। আমি সুকুকে বাড়িতে নিয়ে আসব।

—সুকু কে?
—শিউলির ছেলে। সেদিন থেকে কালীদার বাড়িতে আছে।
—তাহলে কেন আনতে হবে? ভালই থাকবে নিজের চেনা বাড়িতে। একটা অচেনা বাড়িতে এলে বাচ্চারা ভয় পায়। এইভাবেই যুক্তি সাজায় সুতপা।
—না ভয় পাবে কেন? আমাকে খুব ভালবাসে। বলতে বলতে শানুর চোখ আনন্দে চিকচিক করে ওঠে। ওর কী দোষ বলো মা?
—ছোটদের কোন দোষ হয় না।
—তাহলে আমারও কোনও দোষ ছিল না মা। তবু দেখো আমার দশা… আমি পথে পথে ঘুরে বেড়াতাম মা। আমার কোনও আশ্রয় ছিল না। আমি যেমন, মাথাপাগল। কে আমায় কাছে আসতে দেবে? যেদিকে গিয়েছি সবাই দুদ্দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। ছোট ছোট ছেলেরা ঢিল ছুড়েছে পাগল বলে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে একসময়ের চেনা লোকেরাও পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। কী কষ্ট মা, নিজের বুকে উঁকি দিয়ে দেখেছি যেন খাঁ খাঁ করছে। ছটফট করেছি, দিকে দিকে ছুটে গেছি কেউ হাত বাড়ায়নি। কেন তবে বেঁচে থাকা, শুধু হাহুতাশ শোনা? ভাবতে ভাবতে আমার মাথা দপদপ করেছে মা। একলা আকাশের দিকে চেয়ে বসে থেকেছি। কী আছে ওই আকাশের ওপারে? কী আছে এই জীবনের অন্যদিকে? কী আছে এই জীবনেও?

বুকটা চিনচিন করে ওঠে সুতপার। কোনওদিন এইভাবে শানুর সঙ্গে কেন কথা বলেনি, প্রলেপ দেয়নি ওর বুকের ক্ষতে? শানুর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দেওয়ার প্রত্যাশায় হাত বাড়ায় সুতপা।

সুতপার দিকে তাকিয়ে ফিকে হাসল শানু। কী বুঝেছি জানো মা? জীবনে একটা জিনিসই আছে মা, ভালবাসা। আমি অনেক বড় কিছু হলেও সেই ভালবাসা না পেলে, তাতেও তো জীবন ব্যর্থ। আবার আমার এই নিঃস্ব জীবনে একটু ভালবাসা পেলেও কেমন সার্থক মনে হয়। সুকু যখন খেলতে খেলতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে, আমার আবোলতাবোল কথায় হাততালি দিয়ে হাসে কী আনন্দ হয় মা আমার। মনে হয় আমার কিছু দেওয়ার ছিল, নেওয়ার কেউ ছিল না। আজ সেই জায়গাটা ভরেছে। আমি শিউলিকে বিয়ে করব মা। সুকু আমার ছেলে হবে।

—আচ্ছা, কথা বলব শানু। আগে বাড়িতে চল। স্নান করে খাওয়াদাওয়া করে বিশ্রাম নে। এইসব কথা এমন হুট করে ঠিক করা যায় নাকি।
—আমি শিউলিকে বিয়ে করব মা। কালীদা ওকে ছাড়িয়ে আনুক কাল। তারপর।

শানুর গলার এই স্থির সিদ্ধান্ত কাঁপিয়ে দিল সুতপাকে। পরমেশকে জানে, একটা অগ্নিকাণ্ড হয়ে যাবে। কীভাবে সামলাবে সুতপা? শানুর ডানহাত দুহাতের মধ্যে নিয়ে কাতর অনুনয়ে ঢেলে দেয় গলায়। আজ আর এইসব কথা বলিস না শানু বাড়ি গিয়ে। সারাদিন আমাদের সবার অনেক ধকল গেছে। কালকে আবার বলব এই কথা। কেমন?

—আমি শিউলিকে বিয়ে করব মা। সুকু আমার ছেলে হবে। মন্ত্রধ্বনির মতো আবার বেজে উঠল শানুর গলায়।

সুতপা একথার কোনও উত্তর দিল না। কথা ঘোরানোর জন্য বাইরে তাকিয়ে বলল, দ্যাখ আমরা প্রায় এসে গেছি। কলকাতা অত কিছু দূরেও নয়। আমরা মাঝে মাঝে বেড়াতে যেতে পারি, তাই না রে শানু?

—শিউলিকে না ছাড়লে কালকে আবার যাব।
—তুই থামবি? বলছি না শিউলির কথা কালকে বলব।
—আমি শিউলিকে বিয়ে করব মা। কাটা রেকর্ডের মতো একই কথা ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে শানুর গলায়।

একবুক ভয় নিয়ে বসে রইল সুতপা। যে ভয় কাটিয়ে বেরিয়ে এসেছে ভেবেছিল আজকেই দুপুরে সে কোথাও যায়নি। ঘাপটি মেরে বসে আছে তার মধ্যেই। একটু সুযোগ দিতেই আবার সুতপাকে ছেয়ে যাচ্ছিল।

পরমেশ গ্রিল ঘেরা বারান্দায় পায়চারি করছিল। সুতপা একা সব সামলে নিয়ে আসতে পারবে সেই ভরসা ছিল না। আবার এমন একটা ব্যাপারে নিজেকে জড়াতে মন সায় দেয়নি। ওই দ্বিধায় সারা বিকেল সন্ধে অস্থির কেটেছে পরমেশের। রাগ, অনিশ্চয়তা, ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা কেমন সাঁড়াশির মতো চেপে ধরেছে সবদিক থেকে। গাড়ি থামতেই গ্রিলের গেট খুলে বেরিয়ে এল পরমেশ।

শানুর হাত এখনো সুতপার হাতে ধরা। গেট খুলে ভিতরে ঢুকে এল।

গাড়িটা মোটে গেছে। বারান্দা দিয়ে শানু আর সুতপা ঢুকছে। পরমেশ জিজ্ঞেস করল, ওকে কি হাজতে পুরেছিল?

—না, খবর পেয়েছিল যে আমরা নিতে আসছি। তাই থানায় আটকে রেখেছিল, কিন্তু লেখালেখি কিছু করেনি।

দুশ্চিন্তা কেটে যেতেই রাগ উথলে উঠল পরমেশের। ওটা করলেই ষোলকলা পূর্ণ হত। তোমার গুণধর ছেলে বাবা মায়ের মুখে কালিটা খুব ভাল করে দিতে পারত।

—আহ, থামো না এখন। তুমি কিছু খেয়েছ?

নটা বেজে গেছে। পরমেশের অভ্যাস তাড়তাড়ি খেয়ে নেওয়া। শুনে আবার ঝাঁঝিয়ে উঠল। গলা দিয়ে নামত কিছু? কাঁটা বিঁধে আছে গলায়। না পারছি গিলতে, না পাচ্ছি ওগরাতে।

—চুপ করো। সবসময় শুধু নিজের কথা ভেবো না তো। ছেলেটাকেও একটু শান্তি দাও। নিজের গলার তেজে নিজেই অবাক হচ্ছিল সুতপা।

ফেটে পড়ল পরমেশ।

—আমি চুপ করব? ছেলে একটা বেশ্যা মেয়েছেলের জন্যে বলা নেই কওয়া নেই কলকাতা ছুটবে, আর আমাকে বলছ চুপ করতে? মা আর ছেলের কি সালিশ হয়েছে?
—আমি শিউলিকে বিয়ে করব। ভাবলেশহীন গলায় বলতে বলতে শানু সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলল।
—কী? বাজ পড়লেও এত জোরে আওয়াজ হত না ঘরের মধ্যে। চাবকে লাল করে দেব বেয়াদপ ছেলে! এই বাড়িতে যেন ওই নাম আর কোনদিন না শুনি। কানে গেছে কথাটা?
—আমি শিউলিকে বিয়ে করব। সুকু আমার ছেলে হবে।

একমুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল পরমেশ। কী দুঃসাহস! তেড়ে গেল সিঁড়ির দিকে। রাস্কাল! যা বললাম শুনতে পাসনি? বাবার হোটেলে খাবি আর বেশ্যাবাড়ি গিয়ে মজা করবি, চলবে না এই বাড়িতে।

কথাটা খট করে কানে লাগল সুতপারও। শানু এক মুহূর্তে সিঁড়িতে থমকে দাঁড়াল। পুলিশের লোকগুলোও তোমার মতো কথা বলে। পুলিশের চাকরিতে যাওনি কেন বাবা? তারপর যেন কিচ্ছু হয়নি এমনভাবে আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলল, আমি শিউলিকে বিয়ে করব। সুকু আমার ছেলে হবে।

রাগে দিশেহারা হয়ে গেল পরমেশ। ছুটে গিয়ে পিছন থেকে শানুর জামা ধরে টান মারল। কোথায় যাচ্ছিস? আমি কথা বলছি, আর তুই না শুনে কোথায় যাচ্ছিস?

—চিলেকোঠার ঘরে। আমি ওখানে বসে ভাবব।
—কোত্থাও যাবি না। এইখানে থাক।
—তোমার বাজে কথা শুনব না আমি। পিছনের টানে শানুর ঘাড়টা বেঁকে র‍য়েছিল। সেইভাবেই বলল, আমি শিউলিকে বিয়ে করব। আমি শিউলিকে বিয়ে করবই।

ঠাস করে একটা চড় পড়ল শানুর গালে। সাঁড়াশির মতো দুই হাতে পরমেশ চেপে ধরল ওর গলা। হাঁফাচ্ছিল পরমেশ। একটা কথা বললে গলা টিপে দেব। সারাদিন ওনার জন্য উথালপাথাল। বাবা মায়ের জন্য ওনার কোনও টেনশান নেই। একটা বেশ্যামাগীর জন্য দরদ উথলে পড়ছে।

শানু এক গা ঝাড়ায় বাবার হাত গলা থেকে সরিয়ে দিল। ডান হাতে সমস্ত শক্তি দিয়ে পরমেশের মুখে এক ঘুষি কষাল। পরমেশের নাক ফেটে রক্ত পড়ছিল। শানুর পাল্টা আক্রমণের জন্য তৈরি ছিল না পরমেশ। কোনওদিন এটা করেনি। কিন্তু হাড়েমাংসে এক হয়ে যাওয়া শানুর তুলনায় পরমেশের শক্তি অনেক বেশি। ঘুরে দাঁড়ানো শানুর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল পরমেশ। সামনে থেকে দুই হাতে ওর গলা চেপে ধরল। এত বড় সাহস তোর? আমার গায়ে হাত তুলিস? ভেঙে দেব ওই হাত। শানুর কন্ঠার উপর পরমেশের হাত সর্বশক্তিতে চেপে বসছিল। বল, বল, কী বলবি এবার বল? শানুর চোখ ঠিকরে উঠছিল। পরমেশের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার শক্তি ওর নেই। সিঁড়ির মধ্যে উল্টো হয়ে দাঁড়ানোর জন্য আরও অসুবিধা হচ্ছে।

সবকিছু এত তাড়াতাড়ি কীভাবে ঘটে গেল সুতপা বুঝতেও পারেনি। সম্বিত ফিরে পেতে চিৎকার করে উঠল। ছেড়ে দাও, তুমি ওকে। মরে যাবে ছেলেটা, এক্ষুনি ছেড়ে দাও।

—মরুক। এইরকম ছেলে বাবা মায়ের অভিশাপ। মেরেই ফেলব ওকে আজ।

সুতপা আর পারল না। ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো দৌড়ে এল। তার হাতে তখনও স্টিলের বড় টিফিন ক্যারিয়ারটা। দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ওটাই ঘুরিয়ে মারল পরমেশের মাথার পিছনে। সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পরমেশ টাল সামলাতে না পেরে উল্টে পড়ল। মাথা একটার পর একটা সিঁড়িতে ঠুকতে ঠুকতে পরমেশের শরীরটা একদম নিচের মেঝেতে এসে স্থির। সুতপা দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল শানুকে। শানুর চোখমুখ তখনও নীল। মার মাথা বুকে নিয়ে সিড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে তখনও। সেইভাবেই বলল, বাবা মরে গেল।

চমকে উঠল সুতপা। মাথা ঘুরিয়ে দেখল লোকটা ওইভাবেই পড়ে রয়েছে। একটুও নড়েনি। ত্রস্ত হয়ে তিনটে সিঁড়ি টপকে নিচে নামল সুতপা। কী হল, কী হল কী তোমার? চরম আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল। পাশে বসে দু হাতে মাথাটা তুলে নিল। কপালের উপর থেকে একদম থেঁতলে গেছে। শানুর ঘুষিতে নাক ফেটে ঠোঁট কেটে সারা মুখ রক্তাক্ত। বুকে মাথা ঝুঁকিয়ে হৃদস্পন্দন শোনার চেষ্টা করল।

—ও গো শুনছ? কী হল তোমার?
—বাবা মরে গেছে মা।
—চুপ কর! ঝাঁঝিয়ে উঠল সুতপা। বলতে লজ্জা করে না? দৌড়ে গিয়ে ডাক্তার ডেকে আন। তোর জন্য, তোর জন্য লোকটা শেষ হয়ে গেল আজ।
—আমি তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছি, তার বেলা? শানু শান্ত চোখে মৃতদেহের দিকে চেয়েছিল। কোনও কষ্ট তাকে ছুঁতে পারছিল না। এটাই তো হওয়ার ছিল। মা কেন কাঁদছে কিছুতেই বুঝতে পারছে না।

তীব্র চিৎকারে সুতপা শানুকে নড়াতে চাইল। দাঁড়িয়ে আছিস কেন? দৌড়ে যা, একটা ডাক্তার ডেকে আন। মেরে ফেলবি লোকটাকে?

—বাবা মরে গেছে মা।

চিৎকার করে কেঁদে উঠল সুতপা। কী হল তোমার? শুনতে পাচ্ছ?

—কী হয়েছে এখানে। দরজা খোলা কেন? বলতে বলতে ঢুকে এল এসআই ঘোষ। ছেলে ফিরেছে? এ কি উনি এভাবে পড়ে আছেন কেন?
—বাবা মরে গেছে। শানু জানে না কেন আনন্দের একটা জোয়ার আসছে শরীরে। নাচতে ইচ্ছে করছে তার। মুক্তি, মুক্তির স্বাদ। সেই আনন্দেই ঘোষণা করল, মেরে ফেলেছি বাবাকে। এক্কেবারে শেষ করে দিয়েছি।

এবার অন্য একটা ভয় সুতপাকে গ্রাস করছিল। কী যা তা বলছিস তুই। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পড়ে গেছে, মরে যাবে কেন?

—দেখি দেখি কী হয়েছে? ঘোষ হাঁটু গেড়ে বসে ঝুঁকে পড়ল। একি, মুখটা তো একেবারে থেঁতলে গেছে। কে মারল এইভাবে? শ্বাস নিচ্ছে? এক্ষুনি হল? ঘোষের মনে হল বেঁচে আছেন উনি। অন্তত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে যদি স্টেটমেন্ট নিয়ে নেওয়া যায় কীভাবে কী হয়েছে জানা যেতে পারে। শানুর দিকে তাকিয়ে বলল, এদিকে এসো। আমার সঙ্গে ধরে ওকে নিয়ে চলো তো আমার জিপে। এখনও বেঁচে আছেন মনে হচ্ছে। হাসপাতালে নিতে হবে। ঘোষ দ্রুত দরজার কাছে গিয়ে হাঁক মারল, এই শিবদাস এদিকে দৌড়ে এসো তো।

শিবদাস জিপের ড্রাইভার। বেশ তাগড়া লোক। শিবদাস, ঘোষ আর শানু ধরাধরি করে পরমেশকে নিয়ে জিপে তুলল। সুতপা সঙ্গে সঙ্গে এল। আমিও যাব।

—হ্যাঁ হ্যাঁ সে তো যাবেনই। আপনাদের সবার স্টেটমেন্ট নিতে হবে।

গাড়ি ছুটছিল হাসপাতালের পথে। কী তাড়াতাড়ি কত কিছু ঘটে গেল। পরমেশ শানুকে সিঁড়িতে আটকে দিল। শানু পরমেশকে ঘুঁষি মারল। পরমেশ শানুর গলা টিপে ধরতেই সেই তো পিছন থেকে গিয়ে মারল পরমেশের মাথায় আর সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ল ও। সব কিছু চোখের সামনে সেজে উঠতেই সুতপা হঠাত সোজা হয়ে সিটের মধ্যে এগিয়ে এল।

—ইন্সপেক্টার, ওকে আমি মেরেছি। শানুকে মারছিল বলে ওকে সিঁড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছি। আমার ছেলে কিছু করেনি।
—মা, আমি মেরেছি বাবাকে। নিষ্কম্প গলায় বেজে উঠল শানু।
—আপনারা থামুন। কে কাকে মেরেছে আমি দেখছি। আগে ওনাকে বাঁচানো যায় কিনা সেটা দেখুন।

মনে মনে হাসল ঘোষ। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য মায়েরা মিথ্যে কথা বলেই। এটা নতুন কিছু নয়। আগে দেখা যাক লোকটা বাঁচে কিনা। পরে ফয়সালা হবে এসবের। এইসব ঘরোয়া কেসে পুলিশের ভালই হিস্যা থাকে।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]