এক চারপেয়ের আত্মকথা

এক চারপেয়ের আত্মকথা -- পায়েল চ্যাটার্জি

পায়েল চ্যাটার্জি

 

১.

–ই-কর্নারে ওটা কী হচ্ছিল?
–কী আবার?
–তুমি ইচ্ছে করে হলুদ শাড়িকে লাইনটা ছেড়ে দিলে তাই না?
–আরে, উনি বললেন ওঁর ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে হবে। তাড়াতাড়ি! তাই….
–মোটেই না। হলুদ রং দেখলেই তোমার মনের ভেতর প্রজাপতিরা ডানা মেলতে শুরু করে। আমি বুঝি না ভেবেছ?
–না ইয়ে মানে..
–থাক! আর কিছু বলতে হবে না। আমার জন্য কফি আর একটা মোগলাই অর্ডার করো।

 

২.

–ভাই মনে করে দেখ, তোর মাসতুতো বোনের পিসতুতো দিদিকে পটানোর… থুড়ি ইমপ্রেস করার কথা ছিল। আমি সময়মতো কাজ শেষ করেছি। এবার তোর পালা।
–বিরিয়ানি খাবি তো? অর্ডার করছি এক প্লেট।
–শুধু বিরিয়ানি? ওই কৃপণ-সুন্দরীকে জয় করতে পারলে বিরিয়ানি, চিকেন চাপ, মিষ্টি সহযোগে রীতিমতো উদযাপন করার কথা ছিল। আমি পেট ভরাতাম, তুই পকেট হালকা করতিস। এই কথাই হয়েছিল কিন্তু।
–এই কথা! কোনও সাক্ষী আছে?
–এই টেবিল, এই ‘বসন্ত কেবিন’ সাক্ষী। কথার খেলাপ করিস না ভাই।

 

৩.

–আবার মিথ্যে কথা!
–মিথ্যে কথা! সত্যির বাপ… ইয়ের দিব্যি..। মানে তোমার দিব্যি!
–একদম না! একদম আমায় টানবে না। পাজি, বদমাশ, হনুমান একটা। এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট বাইশ সেকেন্ড এই টেবিলে আমি অপেক্ষা করছি। আর তুমি বলছ তুমি নাকি এই রেস্টুরেন্টের বাইরে এসেছিলে! আমায় দেখতে পাওনি! ডাহা মিথ্যে কথা! মিথ্যুক কোথাকার!
–আরে আরে করছ কী? টেবিলের পায়াটা ভাঙবে নাকি?

উফ! দেখেছেন কাণ্ডটা! এই মেয়ের রাগ আর আস্ফালনের জেরে আমার কোমর বোধহয় ভেঙে গেল। এরকম কত গুঁতোই না রোজ খাই আমি!

বিশেষ করে এইরকম রাগী প্রেমিকারা এলে বেশ ভয়েই থাকি। তবে ওদের প্রেমিকদের থেকে একটু কম! আসলে একবার এরকম এক রাগী প্রেমিকার সারসের গলার মত লম্বা জুতোর আঘাতে আমার কোমরে বেশ চোট লেগেছিল। পেরেক-টেরেক উঠে যা তা অবস্থা! তখন মালিক আমায় সুস্থ করতে পাঠিয়েছিল এক খিটখিটে কাঠ-বুড়োর কাছে। ওহো! আমার পরিচয়টাই তো দেওয়া হয়নি। আমি এই বসন্ত কেবিনের চার পা যুক্ত একটি টেবিল। পুবদিকের জানালার পাশে আমার অবস্থান।

তা যা বলছিলাম, সেই খিটখিটে কাঠ-বুড়োর কাছে আমার অসুখ সারাতে পাঠানো হয়েছিল। কী যে দুঃখের দিন গেছে! বুড়োর শুধু টাকটা চকচকে, আর মুখে নিমপাতার মত বুলি। তবে বুড়ো ওষুধ দেয় ভালো। সেই যে আমায় সারাল, তারপর থেকে প্রায় দশ বছর এই বসন্ত কেবিনে আমি অক্ষত আছি।

তবে টেবিল শুনে মোটেও ভাববেন না, আমি পড়ে থাকি! ‘থাকা’ আর ‘পড়ে থাকা’ কি এক? একেবারেই না।

রোজ এই রেস্তোরাঁয় এসে বসে থাকেন সংক্রান্তিবাবু। বউয়ের মুখ-ঝামটা খেয়ে। বউটারই বা দোষ কোথায়? বাজারে বেরোলেই সংক্রান্তিবাবুর ‘শিরে সংক্রান্তি’। সারা সপ্তাহের বাজার করতে গিয়ে চারটে আলু আর পাঁচটা পটল এনে হাজির করেন। মাছ নিয়ে আসতে বললে বাজারের রাস্তা ভুলে যান। একদিন শুনি আমার মালিককে বলছেন—

–আরে দাদা, জ্যান্ত মাছটাকে দেখে বড় মায়া হল। আহা! তাকে কাটবে, তারপর নুন, হলুদ মাখিয়ে গরম তেলে ভাজবে! ওইটুকু প্রাণীর ওপর এমন অত্যাচার আমি সহ্য করতে পারব না।
–তাহলে নিরামিষ খেলেই পারেন।
–গাছ-পাতা খাব? তারা যে প্রকৃতির সম্পদ।
–তাহলে খাবেন কী? হাওয়া?
–না এই চিঁড়ে, মুড়ি, গুড় এসব খেতে দিব্যি লাগে। কিন্তু গিন্নি এক্কেবারে এসব পছন্দ করে না। সেইটাই মুশকিল!
–তা গিন্নির পছন্দের খাবারগুলো এনে দিলেই হয়।
–আসলে পকেট গরম থাকলে ভাবা যেত না হয়!

এইবার আমি বুঝছি। আসল কথা হল গিয়ে পকেটের তাপমাত্রা। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর চাকরি করেও সংক্রান্তিবাবুর পকেট কোনওদিনই উন্নতি করতে পারল না। সবসময়ই ঠান্ডা, ঝিমোনো, ন্যাতানো। আমার মালিক বলেন উনি নাকি সকালের টুথপেস্টের ফেনা দিয়ে দুপুরে শ্যাম্পু করেন। এই হাড়-কিপ্টে লোকের পকেটের তাপমাত্রা কম হলেও বাড়ির তাপমাত্রার পারদ যে ঊর্ধ্বমুখী থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। এই সংক্রান্তিবাবু আসলে বাড়িতে ‘পড়ে’ থাকেন। আর ‘বসন্ত কেবিনে’ আমার মালিকের সঙ্গে নিজের জীবনের সেই ‘পড়ে’ থাকার দুঃখের গল্প শোনাতে আসেন।

এবার আমার মালিকের পরিচয়টা দিই। গোপেন রঞ্জন মিত্র। তবে ওই নামই সার। মিত্র ওঁর একজনই। এক প্লেট বিরিয়ানি। আর সেই বিরিয়ানি পেটে পড়লে কোনও কথাই গোপন থাকে না বিরিয়ানির সামনে। তাই তো আমি সব জানতে পারি। আসলে রাতের খাবার উনি এই বসন্ত কেবিনে খেয়ে তারপর বাড়ি যান। কখনও বিরিয়ানি নিয়ে বসেন আমার সামনের চেয়ারটিতে। কত কীই বলেন! মাঝে মাঝে কথার ভারে আমি ফুলে উঠি। সারারাত ধরে কথারা পাক খেয়ে চলে আমার মধ্যে, তারপর আমি শান্ত হই। বাড়ি যাওয়ার আগে গোপেনবাবু একটি নিদারুণ কাজ করেন। বসন্ত কেবিন পরিষ্কার করেন।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে উনি চরমপন্থী। কেমন চরমপন্থী? ওই যে এখন সকলে নানাভাবে যে মুখোশটা পরে, মানে ‘মাস্ক,’ ওটি সঠিকভাবে না পরে এলে, বসন্ত কেবিনে ঢোকার অনুমতি নেই। আর ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই বসন্ত কেবিনের জীবাণুনাশক তরল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে হাত, সেটাও গোপেনবাবুর তীক্ষ্ণ তদারকিতে।

ছোটু আর সুমন্ত, এই বসন্ত কেবিনে কাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। একবার এক ছোকরা এক পৃথিবী খিদে নিয়ে এসেছিল এই বসন্ত কেবিনে। কিন্তু তার মাস্কের অবস্থা স্মৃতিটুকু থাক। মানে কোনও মতে থুতনিতে ঝুলছে। ছোটুর বারণ সত্ত্বেও সুমন্ত তাকে শুধু ঢুকতেই দিল না, একেবারে খাবার টেবিলে বসিয়ে দিল। মালিক তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলেন। এই রেস্তোরাঁর ব্যাপারে ছোটুর আনুগত্যকে হনুমানের রামভক্তির সঙ্গে তুলনা করা যায়। তার বুক চিরে দেখলে বোধহয় বসন্ত কেবিনের দরজার ছবি পাওয়া যাবে।

যাই হোক ছোটু সঙ্গে সঙ্গে মালিককে খবরটা দিয়ে দিল। ওই ছোকরা যদিও তখন সুমন্তর নির্দেশে মাস্কটা মোটামুটি ঠিকভাবে পরে নিয়েছে। তবে সেই মাস্ক তখনও নাক ছুঁতে পারেনি। মালিক ওই টেবিলের সামনে এসেই সুমন্তর দিকে একটা আগুনে-দৃষ্টি দিলেন। ভাবটা এমন— আগে একজনের ব্যবস্থা হোক, তারপর বাকিটা….!

আমি দূর থেকে সব দেখছিলাম। ভয়ে আমার পায়াগুলো নড়ছিল। মালিক এসেই ওই নাস্ক মানে নাক ছুঁয়ে না থাকা মাস্কসমেত ব্যক্তিটিকে বসন্ত কেবিনচ্যুত করে তবেই এক গ্লাস জল খেলেন। আর যে টেবিলে ওই লোকটি বসেছিল, সেই টেবিলটি চোদ্দ দিন কাউকে ব্যবহার করতে দেননি। কোয়ারেন্টাইন টেবিল।

ভিড় আর শারীরিক দূরত্বের কারণে পেটে খিদে নিয়ে অনেকে ফিরে গেছেন, তবুও মালিকের কথায় জীবাণুর সম্ভাবনাময় ওই টেবিলে তিনি কাউকে জায়গা দেবেন না।

এদিকে ছোটু আর সুমন্তর অবস্থা তখন দেখার মত। ওই ঘটনার পর ছোটুর ভাবটা ছিল— দ্যাখ কেমন লাগে। কিন্তু তখনও কিছু বাকি ছিল। সুমন্তর শাস্তি ঘোষণা!

–ওই নাস্ক পরা বেয়াদব ছোকরার স্পর্শে আসার কারণে তোকেও চোদ্দ দিন গৃহবন্দি থাকতে হবে। শোন, এরকম ভুল যদি আর কোনওদিন করতে দেখি, বসন্ত কেবিনের দরজা কিন্তু তোর জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।
–দাদা! বড্ড ভুল হয়ে গেছে! আপনার দেওয়া শাস্তি মাথা পেতে নেব। আমার মাইনেটা…।
–ওটি নিয়ে ভাবতে হবে না। সময়মতো পেয়ে যাবে।

এ… কী হল, কেন হল! সুমন্তর শাস্তি শোনার পর ছোটুর মুখের ভাব ছিল এরকমই। এমন একখানা অপরাধীকে ধরিয়ে দেওয়ার পর মালিক ছোটুকে একটু মান্যিগন্যি করতে বলবে, সুমন্তকে ছোটুর মত করে কাজ করতে বলবে, এই ছিল ছোটুর নির্ভেজাল আশা। কিন্তু এ যে এক্কেবারে উলটপুরাণ। দিব্যি আরামে সুমন্ত চোদ্দ দিন ছুটি কাটাবে, আর খেটে মরবে বসন্ত কেবিনের অনুগত ছোটু। হাঁড়ির মতো মুখ করে ছোটু সুমন্তর কলার উঁচিয়ে চলে যাওয়া দেখল।

চোদ্দ দিন পর ফিরে এসে সুমন্তর ভাবখানা ছিল হিরো নাম্বার ওয়ান। তবে সে শুধুই ছোটুর সামনে। গোপেনবাবুর সামনে সে কেঁচো হয়েই থাকত। শুধু সুযোগ পেলেই সিংহের কেশরের মত আঙুল দুলিয়ে ছোটুকে নানা নির্দেশ দিত। ছোটুও উলটপুরাণের ভয়ে ইঁদুরের মত সব নির্দেশ পালন করত।

আমি যদি টেবিল না হতুম বা আমার যদি কয়েক জোড়া দাঁত থাকত, তবে এইসব দেখে বেশ ফ্যাকফ্যাক করে হাসতুম।

তবে বসন্ত কেবিনে আজও বসন্ত আসে আমার মালিকের জন্যই। তাঁর রান্না করা মোগলাই-এর নামে এই চত্বরের সব ঝগড়াটে মানুষরা নাকি তাদের ঝগড়া ভুলে যায়। কত প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধু-বান্ধবী, স্বামী-স্ত্রী, এছাড়াও কত নাম না জানা সম্পর্কের মালিক-মালকিনরা ঝগড়া ভুলে ভাব করেছে এই মোগলাই পরোটা জিভে নিয়ে।

এই মোগলাই গোপেনবাবু সাধারণত অন্য কাউকে রাঁধতে দেন না। কোনও কারণে ছুটি নিলে সেদিন বসন্ত কেবিনে বসন্ত সমাগম খানিক কম হয়। ওই দিন খাবারের তালিকায় থাকে না মোগলাই।

একবার গোপেনবাবু অসুস্থতার কারণে বেশ কিছুদিন আসতে পারেননি। এদিকে ক্রেতারা মোগলাই মোগলাই করে দোকান মাথায় তুলছে। এই দোকানের এক রাঁধুনি তখন গোপেনবাবুর কাছ থেকে জেনে রান্না করেছিল বসন্ত কেবিন স্পেশাল মোগলাই। তারপর, কী আর বলব! ওই মোগলাইতে ডিমবাবাজি নাকি কোনও কোণায় ঘাপটি মেরে লুকিয়েছিল। তেল নাকি পরোটার ওপর বহাল তবিয়তে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আর আলুতে নুন নাকি হলুদকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। যারা ওই রাঁধুনির রান্না মোগলাই খেয়েছিল, তাদের প্রত্যেককে গোপেনবাবুর হাতের মোগলাই পরে ফ্রিতে খাওয়াতে হয়েছিল।

তারপর থেকে আর অন্য কেউ রাঁধে না বসন্ত কেবিন স্পেশাল মোগলাই। গোপেনবাবু না থাকলে ওই মোগলাইয়ের দেখাও মেলে না। যথারীতি বসন্ত কেবিন তখন বসন্তবিহীন।

ছুটি শব্দটার অস্তিত্ব বসন্ত কেবিনের জন্য নয়। সপ্তাহে একদিন একবেলা বন্ধ থাকে আমাদের এই বসন্ত কেবিন। আসলে গোপেনবাবুর ডিকশনারিতে ছুটি শব্দের অস্তিত্ব নেই। উনি অবিবাহিত, পরিবার বলতে দুটো ভুলো আর চারটে হুলো। শরীর খারাপ না হলে ছুটি নেন না। তা একদিকে ভালোই। ফাঁকা বসন্ত কেবিনে নিজের সারা দিনের অভিজ্ঞতা উগরে দেন আমার সামনে, এক প্লেট বিরিয়ানি সঙ্গে নিয়ে।

কিন্তু ছোটু, সুমন্ত ছুটি চাইলেই রীতিমতো গোয়েন্দা দপ্তরের জেরার মুখে পড়তে হয়। এই প্রশ্নবাণের ঠেলায় ছোটুর কয়েক জোড়া দাদু, দিদা প্রায় বার চার-পাঁচেক মারা গেছে। আর সুমন্ত ছুটি চাওয়ার আগে গোপেনবাবুর পছন্দমতো একটা চিত্রনাট্য তৈরি করে নেয়। চিত্রনাট্যে নায়ক— গোপেনবাবুর মোগলাই-এর প্রশংসা। নায়িকা— বসন্ত কেবিনের বেশ কয়েকটা অর্ডারের নিশ্চয়তা। এই নায়ক, নায়িকাকে কেন্দ্র করেই সুমন্তর কাহিনি আবর্তিত হয়। সে অমুক জায়গায় একটি বিশেষ প্রয়োজনে যাচ্ছে, কিন্তু তার মূল লক্ষ্য বসন্ত কেবিনের জন্য কয়েকটা অর্ডার আনা। আর এই অর্ডার পাওয়ার প্রধান কারণ গোপেনবাবুর হাতের সুস্বাদু মোগলাই। ওম প্রশংসায়ো নমঃ— এই মন্ত্রেই কাবু হয়ে যান বসন্ত কেবিনের মালিক গোপেন রঞ্জন মিত্র। তারপর সেই অর্ডার আদৌ বসন্ত কেবিন পর্যন্ত আসে কিনা তার খোঁজ আমি অন্তত পাইনি।

মাঝে মাঝে আমি ভাবি, গোপেনবাবু কি কিছুই বোঝেন না? নাকি সব বুঝেও অভিনয় করে যান, ওই প্রশংসাটুকুর জন্য! তাঁর এই ছদ্ম-বকাবকির আড়ালে হয়তো থাকে শুধুই স্নেহ। এই বাৎসল্য দিয়েই তিনি আগলে রাখেন বসন্ত কেবিনের মানুষ, অনুভূতি আর আমার মত সমস্ত জড়বস্তুদেরও!

এই বসন্ত কেবিনের বাকি দুজন রাঁধুনিও গোপেনবাবুর মত। সংসার নামক বিষম বস্তুটি তাদেরও নেই। গোপেনবাবু সমেত এই তিনজনের কুমারত্ব অমরত্ব লাভ করেছে। ছুটির বিষয়ে এরাও নিরুত্তাপ। কখনও দু-একটা সিঙ্গেল রান নিয়েছে বটে! তবে চার বা ছক্কা হাঁকায়নি। এদের জীবনেও নাকি প্রেম এসেছিল। তবে সে আসায় আশা ছিল না। তাই সংসার অবধি গড়ায়নি কিছুই।

ছোটু আর সুমন্ত বাদে গোপেনবাবুকে আর কাউকে নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। শুধু মাঝেমধ্যে বসন্ত কেবিনের প্রত্যেকটা ইট, দরজা, জানালা, টেবিলের কাছে এসে মায়াভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। আমি দেখতে পাই। অন্য টেবিল, দরজা, জানালাগুলো দেখতে পায় কি না কে জানে!

কখনও আমার পাশে বসে আক্ষেপ করেন। এই যে রাতে খেয়ে বাড়ি যাবেন, ওগো, হ্যাঁগো বলে কেউ জলটা, গামছাটা এগিয়ে দেওয়ার নেই। এই দুঃখের কথাই গোপেনবাবু আর তাঁর এক প্লেট বিরিয়ানির আসরে বারে বারে ফিরে আসে। যে আসর রোজ বসে আমার পাশে। আমার গায়ে সে সব কথার গন্ধ লেগে থাকে। আর লেগে থাকে খাবারের গন্ধ। তবে খাবারের থেকেও কথার গন্ধ আমার বেশি প্রিয়। কথার গন্ধ স্থায়ী, খাবারের নয়।

কিন্তু এত কথার শেষে আমার ওপর যেটা যায়, সেটা আমার মোটেই পছন্দ হয় না। ছোটু আর সুমন্তর প্রত্যেকদিন এই বসন্ত কেবিন পরিষ্কার করে যাওয়ার পরেও গোপেনবাবুর মনের খচখচানি পরিষ্কার হয় না। তাই আরেক প্রস্থ পরিষ্কারের পালা চলে। জল, গামছা তারপর ওই বিদঘুটে নীল রঙের জলটা। স্যানিটাইজার না কী যেন নাম। উফ! কী যে ঠান্ডা লাগে আমার! শুধু নাক নেই বলে সর্দিটুকুই লাগে না।

পরের দিন সকাল থেকেই এই বসন্ত কেবিনে শুরু হয়ে যায় প্রতিযোগিতা। গোপেনবাবুকে দিয়েই শুরু হয় গন্ধ শোঁকার প্রতিযোগিতা। এই সকলে পাচ্ছিস তো? তখন সকলে সমবেত কণ্ঠে বলে ওঠে— হ্যাঁ, দাদা পাচ্ছি।

গোপেনবাবু নিশ্চিন্ত হন। ওই যে এক দুষ্টু জীবাণু এসেছে, তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার এটাই নাকি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।

এই ভয়ানক প্রতিযোগিতাটির ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর আমাদের দিন শুরু হয়। এরপর হাতা-খুন্তির টুংটাং আওয়াজ, জল, সাবান, স্যানিটাইজারের গন্ধরা মিলেমিশে দিন শুরু করে। সারাদিন জুড়ে কত অনুভূতি এসে বসে আমার পাশে। টুকরো টুকরো মান-অভিমান, আশা-প্রত্যাশা, ঝগড়া, আবদার, আদর কত কিছুই না রোজ দেখি আমি।

মাঝে মাঝে ওই পুব দিকের জানালাটায় তাকিয়ে থাকি। সোনালী রোদ এসে পড়ে আমার ওপর। আমি মন মেলে দেখি, কত বড়, ঝলমলে সব রেস্তোরাঁ। অট্টালিকার মত। তার পাশে আমাদের এই লাল-নীল সংসারের মত ছোট্ট বসন্ত কেবিন। ভয় হয়, কোনও অচেনা, অলীক জগতে আমরা হারিয়ে যাব না তো? তখন দেখি, গোপেনবাবু চা নিয়ে এসে বসেছেন আমার পাশে, ওঁর চোখে সেই মায়া, মায়ার আলোয় ঝিলমিলিয়ে উঠি আমি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...