ভাষা চিন্তা মন: শারীরিক অবকাঠামো — একটি সহজপাঠ [৮]

অশোক মুখোপাধ্যায়

 

পূর্ব-প্রসঙ্গ: প্রথম সঙ্কেত তন্ত্র

শব্দ থেকে ধ্বনি

আমরা জানি, ভাষার মাধ্যমে মানুষ যেমন নিজে চিন্তা করে, তেমনই অপরের সঙ্গেও চিন্তার বিনিময় করে। একে আমরা সাধারণভাবে বলি জ্ঞাপন (communication) বা তথ্যের আদানপ্রদান (information exchange)। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, এই জ্ঞাপনের কাজটা শুধু মানুষ নয়, অন্যান্য প্রাণীকেও কমবেশি করতে হয়। কিন্তু বিবর্তনের ধারা অনুসরণ করলে দেখা যায়— আমরা অন্য প্রসঙ্গেও উল্লেখ করেছি— যে, সরীসৃপ পর্যায় পর্যন্ত প্রাণীজগতে শব্দের সাহায্যে যোগাযোগের কোনও ব্যবস্থা, প্রক্রিয়া বা দেহযন্ত্র গড়েই ওঠেনি। তখন পর্যন্ত যোগাযোগের ব্যবস্থাটা হল ভৌত-রাসায়নিক এবং স্পর্শগত। যেমন, অনেকেই জানেন, পিঁপড়েরা পরস্পরের শুঁড় ঠেকিয়ে একটা রাসায়নিক পদার্থ ফেরোমোন (pheromone) নিঃসরণের মাধ্যমে তথ্যের আদানপ্রদান করে। আর মৌমাছি বা অন্য কিছু কীটপতঙ্গ তিন-চাররকম নাচ দেখিয়ে বায়ুতে বিবিধ প্রকার স্পন্দন সৃষ্টি করে তথ্যবিনিময় করতে পারে।

চলতি ভাষায় আমরা অনেক সময় বলে থাকি, ব্যাঙ ডাকছে, সাপ ফোঁসফোঁস করছে, ঝিঁঝিপোকার কান্নার আওয়াজ শুনছি, ইত্যাদি। কিন্তু এসবের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে জ্ঞাপনের কোনও ব্যাপার নেই। কেন না, আওয়াজ করে এরা শোনাবে কাকে? কীভাবে শোনাবে? যাকে শোনাবে বা শোনাতে চাইতে পারে, তার তো শোনার কোনও ব্যবস্থা নেই। ব্যাঙ বা সাপের মাথার দুপাশে কানের বদলে টিমফ্যানাম (tymphanum) নামক যে পর্দা আছে তাতে উচ্চনাদী শব্দতরঙ্গবাহী হাওয়ার খুব জোরালো স্পন্দনের ধাক্কায় সামান্য স্পর্শানুভূতি হতে পারে। আবার শোনার কোনও যন্ত্র নেই বলেই শব্দ উৎপাদনেরও কোনও ব্যবস্থা বা অঙ্গ এদের নেই। বিবর্তনের যে পর্যায় থেকে শব্দ শুনবার যন্ত্র দেখা দিয়েছে, তখন থেকেই এদের শব্দ উৎপাদনেরও যন্ত্র তৈরি হয়েছে। তখন থেকেই শব্দগত জ্ঞাপন প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। পাখি আর স্তন্যপায়ীদের কানও আছে, শব্দযন্ত্রও আছে। এরা তাই পরস্পরের সঙ্গে শব্দ শুনে এবং শুনিয়ে যোগাযোগ করে যেতে পারে।

স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলির শব্দগত জ্ঞাপনের বিকাশ অনুসরণ করলে দেখা যায়, যত উচ্চতর পর্যায়ের প্রাণী তত তার শব্দসংখ্যা ও বৈচিত্র্য বেশি। যেমন, রাতে ছুঁচো বা ইঁদুরের ডাকের মধ্যে দু-তিনরকম আওয়াজ চেনা যায়। এরা থালাবাসনের মধ্যে পড়ে থাকা খাবারদাবার কিছু পেয়ে গেলে একরকম তৃপ্তিসূচক আওয়াজ করে। থালাবাটি উপুড় করা থাকলে এরা যদি এসে গন্ধ পেলেও খাদ্য না পায়, তাহলে বিরক্তিব্যঞ্জক আওয়াজ শোনায়। বেড়ালকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখব, ওরা খুশি হলে একরকম আওয়াজ করে, রেগে গেলে আবার অন্যরকম। দুটো হুলো বেড়াল মুখোমুখি হলে তাদের মধ্যে চার-পাঁচরকম হাঁক-ডাকের বিনিময় হতে থাকে। ঝগড়া বা মারামারি না হওয়া পর্যন্ত। আবার হুলো বেড়াল মাদি বেড়ালকে যখন যৌন মিলনের জন্য ডাকে, তার আওয়াজ আর একরকম শোনায়। কুকুর অচেনা লোককে দেখে যেভাবে ঘেউঘেউ করে গর্জন করে, চেনা লোককে দেখে তার চেয়ে অনেক মোলায়েম আওয়াজ করে। গরুর ব্যাপারটাও একইরকম। গরু খিদে পেলে একভাবে ডাকে, মাঠে রাখাল বা পরিচিত লোক দেখতে না পেলে আর একরকম করে ডাকে। আবার বাচ্চা হারিয়ে বা মরে গেলে বা বিক্রি করে দিলে করুণ সুরে ডাকে। ঘোড়ারও বিভিন্ন অবস্থার সাপেক্ষে বিভিন্নরকম ডাক শোনা যায়।

মানুষ বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই সব গৃহপালিত জীবজন্তুর ডাকাডাকির ধরনধারণ লক্ষ করেছে। নিজেদের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে মানুষ আবার তাতে মানবিক বৈশিষ্ট্য আরোপ করে থাকে। বলে: গরুটার মন খারাপ, বেড়ালটা খেতে চাইছে, কুকুরটা কাঁদছে, ঘোড়াটা ওর সহিসকে খুঁজছে, ছাগলটা বাচ্চাকে ডাকছে, ইত্যাদি। কিন্তু এই প্রকারভেদের সংখ্যা চার-পাঁচের বেশি নয়। গরিলা, শিম্পাঞ্জি, ওরাংউটাং জাতীয় বনমানুষগুলি, যারা বিবর্তনবৃক্ষে মানুষের খুব কাছাকাছি, বেড়াল কুকুর গরু ঘোড়ার চেয়ে অনেক বেশিরকমের শব্দ উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু তাও তিরিশ-চল্লিশের বেশি নয়। সোভিয়েত রাশিয়ায় পাভলভ ইন্সটিটিউটের গবেষণাগারে দুটি শিম্পাঞ্জি রোজা এবং রাফায়েলকে দিয়ে অনেক চেষ্টাচরিত্র করে মোট পঞ্চান্নরকম শব্দ উচ্চারণ শেখানো গিয়েছিল। তার মধ্যে এরা “পা-পা” “মাম্মি” “কাপ” ইত্যাদি খুব সরল তিন-চারটে ধ্বনিবহ অর্থযুক্ত শব্দও বলতে শিখেছিল।

তবে মানুষের শব্দ উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় এটা কিছুই নয়।

মানুষ কতরকম শব্দ উচ্চারণ করতে পারে?

এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে— সীমা-পরিসীমাহীন। গণনা করে কুলিয়ে ওঠা যাবে না।

ব্যাপারটা ভালো করে বুঝে নেওয়া দরকার।

আমরা জানি, বাংলা ভাষায় যত শব্দ আছে— আনুমানিক ষাট হাজার— জানলে আমরা তার সবই বলতে পারি। আমাদের মধ্যে যারা ইংরেজি শিখেছেন, তারা সঠিক উচ্চারণ সহ শিখে থাকলে তারও সবই বলতে পারবেন। অর্থাৎ, আরও অন্তত এক লক্ষ তিরিশ হাজার। এইভাবে দেখা যাবে, পৃথিবীতে যতগুলি কথ্য ভাষা আছে— কমপক্ষে দু হাজার— তার প্রতিটিতে যদি গড়ে দশ হাজার করেও শব্দ থাকে, তাহলে মানুষের সম্ভাব্য শব্দ উৎপাদন ক্ষমতা দু কোটির চেয়ে বেশি। কেন না, মানুষ নিজের ভাষা ছাড়াও অন্য যে কোনও ভাষাই উপযুক্ত পরিবেশ ও শিক্ষাগত সাহায্য পেলে শিখে নিতে পারে। তাছাড়া, মানুষের জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা, সাহিত্যসৃষ্টি, আন্তর্ভাষা অনুবাদ ইত্যাদির প্রয়োজনে তাকে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন শব্দের জন্ম দিয়ে যেতে হচ্ছে। তাই একথা মানতেই হবে, মানুষের শব্দ উৎপাদন করার ক্ষমতার কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হল, মানুষ এত শব্দ উৎপাদন ও উচ্চারণ করতে শেখে কীভাবে?

আমরা দেখব, এর পেছনে একটা চমৎকার নির্মাণকৌশল আছে।

যে কোনও ভাষার শব্দভাণ্ডার বিশ্লেষণ করলে কয়েকটা সীমিত সংখ্যক ন্যূনতম ধ্বনি বা শব্দ-একক পাওয়া যায়। ভাষাবিজ্ঞানে এদের বলা হয় স্বনিম (phoneme)। মানুষের মুখের ভাষায় ব্যবহারযোগ্য এরকম কম বা বেশি পঞ্চাশের মতো স্বনিম আছে। প্রতিটি ভাষাতেই এর সবগুলির ব্যবহার হয় না। এক একটা ভাষায় এই রকম কিছু ধ্বনিকেই লিখিত অক্ষর রূপে চিহ্নিত করে বর্ণমালা গঠিত হয়। যে কোনও ভাষায় তার সমস্ত স্বনিমের প্রতিনিধি স্বরূপ বর্ণ থাকে না; যতগুলো বর্ণ থাকে তাদের মিলিয়ে মিশিয়ে বাকি স্বনিমগুলি লেখা হয়। যেমন, ইংরেজিতে ‘থ’ বা ‘দ’-এর কোনও প্রতিনিধি বর্ণ নেই, কিন্তু উচ্চারণে আছে; তাই th লিখে এদের উচ্চারণ বোঝানো হয়। কিংবা ‘শ’ উচ্চারণ যেখানে আছে, সেই সব শব্দে tio ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আবার এরকম অনেক ভাষাতেই লিখিত রূপের সঙ্গে বেশ কিছু স্বনিম উচ্চারণের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। কিন্তু স্বনিমগুলি সমস্ত ভাষারই মৌলিক একক। তবে কোনও ভাষাতেই মানুষের পক্ষে উচ্চারণ যোগ্য সমস্ত স্বনিম কথায় ব্যবহার হয় না।

মানুষ যেটা পারে এবং করে তা হল, এক দিকে কথা থেকে ধ্বনিগুলিকে বিচ্ছিন্ন ও বিশ্লেষণ করতে, আলাদা করে চিহ্নিত করে নিতে, অপর দিকে সেইগুলিকে নানা ভাবে জুড়ে জুড়ে সাজিয়ে গুছিয়ে বিচিত্র শব্দ তৈরি করতে। এর ফলে কত যে শব্দ উৎপন্ন হতে পারে, তার সংখ্যার কোনও সীমা নেই বললেই চলে। স্কুলের উঁচু ক্লাসে যাঁরা গণিতের বিন্যাস (permutation) ও সমবায় (combination)–এর অঙ্ক শিখেছেন, তাঁরা জানেন— অঙ্কের ভাষায় এই ঊর্ধ্বসীমা সংখ্যাটা হল ২x — ১ (যেখানে x = আলোচ্য ভাষার স্বনিম সংখ্যা)। শব্দকে এইভাবে এককে বিশ্লেষণ করার এবং এককগুলিকে সংযুক্ত ও সংশ্লেষণ করতে পারার সামর্থ্যকে বলা হয় ধ্বনিবহ শব্দ (articulate sound) উৎপাদন। মানুষ ছাড়া এই ক্ষমতা অন্য কোনও প্রাণীর নেই।

মানুষের এই অনন্য বিশেষত্বের বাস্তব ভিত্তি বোঝা দরকার। জানা দরকার এই ক্ষমতার শারীরস্থানিক ভিত্তি এবং শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।

প্রথমত, মানুষের মস্তিষ্ক।

এই ব্যাপারে আমরা ইতিমধ্যেই খানিকটা সবিস্তারে আলোচনা করেছি। তাতে আমরা দেখেছি, মানবমস্তিষ্কের বাঁদিকের অর্ধাংশে (বাম অর্ধগোলার্ধে) সম্মুখকপাল পিণ্ডের সঞ্চালক অঞ্চলের একেবারে নিচের দিকে রয়েছে বাক-সঞ্চালন কেন্দ্র— যেটা ব্রোকা-র অঞ্চল (Broca’s Area) নামেও পরিচিত। একজন বিশিষ্ট ফরাসি শল্যবিদ পোল ব্রোকা (১৮২৪-৮০) ১৮৬১ সালে যুদ্ধে আহত ও নিহত সৈনিকদের আঘাত পরীক্ষা ও শল্যচিকিৎসা করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন, আহতদের মধ্যে যাদের মস্তিষ্কের এই অঞ্চলে গুলি বা বোমার টুকরো-জনিত আঘাত লেগে গুরুতর জখম হয়েছে, তাদের কথা বলার ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে গেছে। তার ভিত্তিতেই এই নামকরণ। এই ব্রোকার অঞ্চলের ভাঁজগুলির অনুরূপ গঠন (হ্যাবিলিস বাদে) হোমো গণের বাইরে অন্য কোনও প্রজাতির মস্তিষ্কের প্রাপ্ত খুলির ভেতরের দেওয়ালে দেখতে পাওয়া যায় না। বিবর্তনের গতিপথে ইরেকটাস প্রজাতি থেকে শুরু করে মানুষই একমাত্র এটা অর্জন করেছে। এই অঞ্চলটি থেকেই কথা বলার সঙ্গে জড়িত বাক্‌যন্ত্রের সমস্ত পেশির কাছে প্রয়োজনীয় সঞ্চালনের নির্দেশ যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মস্তিষ্কের আর একটি অঞ্চল। পার্শ্বকপাল পিণ্ডের উপর দিকে যেখানে শ্রবণ সংবেদন কেন্দ্র অবস্থিত তার ঠিক উপরে মধ্যকপাল পিণ্ডের দেহানুভূতি অঞ্চলের একটা সংলগ্ন এলাকা আছে, যা বিশেষায়িত হয়ে ধ্বনিবহ অর্থপূর্ণ শব্দের সংবেদন গ্রহণ ও সংশ্লেষণ করতে পারে। ব্রোকার কাজের দ্বারা উৎসাহিত হয়ে কথা বুঝতে অক্ষম এমন ধরনের অসুস্থ মানুষদের মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করতে করতে এই অংশটি আবিষ্কার করেছিলেন একজন জার্মান শল্য চিকিৎসক কার্ল হ্বার্নিক (১৮৪৮-১৯০৫), যে কারণে একে হ্বার্নিকের অঞ্চল (Wernicke’s Area) বলা হয়। ১৮৭৪ সালে তিনি তাঁর একটি বইতে প্রথম এই বিষয়ে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই অঞ্চলটিও মানুষ ছাড়া অন্য কোনও প্রজাতির মস্তিষ্কে বিকশিত হয়েছে বলে দেখা যায়নি।

দ্বিতীয়ত, মানুষের বাক্‌যন্ত্রের গঠন।

এক্ষেত্রে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, ফুসফুস, শ্বাসনালি, মুখ, নাক, জিহ্বা, ইত্যাদি যে সব দেহাঙ্গ কথা বলার যন্ত্রপাতি হিসাবে ব্যবহৃত হয়, শারীরতাত্ত্বিক দিক থেকে কোনওটারই ধ্বনিবহ শব্দ উৎপাদন করাটা প্রধান বা প্রাথমিক কাজ নয়। এর থেকে বোঝা যায়, বিবর্তনের ধারাতে হোমো গণভুক্ত মানুষের কোনও এক পূর্বতন প্রজাতির পর্যায় থেকে এই দেহাঙ্গগুলি কথা বলার অতিরিক্ত কাজ শুরু করেছিল। মানুষের এই বাক্‌যন্ত্রের গঠন একটু বুঝে নেওয়া যাক।

মানুষের মুখের নিচে গলার ভেতরে একটা অংশ আছে— কণ্ঠনালি— যেটা মুখের খাদ্য এবং নাকের বাতাসের চলাচলের সাধারণ পথ। এই জায়গা পার হয়ে খাবার খাদ্যনালি বেয়ে পাকস্থলীর দিকে যাবে, আর বাতাস শ্বাসনালি দিয়ে ফুসফুসে ঢুকবে। কণ্ঠনালির নীচের দিকে আছে একটা পেশিখণ্ড যাকে বলে উপজিহ্বা বা অধিজিহ্বা (epiglottis)। এটা খাড়া হয়ে থাকলে শ্বাসনালি ও খাদ্যনালি— উভয়েরই মুখ খোলা থাকে। কিন্তু খাওয়ার সময়, খাদ্যবস্তু মুখ থেকে নিচে থামার সময়, এটা প্রসারিত হয়ে শ্বাসনালির পথ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে খাদ্যকণা শ্বাসনালিতে ঢুকে যায় না। যদি কখনও খাদ্য চলাচলের সময় উপজিহ্বা খাড়া থেকে যায় বা নিচে নামতে দেরি করে ফেলে তখনই আমাদের বিষম লাগে। এটা প্রশ্বাসের সময় ঘটলে খাদ্যকণা শ্বাসনালিতে ঢুকে যায়। তখন কাশির সাহায্যে, অর্থাৎ, ফুসফুস এক সঙ্গে অনেকটা হাওয়ার ঝাঁকুনি দিয়ে তা বের করে দেয়। আর যদি নিশ্বাসের সময় খাদ্য নিচে নামতে থাকে, তখন তা একটু উঠে গিয়ে নাসাপথের নিচে আটকে থাকে। সেখানকার পেশিগুলি তখন নানারকম কায়দাকানুন করে ঠেলেঠুলে খাদ্যকণাটিকে আবার কণ্ঠনালির মুখে নামিয়ে দেয়।

এত সব ঝামেলা হয় না, যদি আমরা গুরুজনদের আদেশ মেনে চলা অভ্যাস করি: “খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই, গান গাইতে নেই, বইও পড়তে নেই।”

মানুষের শ্বসনব্যবস্থা এমন যে সে নাক এবং মুখ উভয়ের সাহায্যেই শ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে পারে। বায়ু চলাচলের এই অবাধ ব্যবস্থা আওয়াজ সৃষ্টির সহায়ক হয়। আর মানুষের ক্ষেত্রে এই বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেই কথা বলার শব্দগুলি উৎপাদন করতে হয়। এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাটি খুব সুন্দর।

আমাদের গলার মাঝামাঝি একটা ফোলা অংশ আছে। অনেকেরই বাইরে থেকে সেটা বেশ পরিষ্কার দেখা যায়। কেননা, শ্বাসনালিও ওই বরাবর খানিকটা স্ফীত। এখানেই আছে মানুষের স্বরযন্ত্র (larynx)। কথা বলতে পারার বন্দোবস্ত। আসলে এখানে সামনের দিকে সংযুক্ত এবং পেছনের দিকে বিচ্ছিন্ন দুটো অনুভূমিক তরুণাস্থি রয়েছে। এদের ভালো নাম অ্যারিটেনয়েড তরুণাস্থি (arytenoid cartilege)। এরা হচ্ছে গলা থেকে শব্দ উৎপাদনের আসল চাবিকাঠি। এদের বলা হয় স্বরতন্ত্রী (vocal cords)। পেছন দিকে পরস্পর থেকে বিভিন্ন মাত্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন মাপের ফাঁক বানিয়ে এরা শ্বাসনালির সামনে নানা আকারের ত্রিকোণ খাঁজ তৈরি করে দেয়। ফুসফুস থেকে নির্গত বায়ু এদের কাছে নানাভাবে বাধা পেয়ে নানারকম কম্পন বিশিষ্ট শব্দতরঙ্গ হয়ে বেরিয়ে আসে। উপরে এই পুরো ব্যবস্থাটার গঠনের একটা নকশা দেখানো হল (চিত্র – ১৩)।

মানুষের মুখবিবর থেকেই প্রধানত একক ধ্বনিগুলি উৎপন্ন হয়। অন্যান্য স্তন্যপায়ী তো বটেই, এমনকি বনমানুষদেরও দাঁতগুলি বড় বড়, মাড়ি ফোলা ফোলা এবং দাঁতের বিন্যাস অনেকটা অশ্বক্ষুরাকৃতিবিশিষ্ট বা ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের মতো। উপরের ঠোঁট উপরের সারির দাঁতের মাড়ির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সন্নিবদ্ধ। সেই সঙ্গে সামনের দিকের দুই জোড়া উঁচু শ্বদন্ত বা কুকুর-দাঁত থাকার ফলে মুখ-বন্ধ অবস্থায় এদের মুখের মধ্যে জিহ্বার নড়াচড়া করার বিশেষ জায়গা থাকে না। ঠোঁটও মুখের শব্দ উৎপাদনে কোনও অংশ নিতে পারে না। জিহ্বাকে নাড়াতে গেলে এদের মুখ খুলে হা করে থাকতে হয়। পক্ষান্তরে, মানুষের ক্ষেত্রে দাঁতগুলি ছোট ছোট, মাড়িও দাঁতের প্রায় সমান আকার প্রাপ্ত। দাঁতের বিন্যাস অনেকটা অধিবৃত্তাকার (paraboloid) এবং উপর ও নিচের ঠোঁট মাড়ি থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। এর দরুণ মুখ বন্ধ থাকলেও জিহ্বা মুখের ভেতরে বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করার এবং ঘুরবার জন্য অনেকখানি জায়গা পেয়ে যায় (চিত্র – ১৪ দ্রষ্টব্য)। ঠোঁটজোড়া এবং উপরের পাটির দাঁতও শব্দ উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া মুখের উপরে ছাদের বিভিন্ন অংশ, যথা, মূর্ধা ও তালু এবং তার সঙ্গে নাকও শব্দ উৎপাদনে কিছুটা দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু ধ্বনি বা স্বনিম উৎপাদনে জিহ্বার ভূমিকাই প্রধান। সুদূর অতীতকাল থেকেই মানুষ এটা ধরতে পেরেছিল। তাই বহু ভাষাতেই জিহ্বা এবং ভাষা বা কথা একই বা সমমূল শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ইংরেজিতে tongue শব্দের দুটো অর্থই বর্তমান। বাংলায় আমরা যখন বলি, কাবলুর জিভ খুব আলগা, কিংবা সমস্ত উত্তর যেন রাকার জিভের ডগায়— তখন এই অর্থব্যঞ্জনাই মূর্ত হয়ে ওঠে।

এখানে বলে রাখি, বাক্‌যন্ত্রের সমস্ত অঙ্গগুলিই ছোট ছোট পেশির টুকরো দিয়ে তৈরি এবং প্রতিটি টুকরোই বিশেষ বিশেষ স্নায়ুতন্তুর মাধ্যমে গুরুমস্তিষ্কের ব্রোকার অঞ্চল এবং হ্বার্নিকের অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত। আরও একটা কথা। মানুষের মুখমণ্ডলের হাড়গুলি ফাঁপা ফাঁপা, বায়ুপূর্ণ। এগুলিকে বলে সাইনাস। এই সাইনাসগুলি শব্দ উৎপাদনের সময় অনুনাদক (resonator)-এর কাজ করে।

এইবার স্বর উৎপাদনের প্রক্রিয়াটা বোঝার চেষ্টা করা যাক।

পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুসরণ করে।

আমরা জানি, যে কোনও সরু নলের এক প্রান্তে জোরে ফুঁ দিলে বাতাসের কম্পনের জন্য শব্দ উৎপন্ন হয়। শব্দ উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে হলে স্পন্দন এবং শব্দকম্পাঙ্ক ও তরঙ্গবিস্তার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। মানুষের ক্ষেত্রে চাপ দিয়ে জোরে বাতাস বের করার কাজ করে ফুসফুস পাকস্থলী এবং বুক ও পেটের মাঝখানে থাকা একটা পাতলা আবরণী, যার নাম মধ্যচ্ছদা (diaphragm)। এছাড়া শ্বসনের সঙ্গে যুক্ত ট্র্যাকিয়া বা ব্রঙ্কিয়ার পেশিগুলিও এতে অংশগ্রহণ করে। স্বরযন্ত্র হচ্ছে শব্দ উৎপাদন করার জন্য স্পন্দন সৃষ্টিকারী ব্যবস্থা। আর নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক ও বিস্তারযুক্ত বিভিন্ন শব্দ উৎপাদন করার কাজগুলি করে মুখ এবং নাকের পেশিগুলি।

এখন, কণ্ঠনালি থেকে ঠোঁট ও নাক পর্যন্ত ধরলে আমরা ইংরেজি ‘এফ’ অক্ষরের মতো একটি বাঁকানো তিনমুখো নল পাব, যার দুটো মুখ খোলা, একটা মুখ বন্ধ। এই নলের মধ্য দিয়ে হাওয়া একটু জোরে ঢুকলে বা বেরোলেই কোনও না কোনওরকম শব্দ হবে। যেমন, ঘুমন্ত মানুষের নাক ডাকার শব্দ। মানুষ এই নলটাকে নানাভাবে ব্যবহার করে এবং হাওয়ার পরিমাণ, নির্গমন বেগ, নির্গমন পথ (মুখ এবং/অথবা নাক) ও বায়ুস্তম্ভের কম্পন ও দৈর্ঘ্য ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে ইচ্ছামতো ধ্বনি সৃষ্টি করতে পারতে পারে। লিনেবার্গ হিসাব করে দেখিয়েছেন যে এইভাবে প্রায় একশটি টুকরো পেশির সাহায্য নিয়ে মানুষ মুখ ও নাকের অন্তত চোদ্দ রকম অন্তর্ভঙ্গি পর পর তৈরি করতে পারে, অর্থাৎ, চোদ্দটি ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারে।[1]

পদার্থবিজ্ঞানের শব্দসংক্রান্ত জ্ঞান থেকে একটা বিষয় সহজেই বুঝে নেওয়া যায় যে এই তিনমুখো নলটির নির্গমন পথ যদি নাক বা মুখের কাছে কোথাও বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে এটা একটা বদ্ধ নলের মতো কাজ করবে। না হলে এর কাজ হবে অনেকটা খোলা নলের মতো।

যখন আমরা মুখ সম্পূর্ণ খুলে আওয়াজ বের করি, তখন যে ধ্বনিগুলো উৎপন্ন হয়, তা আসলে স্বরবর্ণের ধ্বনি: ‘অ’, ‘আ’, ‘ই’, ইত্যাদি। মুখ খোলা রেখে ঠোঁট ও অন্যান্য পেশিগুলির সঙ্কোচন প্রসারণ করে নলের আকৃতি, অর্থাৎ, নির্গত বায়ুস্তম্ভের চেহারা পালটে পালটে বিভিন্ন স্বরধ্বনি উচ্চারণ করা হয়। যেমন, ‘আ’ উচ্চারণ করার সময় জিহ্বা নীচের মাড়ির কাছে প্রসারিত অবস্থায় থাকে, কিন্তু ‘ই’ বলবার সময় উপরে উঠে একটু সঙ্কুচিত হয়ে যায়। ‘অ্যা’ এবং ‘এ’ বলবার জন্য জিহ্বাকে এর মাঝামাঝি অবস্থানে যেতে হয়। আবার ‘অ’ ‘ও’ এবং ‘উ’ বলার জন্য ঠোঁটজোড়া মুখের ফোকরকে ক্রমান্বয়ে বড় থেকে ছোট করে দেয়।

অন্যদিকে মুখ কোথাও না কোথাও বন্ধ করে বায়ুস্তম্ভ বিভিন্ন জায়গায় আটকে এবং তার আকৃতিতে রকমফের ঘটিয়ে বিভিন্ন ব্যঞ্জনধ্বনি উৎপাদন করা হয়। সংস্কৃত ভাষায়— এবং তার অনুসরণে বাংলা ভাষাতেও— যে সমস্ত ব্যঞ্জনধ্বনি আছে সেগুলো আসলে মুখের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় জিহ্বা ঠেকিয়ে বায়ুস্তম্ভের দৈর্ঘ্য নিয়ন্ত্রণ ও কম্পাঙ্ক পরিবর্তন করে উচ্চারিত হয় (চিত্র – ১৫)। কিছু কিছু অক্ষর উচ্চারণের সময় বাতাসের বেশিরভাগ অংশ নাকের মধ্যে দিয়ে নির্গত হয়। সেগুলিকেই আমরা বলি নাসিক্য ধ্বনি বা অনুনাসিক বর্ণ। বিভিন্ন ভাষাতে স্বর ও ব্যঞ্জনধ্বনির সংখ্যা ও বিন্যাস বিভিন্ন। কিন্তু একইরকম ধ্বনি একই শারীরতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াতেই নিষ্পন্ন হয়। বাংলায় ‘দে’ এবং ইংরেজিতে ‘they’ বললে দুটো আলাদা শব্দ বোঝায়, যাদের অর্থও একেবারেই আলাদা। কিন্তু ধ্বনিগত সাযুজ্যের কারণে এদের উচ্চারণের শারীরিক কসরত একই। বাংলায় ‘লাল’ (রং) এবং উর্দুতে ‘লাল’ (পুত্রসন্তান) সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভিন্নার্থক শব্দ। তথাপি উভয়ের ক্ষেত্রে উচ্চারণে শারীরতাত্ত্বিক ঘটনাটি হবে হুবহু একইরকম।

এখানে এসে মানুষের কান এবং শ্রবণ সম্পর্কে আগে যা বলেছি তার সঙ্গে একটা সংযোজন দেওয়া দরকার। আমরা মানুষের দর্শন ও শ্রবণ সংবেদনক্ষমতা প্রসঙ্গে আলোচনার সময় দেখিয়েছিলাম যে দর্শনের প্রত্যক্ষণ পরিধি অনেক বেশি। কিন্তু আবার এটাও জানা দরকার যে দর্শনের তুলনায় মানুষের শ্রবণতন্ত্র অনেক বেশি বিশ্লেষণধর্মী। শ্রবণযোগ্য শব্দের স্পন্দনমাত্রার তারতম্য বা বৈচিত্র্য মানুষ যত সহজে উপলব্ধি করতে পারে, আলোর স্পন্দনমাত্রার পার্থক্য ও বৈচিত্র্য সে ততটা প্রকটভাবে চোখ দিয়ে ধরতে পারে না। অনেকটা এই কারণেই মানুষের সঙ্গীতের সুর তাল লয় ছন্দ আস্বাদনের ক্ষমতা চিত্র ও ভাস্কর্যের সৌন্দর্য উপলব্ধির তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপকতর ও গভীরতর। আবার রেডিওতে শ্রুতি নাটক শুনে কুশীলবদের চলাফেরা আন্দাজ করা যায়। অথচ মঞ্চে একটা মৌন নাটক বা মাইম দেখে পাত্রপাত্রীর সংলাপ তেমন সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব হয় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে দৃষ্টিহীনতার তুলনায় বাক্‌-শ্রবণহীনতা মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় অনেক বেশি পরিমাণে প্রতিবন্ধ সৃষ্টি করে থাকে।

 

(আবার আগামী সংখ্যায়)


[1] Lenneberg 1967, ?X?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...