এক চন্দ্রাহত হরিণীর গল্প

রূপায়ণ ঘোষ 

 

চার্চের ঘন্টাটা একটানা দীর্ঘক্ষণ বাজতে বাজতে একসময় থেমে গেল। রাত ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে, কুয়াশার গাঢ় চাদরে ঢাকা জঙ্গলটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রাত্রির ঘনঘোর শরীরটাকে চোখের আড়ে মেপে নিচ্ছিল শিবু।

বারান্দায় ঝোলানো লণ্ঠনটা মিটমিট করে জ্বললেও তার আলো এই শীতল অন্ধকারের জন্য যথেষ্ট নয়। তবুও প্রতিটা বনবাংলোর বারান্দায় এভাবে আলো জ্বালিয়ে রাখা কেয়ারটেকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেই দায়িত্বটুকু শেষ করে বাংলোর ভিতর বন্ধ কাচের জানালা থেকে কুয়াশাঝরা রাত্রির দিকে চেয়ে ছিল শিবু সোরেন। দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক শূন্যতা— পঁয়ষট্টি বছরের দীর্ঘ জীবনে এত শোক সে সঞ্চয় করেছে যে সেসবের গণনা অবধি ভুলতে বসেছে। কেবল ময়ূরীর চিন্তাটা তাকে দিনরাত কুরে কুরে খায়।

নিজের নাতনি তবুও তার স্বভাবের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারে না শিবু। এই স্বভাবদোষেই ওর মা সমস্ত কিছু খুইয়েছিল; অথচ তার চরিত্তির বদলায়নি এতটুকু! এত কিসের আগুন ওর শরীরে, শিবু বুঝতে পারে না। প্রতি রাতে দেহের নিদারুণ খিদে নিয়ে মেয়েটা নিশির মতো সমস্ত জঙ্গল চষে বেড়ায়।

আজও রাত বাড়তেই জঙ্গলের গভীরে হারিয়ে গেল ময়ূরী, গোটা হিমরাত্রিটা কাটাবে কোনও আগুনের পাশে। ভোর ভোর যখন ফিরে আসবে, সঙ্গে থাকবে নতুন কোনও নাগর। টলতে টলতে উঠে যাবে বাংলোর দোতলায়, তারপর আর ভাবতে পারে না শিবু। বৃদ্ধ বয়সে এত কিছু ভাবতে গিয়ে তার গা গুলোয়, বমি ওঠে।

আস্তে আস্তে জানালার কাছ থেকে সরে এসে ফায়ারপ্লেসের পাশে বসল সে। উত্তরাখণ্ডের এই বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমিতে শীত হামেশাই খুব জোর দিয়ে পড়ে, এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। এর মধ্যেও মেয়েটা বেরিয়ে গেল! ঘড়িতে চোখ রাখল সে— বারোটা প্রায় বাজতে চলেছে। দূরে কোথাও রাতচরা পাখিরা সমস্বরে ডেকে উঠল। টিকটিক করে ঘুরে যাওয়া ঘড়ির কাঁটা আর ধিকিধিকি আগুনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে, শিবু বসে রইল ভোরের অপেক্ষায়।

 

নেশার ঘোরে পা টলমল করছিল ময়ূরীর। দীর্ঘাঙ্গী তাম্রবর্ণা মেয়েটির নেশাগ্রস্ত শরীর থেকে যৌবন যেন ছলকে ছলকে পড়ছে। যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড তেষ্টা মেটানোর অদম্য বাসনায় এগিয়ে চলেছে সামনে। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে অনেকটা যাওয়ার পর একটা ক্যাম্পফায়ারের আলো চোখে পড়ল তার। ঝোপঝাড় ভেঙে সামনে আসতেই পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে রইল ময়ূরী। ক্যাম্পের আগুনের পাশে খাটিয়ার উপর বসে রয়েছে অনিন্দ্যসুন্দর এক পুরুষ— মধ্যবয়স্ক অথচ তার পৌরুষ প্রলুব্ধ করতে পারে যে কোনও নারীকে। সম্মোহিতের মতো লোকটির দিকে এগিয়ে গেল ময়ূরী, কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটির চমক ভাঙল। এই প্রবল শীতরাত্রে তীক্ষ্ণ-যৌবনা এক নারীকে জনশূন্য বনাঞ্চলে দেখে লোকটি হয়ে উঠল লোভাতুর। ময়ূরী ধীরে ধীরে মদের বোতলটা তুলে ধরল তার সামনে— মুহূর্তের মধ্যে দুজনেই মাদকের তীব্রতায় ডুবে যেতে লাগল, ডুবে যেতে লাগল পরস্পরের শরীরের ভিতর। মহাঘোর অরণ্যের মাঝে দাউদাউ আলোর গায়ে ফুটে উঠছে মৈথুনের আদিম চিত্র। দুই নর-নারীর সম্ভোগ শীৎকারে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। রাত্রির গা বেয়ে নেমে আসা তরল কুয়াশাও যেন কামনার উষ্ণ আঁচে ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠল।

এই অনিবার্য মিথুনক্রিয়া লক্ষ করে, দূরে গাছের আড়ালে এক চন্দ্রাহত হরিণ অস্থির হয়ে উঠতে থাকল ক্রমাগত।

দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে ছুটে চলেছে অন্ধকার চিরে; তার অতৃপ্ত কামনা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গিনীর কাছে। বেশ কিছু দূর গিয়ে আস্তে আস্তে থমকে দাঁড়ালো হরিণটা, প্রলুব্ধকর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই হরিণী! চাঁদের লাস্যময়ী আলো তার চোখ ও দেহের উপর পেয়ালা উল্টানো মধুর মত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে অবিরাম। শরীর থেকে বাতাসে মিশে যাচ্ছে আশ্চর্য কস্তুরীগন্ধ, মায়া-আবেশ! সতর্ক ভঙ্গিতে হরিণীর গা ঘেঁষে আসতেই অরণ্য-জীবনে ঝড় উঠল। শীতল চন্দ্রকিরণে অব্যক্ত দুই মৈথুনকামী জীব ভিজে যেতে লাগল অবলীলায়।

রাত্রির দিকে এগোতে এগোতে সময়ের চাদরে নক্ষত্রেরা মুখ লুকোতে শুরু করেছে, কেউ কোথাও জেগে নেই। চারটি অদম্য জীব কেবল নিজস্ব শীৎকার সৃজনে মগ্ন!

 

অকস্মাৎ একটা দড়াম শব্দে তন্দ্রা কেটে গেল শিবুর। উত্তর দিকের জানালার পাল্লাটা হাওয়ার ঝাপটায় আলগা হয়ে খুলে গেছে, তড়িঘড়ি উঠে তা বন্ধ করে এল সে। ফায়ারপ্লেসের আগুনটা ধিকিধিকি করে প্রায় নিভে এসেছে; শিবু ঘড়িতে চোখ রাখল— চারটে বাজতে আর কিছু বাকি। এই সময়টা এখানে হু হু করে শীত বাড়ে, অথচ মেয়েটা ফিরল না এখনও। মায়ের স্বভাবটাই পেয়েছে সে।

মেয়ের কথা স্মৃতির ভিতর উঁকি দিতেই সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিষণ্ণ অচল হয়ে উঠল শিবুর। কাজরীরও শখ ছিল এই বিশাল বিস্তৃত বনাঞ্চলে উড়ে বেড়ানোর, দিন-রাত যে কোনও সময় নিশুতি রঙের সুগঠিত দেহে হারিয়ে যেত গভীর অরণ্যের আনাচে-কানাচে।

সারি সারি স্তব্ধ নিশ্চুপ গাছেদের মাঝে তার অদম্য যৌবন খুঁজে বেড়াত সমর্থ হৃদলগ্ন পুরুষ। দীর্ঘ খোঁজের পর সেই অসম্ভব সুপুরুষ সাহেবের দেখা পেয়েছিল সে, দূর-চার্চের কোনও এক কাজে আসা বার্টন সাহেব। নানান অছিলায় তাদের মেলামেশার সাক্ষী থেকেছে শিবু; তাই বাপের মত নীল সমুদ্র মাখা চোখ ও কোমরের কাছে মেঘাকৃতি লাল জড়ুল নিয়ে যখন জন্মাল ময়ূরী— শিবুর গর্ব ছিল মহামান্যতার, সৌন্দর্যের। অতখানি আশ্চর্য রূপ নিয়ে কেউ বেড়ে ওঠেনি এ তল্লাটে।

কিন্তু সেই গর্বের প্রাসাদ ভেঙে যেতে সময়ও লাগেনি, দেশ থেকে খবর এসেছিল বোধহয়— এক গভীর রাত্রে সকলের অজ্ঞাতে বার্টন সাহেব এই উপত্যকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। হৃদয়ের সংযোগ কতখানি বেদনাবিধুর সেদিন তা উপলব্ধি করেছিল শিবু। চলে যাওয়ার কয়েক মাসের ভিতরেই অদ্ভুত উপসর্গ দেখা দিতে থাকে কাজরীর। সে যে আস্তে আস্তে পাগল হয়ে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছিল তা।

চোখের সামনে নিজের পৃথিবীটার একটু একটু করে তছনছ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য স্থবির পাথরের মতো প্রত্যক্ষ করছিল শিবু। তারপর হঠাৎ এক সমাধিলীন ভোরে কাজরীকে গাছের ডাল থেকে ঝুলতে দেখা গিয়েছিল। ময়ূরী তখন ছটা ফাগ পেরিয়েছে মাত্র, একটি প্রাণোচ্ছ্বল জীবন্ত শিশু কেমন করে যেন পাল্টে যাচ্ছিল! জঙ্গল, কুয়াশা-গভীর রাত, চন্দ্রালোক ভেজা প্রান্তর আর অবিরাম পুরুষের খোঁজ।

শিবু জিজ্ঞেস করেছিল, “কী খুঁজিস এভাবে তুই?” তলোয়ারের ফলার মতো শাণিত বাঁকা দৃষ্টিতে ময়ূরী উত্তর দিয়েছিল, “প্রতিশোধ।”

সেদিন থেকেই ওকে যেন অন্য এক পৃথিবীর বলে মনে হয়! যেন চন্দ্রাহত কোনও যোগিনী স্তব্ধ চরাচর জুড়ে সন্ধান করে চলেছে শাপমোচনকারী একটি রাতের।

 

ধীরে ধীরে এই বিশাল প্রান্তর জুড়ে ধূসর-চাদর বিছানো একটা ভোর অঙ্কুরের মতো ফুটে উঠতে লাগল। নিশাচর পক্ষীদের শুরু হল অস্থির আত্মগোপন, দিবসগামী পাখিদের ডানা ঘুমের জটিল ফাঁস ভেঙে বাক্যহীন সরলতায় খুলে যেতে থাকল। তাদের মৃদু অথচ তীক্ষ্ণ শব্দে মন্থর ছায়ার মতোই ঘুম সরে গেল ময়ূরীর চোখ থেকে। দূর ঝোপের পাশে হরিণটিও জেগে উঠল ক্রমশ। প্রায় সমস্ত রাত্রি তীব্র উদ্দাম সম্ভোগের পর তারা ক্লান্ত যেন!

নিজেদের নগ্নদেহ আলাদা করতে করতে থমকে গেল ময়ূরী। পুরুষটির ডান কোমরের খাঁজ বেয়ে মেঘাকৃতি লাল জড়ুল। শৈশবের সেই চেনা উষ্ণ স্পর্শ! ক্রোধ ও ঘৃণায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল সে।

একইভাবে ক্রোধ ও যন্ত্রণায় থরথর করে কাঁপছিল হরিণটিও, তার এবং সঙ্গিনীর সমস্ত শরীর জুড়ে কস্তুরী হরিণের ঘ্রাণ। যেন এই রাতভোর আনন্দ-সঙ্গমে সে ক্রীড়নকমাত্র! গোপন আহরণে সমস্ত লুণ্ঠন করে গেছে অনধিকারী কেউ।

যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত ময়ূরী সন্তর্পণে উঠে বসল লোকটির উপর, কামনার ভঙ্গিতে কণ্ঠলগ্না হল অবলীলায়— দু চোখে আগুনের অদ্ভুত মায়াবীস্রোত!

সেই রক্তিম স্রোত ছড়িয়ে যাচ্ছিল প্রতারিত হরিণটির চোখেও, ধীরে ধীরে সে বক্ষলগ্না সঙ্গিনীর গলাটা পেঁচিয়ে ধরল শিং দিয়ে, তারপর হঠাৎ একটি আঘাতেই এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলল গলাটি। পৃথিবীর স্তব্ধ ইন্দ্রজাল ছিন্ন করে হরিণীর একটিমাত্র আর্তরব ছড়িয়ে যেতে যেতে মুহূর্তেই তলিয়ে গেল যোজনবিস্তৃত অরণ্য-গহ্বরে।

একই সঙ্গে ক্ষুরধার ছুরিটি প্রতারকের কণ্ঠ ভেদ করে নামিয়ে আনলো ময়ূরী। আর্তনাদ করার সুযোগটুকু এল না, রক্তের বিপুল স্রোতে লাল হয়ে উঠল ক্যাম্পফায়ারের নিভে যাওয়া ছাই ও শিশিরসিক্ত মাটি। লোকটির অস্থির পা দুটো ক্রমশ নিথ‍র হয়ে এল, গাঢ় নীল চোখ দুটি আকাশের অনন্ত প্রশ্নরাশির দিকে নিবদ্ধ।

ভোর ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে শুরু করেছে; তা সত্ত্বেও অস্তগামী চাঁদের আলো নিজস্ব রক্তবধ্যে উন্মাদ দুটি জীবের উপর তরল রুপোর মতো গলে গলে পড়ছিল। ঝোপ-বৃক্ষ-কাঁটাপথ পেরিয়ে তারা দ্রুত ছুটে চলেছে নদীর কাছে, একটি প্রশান্ত ও পবিত্র স্নান এখন খুব প্রয়োজন তাদের।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2947 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...