Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

তিন মাতালের প্রাগ বা লঘু মুহূর্ত ফিরে আসে

নিরুপম চক্রবর্তী

 

তিনটে মাতাল মিলে একদিন প্রাগ শহরেতে
বেজায় হুল্লোড়ে মাতে, অসীম আমোদগেঁড়ে তারা
ধেই ধেই নেচে যায় ফুটপাত জুড়ে,
জোরে হাসে, জোরে সিটি মারে
তারপরে হুড়মুড় রাস্তা পার হয়ে জোর হাঁটা,
চলন্ত ট্রামের নিচে একটু হলেই ওই
তিনটেই পড়েছিল কাটা!

বেজায় আহ্লাদে তারা নাচতে নাচতে দেখি
ভাল্ত‌ভা নদীর দিকে যায়
(মুক্তপ্রাণ বোহেমীয়, তাদের মাতাল বলা বেজায় অন্যায়!)
নদীর ধারেতে আজ কারা যেন সারসার কবিতা লটকেছে
ইয়ান স্ক্যাসেল বলে কবি এক লিখে গেছে
বসন্তের আগমনী গান:
মাতালেরা পড়েছে সেসব আর বেজায় হেসেছে!
‘প্রাগের বসন্ত সে তো আমরাই,
আমাদের বদনাম এখানে করেছে কোন ব্যাটা?’
এই বলে যেই তারা ছিঁড়েছে প্রথম কবিতাটা
দেখেছে সেটার নিচে ওরকমই আরেকটা কবিতা,
তার নিচে আরও একখানি!
(দ্রৌপদীর শাড়িময় এসব কবিতা প্রাগে কারা যে লিখল তা কি জানি?)
বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে ঘাসেতেই শুয়ে পড়ে
তিনজন বিদগ্ধ মাতাল!

নদীতে বিষণ্ণ স্রোত, স্মিত রোদে ভরে আছে ঘাস
অদূরে চুম্বনরতা দুই নারী
রামধনু পতাকার সারি,
মুগ্ধ হয়ে দ্যাখে আর কবিতায় চুমু খায়
প্রাগের ওই তিনটি মাতাল,
খুব হাসে, তারপরে বলে:
‘ট্রামে কাটা পড়লেই কবি হতে হত,
আরে শালা কী যে বেঁচে গেছি!’

দুপুর গড়িয়ে যায় ভর সন্ধ্যায়।

 

প্রাগ ক্রনিকল

ক্রমশ পারদ নামে, দিনের পরিধি কমে আসে
মুদ্রাস্ফীতি ১৮ শতাংশ ছুঁয়ে গেল
শহরের কেন্দ্রবিন্দু তবু ভরা ট্যুরিস্টের ভিড়ে।
রাস্তায় চেয়ার পেতে রেস্তোরাঁর দরজা আগলিয়ে
চলার পথেতে দেখি জলজ্যান্ত রাজা বসে আছে!
মাথায় মুকুট তার, রাজবেশ, হাতে রাজদণ্ডটিও খাসা,
বিষণ্ণতা ভরা দুটি চোখ যেন, অবিন্যস্ত চুলগুলি, নিরানন্দ হে রাজাধিরাজ
মধ্যরাত্রি, ঘণ্টা বাজে, অদূরেই জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ন্ত্রিত ঘড়ি,
তাকিয়ে দেখেছ তুমি বিপরীতে টাইন গির্জায়
নিরাপদ কবরের বাসস্থান ছেড়ে,
ধড়মড় করে জাগে টিকো ব্রাহে
জ্যোতির্বিদ, যদিও অধুনা সে যে নিছক কঙ্কাল।
একহাতে সেকস্ট্যান্ট, অন্যহাতে তরোয়াল নিয়ে,
রাজা দ্যাখে, টিকো ব্রাহে মঙ্গলের গতিপথ মাপে।
নাসিকাবিহীন টিকো: কে কত গণিত জানে, এই নিয়ে বিতণ্ডার জেরে
ডুয়েল লড়ার পরিণতি! আঠা দিয়ে সাঁটে টিকো
ধাতব নাসিকা তার, অস্থিসার মুখে। জ্যোতির্বিদ্যা লগ্ন ঘড়িটিতে
ঘণ্টা বাজায় এক নামহীন সফেদ কঙ্কাল:
এ অবধারিত মৃত্যু, একমাত্র শেষ সত্য, প্রতিটি ঘণ্টায়
গমগম করে সেই নোটিশ পাঠানো তার কাজ!
টিকো ব্রাহে হেঁটে যায় সুপ্রাচীন স্কোয়ার পেরিয়ে,
অদূরেই বাস যার, তার শিষ্য যোহানেস কেপলারের খোঁজে।
‘বেজায় বহেস হবে আজ রাতে’, বলে হাসে ঘড়ির কঙ্কাল:
‘দুটোই কবিতা লেখে, টিকো আর কেপলার,
চাই একটা জব্বর ডুয়েল
হয় যদি হোক ফয়সালা,
আরে শালা,
রাতটা তো কেটে যাবে বেজায় আমোদে!’

রাজা দ্যাখে, রাজা শোনে সবকিছু, রাজা থাকে
নিরুত্তর, স্থির।
নাতিদূরে কাফকা স্কোয়ারে
ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে লেখকের সৃষ্ট চরিত্রেরা:
দুঃখী তারা, বিষণ্ণ অস্তিত্ব সব
বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে উঠে আসা একরাশ দুঃখী মানুষেরা
কোনও এক বিষণ্ণ রাজার দিকে হেঁটে যায়।
তাদের বিদায় দ্যান রাজা
এ মুহূর্তে সামনে একটি নারী
(‘সে যেন জীবন্ত এক অগ্নিশিখা’— ফ্রানজ় কাফকা নিজে লিখেছিল!)
তাকে তো চিনতে পারি
মিলেনা যেসেনস্কা তার নাম!
(সেই কবে, বহু চাঁদ আগে
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে,
সে এক কিশোর বুঝি গোগ্রাসেতে গিলেছিল
মুগ্ধ কাফকার লেখা পত্রগুচ্ছ তাকে!)

প্রাগের প্রথম শীতে আমাকে ডাকেন রাজা:
‘আমি যেন আমাকেই ডাকি!’
‘যেন লীন হয়ে যাই আমাতেই আমি’
অন্তরীক্ষে জ্বলে ওঠে হারানো সুপারনোভা
(টিকো ব্রাহে যাকে দেখেছিল তার
হারানো স্বদেশে।)
আমি আর রাজা দেখি
ব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংস আর পুনর্জন্ম
পরস্পর কণ্ঠলগ্ন হয়ে
(মিলেনা কি আমাদের দ্যাখে?)
টিকো আর কেপলার অবশেষে যোগ দ্যায়
সুবিশাল বিতণ্ডার শেষে!

কাফকা অবশ্য জানে
ভোরের আলোয় আমি প্রথম মেট্রোতে
মানুষের ছদ্মবেশে বাড়ি ফিরে যাব।
রাস্তায় চেয়ার পেতে বসে থাকবেই ওই
প্লাস্টিকের রাজা!
(ভিয়েতনামি চু-দা-খাই এসে
খুলবে দোকান তার সাত সকালেতে)
আসলে রাজা ও আমি, এবং মিলেনা
টিকোর কঙ্কালটাকে বিদায় জানিয়ে
পুনর্বার গাঢ় শীতে, রাতের জাদুতে
আবার কখনও বুঝি চার্লস ব্রিজ পার হয়ে
প্রাগের দুর্গেতে হেঁটে যাব।

কাফকা আসবে বলে গেছে।।


*হেডারে কোলাজের ছবিগুলি কবির তোলা