Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

প্যারাডাইস লস্ট

প্যারাডাইস পেপার্স

অভয় দে

 

খবরের কাগজে ইদানীং চোখ বুলোলেই মিল্টনের সেই মহাকাব্য বা রবি ঠাকুরের ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’ মনে পড়ে যায়। কিন্তু এই স্বর্গ সেই স্বর্গ নয়। একটুকরো স্বর্গ পাওয়ার আশা কে না করে! আমাদের জন্য তা অধরা, অলীক স্বপ্ন মাত্র– তাঁদের জন্য নয়। আমরা ‘হে মোর চিত্ত’, তাঁরা ‘হে মোর বিত্ত’। তাঁরা আছেন আমরা জানি– জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশ মানুষ দেশের মোট বিত্তের পঞ্চাশ শতাংশ কব্জা করে বসে আছেন। আমরা তাঁদের বাড়ির পাঁচিল দেখেই উৎফুল্ল, ভেতরবাড়ি দৃষ্টিগোচর হয় না।

দুনিয়ার ক্ষমতাবান, বিত্তবানদের অন্দরমহলের কিছু চাঞ্চল্যকর খবর সম্প্রতি জানালেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ। লক্ষাধিক দস্তাবেজ ফাঁস করে বিভিন্ন দেশের অগুনতি ব্যক্তি ও সংস্থার গোপন কার্যকলাপের হদিস দিয়েছেন তাঁরা। নাটকের ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েছে ১৯টি দেশে যেখানে করের হার শূন্যের কাছাকাছি। এইসব দেশে কোম্পানি খুললে কর প্রায় দিতেই হয় না। ব্যবস্থাপনার ভার নিয়েছিল বারমুডার অ্যাপেলবাই এবং সিঙ্গাপুরের এশিয়াসিটি সংস্থা। তাদেরই দস্তাবেজের গোপন তথ্যের নাম ‘প্যারাডাইস পেপার্স’। স্মরণ থাকতে পারে, বছরখানেক আগে এমনই তথ্য পাওয়া গিয়েছিল ‘পানামা পেপার্স’ কাণ্ডে। তার তদন্ত চলছে।

কীভাবে কাজ করে এই সংস্থা? ধরা যাক, ভারত থেকে কিছু বিত্তবান মানুষ বা সংস্থা তাদের বরাত দিল নিজেদের উদ্বৃত্ত অর্থ লগ্নি করার জন্য। অ্যাপেলবাই সেই টাকা নিয়ে বারমুডা, মাল্টা বা কেম্যান দ্বীপপুঞ্জে কোম্পানি খুলল, তাদের নামে শেয়ার দিল। এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ অবৈধ নাও হতে পারে। এইসব দেশে জনসংখ্যার চেয়ে কোম্পানি বেশি। তবে ভারতে এই উদ্বৃত্ত অর্থের উপর কর না দিলে তা অবৈধ। এখানেই শেষ নয়– প্রথম কোম্পানি ‘ক’ এবার ‘খ’ নামের কোম্পানি খুলল, ‘খ’ থেকে ‘গ’ এবং ‘গ’ থেকে চতুর্থ কোম্পানি ‘ঘ’ খুলল। “শ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেডের” (পরশুরাম উবাচ) সব কোম্পানিতেই ডাইরেক্টরের যোগান দিল অ্যাপেলবাই সংস্থা। এই দীর্ঘ তালিকার তল পাওয়া ভার। মজার কথা হল, ‘গ’ কোম্পানি যদি ইতিমধ্যে কোনও অবৈধ কাজ করে থাকে, তবে তার দায় মূল ‘ক’ কোম্পানির উপর বর্তাবে না। অর্থাৎ আর্থিক লেনদেন হবে মূল কোম্পানি থেকেই, তার লভ্যাংশও পাবে তারা অথচ কোনও দায় থাকবে না।

পদ্ধতিটা একটু সহজভাবে বোঝা যেতে পারে। ছোটবেলায় আমরা রুশ মাত্রিয়োস্কা পুতুল দেখেছি। একটা মেয়ের আদলের পুতুলের মধ্যে আরেকটা পুতুল থাকে। সেটা খুললে আরেকটি এবং এইভাবে সাতটি সম্পূর্ণ পুতুল। এর মধ্যে তৃতীয় পুতুলের কিছু রদবদল ঘটালে মূল পুতুলের কাঠামোতে প্রভাব পড়বে না। তেমনই অন্য কোম্পানি অবৈধভাবে শেয়ার বিক্রি করলে মূল কোম্পানি দোষী হবে না।

আরেকটি পদ্ধতির কথা বলি যার নাম দেওয়া যেতে পারে ‘ঘরে ফেরা’। একই কোম্পানি থেকে বিস্তর নতুন কোম্পানি তৈরি হল, তারা বিভিন্ন জায়গায় অর্থ লগ্নি করার প্রক্রিয়ায় ভারতেও লগ্নি করল। অর্থাৎ দেশের উদ্বৃত্ত অর্থ বেনামে বা বিনা কর দিয়ে প্রথমে বিদেশে পাঠানো হল এবং সেখান থেকে এই প্রক্রিয়ায় একই পরিমাণ অর্থ ভারতে নিজেদের বৈধ কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে ফিরে এল। এর নাম ‘রাউন্ড ট্রিপিং’ বা অবৈধ অর্থের ‘ঘরে ফেরা’।

এই জটিল চক্রে কারা জড়িত আছে শুনলে চমক লাগে। এ যেন নক্ষত্রপুঞ্জ। মার্কিন বাণিজ্যসচিব যেখানে লগ্নি করেছেন, সেখানে রুশ প্রেসিডেন্টের জামাইও রয়েছেন। রুশ সামওভারে মার্কিন হুইস্কির যোগান। ভারতের সাতশো ব্যক্তি বা সংস্থার মালিকানা রয়েছে এই উনিশটি দেশে ছড়ানো কোম্পানিতে। বিত্তশালী ব্যক্তিবিশেষ ছাড়াও রয়েছে অভিনেতা, রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন কোম্পানির নাম। একদিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জয়ন্ত সিনহা, তো ফিল্মস্টার অমিতাভ বচ্চন থেকে বিজয় মালিয়া– খিচুড়ি বিরিয়ানি সব মিলেমিশে একাকার, কাকে ছেড়ে কাকে দেখি! ব্রিটেনের রাণীর নামও জড়িয়েছে তাঁর লগ্নির মাধ্যমে। এর আগে ‘পানামা পেপার্স’ কাণ্ডে ভারতে মাত্র সাতশো কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে। এবারে কী হবে এখনও জানা নেই। তবে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ কাগজে খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে নতুন তদন্তের ইঙ্গিত মিলেছে। উল্লেখ্য যে প্যারাডাইস পেপার্সে অভিযুক্ত রথী-মহারথীদের যদি নাগরিকত্বের ভিত্তিতে র‍্যাঙ্ক করি তবে আমাদের দেশ ভারতবর্ষের স্থান উনিশ– অর্থাৎ অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংস্থাদের সংখ্যার নিরিখে একশো আশিটি দেশের মধ্যে আমরা উনিশ নম্বর স্থানাধিকারী। অতএব ‘প্যারাডাইস লস্ট’ হবে না নতুনভাবে ‘প্যারাডাইস রিগেইনড’ হবে তা দেখার জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করতেই হবে।

প্রশ্ন জাগতে পারে– আশমানে কত তারা জন্ম নিল, কত তারা নিভে গেল জেনে আমাদের মত ছাপোষা মানুষের কী হবে? ভাবনা অন্য স্রোতে বয় যখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে ভারতের স্থান ষষ্ঠ জেনে গর্বিত হই আবার দেশের তিরিশ কোটি মানুষ দরিদ্র জেনে লজ্জায় মুখ লুকোতে চাই। এশিয়ায় সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তি থাকে ভারতে, অন্যদিকে ক্ষুধা নিবারণের নিরিখে ১১৯টি দেশের মধ্যে আমাদের স্থান লজ্জাজনকভাবে শততম। মাথাপিছু মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের নিরিখে আমাদের স্থান বিশ্বে ১৪১ এবং সারা দুনিয়ায় মানব উন্নয়ন সূচকে আমরা পৌঁছেছি ১৩১তম স্থানে।

‘প্যারাডাইস পেপার্স’-এ অভিযুক্তদের ব্যবসার মোট পরিমাণ নির্ধারণ এখনই সম্ভব নয়, তবে গত বছর পানামা পেপার্স-এ জড়িত চারশোটি কোম্পানির তথ্য ফাঁস হওয়ার পর তাদের মোট ১৩,৫০০ কোটি মার্কিন ডলার লোকসান হয়েছিল বলে জানা গেছে। ভারতের বিত্তবান মানুষ ও কোম্পানির তরফে কত লক্ষ কোটি টাকা সেখানে জমা পড়েছে জানা নেই, তবে অর্থনৈতিক অসাম্যের ভারতে প্যারাডাইস কেলেঙ্কারি এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। যাঁদের জন্য ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’, তাঁরা হয়ত জানতেই পারবে না দেশে বৈধভাবে এই টাকা থাকলে কত মানুষ দীর্ঘ জীবন সুখে কাটাতে পারত।

স্বর্গচ্যুত দেবতারা তাঁদের সুউচ্চ মিনার থেকে হয়তো সাময়িকভাবে ধরায় অবতীর্ণ হবেন, কিছু রাজনৈতিক চাপান-উতোর হবে, শেষে সব রঙ একযোগে মিশে হবে কালো, সব টাকাই হবে ভালো এবং রূপকথার আঙ্গিকে রায় জানা যাবে আমাদের এই ‘শিবঠাকুরের আপন দেশে’– আপাতত আমার কথাটি ফুরাল, ‘নোটের’ গাছটি মুড়োল।