রয়েছ নয়নে নয়নে…

রয়েছ নয়নে নয়নে… -- অনির্বাণ ভট্টাচার্য

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

সিনেমায় এমন হয়। সিনেমায় স্পেস, টাইম জিগস পাজলের মতো জায়গা বদলায়। যাকে দেখছ, সে নেই আসলে। যে নেই, আসলে সে ভীষণরকম জ্যন্ত। সিনেমায় এমনটা হয়। আশা এসব ভাবেন। বহুদিন দেশে ফেরেননি। সিঙ্গাপুর থেকে মুম্বই, মুম্বই থেকে সিঙ্গাপুর— গলি থেকে গলি, জীবন-মরণ, সীমানা— আশা সিনেমায় চলে যাচ্ছেন। তাঁর সেইসব গানের ভেতর আরেকটা সিনেমায়। ০.২২ ব্রাউনিং পিস্তলে চলে যাচ্ছেন। চলে যাচ্ছেন রক্তস্রোত, একটা ফোনকল এবং অবসাদ, অবসাদ আর অবসাদে। বর্ষা কোথায় এখন? ওখানে সন্ধে হয়? সিঙ্গাপুরের সেই সকাল। ফোনটা। অসহ্য সেই ফোনটা। মনে হল মাটিতে পড়ে যাবেন। কিছু একটা ধরলেন। সাউথ মুম্বইয়ের পেদ্দার কোর্ট। বর্ষাকে রক্তে ভিজে কেমন দেখতে লাগে? এত, এতটাই কম কথা বলত শেষের দিকে, ঝলকানি দেখেও কি চিৎকার করে ওঠেনি, ওঃ! আশা ভাবতে পারেন না। দিদি পাশের ফ্ল্যাটে ছিল। দিদির শরীর ভালো না। দিদিও তো মা। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল দিদি। আশা সবার মধ্যে একা। বছর। তিনটে বছর। আবার সিঙ্গাপুর। আবার মুম্বই। সেবার দিদির ৮৭ হচ্ছে। জন্মদিন। প্যাকিং। আবার ফোন। এবার হেমন্ত। পিস্তল থেকে কর্কটে পৌঁছতে কতটা কমে যায় মৃত্যুশোক। আদৌ কমে কি? পেদ্দার কোর্ট রোডে বর্ষার পিস্তল, স্কটল্যান্ডে ৬৬ পেরনো হেমন্তর ক্যান্সার— মা, বাবাগুলো কেন যে বেঁচে থাকে। দিদির জন্মদিন হয়নি। মুম্বই ফিরে অনেকক্ষণ দুই বোনে হাত ধরেছিলেন। কেঁদেছিলেন সারা রাত। আশাকে গান গাইতে বলেছিলেন। কী গান গাইবেন আশা? গলা ভেঙে যাচ্ছিল— ‘মওত কিতনি ভি সংদিল হো মগর, জিন্দেগি সে তো মেহেরবান হোগি…’। ইদানীং চিত্রা অবশ্য গুনগুন করেন। চারপাশে সাঙ্গীতিক হুল্লোড়ের ভেতর চিত্রা এক অদৃশ্য, অস্ফুট এক ব্যালাড ভাবেন। ভাবেন গজল। মেরিন ড্রাইভের আলোঢাকা অন্ধকার রাস্তা। চারপাশে শব্দের ভিড়ে অজস্র ক্যাকোফনি। জুলাই। নব্বই। পাশ থেকে একটা গাড়ি হঠাৎ। বিবেক সারাক্ষণ হাসত। ভয় পেলেই বলত, সব ঠিক হয়ে যাবে। হল না। উনিশ বছর। চিত্রা অভ্যেস করে নিয়েছেন অনেককিছু। মনিকা। মে। ২০০৯। আগের রাতেও তো কথা, একসঙ্গে কতটা সময়। আড়াইটে। শুতে যাচ্ছি, মা। পরের সকাল। আরমান বাথরুমের জানলা ভেঙে ঢুকেছিল। সিলিং আর মাটির ব্যবধানে একগাদা ডিপ্রেশনের হাওয়া। ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের হাওয়া। প্রেম, অপ্রেম, কোর্ট কেস— মনিকা, তুই এতদিন ছিলিস কী করে রে? মেরিন ড্রাইভের ওই রাস্তা। বান্দ্রার পেরি ক্রস রোডের ওই ঘর। চিত্রার কাছে অশ্লীল এক বিজনেস সিটি। গলা স্তব্ধ। কেউ কথা বলবেন না প্লিজ। করুণা করবেন না। ‘মেরে দুখ কি কোই দাওয়া না করো’। আমি ভালো আছি। মাঝে মাঝে জগজিতের গলাটা ভেসে ওঠে। ‘জগ নে ছিনা মুঝসে, মুঝে জো ভি লাগা…’। গলার কাছটা কিছু একটা আটকায়, গিলতে পারি না। বাকিটুকু সময়ে ভালো আছেন চিত্রা। বিবেক, জগজিৎ, মনিকা— ওদের ছবিগুলো নিয়ে ভালো আছেন।

ভালো থাকা আর না থাকার ভেতর একাই বসে থাকেন মোহন সিং। মোহরদির গলা মনে পড়ে। মনে পড়ে শ্রীপল্লী থেকে আসা শান্তিদার ফোন। শুচিস্মিতার মুখ। আর মনে পড়ে…। ফারহাত শাহজাদের লেখা গান তাঁর শাহানা বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে। ‘তনহা তনহা, রোনে ওয়ালো, কউন তুমহে ইয়াদ আয়ে …’। ওর যে কী হল! পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরল। বলল পায়ে সাড় পাচ্ছে না। অভিশপ্ত একটা চোদ্দ মার্চ। বলেছিল শান্তিনিকেতনে ফিরছি, বাবা। বলেছিল ঠিক হয়ে গেছে। ‘কিছুই তো হল না। সেইসব, সেইসব সেইসব হাহাকার রব …’। বকুলবীথি, তিনপাহাড়, লালবাঁধ— সবকিছু, সব কিছুই যেন পিঙ্কুর রাস্তা। শুচিস্মিতা ওকে ওই নামেই ডাকত। শুচির চলে যাওয়ার দিন চাঁদের শ্মশানে ওর সারা রাত একা। ওর ছাতিম। ওর চিঠি। শাহানার উপর মেঘ করেছে। বৃষ্টি হবে? ওর গলায় ‘নয়ন তোমারে’ ঘুরছে নেটে, সোশ্যাল মিডিয়ায়। মোহনের বুকে কিছু একটা জমছে। শ্বাস নিতে দিচ্ছে না। পাথর না আলো? আলো না পাথর? ওর ছাতিমকে লেখা চিঠির পাতা উড়ছে মেঘের হাওয়ায়— ‘আগুন কেন ঝরে অমন/ শরীর জুড়ে কালো/ শিলার নীচে ছাতিম পাতা/ পাথর ভরা আলো’।

আলোর স্টেজ-শো। গান, গান, গান। ৫৩ তলার জানলা থেকে মাটির গান শোনা যায়? কোনর শুনেছিল? তাহলে কেন বসল ও? কেন ঝুঁকল নিচে? সাড়ে চার বছরের কোনর ক্ল্যাপটনের শরীর নিউ ইয়র্ক সিটির রাস্তায়। ভিড়, ভিড়, ভিড়। এরিকের হাত পা সব স্থাণু হয়ে আসছে কেন? এ কি শুধুই সন্তানশোক, নাকি অন্য কিছু? এরিক নিজেই কি পড়ে গেছিলেন, এখনও যাচ্ছেন? পতলশীল বস্তু, এরিক সত্যিই তো নিজের কোনও ওজন পাচ্ছেন না। বন্ধু উইল জেনিংসকে বললেন, ফিরতে হবে, ফিরতে হবে যেভাবেই হোক। টানা একটা বছর। ‘উড ইউ হোল্ড মাই হ্যান্ড, ইফ আই স ইউ ইন হেভেন’। একবার হাতটা ধর লিটল ম্যান, একবার। আমি যেভাবে হোক বাঁচাব তোকে, স্কাইস্ক্যাপারের প্যারালাল এক শূন্যতা থেকে, অসম্ভব গতিতে নিচে পড়া থেকে যেভাবেই হোক তুলে আনব। আবার গান লিখব, গাইব। তোকে নিয়ে। শেষ রাত। ওই সার্কাসটা। কোনর একটা ক্লাউনকে দেখে কী অসম্বব হাসছিল। ওর হাত পা নড়ছিল পাগলের মতো। বলছিল ক্লাউনটার হাতে ছুরি কেন? সেই শেষ রাত। একটা সার্কাস আর পিতা পুত্রের সিলুয়েট। এরিকের শেষ স্মৃতি। সার্কাস। শহর থেকে চলে যাওয়া, জীবন থেকে চলে যাওয়া একটা সার্কাস। ‘অ্যান্ড দ্য সার্কাস লেফট দ্য টাউন’। আচ্ছা, এরিক নিজেই ওই ক্লাউনটা, হাতে ছুরি? সন্তানের কাছে না থাকতে পারা, তাকে অত ভয়ঙ্কর একটা ৫৩ তলার জানলার ধারে ঝোঁকার থেকে আটকাতে না পারা একটা ক্লাউন, যে একটা ছুরি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে? কী অসম্ভব স্বার্থপর এই সঙ্গীত, কী স্বার্থপর…

নিজের কেরিয়ারকেও সেলফিস মনে হয় টাইসনের। অন্ধকার এক একটা রাতে ট্রেডমিলটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। শূন্য, অচল, নিস্ক্রিয় ট্রেডমিলটার এক একটা পার্টস। এক্সোডাসের রক্ত লেগে আছে। এক্সোডাসের শ্বাস লেগে আছে। লাস ভেগাস থেকে ফিনিক্সে আসার ফ্লাইটে একটা কথাই মনে হচ্ছিল টাইসনের— একটা রাগ। ‘মাই ফার্স্ট ইন্সটিংট ওয়াজ আ রেজ’। কেন ওই ট্রেডমিলটার কাছে গেছিল মেয়েটা? কী বোঝে চার বছরের শিশুকন্যা? কিভাবে আটকে গেল ওর গলা, জিভ, শরীর? কার দোষ? একটা বীভৎস ২০০৯। একটা বীভৎস ২৬ মে। একটা বীভৎস শোকজীবন। আকস্মিকতা। ‘এভরিবডি হ্যাজ আ প্ল্যান আন্টিল দে গট পাঞ্চড ইন দ্য মাউথ’। টাইসন কি মুহূর্তের জন্য মুখটা সরিয়ে নিয়েছিলেন? ফরগিভ মি লিটল ডটার, ফরগিভ মি…

প্রকাশ রাজ নিজেকে অবশ্য ক্ষমা করে দিয়েছেন। সিধু। ফুলের মতো শিশু। সেবার পাঁচ হচ্ছে। ওই ২০০৪। ওই কোনও কিছু না বোঝা একটা জানুয়ারি। একটা একফুট উঁচু টেবিল। সিধুকে উঠিয়ে দিয়েছিলেন। ও ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল। ঘরের ভেতর। ফ্ল্যাটের সিলিং ওর আকাশ। হঠাৎ শব্দ। পতনের শব্দ। কিভাবে কী হয়ে গেল। প্রকাশ ফোকাস করতে পারেন না। স্ক্রিপ্টের পাতায়, ছবির অ্যাস্পেক্ট রেশিওয় বারবার সিধুর মুখ। জানুয়ারি থেকে মার্চ, ওই তিন তিনটে মাসের লড়াই, সিধুর যন্ত্রণাকাতর মুখ। ওইটুকু পতন, ওইটুকু উচ্চতা কেন এত বিপর্যয় ডেকে আনে? কেন? এইসব প্রশ্ন একধরনের ভয়েড তৈরি করে। যেমন সাউথ লিসবনের ট্রয়া। একটা ভ্যাকেশনে গিয়ে অসম্ভব পাথুরে একটা রাস্তায় আছড়ে পড়ে এমিলিওর বাইক। বাবার নিজের বাইক। সুদর্শন, ঝঝঝকে এমিলিও আঠারো ছুঁচ্ছিলেন। ঘাতক একটা বাইক বাইরে রাখা, ভেতরে নিজের পুরনো ক্লিপিং। দেখতে দেখতে কেমন একটা বিহ্বল হয়ে যাচ্ছেন মাইকেল, মাইকেল বালাক। এতদিন ধরে এই সামলালেন মাঝমাঠ? এভরিথিং ইজ আ লাই, ব্ল্যাটান্ট লাই…। কিংবা বারহানা শাহ কি দরগা। ১০০ বছরের পুরনো গোরস্থান। দেখভাল করা মহম্মদ মনে করতে পারে দিনটা। মক্কায় জানাজা শেষ হল। আয়াজকে আনা হল। ভাইজান ভেঙে পড়েছিল। হাউ হাউ করে কাঁদছিল। লোকটার খেলা কত দেখেছে, ওই দম্ভ, ওই কলার তোলা, ওই ফিল্ডিং। এসবের সঙ্গে কান্নাটা মেলানো যায় না। ভাইজান প্রথম দিন এল, চতুর্থ দিন এল, দশ নম্বর দিন এল, তারপর… মনে করতে পারছে না। মাঝে একবার এলেও একা দূরে দাঁড়িয়েছিল। রাতের বারহানা শাহ। ইদের চাঁদ। ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটি, হায়দ্রাবাদ, রঞ্জি, তারপর ইন্ডিয়া। কত কত খেলার কথা ছিল ওর। একদম আমার মতো স্টাইল। ওই গ্লান্স, ওই ফ্লিক। কেন ছেলেকে বাইকটা কিনে দিলাম? অবিশ্বাসী এক ইদ। ইদের গিফট। ইউনিসের ডেলিভারির চেয়েও তীব্র গতিতে ছোটা একটা সুজুকি হায়াবুশা সুপারবাইক আর সন্ধে সাতটার এরোটিক, মাতাল হায়দ্রাবাদ এক্সপ্রেসওয়ে। ডাক্তার জনিয়েছিল হাইপোক্সিক এনসেফালোপ্যাথি। আজহার জানেন ওসব প্যাথিট্যাথি কিচ্ছু না। তাঁর নিজের একটা ডিসিশন। ওটাই কিলার। ক্ষমা করে দিও নওরিন। তোমার ছেলেকে, আমাদের ছেলেকে প্রচণ্ড ভালোবাসতাম আমি। প্রচণ্ড…

জানা, তাঁর ন নছরের জানিতা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে ন্যু ক্যাম্প। পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, লিও আর বন্ধুরা। লুই এনরিকে দেখতে পাচ্ছেন। পাঁচ মাসের লড়াই আর অস্টিওসারকোমার ভেতর ছটফট করা মেয়ে। কফিনে লা ব্লাউগ্রানার পতাকা মোড়া ছিল কি? শেষ ট্রফিটায় ওর গন্ধ লেগে। রাতে ঘুমোতে ঘুমোতে এখনও গাল টিপে দিচ্ছেন। যেমন করছেন আনোয়ার। অবসরের এতগুলো বছর পর, নন স্ট্রাইকে আমির সোহেলের পাশে সেইসব আগুন ঝরা দিনের এতগুলো যুগ পর এখনও তিন বছরের বিসমাহকে ভুলতে পারছেন না সৈয়দ আনোয়ার। দিন, সময় টাইম স্পেসে ফিরে ফিরে আসছে। আসিফ আলি আর ওর দু বছরের মেয়ে নুর ফতিমা। আটলান্টিক পেরনো এক হাসপাতালে নুর ঢলে পড়ছে ঘুমে। আসিফ ফিরে যাচ্ছেন ইংলন্ড ট্যুর করে। ফ্লাইটে টেক অফ টাইম পেরোলেই ফোনে নুরের রেকর্ডেড গলা। ছোট্ট নুরের গলা। আনোয়ার মানে আলো, নুর মানে আলো। জোনাকির মতো। বাট, হোয়াই ডু দ্য ফায়ারফ্লাইজ ডাই সো আর্লি?

সিনেমায় এমনই হয়। এইসব চলে যাওয়ার আর আসার মাঝে কেউ ইচ্ছেমতো বসিয়ে দিতে ইচ্ছে করে খেলার পুতুল। সে মাথা নেড়ে বলবে, আছি গো, আছি। মসজিদ স্ট্রিটের বাড়িতে নলিনী সরকার এসছিলেন খবর পেয়ে। ‘নলিনীদা, আমার কাননের বুলবুলি উড়ে গেছে নলিনীদা। ছেলেটা সারা ঘর দাপিয়ে বেড়াত নলিনীদা। উড়ে গেল।’ নলিনী যেন নিজের সন্তানশোকেও নিথর। যোগীরাজ বরদাকান্ত মজুমদারের বালিগঞ্জের বাড়িতে বুলবুল আসবে। আসবেই। নজরুল অন্ধকারে বসে আছেন। প্রমীলা কীভাবে সামলাবেন? নিজেও শোকে পাথর। এভাবে না, এভাবে না। কিছু লিখুক মানুষটা। লিখে ভুলুক। ছড়া লিখুক। হাসির গল্প লিখুক। হাসুক। কতদিন হাসেনি। ঘুমের ভেতর বারবার ছটফট করছে লোকটা। ওর চোখে বসন্ত হয়ে গেছিল প্রমীলা। ও দেখতে পেত বেঁচে থাকলে? কোথায় গেল? বুলবুলিস্তান? ইরান? নাকি গালিবের হাভেলি? কে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন? গালিব নাকি উমরাও? কলকাতা থেকে খবর পেয়েই ছুটে ফিরে গেছিলেন হাভেলিতে। আরিফ নেই। আরিফ, তাঁর সন্তামসম আরিফের মুখে, গলায় যক্ষ্মা। ‘তনহা কিউ গ্যায়ে, তনহা কিউ গ্যায়ে’। খাঁ খাঁ হাভেলিতে উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না মির্জা। তারপর হাসলেন। উমরাও তাঁকে বিড়বিড় করতে করতে কোথাও একটা মিলিয়ে যেতে দেখলেন— ‘জানে হুয়ে কহতে হো, কেয়ামত কো মিলেঙ্গে কেয়া খুব…’। অথবা শান্তিনিকেতন। ইজিচেয়ারে একদিন ছেলেকে বসে থাকতে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দুলছে। আধো-অন্ধকার একটা সন্ধের শান্তিনিকেতনে। কিছু একটা গাইছে কি? ‘একি লাবণ্যে …’? বড় প্রিয় ছিল ওর। একটু থামল। কে যেন এল পাশে। যেন ভোলা। ওর বন্ধু। যেন মুঙ্গেরে না হওয়া ওদের খেলার, গানের বাকিটুকু ঝালিয়ে নিচ্ছে। মুঙ্গেরে সেই রাতে শেষটা থাকতে পারেননি ছেলের ঘরে। সাতই অঘ্রান। সেই সাতই অঘ্রান। মৃণালের, শমীর অঘ্রান। পাশের ঘরে উঠে এসে বাকিটুকু সময় চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন। কেউ খবর দিল তাঁকে। ‘সৎকার করো তোমরা’। প্রফুল্লও এমনটি করেছিল। অভিশপ্ত রাত। ওর বলু সেই রাতে চলে যাচ্ছে। মা হয়ে এই যন্ত্রণা দেখা যায়? পাগল বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরবাড়ির গারদের ভেতর থেকে চিৎকার করছে, ‘বাড়িতে সবকিছু তালাবন্ধ কেন?’ প্রফুল্লময়ী পারছেন না সহ্য করতে। ‘একটু যাও, তুমি। ও যে মা-মা বলে ডাকছে।’ প্রফুল্লময়ী ছেলের পাশে এসে বসলেন। বলু দেখল। চিনতে পারল। তারপর বমি করে শেষ হয়ে গেল। রানির শেষটাও চোখে ভাসছে। ‘ও যে আমার শিশির কণা,/ও যে আমার সাঁঝের তারা—/কবে এল কবে যাবে এই ভয়েতে হই যে সারা!’ আলমোড়া থেকে ফেরার সময় লখনউয়ে দাঁড়িয়েছিল ট্রেন। ‘বোনের জন্য একটা খেলনা নিই বাবা?’ কথা বলতে পারছে না রোগের চোটে, তবু, নিজে নেমে কিনল। জোড়াসাঁকোয় মীরাকে দিয়ে অদ্ভুত শান্ত হয়ে গেছিল রানি। আর হাউ হাউ কাঁদছিল মীরা। সেই মীরা আরও একবার কাঁদল। ও তখন জার্মানিতে। ‘নীতুকে খুব ভালবাসতুম। আমার শোকের দায় আমিই নেব। বাকি পৃথিবী কী বুঝবে এর মানেটা?’

সিনেমা এরপর সব মিলিয়ে দেবে। হালকা একটা শিস দিতে দিতে ব্রাউনিং পিস্তলটা দেরাজে ঢুকিয়ে মায়ের কাঁধে মাথা রাখছে বর্ষা। ব্রেকফাস্টের সময় দেরি করেও এসেই ভাই আরমানকে অল্প চাপড় মেরে মনিকা বলছে, আগে ডাকিসনি কেন? ও মা, একটা গান গাও। আনন্দের গান। বেঁচে থাকার গান। কোনর বড় হয়ে বাবার সঙ্গে ট্যুর করছে। ওর স্ট্রিমিং। ওর গিটার। ওর বান্ধবী। ‘শি পুটস অন হার মেক আপ, শি ব্রাসেস হার লং লং হেয়ার …’। তারপর সারা রাত স্টেজ মাতানো বাবা-ছেলের ‘ওয়ান্ডারফুল টুনাইট’। লিওকে ফিরিয়ে, ওর বন্ধুদের ফিরিয়ে, তাঁর বড় ভালোবাসার এমএসএনকে নিয়ে আরও একটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতছেন লুই এনরিকে। পাশে হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় ছুটতে শুরু করেছে জানা। সেরে গেছে, ওর অসুখ সেরে গেছে। ইন্ডিয়াকে জিতিয়ে, কলঙ্কহীন, দাগহীনভাবে জিতিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরছেন আয়াজুদ্দিন, গ্যালারিতে প্রাউড ফাদার, ‘ব্যালেন্স হারাস না, কোনওদিন ব্যালেন্স হারাস না আয়াজ’। শেষ ম্যাচটায় ৪৯ সেকেন্ডের একটা ফার্স্ট রাউন্ড নকআউটের পর অপোনেন্টকে জাস্ট উড়িয়ে দিয়ে স্বভাবোচিত ভঙ্গিতে ধুর আর ভাললাগছে না বলে রিং ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন মাইক টাইসন। ওই তো এক্সোডাস। আমার এক্সোডাস। চুমু, চুমু, চুমু। আমার প্ল্যান, আমার লাস্ট পাঞ্চ আমি নিজেই ঠিক করব। একদিন কীভাবে যেন চোখের বসন্ত সেরে যাচ্ছে বুলবুলের। বাবার শেষ বক্তৃতার খসড়ার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েই আনমনা হয়ে যাচ্ছে তরুণ— ‘জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান— বেদনার গান গেয়ে যাব আমি। সকলের বাঁচার মাঝে থাকব আমি বেঁচে’। বাইরে হাসনাহানার গন্ধ। সেই রাতের মুঙ্গেরের মতো আজ যেন শান্তিনিকেতনে জ্যোৎস্না, জ্যোৎস্না, দারুণ এক জ্যোৎস্না। কোপাইয়ের ধার থেকে আসা একশ বছর পরের একটি ছেলের গান শুনতে পাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। ভিজে যাচ্ছে তাঁর শরীর। চশমাটা আলতো সরিয়ে চোখ মুছছেন। ওদিকে এক প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে এসব কিছুই না জেনে বাবার পাশে বসে একলাই গাইছেন বিক্রম, বিক্রম সিং খাঙ্গুরা—

তুমি আর আমি, মাঝে কেহ নাই, কোনও বাধা নাই, ভুবনে। রয়েছ নয়নে নয়নে…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...