অপমানের আমমোক্তারি

সোনালী চক্রবর্তী

 

দ্রৌপদী
শালী
খানকি
বেশ্যা

নাক কুঁচকে গেল প্রথমেই? চোখটা ব্যথা ব্যথা করে উঠল? একে তো মেয়ে (না না, মেয়েমানুষ বলবেন না, ভীষণ প্যারাডক্সিক্যাল), তায় লিখছে সাহিত্যে নারীর বঞ্চনার মত গুরুতর বিষয়ে প্রবন্ধ। তার শুরু কিনা…

তাহলে এবার যন্ত্রণাটা চোখ থেকে বুকে না নামলেও মাথায় উঠুক। আজ্ঞে ঠিক এটাই সাহিত্যে নারীর অবমাননাকর অবস্থান ও প্রায় ঠনঠনে প্রাপ্তির ভাঁড়ারের মূল চাবি। তাকে লড়তে হয় বেদান্তের ‘মায়া’ রূপী অস্তিত্বহীন সর্পটার মত ‘চরিত্র’ নামের এক আরোপিত ছায়া সৈনিকের সঙ্গে। চাইবাসা শক্তি চাটুজ্যে তৈরি করে না ঠিকই কিন্তু ওই বোহেমিয়ান শ্বাসের পরিসরটা না পেলে শক্তির কবিতাগুলোও আসে কি? এবার বলুন তো, কোনও কবি বা কথাসাহিত্যিক মেয়ে যদি ওই যাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে বা থাকে, আপনি, আপনার সমাজ ছেড়ে দিন, সাহিত্য মহলে তাকে কী কী নামে ডাকা হয়? প্রথম চারটেই না? চোখের ঈশারা করা হয় তো পড়তে গিয়ে একে অপরকে? না?

একটি নারী কাগজের উপর কালির আখরে শুধুমাত্র তার লিখনীশক্তি, অর্জিত শিক্ষা আর অধিগত প্রজ্ঞা বা মেধার প্রমাণ রাখলেই তিনি পাঠযোগ্য হয়ে ওঠেন না। তাকে সামাজিকতায় তার ব্যাক্তিগত যাপনের নৈতিক শুদ্ধতা ও তথ্যের স্বচ্ছতা জাতীয় প্রসঙ্গের জহুরি লেন্সে উত্তীর্ণ হতে হয় আগে। যদি বিবাহিত হন তাহলে তিনি যে আদতে নিতান্তই লক্ষ্মীমন্ত বৌ, লিখতে বসার আগে শুক্তোটা রেঁধে, শাশুড়িকে ওষুধ খাইয়ে, শ্বশুরের চশমা বালিশের পাশে সাজিয়ে, সন্তান-সন্ততিকে পড়াশুনা করিয়ে, বাকি সমস্ত কর্তব্য ও দায়িত্বে সুচারু নিষ্ঠার প্রমাণ রেখে আসেন, এই শংসাপত্র অতি বাধ্যতামূলক। ও হ্যাঁ, মূলত যার কারণে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির অবতারণা, সেই স্বামী ও সম্বন্ধিত শয্যায় যে তিনি নিতান্তই সতী অংশে জন্মলাভ করেছেন, এই প্রমাণ না থাকলে কিন্তু বাকি সব যোগ্যতা একেবারে নাকচ হয়ে যাবে। আর যদি অবিবাহিত হন, তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল। কোনও প্রমাণের দরকারই নেই। যে নিজের ইচ্ছার অধীশ্বরী হয়ে থাকবে বলে সংসারের মত পবিত্র রিস্তায় জড়ায়নি আবার দুই কলম লেখে, সে তো সন্দেহাতীতভাবেই ওই যে প্রথম চারটে শব্দ। কিছুটা ধোঁয়াশা কাটছে কি যারা এখনও পড়ছেন? আপনি আমায় যুগের অগ্রগতি দেখাবেন? মননের টাইমমেশিনে বঙ্গাব্দ খ্রিস্টাব্দ বোঝাবেন? নারীপ্রগতির সেমিনার শোনাবেন? আমি আপনার বিপুল তথ্যকে যথাযোগ্য মর্যাদায় ডাস্টবিনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে বলব, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়েও একজন প্রথিতযশা বাঙালি কবি মৃদুমন্দ সুরে নয়, রীতিমত যুক্তিতর্ক দিয়ে যখন বোঝান ‘মেয়েরা কবিতা লিখতে পারে না, তা শুধু নয়, তাদের কবিতা লেখা উচিত নয়’, স্তাবকদের কোনও অভাব পড়ে না মহা সমারোহে তাকে সমর্থনের জন্য। আমি আপনাকে বলব এখনও গ্লিসারিননির্ভর বাংলা সিরিয়ালের টিআরপি সর্বাধিক এবং পৃথিবীর নবতম অলীক ভাইরাসটির কারণে ভারতবর্ষে লকডাউনের সময়ে পঁচিশ বছর পর রিপিট টেলিকাস্টের ‘রামায়ণ’ ৯১ কোটি দর্শক গদগদ চিত্তে গেলেন। এখনও অসহায় নারীর অগ্নিপরীক্ষা টাইপ নাটক শ্রেষ্ঠ অরগ্যাসমিক টুল। অর্থাৎ যে শর্তগুলি আমি রাখলাম একজন নারীর পাঠযোগ্য হয়ে উঠতে তা অবান্তর কোনও চর্চা নয়। যে রূপে সমাজ একজন নারীকে দেখতে চায়, হুবহু সেই আর্কিটাইপ্যাল স্টিরিওটাইপের কাছে যোগ্যতামান উত্তীর্ণ করে তবেই একজন নারী সাহিত্যক্ষেত্রে পাঠযোগ্যতার প্রবেশপত্র অর্জন করেন। নাহলে তিনি প্রথম চারটে শব্দ। অস্বাভাবিক মনে হলে এখনও অবধি বাংলা ধ্রুপদী সাহিত্যিকদের মধ্যে যে কজন নারী সর্বাধিক পরিচিত তাদের দিকে তাকান। লীলা মজুমদার বা আশাপূর্ণা দেবীকে অতিরিক্ত পূর্ববর্তী মনে হলে সুচিত্রা ভট্টাচার্য আর তিলোত্তমা মজুমদারের কথা ভাবুন। আপনি অস্বীকার করলেও সদ্যপ্রয়াত নবনীতা দেবসেনের ব্যক্তিচর্চা নিয়ে কুৎসা তাঁর মৃত্যুর পরেও বিদ্যমান। ফিরতে হল তো চারটি শব্দের কাছেই?

বহির্মহলের শার্সিতে অনেক চিড় পড়ল। ঋতুপর্ণের ঋণ স্বীকার করে অন্তরমহলে পা রাখি এবার? এক্ষেত্রে প্রথমে প্রশ্ন আসে সাহিত্য ও জীবনের সম্পর্ক নিয়ে। আর সেই তর্ককে কিছুটা সহজপাচ্য  করতে আমরা আশ্রয় নিতে পারি পাশ্চাত্যের কিছু তত্ত্ব ও উদাহরণের। প্রসঙ্গের খাতিরে যদি মেনেও নিই একমাত্র পর্যাপ্ত অনুবাদের অনুপস্থিতিই বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলার খরামাত্রিক পরিস্থিতির কারণ তাহলে তা অতিসরলীকরণ হয়ে যায় না কি? কারণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে আমরা বঞ্চনার দুঃখ যাদের জন্য অনুভব করি তাদের কেউই সাম্প্রতিক নন এবং নারীদের মধ্যে তা একমাত্র মহাশ্বেতা দেবীর। তিনিই রবীন্দ্রনাথের পর একমাত্র ভারতীয় যিনি নোবেলের জন্য শর্ট লিস্টেড হয়েছিলেন। এবং যে কোনও সাহিত্যসাধক মাত্রেই নিশ্চয় এই তথ্যকে অস্বীকার করবেন না যে তিনি তার জীবনচর্যা ও সাহিত্যসাধনার কোনও পৃথকীকরণ করেননি। এই দেশে ভার্জিনিয়া উলফ জন্মাননি। সিলভিয়া প্লাথ, এন সেক্সটন, ব্রন্টি সিস্টারদের কেউই না। এ তাদের সৌভাগ্য না বাংলা সাহিত্যের পোড়াকপাল এ কূটে না ঢুকেও বলা যায়, আত্মায় মননে যে বোধ নিয়ে জন্ম হয় কোনও ক্ষণজন্মার, যার তাড়নায় তাদের সমগ্র যাপন শুধুমাত্র উপলক্ষ হয়ে ওঠে সৃষ্টির, তার সারভাইভের কোনও স্পেস বাংলা সাহিত্য তার কোনও নারী স্রষ্টার জন্য বরাদ্দ রাখে না। সমিধের অভাবে যজ্ঞাগ্নি নির্বাপিত কখন যে করে দেয় ছকে বাঁধা নৈতিকতার শিলনোড়া জীবন, টের পাওয়া যায় না। পেলেও কিছু করার থাকে না। অবচেতনে ভয় কার না থাকে চারটি শব্দের? আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব মনে হলেও যদি এই যুক্তির আলোয় আপনি বাংলা সাহিত্যে নারীদের অংশকে তুলাদণ্ডে চাপান, গুণগত বা পরিমাণগত যে কোনও সূচককেই এড়িয়ে স্পষ্ট বলা যায় এখনও অবধি অতি সামান্য ব্যতিক্রম ব্যতীত কোনও নারী সাহিত্যের চরাচরে মৃগয়া তো দূর, দেহলিজেই বিচরণ করে উঠতে পারেননি। কীসের সম্মান আর কীসের বঞ্চনা? সাহিত্যচর্চাটাই যাদের করে উঠতে দেওয়া হয় না তাদের আর প্রাপ্তি প্রবঞ্চনা নিয়ে কথা…

***

 

ধারণা কোনও এক রৈখিক সত্য নয় এমনকি সত্যও কখনও একমাত্রিক নয়। সুতরাং পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদগুলিতে নারীদের সাহিত্যসৃষ্টির প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে যে চিত্র আলোচিত হল এবং প্রায় সিদ্ধান্তের মত করে একটা সূত্রে উপনীত হওয়া গেল, যে মনন ও যাপনগত আকাশ সাহিত্য নির্মাণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় দুটি শর্ত তার অনুপস্থিতিতে নারীরা তাদের মূল কাজের নির্মাণই করে উঠতে পারেননি, সেই অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র না সরে বাস্তবতায় যে পরিমাণ চর্চিত উপাদান উপস্থিত আছে তার নিরিখে বঞ্চনার ইতিবৃত্ত সন্ধানে এরপর এগোনো যেতেই পারে। একদম শিকড় স্তর থেকে শুরু করা যাক। বাঙালি মাত্রেই তার সাহিত্যচর্চা শুরু হয় কবিতা দিয়ে আর এটা প্রায় নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে অভ্রান্ত। পরবর্তীতে কর্পোরেট অফিসের ব্যস্ত অফিসার যার বাড়িতে একটিও ইন্টিরিয়রের প্রয়োজনে ব্যবহৃত ছাড়া বই নেই, তিনিও যে নবম-দশম শ্রেণিতে প্রথম কদমফুলকে বর্ষায় নিজের ভিতর ফুটতে দেখে দু-দশটা লাইন ছন্দ মিলিয়ে লিখে ফেলেননি একথা হলফ করে একেবারেই বলা যাবে না। অবশ্যই সেটি মোবাইল-ইন্টারনেট যুগের পূর্ববর্তী পৃথিবী ছিল। সামান্য অপ্রাসঙ্গিক হলেও একথা বলাই যায় সম্পূর্ণ পরিবর্তিত দুটি পর্যায়ের পৃথিবীকে এই জগৎ প্রত্যক্ষ করেছে অদ্যাবধি শেষ শতবর্ষে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী, অন্তর্জালের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আর এখনও পরবর্তী পর্যায়ে না পৌঁছানোয় যে অতিমারির অবতারণা করা গেল না, সেটি। এবার বলুন তো, একদম বিশুদ্ধ হিসাবশাস্ত্রের কচকচি দিয়ে, কৈশোর-যৌবন সন্ধির ভার্চুয়াল প্লাটফর্মের আগের যুগে একমাত্র প্রকাশমাধ্যম স্কুল-ম্যাগাজিনগুলিতে কটি মেয়ের কবিতা ছাপা থাকত? এর মানে কি এই যে তাদের বর্ষা তাদের যমুনা তাদের কুঞ্জ তাদের প্রতীক্ষা জাতীয় অনুভূতিগুলোর অস্তিত্বই ছিল না? তা তো নয়। কিন্তু চশমা পরা মেয়ে মানেই রাগী অঙ্কের রসকষহীন দিদিমণি যেমন একটা মিথ তেমনই মেয়েমানুষ স্কুলে পড়তে গিয়ে কবিতা লিখছে একথা প্রকাশ্যে এলে যে বিদ্রূপের শিকার হতে হবে সেই আশঙ্কায় পঞ্চাশ শতাংশ আর প্রকাশ পরবর্তীতে একান্নবর্তী ব্যঙ্গের তাড়নায় বাকি পঁয়তাল্লিশের কাব্যসাধনার সেখানেই ইতি ঘটে যেত।  অবশিষ্ট পাঁচ শতাংশের মধ্যে যে গুটিকতক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি অতিক্রান্তে অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার পদক্ষেপ অথবা আপাতস্বাচ্ছন্দ্য সমঝোতার গার্হস্থ্যজাল পেরিয়ে অন্তঃসলিলা ফল্গুর মত সাহিত্যসাধনাকে বহমান রাখতে পারত তাদের দিকে এবার আলোচনা এগোক। জীবন নামের আঙ্গিক একটি মেয়ের কাছ থেকে যা যা প্রত্যাশা করে, সাহিত্যে তার বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটে না। মেয়েদের সাহিত্য হবে শান্ত শীতলপাটি, ভিজে লাল গামছাটির মত, এটাই প্রার্থিত। শুধুমাত্র পাঠক সমীপে নয়, সমসাময়িক সাহিত্যকর্মীদের মননেও, এ বড় বিস্ময়ের। মডেল স্টাডি করেই হোক, অথবা কল্পনাপ্রসূত, একজন পুরুষ শিল্পী ন্যুড অঙ্কনে বা ভাস্কর্য নির্মাণে যেভাবে প্রভূত সম্মানের অধিকারী হন, সম মানের স্বীকৃতি তো আরব্য রজনী, কুৎসার অধিক কিছু প্রাপ্তি ঘটে কি যদি শিল্পীর লিঙ্গটি ভিন্ন হয়? প্রকৃত কলম পাঠকের দাসত্বনির্ভর নয়, একথা যেমন সত্য ঠিক তেমনই কলমের কারণে সামাজিক যাপনকে প্রশ্নের মুখে না দাঁড়িয়ে পড়তে হয়, এমন অবচেতন ক্রিয়া পদবিন্যাসে প্রভাব ফেলে না একথাও অলীক বলেই বোধ হয় যদি স্রষ্টাটি নারী হন। উচ্চকিত স্বরে সমর্থন না করলেও এই প্রবন্ধটি যারা পড়ছেন তাদের নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে স্বীকার করতেই হবে এমন সাহিত্যিক একজনও এমন নেই মেয়েদের মধ্যে যাকে জীবনের কোনও না কোনও পর্যায়ে তার প্রেমিক হোক বা স্বামী, পিতা হোক বা পরিবারের বয়জ্যেষ্ঠ কোনও সদস্য, সন্তানসন্ততির চোখে আর কিছু ক্ষেত্রে চোখ পেরিয়ে মৌখিক আক্রমণের অন্তত শিকার হতে হয়নি তার কোনও না কোনও সৃষ্টির পটভূমি, বিষয়, চরিত্র অথবা ভাষা নির্মাণের প্রকৌশলজনিত প্রসঙ্গে। কজন পুরুষকে আজ অব্দি তার সৃষ্টিরহস্যের পোস্টমর্টেম করতে হয়েছে বলবেন আমায়? তার উপর হয়তো সাংসারিক উদাসীনতার অভিযোগ আসতে পারে। তার স্রষ্টাসুলভ খেয়ালি পদচারণের আলোচনা চলতে পারে, এই অবধিই সীমা। কিন্তু একটা মেয়েকে করতে হয়।

***

 

“ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি”— চটুল গানের পংক্তি শুধু নয়, নির্মাণ সাহিত্যের অতি বড় সত্য। শুধু ব্রহ্মার পরিবর্তে তার মানসকন্যাকে নিয়ে আসুন। আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধায় তার জন্য বরাদ্দ শুধুই বেদি, উৎসব, নৈবেদ্য বা অঞ্জলির ফ্যাশন প্যারেড। তিনি যদি সৃষ্টিতে স্বয়ং আসেন, তার শুভ্র বসন, তার বীণা, কিংবা নিরীহ বাহনটি সুদ্ধ তাকে ওই প্রথম চারটি মানবিক শব্দে বিদ্ধ হওয়ার জন্য বিশেষ অপেক্ষা করতে হবে না। সাহিত্য পাঠ করে নারীকে বঞ্চনা করবেন কী করে আর? একদম জেনেটিক প্র্যাকটিসেই তো সৃষ্টির পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে পৃথিবী তাদের। একদম অভ্রান্ত নৈপুণ্য। যে কজন এই কুটিল ছক ভেঙে লিখেই ফেলেছেন, আর এখন লিখছেন, পৃথিবীর কাঁটা যেদিকেই ঘুরুক, তাদের পড়ার আগেই তাদের শারীরিক গড়নের স্ক্যানিং আর যাপনের বিস্তৃত তথ্য নিয়ে কফি থেকে মদ কোনও পেয়ালাকেই তাপমাত্রা পরিবর্তনের নূন্যতম অবসর দেওয়া হয় না। সাহিত্যিক যেখানে একজন নারী, সেখানে সাহিত্যপাঠের আগে ও পরে সাহিত্যিককে অধিক পাঠের চর্চা যতদিন অব্যাহত থাকবে, নারী শুধু বঞ্চনা নয়, ওই চারটে শব্দেই ক্রুসিফায়েড হতে থাকবে নিরন্তর। মেল শভিনিসম, ইগো আর ডমিনেশন নারীর সাহিত্যকে ছাড়ের তালিকায় রেখে নিস্তার দেবে তার অবদমনের প্রশান্তি তল্লাশে, এ অলীকের বিলাস কল্প নিয়ে অন্তত উপমহাদেশের কোন নারী যেন সাহিত্যে না আসেন। বরং প্রস্তুত হয়ে আসুন, নিজেকে বার বার চারটে শব্দ চীৎকার করে শুনিয়ে শুনিয়ে, তাতে অন্তত সাহিত্যিক সত্তাটিকে পাঞ্চালী সহ্যে আগলে রাখতে পারবেন।

***

 

‘ট্র্যাফিকিং’ শব্দটি অতি পরিচিত পৃথিবীর আদিমতম জীবিকাটির সঙ্গে। ভাবলে বিস্মিত হতে হয় সাহিত্যে নারীর অবস্থানের সঙ্গে এর যোগ কী নিবিড়। কেন আমি শুরুর চারটি শব্দ দিয়ে এই বিষয়ের অবতারণায় এসেছিলাম, তা যতদূর সাধ্যে কুলিয়েছে, আলোচনার চেষ্টা করেছি। শেষও করব তাকেই ধ্রুবক ধরে। মালিকানাহীন হস্তান্তর হয় না অবিকল সাহিত্যে নারীর সৃষ্টি নিয়ে? ট্র্যাফিকিং শব্দটি কেন আনলাম? বয়স-বংশমর্যাদা-শিক্ষা-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কোনও কিছুরই ফিল্টার না মেনে যেভাবে প্রতিনিয়ত অপহৃত হয় শুধুমাত্র ‘বায়োলজিক্যালি মেয়ে’ এই পরিচয়ে লক্ষ লক্ষ নারী আর তাদের ক্রেতা-বিক্রেতার যাবতীয় ভিত্তিহীন ও অবান্তর অধিকারের শিকার হিসাবে হস্তান্তর হতে হতে পয়সার বিনিময়ে বিকিয়ে যেতে যেতে ব্ল্যাক হোলে ঠাঁই পায় তাদের পরিচয়পত্রগুলো, একই পরিণতি সাহিত্যেও ঘটে মেধা ও ব্যক্তিত্বের দাখলিয়তে। কোনও মেয়ের লিখতে আসা থেকে শুরু করে তার উত্থান ও প্রতিষ্ঠার প্রতিটি অংশের ভাগচাষি নয়, অভিভাবক হতে ব্যগ্র হয়ে ওঠে পুরুষ প্রভুরা। তাদের মনোরঞ্জনে ত্রুটি হলে বা নির্জন স্বকীয়তায় কেউ বিরাজ করতে চাইলে তাদের লেখনীও কি নিজস্ব, এই ঘৃণ্য সন্দেহ পুঁতে দেওয়া হয় রক্তবীজী কৌশলে।

কলমের জোরে অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে কারও পরিচিতির প্রসার ঘটলে অবলীলাক্রমে লেবেল সেঁটে দেওয়া হয় পাইকারি দরে ‘শুয়ে ছাপায়’। নৈতিক শুদ্ধিকরণের ঝান্ডা উড়িয়ে আত্মমর্যাদার শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়া হয় কত নারীর যারা লিখতে এসেছেন নিতান্তই আত্মার তাগিদে। পুরুষ যখন উচ্চারণ করে “একমাত্র কবিতার প্রতি আমি বিশ্বস্ত” তখন তা সমাদর পায়, সমতুল বক্তব্য নারী রাখলে সে হয়ে যায় ‘বেশ্যা’। সেলুকাস মনে পড়ে। স্রষ্টার নারী পুরুষ হয় না। কিন্তু অনভিপ্রেত, আকস্মিক, অবিরাম আক্রমণ লাগাতার নিয়ে যেতে হয় দ্বিতীয় লিঙ্গের স্রষ্টার সংবেদনশীল স্নায়ুর বিক্ষেপকে। কীসের যুদ্ধ? ভেরি বাজার আগেই তো সর্বজনবিদিত ফলাফল সদর্পে ঘোষিত। বঞ্চনা বহু পরের কথা। সাহিত্যে নারীকে তার নিজস্ব অবস্থানটুকুতে স্বীকৃতি দিলেই হয়তো চালচিত্র বদলাত। কিন্তু এ এমন এক ময়দান যাকে রুমিও খুঁজে পাননি। চামড়ার সঙ্গে ঘিলুকে ঘুলিয়ে পোড়া খিচুড়ি রেঁধে পরিবেশনের শিল্পকলা কী হতে পারে প্রতিটি নারী সাহিত্যিকের প্রতি পিতৃতন্ত্রের ব্যাখ্যা তার আদর্শ উদাহরণ। পুরুষ তার বন্ধুবান্ধব, সঙ্গিনী, মা, স্ত্রীকে নিয়ে বা ছাড়া উৎসব, পানভোজন ইত্যাদি প্রমোদের প্রদর্শন নির্বিবাদে করতে পারেন পাবলিক প্ল্যাটফর্মগুলিতে, প্রশ্ন ওঠে না তার সাহিত্য নিয়ে। সমান নয়, সামান্য ছবি আপলোড করুক তো লেখালিখির সঙ্গে জড়িত কোনও নারী তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে, ‘রূপ দেখিয়ে লিখতে এসেছ’, এই ধৃতরাষ্ট্র যুক্তিতে মুহূর্তে ম্লান করে দেওয়া হবে তার মেধার দর্পণগুলিকে। নারী মাত্রেই অপরাধী। তার কলম থেকে পোশাক, মগজ থেকে শরীর— যে কোনও বিচারে নামার আগে নাকে দুর্নীতির পারফিউম লাগিয়ে নিতে ভোলে না বরাহসমাজের নন্দনেরা। সেখানে নারীর সাহিত্য পাবে প্রাপ্য সম্মান? হায় সোনার পাথরবাটি।

একলব্যকে নিয়ে দুনিয়া তোলপাড় হয়। কত নারী যে সাহিত্যিক হতে এসে সামান্য স্বাধীন শ্বাসটুকু না নিতে পেরে নীরবে পেন তুলে রাখে অথবা নীল লাল হাজার তিমির পেটে সেঁধিয়ে গিয়ে হারিয়ে ফেলে নামটুকুও, সার্ভে করলে ডকুমেন্টারি হতে পারে। কজন প্রতিষ্ঠিত পুরুষ বোয়াল অনুবাদ করিয়ে নিয়ে স্বীকৃতি দেয় নবাগত নারী অনুবাদককে? নামটুকু অবধি নিতে তাদের জিভ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে থাকে আমরণকালীন। কেউ হয়তো সম ওয়েভের সমান ক্ষেত্রের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করেন জীবনকে সাহিত্যেরই এক পাতা ভেবে। তাদের পরিণতি আরও করুণ। প্রথম লিঙ্গের ভারি নামটির ছায়ায় অধিকতর যোগ্য হয়েও আজীবন যাত্রার কাটা সৈনিকের ভূমিকায় অভিনয় করে চলার থেকে বেশি সম্মান কোনও মঞ্চই তাদের দেয় না। নাম তুললে ব্যক্তি আক্রমণের দায়ে দুষ্ট হতে হয়, মানহানির মামলা রুজু হওয়াও বিচিত্র নয়, অতএব সে কথা থাক। কেউ তো আবার মরে গিয়ে সিংহদুয়ার খুলে দিয়ে যান তার পুরুষটির সাহিত্য সাম্রাজ্যে খোলা ষাঁড়ের চামড়ায় ঢুকে পড়ার আয়োজনের। বিচিত্র এই সাহিত্য ক্ষেত্র। এখানে নারী? আর তার বঞ্চনা? কষ্টিপাথর থেকে কৃষ্ণবর্ণকে আলাদা করার কোন প্রক্রিয়া যদি থাকত, এই অধমও নিশ্চয়ই চেষ্টা করত কতভাবে আর কী কী প্রকারে সাহিত্যে নারীকে বঞ্চিত ও প্রতারিত করে রাখার কারনামা জারি আছে আদি থেকে সম্প্রতি। বরং শিরোধার্য করি চারটি বিশেষণ। একজন নারী হিসাবে এই সাহিত্য জগতে আমার প্রাপ্তি এই অমূল্য অর্জন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2946 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...