Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বেগুনি, একটি রাজনৈতিক রং

স্বাতী ভট্টাচার্য

 


পশ্চিমবঙ্গের আশা আন্দোলন কেবল কিছু বেগুনি শাড়ি পরা মেয়ের বাড়তি রোজগারের দাবিতে আন্দোলন নয়। যে মেয়েদের পাশে কেউ নেই, তারা কেবল নিজেদের শক্তিতে কতটুকু কী করতে পারে, তার পরীক্ষা চলছে উন্মুক্ত ল্যাবরেটরিতে— রাজ্যের রাস্তায়। শুধু অনুদান দিয়ে মেয়েদের ভোট পাওয়া যাবে, এই প্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকার ব্যারিকেড তৈরি করে, লাঠি চালিয়ে, কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে, সর্বোপরি স্রেফ নিষ্ক্রিয়তা দিয়ে মেয়েদের শাসন করছে। শাসকের এই রাজনৈতিক কৌশল প্রতিদিন রাজ্যবাসী, দেশবাসীর কাছে দেখাচ্ছে যে, দরিদ্র, প্রান্তিক, শ্রম-সম্বল মেয়েরা আজ সরকারের ‘প্রতিপক্ষ’। কোনও দলের ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, মেয়েদের সক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতীক তাঁদের বেগুনি শাড়ি

 

পশ্চিমবঙ্গের অর্থ-প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেছেন, আশাকর্মীদের আন্দোলন রাজনৈতিক। ঠিক বলেছেন। যে-দিক দিয়েই দেখা যাক না কেন, বেগুনি শাড়ি-পরা মেয়েদের রাস্তা কামড়ে পড়ে থাকাকে রাজনীতি করা ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। তবে কি না, ‘রাজনীতি’ শব্দটা অনেকটা ঢাকাই পরোটার মতো। কী তার স্বাদ-গন্ধ, বোঝার জন্য দাঁত ফোটালে একটা পরতের নিচে মালুম হয় আর একটা।

একেবারে উপরের স্তর হল দলীয় রাজনীতি। যে সংগঠনের পতাকার নিচে রাজ্যের সত্তর হাজার আশাকর্মীর একটা বড় অংশ ৭  জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতি শুরু করেছেন, সেই পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়ন হল এসইউসিআই-এর অনুগামী। তার নেত্রী ইসমত আরা খাতুন এসইউসিআই-এর হয়ে গত লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থীও হয়েছিলেন কৃষ্ণনগর থেকে। তৃণমূল যখন ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেছিল, তখন এসইউসিআই তার জোটসঙ্গী ছিল, বছরখানেকের মধ্যে সে জোট ভেঙে গিয়েছে। এসইউসিআই এখন বিরোধী দল। যদিও যে বিপুল সংখ্যক আশাকর্মী এখন আন্দোলন করছেন, তাঁরা সকলেই এসইউসিআই-এর কর্মী বা সমর্থক নন, তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়নকে নিজেদের দাবি আদায়ের মঞ্চ হিসেবেই দেখছেন। তাতেও তাঁদের আন্দোলনে মন্ত্রীর বিরক্তি হতেই পারে।

কিন্তু কী বলছেন তৃণমূলের আশাদিদিরা? পাঁচ হাজার টাকা বেতন, দেড় মাস মাতৃত্বের ছুটিতে তাঁরা কি সন্তুষ্ট? নাকি তাঁরাও চাইছেন ১৫ হাজার টাকা বেতন, ছ-মাসের মাতৃত্বের ছুটি, অবসরের পর পেনশন? তৃণমূলের আশাকর্মী কী ভাবছেন, তা জানার কোনও উপায় নেই। কারণ, তৃণমূলের আশাকর্মী ইউনিয়ন নেই। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী বা মিড ডে মিল ইউনিয়নও নেই। এই হল রাজনীতির দ্বিতীয় স্তর। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্কিম কর্মীদের ইউনিয়ন গড়েনি (বা গড়তে দেয়নি) দুটি দল। তৃণমূল এবং বিজেপি। আমরা জানি, কৃষি আইন থেকে শ্রম বিধি, শস্য বিমা থেকে স্বাস্থ্য বিমা, কেন্দ্রের অনেক আইন এবং প্রকল্পের বিরোধিতা করেছে তৃণমূল, অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ টাকাও প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু দরিদ্র, প্রান্তিক মেয়েরা সরকারি প্রকল্পে উদয়াস্ত কাজ করেও যে ‘কর্মী’ নয়, তা বিনা বিতর্কে মেনে নিয়েছে তৃণমূল। আন্দোলনে সামিল এক আশাকর্মীর কথায়, “কাজ করার সময়ে আমরা স্বাস্থ্যকর্মী, বেতন নেওয়ার বেলায় ভলান্টিয়ার।”

কেবল তৃণমূল নয়। যে-রাজ্যে যে-দল ক্ষমতায় রয়েছে, সে-দলই তৃণমূলস্তরের এই স্বাস্থ্যকর্মীদের ‘কর্মী’ বলে স্বীকৃতির দাবিকে খারিজ করেছে। এ-নিয়ে ক্ষমতাসীন শাসক দল আর দল-ঘনিষ্ঠ শ্রমিক সংগঠনের অবস্থানের মধ্যে বিরোধ বেধেছে। এই স্ববিরোধকে বলা চলে দলীয় রাজনীতির তৃতীয় পরত। এর উদাহরণ কেরল। শ্রমিক সংগঠন সিআইটিইউ (সিটু) দাবি করে, আশাকর্মীদের সরকারি কর্মী বলে স্বীকার করতে হবে, সেই হারে বেতন দিতে হবে। সারা ভারত আশাকর্মী ফেডারেশনের অন্যতম শরিক সিটু (বাকি সংস্থাগুলি বাম কিংবা সমাজবাদী নানা দলের)। কিন্তু গত বছর কেরলে আশাকর্মীরা যখন ২১ হাজার টাকা ভাতা, পেনশন প্রভৃতির দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন, তখন তার বিরোধিতা করেছিল পিনারাই বিজয়নের সিপিএম সরকার। কেরল সরকারের যুক্তি ছিল, কেন্দ্র ভাতা না বাড়ালে কেবল রাজ্যের পক্ষে এই ভার বহন করা সম্ভব নয়। সিটু যে এই আন্দোলনে ছিল না, তা হয়তো অপ্রত্যাশিত নয়। কেরল আশা হেলথ ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন, যারা আন্দোলনে নেমেছিল, তারা এসইউসিআই-এর সহযোগী। তাদের এক টানা ২৬৫ দিনের কর্মবিরতি, বাধার মুখে লড়াই, নাগরিক সমাজের প্রচুর সমর্থন পায়, মিডিয়াতেও যথেষ্ট কথাবার্তা হয়। শেষে কেরল দিবসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে, মাত্র হাজার টাকা ভাতা বৃদ্ধির আশ্বাসে। কেরলের ছায়া সম্ভবত পড়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মীদের আন্দোলনে সংহতি জানালেও কর্মবিরতিতে যোগ দেয়নি সিটু।

কোনও দলই এই স্ববিরোধ থেকে মুক্ত নয়। এ-বছর কেরলে বিধানসভা নির্বাচন। কংগ্রেস বলেছে, জিতে এলে আশাকর্মীদের দাবি মেনে নেবে। যদিও কর্নাটকে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে ২০২৩ সালে, এখনও অবধি আশাদের স্থায়ী কর্মীর স্বীকৃতি দেয়নি, দশ হাজার টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেনি। পশ্চিমবঙ্গে এখনও অবধি কোনও দল নির্বাচনী প্রচারে আশা, অঙ্গনওয়াড়ি, মিড ডে মিল কর্মীদের দাবি নিয়ে কথা তোলেনি। যদিও এঁদের সম্মিলিত সংখ্যা পাঁচ লক্ষের উপরে।

কী চোখে সরকার দেখছে এই পাঁচ লক্ষ মেয়েকে, সেদিকে নজর রয়েছে সব খেটে-খাওয়া মেয়ের। সম্প্রতি ক্ষেতমজুর, দিনমজুরদের সংগঠক তহমিনা মণ্ডল একটি সভায় বললেন, “আশাকর্মীরা যা চেয়েছেন, তা কোন শ্রমিক মেয়ে না চাইছে?” কেন হাড় কালি-করা পরিশ্রম করেও একটি মেয়ে সংসার চালানোর উপযুক্ত টাকা রোজগার করতে পারে না, এ প্রশ্ন সব শ্রমিক মেয়ের। অথচ মেয়েদের সমান মজুরি, ন্যায্য মজুরির দাবি ভোটের মঞ্চে উঠতে পারছে না। দলের নেতাদের ‘জমিদারি’ রক্ষার তাগিদ শ্রমিক সংগঠনগুলোকে এক হতে দিচ্ছে না। একটি উদাহরণ, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৩ মিড ডে মিল কর্মীদের আটটা সংগঠন একটা বড় সমাবেশের আয়োজন করে কলেজ স্কোয়ার চত্বরে, ইউনিভার্সিটি ইউস্টিটিউট হল-এ। ধ্বনিভোটে পাশ হয় আটটি প্রস্তাব। কিন্তু সেই প্রথম, সেই শেষ। তারপর থেকে আর এক মঞ্চে আসেনি সংগঠনগুলি। কয়েক লক্ষ শ্রমিকের দাবি এক, কিন্তু তারা কিছুতেই একজোট হতে পারে না।

একই সঙ্কট এনজিও-দের মধ্যেও। মেয়েদের উপর দখল রাখতে রেষারেষি চলে, বড় বড় নেতা-নেত্রীদের মধ্যে ইগো-র লড়াই, টাকার লড়াই বাধে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে প্রধানত এনজিও-দের উদ্যোগেই মেয়েদের ট্রেড ইউনিয়ন তৈরি হয়েছে, কাজ করছে— এলা ভট্টের ‘সেওয়া’ যার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। পশ্চিমবঙ্গে তার হয়তো একটা-দুটো দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিক পরিচয়ের স্বীকৃতি আদায়, মহাজন-ঠিকাদারের দ্বারা শ্রমজীবী মেয়েদের প্রতারণা, হয়রানির নকশার পরিবর্তনের জন্য কাজ করা, এসবের পরিবর্তে এনজিও-দের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় সরকারের ‘এক্সটেনশন অফিস’ হিসেবে কাজ করা। মেয়েদের ঋণ পাইয়ে দেওয়া, ট্রেনিং-এ জুড়ে দেওয়া, মুরগি ছানা বিতরণ, প্রভৃতি। এখন এনজিও-দের ‘পথে আনা’ আরওই সহজ হয়ে গিয়েছে— বিদেশি অনুদান বন্ধ করা, সরকারি অনুদান বাতিল করার ভয় দেখিয়ে। ফলে যে শ্রমজীবী মেয়েরা গ্রামে গ্রামে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছে ন্যায্য মজুরি, ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্য, তারাও শহরের মহিলা সংগঠনগুলির থেকে, নারী সংগঠনের মঞ্চগুলি থেকে আগের মতো আইনি সহায়তা, সাংগঠনিক সমর্থন আর পাচ্ছেন না। আপাতদৃষ্টিতে একে নাগরিক সমাজের সংকট বলে মনে হয়, এর পিছনেও রয়েছে দলীয় রাজনীতির চাপ।

এ হয়তো নতুন কথা নয়। কিন্তু পুরনো বেতও পিঠের উপর আছড়ে পড়লে নতুন করে ব্যথা লাগে। তাই দলীয় রাজনীতির কৌশল চিরে চিরে দেখার কাজ থামালে চলবে না। ভারতে ধনীতম ১০ শতাংশের হাতে দেশের ৬৫ শতাংশ সম্পদ, নিচের ৫০ শতাংশের হাতে মাত্র ৬ শতাংশ— এ যে সম্ভব হয়েছে, তার অন্যতম কারণ মেয়ে শ্রমিক, দলিত-আদিবাসী, মুসলিম শ্রমিকের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলির ব্যবহার। সেদিকে তাকালে চোখে পড়ে রাজনীতির পরবর্তী স্তরটি— দলীয় রাজনীতির শিবির যখন আলাদা, তখনও হেঁশেল এক। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার কেন্দ্রের শ্রম বিধি গ্রহণ করেনি। চারটি শ্রম বিধির বিরুদ্ধে একটি প্রধান যুক্তি, সেগুলি অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের, স্বনিযুক্ত কর্মীদের ‘শ্রমিক’ বলে স্বীকার করছে না। তা হলে কি তৃণমূল সরকার অসংগঠিত, স্বনিযুক্ত শ্রমিকদের ‘শ্রমিক’ মর্যাদা দিতে আগ্রহী? গৃহপরিচারিকাদের প্রতি এ-রাজ্যের শ্রম দপ্তরের ব্যবহার দেখলে তা মনে হয় না। পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি ছিল এ রাজ্যের একমাত্র গৃহপরিচারিকা সংগঠন যা ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ স্বীকৃতি পেয়েছিল (২০১৮)। সম্প্রতি চিঠি লিখে সেই স্বীকৃতি খারিজ করে শ্রম দপ্তর লিখেছে, যেহেতু গৃহপরিচারিকাদের নির্দিষ্ট মালিক নেই, তাই শিল্পক্ষেত্রে বিরোধ আইন (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপুটস অ্যাক্ট, ১৯৪৭) অনুসারে তাদের শ্রমিক সংগঠন বলে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না। যুক্তিটা ধোপে টেকে না— বেশ কিছু রাজ্যে গৃহশ্রমিকদের সংগঠন শ্রমিক সংগঠন হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। উদাহরণ, কর্নাটক ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন, দিল্লি ঘরেলু কামগার সংগঠন। এ-রাজ্যে গৃহপরিচারিকারা একের পর এক সংগঠন তৈরি করেছে, ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে নথিভুক্তির আবেদন করেছে। গ্রাহ্য করেনি শ্রম দপ্তর। অসরকারি সংগঠন হিসেবে নথিভুক্তিতে বাধ্য হয়েছে মেয়েরা।

তা হলে শ্রমজীবী মেয়েদের পরিস্থিতিটা দাঁড়াচ্ছে কী? রাজনৈতিক দলগুলি তাদের মজুরি বৃদ্ধি, যৌন হয়রানি থেকে মুক্তি, ক্রেশ-শৌচাগার প্রভৃতির দাবিকে পাত্তাই দিচ্ছে না। তৃণমূল, বিজেপির মতো দল অসংগঠিত ক্ষেত্রের মেয়ে-কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ছে না। বামপন্থী, সমাজবাদী বা অন্যান্য কিছু দল যখনও বা গড়ছে, তখনও তাদের মহিলা শাখা প্রায়ই থাকে দলের প্রধান চালকদের ইচ্ছার অধীনে, নিজস্ব কর্মসূচি নেওয়ার ক্ষমতা তাদের অনেকের থাকে না। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি মেয়েদের দাবিগুলো মুখে সমর্থন করলেও কাজের বেলায় পাত্তা দিচ্ছে না— উদাহরণ, পশ্চিমবঙ্গের চটকল মালিকদের সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি (২০২৪) সই করল ট্রেড ইউনিয়নগুলো, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটিকে (আইসিসি) রাখল চুক্তির শর্তাবলির বাইরে। চা বাগানে মেয়েরা বোনাস, পিএফ-এর জন্য আন্দোলন করলে প্রধান ট্রেড ইউনিয়নগুলো মেয়েদের উপরেই চাপ তৈরি করে আন্দোলন প্রত্যাহার করার। ট্রেড ইউনিয়নগুলির মহিলা শাখা যেখানে আছে, সেখানেও তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সামান্যই। প্রায়ই দেখা যায়, অন্য মেয়েদের সঙ্গে হাত মেলানোর সিদ্ধান্ত নিতেও উপরের নেতাদের অনুমোদন লাগে। আবার দলীয় রাজনীতির কাঠামোর বাইরে শ্রমজীবী মেয়েরা যে নিজেদের শক্তিতে ইউনিয়ন তৈরি করে সাধ্যমতো লড়াই করবে, তার পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সরকার— হয় ইউনিয়ন নথিভুক্ত করছে না, না হলে দলের দুষ্কৃতি, পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে হয়রান করছে।

এই প্রেক্ষিত থেকে দেখলে পশ্চিমবঙ্গের আশা আন্দোলন কেবল কিছু বেগুনি শাড়ি পরা মেয়ের বাড়তি রোজগারের দাবিতে আন্দোলন নয়। যে মেয়েদের পাশে কেউ নেই, তারা কেবল নিজেদের শক্তিতে কতটুকু কী করতে পারে, তার পরীক্ষা চলছে উন্মুক্ত ল্যাবরেটরিতে— রাজ্যের রাস্তায়। শুধু অনুদান দিয়ে মেয়েদের ভোট পাওয়া যাবে, এই প্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকার ব্যারিকেড তৈরি করে, লাঠি চালিয়ে, কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে, সর্বোপরি স্রেফ নিষ্ক্রিয়তা দিয়ে মেয়েদের শাসন করছে। শাসকের এই রাজনৈতিক কৌশল প্রতিদিন রাজ্যবাসী, দেশবাসীর কাছে দেখাচ্ছে যে, দরিদ্র, প্রান্তিক, শ্রম-সম্বল মেয়েরা আজ সরকারের ‘প্রতিপক্ষ’। কোনও দলের ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, মেয়েদের সক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতীক তাঁদের বেগুনি শাড়ি। যাঁদের উন্নয়ন সরকারের কাজ, যাঁরা নিজেরা উন্নয়নের জন্য দেশের সংগ্রামের পদাতিক বাহিনী, সেই মহিলা কর্মীরা সরকারি ক্ষেত্রে কাজ করেও অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী হয়ে রয়েছেন। তাই তাঁদের শ্রমের দাম, কর্মীর সম্মান পাওয়ার লড়াইয়ের মধ্যে দেশের সব অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মেয়ে নিজেদের সম্মান পাওয়ার আশাকে দেখতে পায়। বেগুনি রঙের শাড়ি সরকারই দিয়েছিল এই মেয়েদের, আজ তা হয়ে উঠেছে শ্রেণিরাজনীতি, লিঙ্গরাজনীতির প্রতীক। বেগুনি শাড়িদের রুখতে রাষ্ট্র নিজের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করছে। কাকে বাঁচাতে? কার স্বার্থ রক্ষা করতে? নিজেদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে সারা দেশকে এই প্রশ্নটি করতে বাধ্য করছেন আশাকর্মীরা। যা এক প্রকাণ্ড রাজনৈতিক প্রশ্ন।


*মতামত ব্যক্তিগত