Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আমার ভয় হয়, তিতিক্ষা…

সৈকত ব্যানার্জী

 


আমার ভয় হয় তিতিক্ষা সেই আয়নায় আমি নিজেকে দেখে ফেলব। দেখব ঢাকা শহরের রাজপথ অলিগুলি বাড়িঘরগুলো রূপ বদলে হয়ে যাচ্ছে মেট্রোপলিটান কলকাতা। দেখব বিশ শতক ছয়ের দশকের পূর্ব-পাকিস্তান ফের-বদল করে হয়ে উঠছে একুশ শতক দুই দশকের ভারতবর্ষ। দেখব খুনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে আমি হাতড়ে বেড়াচ্ছি অলিগলি, খুনযোগ্য একটা দেহের সন্ধানে

 

তিতিক্ষা, একদিন বুক ঝিম হয়ে আসা সন্ধেবেলায় তোমাকে বলেছিলাম, আজকাল আমি কোনও উপন্যাস পড়তে পারি না। পড়তে গেলে মনে হয়, উপন্যাসের চরিত্ররা তাদের যাবতীয় দীর্ঘশ্বাস আর ক্লান্তি আমার দিকে ছুড়ে দিচ্ছে। যত চরিত্রের ভিড়, তত দীর্ঘশ্বাস। এত এত ভিড়েও সব চরিত্রদের আমার একলা লাগে। মনে হয় নিজের নিজের না-ভালো থাকাগুলো নিয়ে এরা পাঠক নামের এক একজন ঈশ্বরের কাছে প্রশ্ন করছে, এই চেয়েছিলে বুঝি? আর আমি ক্রমশ তাদের ক্লান্তিগুলোকে বইয়ের অক্ষর থেকে তুলে গুছিয়ে রাখতে থাকি আনাচেকানাচে। ক্লান্তি-দীর্ঘশ্বাস-হতাশা, হতাশা-দীর্ঘশ্বাস-বিষাদ উপন্যাসের সব চরিত্ররা কখন কে জানে আমি হয়ে যায় তিতিক্ষা। আর আমি নিজেই উপন্যাসের কোনও কদাকার চরিত্র। নিজেকে পড়তে পড়তে আরও একলা হয়ে যাই৷ পড়তে ভালো লাগে না কিছুতেই… তবু…

তবু আমাকে যে কিছু অক্ষরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতেই হবে! অক্ষরের ভিড় থেকে তুলে আনতে হবে বিষবিষে নীল মানুষ, তাদের মাটি আঁচড়ানো নখের ভেতরের ময়লা আর প্রতিরাতের না-ঘুমোনো দুঃস্বপ্ন। তাদের দমবন্ধ হয়ে আসা বিস্ফারিত চোখে ভালোবাসা খোঁজার আকুতি আর সেই খোঁজকে কুপিয়ে খুন করা বাস্তবতা। ভালোবাসতে-বাসতে কীভাবে খুন করার আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে ভেতরে, আর প্রবল একটা ঝড়ের মতো সেই খুনের আকাঙ্ক্ষা কাউকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আমাকে যে জানতেই হবে। নিকষ অন্ধকারের সেই উপন্যাসের সামনেই এসে দাঁড়াতে হবে আমাকে, যে উপন্যাস আমি পড়তে চাই না কিন্তু যে উপন্যাস আমি পড়বই— হুমায়ুন আজাদের একটি খুনের স্বপ্ন

 

ছয়ের দশক। পূর্ব পাকিস্তান। ঢাকা শহর। অর্ধেক শতাব্দী আর বদলে যাওয়া মানচিত্র পেরিয়ে আমি উঁকি দিচ্ছি উপন্যাসের পটে। আর আশ্চর্য হচ্ছি, আতঙ্কিতও কিছুটা, কারণ আমি কথকের চলনে-বলনে, জেগে থাকা খামখেয়ালে বারবার আবিষ্কার করছি একুশ শতকে কলকাতার অলিতে-গলিতে যন্ত্রণা বমি করতে করতে ঘুরতে থাকা আমিকে। অন্ধরাগে কাউকে একটা খুন করতে চাওয়া, খুনের স্বপ্নে বুঁদ হয়ে শান্তি পেতে চাওয়া এক যুবককে। প্রতিদিনের খাওয়া-পড়া-ঘুম, সুখ-বিষ-অপেক্ষা, সাফল্য-ব্যর্থতা-হতাশা আর অন্তহীন একঘেয়ে বিষাদ, যে বিষাদের অন্তে কোনও নির্মল কাব্য উপহার হয়ে নেই, অন্তই নেই আসলে যার কোনও— তাই দিয়ে গড়ে উঠছে উপন্যাসের বয়ান। আইয়ুব খানের অধীনস্থ পাকিস্তানের জরাগ্রস্ত ঢাকা শহরে একটা খুন করার স্বপ্ন বুকে নিয়ে একা একা ঘোরে আমাদের উপন্যাসের বিষাদমগ্ন কথক। নিজেও জানে না সে কোন বিষাদ আর ভেঙেচুরে যাওয়া থেকে উঠে আসছে তার স্বপ্ন। আমরা কে-ই বা কবে বুঝে উঠতে পারি তিতিক্ষা আমাদের বিষাদের উৎস! ব্যক্তিগত যন্ত্রণার নদীগুলো কোন সমষ্টির গুহা থেকে বেরিয়ে আসে তা ঠাওর করতে পারি কই? কথকও পারে না৷ সে শুধু জানে এই ধুলোমলিন শহরে তার জন্যও একবার নেমে এসেছিল প্রেম। তার সাদাকালো দৈনন্দিনকে পাল্টে দিয়েছিল এক ঝটকায়। সঙ্গ পাওয়ার সুখ আর না-দেখতে পাওয়ার অসুখ, ছুঁতে পারার মধু আর না-পারার বিষ— এই দিনলিপিতেই ভরে যাচ্ছিল তার মাস, বছর।

পূর্ব-পাকিস্তান কিন্তু তখন এক জায়গায় থেমে নেই। ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ঢাকা শহর, বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের যাত্রাপথের অকথিত সংঘর্ষেরা দানা বাঁধছে থেকে থেকে। কখনও কলেজ বন্ধ হচ্ছে। কখনও ছাত্রলিগের আর এপসুর কর্মীদের ওপর চড়াও হচ্ছে এনএসএফের গুণ্ডাবাহিনী। কখনও কথক নিজের অভিজ্ঞতাতেও দেখতে পাচ্ছে এনএসএফ নেতাদের বিকৃত যৌনতা, যে যৌনতা আসলে হয়ে উঠছে ক্ষমতার ভাষা। কিন্তু কথক জানে, “এসবে আমার কিছু যায় আসে না, আমি মিছিলের নই, শ্লোগানের নই, বইয়ের এবং সুফিয়ার; গতকাল সুফিয়াকে পড়েছি, বই পড়া হয়নি, আজ প’ড়ে সেটুকু পুষিয়ে নিচ্ছি, আগামীকালের স্বপ্ন দেখছি।” সুফিয়ার প্রতি কথকের প্রবল টান, সুফিয়াকে ছুঁতে চাওয়ার আদিম তাড়না একদিকে যেমন কথককে বিভোর করে রাখে, আরেকদিকে এনএসএফ-এর ক্ষমতাবান বন্ধুদের উদগ্র প্রেমহীন পুরুষতান্ত্রিক যৌনতা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। অস্বস্তির ফলে চলতে থাকে তার ক্রমাগত অবদমন, “কিন্তু আদিম দেবতা তার প্রত্ন আদিম রূপের মতোই আদিম, সে একবার বলি পেলে আরো বলির জন্য ব্যগ্র হয়ে থাকবে, না পেলে চারপাশ লণ্ডভণ্ড করবে, তা আমি চাই না; তাকে আমি ঘুমিয়ে রাখবো, সময় হলে সে জাগবে কবি হয়ে দস্যু হয়ে।” এই অবদমন বুঝি তাকে আরও ভরিয়ে তোলে বিষাদে, পেয়েও না-পাওয়ার যন্ত্রণায়। আর সে আরও প্রতি মুহূর্তে হাতড়ে-পাতড়ে খুঁজতে থাকে সুফিয়াকে। তার মনে হয় সুফিয়া ‘একটি পৃথিবীকে পূর্ণ করার পর অজস্র মহাবিশ্বকে শূন্য করে তোলে।’ সুফিয়াকে ছুঁতে ছুঁতে, আদর দিতে দিতে আরও বেশি করে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষায় তার এই বিষাক্ত শহর আর চেনা পরিধি থেকে অনেক দূরে চলে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কথক জানে “যেখানে যাবো সেখানেই অশ্লীল পূর্ব পাকিস্তান, সেখানেই প্রেমের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ।” তাই কলেজে ক্লাস চলাকালীন কখনও যেমন সুফিয়ার থেকে চোখ সরানো সম্ভব হয় না কথকের, মনে হয় সুফিয়া বুঝি এক রহস্যময় জাদুকর যে চিরকাল কথককে ইন্দ্রজালের মধ্যে সম্মোহিত করে রাখবে, তেমনি কখনও তার মনে হয় সেই সুফিয়াই যদি তাকে বেরিয়ে রিকশায় করে আবার ঘুরতে নিয়ে যেতে বলে তাহলে ফাঁকা পকেট নিয়ে সেই ইচ্ছাপূরণ করতে পারবে না সে। এই ভাবনা মাথায় এলে কথকের সুফিয়ার দিকে তাকাতে ইচ্ছা করে না। তাকালে শুধু অন্ধকার দেখতে পায়। এই ভালোবাসা-দ্বিধা-আকাঙ্ক্ষা-অপেক্ষা-হতাশা নিয়ে চলতে চলতে সুফিয়ার কাছেই দাগা খায় কথক। বিশ্বাসঘাতকতায় ভেঙেচুরে তছনছ হয় তার নিজের জন্য গড়ে নেওয়া পৃথিবী৷ প্রেমে ধ্বংস হতে হতে সে স্বপ্ন দেখে খুন করার। অসম্ভব এক নির্দেশের মতো সেই স্বপ্ন তাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে।

কাকে খুন করবে কথক? তার প্রেমিকাকে? প্রেমিকা যার জন্য তাকে দাগা দিয়েছে, তাকে? নিজেকে? হৃদয়হীন, বিষাক্ত পূর্ব-পাকিস্তানকে? আইয়ুব খানকে? পচাগলা এই সমাজের কাঠামোকে? জানে না কথক। ঘা-পুঁজ-বমিতে ভরা এই ব্যবস্থার ওপরে শুধু জ্বলে থাকে আহত এক প্রেমিকের খুন করতে চাওয়ার স্বপ্ন।

এই উপন্যাসের দিকে তাকালে নির্মল ভালোবাসাবাসির পর্দাটা সরে গিয়ে উঠে আসে নিষ্ঠুর এক বাস্তবতার আয়না, আমার ভয় হয় তিতিক্ষা সেই আয়নায় আমি নিজেকে দেখে ফেলব। দেখব ঢাকা শহরের রাজপথ অলিগুলি বাড়িঘরগুলো রূপ বদলে হয়ে যাচ্ছে মেট্রোপলিটান কলকাতা। দেখব বিশ শতক ছয়ের দশকের পূর্ব-পাকিস্তান ফের-বদল করে হয়ে উঠছে একুশ শতক দুই দশকের ভারতবর্ষ। দেখব খুনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে আমি হাতড়ে বেড়াচ্ছি অলিগলি, খুনযোগ্য একটা দেহের সন্ধানে। এই উপন্যাস তাই পড়তে ভয় করে। তবু এই উপন্যাস যে পড়তেই হবে আমাকে। তার আরেক কারণ হুমায়ুন আজাদ।

 

পাক সার জমিন সাদবাদ-এর লেখক হুমায়ুন আজাদ। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল বাংলাদেশ জুড়ে যিনি মৌলবাদের বারবার মাথাচাড়া দেওয়া দেখতে পান। ছারখার হতে দেখেন সংখ্যালঘু মানুষের জীবন৷ ধর্মের বিষ যখন ছড়িয়ে পড়ে রন্ধ্রে রন্ধ্রে তখন মানুষ কীভাবে হয়ে ওঠে পিশাচ আর যৌনতা কীভাবে হয়ে ওঠে কেবলই নির্লজ্জ ধর্ষকাম তার গল্প বুনেছেন হুমায়ুন আজাদ। একের পর এক। বিদেশে থাকাকালীন মৌলবাদীদের হাতে তাই খুন হতে হয়েছে আজাদকে। খুনির হদিশ মেলেনি আজও। হুমায়ন আজাদ পড়তে পড়তে আমার মনে হয় ধর্মান্ধতায় তলিয়ে যেতে থাকা বাংলাদেশের মতোই বুঝি হয়ে উঠছে এই ভূতে-পাওয়া ভারতবর্ষ। ধর্মের নামটুকুই যা আলাদা। যেখানে আট বছরের আসিফাকে ধর্ষণ করতে করতে জেগে ওঠে বীর হিন্দুত্ব, সেই দেশ কি খুব আলাদা হতে পারছে হুমায়ুন আজাদের দেশের থেকে? যেখানে দশ বছরের এক নাবালিকার মা ইসলাম মৌলবাদীদের কাছে হাত জোড় করে বলে “হুজুর, আমার মাইয়াডা কচি, আপনেরা একজন একজন কইর‍্যা যান” (পাক সার জমিন সাদবাদ)। হুমায়ুন আজাদের লেখায় বাংলাদেশকে পড়তে পড়তে শিউরে উঠতে হবে অনিচ্ছাতেও সেখানে ভারতবর্ষকে আবিষ্কার করে ফেলে। আর একটি খুনের স্বপ্ন পড়তে পড়তে মনে হবে এনএসএফের নেতাদের উদ্দাম ক্ষমতা প্রদর্শন আর এ-দেশের কলেজ কমনরুমে হালফিলে দাদাদের দেদার মনোরঞ্জনে ফারাক নেই বিশেষ। মনে হবে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া কথককে আমি দেখতে পাব আমার পাড়ার মোড়ে, রাস্তায়, গলিতে, ঘরের আয়নাতেও, বুক ভরা ঘেন্না আর মাথাভরা বিষাদ নিয়ে যে রাতের অন্ধকারে হেঁটে চলেছে খুন করবে বলে। কাকে খুন করবে, কাকে মারলে শান্ত হবে তার যন্ত্রণা সে জানে না, কিন্তু খুন একটা তাকে করতেই হবে। নয়তো এ প্রবল দহন তার যাবে কোথায়? ওই দহনের সামনে দাঁড়াতে আমার ভয় করে তিতিক্ষা৷ ওই যন্ত্রণাকে পড়তে ভয় করে একা। তবু ওই যন্ত্রণাতেই যে আমি আমাকে দেখতে পাই। ওই নিষ্ঠুর উপন্যাসের হাত থেকে আমার মুক্তি নেই। ঠিক ওই খুনের স্বপ্নের মতোই। তাই আমাকে যে পড়তেই হবে। পড়বে আমার সঙ্গে?