আলো হাতে আঁধারের যাত্রী

আলো হাতে আঁধারের যাত্রী -- শুভ প্রতিম

শুভ প্রতিম

 



সংঘর্ষ ও সহাবস্থান সম্পর্কিত ক্ষেত্রসমীক্ষা ও গবেষণা গোষ্ঠী ‘আমরা— এক সচেতন প্রয়াস’-এর সদস্য

 

 

 

২০২১-এর বহুচর্চিত বিধানসভা নির্বাচন শেষ হল।  বিগত বছরগুলোতে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ দখল নিয়েছে আমাদের চায়ের টেবিল, চর্চার আবাদভূমি। আমরা চাই বা না চাই দিনহাটা থেকে ডিসেরগড় ভাঙন ধরেছে সম্পর্কে, ফাটল ধরেছে মনে। এক একটা বিসর্জন আসছে, রামনবমী আসছে, আসছে ফতেহাদোয়াজদহমের মিছিল, আমরা প্রহর গুনছি। ২০১৮ থেকে শুরু হয়েছে নতুন ইভেন্ট, ‘ভারত মাতা পুজো’। শিউরে উঠছি, পরচিত মুখের মিছিল থেকে অপরিচিত শ্লোগান শুনে। আশেপাশের মানুষগুলোকে কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে, কানে ভেসে আসছে, ‘ওদের অনেক বাড় বেড়েছে’, ‘তোল্লা দিয়ে দিয়ে কোথায় নিয়ে গেছে দেখো’ ইত্যাদি। ‘দাঙ্গা’ বসত করেছে মনে।

একমুখী এই আলোচনার অভিমুখ, মেরুকরণের মরুবালুরাশি এক লহমায় অন্য খাতে নিয়ে গেছেন যিনি বা যাঁরা। বা একই মানুষের সাম্প্রদায়িক ও মানবিক হওয়ার চিরকালীন লুকোচুরি খেলায় যিনি বা যাঁরা কিছুটা হলেও ‘ধাপ্পা’ দিতে পেরেছেন, তাঁরা গুটিকয়। সংঘর্ষের বিতত মানচিত্রের প্রত্যন্ত জনপদে তাঁদের বাস। দেখতে আমার আপনার মতই, ভাষাতেও মঙ্গল গ্রহ নয়। পারস্পরিক অবিশ্বাস, ঘৃণা, হিংসার দুর্বিনেয় প্রতিবেশে থেকেও এমনকি বহুক্ষেত্রে তা থেকে মুক্ত না হয়েও এঁরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কিছু কাজ করে ফেলেছেন, কিছু কথা বলে ফেলেছেন, কিছু পথ হেঁটে ফেলেছেন। যার জন্য বেঁচে গেছে কিছু মানুষ। বেঁচে গেছে সহাবস্থান, মানবিক, আস্থা ইত্যাদি শব্দগুলোও। বেঁচে গেছে ভারতবর্ষ।

এঁরা কেউ অতিমানব নন। এঁরা তা দাবীও করেন না। অথচ এঁদের ভগবান বানানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত, প্রযত্নে বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিমান। ‘আমরা’ মূলত সংঘর্ষ ও সহাবস্থানের ওপরে ক্ষেত্র গবেষণারত একটি সংগঠন। জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘর্ষ অধ্যয়নের বিভিন্ন পর্বে আমরা কথা বলেছিলাম এইরকম কয়েকটি মানুষের সঙ্গে। মুজফফরনগরে, কোকরাঝাড়ে, খরমাডাঙ্গায়, বসিরহাটে, আসানসোলে এই মানুষগুলি আমাদের দেখিয়েছিলেন, কীভাবে কৌমের মধ্যে থেকেও চরম সংঘর্ষের সময়েও মানবিক হওয়া যায়।

 

 

ধীর সিং: শয়তান যখন ফরিস্তা

ত্রাস বললে কম বলা হবে, মুসলিম মহিলাদের কাছে সে ছিল মূর্তিমান ভয়ঙ্কর একটি নাম। প্রচুর জমি ও ট্রাক্টরের মালিক ধীর সিং উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগর জেলার কুতবি গ্রামের নারীলোভী এক হাভেলি মালিক। এই অঞ্চলে মুসলিমরা ছিল খুব গরীব, তাই ধীর সিং-এর সহজ টার্গেট হয়ে উঠেছিল মুসলিম মহিলারা। কম বয়সে বোরখা তুলে দেখা থেকে যুবা বয়সে হাভেলিতে তুলে নিয়ে আসা সবই ছিল তার ‘নেশা’। মোটর সাইকেলের গ্যাং নিয়ে যখন সে আশেপাশের গ্রাম, বাজার পরিক্রমায় বের হত, মেয়েরা থাকত তটস্থ।

হিন্দু জাঠ অধ্যুষিত এই গ্রামটি রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক সকল ক্ষেত্রেই ছিল জাঠদের দখলে। এই গ্রামে দলিত এবং মুসলিমরা সম্পূর্ণভাবে ছিল জাঠদের অধীনে, জাঠদের জমিতেই তারা চাষ করত। মুসলিমরা গ্রামটির কয়েকটি পাড়ায় ছিল সীমাবদ্ধ, ছিল ধোপা, লোহার, নাই (বা নাপিত) ইত্যাদি জাতের সঙ্গে। ২০১৩-র দাঙ্গার পর মুসলিমরা কুতবি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। আমরা তাঁদের সঙ্গে কথা বলি শাহপুর থানার অধীনে পালদা শিবিরে। প্রায় ১১৩টি দাঙ্গাগ্রস্ত পরিবার এখানে আশ্রয় পেয়েছে।

কুতবি গ্রামটির পাশেই ছিল কুতবা নামে একটি গ্রাম, ২০১৩ সালের দাঙ্গা এই গ্রামটিতে এক ভয়াবহ রূপ নেয়। আটজন মানুষ এখানে বলি হয় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে, আহত হয় প্রচুর। গ্রামে মুসলিমদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, লুঠ হয় ব্যাপক। কুতবিও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যদিও তা কুতবার তুলনায় নগণ্য। এর আগে যখনই উত্তরপ্রদেশে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়েছে কুতবি গ্রামের জাঠ ও দলিতরা গ্রামের মুসলমানদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এবারে পরিস্থতি বদলাতে থাকে দ্রুত। সারা পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ তখন সাম্প্রদায়িক হিংসা কবলিত। তার ভয়ঙ্কর রূপ তখন মুজফফরনগর জেলায়। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩-র রাত্রে জেলার অধিকাংশ স্থানে জাঠরা মুসলিমদের আক্রমণ করে। ওই রাত্রেই কুতবার মুসলিমরা আক্রান্ত হয়, যদিও কুতবিতে কিছু হয় না। কুতবির মুসলমানদের এবারেও ভরসা ছিল প্রতিবেশী জাঠদের ওপর। চারিদিকে উত্তেজনা থাকলেও, ভয় থাকলেও, নিশ্চিন্ত ছিল তারা। কিন্তু ভরসা থাকল না বেশিক্ষণ। পরের দিন ৮ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে দলে দলে জাঠরা কুতবায় ঢুকতে লাগল, কুতবার জাঠদের উত্তেজিত করল তারা, বলল মুসলিমদের বিশ্বাস করা যায় না। ওদের নিকেশ না করলে শান্তি আসবে না। এবারে সফল হল তারা। তখন সকাল ১০টা, কুতবার আপাত ‘শান্তি’ কবরস্থ হল তখনই। মুসলিমদের বাড়িতে হানা দেওয়া হল। মুসলিমরা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি। আগের দাঙ্গায়, অশান্তিতে গ্রামে কিছু হয়নি, এবারে কী হল! আহত, রক্তাক্ত, আশাহত মুসলিমরা দলে দলে পালাতে লাগলো প্রাণ বাঁচাতে। যে যেদিকে পারে।

ইতিমধ্যে মারা গেছে কয়েকজন। হু হু আগুনে জ্বলছে মুসলিমদের কুঁড়েঘর। একদল মহিলা ও শিশুদের নিয়ে ধোপাপাড়া থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছিলেন দিলসাদ। সব মিলিয়ে ৮-১০টি পরিবারের সেই দল। পথেই পরে ধীর সিং-এর হাভেলি। সন্তর্পণে পালাচ্ছিল তারা, যদি ধরা পরে এই নোংরা লোকটির হাতে। কিন্তু শেষ রক্ষা বুঝি হল না, মোড় ঘুরতেই সামনে দাঁড়িয়ে ধীর সিং। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে গাল দিয়ে জানতে চাইল, কী হয়েছে, কোথায় পালাচ্ছে তারা। সন্ত্রস্ত দিলসাদ বলল যতটুকু সম্ভব। কোনও উত্তর না দিয়ে ধীর সিং খুলে দিল হাভেলির সিংহ দরজা, কর্কশ গলায় বলে উঠল, ‘ঘুসো অন্দরমে’। দলটি চুপ থাকে, এগুতে পারে না এক পা, ভিতরে নিয়ে গিয়েই হয়তো মারবে একে একে, মেয়েদের ওপর করবে… ভাবতে পারে না তারা। আবার গর্জন, ‘আরে… (গালি) জলদি যাও।’ আমি থাকতে কেউ কিছু করতে পারবে না তোদের। এবারে অনুগত ভঁইষের মত হাভেলিতে ঢুকে যায় ওরা। সশস্ত্র জাঠরা খবর পেয়ে কিছুক্ষণ বাদেই ঘিরে ফেলে হাভেলি। হাভেলিরে উঁচু ছাদ থেকে ধীর সিং আর তার বাহিনি গুলি ছুড়ে জবাব দেয়, চিৎকার করে শাসাতে থাকে দাঙ্গাবাজদের। তার রুদ্ররূপ দেখে কেটে পড়ে অনেকে। তবু কয়েক ঘণ্টা চলে সেই যুদ্ধ। শেষে আধা সামরিক বাহিনি আসতে পালিয়ে যায় দাঙ্গাবাজরা। উদ্ধার করে দলটিকে।

পালদা শিবিরে সেই দলে থাকা রুক্সানা বলেন, আমার স্বামীকে মেরেছে তার ছোটবেলার বন্ধু, এক জাঠ, রাজন সিং। বন্ধু তাকে আঘাত করতে পারে তা সে প্রথমে বিশ্বাস করতেই পারেনি। মানুষ চিনতে কত ভুল করেছি আমরা। ‘শয়তান ছিল সে (ধীর সিং), কিন্তু বিপদের দিনে সে হয়ে গেল আল্লার ফরিস্তা।’

মুজফফরনগরে কথোপকথন

উকিল মার্ডি: নীরব প্রতিবাদী

২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি ধর্মান্তরকরণের ঘটনা হয় পশ্চিমবঙ্গে। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতালাভের পর এটি এই রাজ্যে প্রথম ঘটনা। বীরভূম জেলার রামপুরহাট ১ নম্বর ব্লকের অধীন ঝাড়খণ্ড লাগোয়া বনহাট গ্রাম পঞ্চায়েত। খরমাডাঙ্গা এই পঞ্চায়েতের অধীন একটি সাঁওতাল অধ্যুষিত গ্রাম। ২৮ জানুয়ারি এই গ্রামের এক মন্দিরে ৯ জন সাঁওতাল খ্রিস্টানকে হিন্দু করা হয় (সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে, হিন্দুত্ববাদীদের দাবী শতাধিক)। খবরটা ছোট বড় সব সংবাদপত্রেই প্রকাশিত হয়। প্রশাসন থেকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়, ‘সেরকম কিছু হয়নি’ এই মনোভাব।

প্রথম পর্যায়ে ২২-২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ‘আমরা’ সেখানে যায় তথ্যনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে। রামপুরহাট থেকে দুমকা যাওয়ার সড়কপথে ভাটিনা গ্রাম, সেখানে ঢুকতেই ২০০৯ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ স্থাপিত সিংহবাহিনী মন্দির নজরে পরে। তারপর ভাটিনা জঙ্গল পেরিয়ে খরমাডাঙ্গা। সারা গ্রামে তখন আতঙ্কের পরিবেশ। প্রশাসন থেকে নাম কা ওয়াস্তে ২৪ ঘণ্টায় একবার পুলিশ আসে রাউন্ড দিতে, তারপর চুপচাপ। বাকি সময় ভিএইচপির মোটরসাইকেল বাহিনির টহল চলে। বিশেষ করে রাত্রে। ধর্মান্তরিত নব্য হিন্দুদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে গ্রাম থেকে পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ডে। খরমাডাঙ্গা ও পাশাপাশি ভাটিনা, নুরিপাহাড়ি, হরিনাথপুর গ্রাম থেকে খ্রিস্টানদের আনা হয়েছিল ‘ঘর ওয়াপসি’ যজ্ঞে। যে সব খ্রিস্টান পরিবার আছেন তাঁরাও ভয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না। সার্বিক এই ত্রাসের পরিবেশে আমাদের আলাপ হল একজনের সঙ্গে, যিনি খ্রিস্টান না হয়েও প্রতিবাদ করেছেন ধর্মান্তরকরণের। রামপুরহাট থানায় গিয়ে এফআইআর করেছেন। ফলে অভিযুক্ত হন ধর্মান্তরকরণের উদ্দেশ্যে আয়োজিত যজ্ঞের পুরোহিত ও ভিএইচপির আঞ্চলিক সংগঠক ধনপতি হাঁসদা, ওই সংগঠনের জেলা সংযোগ প্রধান চুকরা টুডু এবং ভিএইচপির আন্তর্জাতিক সভাপতি প্রবীণ তোগাড়িয়া। উল্লেখ্য উক্ত ২৮ তারিখেই রামপুরহাটে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সভায় প্রবীণ তোগাড়িয়া উত্তেজক ভাষণ দেন মুসলমান ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে।

প্রতিবাদী সেই মানুষটি হলেন উকিল মার্ডি। নিতান্ত দিনমজুর। কখনও ক্র্যাশার মেশিনে ডেলি লেবার, কখনও জন খাটতে সুদূর বর্ধমান। মিতভাষী এই মানুষটি চুপ করে মেনে নিতে পারেননি ভয় দেখিয়ে, লোভ দেখিয়ে খ্রিস্টানদের হিন্দু করে দেওয়ার সাড়ম্বর আয়োজন। সেদিন গ্রাম জুড়ে ছিল সকল মানুষের নেমন্তন্ন। সাঁওতাল ‘হিন্দুরা’ কেউ আজ রান্না করবে না বাড়িতে। উকিলের পরিবারও আমন্ত্রিত। প্রথমে গ্রামের কেউ আঁচ করতে পারেনি। আর পাঁচটা পুজোর মত কিছু হবে। অধুনা পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতাল গ্রামগুলিতে হিন্দু বাঙালির বেশ কিছু পুজো যেমন কালী বা সরস্বতী পুজোর ‘অনুপ্রবেশ’ হয়েছে। এটা সেরকম কিছু হবে, এই ছিল আন্দাজ। কিন্তু ভুল যখন ভাঙল তখনও চুপ করেই থেকেছিল সবাই। মেনে নিয়েছিল। গ্রামের মুরুব্বিরা যখন আছে, তখন ভুল কী হবে? খ্রিস্টানরা যে চাপে পড়ে হিন্দু হচ্ছে তা তাদের চোখ মুখ দেখেই বোঝা গিয়েছিল। তবু সেদিন সবাই ছিল নীরব। সরব হয়েছিলেন একজনই, উকিল মার্ডি। ঘরে মা কালীর ছবি, বাড়ির সধবা মহিলারা হিন্দুদের মত শাঁখাসিঁদুর পরে। জিজ্ঞেস করাতে নিজেকে হিন্দু বলেন উকিল। হিন্দু হয়েও কেন তিনি প্রতিবাদ করলেন বলাতে তাঁর উত্তর, জোর করে ওদের ধর্ম কেড়ে নেবে কেন? খুব বেশি কথা তিনি বলেননি বা বলতে চাননি।

 

কোকরাঝাড়ের বোড়ো বৃদ্ধ: দাঙ্গা যাকে ‘অন্ধ’ করেনি

সন ২০১২, অসমের কোকরাঝাড়ে কমার্স কলেজে সরকারি ত্রাণশিবির, আশ্রয় নিয়েছে দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত বোড়োরা। অতি বৃদ্ধ একজনের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ত্রাণশিবিরের কর্তাব্যক্তিরা ঘিরে ধরেন, প্রথমে বুঝিনি, পরে বুঝেছিলাম, ‘যদি বেফাঁস কিছু বলে ফেলে বুড়ো’, তাই এই ঘেরাও। ত্রাণশিবিরে প্রায় ঘণ্টা খানেক থাকার পর, ফেরার সময় একলা পেয়ে গেলাম বুড়োকে। আগের দিন নওয়েরভিটা গ্রাম যাওয়ার অভিজ্ঞতা তখনও দগদগে ঘায়ের মত। গোঁসাইগঞ্জ যাওয়ার পথে পড়ে গ্রামটা, রাস্তার বামদিকে মুসলিম আর ডানদিকে বোড়ো পাড়া। প্রায় ৩৫০টি মুসলিম পরিবারের বাস। ‘আমরা’ যখন যায় তখন একটি পরিবারও সেখানে নেই। দুই দিন আগেই বোড়োদের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে তিনজন। জিনিসপত্র লুঠ, বাড়িতে, ধানের গোলাতে আগুন। গত রাত্রে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু ‘আমরা’ যখন পৌঁছয় তখনও ধোঁয়া বেরুচ্ছিল। একটা আমড়া গাছ, পুড়ে খাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের সামনে। এক উঠোনে পড়েছিল দেখেছিলাম অর্ধদগ্ধ কোরান শরীফ, মুকসুদুল মমেনিন। সযত্নে তুলে এনেছিলাম তা। উঠোন পেরিয়ে একচালা ঘর। ঘরের মধ্যে ‘বিয়ের পরে স্টুডিওতে গিয়ে ছবি’। কেঁপে উঠেছিল হৃৎপিণ্ড, এই মৃত্যু উপত্যকা, এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ— আমার দেশ! অথচ গ্রামটি ছিল দোতমা থানা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার। চাইলেই থামানো যেত এই হত্যালীলা। আমরা গিয়েওছিলাম থানায়। সে প্রসঙ্গ থাক।

বৃদ্ধকে বললাম আগাগোড়া। ফুঁপিয়ে ওঠার মত, যদিও তা কান্না নয়— এমন আওয়াজ বেরুল তাঁর কণ্ঠ হতে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। একটু সামলানোর পর বলতে থাকলেন, আমরা এখানে আসতে পেরেছি কয়েকজন মুসলমানের জন্যেই। তারাই আমাদের জানিয়েছিল, রাত্রের মধ্যে আক্রমণ করবে পাশের গ্রামের ভাটিয়া মুসলমানরা। ওরা নতুন এসেছে। ওদের আমরা ভাটিয়া বলি। ৫০-৭২ সাল পর্যন্ত যারা এসেছিল তাদের বলি উজানি। আমাদের গ্রামে অনেক উজানির বাস। কয়েক যুগ ধরে আছি, কোনও অশান্তি নেই। কাকা-ভাইপোর সম্পর্ক ছোটদের সঙ্গে। সমবয়সিরা বন্ধু। নতুন যারা আসছে, এই ভাটিয়ারা অশান্তি পাকাচ্ছে। বোড়ো মিলিট্যান্টদের নিজেদের মধ্যে রেষারেষি আছে, বোড়োল্যান্ডকে নাকি মুসলিম মুক্ত করবে। আরে ওই উজানিরা কী করল? ওরা যাবে কেন? সত্যি বলতে কী, মরছে দুই পক্ষের গরিবরা।

ওরা কীভাবে বাঁচাল, প্রশ্ন করি আমরা। বৃদ্ধ শুরু করেন, আংটিহারার ঘটনার পর মুসলিমরা ক্ষেপে গেছিল। (উল্লেখ্য আংটিহারা হল, গোঁসাইগঞ্জ মহকুমার একটি গ্রাম, কোকরাঝাড় থেকে কমসেকম ২০ কিলোমিটার দূরে। ৬ জুলাই, ২০১২ সেখানে চায়ের দোকানে বোড়ো জঙ্গিদের হাতে খুন হয় বছর ছত্রিশের নুরুল হক। পরে তার মৃতদেহ নিয়ে মুসলিমরা রাস্তা অবরোধ করে, বিক্ষোভ চরম আকার নেই)। আমাদের গ্রামে আমরা কয়েক ঘর মাত্র বোড়ো। উজানি বেশি। চারিদিকে গুজব, মার মার কাট কাট। প্রাইমারি ইস্কুলের মাস্টার, তার নাম বলতে বারণ, প্রথমে আমাকে বলে, কাকা পাশের গ্রামে অনেক ভাটিয়া জড়ো হয়েছে, ধুবরি থেকেও এসেছে। রাত্রের মধ্যে আক্রমণ হবে। আমরা কী করব, ঘর দোর গরু ছাগল ওদের জিম্মায় রেখে দুপুরেই পালিয়ে আসি। এখানে এসে শুনতে পাই, রাত্রে কয়েক হাজার ভাটিয়া এসছিল। উজানিরা বুক পেতে আমাদের গরু ছাগল রক্ষা করেছে। সব বাঁচাতে না পারলেও লুঠের হাত থেকে বেঁচে গেছে ধান, অনেকের জিনিসপত্র।

 

দেবাশিস ঘোষ: যিনি পিতার কথিত ‘হত্যাকারী’কে বাঁচান

দেবাশিস ঘোষ, মৃত কার্তিক ঘোষের বড় ছেলে, বয়স ৪০ হবে। কার্তিক ঘোষ, ২০১৭-র বসিরহাট সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী একমাত্র মৃত ব্যক্তি।

আমাদের তথ্যানুসন্ধানের দলকে দেবাশিস বলেন, গত পাঁচ তারিখ (জুলাই, ২০১৭) বেলা ১১টা নাগাদ পাইকপাড়ার দিক থেকে কিছু মানুষ এসে হিন্দুদের দোকানপাট-ঘরবাড়ি ভাঙচুর করতে শুরু করে। ওইদিনই দুপুর আমার বাবা, শ্রী কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, বয়স পঁয়ষট্টি বছর, ন’পাড়া থেকে ফিরছিলেন। পাইকপাড়ার কাছে তাঁর ওপর মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু লোক হামলা করে। সবই চেনা মুখ। বাবার মাথায় তিনটি কোপ মারে। দুপুর দুটোর পর আমরা খবর পাই বাবা আহত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছেন। কিন্তু, ওখানে তখন যাওয়ার পরিস্থিতি ছিল না। চরম উত্তেজনা। কোনও রকমে পুলিশের সাহায্যে অ্যাম্বুলেন্সে বাবাকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা হয়। বসিরহাট জেলা হাসপাতালে নিয়ে আসার পর ওখানে প্রাথমিক চিকিৎসা করে ডাক্তার কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। বলেন অবস্থা গুরুতর, এখানে হবে না। আমাদের তো মাথায় হাত! সঙ্গে সঙ্গে ঐ অ্যাম্বুলেন্সেই নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিই। সেই সময় আমাদের কাছে অনুরোধ আসে আর একজন আহত মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার। সেই মানুষটির নাম, ফজলুর সরদার। তাঁকে চিনতাম না। তিনিও বয়স্ক মানুষ। সংঘর্ষের মধ্যে তিনিও পরে গিয়েছিলেন। শুনেছি ওই পাইকপাড়া অঞ্চলেই আধাসামরিক বাহিনির ছোড়া রবার বুলেট তাঁর মুখের চোয়াল ভেঙে দিয়েছে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মানুষটা। সঙ্গে কেউ নেই ওনার পরিচিত বা আত্মীয়। আমি ও আমার ভাই রাজি হয়ে যাই তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যেতে। একই অ্যাম্বুলেন্সে দুই পাশে দুইজন আহত মানুষকে নিয়ে, দুই হাতে দুটো স্যালাইনের বোতল ধরে রওয়ানা হয়ে যাই কলকাতার উদ্দেশ্যে। ৬ জুলাই সকালে বাবা মারা যান। ভাগ্য ভালো ফজলুর চাচা বেঁচে গেছেন। সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। হ্যাঁ সেই আলাপের পর তাঁকে আমরা চাচাই বলি।

আমার নিরীহ, কারও সাতে পাঁচে না থাকা বাবাকে মুসলমানরা মেরে ফেলল। খুনিরা এখনও গ্রেফতার হয়নি। আমাদের কষ্ট হয়, রাগ হয় আরও। প্রতিবেশী মুসলিমরা অনেকে এই জন্য লজ্জা পায় আমাদের সঙ্গে কথা বলতে। মহিলারা আসেন, মায়ের কাছে এসে কেঁদে গেছেন। আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে হয়ত। কিন্তু বিশ্বাস করুন আহত দুইজন মানুষকে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের তখন কিছু মনে ছিল না। যেভাবেই হোক তাঁদের বাঁচানোই ছিল লক্ষ্য।

মৃত কার্তিক ঘোষের ছেলে ও পরিবার

ইমাম ইমদাদুল্লা রশিদি: যিনি ইতিহাসকে নতুন কালিতে লিখলেন

লোক মুখে এখন তিনি ‘আসানসোলের ইমাম’। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে নিহত পুত্রের লাশ দেখে যিনি নীরব থাকেন। মৃত পুত্রের নামাজ এ জানাজায় যিনি হাজার হাজার মানুষের কাতারে বলেন, শান্ত থাকুন। নামাজের শেষে, দাফনের শেষে ফিরে যান নিজ নিজ বাড়িতে। বলেন, ইমাম বলে যদি আমাকে কিছুমাত্র শ্রদ্ধা করে থাকেন, তাহলে আমার অনুরোধ কোনও হিংসায় লিপ্ত হবেন না। অন্যথায় আমি চিরকালের মত আসানসোল ত্যাগ করে চলে যাব।

তার আগে রামকৃষ্ণ ডাঙ্গালে যখন দুই মুসলিম যুবককে ক্যাপটিভ করে রাখা হয়েছে বা তাঁর নিজের মহল্লায় দুই হিন্দু যুবককে, তিনি পাড়ার যুবকদের বলেছেন, ওদের ছেড়ে দাও, ওরাও কোনও মায়ের সন্তান। ছেলের মারা যাওয়ার খবর পেয়েও চেপে যান, যদি হেফাজতে থাকা হিন্দু যুবকদের এরা মেরে ফেলে! ইমাম ইমদাদুল্লা রশিদি। পুত্রের লাশ এবং জিঘাংসু উন্মত্ত জনতা যাকে টলাতে পারে না, তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে ন্যুব্জ হতে হয়।

আসানসোলের ইমামের সঙ্গে ‘আমরা’

আমরা দুইবার ছুটে গেলাম তাঁর কাছে। যারা ছিলেন আমাদের দলে তাঁরা তাঁর সামনে ভাবুক হয়ে গেছিলেন। যদিও তিনি ছিলেন স্পষ্ট, সোজাসুজি। শুনতে কর্কশ লাগলেও তিনি জানালেন, আমার সঙ্গে আলিঙ্গন করার উদ্দেশ্য যদি হয় তা ফেসবুকে পোস্ট, তবে করবেন না এই আলিঙ্গন। আমি কোনও মহান কাজ করিনি, যেটা স্বাভাবিক আমি তাই করেছি। ইসলাম আমাকে এই শিক্ষাই দিয়েছে। এটা ভারতবর্ষ, এখানে আমরা এইভাবেই রয়েছি পরস্পরকে জড়িয়ে। পাশের হিন্দু পাড়ায় যান, সেখানে এক হিন্দু মা মারা গেছেন সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সময়। যান তাঁর ছেলেদের কাছে। তাঁরাও কোনও প্ররোচনা দেননি, ‘ব্যবহার’ করেননি মায়ের মৃত্যু। তাঁর কথামতো আমরা গেছিলাম রামকৃষ্ণ ডাঙ্গালে মৃতা প্রতিমা রাউতের বাড়ি। মৃতার পুত্র সম্প্রীতির বার্তা দেন, যা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের নিকষ কালো অন্ধকারে এঁরা হলেন উৎসারিত আলো। নিতান্ত যাপনে থেকেও এঁদের হৃদয়ে রয়েছে অতলান্ত গভীরতা। সংঘর্ষে লিপ্ত দুই গোষ্ঠীর মাঝখানে রয়েছেন যারা। আলো হাতে আঁধারের যাত্রী।


*লেখার ভেতরের সব ছবি লেখকের সৌজন্যে প্রাপ্ত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...