Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

অসাম্যের সাতকাহন

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 


অসাম্য কোনও স্বাভাবিক বা অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতির ফল। আজ যে গগনস্পর্শী বৈষম্য আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা আমাদের গৃহীত নীতি, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামোরই প্রতিফলন

 

 

পূর্ব-প্রসঙ্গ: ভারতীয় অর্থনীতিতে ‘চিনা ফ্যাক্টর’

 

এই মুহূর্তে ভারতের অর্থনীতি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার দাবি ও জিডিপির উজ্জ্বল স্বপ্ন, অন্যদিকে মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার তলানিতে পৌঁছে যাওয়া, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ হ্রাস, রপ্তানির তুলনায় আমদানির ক্রমবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বাজারের সঙ্কোচন এবং অভূতপূর্ব বেকারত্ব। এই চালচিত্রে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত একটি বিষয় হল অসাম্য, যা ভারতের অর্থনীতির বিকাশের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধক। বর্তমান নিবন্ধে আমরা এই অসাম্যের স্বরূপ এবং অর্থনীতির ওপর তার ঋণাত্মক প্রভাব পর্যালোচনা করার চেষ্টা করব।

এক্ষেত্রে আমরা প্রথমে World Inequality Lab কর্তৃক প্রকাশিত World Inequality Report 2026-এ ভারত সম্পর্কে উত্থাপিত পর্যবেক্ষণগুলি দেখে নেব। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—

ভারত বিশ্বের অন্যতম অসম দেশ।

সমাজের উপরের স্তরের ১০ শতাংশ মানুষ জাতীয় আয়ের ৫৮ শতাংশের অধিকারী, অন্যদিকে নিচের স্তরের ৫০ শতাংশ মানুষের আয় মাত্র ১৫ শতাংশ।

সম্পদ-সংক্রান্ত অসাম্যও একইভাবে উদ্বেগজনক। দেশের উপরের স্তরের ১০ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের মোট সম্পদের ৬৫ শতাংশ কেন্দ্রীভূত। আরও মারাত্মক হল, দেশের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের ৪০ শতাংশ।

২০১৪ সালে দেশের উপরের স্তরের ১০ শতাংশ মানুষ এবং নিচের স্তরের ৫০ শতাংশ মানুষের মধ্যে আয়ের যে ফারাক ছিল, ২০২৪ সালেও তা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

ভারতের শ্রমবাজারে মহিলাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম— মাত্র ১৫.৭ শতাংশ; এবং গত এক দশকেও এর উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

এই প্রশ্নে আমরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের দিকে নজর দিতে পারি। সুইস আর্থিক পরিষেবা সংস্থা ইউবিএস (UBS) প্রকাশিত Global Wealth Report 2025-এ অসাম্য পরিমাপের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সূচক ‘গিনি সহগ’ (Gini Coefficient)-এর উল্লেখ করা হয়েছে। গিনি সহগ একটি গাণিতিক পরিমাপক, যার মাধ্যমে কোনও নির্দিষ্ট সমাজে বা দেশে সম্পদের বণ্টন কতটা সমতাপূর্ণ বা অসম তা নির্ণয় করা হয়। এই সূচকের মান যদি ০ হয়, তবে তা সম্পূর্ণ সাম্যকে নির্দেশ করে; অন্যদিকে মান যদি ১ হয়, তবে তা চূড়ান্ত অসাম্যের প্রতীক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের গিনি সহগ ০.৭৪, যা উচ্চমাত্রার সম্পদগত অসাম্যের ইঙ্গিত বহন করে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ভারতে ডলার-মিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ৯ লক্ষ ১৭ হাজার। অর্থাৎ, এই ব্যক্তিদের নিট সম্পদের পরিমাণ (মোট সম্পদ থেকে মোট দায় বাদ দিলে) ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার বা তার বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,

India’s high level of inequality means a small affluent segment remains insulated from the contraction. At the same time, more Indian households saw their gains erode due to currency fluctuation or inflation.

ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসাম্যের ফলে কীভাবে অতি ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় Wealth Tracker India 2026 শীর্ষক প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে Centre for Financial Accountability এবং Tax the Top উদ্যোগ।

এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের শীর্ষ পাঁচটি ধনী পরিবারের সম্পদ প্রায় ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের মোট সম্পদে নিম্নবিত্ত ৫০ শতাংশ মানুষের অংশীদারিত্ব মাত্র ৬.৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত পাঁচটি ধনী পরিবার হল— মুকেশ আম্বানি ও তাঁর পরিবার, গৌতম আদানি ও তাঁর পরিবার, সাবিত্রী জিন্দাল ও তাঁর পরিবার, সুনীল মিত্তাল ও তাঁর পরিবার এবং শিব নাদার। ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশে বর্তমানে ১,৬৮৮ জন ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ ১,০০০ কোটি টাকা বা তার বেশি।

প্রতিবেদনটি আরও জানাচ্ছে যে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মুকেশ আম্বানির সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫৩ শতাংশ এবং গৌতম আদানির সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৬২৫ শতাংশ।

এই বিপুল সম্পদকেন্দ্রীকরণের সামাজিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিবেদনে কয়েকটি তুলনামূলক হিসাবও দেওয়া হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ২০১৯-২০২৫ পর্বে মুকেশ আম্বানির সম্পদ বৃদ্ধির ওপর মাত্র ২ শতাংশ কর আরোপ করা হলে তিন বছর ধরে দেশের সমস্ত দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীকে বিনামূল্যে ল্যাপটপ দেওয়া সম্ভব হত। একই অর্থ দিয়ে ২.৫৮ কোটি মহিলাকে টানা দুই বছর মাসে ১৮,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া যেত। একইভাবে, প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী গৌতম আদানির সম্পদের ওপর ২ শতাংশ কর আরোপ করলে গোটা দেশের জন্য দুই বছরের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিষেবার ব্যয় মেটানো সম্ভব হত।

তথ্যের ভারে লেখাকে জর্জরিত না করেও বলা যায় যে ধনী-দরিদ্রের অসাম্য এবং অল্প কয়েকজনের হাতে সম্পদের কেন্দ্রীভবনের প্রবণতা ভারতে নতুন না হলেও ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর এই প্রক্রিয়া নতুন গতি লাভ করে এবং ২০১৪ সালের পর থেকে তা আরও তীব্র হয়েছে। ভারত পশ্চিমের লিবারেল ইকোনমিক মডেলের ধ্বজা তুলে ধরে বহুজাতিক কর্পোরেশনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে অর্থনীতিকে চালাতে চায়। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে পশ্চিমের দেশগুলোতে জনস্বাস্থ্য, সর্বজনীন শিক্ষা, পেনশন এবং বিমার মতো নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প থাকার কারণে উদারীকরণের অভিঘাত ভারতের মতো এতটা ধ্বংসাত্মক হয়নি। ভারতে বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির পরিকল্পনামাফিক বেসরকারিকরণ ও বিলগ্নীকরণ নাগরিকের সামাজিক সুরক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কর্পোরেট সংস্থাগুলির একমাত্র লক্ষ্য যেহেতু সর্বোচ্চ মুনাফা তাই কর্মসংস্থানও হ্রাস পায় এবং জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশের কাছে উদারীকরণের প্রতিশ্রুত সুবিধা মরীচিকা হয়ে থেকে যায়। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক এবং আইএমএফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ভারতের জিডিপি ২.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যেখানে ঋণের পরিমাণ ২.৬২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। মুক্ত বাজার অর্থনীতির নামে আদতে স্থাপিত হয়েছে ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের রাজত্ব।

১৯৯১ সালে ভারতে অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় জাতীয় সম্পদের প্রায় ১৬ শতাংশ ছিল সমাজের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ মানুষের হাতে। অন্যদিকে, নিম্নবিত্ত ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল মোট সম্পদের প্রায় ২৫ শতাংশ। আজ পরিস্থিতি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা আমরা লেখার শুরুতেই দেখেছি।

এই তথ্যগুলি একটি স্পষ্ট আখ্যান তুলে ধরে। ১৯৯১ সালে ভারতীয় অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ২৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; ২০২৫ সালে তা ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই প্রবৃদ্ধির সুফল কারা পেয়েছে? এই প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ভিআর সূর্যবংশীর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: “Crony capitalism is not a side effect—it is the operating system of India’s neoliberal model.”

এই মাগ্‌গিগণ্ডার বাজারে নিম্নবিত্ত ৫০ শতাংশ মানুষের গড় আয়ের বার্ষিক বৃদ্ধির হার গত এক দশকে ২ শতাংশের কম। সামাজিক খাতে রাষ্ট্রের দায় নিয়ে প্রশ্ন করাও অর্থহীন। কারণ ভারতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় এখনও জিডিপির মাত্র ২.১ ও ২.৯ শতাংশ মাত্র।

অসাম্য কোনও স্বাভাবিক বা অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতির ফল। আজ যে গগনস্পর্শী বৈষম্য আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা আমাদের গৃহীত নীতি, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামোরই প্রতিফলন।

এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের পরিণতিও আমাদের সামনে স্পষ্ট। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান, ভঙ্গুর গণতন্ত্র, পরিবেশগত সংকট, অপুষ্টি এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা— সবই আজ আমাদের চোখের সামনে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সম্পদের পুনর্বণ্টন, উচ্চ সম্পদশালীদের ওপর কার্যকর করব্যবস্থা, এবং সেই রাজস্বকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে ব্যয় করার মতো পদক্ষেপ বৈষম্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন পলিসি পরিবর্তনে সরকারের সদিচ্ছা।

 

তথ্যসূত্র:

 

Exit mobile version