Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বিরসা মুন্ডা ১৫০, উলগুলান ১২৫— নবম বর্ষ, পঞ্চম যাত্রা

স্টেশনমাস্টারের কলাম

 

উলগুলানের ১২৫ বছর পরে লড়াইয়ের ধরন বদলায়নি, বদলেছে শত্রুর বিন্যাস। তখন লড়াই ছিল ঔপনিবেশিক শাসন ও জমিদারির বিরুদ্ধে; আজ তা রাষ্ট্র, কর্পোরেট পুঁজি ও সংখ্যাগুরুবাদী মতাদর্শের একযোগে সাঁড়াশি আক্রমণের বিরুদ্ধে। এই সংখ্যার লেখাগুলি সেই চলমান সংঘর্ষেরই পাঠ দেয়। আমাদের মনে করায়, যে উলগুলান কোনও বন্ধ অধ্যায় নয়— এটি এখনও চলমান এক প্রশ্ন, কার ইতিহাস ইতিহাস হয়ে ওঠে, আর কার কণ্ঠকে গণতন্ত্রের নামে নীরব রাখা হয়। মনে করায় মূলনিবাসীদের দৃপ্ত উচ্চারণ— “আবুয়া দিশুম, আবুয়া রাজ— আমাদের দেশ, আমাদেরই রাজ; জল–জঙ্গল–জমির উপর আমাদের অধিকার।”

 

উলগুলানের সোয়াশো বছর পরেও ভারতবর্ষের মানচিত্রে এক দুর্দৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— এই যুদ্ধের মূল উপলক্ষ আদিবাসী ভূখণ্ড ও জীবনের উপর দখলদারি, আর আক্রমণকারীর পরিচয় প্রতিটি সংবেদনশীল ভারতবাসীরই জানা। বিরসা মুন্ডার ১৫০তম জন্মবার্ষিকী ও উলগুলানের ১২৫ বছর পূর্তি স্মরণ করতে গিয়ে এই বিশেষ সংখ্যার লক্ষ্য তাই কেবল অতীতের বীরগাথা পুনরুচ্চারণ নয়; বরং বর্তমানের সুসংবদ্ধ, সুপরিকল্পিত আক্রমণকে চিহ্নিত করা, যেখানে “মাওবাদ দমন”, “উন্নয়ন” এবং “জাতীয় নিরাপত্তা”র নামে আদিবাসী সমাজকে ক্রমাগত ঘিরে ফেলে কোনঠাসা করে দেওয়া হচ্ছে।

সরকারি জনশুমারি (২০১১) ও ট্রাইবাল অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী, আদিবাসীরা ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮.৬ শতাংশ— আনুমানিক ১০ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। কিন্তু উন্নয়নজনিত উচ্ছেদ নিয়ে গবেষণাগুলি দেখাচ্ছে, স্বাধীনতার পর থেকে বড় বাঁধ, খনি, বিদ্যুৎ ও শিল্প প্রকল্পের কারণে যাঁরা ভূমিচ্যুত হয়েছেন, তাঁদের প্রায় ৪০ শতাংশই আদিবাসী। অর্থাৎ জনসংখ্যায় সংখ্যালঘু হয়েও উচ্ছেদের ক্ষেত্রে তাঁরা সংখ্যাগুরু। অর্থাৎ, আমাদের দেশের উন্নয়ন মডেল আদিবাসী ভূখণ্ড ও জীবনকে মূলধন হিসেবে ব্যবহার করেছে, এবং উচ্ছেদের বিনিময়ে দিয়েছে অপ্রতুল পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ।

দেশের উন্নয়নের অনুপম ছবিটিকে যদি “বাম চরমপন্থা”–প্রভাবিত জেলার মানচিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, একটি স্পষ্ট ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ধরা পড়ে। যেসব জেলাকে “লেফট উইং এক্সট্রিমিজ়ম” দমনের অগ্রাধিকার এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তার বড় অংশই পঞ্চম তফসিলভুক্ত, আদিবাসী–অধ্যুষিত অঞ্চল। এইসব জায়গায় বনাধিকার, জমির পাট্টা, স্কুল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো মৌলিক দাবিকেও সহজে “মাওবাদী প্রভাব” বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। তার পর আসে যৌথ বাহিনীর অভিযান, কঠোর আইন এবং গ্রেপ্তার–আন্ডারট্রায়াল–হাজতের এক দীর্ঘ কালচক্র।

২০১৪ সালের পর থেকে নিরাপত্তা অভিযান ও সম্পদ দখলের এই যুগল প্রক্রিয়া আরও তীব্র হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রায় ৭২ হাজার হেক্টর বনভূমি, যার বড় অংশ আদিবাসী এলাকায়, অ–বনায়ন কর্মে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে— অধিকাংশই খনি, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য। একই সময়ে পরিবেশগত ছাড় সহজ করা, জনশুনানি দুর্বল করা এবং বনাধিকার আইন ও PESA–এর অধীনে গ্রামসভার সম্মতির গুরুত্ব খর্ব করার প্রবণতাও স্পষ্ট হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা দেখাচ্ছে, নীতিগত এই পরিবর্তন কর্পোরেট পুঁজির প্রবেশ সহজ করেছে, এবং আদিবাসীদের সুরক্ষা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। ছত্তিশগড়ের হাসদেও অরণ্য বা ওড়িশার সিজিমালি বক্সাইট অঞ্চল— উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন, জোরপূর্বক জনশুনানি, আন্দোলনকারীদের আটক এবং গ্রামসভার সম্মতি ছাড়াই প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ। খনি যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে সামরিকীকরণ এবং আদিবাসী অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে “মাওবাদী” বা “উন্নয়ন–বিরোধী” তকমা।

এই সবকিছু ঘটছে এমন এক প্রেক্ষিতে, যেখানে আদিবাসীদের মানব উন্নয়ন সূচক আগেই পিছিয়ে। NFHS-৫-এর তথ্য বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, নির্ধারিত উপজাতির শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও খর্বাকৃতির হার এখনও জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি। নিরাপদ পানীয় জল, পয়ঃনিষ্কাশন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে কাঠামোগত ঘাটতি রয়ে গেছে, যদিও সারা দেশের ক্ষেত্রে ছবিটা অগ্রগতির।

এই ক্রমাগত বঞ্চনার ওপর দাঁড়িয়ে নাম-বদলের রাজনীতি— “আদিবাসী” বনাম “বনবাসী”— একটি নতুন আদর্শিক আক্রমণ হিসেবে সামনে এসেছে। “আদিবাসী” শব্দটি এই ভূমির আদি অধিবাসী হিসেবে ঐতিহাসিক অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি বহন করে। বিপরীতে “বনবাসী” শব্দটি তাঁদের কেবল বন-নির্ভর বাসিন্দায় নামিয়ে আনে, যেন তাঁরা এই ভূমির মালিক নন। এর ফলে বনাধিকার আইন, পঞ্চম তফসিল ও স্বশাসনের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করার সুযোগ তৈরি হয়। এই কারণেই বহু আদিবাসী সংগঠন “আদিবাসী” পরিচয়কেই আত্মপ্রতিষ্ঠার ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

উলগুলানের ১২৫ বছর পরে লড়াইয়ের ধরন বদলায়নি, বদলেছে শত্রুর বিন্যাস। তখন লড়াই ছিল ঔপনিবেশিক শাসন ও জমিদারির বিরুদ্ধে; আজ তা রাষ্ট্র, কর্পোরেট পুঁজি ও সংখ্যাগুরুবাদী মতাদর্শের একযোগে সাঁড়াশি আক্রমণের বিরুদ্ধে। এই সংখ্যার লেখাগুলি সেই চলমান সংঘর্ষেরই পাঠ দেয়। আমাদের মনে করায়, যে উলগুলান কোনও বন্ধ অধ্যায় নয়— এটি এখনও চলমান এক প্রশ্ন, কার ইতিহাস ইতিহাস হয়ে ওঠে, আর কার কণ্ঠকে গণতন্ত্রের নামে নীরব রাখা হয়। মনে করায় মূলনিবাসীদের দৃপ্ত উচ্চারণ—

আবুয়া দিশুম, আবুয়া রাজ— আমাদের দেশ, আমাদেরই রাজ; জল–জঙ্গল–জমির উপর আমাদের অধিকার।

 

বছরের শেষ এই সংখ্যার অন্যান্য বিভাগগুলি নিয়ে দুটি কথা বলা আবশ্যক। এই ২০২৫ সনটি অনেক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্বেরই শতবর্ষ, সার্ধশতবর্ষ, এমনকি সার্ধদ্বিশতবর্ষও চিহ্নিত ছিল। গত সংখ্যায় আমাদের রিজার্ভড বগিটি আমরা নিবেদন করেছিলাম এমনই এক ব্যক্তিত্ব ইলা মিত্রকে, এই সংখ্যায় বেছে নিয়েছি বিরসা মুন্ডাকে, বাদ পড়ে গেলেন অনেকেই— সে-জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। তবুও এই সংখ্যার স্মরণ-বিভাগে আমরা স্মরণ করলাম আখ্যানকার জেন অস্টেনকে, এবং চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটককে। শুধু এঁরাই নন, অনেক যুগান্তকারী ঘটনারও শতবর্ষ পার করলাম আমরা এই ২০২৫-এ। তেমনই একটি— সের্গেই আইজেনস্টাইনের কালজয়ী সৃষ্টি ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’-ও ১০০ বছরে পদার্পণ করল এই সদ্য-বিগত ডিসেম্বরে। সেই ঘটনাকে স্মরণ করে পোটেমকিনের নির্মাণ সম্পর্কে আইজেনস্টাইনের একটি রচনা আমরা প্রকাশ করলাম এই সংখ্যার স্টিম ইঞ্জিন-এ। অন্যান্য নিয়মিত বিভাগগুলি রইল যথারীতি।

পড়বেন, মতামত জানাবেন, সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা…