Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ছায়াপাখি, এক আকাশের নিচে — পর্ব ৪ (শেষাংশ)

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

Wren House

তিন. 

প্রবুদ্ধদা বার স্টুলে বসে কাউন্টারে কনুই ঠেকাল।

—উত্তাল দিন ছিল সেইসব। তখন রক্তে আগুন জ্বালাতে হুইস্কিতে চুমুক দিতে হত না আমাদের।
—বিপ্লব নিয়ে রোমান্টিসিজম ছিল তোমাদের।
—এখনও তো রোমান্টিক। ঠিক ঝিলের ধারে বাড়ি বানিয়েছে, জলের কাছে না থাকতে পারলে নাকি জীবন ওনার শুকিয়ে যাবে। আবার বাগানে গাছের নিচে কাঠের বেঞ্চি পেতে একেবারে কবি হওয়ার সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। দেখোনি?

মিত্রাদি ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখাচ্ছে জিনিকে। ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছে বেসমেন্টে। এখানে প্রবুদ্ধ আর হীরক বার সাজিয়ে বসেছে।

—মিত্রাদি তোমাদের বাড়িটা কী সুন্দর গো। দেখেছ হীরক, কী দারুণ সাজিয়েছে মিত্রাদি।

এই এখন মুশকিল জিনিকে নিয়ে। বাড়ি কিনে থেকে অবধি শুধু বাড়ি সাজিয়ে চলেছে। যার বাড়িতেই যায় আরও নতুনভাবে সাজানোর আইডিয়া নিয়ে বাড়ি ফেরে।

ওয়াকআউট বেসমেন্টের কাচের দরজার বাইরে চোখ ফেলে জিনি। তোমাদের লনটা কী সুন্দর মিত্রাদি। বাগান কে করে তোমার?

—ওই একটা কাজ করে তোমাদের প্রবুদ্ধদা। ফুলের বাগানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়। ওর এক ফোঁটা যত্ন যদি আমাকেও করত। বলার ভঙ্গিতেই একটা প্রশ্রয়ের আবেশ, মনে হয় খুব প্রেম দুজনায়।
—আর আমার ইনি কী করে জানো তো মিত্রাদি? চোখ নাচিয়ে এবার হীরকের গুণকীর্তন শুরু করল জিনি। নতুন বাড়িতে এসে একদিনও লনের ঘাস সাফ করত না। পাশের বাড়ির লোকটা তিতিবিরক্ত হয়ে নিজেই এখন আমাদের বাগানে লন মোয়ার নিয়ে ঘোরাঘুরি করে।
—এমনভাবে বলছ যেন ফ্রিতে করছে। এক একটা কাটিঙে বিশ ডলার কাচিয়ে নিচ্ছে।
—যারা ঠুঁটো জগন্নাথ হয় তাদের তো গাঁটের পয়সা খরচ করতে হবেই হীরুবাবু।
—তোমরা কি এখন এখানেই থাকবে না কি? দেখো আবার বেশি খেয়ে ফেলো না।

সংঘমিত্রা আর জিনি হাতধরাধরি করে উপরে চলে গেল। বয়সের ফারাক আছে, চেনাই বা কদিনের! কিন্তু যেন কতদিনের চেনা সখী। সবে পুজোয় আলাপ হল, তাতেই এই। বোঝাই যাচ্ছে খুব জমে গিয়েছে, তাই আলাপ হওয়ার কদিনের মধ্যেই এমন বাড়িতে আমন্ত্রণ।

—দেখো এদেশে এসে আমরা কেমন বিশাল বিশাল বাড়িতে থাকার অভ্যেস করে ফেলেছি। ছেলে কলেজে, আমরা দুটি মাত্র জীবন। সাড়ে তিন হাজার স্কোয়ার ফিটের বাড়িতে এক কোনায় পড়ে আছি। মানুষের চাহিদাটা বাড়তে বাড়তে কোথায় চলে যায়। শেষের কথাগুলো নিজেকে শোনানোর ভঙ্গিতে বলে লম্বা আর একটা চুমুক দিল প্রবুদ্ধদা। একটা জীবনেই কেমন একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেছি।
—মানুষ তো বদলায় প্রবুদ্ধদা। আমরা সবাই বদলেছি।
—বুঝি। এরকম সেলফ ফ্ল্যাগ্লেশানের কোনও দরকার নেই। একসময় যেটা সত্যি বলে মনে করতাম, করেছি। এখন জীবনের সত্যিটা অন্যরকম।

তার নিজের জীবনের সত্যি কি বদলেছে? প্রবুদ্ধদা এমনভাবে বলছে যেন অন্য কারও জীবন। একটা কথা জিজ্ঞেস করি প্রবুদ্ধদা। বলেই ভয় হল, সদ্য চেনা। এমন একটা প্রশ্ন সামনে আনার কি দরকার! কিন্তু তীর বেরিয়ে গেছে। তোমার আগের সত্যিটা কি মিথ্যে হয়ে গেছে এখন? রিগ্রেট করো?

—আই ডু।
—নকশাল আন্দোলনে নেমেছিলে বলে?

মাথা নাড়ল প্রবুদ্ধদা।

—তাহলে? ছেড়ে দিলে বলে?
—যখন ছেড়েছি ততদিনে আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। ছাড়ো নয়তো মরো। তাই পালালাম, ব্যস। ফিসফিস করে বলল প্রবুদ্ধদা।

হীরক কোনও প্রশ্ন না করে অপেক্ষা করছিল। অনুতাপ হয় নিজের ভুলগুলো নিয়ে। আমাদের এই বড় বড় বাড়ির সুবিধা কি জানো? এখানে অনেক লুকোনোর জায়গা। একবার বেসমেন্টে এসে গেলে তো মিত্রা জানতেও পারে না আমি হাসছি না কাঁদছি।

—বেসমেন্ট আমাদের মনখারাপের ঘর। তাই না প্রবুদ্ধদা?

কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাল প্রবুদ্ধ। ভাল বলেছ হীরক। আমাদের মনখারাপের ঘর, পালিয়ে বাঁচার জায়গা।

চমকে উঠল হীরক। এই লোকটাও কি তার মতো পালিয়ে বাঁচছে? পালাচ্ছে নিজের সত্যির কাছ থেকে, অতীতের কাছ থেকে?

—আরেকটা করে দিই?
—দুটো হয়ে গেছে প্রবুদ্ধদা। তিরিশ মাইল যেতে হবে।
—আরে, গিন্নিকে বলবে গাড়ি চালাতে। দুটোও যা, তিনটেও তাই। পুলিশে ধরলে লাইসেন্সটি কেড়ে নেবে। এবার জোরে হাসল প্রবুদ্ধদা।

আরও এক এক পেগ বানিয়ে বেসমেন্টের দরজায় দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারে চোখ রাখল প্রবুদ্ধদা। হীরক খেয়াল করল একটু টেনে হাঁটে প্রবুদ্ধদা। বেশ লম্বাচওড়া চেহারা, চল্লিশ পেরিয়েছে। কিন্তু মজবুত গঠন। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পরে যখন মুখ ঘোরাল, হীরক খেয়াল করল ফরসা মুখটা বেশ লাল হয়ে গেছে। মদের প্রভাব কিংবা কোনও চাপা উত্তেজনা যেটা আপাত স্থৈর্যের বেড়া টপকে বাইরে ছিটকে আসছিল।

—তোমার সঙ্গে অতীনের আলাপ ছিল?
—হ্যাঁ ছোটবেলায় অতীনদার বাড়িতে যেতাম খুব। ওদের বাড়িতে সঞ্চয়িতা ছিল। আরও কত বই। ওখান থেকে কবিতা লিখে নিয়ে আসতাম। অতীনদা ভাল আবৃত্তি করত। আমাকেও শিখিয়েছিল স্কুলের প্রোগ্রামের জন্য, সুকান্ত ভটচাজের ছাড়পত্র।
—অতীনকে আমি চিনতাম না। শুনেছি অতীন সত্তরের আন্দোলনের গোড়ার দিকেই গ্রেফতার হয়েছিল। পুলিশের হাতে খুব ধোলাই হয় ওর। ভালরকম জখম হয়েছিল। ওই অবস্থায় কোনওক্রমে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়। এসব বেশ ফলাও করে দেশব্রতী পত্রিকায় ছাপা হয়। তার থেকেই জানতাম ও দুর্গাপুরের ছেলে। কিন্তু দুর্গাপুরে থাকা অবস্থায় আমার আলাপ হয়নি।
—অতীনদা জেল পালিয়েছিল? এতসব জানা ছিল না হীরকের।
—হ্যাঁ, ওকে কোক ওভেনের সমবায় সমিতি আশ্রয় দিয়েছিল। নারায়ণদা ওই সমিতির মেম্বার। আমি চিনতাম, টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করত আমাদের। নকশাল সিম্প্যাথাইজার। নিজে অ্যাক্টিভ না হলেও আমাদের জন্য সফট কর্নার ছিল। রিস্ক নিয়ে নিজের বাড়িতে রেখেছিলেন। নিজের হাতে ওর ব্যান্ডেজ করেছেন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার তো উপায় ছিল না। নিজেই ওষুধ এনে এনে ক্ষতের চিকিতসা করেছেন। অতীন তার বাড়িতে মাস তিনেক শেলটার পেয়েছিল। অবশ্য আমি এসব কিছুই জানতাম না। এইসব জানলাম যেদিন আমাকে পুলিশে ধরল। তারপর।
—তোমাকে পুলিশে ধরেছিল? কীভাবে?
—ওই অতীনের বদান্যতায়।
—মানে? চমকে উঠল হীরক।
—সেটা উনিশশো তিয়াত্তরের শেষের দিক। আমি এসেছিলাম দুর্গাপুরে স্টিল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সেক্রেটারি অনিমেষদার সঙ্গে দেখা করতে। ওর হাত দিয়ে আমাদের বীরভূমের দুই কমরেডকে খবর পাঠানোর ছিল। কিন্তু অনিমেষদাকে পেলাম না। কী করি। চিঠিটা পাঠিয়েই আমার শেল্টারে ফিরে যাওয়ার কথা। সমবায় সমিতিতে এলাম। ওখানে আমাদের একটা ছেলেকে পেলাম। তখন ওর নাম সুবোধ। আমারই মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ওর সঙ্গে দু-বছর আগে বীরভূমে একটা অ্যাকশানে ছিলাম। সেই সময় ওর নাম ছিল বোধহয় তমাল। হুগলির ছেলে, দুর্গাপুরে গা ঢাকা দিয়ে আছে। এতদিন বাদে এইভাবে দেখা। ভাবলাম ওর সঙ্গে একটু সময় কাটিয়ে আবার অনিমেষদার কাছে হানা দেব। কথাবার্তা হচ্ছিল। দুজনে বেরিয়ে একটু চা খেতে গেলাম। প্রবুদ্ধদা লম্বা চুমুক দিল গ্লাসে। চোখ বুজলে মনে হয় এই তো সেদিন। সময় ঝাপসা করতে পারেনি কিছু। সাইকেল নিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ জনাকয়েক পুলিশ এসে হাজির। ক্যাঁচ করে জিপ থামিয়ে নামল ওসি। সুবোধকে জিজ্ঞেস করল, অ্যাই, তোমার নাম সুবোধ? ও হ্যাঁ বলতেই, আমায় জিজ্ঞেস করল, আর তোর নাম নারান? ঠিক যেন কারও কাছে খবর পেয়ে এসেছে। আমি না বলতেই এক রুলের বাড়ি। তাহলে তোর নাম কী?
—এভাবে কোনও কথা নেই বার্তা নেই পুলিশ মারতে পারে?

হা হা করে হাসল প্রবুদ্ধদা। রুলের বাড়ি কি মার নাকি? সেটা তো মামাবাড়ির দাওয়াত। আসল মার তো মামাবাড়ি পৌঁছালে তবে।

—তুমি নাম বললে?
—কোন নামটা বলব? আমার তখন অনেক নাম। প্রবুদ্ধ নামটা নিজেই ভুলতে বসেছি। বললাম যতীন। কিন্তু মাথায় আছে পকেটের চিঠিটা। অনিমেষদাকে দেবার জন্য এনেছিলাম।
—কী ছিল চিঠিতে?
—আমাদের এইসব চিঠিগুলো হত সাঙ্কেতিক ভাষায়। প্রিয় বন্ধু, খবর পেলাম এবারে ফলন ভাল হবে না। বড় বেশি বৃষ্টি ঝরছে। এই সময় ধানের চারা পুঁতে কোনও লাভ নেই। বীজ জমিয়ে রাখো। পরের ফলনে কাজে লাগবে। অনিমেষদাকে এক বস্তা বীজ দিতে পারলে ভাল হয়। আমাদের এদিকে বর্ষার চাপ কম, আমরা রোয়ার চেষ্টা করে দেখি। ইতি— মহীতোষ। এই ধরনের কিছু লেখা ছিল, জানো তো বোঝো টাইপ। এখন ভাবি এইভাবে চিঠি লিখতেও কেমন উত্তেজনা হত। নিষিদ্ধ কিছু করার একটা তীব্র আকর্ষণ থাকে মানুষের। তাই না?
—কিন্তু তোমরা তো মানুষের ভাল করতে গেছিলে।
—ওই যে বললাম, চলতে চলতে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম আমরা। না হলে কারণে-অকারণে মানুষ মারা শুরু করব কেন বল। মদের প্রকোপ কি না জানে না হীরক, কিন্তু গলাটা কেমন ধরা শোনাল ওর কানে।

কথা ঘোরাতে জিজ্ঞেস করল, তোমার পকেটে মহীতোষের লেখা চিঠি কেন?

—মহীতোষ আমার আর একটা নাম। আবার গল্পে ফিরে গেল প্রবুদ্ধদা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে চিঠিতে অনিমেষদার নাম উল্লেখ করা আছে। ওটা পুলিশের হাতে দেওয়া যায় না। পুলিশের জিপে বসে আমি পকেটে আঙুল ঢুকিয়ে ওটাকে গুলি পাকানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ব্যাটা ওসির চোখে পড়ে গেল। ক্যাঁচ করে গাড়ি থামিয়ে আমাকে টেনে নামাল। বল শালা, কী আছে তোর পকেটে? আমি বিপদ বুঝে তখনই চিঠির গুলিটা বের করে খেয়ে ফেললাম। সঙ্গে সঙ্গে ওখানেই ফেলে বেধড়ক মার।
—তারপর?
—এমনিতেই গলায় আটকে ছিল। মারের চোটে বমির সঙ্গে কাগজের গুটলি বেরিয়ে এল। কিন্তু সেটা আর তখন পড়ার অবস্থায় নেই।

উত্তেজনায় রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছিল হীরকের। এই প্রবুদ্ধদাকে দেখে কে বলবে এক সময়ের ডাকাবুকো নকশাল, পুলিশের সঙ্গে এমন পাঞ্জা কষেছে।

এমন সময়ে হইহই করে জিনি হাজির। হাতে একটা প্লেটে চিকেন পকোড়া। কখন থেকে মিত্রাদি ডাকছে তোমাদের উপরে আসার জন্যে। শেষ অব্দি আমিই এসে গেলাম। থমকে গেল জিনি। কী ব্যাপার, তোমরা কোনও সিরিয়াস আলোচনায় ব্যস্ত মনে হচ্ছে।

হীরকের কেন জানি মনে হল প্রবুদ্ধদা তাকে শুধু বলতে চায়, আর কেউ থাকলে বলে উঠতে পারবে না। তাই তাড়াতাড়ি বলে উঠল, দুর্গাপুরের স্মৃতিচারণ হচ্ছে।

—তাহলে বাবা আমি পালাই। নিজের বাড়িতে দুর্গাপুরের স্মতির পাহাড়ে চাপা পড়ে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম। আর কাজ নেই। জিনি সুযোগ পেলেই কেন যে দুর্গাপুর নিয়ে এমন খোঁচা মারে!

জিনি চলে যেতেই হীরক কথার খেই ধরল।

—আমাদের নিয়ে গেল দুর্গাপুরের কোক ওভেন থানায়। আমার ডাক পড়ল থানার ওসির ঘরে। এবার অন্য লোক, আমাকে যে ধরেছে সেটা নয়। আমাকে কোনও কিছু জিজ্ঞেস করল না, বেধরক পেটানি। লাঠি দিয়ে নয়, একটা হোসপাইপের ভাঙা অংশ দিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ হাতের সুখ করল যতক্ষণ আমি বেহুঁশ হয়ে না পড়ি।

শুনেই শিউরে উঠছিল হীরক। এই মার সহ্য করতে পারলে?

—এ তো সবে শুরু হে হীরক। চোখ মেলতেই ওই মালটা কনস্টেবলকে হুকুম করল আমাকে উপরে পা নিচে মাথা করে সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দেওয়ার জন্য। মনে আছে আমার পায়ের পাতা যেন মার খাওয়ার জন্য সমান থাকে তার জন্য দুটো পায়ের মাঝখানে একটা লাঠি ঢুকিয়ে, পা দুটো বেঁধে দেওয়া হল। তারপর দরজার মাথা থেকে ঝুলিয়ে দিল আমায়।
—বার্বারিক একদম।
—এতদিন হয়ে গেছে। তবে মনে আছে শুধু ভাবছিলাম সব টর্চার সহ্য করেও ঠিক থাকতে পারব তো? আর কাউকে ফাঁসিয়ে দেব না তো? আমার অনেক কমরেড এরকম টর্চারে মারা গেছে, কিন্তু তবু মুখ খোলেনি। আমি শুধু তাদের মুখ মনে আনছিলাম। শুরু হল মার। পায়ের পাতায় চলছে ওই ওসির লাঠির বাড়ি। মাথা নিচের দিকে, সব রক্ত যেন নিচে নামতে চাইছে। লাঠির ঘায়ে সেই রক্ত উঠে যাচ্ছে দ্রুত উপরে। মনে হচ্ছিল অজ্ঞান হয়ে গেলে ভাল হয়। আমি আর না পেরে অজ্ঞান হওয়ার ভান করলাম। এরপর কী করল জানো? গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে বলল প্রবুদ্ধদা।
—কী? ভয়ানক কিছু শোনার জন্য হীরকের মন প্রস্তুত।
—একটা আগুনে লাল করা হাতা এনে আমার হাতে চেপে ধরল কনস্টেবলটা। আমি প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে উঠেছিলাম। ওসিটা হো হো করে হেসে উঠে আবার ডান্ডা দিয়ে পেটাতে শুরু করল।
—কী অমানুষিক।
—এখনও সেই দাগ আছে। হাতের কনুই উল্টে দেখাল প্রবুদ্ধদা। আমরা যখন বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতাম, চিনের চেয়ারম্যানকে আমাদের চেয়ারম্যান বলে মেনে নিয়েছিলাম তখন যদি জানতাম পুলিশের অত্যাচার এরকম হয়, হয়তো এই পথে পা বাড়াতাম না। কে জানে? অথবা জানলেও হয়তো যেতাম। বয়সটা ওরকম ছিল, জীবনের পরোয়া ছিল না তখন। আসলে আমরা যখন পুলিশের কনস্টেবলকে মেরেছিলাম জানা উচিত ছিল আমাদেরও একদিন আসবে।

হীরক জিজ্ঞেস করতে পারল না প্রবুদ্ধদা নিজে কোনও পুলিশের লোক বা কোনও মানুষ মেরেছে কিনা। মেরেছে নিশ্চয়। নিজের মুখে মারার গল্প এমন অনায়াসে বলছে যখন।

—তারপর কী হল?
—কী আর, মার খাওয়ার অভ্যেস হয়ে গেল। ওই থানায় আমাকে আর সুবোধকে রেখেছিল দিন সাতেক। আমাদের দুজনকে আলাদা রেখেছিল। সকাল বিকেল শুধু পেটাই। একবার আমায়, আরেকবার ওকে। সাতদিন বাদে আমাদের আসানসোল জেলে পাঠাল। জেলার লোকটা তাও একটু মানুষের মতো ছিল, বুঝলি। রাত্রে এসে ঢুকেছিলাম, কিন্তু তদ্বির করে খাবারের ব্যবস্থা করে দিল।
—কী দিল, লপসি?
—না, জেলের ঘ্যাঁট শেষ হয়ে গেছিল। বাইরে থেকে পাউরুটি আর ভাঁড়ের চা আনিয়ে দিল।
—এ তো একেবারে মহাপুরুষ মানুষ।
—কদিন অমানুষদের সঙ্গে কাটিয়ে একে দেবতা মনে হচ্ছিল।
—এই যে তুমি ঠাকুরদেবতা মানো না প্রবুদ্ধদা?
—মানুষের বেশে দেবতার দেখা পেয়েছি মাঝেমাঝে, সেটা মানি।
—তারপর?
—নকশাল করছি আর জেলের ভাত খাব না, তা কি হয়? কদিন থানায় মার খেয়ে সব কিছুর জন্য প্রস্তুত। রাত্রে জেলে নতুন বন্দি এলে তাদের প্রথমদিন রাখে আমদানি ফাইলে।
—সেটা কী বস্তু? নামের রেজিস্টার?
—আমদানি ফাইল হল জেলখানার নরক। প্রথম রাতে ওখানে থেকে পরদিন কেস টেবিল হবে। তারপর যাকে যার যার সেলে পাঠিয়ে দেবে।
—তোমার এগেন্সটে কেসটা কী ছিল?
—কিছু না। পেট থেকে কোনও কথা তো বের করতে পারেনি। কিন্তু কোনও খবর পেয়েই তো এসেছিল।
—জেলে রাখতে কোনও সলিড কেস লাগবে না? কোর্টে তুলবে না?
—প্রথম একবার কোর্টে নিয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড করল। ব্যস, আর কোনও কোর্টের মুখ দেখা নেই। এরকম আকছার হচ্ছে। জেলে পুরে দিল ব্যস। কে কার খোঁজ রাখছে। দেড় বছরের উপর জেলে ছিলাম। তারপর হঠাৎই একদিন আমাদের কয়েকজনকে ছেড়ে দিল। আসলে বিনা বিচারে আটকে রাখা নিয়ে বাইরে হাঙ্গামা শুরু হয়েছিল। কেউ পিআইএল দিয়েছিল আর কী।

কিন্তু জেলে থাকতে থাকতেই জানলাম কে আমাদের ধরিয়েছে। ওই অতীন। শুধু আমাকে নয়। আমি তো বাই চান্স জালে পরে গেছিলাম। পুলিশ ধরতে এসেছিল নারায়ণদাকে। অতীন বৈদ্যবাটি ইউনিটে কাজ করছিল। আমাদের ঘটনার কদিন আগেই বৈদ্যবাটি থানায় অ্যাটাক হয়, ও তার পিছনে ছিল। পালিয়ে এসে নারায়ণদার কাছে শেলটার চাইতে এসেছিল। আগেও একবার নারায়ণদা ওকে রেখেছে তো। কিন্তু আজকাল ওর উপর পুলিশের খুব নজর আছে। অলরেডি সুবোধ নারায়ণদার ভাই পরিচয়ে আছে। তাই নারায়ণদা ওকে বলল দূরে কোথাও যেতে, এখানে থাকলে ধরা পড়ে যাবে।

—তারপর?
—ওকে সেদিনই পুলিশে ধরে। মারের মুখে ও সব বলে দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়েছে। ওর টিপ পেয়েই পুলিশ ওই চায়ের দোকানটার উপর নজর রাখছিল। এমনকি বৈদ্যবাটি কেসের আরও দুজনকে ধরিয়ে দিয়েছিল।
—আর ওকে পুলিশ ছেড়ে দিল? অতীনদার উপরে কিরকম রাগ হচ্ছিল হীরকের। মনে মনে এক ছোটবেলার হিরোর মৃত্যু হচ্ছিল।
—মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছিল কিছুদিন বাদে। পুলিশ নারায়ণদাকে ধরে কদিন বাদেই। বৈদ্যবাটি কেসের তপন বলে একটা ছেলেকে পিঠে গুলি মেরেছিল। তাই ছাড়া পেলেও অতীনের যাওয়ার কোনও জায়গা ছিল না। মরতে ওকে হতই। হীরক প্রবুদ্ধদার কথায় আফসোস মিশতে শুনল। আমাকে যখন ছেড়ে দিল, দায়িত্ব পেলাম ওকে মারার।
—তুমি মেরেছ অতীনদাকে?
—না মেরে উপায় ছিল না। আমি না মারলে আর কেউ ওই দায়িত্ব পেত। আর আমি নির্দেশ অমান্য করার জন্যে মরতাম।

প্রশ্নটা জেরার মত শোনালেও করেই ফেলল হীরক। তুমি এই নির্দেশ অমান্য করার কথা ভেবেছিলে?

শূন্য চোখে তাকাল প্রবুদ্ধদা। এখনকার আমি ভেবে বুঝতে পারি না মারাটা কেন দরকার ছিল। পুলিশের টর্চারে নিজেকে সামলাতে পারেনি, উগলে দিয়েছে। এই পরিণতির কী দরকার ছিল? থাকলেও আমার হাত দিয়ে কেন? কিন্তু তখন আমাদের প্রতিহিংসার আগুন। কেন আন্দোলনে নেমেছিলাম, কী করতে চেয়েছিলাম, সব তখন ভুলে বসে আছি। নৈরাশ্য, অন্ধকার। কোথাও কোনও পথ নেই। রাস্তা দেখাবার কেউ নেই। চারদিকে উপনেতাদের ছড়াছড়ি। ডিরেকশান আসে, আমাদের কাজ তামিল করা। কে যে তখন কার দলে, বোঝার আর উপায় নেই। না বলার ক্ষমতা ছিল না। খবর ছিল অতীন পালিয়ে আসাম যাবে। তার আগে দুর্গাপুরে মায়ের সঙ্গে একবার দেখা করতে আসবে। আমার উপর দায়িত্ব দেওয়া হল ওকে শেষ করে দেবার। তপনের মৃত্যুর প্রতিশোধ।

প্রবুদ্ধদা এখন সোফায় নিজেকে এলিয়ে দিয়েছে অনেকটা। ঝড়ে বেঁকে যাওয়া গাছের মতো। ঝোড়ো হাওয়া থেমে যাওয়ার নিশ্চিন্ততা মুখে। সেটা দেখে বিরক্তি লাগল হীরকের।

—এতদিন পরে আমাকে কেন বলছ সেটা? আমি কে?

প্রবুদ্ধদা সোফা ছেড়ে উঠে আবার গ্লাস ভরেছিল। যেন হীরকের প্রশ্ন বিদ্ধই করেনি ওকে। অথচ দ্যাখ তারপর আমিই পালিয়ে গেলাম। আমার কাকা ছিল আইএএস। সরকারি কালি মুছে দিয়ে বিদেশে আসার ব্যবস্থা করে দিল। বেশ জমিয়ে তো বসেছি, তাই না?

হীরক চুপচাপ শুনছিল। মানুষের মন তো অদ্ভুতভাবে কাজ করে। একটু আগেই অতীনদার কথা মনে করে বুকটা কেমন করছিল। অথচ প্রবুদ্ধদার পালানোর মধ্যে দিয়ে, নিজের জন্য একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হচ্ছিল এখন।

প্রবুদ্ধদার গলা বেশ ভারী এখন। বয়স হচ্ছে হীরক। পুরনো কথাগুলো আজকাল বেশি বেশি চেপে ধরে। নিজেকে এই ঘরে এনে লুকিয়ে রাখি। মাঝেমাঝে মনে হয় এই সবকিছু যা চারপাশে সব মিথ্যা, কোনও মানে নেই। অথবা জীবনের শুরুর সব ভুল। ঠিক আর ভুলের খতিয়ান করতে করতে কত ঘন্টা এইভাবে কেটে যায়।

উত্তর না পাওয়া প্রশ্নটা এখনও মনে খচখচ করছিল। এই কথা এর আগে কাউকে বলেছ?

মাথা নাড়ল প্রবুদ্ধদা।

—তাহলে আমাকে কেন বললে প্রবুদ্ধদা?

খুব ক্লান্ত চোখে তাকাল প্রবুদ্ধদা। এইখানে বসে ভাবতে ভাবতে অনেক সময় ইচ্ছা হয়েছে ওর মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। বলি, আমিই সেই লোক যে আপনার ছেলেকে খুন করেছিল। দিন, শাস্তি দিন আমাকে। পারিনি। দুর্গাপুরে ঢুকিইনি কোনওদিন আর। হয়তো উনি বেঁচেই নেই আর। কণ্ঠস্বর খুব নিচু হয়ে গেছিল। যেন কোনও দূরদেশ থেকে ভেসে আসছে প্রবুদ্ধদার গলা। ছোটবেলায় কোথাও মিথ্যা কথা বললে জলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। ফিসফিস করে দোষ স্বীকার করতাম। মনে হত সেটাতেই পাপ কেটে গেল। এখন বুড়ো হয়ে গেছি তো। এই বেসমেন্টে বসে নিজের ভুল স্বীকার করে পাপ কাটে না হে আর। ছটফট করে বেড়াই। নিজের মধ্যে এই যন্ত্রণা, মিত্রাকেও বলতে পারিনি কোনওদিন। তোমাকে পেলাম, যে অতীনকে চিনত। হয়তো পছন্দ করত। তাই ভাবলাম… মিহি হতে হতে গলার স্বর এখন হাওয়ায় মিশে গেছে একদম।

হীরককে নিজের এতগুলো কথা শুনিয়ে সেদিন প্রবুদ্ধদার লাভ হয়েছিল কিনা হীরক জানে না। সে অতীনদাকে চেনে বলেই সেটাই তাকে কৈফিয়ত দেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না। কে জানে, হয়তো বুকের ভিতরে জমানো কথাগুলো কাউকে বলার দরকার হয়, নিজেকেই দেওয়া এই কৈফিয়ত। হীরক সাক্ষী হয়ে রইল।

নিজের থেকে পালিয়ে থাকা যায় না।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]