যাদবপুর: রণজয়ী নয়, রণে আছে তবু মেতে

প্রবুদ্ধ ঘোষ

 


দক্ষিণপন্থী দলগুলি রাজনৈতিক জমি দখলের লড়াইতে নেমেছে যাদবপুরে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক, গবেষক, শিক্ষাকর্মীদের সম্পর্কে মনগড়া তত্ত্ব ও তথ্য জনপরিসরে পরিবেশন করছে। তাদের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার গা-জোয়ারিতে মৃত ছাত্রের ন্যায়বিচারের দাবি ততটা নেই, যতটা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ বিষিয়ে তোলার উদগ্র বাসনা। ক্ষমতাশালী শক্তিগুলির এই অপকর্মে সচেতন প্ররোচনা দিচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলি

 

প্রাথমিক কয়েকটি জরুরি কথা

হ্যাঁ। বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রটির মৃত্যুতে আমরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মজনরা সকলে ব্যথিত। ক্রুদ্ধ। তার পরিবারের প্রতি সমব্যথী। তার হত্যার তদন্ত ও বিচার হোক, প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাক এবং র‍্যাগিং নামক বর্বর প্রথা বন্ধ হোক এ আমরা সকলে চাই। অপরাধীদের আড়াল করতে চাওয়ার অপচেষ্টা ব্যর্থ হোক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর কোনও ছাত্রছাত্রীকে কখনও যেন র‍্যাগিং কুসংস্কৃতির শিকার না হতে হয় তা আন্তরিকভাবে কাম্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলির কাছে এই দাবি জোরালো হয়ে পৌঁছোক। অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, শিক্ষাকর্মী, গবেষক, নিরাপত্তারক্ষী এবং ছাত্রছাত্রীদের সদিচ্ছায় ক্যাম্পাসে-হোস্টেলে অনভিপ্রেত ঘটনাবলি বন্ধ করা সম্ভব। ছাত্রছাত্রীদের সংবেদনশীলতা ও মানবিক অনুভূতির নিরন্তর লালনে র‍্যাগিং বন্ধ করা সম্ভব। এই বিশ্বাস আমাদের আছে।

না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় খুনি নয়। কয়েকজন ছাত্রের অমানবিক আচরণের জন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয় দায়ী হয়ে যায় না। শ্রম, নিষ্ঠা ও নিরন্তর অনুশীলনে অর্জিত খ্যাতি মিথ্যে হয়ে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সংগ্রামী ইতিহাস র‍্যাগিং, নির্যাতনকে প্রশ্রয় দেয়নি কখনও। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সওয়া একশো বছরের অর্জন এত ঠুনকো নয় যে, কতিপয় বদের কুকর্মের জেরে তা ভেঙে পড়বে। কয়েকজন র‍্যাগার, যৌন হেনস্থাকারী এবং সংশ্লিষ্ট অপদার্থ উদাসীন কর্তৃপক্ষের কৃতকর্মের দ্বারা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক ভূমিকা বিচার্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় আরও অসংখ্য ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, গবেষক, শিক্ষাকর্মী, নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে পূর্ণতা পায়। এই বৃহত্তর অংশ র‍্যাগিং ও যৌনহেনস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার। কর্তৃপক্ষের বহু উৎকর্ষবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সমস্ত আত্মজনকে (stakeholders) এককথায় ‘খুনি’ দাগিয়ে দেওয়া অন্যায়।

 

যাদবপুর রাজনীতি অবিচ্ছেদ্যকেন?

আমি ধার করে আরও একটা গান/ সেটা তোমায় ভালবাসতে চাওয়ার গান

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য যোগ। বিংশ শতকের শুরুতে বিশেষ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমিতে বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ যাত্রা শুরু করে। তারা মুক্তচিন্তার আদানপ্রদান, পাশ্চাত্যের সঙ্গে দেশীয় শিক্ষার সেতুবন্ধন, যুক্তিবাদ এবং স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে এমন শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তন করতে চেয়েছিল যা শাসকের মতাদর্শের প্রতিস্পর্ধী মনন তৈরি করে চলবে নিরন্তর। সুবোধচন্দ্র মল্লিক তৎকালীন স্বদেশি বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে পরামর্শের পরে যখন স্বদেশি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ঘোষণা করেন, তখন উপস্থিত যে ছাত্ররা তাঁকে সম্বর্ধনা দিয়েছিল, তাদের রাজনৈতিক চিন্তা স্পষ্ট ছিল। প্রযুক্তিশিক্ষার ক্ষেত্রে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের ইতিহাসও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের সাক্ষ্য বহন করে। স্বাধীনতা-উত্তর পর্বে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় উপর্যুক্ত স্বাতন্ত্র্য, চিন্তার মুক্তি, বিশ্ব শিক্ষাপ্রণালীর সঙ্গে যোগ ইত্যাদির চর্চা অব্যাহত রেখেছে। ১৯৬৬-র খাদ্য আন্দোলন বা ১৯৬৯-পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট নকশালপন্থী মতাদর্শের প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মতাদর্শগত ঝোঁক শাসকশ্রেণিকে বিড়ম্বনায় ফেলেছে। কৃষক-শ্রমিকের আন্দোলনে বারবার নিজেদের উজাড় করে দেওয়া যাদবপপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের চেতনা ও শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপরিসরেও নিজেদের উজ্জ্বল অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই নিজ নিজ দায়িত্ব শ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন বলেই উপনিবেশোত্তর ভারতবর্ষের শিক্ষাকাঠামোয় বিশেষ উৎকর্ষ অর্জন করেছে যাদবপুর। এই গর্ব শুধু যাদবপুরের আত্মজনদের নয়, এই গর্ব পশ্চিমবঙ্গের এবং ভারতবর্ষেরও। যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রথাগত অনুশীলনের বাইরে সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মজনদের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। সর্বোপরি এই বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি অর্থপোষিত; অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবের ন্যায্য ভাগীদার প্রতিটি সাধারণ নাগরিক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত সম্মান, বিশ্বমানের শিক্ষা এবং সংগ্রামী ঐতিহ্যে নাগরিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোভিডের মারণসময়ে রাষ্ট্র যখন সব দায় ঝেড়ে ফেলেছিল, শাসক যখন নাগরিকদের প্রতি মৌলিক দায়িত্বগুলি পালনে ব্যর্থ হয়েছিল, তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, গবেষকরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মানুষের ভালর জন্য। কখনও আমফানে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, কখনও অসহায় মানুষের বাড়িতে বাড়িতে চিকিৎসা-সেবা পৌঁছে দেওয়া আর, দীর্ঘ সময় ধরে যাদবপুর ক্যান্টিন চালিয়ে পথবাসী অসহায়দের খাবারের বন্দোবস্ত করা। রাজ্যের মানুষ যখন যেখানে আর্থিক বা সামাজিক বা রাজনৈতিক বিপদে পড়েছেন, তখনই রাষ্ট্রীয় জুলুমের তোয়াক্কা না করে তাঁদের পাশে থেকেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। না, এ কোনও শ্লাঘা না বা মহত্ব প্রদর্শন না। এটুকু মানবিক দায়। এই দায়বদ্ধতা সমাজ ও নাগরিকদের প্রতি ছাত্রসমাজের কর্তব্য। কোনও কর্পোরেট মিডিয়া বা ভাষণবাজ নেতামন্ত্রী সেই দায় পালন করেনি। যদিও বা রাজনৈতিক দলগুলি কিছু উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তাতে ভোটের ফায়দা তোলাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ব্যক্তিগত স্বার্থে না, বৃহত্তর সার্বিক সামাজিক স্বার্থে সেবা করে গেছে। আশু-তিমিরের পাঠশালা তৈরি হয়েছে ২০২১ সালের মার্চে, যে পাঠশালা অতিদুঃস্থ ও পথবাসী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেশের প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগে প্রধান ভূমিকায়। বিভিন্ন বিভাগের গবেষকদের গবেষণাপত্র দেশবিদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উল্লেখ হয়। ছোট-বড় আরও অসংখ্য প্রগতিশীল কাজে তাঁরা জড়িয়ে থাকেন। এই ‘ভাল’গুলির অংশীদারিত্ব অবশ্যই সহনাগরিকদেরও। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভাল’-র অংশীদারিত্ব যেমন নাগরিকদের, তেমনই ‘মন্দ’ বা অনভিপ্রেত কিছু ঘটলে সব অংশীদারিত্ব অস্বীকার করে সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়কে অপদস্থ করা উচিত কি? গণমতামতকে প্রভাবিত করার শক্তি সংবাদমাধ্যমের অনেক বেশি, বিশেষত উত্তর-সত্য যুগে। মাথা-উঁচু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গণমতামতকে বিষিয়ে দেওয়ার নীতিতে যে ন্যারেটিভ তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে, সহনাগরিকদের কি সেই ন্যারেটিভ নিয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তোলা উচিত নয়? কতিপয় ছাত্রছাত্রীর ঘৃণ্য কাজের জন্য এমন উৎকর্ষতার অনুশীলনস্থলকে ‘খুনি’ বলে দাগিয়ে দিলে সেটা প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের অপমান। না, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিষয় সর্বোত্তম নয়, তার বহু ত্রুটিবিচ্যুতি আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু, সেই ত্রুটি সংশোধন আর সীমাবদ্ধতা পেরোনোর আন্তরিক প্রচেষ্টাও জারি থাকে সর্বদা। বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান তার প্রমাণ। আর, এগুলি অস্বীকার করে রাজ্যের তথা দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গায়ে ‘খুনি’, ‘র‍্যাগারদের আখড়া’, ‘মাদক পাচারচক্র’, ‘সন্ত্রাসী’ ইত্যাদি অপশব্দের তকমা এঁটে দিলে বাংলার শিক্ষা ও সংগ্রামের ইতিহাসকে অসম্মান করা হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় বিগত কয়েকদিন ধরে এমন ব্যাপার ঘটছে।

বিগত বেশ কিছু বছর ধরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের চক্ষুশূল হয়েছে। একদিকে গভীরতর আর্থিক সঙ্কট এবং ক্ষয়িষ্ণু সরকারি অনুদান, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় গবেষণাকার্যের হাজারো প্রতিকূলতা— যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষকরা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ছাত্রছাত্রীরা বৃহত্তর ক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। সাম্প্রতিক সরকারি সমীক্ষায় যাদবপুরের উৎকর্ষতা প্রমাণিত। তবুও, সরকারি তহবিলে যাদবপুরের জন্য বরাদ্দ কমে গেছে। বিভিন্ন সময় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বহু শিক্ষাবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছে যাদবপুর। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রতিরোধও করেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মজনদের রাজনৈতিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ শাসকের সঙ্গে সহমত হয়নি বলেই তা শাসকের শিরঃপীড়ার কারণ হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার বেসরকারিকরণের সব অপচেষ্টা ঠেকিয়ে রেখে এখনও কম অর্থে শিক্ষাদান করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা যখন আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতাশালীদের কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে, তখন যাদবপুর একটা দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পেরেছে। এও এক ঋজু রাজনৈতিক অবস্থান। শাসক এবং শাসকের তাঁবেদার কর্পোরেট সংবাদমাধ্যম সেই কারণেই যাদবপুরের আত্মশক্তিতে বারবার আঘাত করতে চায়। সংবাদমাধ্যম যে কোনও ছুতোয় যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠরোধ করতে চায়। সংবাদমাধ্যম সচেতনভাবে এক প্রতিহিংসামূলক বাতাবরণ তৈরি করছে যাদবপুরের বিরুদ্ধে। এমনই প্রতিহিংসা যেখানে কর্পোরেট হাসপাতালে ডাক্তার অবধি ইচ্ছে প্রকাশ করছেন— “বাংলার দু’টি প্রধান রাজনৈতিক পার্টি চাইলেই জেইউ ক্যাম্পাসকে হিরোশিমা বানিয়ে দিতে পারে…” যাদবপুরকে শুধুমাত্র মাদক, অবাধ যৌনতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা চর্চার ‘ঠেক’ হিসেবে প্রদর্শন করানোই শাসক ও শাসকপোষিত সংবাদমাধ্যমের লক্ষ্য; যাতে সহনাগরিকদের মননে সক্রিয় প্রতিহিংসা জাগিয়ে তোলা যায়।

যাদবপুরের কুৎসা করতে দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলি এককাট্টা হয়েছে। মিথ্যে প্রচার, ভিত্তিহীন গুজব ছড়ানো, ছাত্রছাত্রীদের সোশাল মিডিয়ায় গালিগালাজ, অযৌক্তিক বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি চালিয়ে যাচ্ছে তারা। অতিসম্প্রতি ফ্যাসিস্ট আরএসএস-বিজেপির নেতারা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সদলবলে ঝামেলা পাকাতে এসেছে। ছাত্রছাত্রীদের আঘাত করেছে। তৃণমূলের বিশাল বাহিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অহেতুক উত্তেজনা তৈরি করেছে। এই অপশক্তিগুলি যাদবপুরের মুক্তচিন্তা ও সাংস্কৃতিক প্রগতিশীলতা স্তব্ধ করতে সদাসচেষ্ট বলেই নৈরাজ্যের বাতাবরণ তৈরি করছে। এতে যাদবপুরের স্বাতন্ত্র্য যেমন আহত হচ্ছে, তেমনই যাদবপুরের সকল অংশীজনের মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত হচ্ছে। সংসদীয় দলগুলি রাজনৈতিক জমি দখলের লড়াইতে নেমেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক, গবেষক, শিক্ষাকর্মীদের সম্পর্কে মনগড়া তত্ত্ব ও তথ্য জনপরিসরে পরিবেশন করছে। তাদের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার গা-জোয়ারিতে মৃত ছাত্রের ন্যায়বিচারের দাবি ততটা নেই, যতটা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ বিষিয়ে তোলার উদগ্র বাসনা। ক্ষমতাশালী শক্তিগুলির এই অপকর্মে সচেতন প্ররোচনা দিচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলি। একদিকে গণমাধ্যমে অর্ধসত্য সহ গুজব, মনগড়া তত্ত্ব দিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মতামত তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা যখনতখন ক্যাম্পাসে এমনকি ক্লাস-চলাকালীন ক্লাসে ঢুকে পড়ে নজরদারি চালাচ্ছে। ক্যাম্পাসের মধ্যে ছাত্রছাত্রীদের সম্মতির তোয়াক্কা না করে তাদের ধরে ধরে কুরুচিপূর্ণ ও বিকৃত প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে সংবাদমাধ্যম। প্রকাশ্যে অপদস্থ করা হচ্ছে তাদের। গবেষক, ছাত্রছাত্রীরা ট্রমার শিকার হচ্ছে। তারা বলছে যে, সামাজিক পরিসরে রাষ্ট্র ও সংবাদমাধ্যমের দ্বারা সৃষ্ট প্রবল র‍্যাগিং ও ‘বুলি’-তে তাদের জীবন বিপর্যস্ত। এর আগে জেএনইউ-কে কেন্দ্র করে এহেন বিকৃত মানসিকতার প্রদর্শন করেছে শাসকপোষিত সংবাদমাধ্যম। ‘হোক কলরব’-এর সময়েও চেষ্টা চলেছে মূল যৌক্তিক বিষয় থেকে নজর ঘুরিয়ে মদ-গাঁজা-নিরোধের অবান্তর চর্চা করার। এতদিনে আরও শক্তি বাড়িয়েছে এরা। ফলে তাদের আক্রমণের নীতি পাল্টেছে, জবরদস্তি বেড়েছে, ভুয়ো প্রচারের সার্বিক পরিধি বেড়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মশক্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া মানে বাংলার প্রতিস্পর্ধী ধারার ঐতিহ্যকে গুঁড়িয়ে দেওয়া— বিলক্ষণ জানে অপশক্তিগুলি।

 

র‍্যাগিং এবং

A new and sweeping utopia of life, where no one will be able to decide for others how they die, where love will prove true and happiness be possible…

র‍্যাগিং একটি বর্বর অ-সভ্য অমানবিক প্রথা। ‘প্রথা’ শব্দটি ব্যবহারের কারণ, ‘র‍্যাগিং’ প্রজন্মান্তরে বহমান একটি বিষয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ছাত্রাবাসে, কর্মক্ষেত্রে র‍্যাগিং সর্বত্র। অগ্রজরা মনে করে অনুজদের দৈহিক ও মানসিক শাসন করলে তবেই বশে আনা যাবে, তথা, তাদের মানসিকতা-মূল্যবোধ ছাঁচে-ছাঁদে গড়েপিটে নেওয়া যাবে। এটি একটি পচনশীল মানসিকতা। বিভিন্ন কুযুক্তির চাষ খুব হয় সমাজে— আমাদের আগের প্রজন্ম করেছে, আমাদের সিনিয়ররা করেছে, আমরা করব না? আগে মাস্টাররা মেরে ছালচামড়া তুলে দিত, প্রকাশ্যে কটুকাটব্যে নুইয়ে দিত, আহা কী ভাল! ওই ধারাটিই বলবৎ থাকুক। গুরুজনরা কারণে অকারণে চড়থাপ্পড় মেরে প্রবল কেলিয়ে ‘মানুষ করে তুলত’, সর্বসমক্ষে হেয় করে ‘জীবনের শিক্ষা’ দিত, আহা কী সুন্দর দিন ছিল সেইসব! র‍্যাগ দেওয়া মানে তো জুনিয়রটিকে মানুষ করে তোলা, র‍্যাগ দেওয়া কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারের সঙ্গে একাত্ম করে তোলা— এ তো একটা রীতি! ‘ইন্ট্রো’ দেওয়া-নেওয়া আর সিনিয়রের হুকুমবরদার হতে হতে নাকি মানসিক দৃঢ়তা আসে, সহ্যক্ষমতা বাড়ে! কর্মক্ষেত্রে অধস্তনকে একটু দাবড়ানি না দিলে হয়? নিজেরাও সিনিয়রের থেকে অপমানিত হই, তাই নতুনের ওপরে অপমানটা চাপিয়ে দিয়ে অফিস কালচার বজায় রাখতে হবে তো! নিউজঅ্যাঙ্কর ভাবে বিরোধী মতের মানুষকে অতিথি করে এনে তার ওপরে গলাবাজি করে দশচক্রে তাকে ভূত বানিয়ে তাকে অপদস্থ করলেই তাকে শাসনের খোপে এঁটে দেওয়া যাবে। এইসব বয়ান ভাইরাসের মতো আমাদের মগজে ঢুকে গেছে। স্বাভাবিক সহজ হয়ে গেছে প্রজন্মান্তরের অনুশীলনে। এই সবগুলোই একই বিকৃত মানসিকতার অংশ। এর কোনও কম-বেশি মাত্রাভেদ হয় না, কিংবা ভাল র‍্যাগিং-খারাপ র‍্যাগিং বিভাজন হয় না। র‍্যাগিং অসুস্থ সমাজের বিকৃত সাংস্কৃতিক প্রবণতা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও ইদানীং এই বিকৃতির অনুশীলন হয়েছে এবং হয়; দুর্ভাগ্যজনক হলেও তা সত্যি। অবশ্যই সমগ্র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রছাত্রীকে র‍্যাগিং-এ অপরাধী বলে দাগানো যায় না, কিন্তু কতিপয় ছাত্রছাত্রী এই র‍্যাগিং সংস্কৃতির অনুশীলন করে, তা হতাশাজনক সত্যি। এই অপরাধকে নির্মূল করা আশু প্রয়োজন। এর সঙ্গে কোনও ‘তবু’, ‘কিন্তু’ অব্যয় যোগ করা চলে না। তারপরও কয়েকটি অপ্রিয় প্রশ্ন থেকেই যায়।

র‍্যাগিং-এর ব্যাধি সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও ছাত্রাবাসে রয়েছে। কখনও তা প্রকাশ্যে আসে, কখনও আসে না। ছাত্রমৃত্যুর ঘটনা কখনও ধামাচাপা দেওয়া হয়, কখনও কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনায় প্রশাসন চুপ করে যায়। ২০০৯ সালে হিমাচল প্রদেশের মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রাবাসে অমন কচরুকে খুনের ঘটনা এখনও দগদগে স্মৃতি। পরিসংখ্যান বলছে ২০১৮-২০২৩ এই ছ-বছরে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মোট ২৫ জন, আইআইটি-তে মোট ৩৯ জন, আইআইএম-এ মোট ৪ জন, এনআইটি-গুলিতে মোট ২৫ জন ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। ২০২৩ সালের ২৬ জুলাই রাজ্যসভার প্রশ্নোত্তরে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুভাষ সরকার এই পরিসংখ্যান পেশ করেছেন। এই সবকটিই প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। কিছুদিন আগেই আইআইটি-তে একটি ছাত্রের মৃত্যু নিয়ে সংবাদমাধ্যম পঙ্কিল নীরবতায় ডুবে ছিল। গুন্টুরের একটি প্রতিষ্ঠানে এক বাঙালি ছাত্রের লাশ মিলেছে গত মাসে। ২০২১ সালের অক্টোবরে মথুরার রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম দাতব্য হাসপাতালে ২৩ বছরের এক নার্সিং-ছাত্রী আত্মহত্যা করে। পরিবারের অভিযোগ ছিল কর্তৃপক্ষ ও ওয়ার্ডেন তাঁকে নিয়মিত মানসিক নির্যাতন করত।[1] ২০১৩ সালের মে মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা স্নাতকোত্তরের এক ছাত্র ছাত্রাবাসে আত্মহত্যা করে। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে সে বিদায় নিচ্ছে, এমনটাই তার আত্মহত্যা-লেখ থেকে জানা গেছিল।[2] মিনিস্টার অব্‌ স্টেট অন্নপূর্ণা দেবী সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে জানিয়েছিলেন যে, ২০১৮ থেকে ২০২১-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউজিসিতে মোট ২৭৯০টি র‍্যাগিং-এর অভিযোগ জমা পড়েছে।[3] ভারতবর্ষের সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলগুলি র‍্যাগিং-এর আখড়া। প্রায়শই বিভিন্ন অভিযোগ, ছাত্রমৃত্যু, নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে পড়া ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা সামনে আসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসে না। অ্যান্টি-র‍্যাগিং সেল থেকেও যে আসলে মেডিক্যাল কলেজের কুখ্যাত র‍্যাগিং সংস্কৃতি আটকানো যায়নি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে, তার সাক্ষ্য দেয় বহু মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর গোপন স্বীকারোক্তি, বেনামী বয়ান এবং কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন।[4] এই ঘটনাগুলি প্রকাশ্য গোপন; সকলেই জানে কিন্তু জানে না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া র‍্যাগিংজনিত মৃত্যুর পরে র‍্যাগিং নিয়ে সামাজিক পরিসরে আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনা প্রয়োজন। কারণ ছাত্রছাত্রীদের সংবেদনশীলতা বাড়লে তবেই র‍্যাগিং বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু মুশকিল এই যে, সমাজের সিংহভাগ মানুষ ‘র‍্যাগিং’-এর মাত্রাভেদ করে এবং ‘আমাদের সময়ে তো অল্প একটু র‍্যাগ দিত’, ‘একটু ইন্ট্রো দেওয়া বা সিনিয়রের ফাইফরমাশ খাটায় দোষ তো তেমন নেই’ বলে লঘু করার চেষ্টা করে। ছাত্রাবাসে নিজেদের দাপ বজায় রাখতে একদল ছাত্র বা ছাত্রী র‍্যাগিং সংস্কৃতি দিয়ে সিনিয়র-জুনিয়র ‘বন্ডিং’ তৈরি করতে চায়; আর, সেই র‍্যাগিং-সংস্কৃতিকে পরবর্তী ব্যাচের আবাসিকদের মধ্যে চারিয়ে দেয়। বিগত কয়েক দশকে ভরভরন্ত নিরাজনীতি আর ছাত্রছাত্রীদের মনস্তাত্ত্বিক বদল র‍্যাগিংকে আরও তোল্লাই দিয়েছে কিনা, সে এক আলাদা প্রবন্ধের বিষয়। কিন্তু, প্রকৃত রাজনীতিকরণ (মানবিকতা ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি যার অবশ্য ভিত্তি) না থাকলে এই কুসংস্কৃতি আটকানো অসম্ভব।

আশ্চর্যজনকভাবে শাসকের চেষ্টায় আর টিভি-মিডিয়ার চিৎকারের লক্ষ্য কেবল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। আইআইটির ছেলেটির বা গুন্টুরের বাঙালি ছাত্রটির মৃত্যুর বিরোধিতায় (দুজনের মৃত্যুতেই র‍্যাগিংয়ের সুস্পষ্ট অভিযোগ) রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার নীরব। টিভি-চ্যানেলে সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের ডেকে এনে অসুস্থ উন্মাদনায় সঞ্চালক চেঁচাচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার বাড়বাড়ন্ত বন্ধের উপায় বের করতে প্রতিষ্ঠানগুলির কর্তৃপক্ষকে ন্যায্য প্রশ্নে নাজেহাল করার তাগিদ তাদের নেই। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ‘সমাজবিরোধী’ প্রতিপন্ন করলেই সব (পড়ুন শাসকের) সমস্যার সমাধান হবে বলে সংবাদমাধ্যমের ধারণা। তাই দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে হত্যার মূল কারণ র‍্যাগিং থেকে, প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা থেকে। র‍্যাগিং-এর ইস্যু নয়, ‘সিগারেট-মদ-যৌনতা’ কিংবা বিজেপি-নেতার বলা ‘সন্ত্রাসবাদ’ তাদের মূল ফোকাস। টিভি-চ্যানেলের প্রাইম-টাইম আলোচনাসভার শিরোনামগুলি তার প্রমাণ। মূল ঘটনার সঙ্গে সঙ্গতিহীন প্রশ্ন সাজিয়ে সঞ্চালকদের স্বঘোষিত বিবেক হতে চাওয়া তার প্রমাণ।

 

আইকার্ড সিসিটিভি নজরদারি ইত্যাদি

The common argument that we have ‘if you have nothing to hide… if you have nothing to fear’- the origins of that are literally Nazi propaganda… It’s from their minister of propaganda Joseph Goebbels. So when we hear modern politicians, when we hear modern people repeating that reflexively without confronting its origins, without confronting what it really says… that’s harmful.

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মদসহ যেকোনও নেশাদ্রব্য গ্রহণ করা অনুচিত। অনভিপ্রেত। ‘শিক্ষাপ্রাঙ্গণে মদ খাওয়া আমার অধিকার’— এর চেয়ে বড় নির্বোধ মন্তব্য আর কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সংবেদনশীল ও অনুভূতিপ্রবণ হয়ে, অন্তত নিজেদের ‘ইমেজ’ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মানরক্ষার্থে এগুলি থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এর সঙ্গে নজরদারির কোনও সম্পর্ক নেই। গলায় পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে রাখলে বা সিসিটিভির তলায় বসে পড়াশোনা করলেই ‘শিক্ষালাভ’ হয় কি? তেমন প্রমাণ কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই দিতে পারেনি। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা এখনও পড়াছুটের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে— ন্যূনতম খরচে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা পাওয়ার উপায় করে দিতে পারে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এমন অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, যাঁরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ন্যূনতম খরচ, ফি-মকুব, শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীর বন্ডিং, পড়াশেখার গভীরতায় উপকৃত হয়েছে। এগুলি ছাড়া তিনি হয়তো উচ্চশিক্ষা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন না। আইকার্ড, সিসিটিভি, ঝাঁ-চকচকে ক্যাম্পাস, গুরুকুলীয় অনুশাসন, স্মার্ট-ক্লাসরুমের দেখনদারি আর হামবড়া শিক্ষকদের পাল্লায় পড়তে গেলে তাঁদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অধরা থেকে যেত। প্রশ্নটা শিক্ষালাভের। ছাত্রছাত্রীদের প্রগতিশীল মানসিক বিকাশের। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য বিদ্যা উদ্ভাবন, কেবলমাত্র যান্ত্রিক বিদ্যাদান না। আইকার্ড, সিসিটিভি বিদ্যা উদ্ভাবন করতে পারে কি? কাউকে পড়াশোনায় ফেরাতে পারে কি? সিসিটিভি আর নজরদারির আওতায় তটস্থ শিক্ষার্থীরা কতটা খোলা মনে শিক্ষালাভ করতে পারে? এতদিন ধরে যাদবপুরের যেটুকু উৎকর্ষতা, তার জন্য কোনও নজরদারি, আইকার্ড, টিভি-চ্যানেলের খবরদারির প্রয়োজন তো হয়নি। ‘হোক কলরব’-এর সময়ে বা কোনও রাজনৈতিক দলের ডাকা ক্লাস বয়কটের সময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ক্লাস নিয়েছেন। ক্লাসরুমের চার দেওয়ালের বদ্ধতা থেকে বেরিয়ে মাঠে বসে ক্লাস নিচ্ছেন অধ্যাপক। ক্লাসের জন্য নির্ধারিত ১ ঘণ্টা সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বা লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক তাঁর ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, আরও সহজ করে পাঠ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এক বিভাগের কোনও ছাত্রী অন্য বিভাগে তার আগ্রহের বিষয়ের ক্লাস করতে বসে গেছে, এক ক্লাস ওপরের কোনও ছাত্র তার প্রিয় কবিতা অধ্যাপকের থেকে আবার বোঝবার জন্য এক ক্লাস নিচে বসে ক্লাস করছে। এই উদাহরণগুলি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামেশাই চোখে পড়বে। না, কোনও সিসিটিভি, কোনও মিডিয়া-চ্যাঁচানি, কোনও আইকার্ড এতে কোনও ভূমিকাই নিতে পারবে না। কোনওদিনও পারেনি। ‘হাঁ আছে, ফুঁ আছে, দুধের বাটি নেই’— কর্পোরেট ব্যবস্থা এমন শিক্ষানীতিই চাপিয়ে দিতে চায়। অথচ আমাদের রবীন্দ্রনাথ এমন নীতিরই বিরোধিতা করে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথ অমন শিক্ষানীতিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন বলেই অমন শিক্ষানীতির শিক্ষককে বিদ্যার দোকানদার আর ছাত্রদের খরিদ্দার বলে লিখেছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃতপ্রস্তাবে “প্রতিকূল অবস্থাতেও অনেক শিক্ষক দেনাপাওনার সম্বন্ধ ছাড়াইয়া ওঠেন— সে তাঁহাদের বিশেষ মাহাত্ম্য গুণে।” রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকলে দেখতেন উপনিবেশোত্তর যুগের শাসক আর কর্পোরেট হাউসগুলি তাঁর ভাবনাকে নাকচ করে ওই দোকানি-খরিদ্দারের সম্পর্ককে তুলে ধরছে। ‘শিক্ষার নাগপাশ’ চাপিয়ে দিয়ে ‘শিক্ষার মুক্ত অবস্থা’কে বর্জন করতে লেগেছে। “যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্”— এটাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের মন্ত্র। সিসিটিভি বসিয়ে, ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে আটকে, শিক্ষার্থী-অধ্যাপককে নজরদারিতে বেঁধে, পরিচয়পত্র দিয়ে অস্তিত্ব সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে ওই মন্ত্রটাই হারিয়ে যায়। বিশ্বের থেকে বিচ্ছিন্ন করে শিক্ষা-বেচার যান্ত্রিকতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যে আঘাত।

আরেকটি কুযুক্তি টিভি-চ্যানেল, সংবাদপত্রের স্বঘোষিত শিক্ষাহুব্বারা ফাঁপিয়ে তুলছে। জনগণের মতামত নির্ধারণ করে দিতে চাইছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি অর্থে পোষিত, নাগরিকের আয়করের টাকায় চলে, তাই ছাত্রছাত্রী-অধ্যাপকরা সিসিটিভি লাগানোর বিরোধিতা করতে পারবে না। আত্মজনরা নয়, রাষ্ট্র ঠিক করে দেবে কোথায় কোথায় সিসিটিভি লাগবে এবং তা কীভাবে রাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যবহার হবে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী ছাত্রছাত্রীরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রদের লাঠি-রড দিয়ে মারে। তারপর ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকে প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের প্রবল নির্যাতন করে ও পাঠাগারে ভাংচুর চালায়। সবটাই সিসিটিভিতে দেখা গেছে। কিন্তু, তারা রাষ্ট্রের অনুগামী বলেই তাদের কোনও শাস্তিবিধান হয়নি। সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ সিসিটিভিতে ছাত্রছাত্রীদের প্রেম দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল; প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রছাত্রীদের প্রেম সহ্য না-করতে পেরে অভিভাবকদের ডেকে পাঠিয়েছিল। উপর্যুক্ত আইআইটি, এনআইটি, আইআইএমে ছাত্রমৃত্যুর যে পরিসংখ্যান, তার সবকটি ক্যাম্পাসেই প্রচুর সিসিটিভি লাগানো রয়েছে। এখনও পর্যন্ত কেউই ছাত্রমৃত্যুর দায়ে গ্রেফতার হয়নি। অসংখ্য এমন উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে। রাষ্ট্রের যুক্তি— র‍্যাগিং বন্ধ করা যায়নি বলে কি সিসিটিভি লাগানো বন্ধ করে দিতে হবে? যেনতেনপ্রকারেণ বিশ্ববিদ্যালয়কে বজ্রমুঠিতে পিষে ফেলতে হবে এবং নজরদারির নামে নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দিতে হবে— এই উদ্দেশ্যে হাস্যকর যুক্তি সাজিয়ে চলেছে মিডিয়া ও রাষ্ট্র। তবে এইসব হাস্যকর যুক্তির একটা প্রতিযুক্তিও হয়। রাষ্ট্রের নেতা ও মন্ত্রীরা জনগণের বেতনভুক কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষও ছাত্রছাত্রীসহ তাদের অভিভাবকদের কাছে দায়বদ্ধ। তাই ক্লাসরুম থেকে করিডরে যদি সিসিটিভি লাগানো হয়, তাহলে প্রত্যেক উচ্চ কর্তৃপক্ষের অফিসকক্ষে ও সংলগ্ন করিডোরেও তা লাগানো হোক। ছাত্রছাত্রীদের ইউনিয়ন রুম থেকে সেই সিসিটিভি অপারেট করা হবে। প্রত্যেক মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক, জনপ্রতিনিধির দপ্তরে সিসিটিভি থাকুক। যে এলাকার জনপ্রতিনিধি, সেই এলাকার কোনও প্রকাশ্য স্থানে বড় স্ক্রিনে দেখা যাবে তাঁরা কে কখন কী করছেন। সরকারি দপ্তরে বসে সিগারেট খাচ্ছেন কিনা, অধস্তনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন কিনা, তা দেখা যাবে। মন্ত্রীদের দপ্তরে লাগানো সিসিটিভি রাজ্যের প্রত্যেক জেলার বড় কোনও প্রকাশ্য স্থানে সকল নাগরিক দেখতে পাবে। জনগণের কি জানার অধিকার নেই যে, তাঁদের দ্বারা নির্বাচিত ও বেতনভুক নেতা-মন্ত্রীরা কখন কোন দুর্নীতি করছেন? কখন ঘুষ খাচ্ছেন, কখন দুষ্কৃতিদের সঙ্গে মিটিং করছেন, কখন পাল্টি খাওয়ার টাকা নিচ্ছেন, দপ্তরে বসে মদ্যপান বা ধূমপান করছেন কিনা। এই ব্যবস্থার ফলে নেতা-মন্ত্রীদের দুর্নীতি কমে যাবে— এমন সৎ আশা তো জনগণ রাখতেই পারেন। তাই না?

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে সিসিটিভিতে মুড়িয়ে দিতে, ছাত্রছাত্রীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে টিভি-চ্যানেল আর রাজনৈতিক দলগুলির যা তৎপরতা, তার সিকিভাগও যদি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থাভাব দূরীকরণে থাকত, তাহলে মঙ্গল হত। টিভি-চ্যানেলের প্রাইম-টাইমে বিগত তিন বছরে যাদবপুর কেন্দ্রীয় ও রাজ্য অনুদান থেকে অন্যায়ভাবে কেন বঞ্চিত হচ্ছে সেই বিষয়ে আলোচনাসভা বসালে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হত। বিজেপির মন্ত্রী সদলবলে বিশ্ববিদ্যালয় অভিযান করে জাতীয়তাবাদী ভাষণবাজি করার বদলে RUSA 2.0 প্রকল্পের বকেয়া টাকা মেটানোর ব্যাপারে তদ্বির করলে সমাজের প্রগতি হত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অতীতে অর্থাভাবে কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে, কতজন গবেষক নিয়মিত বৃত্তি পান না, কতগুলি প্রয়োজনীয় ইন্সট্রুমেন্টের জন্য বিজ্ঞান-বিভাগের গবেষণা ধাক্কা খাচ্ছে, সংবাদমাধ্যম এই বিষয়গুলি জনসমক্ষে আনে না। আনবেও না। দুটি কারণে— (১) এতে টিআরপি আর বিক্রি বাড়বে না কারণ খবরগুলি উত্তেজক ‘মুচমুচে’ নয়। আর (২) শাসকপক্ষ রেগে গিয়ে সংবাদমাধ্যমকে পোষা বন্ধ করে দেবে। অতএব, স্বঘোষিত ত্রাতা সেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মজনদের খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বিকৃতমনষ্কতা জাহির করাই শাসক ও তাঁবেদার সংবাদমাধ্যমের অস্তিত্বরক্ষার একমাত্র উপায়।

 

র‍্যাগিং-পরবর্তী ঘোলা জলে দক্ষিণপন্থার চাষ

গত ৯ আগস্ট প্রথম বর্ষের ছাত্রটির প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার পরে ফ্যাসিবাদী দল কয়েকদিন অপেক্ষা করেছিল— জল ঘোলা করে যাদবপুরে দক্ষিণপন্থার চাষ করবে বলে। ঠিক এক সপ্তাহ পরে ১৬ আগস্ট থেকে মাঠে নামল তারা। অহেতুক ধ্বস্তাধ্বস্তি আর অবান্তর স্লোগানবাজি হল— মূল উদ্দেশ্য অনস্তিত্বকে জবরদস্তি অস্তিত্বে বদলে দেওয়া। ১৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে শক্তিপ্রদর্শনের সমাবেশ করল ফ্যাসিস্ট নেতা, তাকে সঙ্গ দিল একই মতাদর্শে বিশ্বাসী একটি ছাত্র-সংগঠন। উল্লেখ্য এই ছাত্র-সংগঠনই জেএনইউ সহ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিকভার গণতন্ত্রপ্রেমী ছাত্রছাত্রীদের ওপরে হামলা চালানোয় অভিযুক্ত হয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারে এদের বক্তব্যে র‍্যাগিং-বিরোধিতা ছিল না। ছিল— (ক) বাম ছাত্রসংগঠনগুলির প্রতি বিদ্বেষ; (খ) ছাত্রটির মৃত্যুতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দায়ী করে উস্কানিমূলক বক্তব্য এবং (গ) দশ হাজারের বেশি লোক নিয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ক্ষেত্র দখল করার পরিকল্পনা। এদেরই আরেক নেতা যাদবপুরকে ‘বুট দিয়ে থেঁতলে’ ছাত্রছাত্রীদের ঠান্ডা করার নিদান হেঁকেছে।[5]

একটি বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ফ্যাসিস্ট নেতাকে ও ফ্যাসিবাদের চাষ করা সংগঠনকে প্রতিরোধ করল ১৭ আগস্ট। গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা মেনেই তারা ফ্যাসিস্ট নেতাকে কালো পতাকা দেখাল। বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্ট। প্রথম বর্ষের নির্যাতিত মৃত ছাত্রটির হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইছিল বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্টের সদস্যরা। তারা অগণতান্ত্রিক কোনও পদ্ধতি অবলম্বন করেনি, অসাংবিধানিক কোনও স্লোগান বা বক্তব্য দেয়নি। বরং সংবিধানকে দুমড়েমুচড়ে দিতে চাওয়া কেন্দ্রীয় শাসকের প্রতিনিধিকে প্রত্যাখ্যান করেছে কালো পতাকা দেখিয়ে। যাদবপুরের মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রাঙ্গণকে কলুষিত করার ফ্যাসিস্ট প্রচারোদ্দেশ্যকে প্রতিরোধ করেছে বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্ট। আর, প্রতিরোধের ঐতিহ্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইট-কাঠ-পাঁজরের ইতিহাসে লেখা আছে। ফ্যাসিস্ট গুণ্ডারা তাদের নৃশংসভাবে মারধর করল। একজন রূপান্তরকামী গবেষকের ওপরে নির্যাতন চালিয়ে রক্তাক্ত করল। সবটাই পুলিশ ও টিভি-চ্যানেলের সামনে। রাস্তার ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে। অথচ পুলিশ নির্যাতকদের গ্রেপ্তার না করে প্রতিবাদী ছাত্রদের তুলে নিয়ে গেল থানায়। তারপরে কতিপয় সংবাদমাধ্যমের ‘খেলা’ শুরু হল। বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্টকে জবরদস্তি ‘মাওবাদী নিষিদ্ধ দল’ তকমা সেঁটে হেনস্থা করতে লাগল। ছাত্র ফ্রন্টের এক প্রতিনিধিকে ‘টক শো’-তে ডেকে নিয়ে গিয়ে খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে ক্রমাগত বুলি করা ও র‍্যাগিং করতে লাগল। ছাত্রটির যুক্তিপূর্ণ উত্তরের প্রত্যুত্তরে মনগড়া ধারণা চাপিয়ে দিতে চাইল। আলোচনায় উপস্থিত অন্য বাম ছাত্রপ্রতিনিধিকে দিয়ে জবরদস্তি বলানোর চেষ্টা হতে লাগল যে, যাদবপুর ‘মদ, মাদক ও মাওবাদ’-এর আখড়া। বারবার প্রমাণ করতে চাইল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্রছাত্রী নির্বিশেষে সমাজের ঘৃণ্য অপরাধী। প্রথমত উপস্থাপিকা স্বঘোষিত বিচারক সাজতে চেয়ে ভুলে গেছেন কেরল উচ্চ আদালতের বিচারপতির রায়। শ্যাম বালকৃষ্ণন গিবালা বনাম কেরল সরকারের মামলায় উচ্চ আদালত রায় দিয়েছিল যে মাওবাদ দর্শনে বিশ্বাসের জন্য কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা যায় না, যদি না সত্যিই কোনও অবৈধ কার্যকলাপের যুক্তিশৃঙ্খলা পুলিশ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।[6] অথচ সংবাদ উপস্থাপিকা বারবার আউড়ে গেলেন আরএসএসের নেতা ও তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য। ঠারেঠোরে ইঙ্গিত করলেন যে বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্টের সদস্যদের ইউএপিএ-তে গ্রেফতার করা উচিত। আরএসএস হয়তো ক্যাম্পাসে নৈতিক পুলিশগিরি করার দায়িত্ব স্বঘোষিত বিচারক বনে যাওয়া টিভি-মিডিয়াকে দিয়েছে। অর্ণব গোস্বামীয় ঢঙে গলার শির ফুলিয়ে অতিনাটুকে চিৎকার আর বামপন্থী ছাত্রদের কথা শেষ না-করতে দিয়ে হুমকি দেওয়ার ঘিনঘিনে প্রথা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। এই ভাইরাসের প্রকোপে বহু নাগরিকের সুস্থচিন্তার ক্ষতি হচ্ছে। তাঁরা যৌক্তিক চিন্তাভাবনা আর মানবিক সহানুভূতি ভুলে যাচ্ছেন। আধো জানাবোঝা থেকে, কখনও বা না-জানার পরিসরে দাঁড়িয়ে অভিযুক্ত করে দিচ্ছেন সমগ্র যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীসমাজকে। বেনামী প্রোফাইল থেকে তো বটেই, স্বনামী প্রফাইল থেকেও ছাত্রছাত্রীদের আক্রমণ করছেন, বিকৃত প্রশ্ন করছেন, কুরুচিকর মিম বানাচ্ছেন, প্রকারান্তরে ‘র‍্যাগ’ দিচ্ছেন। না, এইভাবে সমাজের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হয় না। বরং র‍্যাগিং-সংস্কৃতি আর ‘মব-লিঞ্চিং’ প্রবণতা বহমান থাকে। আর, ফ্যাসিস্ট শাসনের সুবিধা হয়ে যায় এর ফলে। নাগরিককে সহনাগরিকের বিরুদ্ধে অবান্তর উন্মাদনায় লড়িয়ে দিতে পারলে শাসনকাঠামো পোক্ত হয়। শাসিত আদতে শাসনের বিষয়ীসত্তা হয়েই থেকে যায়। বাণিজ্য বাড়ে কর্পোরেট মিডিয়ার।

আপাতত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য করা হল যাঁকে, তিনি আরএসএসের বঙ্গীয় অধ্যাপক সংগঠনের অন্যতম নেতৃত্ব— এমনটাই অভিযোগ উঠেছে।[7] এই অভিযোগ সত্যি হলে দক্ষিণপন্থার জবরদস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাকে আহত করবে অচিরেই। পরপর বেশ কদিন দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অভিযান’ করবে। নতুন নতুন ইউনিট আর শিবির খুলে যাবে। উস্কানিমূলক বক্তব্য আর যাদবপুরের সংগ্রামী ঐতিহ্যকে অবমাননা করার রেওয়াজ বাড়বে। তাদের আস্ফালনে দুটি জিনিস থাকবে না— (১) র‍্যাগিং নামক ঘৃণ্য প্রথাকে সমূলে উৎখাত করার আন্তরিক চেষ্টা। আর, (২) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সমস্যা দূরীকরণের নিঃস্বার্থ উদ্যোগ।

 

পরিণতি?

Hope is good thing, maybe the best of things, and no good thing ever dies.

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ঐতিহ্য নিয়ে শুরুতে অল্প কথা লিখেছি। স্বদেশি থেকে বিপ্লবী আন্দোলন, উপনিবেশকালের অধিকারার্জনের লড়াই থেকে খাদ্য আন্দোলন নকশাল আন্দোলন লালগড় আন্দোলনের লড়াই— বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা উজ্জ্বল। আশু মজুমদার, তিমিরবরণ সিংহের যাদবপুর কমিউনিস্ট মতাদর্শগত রাজনীতির সক্রিয় চর্চা করত। ষাট-সত্তর দশকের সেই অনুশীলনে যাদবপুর-বাঘাযতীন এলাকার মানুষের নয়নের মণি ছিলেন নকশালরা। শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার পাশাপাশি মদবিরোধী অভিযান, লুম্পেনবিরোধী অভিযানে আশেপাশের বস্তি অঞ্চলের মানুষকে মেতৃত্ব দিতেন তাঁরা। নিপীড়িত অসহায় মানুষের স্বরের প্রতিধ্বনি জোরদার করে তোলায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা তাদের অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করবে না! জয়ন্ত জোয়ারদারের ‘জয় পরাজয়’ গল্পে[8] যাদবপুর ছাত্রাবাসের সংগ্রামী ইতিহাসের এক ঝলক রয়েছে। নকশাল কমিউনিস্টরা (যাদবপুরের ছাত্র তথা হস্টেলের আবাসিক) পোদ্দারনগরে স্টাডি ক্লাস করাতে যাচ্ছে, শ্রমিক মহল্লায় সংগঠন করছে, সিআরপিএফ হস্টেল আক্রমণ করার পরে পোদ্দারনগর বস্তির মানুষ সিআরপি-পুলিশকে প্রতিরোধ করছে— এই ছিল বাস্তবতা। হস্টেল আর ক্যাম্পাসে লাল পতাকার রাজনীতি শাসনযন্ত্রের বুকে কাঁপন ধরিয়েছিল কারণ নিপীড়িত মানুষ, শ্রমজীবীদের সঙ্গে নিয়ে রাজনীতির জীবন্ত অনুশীলন ছিল। এরকম একটা মাথা-উঁচু ক্যাম্পাসে এখন র‍্যাগিং-এর মতো বর্বরতা ‘প্রথা’ হয়ে থাকে কী করে? যাদবপুরের ছাত্রবাসের বিরুদ্ধে আশেপাশের বসতি থেকে ইদানীং বহু অভিযোগ উঠে আসে। পোদ্দারনগরের বাসিন্দারা ছাত্রাবাসের কিছু ছাত্রের আচরণে অতিষ্ঠ। এতটা অবক্ষয় হল কী করে? দুটি কারণে— (ক) ছাত্রবাসে আধিপত্য করা কিছু মাতব্বরের ভূমিকা, যাদের অধিকাংশ কোনও না-কোনও সংসদীয় দলের ছত্রছায়ায় থাকে। (খ) বিগত দু-তিন দশকে নিরাজনীতির মাত্রাছাড়া আধিপত্য বিস্তার, শাসকশ্রেণি তাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইন্ধন জোগায়।

ছাত্রাবাসের মাতব্বরদের জন্য অতীতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি র‍্যাগিং-এর অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ হয় উদাসীন থেকেছে নয়তো ভুবনের মাসির মতো না-দেখার ভান করে থেকেছে।[9] একাধিক ছাত্র এবং অধ্যাপকের স্মৃতিকথন থেকে তা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক ছাত্রমৃত্যুর ঘটনায় কিছু মাতব্বরের ভূমিকা এবং একটি নির্দিষ্ট দক্ষিণপন্থী দলের ছত্রছায়া প্রায় সবাই এতদিনে জেনে গেছে। আর, নিরাজনীতির আধিপত্য বামপন্থী ছাত্রছাত্রী-আন্দোলনকে দুর্বল করে দিয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে সংগঠিত বামপন্থী ছাত্ররা র‍্যাগিং, ইন্ট্রো, মানসিক নির্যাতনের মতো বহু অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে। প্রগতিশীল প্রচার চালিয়ে র‍্যাগার ‘দাদা’-দের মৌরসিপাট্টা ভেঙেছে। বিপ্লবী বামপন্থী ছাত্রধারার সদস্যরা রাজনৈতিক সচেতনতার পাশাপাশি র‍্যাগিং-বিরোধী মতামত গড়ে তুলেছে। যতদিন পর্যন্ত এই রাজনীতি আধিপত্য করেছে, ছাত্রাবাসে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার বন্ধ থেকেছে বা ‘র‍্যাগার’ মানসিকতা প্রশ্রয় পায়নি।[10] নিরাজনীতির প্রাবল্যেই বাংলার ছাত্ররাজনীতিতে উদয় হয়েছিল ‘অরাজনৈতিক’ মুখোশধারী কিছু সংগঠনের। সংগঠিত বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনকে বিষিয়ে দিতে এরা কখনও পতাকাবিহীন মিছিল জড়ো করেছে, কখনও কাঠামোহীন সংগঠনের জনতোষী প্রচার করেছে আবার কখনও উপর্যুপরি জেনারেল বডি মিটিং করে গেছে আশু প্রতিবাদী সিদ্ধান্তকে ঘেঁটে দিতে। যাদবপুরের মেন হস্টেলে থাকা একাধিক ছাত্র, যারা গত দশকে পাশ করে বেরিয়েছে, তারা তাদের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছে। ছাত্রখুনের ঘটনার পরে ‘এই সময়’ সংবাদমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, সেখানে এই না-সংগঠনের অনেক কীর্তি উঠে আসে।[11] সামগ্রিক প্রতিস্পর্ধী ছাত্র রাজনীতির জন্য এই না-সংগঠনিক অরাজনীতি বিপজ্জনক প্রতীয়মান হয় ওই প্রতিবেদনটি পড়ে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্রেই এদের দাপট বহু ন্যায্য স্বরকে বহু সময় দাবিয়ে দিয়েছে। ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’-র মুখোশের আড়ালে আদতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে অনভিপ্রেত কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় দিয়েছে। বিগত এক দশক ভারতীয় তথা বাংলার রাজনীতির জন্য সুসময় নয়, শাসকবিরোধী ক্ষোভ প্রশমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের বাড়াবাড়ি সক্রিয়তা স্পষ্ট। ছাত্র আন্দোলনও খানিক দিশাহীন। সেই সুযোগে আরও আধিপত্য বাড়িয়ে নিয়েছে নিরাজনীতির চর্চা করা এহেন সংগঠন, যাদের মূল লক্ষ্য বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনের সর্বনাশ করে শাসকের মুঠো মজবুত করা। র‍্যাগিং-বিরোধিতার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীরা যদি এই না-সংগঠন ভাইরাসের প্রতিষেধক বের না করতে পারে, তাহলে নিরাজনীতির চর্চা আরও বাড়বে। অনভিপ্রেত ঘটনা বাড়বে। বর্বর প্রথার চর্চা নির্মূল হবে না।

সংসদীয় দলগুলির ছাত্রসংগঠনগুলি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি দখলের আশায় বাঁচছে। ছাত্রছাত্রীরা আশা করে আছে সুস্থ স্বাভাবিক ক্যাম্পাস-জীবন ফিরে পাবে। অধ্যাপকরা আশা করে আছেন যাদবপুরের মাথার ওপর থেকে মেঘ সরে গিয়ে মুক্তশিক্ষার চর্চা আরও উজ্জ্বল হবে। গবেষকরা আশা করে আছেন তাঁদের গবেষণায় প্রতিষ্ঠানের নাম উজ্জ্বল হবে এবং গবেষণার যথাযথ বরাদ্দ অর্থে আর্থিক সঙ্কট কাটবে। আর, শাসক আশা করে আছে যাদবপুরের স্পর্ধা গুঁড়িয়ে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠরোধ করে ‘তোতাকাহিনি’-র বাস্তব প্রয়োগ ঘটাবে। যাদবপুরের আত্মজনদের আশা, যাদবপুরের সংগ্রামী ঐতিহ্য, রাজনৈতিক সদর্থক ইতিহাস এবং স্বাতন্ত্র্যের অনুশীলন আরও উৎকর্ষের দিকে নিয়ে যাবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এমন বহু আশা-আকাঙ্খা-স্বার্থান্বেষণ-সদিচ্ছার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অনেক অবাঞ্ছিত কাদা আর বানানো খবরের গালিগালাজ শরীরে সয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকবে। আশু-তিমিরের যাদবপুর। সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক জনমত সংগঠিত করা যাদবপুর।

তবে, যাদবপুরের এইবারের লড়াইটা শুধু বহির্শত্রুদের বিরুদ্ধে আর রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের বিরুদ্ধে নয়, নিজের বিরুদ্ধেও। অভ্যন্তরীণ বহু কু-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। নিরাজনীতির দাপুটে আধিপত্যের বিরুদ্ধে। কতিপয় ছাত্রছাত্রীর বেলাগাম স্বেচ্ছাচারী অনুশীলনের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রচ্ছন্ন থাকা ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক লড়াই। দীর্ঘ লড়াই, কঠিনও। কিন্তু, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহ্য, ইতিহাস আর সমকালীনতার মেলবন্ধনে সঙ্কটের মেঘ ছিঁড়েখুঁড়ে আলোর দিশা দেখাবে বরাবরের মতো— এই আশা রাখাই যায়।


[1] Jaiswal, Anuja. Nursing student found hanging in Mathura’s RK Mission hostel. TOI. 7 Oct, 2021.
[2] Student dead in room. TT online. 17 May, 2013.
[3] Sharma, Priyanka. Act against ragging, medical colleges told. Mint. 8 Jun, 2023.
[4] Sanjay. Rage On Campus: Why ragging persists in medical and dental colleges in India. Careers 360. 19 Apr, 2022.
[5] এই একই হিংস্র নেতা ২০১৯ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে বালাকোটের মতো সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে ছাত্রছাত্রীদের চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
[6] The Bench added that the freedom of an individual to embrace a particular political ideology was an aspect of his/her fundamental right to personal liberty…। আদালত এই মামলায় বালকৃষ্ণনকে হেনস্থা করার জন্য পুলিশকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করে। আগ্রহী পাঠক উপর্যুক্ত রায়দানের ব্যাপারে জানতে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়ে সংবিধান প্রদত্ত অধিকার সম্পর্কে অবহিত হতে এটি পড়তে পারেন— STATE OF KERALA v. SHYAM BALAKRISHNAN GIMLA.
[7] কস্তূরী বসুর ফেসবুক পোস্ট। ২১ আগস্ট, ২০২৩।
[8] ‘প্রতিবাদের গল্প: নকশালবাড়ি’। সম্পা. পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাধন চট্টোপাধ্যায়। র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। পৃ- ১৩০-১৪২।
[9] চন্দন বিশ্বাসের ফেসবুক পোস্ট। ১২ আগস্ট, ২০২৩।
[10] অভিজ্ঞান সরকারের ফেসবুক পোস্ট। ১২ আগস্ট, ২০২৩।
[11] চট্টোপাধ্যায়, শর্মিষ্ঠা। বহু সম্ভাবনার মৃত্যুতে কাঠগড়ায় ‘কালেক্টিভ’। এই সময়। ১৪ আগস্ট, ২০২৩।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4758 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...