Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

নারীর মুখ : ভাঙচুর আর উদ্বৃত্তায়নগুলি

কবিতায় নারীর নুখ

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

কথামুখ : শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী

অর্থনীতি বলে যে কোনও পণ্যেরই অতি সহজলভ্যতায় তার চাহিদা লোপ পায়। তার অতিপ্রার্থিত, অতি কাম্য, অতি আদরণীয়তার ক্ষয় হয়। স্পেশ্যাল কমোডিটির স্ট্যাটাস লোপ পায়। ফ্রি-তে পাওয়া আইসক্রিমের মজাই কম।

এই সময়ের প্রতিটি উপাদানই যেভাবে আমাদের নস্‌ নস্‌ মে, মানে শিরায় শিরায় প্রবাহিত, সেরকমই, পণ্যায়িত নারীশরীর, নারী মুখ। সুতরাং অপ্রাপ্যের, নিষিদ্ধের প্রতি কৌতূহল ও লোভবশত যে আকর্ষণ, বলাই বাহুল্য তা লুপ্ত হয়ে যাবে এই সময়ে এসে। আর ঘটছেও তাই।

চল্লিশ পঞ্চাশের দশকে একটি পুরুষের সঙ্গে একটি নারীর দেখাসাক্ষাতের রাস্তাগুলো ততখানি উন্মুক্ত ছিল না, যতটা তার পরবর্তী দুই তিন দশকে। একটা মজার গল্প মনে পড়ে, আমার মায়ের জবানিতে শোনা। প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিত বিভাগে মায়েরা ছিলেন মাত্র দু তিনটি মেয়ে, আর সবাই পুরুষ। যথারীতি আলাদা ডেস্কে, ক্লাসের এক পাশটিতে এসে গুটি গুটি বসতেন মায়েরা, আর চোরাচাউনিতে বিদ্ধ হতেন, ছেলেদের দিক থেকে। ছেলেদের দিকে মুখ তুলে না তাকানোই ছিল দস্তুর। সেই সময়ে কোনও এক অতি দুঃসাহসী পুরুষ বন্ধুদের চ্যালেঞ্জ করে এসে কয়েকটি মৌরী লজেন্স মেয়েদের ডেস্কে, মেয়েদের অবর্তমানে, রেখে দিয়ে বিশাল হিরো প্রতিপন্ন হয়েছিলেন নাকি। শোনা যায় মেয়েরা বসতে এসে, সেই সব বালখিল্যসুলভ লজেন্স দেখে, কে বা কারা তা রেখেছে অনুমান করে, শাড়ির আঁচল দিয়ে ঝেড়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে বসেছিলেন, এবং উল্টোদিকে ছেলেদের সারিতে ফিসফিসানি আর আপশোসের দীর্ঘশ্বাসের ঝড় বয়ে গিয়েছিল।

এমত অবস্থার অনেকটাই বদল হবে সত্তর-আশিতে এসে। তখন মেয়েদের পথেঘাটে চলাফেরা অন্তত দশগুণ বেড়েছে। সুতরাং “পণ্য” হিসেবে হোক না হোক (কথাটি অবশ্যই শ্লেষার্থে প্রযুক্ত), নারীসঙ্গ অপেক্ষাকৃত সুলভ, কেননা কর্মক্ষেত্রে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে, এমনকি কো-এড ইশকুলেও মেয়েদের সঙ্গে কাছাকাছি থাকার সুযোগ পুরুষদের এসেছে। পাল্টেছে মেয়েদের সঙ্গে আদানপ্রদানের ধরণ। হাতে হাত রাখা অথবা একসঙ্গে পিকনিকে গিয়ে বেমালুম জোড়ায় জোড়ায় লোপাট হয়ে যাওয়া (রমাপদ চৌধুরীর পিকনিক উপন্যাসটিতে যে সময়-অক্ষর নিপুণ শিল্পসম্মতভাবে ডকুমেন্টেড), এগুলো অনেক বেশি বেশি করে ঘটতে থাকছে।

পাশাপাশি এই সময়গুলি জুড়ে চলেছে কবিতা লেখার কাজ। ত্রিশ চল্লিশের দশকের কল্লোল-বুদ্ধদেব-জীবনানন্দ- অনুপ্রেরণার সময়ে নারীর যে চিত্র এই কবিদের কলমে, তা আমাদের অতি চেনা। ভালবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে/ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে… জীবনানন্দের এই অমোঘ লাইনগুলি মেয়েদের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠাকেই উদযাপন করে।

কী সেই বিষয়ত্ব? পুরুষ বিষয়ী, নারী বিষয়, পুরুষ জ্ঞাতা, নারী জ্ঞেয় (“স্ত্রিয়াশ্চরিত্রাঃ/দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ” এই অতি জনপ্রিয় কথনের মূলেও সে ধারণা), পুরুষ কর্ষণকারী, নারী প্রকৃতির মতো, বসুন্ধরার মতো, মৃত্তিকার মতো ভোগ্যা ও কর্ষণযোগ্যা। বিষয় হিসেবেই কিন্তু নারীকে দেখতে অভ্যস্ত আমরা। জনপ্রিয় সাহিত্য শিল্পের কাছে সেটাই প্রশ্নচিহ্নহীন ধরে নেওয়া। উপভোক্তা নারী পুরুষ যে-ই হোন, তাঁকে আমোদ দেবে, বিনোদন দেবে নারীর এই বিষয়-মূর্তিই। এটাই পুরুষ শাসিত সমাজের সহজ ছক। নারী পুরুষের মিউজ, তার প্রেরণা, তার আকাঙ্ক্ষার বিষয়, সম্ভোগের বস্তু, হাসিল করার পণ্য। সে একাধারে দেবী ও দানবী, অথবা হয় দেবী নয় দানবী। এই ব্যাপারের প্রতিফলন অবধারিতভাবে ঘটেছে কবিতাতেও। ‘নারীর কবিতা বিষয়ে ভাবতে গিয়ে তাই আগে বুঝে নিতে চাই নারীর সেই প্রতিমা, পুরুষী কবিতার পরম্পরায় যা প্রতিফলিত। সে প্রতিমা পুরুষেরই কল্পনা… উর্বশী আর লক্ষ্মী, পুরুষী কবিতার পরম্পরায় নারীর এই দুই স্টিরিওটাইপই সবচেয়ে প্রবল, পশ্চিমী আলোচনার ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে অ্যাঞ্জেল হোর ডিকটমি। …’ (সুতপা ভট্টাচার্য, ‘কবিতায় নারী, নারীর কবিতা’, মেয়েলি পাঠ, পৃ ৪৪-৪৮)। ঠিক এই একই ব্যাখ্যায় উপনীত হয়েছিলেন সিনেমা চর্চার ক্ষেত্রে লরা মালভে, তাঁর ‘ভিজুয়াল অ্যান্ড আদার প্লেজারস’ প্রবন্ধে, ১৯৭৩ সালে। যা থেকে উঠে এসেছিল নতুন এক তত্ত্ব। লাকাঁ ও ফ্রয়েডের ধারা থেকেই জন্ম নিয়েছিল জনপ্রিয় ছায়াছবির নারীবাদী বিশ্লেষণের নতুন ধারণাটি, ‘মেল গেজ’ বা পুং-দৃষ্টির তত্ত্ব। সে তত্ত্বও বলছে একই কথা। মূলস্রোত ছায়াছবি, হলিউডের বিখ্যাত ছবিগুলিই ধরা যাক, নারীকে দেখায় বিষয় হিসেবে। দুভাবে বিষয় করা হয় নারীকে। হয় ভয়ারিস্টিক বিষয়। সে পুরুষচোখে লালসাময় বেশ্যা। নতুবা ফেতিশিস্টিক বিষয়। সে পুরুষচোখে, পুরুষচাহনিতে দেবী, ম্যাডোনা, মা। রিরংসা থেকে পবিত্রতা। সুতপা ভট্টাচার্যের ভাষায় ‘উর্বশী-ছবি’ আর ‘লক্ষ্মী-ছবি’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে” থেকে শঙ্খ ঘোষের “পায়ে শুধু পড়ে থাক স্তব্ধ এলোচুল” অব্দি। বারেবারেই নারীর এই ‘বিষয়’-মডেল যেহেতু সামনে, নারী যেহেতু পুরুষের শৈল্পিক আত্মপ্রকাশের এক বিশিষ্ট কেন্দ্রস্থল, বাঙালির রচিসংস্কৃতির অবদমিত যৌনবোধের প্রকাশ যখন কবিতার মানক, জীবনানন্দীয় কুয়াশায় যখন তরুণ কবিরা আচ্ছন্ন, তখনই কৃত্তিবাস আন্দোলন আনল ভাঙচুরের পালা। মেধার সরণি ছেড়ে আত্মজৈবনিকের, স্বীকারোক্তির নতুন দিগন্ত খুললেন এই আন্দোলনের পুরোধা প্রধান পুরুষ কবিরা। সুনীল-শরৎ-শক্তি-তারাপদ… পাশাপাশি তুষার রায়, বেলাল চৌধুরী, তন্ময় দত্তরা। সেই মুহূর্তের অ-প্রাতিষ্ঠানিকতার শেষ কথা এই কবিদের হাত থেকে বেরিয়ে আসা তাজা স্বতঃস্ফূর্ত কবিতাগুলি রেখে দিল বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী এক প্রভাব। কবিতায় মেয়েদের পদচারণা তখন যথেষ্ট সীমিত।

রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, ব্যক্তিগত সব স্তরকে ছুঁয়ে গেছে স্বীকারোক্তি। অবধারিতভাবে এসে পড়েছে যৌন স্বীকারোক্তি। এবং সচেতনভাবে। সচেতন, কেননা, কলকাতায় এসে গেছেন গিন্সবার্গ। কৃত্তিবাসের ষোল নম্বর সংকলন সম্বন্ধে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ষোল নম্বর সংকলনে কৃত্তিবাস ফেটে বেরুল। তারিখ ১৩৬৯ চৈত্র। …কবিত্বের খোলস ছেড়ে একদল অতৃপ্ত যুবকের অকস্মাৎ বেরিয়ে পড়ার জন্যে যে প্রচণ্ড অস্বস্তি ও বেগ-এর প্রয়োজন ছিল, অ্যালেনদের সাহচর্য তা জুগিয়েছিল আমাদের। সংখ্যাটি কলকাতা পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল অশ্লীলতা সম্পর্কে। …ঘামে নুন, যোনিদেশে চুল (পৃঃ ৫), দেখেছি সঙ্গম ঢের সোজা, এমনকি বেশ্যারও হৃদয়ে পথ আছে (পৃঃ ২২), যোনির ঝিনুকে রাখা পোকাগুলি মুক্তা হয়ে গিয়েছে বিস্ময়ে (পৃঃ ৪৫) …আসলে যে কাণ্ড ঘটেছিল সব কবিদের বুকের মধ্যে তা হল প্রচণ্ড বিরক্তি থেকে উদ্ভূত ধ্বংস করার ইচ্ছে — সৃষ্টির নামান্তর — যা কিছু পুরনো পচা, ভালমন্দ সোনারুপোর খনি, এমনকি নিজেদের শরীর ও অস্তিত্ব — সর্বস্বের সর্বনাশ।” (শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কৃত্তিবাস পঞ্চবিংশ সংকলন, ১৯৬৮)।

মাটির তলায় চাপা পড়া উপাদানের রাসায়নিক পরিবর্তনের মতোই, বাংলা কবিতার কর্ষণভূমি এর পরে আর কোনওদিন পূর্ববৎ রইল না, থাকার কথাও নয়। পুরুষী কবিতার ট্র্যাডিশনে প্রোথিত ও প্রতিষ্ঠিত হল যৌনতাবিষয়ক অনবদমিত স্বীকারোক্তি। নতুন রক্তসঞ্চালন হতে শুরু করেছে বাংলা কবিতার ভাষা ও ভাবনায়। “গুল্মলতা উদ্ভিদ অরণ্যঘন পর্ণমোচী বৃক্ষের সারি পাহাড় পর্বত সান্নুদেশে … আমি এক সুচতুর ব্যাধ নির্ভুল লক্ষ্যভেদে গাঁথি প্রভুর অসীম কৃপায় অলৌকিক আমার বর্শাফলকে তরল লাভাস্রোতে তাম্রখণ্ডে বিম্বিত অতলান্ত গহ্বর তাক করে।” (বেলাল চৌধুরী, ‘লক্ষ্যভেদ’)। লক্ষ করব, এক বা একাধিক ইমেজের সহায়তায়, অথবা সরাসরি, এক সচেতন যৌন ইশতেহার রচনার তীব্র ইচ্ছা এইসব লেখা তাঁদের দিয়ে লেখাচ্ছিল। ‘আমি ড্রামে কাঠি দেওয়ামাত্র ওর শরীর ওঠে দুলে/ড্রি রৃ ড্রাও স্ট্রোকেতে দেখি বন্যা জাগে চুলে/তিন নম্বর স্ট্রোকের সঙ্গে নিতম্বেতে ঢেউ … আমি তখন ড্রাম বাজিয়ে নাচাই ওকে, মারি এবং বাঁচাই ওকে/ড্রামের কাঠির স্ট্রোকে/যেন গালাই এবং ঢালাই করি–” (তুষার রায়, ‘খুলে যায় তালা’)।

একটি স্পষ্ট কর্মসূচি নিয়েই এই কবিরা এসেছেন শরীরের অনুভবকে সাদা কাগজের বুকে বদলি করতে। “কিছুক্ষণ ডুবেছিল যোনির ভিতরে জিভ লবণের স্বাদ ছাড়া আর/কিছুই আনেনি তবু অসম্ভব ভালোবাসাবাসি হল অসম্ভব/এই নিয়ে তোমাকে আমার/একুশটা পুনর্জন্ম দেওয়া হল এত মৃত্যু মানুষেরও জানা ছিল।” সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃত্তিবাস চৈত্র ১৩৬৯-এর “কয়েক মুহূর্তে” শীর্ষক বিস্ফোরক কবিতাটির মধ্য দিয়ে এভাবেই প্রথাসিদ্ধ ও স্বতঃসিদ্ধ হয়ে ওঠে কবিতায় যৌনতার ব্যবহার। বকলমে যা নারীর উদযাপন। ১৯৫০ পরবর্তীতে যৌনতার সরাসরি উল্লেখ এবং যৌনক্রিয়ার বিবরণী একটি স্বাভাবিক ভাববস্তুতে পরিণত হল বাংলা কবিতায়, এই বস্তুই আসলে নারীর মুখধারণ করে এসেছিল। পুরুষ কবিদের কলম থেকে “শরীর ছাড়া শরীর যায় না চেনা… শরীর ছেনে শরীর দিয়েই অন্ধকারের/নিবিড় শরীর গভীর করে দাঁতে কাটি/বুকে পিষি ঘামের শরীর — আঁষটে গন্ধ” (বেলাল চৌধুরী, ‘শরীর দিয়েই শরীর’) — এর নতুনত্ব সেই সময়ে যতটাই থাক, পরে শরীরের আঁষটে গন্ধ বাঙালির রান্নার মাছের মতোই অনিবার্য হয়ে উঠবে বাংলা কবিতায়।

পুরুষের কবিতায় এরপর কিছুদিন কেবলি শরীরী উদযাপন। নারীশরীরকে একটা আলাদা মর্যাদার জায়গায় স্থাপন করেছে এতদিনে এই সব কবিতা। যদিও কল্লোল যুগেও চেষ্টা হয়েছিল, বুদ্ধদেব বসুর কিছু গদ্য যেভাবে কবিতায় ব্যবহৃত শরীরী সংকেত বহনকারী শব্দদের পক্ষ নিয়ে লেখা হয়েছিল। তবু কৃত্তিবাসের পর্বটি নারীর বিষয়ায়নের একটা বড় ধাপ, জলবিভাজিকাও বলা চলে। সেইকারণেই এ দশকের উল্লেখ পরবর্তী যে কোনও দশককে নিয়ে আলোচনায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

তবে শুধুই কিন্তু যৌনতা নয়। প্রেমের কবিতাতেও পুরুষ কিন্তু নারীকে অবিশ্রান্তভাবে বিষয় করে গেছেন, সেই পঞ্চাশ দশক থেকে পরবর্তী প্রতি দশকে।

বিখ্যাত নীরার কথা না হয় নাই বললাম। স্নিগ্ধ, লাবণ্যস্নাত নীরাকে অনেক বিভঙ্গে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে এক আলাদা সেন্টিমেন্ট তৈরি করেছিলেন সুনীল।

বাস স্টপে দেখা হল তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল

স্বপ্নে বহুক্ষণ

দেখেছি ছুরির মতো বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে–দিকচিহ্নহীন–

বাহান্ন তীর্থের মতো এক শরীর, হাওয়ার ভিতরে

তোমাকে দেখছি কাল স্বপ্নে, নীরা, ওষধি স্বপ্নের

নীল দুঃসময়ে।

দক্ষিণ সমুদ্রদ্বারে গিয়েছিলে কবে, কার সঙ্গে? তুমি

আজই কি ফিরেছো?

স্বপ্নের সমুদ্র সে কী ভয়ংকর, ঢেউহীন, শব্দহীন, যেন

তিনদিন পরেই আত্মঘাতী হবে, হারানো আঙটির মতো দূরে

তোমার দিগন্ত, দুই উরু ডুবে কোনও জুয়াড়ির সঙ্গিনীর মতো,

অথচ একলা ছিলে, ঘোরতর স্বপ্নের ভিতরে তুমি একা।”

–হঠাৎ নীরার জন্য

পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথনের সেই অতিজনপ্রিয় কবিতাতেও নারী, শুধু নারী। সে নারী নন্দিনী। চির রোম্যান্সের রাজ্য-অধিবাসিনী।

এবার আমি তোমার ভবিষ্যত বলে দিতে পারি।

–বলো।

–খুব সুখী হবে জীবনে।

শ্বেত পাথরে পা।

সোনার পালঙ্কে গা।

এগুতে সাতমহল

পিছোতে সাতমহল।

ঝর্ণার জলে স্নান

ফোয়ারার জলে কুলকুচি।

তুমি বলবে, সাজব।

বাগানে মালিনীরা গাঁথবে মালা

ঘরে দাসিরা বাটবে চন্দন।

তুমি বলবে, ঘুমোব।

অমনি গাছে গাছে পাখোয়াজ তানপুরা,

অমনি জ্যোৎস্নার ভিতরে এক লক্ষ নর্তকী।

সুখের নাগর দোলায় এইভাবে অনেকদিন।

তারপর

বুকের ডান পাঁজরে গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে

রক্তের রাঙ্গা মাটির পথে সুড়ঙ্গ কেটে কেটে

একটা সাপ

পায়ে বালুচরীর নকশা

নদীর বুকে ঝুঁকে-পড়া লাল গোধূলি তার চোখ

বিয়েবাড়ির ব্যাকুল নহবত তার হাসি,

দাঁতে মুক্তোর দানার মতো বিষ,

পাকে পাকে জড়িয়ে ধরবে তোমাকে

যেন বটের শিকড়

মাটিকে ভেদ করে যার আলিঙ্গন।

ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত হাসির রং হলুদ

ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত গয়নায় শ্যাওলা

ধীরে ধীরে তোমার মখমল বিছানা

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে সাদা।

–সেই সাপটা বুঝি তুমি?

–না।

–তবে?

–স্মৃতি।

 

মাঝের কিছু বছর

ষাট ও সত্তরের কবিদের কলমে নারী একইরকম লাবণ্যময়ী, একইরকম টান তার।

সেই নারীর মূর্তি নিয়ে আমাদের নতুন করে আবিষ্কারের কিছুই নেই। যদিও দেখব কিছু বিবর্তনের রেখা। জয় গোস্বামীর পাগলি তোমার সঙ্গে কবিতার মধ্যে দিয়ে নতুন এক নারী উঠে আসে। যে নারী নিজেই তীব্র, তীক্ষ্ণ, আমূল বিঁধিয়ে দেয় তার সত্তাকে পুরুষ হৃদয়ে। শুধু লাবণ্য নয়, সেখানে ঝাঁঝ আছে, প্রেমের রসায়ন এবং জ্বালা আছে।

পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাব জীবন

এর চোখে ধাঁধা করব, ওর জল করে দেব কাদা

পাগলী, তোমার সঙ্গে ঢেউ খেলতে যাব দু’কদম।

 

অশান্তি চরমে তুলব, কাকচিল বসবে না বাড়িতে

তুমি ছুঁড়বে থালা বাটি, আমি ভাঙব কাঁচের বাসন

পাগলী, তোমার সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ৪২ কাটাব জীবন।…

আশির কবিতায় আসবে মেয়েদের অন্য রূপ, অন্য রূপায়ন। মিশে যাবে তান্ত্রিক যোগিনী, পাগলি ও উদাসীনারা। মিলে মিশে যাবে শৈশবের অবচেতন থেকে আসা নারী। মাতৃমূর্তি।

সুবর্ণ ধুলো।

এই

সেই মাতৃকোল। সমস্ত চেতনার মূল। অন্ধকার আকাশে

উজ্জ্বল নক্ষত্রদল; বিকশিত কদম্বদ্রুম ঘন কৃষ্ণ বর্ষায়।

যেন একটি পূর্ণ রূপলোক। বলো বৃক্ষ আমার

এ জন্মরহস্যের কথা। আমার জন্ম অর্থাৎ একটি

রূপের জন্ম। আমি সন্তান; ভূম মা আমার। পয়স্বিনী।

এবং তুমিও

এবং অন্য সকলে,

যারা ভূমিষ্ঠ দেখেছে। যারা

আমায় ঘুম পাড়িয়েছে। পাইয়েছে শস্যদুধ, মাতৃস্তনসম; প্রকৃতির

আনন্দকোলে। আজ তাদের কথা শুনি। বলো বৃক্ষ

–বলো বৃক্ষ, শুভব্রত চক্রবর্তী

অথবা,

তুমি সেই জাদুশীতে শ্যাম্পু করা চুলে/নক্ষত্র সাজিয়ে তোলো বিনিদ্র ইস্কুলে

–শুভব্রত চক্রবর্তী

চলন্ত ভ্যান থেকে তুলে নিয়ে কোকাকোলা বোতল

হাসছে এক ফুটপাতবাসিনী, তাড়নাবিদ্ধ

–শব্দ কুসুম, শ্রীধর মুখোপাধ্যায়

অথবা,

লাল সোয়েটারের ওপরের বোতামদুটি লাগাতে লাগাতে

হলুদ মেয়েটি জানালার কাছে দাঁড়াচ্ছে

–অস্পৃশ্য শূন্যকাল, শ্রীধর মুখোপাধ্যায়

 

নব্বই-এর তছনছিয়া দশক : প্রেমের কবিতার ইন্টারল্যুড

নারীর বিষয় হওয়া বন্ধ হল না। কিন্তু সহজলভ্য হয়ে উঠল নারী শরীর এখন। আকাশের নীলে টাঙানো থাকে নগ্ন নারী শরীর। পণ্যের বিজ্ঞাপন জুড়ে থাকে দেশ কাল। পণ্য যদি রেফ্রিজারেটর, হাসি মুখ এক নারীকে সঙ্গে ফ্রি পাই। পণ্য যদি মদের বোতল, পাশে বসে থাকা গভীর ক্লিভেজের নারীটি আশ্বাস দেয়, আমাকেও পাবে, পয়সা ফেলার অপেক্ষা শুধু। সাফল্য আর আনন্দ, জয় আর অধিকার, সর্বত্র একটি করে নারীর শরীর, নানা মুদ্রায়, নানারকম নিরংশুক অবস্থায়… ঠান্ডা, বরফ আপ্লুত সুইজারল্যান্ডেও এক নগ্ন নারীকে সাদা বিপুল বিস্তারের ভেতর বিশাল ফ্লেক্সে দেখে মনে হয়, কী নিষ্ঠুর ওরা। নগ্নতা দেখার এত লোভ! ওদের শীতের দিনে এতই উষ্ণ করে নগ্নতা দৃশ্য? কী বীভৎস, খোলা মাঠের এই বিপুল শীতেও ওই মেয়েটাকে নগ্ন রেখেছে!

না, সত্যি করে তো কোনও মেয়েকে ওখানে ক্রুশবিদ্ধ করে রাখা হয়নি। অথচ মানুষেরই ব্যবহার। পণ্যায়ন। একটি শরীরকে বস্তুর মতো দেখা।

কিন্তু পাশাপাশি মেয়েদের ক্ষমতায়নও কিছু কম পড়ে নাই। এখন মেয়েদের গতিবিধি অনিবার, সর্বত্রগামী মেয়েরা। এই একই মুদ্রার ও পিঠে, কর্মরত মেয়েদের সঙ্গে কর্মরত পুরুষের প্রতিসাম্য তৈরি হতে থেকেছে ক্রমাগত এই কয়েকটি দশকে। আর, ক্রমশই, বিশেষত আইটি ও অন্যান্য পরিষেবা সেক্টরগুলিতে মেয়েদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে যেভাবে, তাতে অন্তত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মেয়েদের মুখ মিশে যেতে শুরু করেছে পুরুষ মুখের সঙ্গে।

এই পটভূমি রচনা করার একটাই কারণ। এই সময়ে, নব্বই পরবর্তীতে দাঁড়িয়ে, কবিতায় নারী কীভাবে উপস্থিত? সেই প্রস্তাবে যাওয়ার জন্য পথ কাটছি।

রাণা রায়চৌধুরী বা প্রসূণ ভৌমিক, চিরঞ্জীব বসু, শিবাশিস মুখোপাধ্যায়েরা, পিনাকী ঠাকুর, শ্রীজাত বা রূপক চক্রবর্তীরা এলেন নব্বইয়ের দশকে, নানা ছাঁদে নারীকে দেখতে। কখনও তা ইয়ারকির ছলে, কখনও শ্লেষে, কখনও আক্ষেপের ছদ্মতায়, ব্যাজস্তুতিতে, রঙিন।

কিন্তু ক্রমশ, রাধা আর শ্যারোন স্টোন মিলেমিশে যাবে শিবাশিসে, শ্রীজাত লিখবে রুশ রূপকথার কাতিউশকার কবিতা, ছড়িয়ে ছেতরিয়ে পড়বে প্রেম, ছাদের কোণে ভিজে চুমু আর দু তিনটি বিবাহিতা মহিলার আসঙ্গলিপ্সা দিয়ে মাপা হবে নারীর নারীত্বকে। নারীর রেঞ্জ এখন ঘরোয়া মিষ্টি ইস্তিরি থেকে, সংসার তছনছ করে দেওয়া প্যাশন পায়রা।

তার যেরকম তছনছিয়া স্বভাব

ঝড়ের পিঠে সওয়ার হয়ে আসে,

আমিও তেমন অজ পাড়াগাঁর নবাব

সন্ধেবেলা মুক্তো ছড়াই ঘাসে

তার যেরকম বিরুদ্ধতার মেজাজ

হঠাৎ করে উল্টোদিকে ছোটে

আমিও তেমন আগুনজলে ভেজা

সময় বুঝে ঠোঁট বসাব ঠোঁটে

তার যেরকম উল্টোপাল্টা খুশি

হালকা রঙের বাতাসে চুল বাঁধে

আমিও তেমন সিঁদুরে মেঘ পুষি

কেমন একটা গন্ধ ছড়ায় ছাদে…

–সে আর আমি, শ্রীজাত

আর একটি,

একমুঠো দুমুঠো চালে তিনমুঠো চারমুঠো

ভাত রেঁধেছি। গরম। তুমি ঘুম থেকে না উঠো

তুমি ঘুম থেকে উঠো না। সূরয পশ্চিমে যাক ঢ’লে

মাথার ধারে জানলা খোলা, বৃষ্টি বেশি হলে

বেশি বৃষ্টি হলেই চুল ভিজবে। চুলখোলা চুলভেজা

শরীর বলে বাইরে যাব, মন বলে ঘরকে যা–

ঘরে বউ আছে ঘুমন্ত, তার শিয়রে মোমবাতি

আলগা, অলস হাত-পা, তবু স্বপ্ন দেখার বাতিক

তাকে সুন্দরী করেছে। আমি দূর থেকে তাই দেখি

ঠোঁটদুটো আধুনিক, আহা, চোখদুটো সাবেকি

আমার ঘুম আসে না। ঠান্ডা ভাতে কাব্য ঝ’রে পড়ে

বৃষ্টি ধরে আসছে। কীসের আগুন লাগে খড়ে…

ঘরে আগুন দিলেও মরব না আজ। আগলাব খড়কুটো

শুধু ঘুম থেকে উঠো না তুমি, ঘুম থেকে না উঠো…

–সংসার গীতিকা, শ্রীজাত

 

শূন্য ও একের দশক : হাপিশ মেয়েছেলেরা

পরের দুটি দশকের কবিতায়, হায়, পুরুষেরা আর লিখছেন না প্রেমের কবিতা, লিখছেন না কোনও মেয়েকে নিয়ে। এমনকি, কবিতায় এতটাই এসেছে অ্যাবস্ট্র্যাকশন অথবা বিমূর্ততা, যে নারীকে প্রায় খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না পাতায় পাতায়।

তবু, অনেকটা সন্ধানী হলে, উঠে আসছে এইসব লাইন:

সন্ধের বয়স বাড়লে রাতের সমুদ্রমন্থনে উঠে আসে পাইপ ব্লুফিল্ম আর রিষার সোনামুখ

কত কত রাত পড়ে থেকে বুঝেছি এখনও শরীর খারাপ হলে রাত হয় গাঢ় হতে বাকী থাকে না মশাদের

ইন্টারফেজে মশারি ঢুকে পড়ে কোনও পঙক্তি বাদ থাকে না ধমনী আর শিরা বেয়ে আমি ক্রমশ ঢুকে পড়ি হৃদপিণ্ড জরায়ু হয়ে জঙ্ঘার গা ঘেঁষে ফুটে ওঠা রাস্তায়

–রাত, রাণা বসু

রাধিকা রিডিফাইনড লিখছেন দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়, একটা চেষ্টা হচ্ছে এই সময়কে ধরার, নতুন কিছু বর্ম কিছু চিত্র, কিছু মাইলফলকচিহ্ন, সময়ের, ধরে ধরে। যদিও কবিতার কাছাকাছি দিয়ে গেলেও ঠিক ঠিক কবিতা হচ্ছে কিনা সময়ই বলবে।

ছোকরা খারাপ নয়, টল ডার্ক হ্যান্ডসাম, সিক্স প্যাক আবস আছে,

রোম্যান্সটাও মোর অর লেস পারে, বাঁশিও বাজায় ভালো,

বয়স কম, বলা যায় কচি,

বড্ড বেশী চুলবুল করে, দোষের মধ্যে হালকা ছকবাজি, তবে তা মানাই যায়

বয়সের ধর্ম ওইটাই, সব ফুলে ঠোঁট রেখে নিজের আস্তানা চিনে নেওয়া

সে তুমি রাখো না ঠোঁট, দম থাকলে আরো কিছু করো

সম্পর্কে মামিমা আমি, কুচিপুচি কিশোরীও নয়, ঘর সামলে, স্বামী সামলে

ফিগারটাও রেখেছি অক্ষত

আয়ান পারে না কিছু, না দাঁড়াতে, না অস্ত্র চালাতে

কদ্দিনই বা মেনে নেবো চুপসনো মেল-ইগোর ঝ্যাঁটা?

আমারও জীবন আছে, গয়নার বাক্স ভরা হিরেমণি সোনাদানা আছে

কাউকে তো দিতেই হবে, ম্যাদামারা ফসিল হবো নাকি?

ভারতবর্ষের এই হাজার বছর ধরে বয়ে চলা ল্যাবা ইতিহাসে

প্রথম, প্রথম কোনো সিংগল উয়োমান আমি, পুরুষের তোয়াক্কা করিনি

একখানা ঘুসি মেরে নকআউট করেছি শালা, বর সংসার ভাঙা ঘর

সেকেন্ড আপার কাটে তাড়িয়ে দিয়েছি ওই ফালতু কালো মাগিবাজটাকে

সেই থেকে একাই থাকি, গান গাই, পথে পথে ঘুরি,

আহা এ মুক্তির স্বাদ সঙ্গমও পারে না ঠিক দিতে…

দেবায়ুধের এই কবিতায়, নারীকে নতুন করে দেখানোর একটি চেষ্টা আছে। সে চেষ্টার মধ্যে তীব্রতা আছে, কিন্তু গভীরতার খোঁজ পাই না। হয়ত রিভার্স মেকানিজমে, কৃষ্ণের চোখ দিয়ে রাধাকে নতুন করে দেখতে পেলে, বোঝা যেত।

আমার বিকেলখানি অসীম ডাউনট্রেনে ভেসে যাওয়া অসুখের মত।

অমন আদরটুকু আমাদের গতিবিধি জানে।

যেখানে ঠোঁটের রঙ মুছে ফেলে পিওনকাকিমা

বাতের ব্যথার তেল ফিরি করে উপরি কামাতে।

–মনখারাপ, দেবর্ষি সরকার

দেবর্ষির এই কবিতার পিয়নকাকিমা মনে পড়ায়, আশির কবি জহর সেন মজুমদারকে। যিনি লিখেছিলেন:

তিনখানা শৈশব কিনেছি, তার মধ্যে একখানা বিক্রি করে দেব, তুমি নেবে?

ও দুপুর ও আনন্দ ও বিস্ময়, ঘুমন্ত সাঁকোর নীচে থমথমে কালোজল আর

সহ্য হয় না, রেললাইনের ওপর খোঁড়া মঞ্জুগোপাল যেদিন কাটা পড়েছিল — আমি কিছু

বলিনি, স্ত্রীর কাছে বকা খেয়ে নিরামিষ রাজেন যেদিন মেঘে মেঘে ঢাকা পড়ে গেল

আমি কিছু বলিনি, গণেশ মণ্ডলের পাখি যেদিন ছটফটে যৌনদোষ নিয়ে

মায়াবাদ ও শূন্যবাদের মিলন করলো — সেদিনও আমি কিছু বলিনি, শুধু একগুচ্ছ

চাঁপাফুল হাতে নিয়ে দেখলাম নিঃশব্দ কাঁটাতারের ওপারে আমাদের রুগ্ন জীবন

পুনরায় সেলাই করছে আমাদেরই মা, পিছনে ধূ ধূ জালিকাটা বালিয়াড়ি, পিছনে

স্তম্ভিত চাঁদের অলৌকিক মূকাভিনয় — আর কিছু নাই, ওগো, আর কিছু নাই

অন্ধকারে সুতো টানে অন্ধ পিসিমা, শকুনের ফাৎনায় শুক্র লেগে যায়

আর কিছু নাই, ওগো, আর কিছু নাই, টিনের সুটকেশ ক্রমে গোরুর পিঠে উঠে

এক পৃথিবী থেকে অন্য পৃথিবীর দিকে চলে যায়, আমিও দেশে দেশে ঘুরে

শৈশব বিক্রি করি, নানারঙের শৈশব ক্রমাগত বিক্রি করি, তুমি নেবে?

–নিরামিষ, মহাকাল সমারূঢ় অংশ থেকে

ঈষৎ পৃথক হয়ে ওঠার তাগিদে, পুরাতন কাব্যকে মিমিক্রি করে দেবর্ষি আবার লেখেন:

পিচ্ছিল বিদায়যন্ত্র মাঝ বরাবর বাজি ওঠে।

বিঘিনি ঘটাবি সখী? আঃ মোলো যা, কাঁদেনা, কাঁদেনা

তমউৎঘাটনে নামি হ্যাজাকের শ্রেণীশত্রু যত

জোনাকিশিবির হতে নমুনা পাঠাবে ঘরে ঘরে,

নমুনা তো যে সে নয়, যেন চিটাগাঙমাসীমার

পাকারুইমাছের কালিয়া।

সে অতি সরলপথ। মীনচক্ষুশুল প্রহেলিকা

ডিঙা দিয়া অধিবৃত্তচাপ ধরি নাসামল দ্বারে

কোনাচে নখের দাগ, মনুষ্যজাতির উপকথা

লিখিয়াছি অন্তরীক্ষে, ব্রহ্মশাপ সুলভে মিলিবে।

এহেন সঙ্কেত হাতে, কুচযুগবিলাসীপ্রমীলা

গেলাসে তরল ঢালি বসিয়াছে, জন্মদিন হবে।

–দেবর্ষি সরকার

অথবা,

আমরা সমুদ্রে যাব কিন্তু পানপাতা থেকে চুন ও খয়ের চেয়ে বসেছেন নবগৃহবধু। সঙ্গী হবে বলে যারা চৌমাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তাদের গায়ের রং সাদা বা কালোর মতো নয় তাদের পকেটে থাকে সীমবীজ, কড়ি ও কলম দিব্যি থু থু করে পিত্ত কফ্ তুলে আনতে পারে ওরা ওদের ভিতর থেকে একজন উঠে এসে কাফ মাসলের ডেলা চিরে দিয়ে বলে, “দেখো এই হল পথ”

আমরা সমুদ্রে যাব ভগ্ন স্বাস্থবতী প্রৌঢ়া দালান কোঠায় একশোআট বার ঋতু ঋতু লেখে মাছের চোখের দিকে তাকাতে পারে না আর, সেই দুঃখে এক লোভী ধর্মযাজকের পাছা লক্ষ করে ঢিল ছুঁড়ে মারে মাথায় কাপড় তুলে ধেই তা তা ধেই নাচে পিছনে রুলার গুঁজে বলে, “দেখো এই হল পথ”

অবশেষে লুব্ধকের চেন খুলে আকাশে ঘোরাই ঋজুপথে তুলাযন্ত্র নিয়ে দুলতে দুলতে ভাবি বয়জ্যেষ্ঠ শশধর মারা কি যাবে না কোন দিন? ভাবতে ভাবতে মেঘ ভেঙে জলস্তম্ভ টুকরো করে ফেলি কৃষ্ণসাগরের দিক থেকে উলুধ্বনি ভেসে আসে।

বাঁজা মহিলারা এই ব্রত কথা শুনে মুখ ঢাকা দিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।

–নিজস্ব উপকথা, দেবর্ষি সরকার

আসলে এখন নারীকে নির্মাণ না করে, বিনির্মাণ করছেন কবি। এই ২০০০ পরবর্তী দিনে, এইটি আমার লক্ষ্যণীয় মনে হয়। পুরনো সেই সব সেন্টিমেন্ট, প্রেমিকার আইকন, স্নিগ্ধ শান্ত রোলমডেল ভেঙে দিচ্ছেন তাঁরা। নেকুপুষু প্রেমের কবিতা লেখা বন্ধ করেছেন অধিকাংশ কবিই।

কিন্তু কোথাও, এই সব কবিতা শব্দের খেলা, ভাষার অনুসন্ধান ছাড়া আর কিছু নয়। সত্তর দশক অব্দি মানুষ প্রেমে পড়লেই কবিতা লিখত। আজকের যুবা প্রেমে পড়লে প্রেমিকার সঙ্গে শপিং মলে যায়। তার প্রেমিকায় কম পড়ে নাই। তাই কবিতায় কাঁদুনি গাইতে হয় না তাকে। সে কবিতা লেখার সময় নতুন করে নির্মাণ বা বিনির্মাণ করে এক অন্য নারীকে। অন্য কনটেক্সটে আনে নারীর নানা চিত্রকল্প বা আইকন। তা একরকমের খেলাই হয়ত।

 

পুরুষ তুমি কি পথ হারাইয়াছ?

যে সময়ে পুরুষ নারী একই সঙ্গে একই বিছানায় বসে ব্লু ফিল্ম উপভোগ করেন, সেই সময়ে পুরুষ নারীর দ্বৈততাই যেন প্রশ্নচিহ্নের মুখে। পণ্যের দুনিয়ায় সকলেই সমান ক্রেতা বা ভোক্তা যেখানে, একটু একটু করে যেন বিষয় আর বিষয়ীর আলাদা আলাদা সত্তাই ভেঙেচুরে পড়ছে। ২০১০-এর পরবর্তী সময়ের কবিরা, যারা পুরুষ, তাঁদের কাচের নিচে এখন নারী নয়, পুরুষ নিজেই, সুতরাং। নিজের পৌরুষকে নিয়ে প্রশ্নতাড়িত:

পৃথিবীর কোনও ভাষায় কি পুরুষকে নিয়ে কবিতা লেখা হয়?

এইখান থেকেই মরদ হয়ে উঠতে বাসি জামাকাপড়ের মতো

একটা মিহি ত্যাগ মেনে নিতে গুহায় আগুন জ্বালাতে হবে

শিকার বেছে নিতে বল্লমে শান রাখতে হবে সতর্কতায়

কারণ

পৃথিবীর সব নদী নাকি নারী

পৃথিবীর সব পুরুষ রহস্যহীন

 

এইসব ছেড়ে শুধু বীজ ধারণ করো

বিতরণ করো কাঠামো গড়ো দুর্গের

নিষিক্ত হতে হতে আবাদ ভূমিপ্রান্তে

একপাহাড় পেশী নিয়ে দাঁড়াও

কারণ

পৃথিবীর সব ভূমি নাকি নারী

পুরুষের জন্য কোনও ল্যান্ডস্কেপ নেই

#

অযথা সার্কিটে হঠাৎ প্রেমের স্ফুলিঙ্গ

আড্রিনালিন বিপর্যয়

ক্ষরণের ধ্যাসটেমো মেনে

ভিগি বিল্লির ন্যায় ম্যাও ম্যাও

পুষ্যি পুষ্যি গলাকলারমোহ

১৫ দিনের বাবাছুটির পর

খেয়াল হলো কিছুই কি করলাম!

…যাঃ আমার তো স্ট্রেচমার্কও নেই

 

এবার শুধু আগলে রাখো

বাবুলগামের মতো ফোলাও    ফাটিয়ে ফেলো ডিপ্রেসন

নির্ভয়ে হেঁটে যাও ফুটপাতে    একতোড়া ফুল কিনে নিয়ে

 

যতদিন তুমি ঠিক বাক্সমাপের অনন্য ক্রিয়েচার

–হলুদ কাব্য ও কিছু অম্ল কথা, ইন্দ্রনীল বক্সী

এবং,

পেছনে তিন তিনটে লাথি কষানোর পরেও কবিতাটা না দাঁড়ানোয় আমার কাপুরুষ মনে হচ্ছে নিজেকে। আমি পাগলের মতো চ্যানেল বদলাচ্ছি যদি একবারও দেখতে পাই সেই বিখ্যাত তেলের বিজ্ঞাপনটা। যদিও সচেতনভাবে কখনও দেখা হয়নি সেটা। কান খাড়া রেখে চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছি প্রতিবার। ভদ্রলোকেরা যেমন করে আর কি।

এখন সেই ভদ্রলোক নামক শয়তানটাই পাছায় লাথ মারছে আমায়। যে-কোনওভাবে একটা, অন্তত একটা কবিতা দাঁড় করাতে হবে আমাকে। যার মুখটা প্রিয়াংকা চোপড়ার মতো শরীরটা সানি লিয়নের।

–সানি লিয়ন মার্কা, দীপ্তিপ্রকাশ দে

এই ওপরের দুটি কবিতা, পুরুষের দিকে আমাদের চোখ ঘুরিয়ে দিতে থাকে। নারীকে বিনির্মাণ করে, প্রেমকে বস্তাপচা, পুরনো, ক্লিশে ও অ-প্রচল, নিছকই একঘেয়ে ভাবার ফলে, ক্রমশ কবিতা থেকে প্রেমিকাদের নির্বাসন হয়ে গেলে, পুরুষের নিজের বিষয়েই সংশয় জাগে। এই একের দশকের দুটি কবিতায় তাই, পুরুষ নিজেকে খুঁজতে বেরিয়েছেন।

আজকের কবিতায় নারী আসে পণ্যায়নের মোড়কে।

ফ্যাশন টিভির নগ্নসুন্দরী/কিংবা হস্তমৈথুনের পরিচিত কৌশল…

–সন্ধানে, অরিজিৎ ভট্টাচার্য

অথবা,

সোনালি চতুর্ভুজের খুব ধার ঘেঁষে

টর্চের মৃদু আলোয় জমাট আঁধার তাড়িয়ে

পেরিয়ে যাই, দেশকাল, এই সময়।

 

আসলে এভাবে কখনওই গন্তব্যে যাওয়া যায় না।

 

প্রিয় রমণীর সুঠাম বাম ঊরু

নিজের শরীরে তুলে এনে

উষ্ণতার অভিযোজন হয়, যৌনতা

হয় না।

 

সোনালি চতুর্ভুজের খুব ধার দিয়ে

টর্চের মৃদু আলোয় অমন আঁধার তাড়িয়ে

জেনেছি, সৃষ্টিশীল, শিল্পপ্রসবী

দুটি নারী-পুরুষ সঙ্গমে

উভয়ত তৃপ্ত, বড় একটা হয় না।

 

এক জীবনে…

–মায়াবন্দর, শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও নারীকে চাইছেন, দেহে ও মনে, সম্পূর্ণতায়।

পুরো একটা দিন আমাকে দিও —

 

সদ্য পজেশান পাওয়া সাততলার সেই ফ্ল্যাটে

দুজনে, শুধু দুজনে

সকাল থেকে সন্ধে পেরিয়ে

 

অন্তত তিনবার মিলিত হব

অন্য অন্য ভঙ্গিতে, বিভঙ্গে

আপ্রাণ শুষে নেব তোমায়

আর সুখের শীর্ষপ্রদেশে দুজনে পৌঁছলে

বলাবলি করব নিজেদের জীবনের

অজানা অন্ধকার সব অলিগলি।…

–শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাপ্রস্থান

আবার,

এইসব অসাবধানী রাস্তা পার চোখে অযত্ন কাজল তাকালেই উদাস জ্যোৎস্না ছলছল ওই, শোনো সাজাও নিজেকে গভীর গভীরতর শিঙ্গারে

এইসব পুরানো দুঃখের আড়মোড়া রাত ফিরতি ধূসর পথ পায়ে পায়ে নৃত্যহীন ক্ষয় ক্ষয় চলন মেয়ে, শোনো গুছিয়ে নাও নিজেকে স্মিত স্বপ্নের গালিচায় গালিচায় হাঁটো

কঠিন চোয়ালের ব্যারিকেড উপচে যাচ্ছে রেশম রেশম বন্যা অনন্ত অপেক্ষার ওড়ছোড় সন্ধান তোমার ও তন্বী যত্ন নাও সে আসবেই সে তরুণ কবি আঙুল ছুঁয়ে উড়িয়ে নেবে তোমায় আলোর মহাকাশে

তুমি পরী হবে নারী হবে পরী হবে নারী হবে…

দরজা খোলো… ঠোঁট

ছুঁইয়ে বাড়িয়ে দাও মহাজাগতিক আঙুল তোমার সে ধরবেই সে তরুণ কবি তুমি পরী হবে নারী হবে পরী…

–তুমি পরী হবে, অংশুমান দে

কিংবা,

কত বিষ কূটনৈতিক কুকুরের খাদ্যের দাম বাড়ছে মোটরবাইক ছাড়া কাম জাগছে না সে নারীর এমন সময় কী করা যায় বলোতো সোনা? মণিকাঞ্চনে মালাবার বিরিয়ানি কী ভালো বানায়! প্রিন্টার খারাপ বলে ছেলের গায়ে হাত তুলবে? চায়ের কাপ নিজে উল্টেছো বলে বলবে টেবিলটা ঢালু? কত বিষ কূটনৈতিক অন্ধকার ভিত্তি করে আসছে টাটা সুমো তোমায় তুলে নিয়ে যাবে স্বর্গে দাঁড়ি

–সোনামণি, অংশুমান দে

অথবা,

তখন বৃষ্টিজনিত সব ছোঁয়ারা মাথার আশেপাশে এসে বিলি কাটার দ্বন্দ্বে বিমূঢ় থাকে। আমি তার ওতপ্রোত কিছু তাৎপর্য নিয়ে একটা দোলনার দিকে তাকিয়ে থাকি। আরো বৃষ্টিঘোর চাপে চশমার বাইরে। নিসর্গ যতই অস্পষ্ট হতে থাকুক, দোলনা ক্রমশ ‌বিঁধে যেতে থাকে সব ইন্দ্রিয়ের সূক্ষ্ম অবকাশে। যখন এইসব ঢেউয়ের পারস্পরিক সাহচর্যে মায়ার ছন্দ তৈরি হতে পারতো, একটা তাগড়া মেয়ে ভিজতে ভিজতে বাসে উঠে যায়। ভাবি ওরকম ভেজা শরীরের অর্ধস্বচ্ছতায় কী ভাসমান লালসা জাগতে পারে! ওকী ব্যাগটা বুকে চেপে ধরলো! দোলনা থেমে যায়।

–বৃষ্টিকালীন ১, অংশুমান দে

রহস্যময়তাই যদি কবিতা হয়, আর নারীর রহস্যময়তা, যদি সামাজিক কারণেই দ্রুত ক্রমক্ষীয়মান, তবে নারীর মূর্তির এই তো পরিণতি!

উপসংহারে বলে ফেলি এটুকুই, এই সময়ের কবিতা চাইছে, নারীকে সংজ্ঞায়িত করে, বেঁধে ফেলতে। বুঝে ফেলতে।

হাড় দিয়ে তৈরি করে

ব্রহ্মা বলেছেন তুমি নারী

তোমাকে দিলাম এই ফল

শুরু হোক আদম শুমারি

–আপেল, নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়