শিলাখণ্ডের বিভূতি

অভীক রায়

 

“ছাদের আলসের চৌরস একখানা টালি হয়ে অনড় অবস্থায় সুখে— স্বচ্ছন্দে থাকার চেয়ে স্ফটিক পাথর হয়ে ভেঙে যাওয়া অনেক ভাল, অনেক ভাল, অনেক ভাল।”

এই অমর বাক্য আর সেই অমর চরিত্রের স্রষ্টাকে তাঁর আবাসস্থলে প্রণাম জানিয়ে শুরু করলাম আমাদের সফর।

এই দুটি লাইন পড়েই সবাই বুঝবেন কার এবং কোন জায়গার কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। বিভূতিভূষণের ঘাটশিলা। আপামর বাঙালিরও।

আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ সেই বহুশ্রুত নদীটির সঙ্গে। হঠাৎ লালমোহন গাঙ্গুলির কথা মনে পড়ল। এখানে এলে তিনি নিশ্চয়ই বলতেন—

“ওয়ি সুবর্ণরেখা—
শিলাবতী অঙ্গে
ঘাটে-শিলা সঙ্গে
স্বর্ণ কণিকা তোমার বক্ষে
আর কেন যায় না দেখা।”

ঘাটশিলার শিলাবতী— সুবর্ণরেখা

যাইহোক, এবার প্রসঙ্গে আসা যাক। ঘাটশিলা ও টাটানগরের আশেপাশের পাহাড়ের সারি, নদী, জঙ্গল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছোটনাগপুর মালভূমির এই এলাকাটিকে বহুদিন ধরেই ছোট্ট অবকাশ যাপনের এক আদর্শ পর্যটনস্থল রূপে প্রতিভাত করেছে। স্টেশন থেকে দৃশ্যমান দূরের আবছা পাহাড়ের হাতছানি, নদীর বুকে উত্থিত শিলাখণ্ড জানান দেয় যে ভ্রমণতৃষ্ণার নিরসন আসন্ন।

এ সফরের মূল আকর্ষণ বুরুডি লেক, ধারাগিরি জলপ্রপাত, দুয়ারসিনি-সাতগুরুং নদী। এগুলি সবই শহরের বাইরে দলমা রেঞ্জের উপর। আর আছে জাদুগোরা-মোসাবনি হিল রেঞ্জে জাদুগোরায় রঙ্কিণী মন্দির, রঙ্কিণী যাওয়ার পথে ১৩ কিমি দূরে সিদ্ধেশ্বর পাহাড়। গালুডিতে সুবর্ণরেখায় ড্যাম। শহরের মধ্যে দেখার জায়গা হল, বিভূতিভূষণের বাড়ি, চিত্রকোট পাহাড়, সুবর্ণরেখার দুটো ঘাট— একটা রাতমোহনা, আর একটা নবগঠিত সূর্যমন্দির লাগোয়া, ফুলডুংরি পাহাড় ইত্যাদি। একটা গাড়ি বা অটো ভাড়া করে দুদিনে এগুলো দেখে নেওয়া যায়। এর সঙ্গে আরও একদিন লাগবে যদি টাটানগরের কাছে ডিমনা লেক, দলমা পাহাড়, চান্ডিল ড্যাম আর জুবিলি পার্ক দেখতে হয়। চাইলে পশ্চিমবঙ্গের কাঁকড়াঝোড়, বেলপাহাড়ির জঙ্গলমহলও ঘুরে আসা যেতে পারে। ঘুরতে যাওয়ার ভাল সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। কিন্তু অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের প্রথম সবচেয়ে ভাল। এই সময় শীত পড়তে শুরু করে। বর্ষাধোয়া প্রকৃতি, মেঘমুক্ত আকাশ, আর স্বচ্ছ জলে ভরা উচ্ছ্বল ঝর্ণা ও স্নিগ্ধ স্রোতের নদী পর্যটকদের অকুণ্ঠ স্বাগত জানায়।

আমাদের ভ্রমণ শুরু হল নবগঠিত সূর্যমন্দির লাগোয়া সুবর্ণরেখার দ্বিতীয় ঘাটে। এখানে পাষাণখচিত সুবর্ণরেখা যেন সত্যিই ঘাটশিলার শিলাবতী। ভরাট না হলেও হেমন্তে এই স্বচ্ছতোয়ার গম্ভীর চলন বেশ মনমোহিনী।

সুবর্ণরেখার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে আমরা এগিয়ে চললাম বুরুডি লেক ও ধারাগিরির উদ্দেশ্যে। টিলায় ঘেরা বুরুডি লেকের রঙিন পটভূমি আর ধারাগিরির রহস্যঘন যাত্রাপথ বেশ রোমাঞ্চকর। ঘাটশিলা শহর ছেড়ে বেরিয়ে দলমা রেঞ্জের পাদদেশে আসতে অনেক ধানক্ষেত, জঙ্গল আর জঙ্গলের মাঝে ছোট ছোট গ্রাম পেরোতে হল। নিকানো উঠোন, টালি বা খড়ের চাল, রঙিন দেওয়াল— গ্রামগুলি যেন হাতে আঁকা ছবি। তার সঙ্গে সবুজ পাহাড়ের পটভূমি, ও নীল আকাশ মনের সজীবতা বাড়িয়ে দিল কয়েকগুণ। আমাদের বাহন মধ্যাহ্নবিরতি ঘোষণা করল বুরুডি লেকের ধারে। ভোজন সাঙ্গ হল ডিম-ভাত সহযোগে। ড্রাইভারদাদার সবিনয় নিবেদন, “আপনারা যতক্ষণ খুশি ঘুরুন, কোনও ব্যাপার না।” কথা হল ধারাগিরি দেখে এসে আমরা বুরুডি দেখব। তাই বুরুডিতে একটু উঁকি দিয়ে চললাম ধারাগিরির পথে।

পাহাড়ের গা বেয়ে, একের পর এক বাঁক পেরিয়ে, সবুজ পাহাড়ের ঢেউ সঙ্গে করে এগোনো গেল ধারাগিরির দিকে। বুরুডি পর্যন্ত রাস্তা পাহাড়ের পাদদেশ অঞ্চলে। পাহাড়ি রাস্তা শুরু এর পর। সর্পিল পাকদণ্ডি, সঙ্গে গিরিখাত আর ঘন অরণ্য— আদি অকৃত্রিম প্রকৃতি। ধারাগিরির কাছে রাস্তা খুবই সরু আর ভাঙাচোরা। দুটো গাড়ি পাশাপাশি যেতে পারে না। গাড়ির পথ শেষে আরও প্রায় ৫০০ মিটার পায়ে হাঁটা পথ। স্থানীয় কিছু মহিলা সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে গাড়ি পার্কিং থেকে ঝর্ণা পর্যন্ত গাইড হিসেবে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।

কোনও গুহায় প্রবেশ করতে গেলে যেমন আলো থেকে অন্ধকারে যেতে হয়, ধারাগিরি পর্যন্ত পায়ে চলা পথেও ঠিক তেমনটাই মনে হতে লাগল। ঝর্ণার কাছবরাবর গাছের ডালপালা আর পাতা যেন এক ঘেরাটোপ তৈরি করেছে। ঠিক মনে হল যেন গুহার ভেতর ঢুকে সন্ধান পেলাম কোনও গুপ্তধনের।

দিনের যে সময়ে আমরা গিয়েছিলাম, সেই পড়ন্ত বিকেলে গাছের চাঁদোয়া ভেদ করে সূর্যের আলো প্রায় নেই। আশ্চর্যভাবে শুধু জলপ্রপাতের উপর চুইয়ে পড়ছে একটু আলো। আর তার প্রতিফলন পড়ছে সামনের জলাশয়ে। এই নৈসর্গিক দৃশ্য গুপ্তধনের চেয়ে কম কিসে?

প্রকৃতি চিত্রকরের সেই অনবদ্য দৃশ্য ক্যমেরাবন্দি করে ফিরে এলাম বুরুডিতে। আর প্রমাণ পেলাম, ওই চিত্রকর অবিরাম তার রংতুলি বুলিয়ে চলেছেন এই ধরিত্রীর ক্যানভাসে। গাঢ় নীল জল, সবুজ টিলা, আর মাথার ওপর আকাশিয়া নীল চাদর মুগ্ধ করল বুরুডির রূপের সম্ভারে। বামদিকে ঢেউখেলানো পাহাড়, আর লেকের জলে আলোর আলপনা— প্রকৃতিপ্রেমের পানপেয়ালা পরিপূর্ণ।

রূপঘন ধারাগিরি জলপ্রপাত

পরদিন সকালে রঙ্কিণী মন্দির দেখার পর ছোট ট্রেক সিদ্ধেশ্বর পাহাড়ে। পাহাড়শির থেকে চারপাশের পাহাড় ও সমতলের দৃশ্য অসাধারণ। দিনের শেষে স্মরণীয় বিদায় জানাল গালুডি ড্যামের সূর্যাস্ত। দূরে জমাট বাঁধা পাহাড়ের স্রোত, তার ওপারে পড়ন্ত বিকেল, কাছে সুবর্ণরেখার জলে প্রতিফলিত আলোর ঢেউ। গালুডি ড্যামের আর একটি ছোট্ট বিশেষত্ব হল নদীর ধারে ড্যামের কাছে কয়েকটি আধডোবা খেজুরগাছ। একটু অন্যরকম দৃশ্য।

পরিচিত জায়গার পর আমরা এরই কাছাকাছি দুটো স্বল্পপরিচিত অথচ আকর্ষণীয় জায়গা দেখতে গেলাম।

জাদুগোড়া থেকে জামশেদপুর-মোসাবনি রোড হয়ে আরও ১০ কিমি দূরে নারওয়া পিকনিক স্পট।

নারওয়া পাহাড় ইউরেনিয়াম খনি ভারতের বিখ্যাত খনি গুলির একটা। সেই সুবাদে ‘নারওয়া’ নামটা অনেকের পরিচিত হলেও এরই কাছে দুই পাহাড়ের মাঝে ছোট একটা নদী উপত্যকার সৌন্দর্য ঝাড়খণ্ডের এক প্রায়-অজানা মাণিক্য। নারওয়া পাহাড় ও রাঙাপাহাড়ের মাঝবরাবর একটা পাহাড়ি নদীর উপত্যকায় স্বল্প প্রশস্ত পরিসরে স্থানীয় পিকনিক স্পট। প্রথম দর্শনে ঝাড়গ্রামের ডুলুং নদীর মত মনে হয়। কারণ দুই পাহাড়শিরার অপর পাড়ে নদীর স্রোত দেখা যায় না। এখানে নদীর পাড়ে পাথরের আধিক্য আর দুপাশে দাঁড়ানো দুই পাহাড়ের ফাঁক গলে বহমান জলধারার দৃশ্য বিমোহিত করে। ছুটির দিন ছাড়া জনসমাগম নগণ্য। ফলে শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশ দেহ ও মনের প্রশান্তির পক্ষে খুবই উপযুক্ত। নদী পাড়ে গাছের ছায়ায় খানিক চুপ করে বসে উপভোগ করা যায় পাহাড়-নদীর এই যুগলবন্দি।

নারওয়া পিকনিক স্পট

নারওয়া পিকনিক স্পট থেকে নারওয়া পাহাড়কে বেড় দিয়ে ইউরেনিয়াম কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার কমপ্লেক্সের গা বেয়ে আরও ১০ কিমি অর্থাৎ নারওয়া পিকনিক স্পটের ঠিক উল্টোপিঠে আর একটা জায়গা হল পাহাড়ভাঙা পিকনিক স্পট। স্বল্প দূরত্ব হলেও রাস্তা বেশ সঙ্কীর্ণ, শেষের দিকে রাস্তায় এমন গর্ত রয়েছে যে পাকা ড্রাইভার আর খানিক উঁচু গাড়ি না হলে এখানে আসা মুশকিল। বর্ষাকালে কার্যত অসম্ভব।

নারওয়ায় যে পাহাড়শিরার কথা বলা হল, এই জায়গাটা ঠিক তার উল্টোপিঠে। এখানে নদীটা রাঙাপাহাড়ের কাছে বাঁয়ে মোড় নিয়ে দু পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে পৌঁছেছে নারওয়া পিকনিক স্পটে।

জলধারার বুকে ঢেউখেলানো ছোট্ট ঝর্ণা, সামনে সবুজ পাহাড় আর উপরে নীল আকাশ। পড়ন্ত বিকেলের রোদে এই দৃশ্য মনের বা হাতের, যে কোনও ক্যামেরাতেই চিরকালীন বন্দি হয়ে থাকবে।

পাথরের বোল্ডারের উপর দিয়ে যাওয়ার ফলে নদীতে একটা ছোট ঝর্ণার সৃষ্টি হয়েছে। নদীর জল কম থাকলে বোল্ডার ধরে জলের কাছে নদীর মাঝবরাবর পৌঁছে যাওয়া যায়। ঝর্ণার পাশে পাহাড়ের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে, পাহাড়ের গরিমা আর নদীর জলের কলতান এক অনবদ্য দৃশ্য রচনা করে। নদীর উপর বোল্ডারগুলি আলগা নয়। জমাট পাথরের সাদা রং মার্বেলের কথা মনে করায়। পাথরের খাঁজে খাঁজে জমা জল আর কোনও কোনও জায়গায় গোল গর্ত অনেকটা ঝাড়গ্রামের তারাফেনী নদীর ঘাগড়া জলপ্রপাতের মত।

পাহাড়ভাঙা পিকনিক স্পট

বর্ষার পরে স্বচ্ছ জলে স্রোত রয়েছে, রয়েছে উচ্ছ্বলতা, কিন্তু বর্ষার ভয়ঙ্করী রূপ নেই। স্রোতের প্রগলভতা ও জলের হাওয়ার আলতো ছোঁয়া মনে করায় কোন চপলাকে। যার পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রেমালাপ চালানো যেতে পারে।

ঝাড়খণ্ডের ভূগোল বলছে অপার সৌন্দর্যদায়িনী এই স্রোতস্বিনী হল গারা (Garra) নদী। স্থানীয়ভাবে একে ডাকা হয় গুররা নদী বলে। সুবর্ণরেখার এক অখ্যাত উপনদী। সর্বজ্ঞ গুগুল একে অভিহিত করেছে ‘পাহাড়ি নদী’ বলে।

নদীর সামনে যে পাহাড়টা দেখা যায়, তার সামনের কিছুটা অংশ ধসে পড়েছে বলে মনে হয়। এই ভাঙা পাহাড় থেকেই জায়গাটাকে পাহাড়ভাঙা বলে। আসলে ‘রাঙাপাহাড়ই’ ভাঙাপাহাড়। আগেই বললাম যে নারওয়া পাহাড় বেড় দিয়ে পাহাড়ভাঙায় পৌঁছতে হয়। পাহাড়ে উঠতে যেমন পাকদণ্ডি থাকে, এখানে উচ্চতার রোমাঞ্চ না থাকলেও অচেনা অজানা গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাত্রা, শেষ মুহূর্তের আগে পর্যন্ত গ্রাম্য ও বন্য পথের উত্তেজনা, সবশেষে ভাঙাপথে পাকা ড্রাইভারের যান চালনার কেরামতি— মাঝে মনে হচ্ছিল, সত্যিই পৌঁছতে পারব তো? শেষ পর্যন্ত যখন পৌঁছানো গেল, তখন আমাদের অপেক্ষায় থাকা অপার্থিব সুন্দরের সঙ্গে যোগ হল ইতিমধ্যে মনের পকেটে ঢুকে যাওয়া পথ পাড়ি দেওয়ার খানিক রোমাঞ্চ-আশঙ্কা-উত্তেজনা। সব মিলিয়ে মনে হল এই যাত্রা শুধু সার্থকই নয়, এ পরম প্রাপ্তি।

ঘাটশিলা, টাটানগর, রাখা মাইন্স, তিন জায়গা থেকেই পাহাড়ভাঙা আসা যায়। দূরত্ব যথাক্রমে ৪০ কিমি, ২৪ কিমি ও ২০ কিমি।

আর একটা ব্যাপার না বললেই নয়। ঘাটশিলা পৌঁছনো মাত্র হোটেলের সর পড়া গাঢ় দুধের চা মেজাজটাকেই বানিয়ে দিয়েছিল রাজা। আর শেষদিন বিকেলে ফুলডুংরি পাহাড়ের গোড়ায় বাবু টি স্টলের ঘন দুধের চা খাওয়ার পর মনে হল শীতের আমেজে শুধু এই চা উপভোগ করার জন্যই বার বার এখানে আসা যেতে পারে।

তিনদিন তিনরাতের সফর শেষে মনে ওই পরম প্রাপ্তির বিভূতি নিয়ে ভোরের আলোয় বিদায় জানানো গেল বাঙালির চিরন্তনের ঘাটশিলাকে। এই স্মৃতি রোমন্থনই হয়ত আবার টেনে আনবে শঙ্করের স্রষ্টার বাসভূমিতে। বেরিয়ে পড়তে বলবে আরও অনেক অজানার খোঁজে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4737 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...