Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

প্রাগে হলোইন

নিরুপম চক্রবর্তী

 

অপার্থিব কুয়াশায় ঢেকেছিল প্রাগের আকাশ সেই রাতে।
আধিভৌতিক কিছু বর্ণালীতে বিচ্ছুরিত লাল
সুররিয়াল চিত্রকল্প কিছু
এলোমেলো ঢেউ হয়ে ভেসে যায় সেই কুয়াশায়
হলোইনে অন্ধকার রাতে।

রহস্যের সেই কুয়াশায়, অটোপাইলটে বুঝি উড়ে আসে একটি বিমান
নিরুপম জানালার সিটে।
দপ্‌দপ্‌ করে জ্বলে ডানার প্রান্তে আলো
‘কার এল মরণের কাল?’
লালকমল-নীলকমল হাতে নিয়ে খোলা তরোয়াল
উড়ে যায় বিমানের সাথে।

তারপর?

দু’হাজার বাইশ সাল। অক্টোবর মাসের শেষ দিন।
ভারতীয় নিরুপম ডায়েরিতে এইসব গল্প লিখে গেছে:
অবতরণের গল্প তারপরে। প্লেন থেকে। প্রশ্ন শুধু, কোথায় বা কবে?
কিংবা কীভাবে?
ভাতস্লাভ হাভেলের নামাঙ্কিত বিমানবন্দরে?
নাকি অন্যকিছু, নাকি অন্য কোনওখানে?
অন্য দেশ? অন্য গ্রহ? কিংবা অন্য কালে
কালের পথিক হয়ে নিরুপম হারিয়ে গিয়েছে?

এসব প্রশ্নের কোনও উত্তর মেলেনি কুয়াশায়।
সেই রাতে কোনও এক মেঠো পথ বেয়ে
হেঁটে গেছে নিরুপম।
চারপাশে কুয়াশার ফাঁকে
ভয়ার্ত অস্ফুট স্বর। ছায়া ছায়া
কিছু হাতছানি।
প্রান্তরের এক কোণে গাঢ় অন্ধকারে
একটি লণ্ঠন জ্বলে আছে।

নিরুপম গিয়েছে সেখানে।
আবছায়া, আধো আলো, সেইখানে একটি লিখন
(নিরুপম পড়েছিল গুগুলানুবাদে!):

৩০শে অক্টোবর, ১৯৭৫ সাল
মন্টিনিগ্রো থেকে উড়ে আসা একটি বিমান
(ওয়াই-ইউ-এ জে ও) ভূপতিত হয় এইখানে।
৭৯ জন মৃত, তাদের স্মরণে
আজ রাতে জ্বলে এই আলো!

২০২২-এর হলোইন: প্রাগ নগরীর এক অজানা অঞ্চলে
(প্রাহা-সুখদলে)
মানুষে জন্য জ্বলা, মানুষের জ্বেলে রাখা আলো
লালকমল-নীলকমল, একরাশ অশরীরী, আর সেই নিরুপম
মুগ্ধ হয়ে বুঝি দেখেছিল!

 

 

প্রাগে চুল কাটার বিবরণী অথবা প্রাগে শীত আসে

অলৌকিক সন্ধ্যা নামে প্রাগ শহরেতে, আমি এক
মায়াবী সেলুনে চুল কাটি।
মেয়েটি নাপিত, তার সপ্রতিভ মুখশ্রীতে রহস্যের
আলোছায়া খেলে।
অতীব দক্ষ হাতে চালায় ক্লিপার, কাঁচি দিয়া ছিমছাম করে
আমার এ কেশদাম (ইদানীং যাহা প্রায় ইন্দ্রলুপ্ত) আর
অনর্গল কথা বলে, অবিরাম গল্পগাছা করে
(যেরকম করে থাকে নরসুন্দরেরা, পৃথিবীর সব মহাদেশে!)
‘আমিও তোমার মতো বিদেশি এদেশে অধ্যাপক’
(মেয়েটির বাক্যবন্ধ অতীব মসৃণ)
‘এখানে একাই থাকি, কাজ করি, যেরকম তুমি করিতেছ’
(কী যে কাজ করো তুমি, ব্লু-কলার? হেঁ হেঁ আমি সফেদ কলার! ভেবে আমি আত্মগর্বে মজি।)
‘আত্মীয় স্বজন সব বহুদূরে।’ ‘কতদূরে? তা সে তো অনেক ক্রোশ, স্লোভাকিয়া দেশে!’ ‘হাসিতেছ? হাসো তবে! মানিতেছি প্রতিবেশী দেশ, ইন্ডিয়া আরও বহুদূর। তথাপি তো প্রাগ নয় ব্রাতিস্লাভা, প্রাগ কি তোমার কলিকাতা?’
এরূপ চলিতে থাকে অনর্গল কথোপকথন।
ক্লিপার চলিতে থাকে, বহুবিধ পরিচর্যা চলে তার সাথে
যাহা খড়্গপুরের ওই মনোরঞ্জন, না শিখিয়া আমার চুল
কাটিয়াছে সারাটি জীবন!

মায়াবী সেলুনে দেখি খেলা করে আলোছায়া,
আশ্চর্য ম্যাজিক যেন ঘিরিতেছে দৃশ্যপট,
বাতিগুলি স্তিমিত হইতে থাকে, পরক্ষণে দীপ্ৰ হয়ে উঠে
(কী যেন হইতে পারে, কী বা যেন ঘটে!)
মেয়েটি ক্লিপার চালাতেছে
আমি আজ শেষ কাস্টমার
প্রাগ শহরের এই মায়াবী সেলুনে।

বলিতে ভুলিয়া গেছি
মেয়েটির সর্ব অঙ্গে ট্যাটু।
পেলব হস্তটি জুড়ি আঁকা এই আশ্চর্য উল্কিটি:
আকাশেতে ভ্রমিতেছে ঝাঁকে ঝাঁকে বলয়িত ইলেকট্রন কণা,
ভূপৃষ্ঠে বালিকা এক তাহার দিকেতে চেয়ে আছে।
ব্রাতিস্লাভা শহরেতে কোয়ান্টাম রসায়ন পাঠরতা সেই বালিকাটি
প্রাগ শহরের এক অন্যকোনও উনিভার্সে
ম্যাজিক সেলুনে আসি
আজ আমার চুল কাটিতেছে!

সম্পন্ন হইয়া যায় কেশকর্তন তথা অনুষঙ্গে অন্যসব
পরিচর্যাগুলি। পাঁচশত চেক ক্রাউন তাহাকে গণিয়া দিই,
যুবতীটি স্নিগ্ধস্বরে ধন্যবাদ বলে।

দরজার বাহিরে আসি।
প্রবল কুয়াশা আজ এই সন্ধ্যা ঘিরে ধরে আছে।
সেলুনের বাতি জ্বলে, মেয়েটি দাঁড়ায়ে আছে বাহির দুয়ারে:
উত্তোলিত দুই বাহু, বলয়িত ইলেকট্রনে বহ্নিশিখা জ্বলে।
সুবিশাল ডানাদুটি ঝাপটায়, হয়ত এবার উড়ে যাবে
ব্যান্ডগ্যাপ পার হয়ে,
অন্যকোনও কোয়ান্টাম স্টেটে।
কে জানে সেই জগৎ ব্রাতিস্লাভা, কিংবা অন্যকিছু।
আমি তো জানি না তাহা। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা জানে?

কুয়াশায় উড়ে যায় অপরূপ দুটি হাত
প্রজ্বলিত ইলেকট্রন আঁকা ছিল তাতে।

মেপলের পাতা ঝরে, শিরশিরে হওয়া বয়, প্রাগে শীত আসিবে এবার।।