প্রসঙ্গ প্রত্নগ্রাম বৈতল: বৃহৎ মল্লভূমের প্রাচীন সংস্কৃতির অনন্য স্মারক

তুলসীদাস মাইতি

 

কথামুখ

একদা মল্লভূম ছিল রাঢ়বঙ্গের এক আকর্ষণের ভূমি। বৃহৎ মল্লভূমে গড়ে ওঠা ছোট বড় নানা জনপদ আজও ইতিহাসের বিবিধ নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দেবদেউল এবং তাঁকে ঘিরে নানান সংস্কৃতি ছড়িয়ে আছে জনপদের আনাচে কানাচে। কোথাও অক্ষত মহিমায় কোথাও-বা ক্রমক্ষয়ের স্মারক হয়ে কোথাও বা অবলুপ্তির অবশেষ নিয়ে। এমনই একটি ঐতিহ্যগ্রাম প্রসঙ্গে আলোচনার জন্য এই প্রতিবেদনের অবতারণা।

অধুনা বাঁকুড়া জেলার এক সমৃদ্ধ জনপদ বৈতল।

মল্লরাজধানী বিষ্ণুপুরকে কেন্দ্র করে যদি একটি পঁচিশ কিলোমিটারের বৃত্ত টানা হয় তাহলে যে বিস্তৃত ক্ষেত্র দেখি তার প্রায় ব্যাসরেখায় অবস্থান করছে প্রত্নভূমি বৈতল। বাঁকুড়া জেলার একটি অতি বড় গ্রাম। অনেকগুলো পাড়া নিয়ে গঠিত এই ইতিহাস সমৃদ্ধ গ্রামটির বহুকাল থেকেই দুটি ভাগ উত্তরবাড় (জেএল নম্বর ১২৭) ও দক্ষিণবাড় (জেএল নম্বর ১৩৪)। পুরো গ্রাম জুড়েই ইতিহাস বাঙ্ময় হয়ে আছে। বিষ্ণুপুর থেকে জয়পুর হয়ে সলদা গোকুলনগর হয়েও যেমন বৈতল গ্রামে পৌঁছানো যায় তেমনই বিষ্ণুপুর মেদিনীপুর সড়কপথের বাঁকাদহ বাস স্টপেজ থেকে পূর্বদিকে চলে যাওয়া প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে জেলার এই প্রান্তিক জনপদ বৈতল। খুব কাছেই পশ্চিম মেদিনীপুর ও হুগলি জেলা।

একদিকে স্থাপত্য শিল্প, অন্যদিকে প্রাচীন উচ্চ ও লৌকিক— দুই সংস্কৃতির বিবিধ উপকরণ অঞ্চলটিকে উচ্চতর মাত্রা দিয়েছে।

 

শ্যামচাঁদ মন্দির ও তার রূপ

গ্রামের একপ্রান্তে দক্ষিণবাড় মৌজার ‘গড়ধার’-এ দাঁড়িয়ে আছে মাকড়া পাথরের পঞ্চরত্ন শ্যামচাঁদ মন্দির। দৈর্ঘ্যপ্রস্থে ৩৬ ফুট উচ্চতায় ৪০ ফুট এই মন্দির এক নিপুণ স্থাপত্যের নিদর্শন। একটি পাথরের ভিত্তিবেদির ওপর নির্মিত। মন্দিরের দেওয়ালে বদ্ধ প্রতিষ্ঠালিপি থেকে ঐতিহাসিকগণ মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খুঁজেছেন—

শ্রীল শ্রী রাধিকাকৃষ্ণ পদপঙ্কজ সান্নিধ্যে
রসর্তুগ্রহগেশাকে বীর হাম্বির জখনত্বা?
রঘুনাথ নরেশস্য সুবর্ণমণি সংগ্রহয়া
মাহষ্যাগ্রমদেন্বেদ নবরত্ন সমর্পিত। ৯৬৬।

অর্থাৎ বীর হাম্বিরের পুত্র প্রথম রঘুনাথ সিংহের পত্নী সুবর্ণমনি ৯৬৬ মল্লাব্দে, ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দিরটি এখন সরকার দ্বারা অধিগৃহীত। সরকারি ফলকেও নির্মাণকাল লেখা আছে।

প্রকৃত প্রস্তাবে, বাঁকুড়া জেলার গুরুত্বপূর্ণ পাথরের মন্দিরগুলোর মধ্যে এই অপূর্ব শোভার মন্দিরটি অন্যতম। ল্যাটারাইট স্টোন অর্থাৎ মাকড়া পাথর নির্মিত এই দেবদেউল বিষ্ণুপুর শৈলিতে নির্মিত হলেও স্বতন্ত্র অবয়ব নিয়ে বিরাজ করছে। মন্দির পূর্বমুখী হলেও মন্দিরের চারদিকেই ত্রি-খিলান দালান মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। মন্দিরটির অন্য এক ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য দক্ষিণদিকের প্রবেশপথের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া অর্ধবৃত্তাকার সিঁড়ি। এই পথ দিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় মন্দিরের পাঁচটি চুড়োর কাছে। বড় ছাদে খাঁজকাটা-চালের অষ্টকোণযুক্ত মাঝের কেন্দ্রীয় চুড়ো বেশ বড়। বাকি চারটি ছোট চুড়ো সমান আকৃতির। লাগালাগি নয়। সবগুলি আলাদা-আলাদাভাবে দেখলে স্বতন্ত্র পাঁচটি মন্দিরের রূপ লক্ষিত হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, কেন্দ্রীয় চূড়াতে বেদির ওপর উৎসবের সময় বিগ্রহ এনে রাখা হত।

মন্দিরে নিত্যপুজো হয় আজও। পাঁচিলের পাশে কিছু ঢিপি আছে। গবেষকগণ বলে থাকেন এখানে গড় ছিল। এবং হয়তো সেকারণেই মৌজার নাম গড়ধার।

মন্দিরচত্বরে বছরে দু একবার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তবে ভ্রাতৃ-দ্বিতীয়ার দিন অনুষ্ঠিত ‘কলালড়াই’ এখানকার এক অন্যতম ব্যতিক্রমী পরম্পরা।

সরকার সংরক্ষণ করলেও মন্দিরটি আজও অবহেলা বা উদাসীনতার শিকার। দেওয়ালে কোথাও সিমেন্ট লেপা। ওপরের দিকে গাছপালা গজিয়ে উঠেছে। চত্বরে গবাদি পশু ঘুরে বেড়াচ্ছে।

 

বাঁকুড়া রায় ধর্মঠাকুরের মন্দির ও তার আকর্ষণীয় ঘরভরা ধর্ম গাজন

বাঁকুড়া নামকরণের ইতিহাসে একটি জনশ্রুতি আছে বাঁকুড়া রায় ধর্মঠাকুরের নাম থেকেই এমন নামকরণ। বিষয়টি বিতর্কিত হলেও এমন কথা বলাই যে বাঁকুড়া জেলা ঘিরে বাঁকুড়া রায় ধর্মঠাকুরের বিবিধ সংস্কৃতি দীর্ঘ সময় ধরে চলমান। বৈতল গ্রামের বাঁকুড়া রায় ধর্মঠাকুরের মন্দির, এই বৃহৎ সংস্কৃতি স্রোতেরই এক অন্যতম একক। বৈতল পল্লীর দক্ষিণবাড় মৌজাতেই রয়েছে মাকড়া পাথরে নির্মিত এই প্রাচীন মন্দির। দৈর্ঘ্য প্রস্থ জুড়ে ১৫ ফুটের বেশি ও উচ্চতায় ২৫ ফুট বিষ্ণুপুর রীতির একরেখ দেউল। জনশ্রুতি অনুযায়ী মন্দিরটি মল্লরাজ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করা হয়। তবে কোনও প্রতিষ্ঠাফলক নেই। পণ্ডিতপাড়ার মাঝখানে মন্দিরটির অবস্থান। চারচালা ছাদযুক্ত ত্রিখিলান দালান। চূড়ায় সুদৃশ্য আমলক। প্রায় তিনশো বছরের পুরনো মন্দিরের বাইরের দিকে আধুনিক নকশা ও ফ্রেসকো আছে। সম্প্রতি একটি আটচালা নির্মিত হয়েছে। মন্দিরে রয়েছে বাঁকুড়া রায়-এর কুর্ম শিলামূর্তি। দুটি বড় মূর্তি ছাড়াও বেশ কয়েকটি ছোট বড় মূর্তি রয়েছে। এখানে বারো ধর্ম বিরাজ করেন। তিনজন কামিন্ন্যা আছেন। আছে এক সপ্ত নাগছত্রধারিণী দেড় ফুট মাপের এক শিলাখোদিত চার বাহু বিশিষ্ট মনসার মূর্তি। বাঁকুড়া রায় ছাড়াও স্বরূপ নারায়ণ, দলু রায়, কৌতু রায়, রাজবল্লভ, ফতেসিং প্রমুখ বারোজন ধর্মদেবতার অধিষ্ঠান।

পণ্ডিত পদবিধারী পুরোহিত দ্বারা দেবতা নিত্য পূজিত হয়ে আসছেন। পণ্ডিত হলেও আসলে তাঁরা তেঁতুলে বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষ। দেবোত্তর জমি সম্পত্তি আছে। তাই দিয়ে নানা উৎসব হয়। আগে বারো বছর ছাড়া ছাড়া ঘরভরা অর্থাৎ গৃহভরণ গাজন অনুষ্ঠিত হত। তবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান বলে এখন বহু বছর পরে পরে এই গাজন হয়। বছর পাঁচেক আগে প্রায় তিরিশ বছর পরে এই গাজন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বৈতল গ্রামের এই ঘরভরা গাজন একটি অতি আড়ম্বরপূর্ণ ও কড়া নিয়মকানুন যুক্ত উৎসব। বিষয়টি বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ।

 

বৈতলের ধর্ম গাজনের ক্রিয়াদি

বৈশাখী পূর্ণিমা ঘিরে গৃহভরণ গাজন হয়। তার আগে অক্ষয় তৃতীয়া থেকে শুরু হয় এবং শেষ হয় পূর্ণিমাতে। ধর্মপুজোর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি নিয়মকানুন বা বিধি আছে যা প্রস্তুত করতে হয় বা পালন করতে হয়। ছোট ছোট ভাঁড় অথবা কলসিতে গঙ্গাজল, ডাবের জল, মধু, সুরা ইত্যাদি মিশিয়ে যা নিয়ে ভক্তরা মন্দিরের সামনে বৃত্তাকার দাঁড়িয়ে ছড়া কাটে এর নাম ভাঁড়াল। তাছাড়া দণ্ডি কাটা, বাণফোড়া, আগুনসন্ন্যাস জাঙ্গাল দেওয়া, ধুনাপোড়ানো ইত্যাদি হয়ে থাকে। বারোজন ভক্তা সূচনাপর্বে অংশগ্রহণ করে। পুজো হয় ধর্মপূজার বিধান অনুযায়ী।

ধর্মপূজা বিধানে আছে—

প্রথমত আরম্ভাৎ পূর্বদিবসে দ্বাদশ ভক্তান্ নিরুপ্য ক্ষৌরাদিহবিষ্য্ কারয়ীত্বা স্বয়ং চ হবিষ্যাশী সংযতস্তিষ্ঠেত। পরদিনে উষসুত্থ্যায় প্রাতঃকৃত্যাদি বিধায় সদ্বাদশভক্ত স্নাত্বা কৃতনিত্যক্রিয়: শ্রীধর্মমন্দিরং গত্বা পাদশৌচাদি বিধায়াদৌ গৃহাভ্যন্তরে ঘটং সংস্থাপ্য গণেশাদীন্ যথাশক্তি সংপূজ্য ততো বাহির্বেদিসংমুখে স্থাপয়েৎ।

বারো ধর্মের শিলামূর্তিকে মন্দিরের বাইরে এক স্থানে অস্থায়ী মণ্ডপ নির্মাণ করে স্থাপন করা হয়।

এই অবস্থাকে বারাম বলা হয়ে থাকে। বেদির মধ্যে ধর্মশিলা প্রতিষ্ঠা করার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। অষ্টদল পদ্ম অথবা ষোড়শদল পদ্ম নির্মাণ করে তার ওপর ধর্মকে স্থাপন করতে হয়। লিখিত মণ্ডল মধ্যে ঈশান কোণে কামিন্যাকে রাখা হয়।

বারো দিনে সকালে বারো বিকেলে বারো অর্থাৎ চব্বিশ পালার গান গাওয়া হয়। একে বলে বার্মতি বা বারোমতি। বারো দিন বাইতির ঢাক বাজে। অনেক সময় পাড়ায় ঘুরে ঢাকিরা ঢাক বাজিয়ে আসে।

বৈতলের বাঁকুড়া রায়ের ধর্মগাজনে বারোজনের বেশি ভক্ত হওয়া যায়। অনেকদিন ছাড়া গাজন পার্বণে বহু মানুষ ভক্ত হয়ে থাকে। নারী পুরুষ উভয়েই গাজনের ভক্ত হয়। ভক্তদের মধ্যে পাটভক্ত্যা, বাণভক্ত্যা, সাধারণ ভক্ত্যা, অধিষ্ঠান ভক্ত্যা ইত্যাদি নাম থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল গ্রামের সমস্ত মানুষের একত্র হওয়ার সুযোগ। গাজনের অনেক আগে থেকে গ্রামের কমিটি সভা করে পরিকল্পনা করে থাকে। কারা ভক্ত্যা বা কামিন হবে ও কারা কর্মী হবে সভাতেই ঠিক করা হয়। সেদিনই নতুন হাঁড়িতে ঠাকুরের ফুল রেখে গ্রামের মান্যগণ্য কিছু মানুষের কাছে পাঠানো হয়। একে বলা হয় মান্যহাঁড়ি। বলা বাহুল্য, বৈতল গ্রাম ছাড়াও বাঁকুড়ার ময়নাপূর, সুলদা, প্রভৃতি অঞ্চলে প্রায় একরকম নিয়মকানুনের ঘরভরা গাজন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

একটি কালো রঙের পাঁঠাকে বছর ধরে পায়ে মন্ত্রপূত বেড়ি বেঁধে ছেড়ে দেওয়ার ছিল। বেড়িটির নাম ভাঁড়কো, ছাগলটিকে বলা হয় লুই। পুজোর প্রায় শেষ লগ্নে লুইয়ের বলি হয়। ধর্মঠাকুরের কাহিনিতে লুই-এর নানা প্রসঙ্গ আছে। আজকাল অবশ্য বারো বছর আগে লুইকে ছাড়া হয় না। বড় নিখুঁত কালো পাঁঠা হলেই চলে। গাজনের কয়েকদিন আগে লুই এবং কোল লুই-এর সংস্কার করা হয়। একে লইয়া সংস্কার বলা হয়। কথিত আছে আগে গাজনের সময় লুই এবং কোল লুই বলির জন্য নিজেরাই মন্দিরে আসত। বলির আগে লুইকে স্নানকরানোর পর পুজো করানো হয়ে থাকে। বেলপাতা সহ তাকে ফুল খাওয়ানো হয়। তারপর হাঁড়িকাঠ ছাড়াই এক কোপে বলি দেওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে। বলির পর লুইয়ের মাথা একটি মাটির হাঁড়িতে ঘি এর প্রদীপ বসিয়ে পঞ্চশস্যের উপর রাখা হয়। কাপড়ে হাঁড়ির মুখ ঢেকে তা মণ্ডপে আনা হয়। প্রতিপদে হাঁড়িটি বিশেষ পুজো ও শোভাযাত্রা সহকারে গাজন পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়। কিংবদন্তি আছে বন্ধ্যা রমণী বলির পর রাত্রিতে লুইয়া মুণ্ডসহ রাত্রি জাগলে রাত্রে লুইয়া জীবন্ত হয়ে ডাক ছাড়ে তাতে ওই রমণীর মঙ্গল হয় এবং সে সন্তানসম্ভবা হয়ে ওঠে। একে বলে লুইয়া জাগা। এক্ষেত্রে মাটির হাঁড়ির সঙ্গে শিশুর বস্ত্র, খাওয়ার পাত্র ইত্যাদি রাখা হয়। প্রতিপদে লুইয়ার বিসর্জনের পর নির্দিষ্ট গাজন পুকুরে স্নান ও শান্তিজল নিয়ে গাজনের সমাপ্তি। নির্দিষ্ট গাজনপুকুরেই গাজনের দিনগুলিতে স্নান সহ কাজ সব কাজ চলে। অধিবাসের পর গুরুত্বপূর্ণ কাজ গামীর গাছ ছেদন। বলা বাহুল্য, রাত গাজনেও এই প্রকারের ক্রিয়াকর্ম আছে। গামীর বৃক্ষছেদনের পর নির্দিষ্ট কামারঘর থেকে ওই কাঠ দিয়ে ঝাঁপ কাঠি বানানো হয়। গাজনের দিনগুলির মধ্যে গাজন দিন গাজন গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ণিমার দিন দিনগাজন এবং তার আগের দিন রাতগাজন হয়ে থাকে। গাজনের মধ্যেই একদিন ধর্মঠাকুরের বিয়ে হয়। এই অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বাঁকুড়ার বৈতল গ্রামে আশেপাশের মানুষও আসে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। বিয়ের নিয়ম অনুসারে কামিন্যা অর্থাৎ কনের সঙ্গে ধর্মের বিয়ে হয় খাওয়া-দাওয়া হয়। মন্দিরে নির্মিত হয় মুক্তাঘর। বিশেষ আতপচালের সঙ্গে মধু কলা মুসুরডাল, মুগডাল সহ রং ইত্যাদি কিছু মিশিয়ে ধর্মের মন্দিরের থানে মুক্তা ঘর তৈরি হয়। লুইয়ের বলি পর্যন্ত এই মুক্তাচাল নির্মিত ঘর থাকে। এর নাম মুক্তামণ্ডল। ধর্মশিলার বিশেষ কুর্মমূর্তির আকারে এই মণ্ডল। মাঝে ধর্মের পাদুকা আঁকা হয়। নাগ নাগিনী দিয়ে বেষ্টিত থাকে। থাকে দরজাও। এই নির্মিত মুক্তাঘরকে বলা হয় ধর্মঠাকুরের বাসর। গাজন শেষে পায়রা বা হাঁস দিয়ে ওই চাল খাইয়ে মুক্তাঘর ভাঙা হয়। মুক্তাচালকে কুড়িয়ে মুক্তাহাড়িতে রাখা হয়। এই মুক্তাঘরের তত্ত্বগত গভীর তাৎপর্য আছে বলে পণ্ডিতগণ মনে করেন।

রাতগাজন ও দিনগাজনের দিনে ভক্ত্যারা নানা কৃচ্ছসাধনা করে। শালে ভর, ঝাপকাটা, আগুনে ঝাঁপ, বাণফোড়া‌ প্রভৃতি।

বিভিন্ন ধর্মগাজনে নানা প্রকার বাণ বিদ্ধ করার বিধি আছে। লোহাবাণ, নলিবাণ, ঢেঁকিবাণ, লড়কিবাণ, দশমুখীবাণ ইত্যাদি।

নবখণ্ড এই ধর্মগজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়া। অন্য নাম হাকন্দ। ধর্মগাজন থানের কিছুটা সামনে একটি চৌকো গর্ত কাটা হয়। নাম দেওয়া হয় হাকন্দ পুষ্করিণী। ধর্মমঙ্গল কাহিনিতে এই বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। নবখণ্ড কথা দেহকে নটি খণ্ডে ভাগ করে ধর্মকে উৎসর্গ করার কথা রয়েছে। গাজন উপলক্ষে একটি কলাগাছকে ওই গর্তের মধ্যে এমনভাবে রাখা হয় কয়েকটি ধারালো খড়্গ যেন তাকে নয়টি খণ্ডে কেটে প্রতীকী উৎসর্গ করে। পাটভক্ত্যা গলা পর্যন্ত জলে ডুবে থাকে। মৃতবৎ থাকে সে। অন্য ভক্ত্যা ও আমিনীগণ সবাই কাঁদে। লাউসেনের প্রাণদান ও পশ্চিমে সূর্যোদয় পালা গাওয়া হয়। কয়েক ঘন্টা এই অনুষ্ঠান চলে।

সবমিলিয়ে বৈতলের ধর্মঠাকুরের মন্দিরে ধর্মের এই কিছু বছর ছাড়া গাজন বাংলার এক অন্যতম লৌকিক উৎসব।

বাঁকুড়া রায়-এর মন্দির ছাড়াও বৈতল গ্রামে আরও কয়েকটি ধর্মঠাকুরের থান আছে। আর এক পণ্ডিতপাড়ায় দলু রায়-এর ছোট একটি মন্দির আছে। তপন পণ্ডিত ও তাঁর বংশধর এর পুরোহিত। গ্রামের ঈশানপাড়াতেও ধর্মঠাকুরের থান আছে।

 

বৈতলের ঝগড়াই চণ্ডীর মন্দিরে কাদা খেলা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

মানিক রামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের বন্দনা পর্বে ঝগড়াই চণ্ডীর প্রসঙ্গ আছে—

ফুলুইয়ের জয়দুর্গা বৈতলের ঝগড়াই।
ক্ষেপুতে খ্যাপাই বন্দি আমতা মেলাই।।

এই ঝগড়াই চণ্ডী বিরাজ করেন বাঁকুড়া জেলার সলদা প্রত্ন ভুখণ্ডের অন্তর্গত বৈতল উত্তরবাড় মৌজায়। একদা গাছতলায় পূজিত দেবী ঝগড়াই-এর মূর্তি মন্দিরের ভেতর প্রতিষ্ঠিত। এটিও মাকড়া পাথরের তৈরি সপ্তরথ দেউল। ইতিহাস থেকে জানা মন্দিরটি ৯৬৫ মল্লাব্দে অর্থাৎ ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। ভেতরের মূর্তিটি খুব সুন্দর। সারাক্ষণ আচ্ছাদনে ঢাকা থাকলেও স্নানের সময় অনাবৃত থাকে বিগ্রহ। বেলেপাথরের মূর্তিটি দশভূজা বলে জানা গেলেও সব হাত চোখে পড়ে না। তবে আটটি হাত স্পষ্ট চোখে পড়ে। মূর্তিটির পায়ের অংশের সঙ্গে মাথা বা দেহের সাযুজ্য কম। উত্তরদুয়ারী এই মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রস্তরখোদিত দেবীর অপরূপ সেই মূর্তি। মন্দিরের প্রস্তরলিপি অস্পষ্ট। গবেষকগণ অন্য একটি লিপির কথাও বলেছেন। এ সব থেকে জানা যায়, দেবীর মন্দির নির্মিত হয়েছিল বিষ্ণুপুরের মল্লরাজ প্রথম রঘুনাথ সিংহের আমলেই। অনেকে বলেন দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ। লোকমুখে ও ইতিহাস থেকে যেটুকু জানা যায় মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ তার রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মাঝে মাঝে যুদ্ধ অভিযান করতেন। কখনও জয়লাভ করতেন কখনও বা ব্যর্থ হতেন। বর্গক্ষত্রিয়, বাগদি ইত্যাদি জনজাতির বসবাস ছিল এই অঞ্চল। স্থানীয় নিম্নবর্গের এই মানুষজন রাজার সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিতেন। কোনও এক শারদীয়া বিজয়ার দিন রাজা রঘুনাথ সিংহ স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন অভিযানে। যদিও ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। জনশ্রুতি অনুযায়ী, রাজা যুদ্ধযাত্রাকালে বটতলায় পূজিত দেবী ঝগড়াই চণ্ডীমাতার কাছে জয়ের প্রার্থনা করেন। তিনি দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে মানত করেন যদি জয়লাভ করেন তবে গাছতলার দেবীকে মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করবেন এবং দেবীর প্রাঙ্গণে বিজয় উৎসব করবেন। বলা বাহুল্য সেদিন রাজা যুদ্ধ জয় করেন এবং তার সৈন্যদল বর্গী হানা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হন এবং চেতুয়া বরদা জয় করেন। আর এই বিজয় স্মরণে দেবী ঝগড়াই চণ্ডীর প্রাঙ্গণে কাদা খেলা উৎসবেরও সূচনা করেন। এই উৎসবও বাংলার তথা রাঢ়বঙ্গের অন্যতম ব্যতিক্রমী একটি উৎসব। রক্ত অশ্রু ও আনন্দের উৎসব। ইতিহাস থেকে এর প্রমাণ না মিললেও এ কথা সত্যি যে ওই সময়কালে সীমান্ত অঞ্চলে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। এলাকার মানুষজন ও পুরোহিতদের কথা শুনে মনে হয়েছে সেদিন রাজা জয়লাভের পর দেবীকে গাছতলা থেকে মন্দিরে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করেন।

এ প্রসঙ্গে অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়-এর লেখা থেকে জানতে পারি ৯৬৫ মল্লাব্দ অর্থাৎ ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। যদিও এই সময়কাল নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে দীর্ঘকাল ধরে এই দেবী মানুষের কাছে জাগ্রত দেবী ও জনপ্রিয় স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

দেবীর অভিজাত নাম ‘ঝগড়ভঞ্জনী’। এখানকার দেবী এতই জাগ্রত বলে কথিত যে আশেপাশের সমস্ত গ্রাম থেকে মানুষজন আসে পুজোর জন্য। রোগজ্বালা নিরাময় ও মনস্কামনা পূরণের আশায়। মানুষজনের বিশ্বাস এই দেবী মানুষের নানাপ্রকার কলহ বিবাদ মিটিয়ে দেন। এখানকার চণ্ডীদেবীর আশীর্বাদে মামলা মোকদ্দমায় জয়লাভও নাকি হয়ে থাকে।

দেবীর নিত্য পূজা হয়। শনিবার ও মঙ্গলবার দেবীর পূজা হয় ঘটা করে। মানত করা ছাগ বলি হয় এই দুই দিন। তবে শরৎকালের দুর্গোৎসবের সময় দেবীর পুজো হয় জাঁকজমক সহকারে। দুর্গাপুজোর নিয়ম অনুসারে পুজো হয় তবে যেহেতু স্থায়ী ঘট আছে তাই নতুন করে ঘট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হয় না। সপ্তমী অষ্টমী নবমী তিথিতে পুজো হয়। বহু লোক সমাগম হয়।

তবে এখানকার পুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্বটি হল দশমীতে কাদাখেলা।

 

কাদাখেলার বর্ণনা

ঝগড়াই মণ্ডপে কাদা খেলা একটি পরম্পরাগত অনুষ্ঠান। ঘটা করে দেবীর পুজো হয় বিজয়ার সকালে। দ্বিতীয় প্রহরে ছাগ বলি হয়। মন্দিরপ্রাঙ্গণে রাস্তার দিকে একটি অংশে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় সাতটা পুকুরের জয়লেনে ওই প্রাঙ্গণ ভরে দেওয়া হয় বলি রক্তের কয়েক ফোঁটা ওই জলে মিশিয়ে দেয়া হয়। তার পরেই চলে জলক্রীড়া, কর্দমক্রীড়া। প্রথমে ছোটরা পরে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই এই খেলায় মেতে ওঠেন। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি থেকে মানুষজন আসেন এই খেলায় অংশ নিতে বা খেলা দেখার জন্য। যাঁরা এই খেলায় মাতেন তাঁরা নিজেদের পুণ্যার্থী বলে মনে করেন, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে। এই খেলায় অংশ নেন পরস্পর পরস্পরকে জলকাদা ছিটিয়ে ছড়িয়ে উপভোগ করে। এই খেলা সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলতে থাকে। শেষ হয় যখন জলকাদা মিশে ঘন হয়ে ওঠে জলের বাঁধ কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিতে আসেন পার্শ্ববর্তী হিজলডিহা গ্রামের জমিদার বক্সি পরিবারের প্রতিনিধি। কথিত আছে বিষ্ণুপুর থেকে মল্লরাজারা হাতির পিঠে চড়ে এই বাঁধের জল কাটাতে আসতেন। রাজার জয়সূচক উৎসব হিসেবে দেখা হত এই অনুষ্ঠানপর্বটিকে। উপভোগ্য এই অনুষ্ঠান দর্শন করতে বা অংশ নিতে পাশের ময়নাপুর কুচিয়াকোল মাগুরা রাজগ্রাম, জয়পুর প্রভৃতি গ্রাম থেকে লোকজন আসে।

বলা বাহুল্য, বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে এই কাদা খেলা অনুষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ। জয় বিজয় অভিযান এমন মিলনপর্ব আর দেখা যায় না এই বিশ্বাসের সঙ্গে জাদু বিশ্বাস হয়তো মিশে থাকতে পারে গবেষকগণ বলেন শারদীয়া দশমীর দিন সব জাতির লোকদের মধ্যে এমন একটি অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল নগ্ন কাতরে কাদা ও লতাপাতা জড়িয়ে উৎসব। এই অঞ্চলটি মল্লরাজার ছিল তবে অন্যান্য রাজ্যের সীমান্ত অঞ্চলে জনশ্রুতি অনুযায়ী রঘুনাথ সিংহ বিশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজয়ের পর এই অনুষ্ঠানটি পরিচালিত করে। হেরে যাওয়ার পর অধিক মনোবল ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার পর যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত সেনাবাহিনী এই মন্দিরের সামনে জয়ের উল্লাস করেছিল। সেদিন খুব বৃষ্টি হয় বৃষ্টি জল কাদা এবং রক্ত সব একাকার করে নাচ শুরু হয়। ঝড় বৃষ্টি উল্লাস একসঙ্গে মিশে একাকার হয়ে সূচিত হয়েছিল এই স্বতন্ত্র পরম্পরা অনুষ্ঠান। সেই দিন থেকেই স্মরণ করে আয়োজন চলে আসছে এই অনুষ্ঠান। আগে ঢাকঢোল প্রভৃতি বাদ্য সহযোগে এই উল্লাস হত।

কাদা খেলা ছাড়াও এই মন্দিরে বছর ব্যাপি নানা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

 

রাধাদামোদর মন্দির ও অন্যান্য

বৈতল পল্লীর ঝগড়াই মণ্ডপের  অনতি দূরে লাহা পরিবারের আর একটি পঞ্চরত্নের মন্দির আছে। মন্দিরটি রাধাদামোদরের মন্দির। প্রতিষ্ঠা লিপি থেকে জানা যায় দক্ষিণমুখী এই মন্দির ১৬৯৬ সালে নির্মিত। অধুনা পরিত্যক্ত মন্দিরটি দৈর্ঘ্য প্রস্থ জুড়ে ১৬ ফুট ও উচ্ছতায় ২৫ ফুট।

মন্দিরের সাধারণ মর্যাদা কমলেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও কমেনি।

বৈতল পল্লীর প্রায় মধ্যিখানে জনপ্রিয় বাঁকা রায়-এর শিবমন্দির। অনেকে মনে করেন এটিও ধর্মরাজের থান ছিল হয়তো। কারণ বৈতল সহ পুরো জনপদে বাঁকুড়া রায় ধর্মঠাকুরের ওপর বিশ্বাস এখনও ভীষণভাবে রয়ে গেছে।

 

কথাশেষ

বৈতল পল্লীর এই ঐতিহ্য হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে। জনপদের যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা পাথর, ভগ্নদশার নানান চিহ্ন সব অদৃশ্য হয়ে যাবে একদিন। কিন্তু বহুকাল ধরে লালিত যে সংস্কৃতি ইতিহাস ভূমির লোকমানসে মনন হয়ে রয়ে গেছে তার সম্পূর্ণ অবলুপ্তি কখনোই সম্ভব কি? আগামীদিনই দেবে এই উত্তর।

 

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

  1. বাঁকুড়া জেলার পুরাকীর্তি- অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায়।
  2. পশ্চিম বঙ্গের সংস্কৃতি: প্রথম খন্ড- বিনয় ঘোষ।
  3. বাঁকুড়ার লোক পার্বণ: টেরাকোটা সম্পাদনা প্রদীপ কর।
  4. টেরাকোটা পত্রিকা। মে জুন জুলাই সংখ্যা। সম্পাদনা প্রদীপ কর ও তুলসীদাস  মাইতি। (প্রবন্ধ-পথে প্রান্তরে বাঁকুড়া – তুলসীদাস মাইতি)
  5. ক্ষেত্র সমীক্ষা সঙ্গী প্রদীপ কর-বিষ্ণুপুর। বিশ্বজিৎ পাজা হীরাপুর, সলদা। পলাশ চট্টোপাধ্যায় – জয়পুর।
  6. সঞ্জয় সন্তকী। ঝগড়াই চণ্ডী। উত্তরবাড়।
  7. তপন পণ্ডিত। কার্তিক পণ্ডিত। দক্ষিণবাড়
  8. ধর্মমঙ্গল- মানিকরাম দত্ত।
  9. আঞ্চলিক দেবতা ও লোকসংস্কৃতি – মিহির চৌধুরী কামিল্যা।
  10. নিরঞ্জন পণ্ডিত – সলদা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...