আত্রেয়ী চক্রবর্তী

পাঁচটি কবিতা

 

উদ্ধতস্বভাব, তোমায়

তোমার সঙ্গে দেখা হবে না জেনেও
রমণী হাঁটে ধীর
গা-গড়ানো কামজল, রাঙাঠোঁট

ভাঙা পিচ পেরিয়ে যায়
মাঝঝিম দুপুরের বাস, ভাতের হোটেল
আর যা যা-কিছু ফেলে আসা
গতরাতের কান্না; শোক

বন্ধুরা ভাবে পরদেশি কেউ
হা-হা লেখ্য, এর ওর গায়ে ঠেলা দেয়
ঊন-ঊন বাক্যে বিষিয়ে দেয় করমচা-হৃদয়

রমণী হাঁটে ধীর—
জেনেছে, এই ভাগ্য লুকিয়ে রাখা কবিতায়
থাকবে সে, ও-সন্তান
জানে, গুপ্তযুগ শকাব্দ অন্তে
তুমি একমুঠো মা-ডাক রেখে দেবে
বুনোঘ্রাণ, জায়া শব্দের পাশে…

 

গার্হস্থ্যকথা

নিভৃতে সংসার পেতেছি দুজন
এমন ভিটেমাটি হারা দুটি দেশ, স্বজনভাগ,
ফরাকতনামা

দিনান্তে তুমি এক-একটা গরাস তুলে দাও মুখে
নাচন ডেকে আনো জিভের ছোবলে
আমি হিসেব রাখি চার ছটাক চাল,
ছিন্ন কবিতাজন্মের

বেপাড়ার যুবক, আমাদের ফেলে আসা গ্রামে
রয়ে গেছে খুচরো পাহাড়, ঘাই ওঠা রাত,
পদ্মার গোঙানি—
ঠিক যেন তোমার পিতৃজন্মসুখ!

আমরা কাঁটাতার পেরিয়েছি, পেরিয়েছি জলোধি-পয়ঃ,  দ্রুম ও মহাকাশ
পালাতে পালাতে তুমি জন্ম দিয়েছ নীল পদ্মের,
নাভিদেশে রোপন করেছ চারাগাছ

ও কত্তা, ও দেশ, আমিও অকম্প ঘরনী তোমার
ধৈর্য্যের পাঠ শিখছি একান্তে।
ভাঙা সে ইস্কুলবাড়িটি জুড়ে বয় কপোতাক্ষ,
যশোর ও ভদ্রা—

ভেসে যায় আমাদের না-হওয়া সন্তান…

 

মোরে বারে বারে ফিরালে

অভিসার শিখছি নিপুণ, অভিসার শিখছি তার-সপ্তকে। তার-সপ্তকে ‘পা’ কাঁটায় এসে লাগলে, ভিতরজলে ছলাৎ শব্দ হয়।

জল গড়িয়ে আসে ঘরে, লাল রঙের মেঝেখানি ভিজে যায়। তুমি মুছতে চাইলে, আমি আটকাই, এটুকুই সঞ্চয়…

রাত পিছলে ভোরের দিকে আরোহণের প্রস্তুতি চলে। কয়েকটি শুদ্ধ স্বর কোমলে আঘাত করছে, লক্ষ্যভেদে। আঙুল, নখ, পায়ের গোড়ালি বেয়ে উঠে আসছে চিরস্রোত ও সাপ। তুমি খোঁপা ভেঙে দাও, আমি ঊরুপ্রদেশে ঘুঁটি সাজাই। ঘুঁটি ছড়িয়ে পড়ে, সামন্ততন্ত্রও! এতক্ষণে শুক-সারিকথা সম্পন্ন হয়। পরিশ্রম মোছো। ধুয়ে দাও আমাকেও। নিজস্নান। আমি চুল মেলে দিই তোমার গদ্যের পাতায়।

তুমি, তোমার অন্তরকথা স্থির। এত ছুরি, এত জমিয়েছ সেসব! হত্যা শেষে আর কীই বা থাকে বলো, লেহন? ভোরমাঘে বাসায় ফিরব, জঙ্গল পেরিয়ে। তোমার আঙুল এসে থেমেছে চেরাপ্রান্তে। এই, তবে এই থাক, আমাদের এ সংসারসুখ। তুমি ছুঁয়ে দাও, ভুল। ঠিক করবে কে? ভাঙা আয়নায় তাকিয়ে আছ অনিমেষ। ধোয়ামাজা উঠোন, পাটভাঙা সিঁড়ি ভেসে যাচ্ছে সুখে, অভিমানে। সারা ঘর জুড়ে ছড়িয়ে আছেন গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়…

 

প্রেম, বিদায় ডাকি?

মৃত্যু—
এ অমোঘ শব্দে আমি বৃক্ষ রচনা করি
বৃক্ষশাখ, তুমি জরায়ু আমার
শুষে নিচ্ছ সমস্ত বর্ষা, বেহাগসুর

মেঘমাস যেন সন্ধ্যাতারা, ফুটে থাকে
অচেনা বাড়ির ছাদ ঘেঁষে!
সে বাড়ি আমার ভবিতব্যে নেই,
নেই সে বাড়ির উদ্ধত যুবক
শুধু মৃত্যু জেগেছে দ্বিতীয়বার…

মৃত্যুটি বুকে নিয়ে হাঁটি
পুনরায় অভ্যেস করি, “ভাল আছ? শরীর, মন?”
রেওয়াজ নেই বহুকাল!
তাকে চাইব না আজন্ম নীড়—
এ মিথ্যে হেঁটে চলে আমারই পথে
মিথ্যের জ্বর হয়, আমি তার কপালে দিই
জলপট্টির শীতরেখা, স্নায়ু

ওগো সম্পর্ক, আয়ুস্পৃহা দাও
ফেলে আসা বাড়িটির সুগন্ধ ও ঠিকানা
ওগো যন্ত্রণাশব, তোমাকে দাফন করি তবে,
করি মৃত্যু পরিহার।

ফিরতি পথ ধরি প্রেয়সীজন্মে,
উঁকি দিয়ে যাই
যে বাড়িটির উঠোনে খেলা করে
বসন্ত ফিঙেনাচ, ভাওয়াইয়া গান…

 

রাস পূর্ণিমা

নামের পাশে নাম রাখব না ভেবে, সমীপ্য মুছি; পরিশ্রুত মদ, শুচি ভব-শুচি ভব। শ্লেটকাল যায়, চকখড়ির দিন, ফেলে আসা সেলাই বুনোন ফোঁড়, প্রেমিকা চিহ্ননাম, গতজন্মশ্লোক। আমি তাকিয়ে রই আড়চোখে। আজকাল, পুরনো ইটের গায়ে ঈর্ষা জাগে খুব। জেগে ওঠে জাহাজের ভোঁ, দৈনন্দিন অটোরুট, মদমুখ হল্লা, ঈষৎ ছোপানো লাল শাড়ি। এমন অসুখদিনে, দূরে কিছু হিম-চাঁদ ওঠে, রাংতার চাঁদ। তার কোটরে ভাঙে শিষ, গহীনে অপাপ লাগা জাগে। শোনো গো মধু-শালবন, নিরীহ ছাদের কিনার, গোখরোযোনিজাত, আনতমুখ যে যুবা দাঁড়িয়ে আছে এ সন্ধ্যায়, তাকে আমি ভালবাসি।

‘ভালবাসি’— অথচ ভালবাসা, তোমায় মুখে আনতে নেই! চিবুক ছুঁয়ে বলি, দক্ষিণহাত রাখো, পাণিগ্রহণ; এই নাও রজনীসুবাস। মনে মনে আঁক কাটি, শিয়রের চাঁদ, এমন ঝুরোনরাতে গ্রহণ দিও না আর। পৃথিবীর সমস্ত কথা রাখো তুমি, জড়ো হওয়া, প্রেমশ্যাম। যুবাটির গায়ে দাও হলুদচন্দনজল, কীর্তনরেণু—

কিছুটা আমাকেও…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4063 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...