অণুগল্প নিয়ে এত বিতর্ক কেন

অণুগল্প নিয়ে এত বিতর্ক কেন -- বিলাল হোসেন

বিলাল হোসেন

 


লেখক কবি, অণুগল্পকার; অণুগল্পের প্রচার ও প্রসার আন্দোলনে যুক্ত

 

 

 

 

পূর্ব প্রসঙ্গ: অণুগল্পের প্রকৃতি এবং লিটল ম্যাগ

অণুগল্পের জয় পরাজয়

অণুগল্প সম্পর্কিত আলোচনায় নিজস্ব মতামত থাকবে। মতামতের পেছনে অণুগল্পসংলগ্ন যুক্তিও থাকবে। একইভাবে অণুগল্প যে একটি আলাদা এবং বৈশিষ্ট্যযুক্ত ঘটনা সেটা ভেবে এবং মেনে নিয়েই যদি আলোচনা হয় তবে লেখকের যে ভাবনাটা উঠে আসবে সেটা হবে অণুগল্পের জয়। আমরা অণুগল্পের জয় চাই।

আমাদের মধ্যে অনেক অণুগল্পকার আছেন। তাঁরা নিজেরাও বিশ্বাস করেন তাঁরা ‘অণুগল্প লেখেন। কিন্তু তাঁরা অণুগল্প সম্পর্কিত তেমন আইডিয়া/ধারণা দিতে চান না। তাঁদের লিখিত অণুগল্প কেন অণুগল্প সে ব্যাপারে মুখ খুলতে নারাজ। আমি নিজে মাঝেমধ্যে আমার লিখিত অণুগল্পের কিছু কিছু চারিত্র্যলক্ষণ তুলে ধরার চেষ্টা করি। যদিও অনেকেই এতে গোঁসা হন, এতে অবশ্য আমার কিছুই আসে যায় না। তাঁরা গোঁসা হন, আমার কথাগুলি তাদের কানে খুব বাজে। আমার চিন্তার সঙ্গে তাঁদের চিন্তা খাপ খায় না। কিন্তু কোথায় কোথায় খাপ খায় না— সেসব না বলেই তাঁরা রাগ করেন। আমি অনেক ভেবে একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছি, তাঁরা অণুগল্পের একটি কমন লক্ষ্মণ ‘স্বল্পায়তন’ ছাড়া আর কোনও বৈশিষ্ট্যকেই গ্রহণ করতে রাজি না; আর কোনও লক্ষণে তাঁরা বিশ্বাস করেন না। যদি ‘স্বল্পয়াতন’ই হয় এর একমাত্র বিষয় তাহলে আমার বলার কিছুই নাই একরাশ দুঃখ ছাড়া। অণুগল্পের কপালে জয় না, পরাজয়ই হবে এর শেষ ঠিকানা।

 

অণুগল্পের সারাংশ বলতে কিছু থাকে না

একটি বিষয় লক্ষ করা গেছে, নিবন্ধকার ছোটগল্পের ওপর কোনও আলোচনা করতে গিয়ে অবধারিতভাবে আলোচনায় উল্লেখিত ছোটগল্পের সারসংক্ষেপ নিজের মত করে নিজের ভাষায় প্রবন্ধ-পাঠকদের উদ্দেশ্যে একবার লিখে থাকেন। পাঠকের ছোটগল্পটি অপঠিত থাকলেও প্রবন্ধালোচনাটি যেন বোধগম্য হতে কোন সমস্যা না হয়। অন্যদিকে, কোনও অণুগল্প আলোচনাকালে এ-ধরনের নিজ ভাষায় সারাংশ লিখে পাঠকদের বোঝানোর পদক্ষেপ নেওয়ার কোনও সুযোগ নাই। কারণ লেখক অণুগল্পটিকে এমনভাবে লিখে থাকেন, এর শিরোনাম থেকে শুরু করে শেষ শব্দটি পর্যন্ত এমন একেকটি ইঙ্গিতের ভার বহন করে যে, তাকে যথাযথ শব্দটিই লিখতে হবে। এর স্তবক, শব্দ, বাক্যের বেলায়ও একই অণুগল্পীয় রহস্য থাকে, তাকে অবহেলা করে নিজ ভাষায় কোনও সারাংশ রচনা করে পাঠকের বুঝের মধ্যে আনাটা বিরাট সমস্যা। আর এই সমস্যা থেকে উত্তরণের একটাই পথ— সমগ্র অণুগল্পটির আগাপাশতলা একই সঙ্গে উল্লেখ করা।

 

যারা অণুগল্পকে খুঁজে বেড়ান রবীন্দ্রনাথে

যেসব অণুগল্পকার, অণুগল্পপ্রেমী, বা বিদ্বেষী আছেন যারা অণুগল্পকে তিনবেলা অভিশাপ দিয়ে বেড়ান অথবা ওই শ্রেণি, যারা অণুগল্পকে খুঁজে বেড়ান রবীন্দ্রনাথে— তার লিপিকায়;— সবার জ্ঞাতার্থে এর আগে সচেতন করার লক্ষ্যে বহুভাবে আলোচনা করার মাধ্যমে তাদের সেই অজ্ঞতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি। আশা করছি সে-চেষ্টাগুলি খুব হালকা পলকা ছিল না। তবু আজ আবার একটি পদক্ষেপ নিচ্ছি।

একথা অনেকেই বলে একটি তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন— অণুগল্প নতুন কিছু না। রবীন্দ্রনাথ এর আগে তার ‘লিপিকা’ গ্রন্থের মাধ্যমে অণুগল্পের চর্চা করে দেখিয়েছেন। তাদের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ নিজে কী বলছেন সেইটাই তার বয়ানে উদ্ধৃত করব আজ। আধুনিক গদ্যকবিতার প্রবর্তক কীভাবে নিজে এই জগতের মধ্যে ঢুকলেন তার বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা আছে তার গদ্যকবিতার প্রথম বই ‘পুনশ্চ’-র ভূমিকাংশে। আর অই ভূমিকাতেই রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করে নিয়েছেন লিপিকা হল গদ্যকবিতায় প্রবেশের একটি পরীক্ষা মাত্র। আসুন ভূমিকাটি পড়ি।

পুনশ্চ-এর ভূমিকা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গীতাঞ্জলির গানগুলি ইংরেজি গদ্যে অনুবাদ করেছিলেম। এই অনুবাদ কাব্যশ্রেণীতে গণ্য হয়েছে। সেই অবধি আমার মনে এই প্রশ্ন ছিল যে, পদ্যছন্দের সুস্পষ্ট ঝংকার না রেখে ইংরেজিরই মতো বাংলা গদ্যে কবিতার রস দেওয়া যায় কি না। মনে আছে সত্যেন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেম। তিনি স্বীকার করেছিলেন, কিন্তু চেষ্টা করেন নি। তখন আমি নিজেই পরীক্ষা করেছি, লিপিকা’র অল্প কয়েকটি লেখায় সেগুলি আছে। ছাপবার সময় বাক্যগুলিকে পদ্যের মতো খণ্ডিত করা হয় নি, বোধকরি ভীরুতাই তার কারণ।

তার পরে আমার অনুরোধক্রমে একবার অবনীন্দ্রনাথ এই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। আমার মত এই যে, তাঁর লেখাগুলি কাব্যের সীমার মধ্যে এসেছিল, কেবল ভাষাবাহুল্যের জন্যে তাতে পরিমাণ রক্ষা হয় নি। আর-একবার আমি সেই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছি।

এই উপলক্ষে একটা কথা বলবার আছে। গদ্যকাব্যে অতিনিরূপিত ছন্দের বন্ধন ভাঙাই যথেষ্ট নয়, পদ্যকাব্যে ভাষায় ও প্রকাশরীতিতে যে একটি সসজ্জ সলজ্জ অবগুণ্ঠনপ্রথা আছে তাও দূর করলে তবেই গদ্যের স্বাধীন ক্ষেত্রে তার সঞ্চরণ স্বাভাবিক হতে পারে। অসংকুচিত গদ্যরীতিতে কাব্যের অধিকারকে অনেক দূর বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, এই আমার বিশ্বাস এবং সেই দিকে লক্ষ রেখে এই গ্রন্থে প্রকাশিত কবিতাগুলি লিখেছি। এর মধ্যে কয়েকটি কবিতা আছে তাতে মিল নেই, পদ্যছন্দ আছে, কিন্তু পদ্যের বিশেষ ভাষারীতি ত্যাগ করবার চেষ্টা করেছি। যেমন, তরে, সনে, মোর, প্রভৃতি যে-সকল শব্দ গদ্যে ব্যবহার হয় না সেগুলিকে এই-সকল কবিতায় স্থান দিই নি।

 

অণুগল্প নিয়ে এত বিতর্ক কেন?

‘অণুগল্প’ শব্দটাই বিতর্কের প্রথম বীজটি রোপণ করেছে। অণুগল্প শব্দের সাধারণ অর্থ হল— ক্ষুদ্র/ছোট/খুদে গল্প। অর্থাৎ অণুগল্প মূলত ছোট আকারের একটি গল্প। তাই সর্বসাধারণের মাঝে এই কথাই চাউর হয়েছে। আর এই সরলীকরণে সাধারণ পাঠক যেমন বিভ্রান্ত হয়েছে একইভাবে যারা অণুগল্প লিখছেন— সেইসব লেখকরাও রীতিমত বিভ্রান্ত হয়েছেন।

আর এই কারণেই যাঁরাই ছোট আকারের গল্প লিখেছেন তাঁদের গল্পকেই অণুগল্প আখ্যা দিয়ে ফেলছেন। একটা ছোট্ট সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা দেখতে পারি। ইংরেজির দুটো শব্দ নিই। একটি হল— হোল, অন্যটি— ব্ল্যাক। এ-দুটোকে বাংলায় আলাদা আলাদা তরজমা করলে হয়— গর্ত, অন্যটি— কালো। আমাদের আশেপাশে অনেক গর্ত দেখতে পাওয়া যায়। যাদের ভেতরটা দেখতে কালোই হয়। কিন্তু এই শব্দ দুটোকে যদি আগুপিছু করে নেই তাহলে শব্দটি দাঁড়ায়— ব্ল্যাকহোল। এখন এই ব্ল্যাকহোলের সঙ্গে আমাদের এলাকায় ব্ল্যাকহোলের তুলনা নিশ্চয়ই আপনি করবেন না।

অথবা ধরা যাক, একজন ব্যক্তির নাম জজ মিয়া। লোকটা নাইন্দাইল নামক এক গ্রামে থাকে, পান খায়, মাথায় টাক। অন্যদিকে আমরা সবাই জানি, বিচারিক কাজে নিম্ন আদালতের বিচারপতিকেও জজ বলে সম্বোধন করা হয়। এটি একটি সাংবিধানিক গুরুত্বপুর্ণ পদ। কেউ কিন্তু কখনওই ভাবেন না যে নাইন্দাইলের জজ আর নিম্ন আদালতের জজ একই বিষয়।

পানখাওয়া টাকপড়া যেমন জজ নয় একইভাবে ব্ল্যাকহোল আর এলাকার কালোগর্ত একই বস্তু নয়। অণুগল্পের ব্যাপারটা অনেকটাই এইরকম। অণুগল্প মোটেও সাধারণ কোনও শব্দ নয়। এটা একটা পরিভাষা। শব্দটিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে দরকার টিকা-ভাষ্য। শুধুই খুদে গল্প/ক্ষুদ্রগল্প বা ছোট আকারের কোনও গল্প বলে দেওয়াটা অজ্ঞতা। এই অজ্ঞতা কাটিয়ে দ্রুত আপডেট হওয়ার সময় এসেছে। তাঁদের জানা দরকার অণুগল্প একটা নির্দিষ্ট তত্ত্বের ওপর দাঁড়ানো একটি বিষয়। দিনে দিনে তত্ত্বটির গ্রাভিটি বলয় বেড়েই চলেছে।

 

চলবে

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.