সৈকত ভট্টাচার্য
পূর্ব প্রকাশিতের পর
স্বপ্ন দেখছিলাম। চেন্নাইতে আমাদের বিখ্যাত বাঙালি খাবার জায়গা ‘পেটুক’-এ খেতে গেছি। ওখানে থাকাকালীন এত কম মাইনে পেতাম যে বড়সড় ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁতে রোজ রোজ খাওয়ার রেস্ত পকেটে থাকত না। তার উপর দক্ষিণদেশে কেই বা গুছিয়ে মুগডাল, আলুপোস্ত, ছানার ডালনা, ডিমের ঝোল, কিংবা মাটন কষা বানিয়ে দিচ্ছে! অথবা রবিবার-রবিবার একদম কলকাতার কায়দায় আলু, আলুবোখরা সম্বলিত মাটন বিরিয়ানি! ফলে পেটুক আমাদের রোজকার খাওয়ার জায়গা ছিল। স্বপ্নে তাকে দেখে তাই একটুও অবাক হলাম না। অবিশ্যি স্বপ্নে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস দেখেও কখনও অবাক হয়েছি বলে মনে পড়ছে না! যাই হোক, দেখলাম যে পেটুকে গেছি বিরিয়ানি খেতে। জয়দা সেখানে বিরিয়ানি শেফ। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এখানে কবে জয়েন করলে? বলল, এই তো এআই দিয়ে বিরিয়ানি বানানোর জন্য আমাকে হায়ার করেছে। এর মধ্যে মঞ্জুশ্রী কোথা থেকে এসে হাজির হয়েছে। ও নাকি পেটুকের উল্টোদিকেই বাড়ি নিয়েছে। সঙ্গে তিনটে গেঁড়ি বাচ্চা। আমি বললাম, তোর তিনটে বাচ্চা? বলছে, না, আমার না। এরা আমার সঙ্গে থাকে। আমি এদের পড়াই। হঠাৎ মনে পড়ল শুভকে তো দেখছি না! জয়দাকে জিজ্ঞেস করলাম। সে উত্তর না দিয়ে মিটিমিটি হাসছে আর বিরিয়ানির হাঁড়ির মধ্যে হাতা দিয়ে কী যেন নাড়ছে। এমন সময় হাঁড়ির মধ্যে থেকে অবিকল শুভর গলায় কে একটা বলে উঠল, ক্ষুধিতম্…
স্বপ্নটা কতক্ষণ চলত জানি না কিন্তু ঘুমটা ভেঙে গেল। সকাল হয়ে গেছে। সাতটা বাজে। কিন্তু বাইরে মেঘলা। ফলে আলো কম। দেখে মনে হচ্ছে খুব ভোরবেলা উঠে পড়েছি। র্যাপারটা সরিয়ে উঠব কি না ভাবছি এমন সময় বাইরের ঘর থেকে আবার অমন একটা গমগমে গলায় কে যেন বলে উঠল, ক্ষুধিতম্। এই সকাল সাতটার সময় কে আবার ক্ষুধিত হয়ে পড়ল! কৌতূহল নিরসনের জন্য শেষমেশ বিছানার সঙ্গে সম্পর্কটা ছিন্নই করলাম।
বাইরের ঘরে এসে দেখি শুভ আর জয়দা বসে ল্যাপটপে কীসব করছে। আর আমি সেখানে ঢুকতেই ল্যাপটপটা আবার বলে উঠল— ক্ষুধিতম্।
—কী শুরু করেছ তোমরা সকাল সকাল? ঘুমভাঙা গলায় অনুযোগ করলাম।
আমার গলা শুনে দুজনের কেউই খুব একটা পাত্তা দিল না। শুধু শুভ আমার দিকে না তাকিয়েই বলল, হেব্বি মজার জিনিস বানিয়েছে জয়দা।
কৌতূহল হতে দুজনের ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখি ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা মুখ, কিছুটা শুভর মতো দেখতে। সে থেকে থেকে ক্ষুধিতম্ বলে উঠছে।
—এটা আবার কী? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
—একটা নিরীহ মজা। এবার জয়দা উত্তর দিল।
—কীরকম?
—এর পিছনে দুটো এআই মডেলের অবদান রয়েছে। একটা টেক্সট টু ভয়েস— অর্থাৎ আমি এই শব্দটা লিখে দিয়েছিলাম, এআই সেটাকে উচ্চারণ করে দিচ্ছে। আর দুই, ইমেজ টু ইমেজ। আমি শুভর একটা ছবি আপলোড করে বলেছিলাম যে একে সপ্তম শতাব্দীর মামল্লপুরমের পাথরের মূর্তির মতো করে দাও। সে মামল্লপুরম-টুরম অতশত বুঝেছে কি না জানি না, কিন্তু এই মুখটা বানিয়ে দিয়েছে— মন্দ না। কী বলিস?
—হ্যাঁ, সে তো মন্দ নয়। কিন্তু এসব কেন করছ? কাজকর্ম নেই তোমাদের?
—নেই কাজ তো খই ভাজ!
বুঝলাম এরপর বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তাই অগত্যা পোলাপানদের ছেড়ে দিয়ে আমি বাথরুমের দিকে পা বাড়ালাম।
বিকেলবেলা অফিস থেকে ফিরে দেখি সকালের জয়দার সেই ফুরফুরে মেজাজ একেবারে উধাও। কপালে গোটা বিশেক ভাঁজ ফেলে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। আমি সুযোগ পেয়ে একটু ফুট কাটতে ছাড়লাম না— কী গো? খই ভাজা শেষ?
—সে তো সকালেই শেষ— কিন্তু তোর মুখে তো দেখছি কথার খই ফুটছে! স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল জয়দা।
—অফিস যাওনি?
—নাহ, ওয়ার্কিং ফ্রম হোম। এদিকে আয়— বলে জয়দা ডাকল।
আমি গিয়ে দেখি স্ক্রিনে পাশাপাশি দুটো ভিডিও চলছে। একই রাস্তার দুটো আলাদা সময় রেকর্ড করা ফুটেজ।
—এটা কী?
—সিসি ক্যামেরার রেকর্ডিং। এই যে রাস্তার ছবিটা দেখছিস, গণ্ডগোলটা এখানেই হয়েছে। ডানদিকেরটা যখন সিগন্যাল ঠিকঠাক কাজ করছিল আর বাঁদিকেরটা যখন সিগন্যাল বিগড়েছে। পার্থক্য কিছু চোখে পড়ছে?
আমি মিনিটখানেক খুব মন দিয়ে দেখার চেষ্টা করে বললাম, পার্থক্য তো অনেক কিছুই। মানে, আলাদা আলাদা রকমের গাড়ি সব। লোকজনের চলাচলের প্যাটার্ন আলাদা।
—ঠিক ঠিক… সেটাই মুশকিল হয়েছে রে। পার্থক্য এতটাই যে কোনটা যে কালপ্রিট সেটাই বোঝা মুশকিলের।
—মানে?
—মানে, আমাদের মডেল খাসা কাজ করছে, সিস্টেম লগে কোনও ত্রুটি নেই— অর্থাৎ কিনা সফটওয়্যারের গণ্ডগোলে আমাদের সিগন্যালিং সিস্টেম বিগড়োয়নি। মডেলের প্রেডিকশন অনুযায়ী ঠিকভাবে সিগন্যাল অন আর অফ করেছে। তাহলে গণ্ডগোলটা হল কী করে? এমন কিছু একটা আছে যেটা মডেলকে ভুল অনুমান করতে বাধ্য করেছে। সেটা কী?
—কিন্তু একটা কথা বলো, মডেল ভুল অনুমান করলেও তোমাদের সফটওয়ারের সেফটি ফিচার একসঙ্গে দুদিকে সিগন্যাল সবুজ করে দেওয়াতে বাধা দেবে না? মানে, এটাতে তো অনুমানের কিছু নেই, এটা কখনওই হতে পারে না। অতএব…
—গুড কোয়েশ্চন। এখানেও সে ব্যবস্থা আছে। একটা ফেইলিওর সেফটি লজিক বা বাংলায় বললে যদি এআই মডেল গড়বড় করে দুদিকের সিগন্যাল একসঙ্গে সবুজ করার সঙ্কেত দেয়, তাহলে সফটওয়্যার সিস্টেম মানা করবে। কিন্তু ওইখানে একটা ছোট্ট ফাঁক থেকে গেছিল। সিগন্যালিং সিস্টেম তো চব্বিশ ঘণ্টাই চলছে। এবার কোনও আপডেট করতে হলে কী করে করবে? যেমন তোর মোবাইলের কোনও অ্যাপ যদি আপডেট হয়, তাহলে অ্যাপটা বন্ধ হয়ে ফের চালু হয়, তাই না? কিন্তু এক্ষেত্রে তার উপায় নেই। কারণ ট্রাফিক সিগন্যালকে তো বন্ধ রাখার উপায় নেই। অতএব চালু থাকতে থাকতেই তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। আমরা যেটা করেছিলাম সেটা হচ্ছে যে, নির্দিষ্ট কিছু ফিচারকে বন্ধ রেখে গোটা সিস্টেমটাকে আপডেট করার রাস্তা রেখেছিলাম একটা। আর সেই ফিচারের মধ্যে ছিল এই ফেইলিওর সেফটি লজিকটা। আমরা ভেবেছিলাম যে কয়েক মিনিটের জন্য ওটা বন্ধ রাখলে সমস্যা কিছু হওয়ার কথা নয়। আর বাইরের কারও সেই ফাঁকের কথা জানারও কথা না। কিন্তু সেই ফাঁক গলেই যে এমন কালসাপ ঢুকে পড়বে, কেই বা জানত!
—তার মানে, ওই যে কয়েক মিনিটের জন্য ওই সেফটি ফিচারটা বন্ধ ছিল ঠিক সেই সময়টাতে তোমাদের এআই মডেলকে ভুল করতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে? হ্যাকিং নাকি?
—নাহ, প্রথমে আমরাও হ্যাকিং ভেবেছিলাম। কিন্তু সিস্টেম লগ চেক করে দেখেছি কোথাও তার কোনও চিহ্ন নেই। মডেল যা ডেটা পেয়েছে, সেই অনুযায়ী একদম সঠিক অনুমান করেছে… আরে! এটা কী?
কথা বলতে বলতেই জয়দা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল। আমি দেখলাম সেই একই রাস্তার ছবি— দু-চারটে গাড়ি, একটা জলবাহী ট্যাঙ্কার, গোটা পাঁচেক অটো, আর একটা কোনও বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংওয়ালা টেম্পো।
জিজ্ঞেস করলাম, কী হল?
—এই দ্যাখ। রিওয়াইন্ড করছি। সিগন্যাল লাল রয়েছে। এবার মন দিয়ে দ্যাখ। এই যে টেম্পোটা— কী একটা বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং নিয়ে যেই ফিল্ড অফ ভিউয়ের মধ্যে ঢুকল, সিগন্যাল সবুজ হয়ে গেল।
—তাই তো! এই টেম্পোটাতে কী এমন আছে?
—বিষ! বেশ চিন্তিত গলায় উত্তর দিল জয়দা।
—কীসের বিষ?
—বললুম যে— কালসাপের।
বলে একেবারে স্পিকটি নট হয়ে সার্ভারে লগ ইন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমিও আর উত্তর পাব না বুঝে মানে মানে কেটে পড়লাম।
শুভ আর মঞ্জুশ্রী যখন বাড়ি ফিরল তখন আটটা বেজে গেছে। আমি নেটফ্লিক্সে একটা সিরিজ দেখছিলাম। জয়দা সেই থেকে দরজা বন্ধ করে কী যে করছে খোদায় মালুম। রবিঠাকুর এসে রান্না করে চলে গেছে এর মধ্যে। আজের রাতের মেনু গরম গরম পরোটা আর পাঁঠার কিমা দেওয়া ঘুঘনি। গন্ধেই দিল একেবারে গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেছে। একটু চেখে দেখব কি না সেটা নিয়ে বেশ একটা অন্তর্দ্বন্দ্বে ছিলাম। এর মধ্যে শুভরা ঘরে ঢুকল আর আমার মানসিক ঘাত-প্রতিঘাত লোকলজ্জার ভয়ে থিতিয়ে গেল।
শুভ ঘরে ঢুকেই এক বুক গন্ধ নাকে টেনে, আহ, কী খোশবাই! বলে কেমন একটা ভাবুক হয়ে গেল। মঞ্জুশ্রী ইশারায় আমায় জিজ্ঞেস করল জয়দা কই? আমি বন্ধ দরজাটা দেখাতে যাব এমন সময় ভদ্রলোক নিজেই অন্দরমহল থেকে বাহিরমহলে আত্মপ্রকাশ করলেন।
—তোরা এসে গেছিস? গুড, তাহলে ডিনারটা সেরে ফেলা যাক। যা খুশবু বের হয়েছে কাজে মন দেওয়া যাচ্ছে না!
—কী এমন গোপন কাজ করছ? পরোটা দিয়ে কিমা মেশানো ঘুঘনি জড়িয়ে মুখে দিতে দিতে মঞ্জুশ্রী জিজ্ঞেস করল।
জয়দা অর্ধনিমীলিত নয়নে চিবোতে চিবোতে একটু পজ নিয়ে উত্তর দিল, খড়ের গাদায় সূঁচ খুঁজছিলাম। এখন সূঁচ তো পেয়ে গেছি, সেটা ফাল হয়ে কী করে বের হল, সেইটার সন্ধান করছি।
আমরা তিনজনেই এর ওর মুখের দিকে চেয়ে বুঝলাম যে কেউ কিছুই বুঝিনি। বললাম, কীসব বলছ! সূঁচ ফুঁচ…
—সূঁচ-ফুঁচ! জয়দা খাবার চিবোনো বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল। সূঁচকে এমন অচ্ছেদ্দা কোরো না হে। ম্যাগনেটিক নিডল কত নাবিককে দিশা দেখিয়েছে জানো! জ্যামিতিক সম্ভাবনাতত্ত্বের প্রথম ভাবনা মাথায় এসেছিল একটা সূঁচের থেকে— জানো এসব!
বুঝলাম জয়দা এখন ঘনাদা মোডে। বললাম, জানানোর জন্য তো তুমি আছ। আমাদের জ্ঞানোজ্জ্বল করো।
জ্ঞানোজ্জ্বল করার কথা শুনে জয়দার চোখটা জ্বল জ্বল করে উঠল। একটা শসার টুকরো নিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল, জর্জ-লুই লেক্লে কোঁত দি ব্যুফোঁর নাম শুনেছিস?
শুভ খাবার খাওয়া থামিয়ে হাঁ করে বলল, এটা পুরোটা একজন লোকের নাম?
—তা না তো কী? তখনকার দিনে সবই বোম্বাই সাইজের হত।
—কে এই ক্যাঁৎ দি গুঁফো না কী বললে! শুভ আবার বলে।
সামনে খাবার না থাকলে জয়দা বোধহয় ক্যাঁৎ করে একটা লাগিয়েই দিত শুভকে। অনেক কষ্টে সেটা সংবরণ করে বলল, সতেরোশো সাত সালে জন্ম। ফরাসি বুদ্ধিজীবী। ভদ্রলোক প্যারী নগরীর বোটানিক্যাল গার্ডেনের ডিরেক্টর ছিলেন। সেখানে তাঁর মূর্তি এখনও গেলে দেখা যায়। পরে চাঁদের একটা খাদের নামও দেওয়া হয় তাঁর নামে। এঁর চ্যালাদের একজনের নাম শুনে থাকবি তোরা— জাঁ-ব্যাপ্তিস্ত লামার্ক। শুনেছিস?
সঙ্গে সঙ্গে আমি আর মঞ্জুশ্রী ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ করে মাথা নাড়লাম। ইশকুলে জীবনবিজ্ঞানে বিবর্তনের চ্যাপ্টারে ডারউইনের পাশে এই ভদ্রলোকের নাম পড়েছিলাম, মনে পড়ল।
—গুড। যাই হোক, ভদ্রলোক কিন্তু গাছগাছড়ার বাইরেও গণিতজ্ঞ হিসাবেও খ্যাতি পেয়েছিলেন বেশ। তিনি একটা মজার প্রবলেমের কথা ভেবে বের করেন। এক ছটাক ক্যালকুলাসের সঙ্গে দুই ছটাক সম্ভাবনাতত্ত্বের মিশেলে প্রথম জ্যামিতিক সম্ভাবনাতত্ত্বের কথা মাথায় আসে তাঁর। অঙ্কটা শুনতে যদিও খুব একটা জটিল নয়।
—কীরকম? মঞ্জুশ্রী জিজ্ঞেস করে।
—একটা ঘরের মেঝেটা মনে কর সমান্তরাল কাঠের পাত দিয়ে তৈরি। যেমন কাঠের মেঝে হয় আর কী! প্রতিটা কাঠের টুকরোর প্রস্থ সমান। এইবার তোর হাতে একটা সূঁচ আছে। সূঁচটাকে যদি মেঝের উপর চোখ বুঝে ছুঁড়ে ফেলিস, তবে ব্যুফোঁসাহেব প্রশ্ন করেছেন যে দুটো কাঠের জোড়ের উপর সূঁচটার পড়ার সম্ভাবনা কত?
আমাদের ইশকুলের অঙ্কের মাস্টারমশাই ছিলেন অসিতবাবু। ক্লাসে এসেই গম্ভীর মুখে বোর্ডে একটা কঠিন অঙ্ক লিখে দিয়ে— কর সবাই— বলে চেয়ারে বসে আমাদের দিকে চেয়ে থাকতেন। মুখে একটা রহস্যময় হাসি। এই হাসির জন্য ছাত্রদের মধ্যে অসিতবাবুর নামই হয়ে গেছিল ‘চেশায়ার ক্যাট’। এই মুহূর্তে জয়দার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার সেই চেশায়ার ক্যাট-এর কথা মনে পড়ে গেল।
আমাদের মধ্যে মঞ্জুশ্রীই একটু মাথা ঘামানোর চেষ্টা করল। এবং খুব শিগগিরই রণে ভঙ্গও দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, কত?
–সম্ভাবনা কত সেটা বের করতে গেলে বিস্তর ডিফারেন্সিয়েশন আর ইন্টিগ্রেশন করতে হবে। তবে উত্তরটা ইন্টারেস্টিং। কারণ, এই অঙ্কের সমাধান থেকে সূঁচ ফেলার সম্ভাবনা বের করার থেকেও গণিতজ্ঞদের যেটা বেশি আকর্ষণ করেছিল তা হল পাই-এর মান নির্ণয়।
—পাই মানে ওই যে বৃত্তর পরিধি আর ব্যাসের অনুপাত? সেই পাই? মঞ্জুশ্রী প্রশ্ন করল।
—ইয়েস… সেই পাই। জয়দা উত্তর দিল।
—কিন্তু তার মান তো বাইশ বাই সাত না? মনে ছিল, তাই জিজ্ঞেস করলাম।
—হ্যাঁ, প্রায়। কিন্তু সেটা বের হল কীভাবে?
—সেটা তো জানি না।
—লাইফ অফ পাই অত সহজ নয় রে ভাই। বলে জয়দা উদাস হয়ে গেল। তার পাইয়ের প্রতি এহেন সহানুভূতি দেখে আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি এমন সময় সে নিজেই বলল, যদি পাইয়ের গল্প শুনতে চাস, তবে হাতটা ধুয়ে এসে একটা সিগারেট ধরাতে হবে।
কে আর জয়দার জ্ঞানগর্ভ গল্প না শুনতে চায়! আমরা চটজলদি হাত-মুখ ধুয়ে সোফায় এসে গ্যাঁট হয়ে বসলাম। জয়দাও নিজের দোলনা-চেয়ারে বসে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। যদিও ঘরের মধ্যে সিগারেট খাওয়া অলিখিত বারণ— তবু গল্পের স্বার্থে সেটা নিয়ে কেউ কিছু বললাম না।
—পাই নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে। ব্যাবিলনে। মানবসভ্যতার তখন সদ্য কৈশোর। সুমেরীয় সভ্যতার কিছু মানুষ লেগে পড়েছিলেন এই ধ্রুবকের মান নির্ণয়ের জন্য। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সেই সব কীলক লিপিতে লেখা মাটির ফলক খুঁজে পেয়েছেন পরে। অবিশ্যি শুধু সুমেরীয় সভ্যতাই নয়, তখন মিশরীয় সভ্যতাও পুরোদমে বিকশিত হচ্ছে। আর বলা বাহুল্য সেখানেও জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা যে কম কিছু হয়নি তার চাক্ষুষ প্রমাণ মাটির উপর আজও সদম্ভে বিদ্যমান।
—পিরামিড? মঞ্জুশ্রী মন্তব্য করল।
—ঠিক। রীতিমত জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতিতে দক্ষ না হলে ও জিনিস ওই বিশাল স্কেলে বানানো অসম্ভব। প্রাচীন মিশরের গণিতচর্চার আর একটা প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখা যাবে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সযত্নে রাখা রাইন্ড প্যাপিরাসে। আঠারোশো আটান্ন সালে অ্যালেক্সান্ডার হেনরি রাইন্ড নামে এক স্কটিশ প্রত্নসংগ্রাহক মিশরের লাক্সর থেকে একটা প্রাচীন প্যাপিরাস কেনেন। হিয়েরোগ্লিফিক্সে লেখা এই প্যাপিরাস প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরনো। হিয়েরোগ্লিফিক্স জানিস তো?
—হ্যাঁ হ্যাঁ। প্রাচীন মিশরের ভাষা। আমরা সমস্বরে বললাম।
—গুড। তবে তখন জানা ছিল না এই প্যাপিরাসে কী লেখা আছে। অনেক পরে, বিংশ শতাব্দীতে যখন এর অর্থ উদ্ধার করা হয়, দেখা যায় যে এর মধ্যে সাতাশিখানা অঙ্ক কষা আছে। তার মধ্যে একটা হল বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়। আর বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের জন্য দরকার পাই।
—সেই সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে মানুষের মাথায় এমন পাই-এর বাই কেন চড়েছিল? শুভ প্রশ্ন করল।
—বাহ, তুই আজকাল ভালো ভালো প্রশ্ন করছিস তো।
সুযোগ পেলেই শুভকে আওয়াজ দিতে ছাড়ে না জয়দা। তারপর আবার বলতে শুরু করলো—
—আমাদের জগৎ সংসারে সমস্ত কিছুই চলে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মে। প্রকৃতিঠাকরুন সবার কান ধরে বলে দিয়েছেন— চলো নিয়মমতে। আর আমরা, আমাদের জ্ঞাত পরিধির মধ্যে একমাত্র বুদ্ধিমান জীব, সেই সমস্ত নিয়মের ব্যাখ্যা বের করার জন্য তৎপর হয়ে উঠে পড়ে লেগেছি সেই আদি যুগ থেকে। মানবসভ্যতার প্রথমদিকে, যখন মানুষ ঘর বাঁধতে শেখেনি, কাপড় পরতে জানত না, তখনও নিজেদের প্রয়োজনে, সহজাত প্রবৃত্তির ঠেলায় পড়ে অনেক কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে— যেমন শিকার করার জন্য পাথরের অস্ত্র— নাকি আত্মরক্ষার জন্য? নাকি, নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য? কে জানে! তারপর শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য আগুন, দ্রুতবেগে এগিয়ে চলার জন্য চাকা, এমন আরও কত কিছু। এই সমস্ত প্রাথমিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর মানুষের বুদ্ধি যখন বিবর্তনের নিয়মে আর একটু বাড়ল, তখন তার ভাবনা হল এই সমস্ত কিছুকে আর একটু ভালো করা যায় কীভাবে? আগুনের জোর কী করে বাড়ানো যায়, চাকাকে আরও কিছুটা মসৃণ করা যায় কি না, আরও ঝকঝকে তীক্ষ্ণ ফলাওলা অস্ত্র বানাতে গেলে কী করতে হবে? আর এই ভাবনা থেকেই জন্ম নিল আদি ইঞ্জিনিয়ারিং— এবং সেই প্রযুক্তিবিদ্যাকে আরও ফলপ্রদ করার জন্য মানুষ ভাবল ‘দেখতে হবে কোত্থেকে আর কী করে, রস জমে এই প্রপঞ্চময় বিশ্বতরুর শিকড়ে’— বাড়ল এই জগৎসংসারকে নিয়ে তার কৌতূহল। সেই থেকে আমরা এখনও অবধি নানারকম সত্য-কে খুঁজেই চলেছি— চারিপাশে যা কিছু ঘটে চলেছে, সমস্ত কিছুর ব্যাখ্যা পাওয়াই একজন বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের একমাত্র অভিপ্রায়। তা মানুষ যখন সেই প্রাচীনকালে তার পারিপার্শ্বিক নিয়ে ভাবতে শুরু করল— তখন তার চোখে ধরা পড়ল প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা নানাবিধ জ্যামিতিক আকার। প্রযুক্তিগত সুবিধার জন্য জ্যামিতিক আকার সম্পর্কে ধারণা প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়াল। দৈর্ঘ্য মাপার নানারকম একক তৈরি হল। কিন্তু বাকি সমস্তরকম জ্যামিতিক আকারকে মেপে ফেলা গেলেও গোল বাধল বৃত্তের বেলায়। তার ব্যাস আর পরিধির মধ্যে একটা সমানুপাতিক সম্পর্কে যে আছে, সেটা স্পষ্ট— কিন্তু পরিধি যে ব্যাসের ঠিক কতগুণ আর বৃত্তের ক্ষেত্রফলই বা কত সেটা মাপা একটু মুশকিল দেখা গেল। অতএব বুদ্ধি খাটানো দরকার। আর সেই বুদ্ধি খাটানোর ফলেই পাওয়া গেল পাই-কে।
[ক্রমশ]

