‘দেশ’-এর কথা

প্রবুদ্ধ বাগচী

 

অরবিন্দ ঘোষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সখারাম গণেশ দেউস্কার একটি বই লিখেছিলেন যার নাম ছিল ‘দেশের কথা’। জুন ১৯০৪-এ প্রকাশিত এই গ্রন্থ মাত্র এক বছরের মধ্যে চারটে সংস্করণ ছাপা হয়ে দশ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। পরাধীন দেশে বিপ্লবী আন্দোলনকে সংহত করতে বিদেশি শাসকের দুরাচারের কথা সবিস্তারে বলা হয়েছিল এই বইয়ে। স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যারা যুক্ত হয়েছিলেন তাঁদের পক্ষে অবশ্যপাঠ্য ছিল এই বই। স্বাভাবিকভাবেই বইয়ের এই প্রবল অভিঘাত দেখে ১৯১০ সালে বাংলার সরকার এই বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ও তার সমস্ত কপি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কাছাকাছি সময়ে কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস তার সেই বিখ্যাত ‘স্বদেশ’ কবিতা লিখেছিলেন (১৯০৭) যাতে বলা হয়েছিল, ‘স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে? এদেশ তোমার নয়।’ ‘দেশ’ বা ‘স্বদেশ’ নিয়ে এমন সব উচ্চারণ একেবারেই বিরল ছিল না প্রাক-স্বাধীনতার আবহে।

কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল রায় যখন নিজের দেশ-কে ‘সকল দেশের সেরা’ বলে গর্ব করেন তখন গোবিন্দচন্দ্র দাশের কথাকে তার পাশে মিলিয়ে পড়লে কোথাও যেন একটা বিরোধাভাস চোখে পড়ে। মনে হতে থাকে, ‘এদেশ’ যদি আমারই না হয় তাকে ‘সেরা’ বলব কেন? অথচ রবীন্দ্রনাথ যখন ‘দেশের মাটি’তে মাথা ঠেকানোর কথা গানে বলেন (রচনাকাল ১৯০৫) সেখানে আরেকটা জরুরি উচ্চারণ থাকে এই দেশের মাটি বিষয়ে— ‘তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা’— অর্থাৎ সবার সেরা হওয়ার থেকেও জরুরি নিজের দেশের মধ্যে ‘ধনধান্য পুষ্পভরা/ আমাদের এই বসুন্ধরা’র যাবতীয় আকরসত্তাকে খুঁজে পাওয়া। আবার এই রবীন্দ্রনাথই  ‘দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরী’ গানে (রচনাকাল ১৯১৭) বারবার ফিরিয়ে আনছেন আক্ষেপ— ‘দিন আগত ওই, ভারত তবু কই?/ সে কি রহিল লুপ্ত আজি সব-জন পশ্চাতে?’

তার মানে হল, যে ‘দেশ’কে আমরা এখন দেখছি সেই আদলকে পালটে দিতে হবে। স্বাধীনতার লড়াইয়ের আদর্শ ও সংকল্প আসলে তো তাই ছিল। যদিও সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার অল্প পরেই সলিল চৌধুরী গান বেঁধেছিলেন ‘নাকের বদলে নরুন পেলাম টাক ডুমাডুমডুম/ জান দিয়ে জানোয়ার পেলাম পড়ল দেশে ধুম’। এরও বছর কুড়ি-পঁচিশ পরে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখবেন ‘আলো জ্বললেও স্বদেশ/ অন্ধকারেও স্বদেশ/ মন্ত্রী যখন ন্যাংটো ছেলের কান মুলে দেন/ বুঝতে পারি/ চতুর্দিকে সভা করছে স্বদেশ’। অর্থাৎ স্বাধীনতার আড়াই দশক পেরিয়েও ‘তুমি আর নেই সেই তুমি’। নবারুণ ভট্টাচার্য জানিয়ে দেবেন সোচ্চারে ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ আর তারই পাশাপাশি বলবেন ‘আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব।’ অর্থাৎ আবারও আমরা ফিরে শুনলাম ‘দেশ’কে বদলে দেওয়ার কথা, কারণ এখনও ‘এদেশ তোমার নয়’। শঙ্খ ঘোষ লিখবেন ‘দেশ আমাদের মাতৃভাষা দেয়নি এখনও।’ সত্যিই তো দেয়নি।

তাই গত সাড়ে সাত দশকের ইতিহাস বারবার মথিত হয়েছে ‘দেশ’কে নানাভাবে দুমড়ে মুচড়ে দেখবার প্রচেষ্টায়। স্বাধীনতার আগের আমলেও দেশকে মাতৃমূর্তির সঙ্গে তুলনা করা নিয়ে একটা গোল বেধেছিল। কারণ এই তুলনাকে স্থায়ী সর্বজনীন চেহারা দিতে গেলে পৌত্তলিক ধারণাকে প্রশ্রয় দিতে হয় যা আবার বিশেষ একটি ধর্মীয় মতাদর্শের পক্ষে যায়। অন্য ধর্মের নাগরিকরা যারা চেতনাগতভাবে পৌত্তলিকতার সমর্থক নন, তাঁদের পক্ষে কি দেশের মাতৃমূর্তি কল্পনা করা সম্ভব? প্রায় গুরুত্বহীন যে কবিতা বঙ্কিমচন্দ্র নিজের বর্জিত লেখার ঝুড়িতে রেখে দিয়েছিলেন, ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রকাশের সময় পাদপূরণের জন্য সেই কবিতাকেই তিনি তুলে এনে ছেপে দিলেন তার নিচে। ‘বন্দেমাতরম’ কবিতা বা পরে গান হিসেবে গীত লেখাটির ইতিহাস তো এইটাই। পরে সেই ‘বন্দেমাতরম’ হয়ে উঠল দেশপ্রেমের একমাত্র প্রতীক— কিন্তু এই গানেও সেই দেশের সঙ্গে মায়ের মূর্তির মিশেল। এ নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ক্ষেত্রে শেষ অবধি অবশ্য তাকে পরাজিত হতে হয়।

মনে করতে পারি, রবীন্দ্রনাথের ‘অয়ি ভুবন মনোমোহিনী’ গানটি নিয়ে সেই বিতর্কের কথা। ১৮৯৬ সালে কলকাতায় কংগ্রেস অধিবেশনের আগে বিপিনচন্দ্র পাল ও হেমচন্দ্র নাগ কবির কাছে অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন দুর্গামূর্তির মাধ্যমে দেশভক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি যেন একটি গান লিখে দেন, যাতে প্রধান হবে ভক্তিরসের আধারে দেশপ্রেমের আবেগ। কবি সবিনয়ে এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ওই ধরনের ভক্তিরসে তাঁর বিশ্বাস নেই তাই ওরকম গান লিখতে গেলে তাঁকে তাঁর বিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়াতে হয়। পরিবর্তে, তিনি লেখেন ‘অয়ি ভুবন মনোমোহিনী’— যে গানকে আর যাই হোক দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এই গান নিয়ে আক্রান্ত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, মায়ের রূপকে ‘ভুবনমনোমোহিনী’ হিসেবে বিভূষিত করার মধ্যে একটা ‘কু-ইঙ্গিত’ আছে। যদিও পাশাপাশি বলা হয়েছিল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ও তো তাঁর গানে ‘জগজ্জননী ভারতবর্ষ’ ব্যবহার করেছেন! এই বিতর্ক চলতেই থাকে। আর অবনীন্দ্রনাথ যখন নিজের শিল্প-কল্পনার পথ ধরে ‘ভারতমাতা’র রঙিন ছবি এঁকেছিলেন তখন তিনি ভাবতেই পারেননি এই একটা শিল্প-দৃষ্টান্ত পরের ইতিহাসে কীভাবে একটা ফ্যাসিবাদী দলের আগ্রাসী স্লোগানের মর্মবস্তু হয়ে উঠবে। এমনকি এই ছবিকে সামনে রেখে তৈরি হবে মৃন্ময় মূর্তি ও কালে কালে তার পুজোও প্রচলিত হবে দেশপ্রেম ও দেশভক্তির পরাকাষ্ঠা হিসেবে। যদিও স্বয়ং দেশমাতাও জানেন না যে-মূর্তির জন্ম শিল্পীর মনোভূমিতে তার বন্দনার মন্ত্র লিখে ফেললেন কোন সে প্রতিভাধর রচনাকার? ঠিক যেমন জানা যায় না হাইরোডের ধারে স্থাপিত ‘বাবা হাইরোডেশ্বর’-এর পুজোর মন্ত্র রচনা হল কার মগজের কোষে? কারাই বা করোনা-কালে ‘দেবী করোনা’র উপাসনা করে মুক্ত হতে চাইলেন অতিমারি থেকে, কে লিখল সেই পুজোর মন্ত্রাদি? তবে এসব অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

কথাটা হল, ‘দেশ’ ঘিরে এমন সব কল্পনা ও প্রকল্পনা ক্রমশ এক বিস্ফোরণের আকার নিয়েছে। বিশেষ করে, গত কয়েক বছরে ‘দেশপ্রেম’ ও ‘দেশদ্রোহ’ শব্দ দুটোকে এমনভাবে দুই বিভাজিকা রেখায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে খুব হিসেব করে, যে কার গায়ে কখন এর চিহ্ন লেগে যাবে তা বুঝে ওঠা বড় মুশকিল। সরকারের মত কেউ পছন্দ করলেই তিনি খাসা দেশভক্ত আর তার সামান্য সমালোচনা করলেই তিনি বিপজ্জনক ‘দ্রোহী’— এমন এক ধাঁচা প্রায় প্রতিষ্ঠিতই হয়ে গেছে বলা যায়। নাগরিক সমাজ থেকে সর্বোচ্চ আদালত এ নিয়ে উদ্বিগ্ন কিন্তু শাসকের তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। যেভাবে ‘দেশদ্রোহী’ শব্দটিকে জীবনানন্দের ভাষায় ‘ব্যবহৃত ব্যবহৃত ব্যবহৃত হতে হতে শূকরের মাংস’ করে তোলা হয়েছে তাতে শব্দ তার প্রকৃত সত্য থেকে সরে এসেছে বহুদূর। কিন্তু তাতে কারও কারও কিছুই আসে যায় না। শব্দ নয়, তারা ক্ষমতার কারবারি।

 

২.

কিন্তু মানুষের ‘চরিত্র’ তার শরীরের কোন অংশে অবস্থান করে তা যেমন আজও সুনির্ণীত নয়, ‘দেশ’ ব্যাপারটা আসলে ঠিক কী, সেটাও বোধহয় একটা অধরা জগৎ। কথাটা কেন বলছি? তার কারণ আমাদের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা বলে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনে ‘দেশ’ শব্দটার ব্যঞ্জনা ঠিক এমন নয়, যেভাবে আমাদের ভাবাতে চাওয়া হয় গানে-নাটকে-সিনেমায় বা ভাবগদগদ ভাষণে। আমাদের মনে পড়বে, তথাকথিত ‘দেশবিভাগ’-এর আগে কলকাতা শহরে বাস করতেন এমন অনেক মানুষ যারা খাস কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন না। অনেকেরই মূল বাস ছিল শহর থেকে দূরে, কারও বা পদ্মাপারে। এর সবগুলোই ছিল তাঁদের কাছে ‘দেশ’। চাকরি বা পড়াশোনার জন্য দূর পদ্মাপাড়ের যাঁরা সারা সপ্তাহ বা মাস বা বছর জীবন কাটিয়ে দিতেন কলকাতার মেসবাড়িতে বা বাসাবাড়িতে— সপ্তাহান্তে, মাসান্তে বা অন্তত পুজোর ছুটির অবকাশে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া সকালের চিটাগাং মেল বা বিকেলের ঢাকা মেল ভরে উঠত তাঁদের আর্তি ভরা উপস্থিতিতে— সকলেই ফিরে চলেছেন তাঁদের ‘দেশের বাড়ি’। কারও বাড়ি দূর কোনও গ্রামে, যেখানে পৌঁছাতে হলে রেলস্টেশন থেকে নেমে আবার পাড়ি দিতে হয় স্টিমার বা নৌকা। কারও বা জেলা বা মফস্বল শহরের কোনও নিস্তরঙ্গ পাড়ায়। প্রাক-স্বাধীনতা আমলের বাংলাদেশের অচিন কোনও পাড়া বা গ্রাম— সেই তাঁদের ‘দেশ’। অথচ কলকাতা শহর আর ওই ‘দেশের বাড়ি’ আসলে তো বৃহত্তর অর্থে একই দেশের মানচিত্রে— তবু ওই মানুষগুলোর কাছে ওই ছোট্ট জনপদ, ওইটাই তাঁদের ‘দেশ’, ওখানেই জড়িয়ে আছে তাঁদের অস্তিত্বের শেকড়বাকড়।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর আত্মকথনে পড়েছি এক কিশোরের কথা— বঙ্গবাসী স্কুলে পড়লেও, সে তার এক কাকার সঙ্গে থাকত শিয়ালদা এলাকার একটা মেসবাড়িতে। তার বাড়ি ছিল বসিরহাটের কাছে এক গ্রামে। শনিবার স্কুলে হাফছুটি হয়ে গেলেই সে কাকার সঙ্গে দৌড় লাগাত শ্যামবাজারের দিকে, সেখান থেকে তখন চালু ছিল বসিরহাট-অভিমুখী ছোট লাইনের রেল। শনিবারের দুপুর তাকে টান দিত ‘দেশ’-এর দিকে— এই টান কি অকৃত্রিম নয়? ‘দেশের বাড়ি’ ফেরার নানান আবেগময় আখ্যান আমরা পেয়েছি তারাপদ রায়ের লেখায়। শঙ্খ ঘোষ তাঁর কিশোর উপন্যাসে অসামান্য বুননে ধরে রেখেছেন সেই ‘দেশে ফেরা’র স্মৃতি— এই ‘দেশ’ আসলে কোন দেশ? আর এই ‘দেশ’ নিয়ে লেখা স্মৃতির ভাঁড়ার বাংলা সাহিত্য তো খুব কম নয়।

একটু ঝুঁকি নিয়ে এই প্রসঙ্গটাও উচ্চারণ করতে চাইব যে ‘দেশভাগ’-কেন্দ্রিক যে বিপুল সাহিত্য ও স্মৃতিআখ্যান আমাদের বিষণ্ণ করে দিয়েছে বারবার, সেখানে ‘দেশছাড়া’ মানুষগুলোর বেদনা আসলে কি গোটা পুববাংলা ছেড়ে আসার যন্ত্রণা, নাকি নিজেদের যে পূর্বপুরুষের ভিটে গড়ে উঠেছিল, কোনও একটি নির্দিষ্ট গ্রাম বা পাড়ায় সেইটুকু এবং তাকে কেন্দ্র করে ওঠা একটা সামাজিক বলয় ছেড়ে আসার ব্যথা ও সঙ্কট? ‘দয়াময়ীর কথা’ র শেষ অধ্যায়ে যখন দয়া ও তাঁর পালিকা মাতা স্নেহলতা ছেড়ে আসেন তাঁদের দিঘপাইত গ্রাম, আমরা দেখি সারা গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছেন তাঁদের বিদায় জানাতে, সকলের চোখে অবারিত অশ্রু— কেউ কেউ তাঁদের পায়ে পায়ে চলেছেন নিকটতম রেলস্টেশনে, শেষ বিদায় জানাতে। এই দুঃখের উৎস কোথায়? সে কি পুব পাকিস্তান ছেড়ে তাঁদের চলে যাওয়া না ওই নির্দিষ্ট গ্রাম ছেড়ে তাঁদের পাকাপাকিভাবে ‘হিন্দুস্থান’ চলে যাওয়া? মনে করতেই পারি দেশহারা মানুষদের অন্য এক বিশেষণ আমরাই তৈরি করেছি ‘ছিন্নমূল’— তাহলে ওই মূলটা আসলে কোথায়? সেটা কি একটা বিরাট ভূখণ্ড না কি সেই সীমায়িত ভূগোল যেখানে প্রোথিত ছিল তাঁদের ‘মূল’— আর সেটাই কি তাঁদের ‘দেশ’ নয়!

শুধু দেশবিভাগ-এর প্রসঙ্গই বা ধরব কেন? ‘পথের পাঁচালী’র শেষ দৃশ্যে গরুর গাড়িতে মালপত্র বেঁধেছেঁদে মন্থর গতিতে হরিহরকে আমরা ছেড়ে যেতে দেখি নিশ্চিন্দিপুরের ভিটে— এই দৃশ্যের অভিঘাতে যে তারসানাই বেজে ওঠে আমাদের ভেতরে সে তো কোনও ‘দেশত্যাগ’-এর শোক নয়, আসলে তা এতদিনের স্মৃতিঘেরা নিতান্তই এক অচেনা গাঁ ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট, যার সঙ্গে জুড়ে থাকে হরিহরের দাম্পত্য, অপুর শৈশব, দুর্গার অকাল বিসর্জনের আল্পনা-আঁকা স্মৃতিপট। হরিহর স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে যান না, এরপরে আমরা তাঁকে দেখব কাশীর মহল্লায়। তাহলে কি ওই নিশ্চিন্দিপুরের পুকুর আর বাঁশঝাড়, কাশফুল আর টেলিগ্রাফের তার, ইন্দিরঠাকরুন বা পাঠশালার গুরুমশায়— এগুলোই অপুর ‘দেশ’ নয়? এই ‘দেশ’-এর পক্ষে যেমন আলাদা করে ভক্তি ঘোষণার অবকাশ থাকে না ঠিক তেমনি এর বিরুদ্ধে কি কেউ ‘দ্রোহ’ জানাতে পারে আদৌ?

অনেককাল ধরেই সারা দেশের মানুষ এরাজ্যে ওরাজ্যে বাসা বেঁধে থাকে জীবিকার দায়ে। এক সময় পাচক হিসেবে ওডিশা রাজ্যের অনেক মানুষ বিভিন্ন পরিবারে যুক্ত থাকতেন প্রজন্মপরম্পরায়। কিন্তু বছরান্তে একবার তাঁরা যেতেন ‘দেশে’— সেই নিজেদের গাঁ-মফস্বলে। কলকাতা বা বৃহত্তর কলকাতা বা জেলাশহর যেখানেই তাঁরা পেশাগত প্রয়োজনে নিযুক্ত থাকুন না কেন সেই জায়গাটাকে কখনও তাঁরা দেশ বলতেন না, আজও বলেন না। এখনও খোঁজ নিলে দেখা যায়, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা বা দুই মেদিনীপুরের অনেকে কলকাতায় গৃহপরিচারিকার কাজে নিযুক্ত, সেই বাড়িতেই তাঁরা থাকেন। কিন্তু মাঝে মাঝেই গৃহকর্ত্রীর কাছে বায়না করে তাঁরা ফিরতে চান ‘দেশে’ আর বাড়ির কর্ত্রী সেই অনুমতি দিতে কুণ্ঠিত থাকেন কারণ তাঁর অভিজ্ঞতা বলে, এরা ‘দেশে’ গেলে আর সহজে ফিরতে চায় না। এর একটা বিপরীত ছবি পাওয়া গিয়েছিল ‘রাধিকা সুন্দরী’তে যেখানে হুগলি জেলার এক অনগ্রসর গ্রামের মেয়ে রাধা কাজ করতে এসেছিল কলকাতার লেকটাউনে বাবুদের বাড়িতে। সেখানকার ঠাঁটবাট আদবকায়দায় সে মুগ্ধ, তাই তার বিয়ের বয়স হয়ে যাওয়ায় যখন তাকে ফিরিয়ে আনা হল ‘দেশে’, সে বিদ্রোহ করে, কেবলই চলে যেতে চায় নাগরিক আলোর কেন্দ্রে। কোনটা তাহলে ‘দেশ’ রাধার? আর কোনটাকেই বা এখানে চিহ্নিত করা হবে দেশপ্রেম বা দেশদ্রোহ বলে?

জীবিকাসূত্রে ভিন প্রদেশের শ্রমিকরা একসময় প্রচুর পরিমাণে কাজ করতে আসতেন চটকলে। এদের পরিভাষায় ‘দেশ’ মানে ‘মুলুক’— নিজের ‘মুলুক’ ছেড়ে কাজের টানে শহরে বা শহরতলিতে আসতেন তাঁরা, থাকতেন শ্রমিক মহল্লার অপরিচ্ছন্ন ঘরে। আবার একসময় কাজ না পেলে ফিরে যেতেন ‘মুলুকে’। ছটপুজোর আগে হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে যেসব বিহার-উত্তরপ্রদেশগামী ট্রেন ছাড়ত তার কামরায় গাদাগাদি করে ‘দেশে’ ফিরতে দেখেছি এদের, আজও হয়তো তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাহলে এদেরই বা দেশ কোনটা? ভারতবর্ষ, পশ্চিমবঙ্গ, না সেই বিহারের একটা রুখাসুখা গ্রাম? আজ যে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’দের নিয়ে একটা নতুন চর্চাই শুরু হয়ে গেল সারা দেশে, সেখানে ওই ‘পরিযায়ী’ শব্দটিই তো বলে দেয় তাঁদের কাজের জায়গা আর বসবাসের জায়গা আসলে দুটো আলাদা ‘দেশ’— সেই ‘দেশে’ ফেরার জন্যই তাঁরা মাইলের পর মাইল হাঁটলেন, নিরুপায় হয়ে ট্রেনে কাটা পড়লেন, হাইরোডে বা বাস টারমিনাসে প্রশাসনের হাতে পীড়িত হলেন— বিরাট বড় এই মহান দেশ তাঁদের কোন সংস্থানটুকু করে উঠতে পেরেছিল সেদিন? আর ওই কাজহারানো বিপন্ন মানুষগুলো বাড়ি ফেরার সময় ঠিক কোন ‘দেশে’র কথা ভাবছিলেন? এদের কাছে কীই বা দেশপ্রেম আর কীই বা দেশদ্রোহ!

 

৩.

তাই হয়তো আজ আমাদের ভাবতে ইচ্ছে করে, ‘দেশ’ শব্দটা ঘিরে যে প্রকাণ্ড একটা কিছু বড়সড় ব্যাপার অনেকদিন ধরে আমাদের ঘিরে আছে তার কি কোনও অন্য মানেও লুকিয়ে থাকে না কোথাও? প্রতিটি মানুষেরই বোধহয় নিজস্ব একটা ছোট মাপের ‘দেশ’ থেকে যায় কোথাও। কখনও তার নাম ‘ভিটে’, কখনও ‘মুলুক’ বা ‘সাকিন’। ওই ছোট্ট অঞ্চলটুকুর মধ্যে ঘোরাফেরা করে আমাদের স্মৃতি ও আবেগ, আমরা আসলে ফিরতে চাই সেই মিতায়ত চৌহদ্দিতে। আজও আমরা যারা শহরে ফ্ল্যাট বা বাড়িতে থাকি কোথাও তাঁদের থেকে যায় ‘দেশ’— আমরা কেউ কেউ সেই ‘দেশের বাড়ি’ যাই পুজোর ছুটিতে, কারও কারও ‘দেশের বাড়ি’তে উদযাপিত হয় পারিবারিক উৎসব, পরিবারের সকলে তখন একজায়গায় মিলি কয়েকটা দিনের জন্য। এইভাবে ‘দেশ’ থেকে ‘দেশান্তর’-এ আমাদের নিত্য আসাযাওয়া। এইসব চলাচলের মধ্যে থাকে না বানিয়ে তোলা কোনও দেশভক্তির কাঠামো অথবা ‘দেশ বিরোধিতার’ কষ্টকল্পিত উদ্যত তর্জনী। এইসব ‘দেশচেতনা’কে অস্বীকার করে শুধু বড় দেশের কথাই ভাবতে হবে আমাদের এমন মাথার দিব্যি কে কবে কোথায় দিয়েছে? শক্তি চাটুজ্যে লিখেছিলেন— ‘এই বিদেশে সবই মানায়’— তাহলে আমাদের এই ছোট মাপের ‘দেশ’-এও বা সব মানাবে না কেন, বলতে পারেন?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3695 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...