তিনটি অণুগল্প

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ

 

সুপারহিরো

–বেতাল কী বলল রে?
–তার কোমরে নাকি ফিক ব্যথাটা চেগে উঠেছে, ডাক্তার কমপ্লিট বেডরেস্ট বলেছে।
–আবার? এই বুড়ো বয়সে কাজটা ছেলের হাতে ছাড়ছে না কেন কে জানে। বুদ্ধিশুদ্ধি সব হাঁটুতে এদের। ম্যানড্রেক?
–কোথায় সে? সে পুরো ট্রুপ নিয়ে ইউরোপ টুরে গেছে। ম্যাজিক শো আছে তার নাকি গোটা ইউরোপে। তার সেক্রেটারি বললে।
–বাহ্। এই না হলে হিরো অব দ্য নেশন! এই সময়েই তাকে যেতে হল? অবশ্য বিদেশি তো, ওদের আর আমাদের বাংলার প্রতি কী টান থাকবে! আশা করাও ভুল। বাহাদুর কী বললে?
–সে আবার বাংলা বোঝে না। অনেক কষ্টে তাকে বললুম। সে পাত্তাই দিলে না। বললে, ওসব জায়গার কালচার আমি বুঝি না। কিছু না বুঝে মাথা গলিয়ে লাভ নেই।
–ওসব জায়গা মানে? বাংলা কি দেশের বাইরে নাকি? এরা এখনও আমাদের চিনবে না?
–কী বলি বলো বাবা।
–বেশ। সত্যিই কিছু বলার নেই। ওদিকে গেলি যখন, চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করলি?
–কে চৌধুরী?
–অরে চাচা চৌধুরী।
–ওহ। পুরোটা বলবে তো।
–আরে সে কি আমার চাচা নাকি যে তাকে আমি চাচা চৌধুরী বলব? বুদ্ধিশুদ্ধি তোর হবে না। গিয়েছিলিস কি? সেইটে বল।
–যাইনি আবার? গেলুম তো।
–তো কী বললে?
–বললে, দেখো বাবা, যারা একটা মন্দিরের সামনে হাড় ফেলা নিয়ে তুলকালাম করে দাঙ্গা লাগিয়ে ফেলতে পারে, তাতে বারোজন মরে যেতে পারে, তারা সত্যি বুদ্ধিহীন প্রাণী।
–মানে, ওঁর কম্পিউটারের থেকেও প্রখর দিমাগ এখানে উনি লাগাবেন না, তাই তো?
–ঠারেঠোরে তো তাই বললেন। সাবুও দেখলুম ঘাড় নাড়লে।
–এদের দিয়ে সত্যি হবে না। ভাবছি বিকেলে ফেলুর কাছে যাব একবার।
–ফোন করেছিলুম।
–আমাকে না বলে ফোন করে ফেললি? কদ্দিন কথা হয়নি। সে যা ব্যস্ত।
–কী নিয়ে ব্যস্ত সেটা শুধু জানি না। আমাকে বললে, দেখো, এখানে মগজের কাজ কই। এ তো বুনো ষাঁড়ের লড়াই। এখানে আমি নিরুপায়। একটা দুটো খুন হলে, সোনাদানা ইনভল্ভড থাকলে আমি কিছু করতে পারতাম।
–এই বললে ফেলু! হ্যাঁ রে, তাহলে আর বাকি কে রইল? আমার তো মাথায় কিছু কাজ করছে না।
–করছে না?
–না। তুই বল। তোর মাথায় কেউ আছে নাকি?
–আছে তো। তুমি আছ। আমি আছি।

 

অভিমান

উঠে দাঁড়ায় সে। ঘুরে দাঁড়ায়। আমার দিকে পিছন করে, ডুবন্ত সূর্যের দিকে মুখ করে।

আমার দিকে না তাকিয়ে, প্রচণ্ড আয়াসে গলা না ধরিয়ে, জিজ্ঞাসা করে, সবাইকে ডাকলে, আমাকে ডাকলে না কেন?

তার আগে সে বসেছিল বেঞ্চে আমার ডানদিকে।

আমি পিছন থেকে তার বামহাত ধরি।

বলি, ভালবাসি তাই।

–ভালবাসো তবু ডাকলে না?
–ভালবাসি তাই ডাকলুম না।

এবারে সে ঘুরে তাকায়।

এবারে প্রশ্ন তার চোখে।

বলি, যদি আমি ডাকতুম, আর তুমি, কোনও এক কারণে, না আসতে, তাহলে তোমার ওপর আমার বিশ্বাস আহত হত। আমি যাকে এত ভালবাসি, যে আমাকে এত ভালবাসে, সে আমার ডাকে এল না, ভাবার আগেই অবিরাম রক্তক্ষরণ হত।

এবারে সে ঘুরে দাঁড়ায়। মুখোমুখি।

এবারে আর্জি তার চোখে। বুঝিয়ে দেওয়ার, বিস্তারে।

বলি, এই যে ডাকিনি, যখন একা বসে ভাবব, হৃদয় আমাকে দোষ দেবে। বলবে, কেন ডাকলি না? হৃদয় আশা দেবে। ডাকলেই তো সে আসত। তোর ডাকের অপেক্ষায়, প্রত্যাশায় ছিল সে।

আর,

যদি ডাকতুম, আর তুমি না আসতে, তাহলে হৃদয় তোমাকে দোষ দিত। আর তোমাকে দোষ দেওয়ার গ্লানিতে সে ধীরে ধীরে নিজেই মৃতবৎ হয়ে যেত। ফারসিতে তাকে বলে, অফ্‌সুরদহ্।

সে হেসে ফেলে। গালে হাত রেখে বলে, উফফ, তুমি আর তোমার ভাষাজ্ঞানের শোও-অফ।

 

প্রত্যর্পণ

সেই গ্রামে তারপর একজন সন্ন্যাসী এল। তার লম্বা দাড়ি, তার জট পড়া চুল, গায়ের পরিধানের রং বোঝা যায় না আর। হিন্দুরা সন্নেসি ঠাকুর আর মুসলমানরা পীরবাবা বলে পায়ে যেয়ে হত্যে দিল। তিনি শুধু হাসলেন।

তারপর আস্তে আস্তে অনেক কথা ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলে তিনি হিমালয় থেকে এসেছেন পাঁচশো বছর পর ধ্যান ভেঙে, কেউ বলে তিনি মক্কা থেকে এসেছেন পদব্রজে। আস্তিকেরা বললে, তিনি ঈশ্বরের অবতার, দেবতা কোনও, নাস্তিকেরা বললে, বিজ্ঞানীশ্রেষ্ঠ বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছেন পার্থিব দুনিয়ার উপর।

তিনি নাকচ করেন না কিছুই, তিনি মেনেও নেন না কিছুই। শুধু চেয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে দাড়ির অনেক গভীরে একটা হাসির রেখা ফুটে ওঠে। দু-চারটে নিন্দুক বলে, ওটা তাচ্ছিল্যের হাসি।

সেবার সে গ্রামে বৃষ্টি হল প্রচুর। ফসল উপচে পড়ল। হিন্দুরা বাবার পুজো দিয়ে গেল, মুসলমানেরা উরস পালন করল। সেবা শুরু হল বাবার। বাবা সে সেবা নেন না, ফিরিয়েও দেন না।

তারপর, একদিন তারা দেখল, যেমন বিনা ঘোষণায় বাবা এসেছিলেন, তেমনিভাবে বাবা চলে যাচ্ছেন। উঠে দাঁড়িয়েছেন।

তারা অনেক কাঁদল। বাবা নির্বিকার। সেই প্রথম তাঁর মুখে কোন আওয়াজ শোনা গেল যদিও। বললেন তিনি, আজ চেয়ে নাও একটা কিছু, তোমাদের সবার জন্য। যে কোনও একটা কষ্ট আমি লাঘব করে দেব। বা চেষ্টা করব।

গ্রামের পাকামাথা বুড়োরা আলোচনায় বসলে। কী চাইবে তারা? ধনসম্পত্তি তাদের উপচে পড়ছে। হঠাৎ চাইতে বসে তাদের মাথায় অনেকগুলো চাহিদা এল, কিন্তু কোনওটাই চেয়ে নেওয়ার মতো মনে হল না।

শেষে, অতিবৃদ্ধ যে প্রথম দেখেছিল বাবাকে সে গ্রামে, সে এগিয়ে এল, নত হল বাবার সামনে, বললে, বাবা, আমাদের সব আছে। তুমি আমাদের হৃদয় দাও।

বাবার উত্তর হারিয়ে গেছে আজ। জনশ্রুতিও একাধিক।

নাস্তিকে বলে, বাবা বললেন, প্রস্থেটিক হার্ট আজও বানাতে শিখিনি আমরা, সে শিখবও না কোনওদিন।

আস্তিকে বলে, বাবা বললেন, বুকের দিকে তাকাতে গেলে মাথা ঝোঁকাতে হয়।

তারপর নাকি তাঁকে সেই গ্রামে আর কেউ দেখেনি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...