প্রবঞ্চক ঋতু

প্রবঞ্চক ঋতু -- যশোধরা রায়চৌধুরী

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

এ বড় প্রবঞ্চক ঋতু হে, সামাল সামাল।

গাছের তলার ছায়াটি ভারি মনোরম। উষ্ণতা বিথারি সূর্য ওপরে উঠেছে যদিও। সবুজের কানাতের তলায় কুঞ্জে, এক গভীর ছায়ান্তরাল বানিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। সে সূর্য থেকেই পান করে স্রোত। অথচ কী সাহস তার। সে সূর্যের বিপরীতে কাজ করে। তাপের বদলে,  ছায়া দেয়। ছায়াদায়ী তরুর তলায় মানুষ আশ্রয় নেয়। স্বপ্ন দেখে। সবুজ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয় সূর্যস্তব করতে করতে। মানুষের স্বপ্ন, দ্বিপ্রাহরিক, তপ্ত আঁচে বসানো ক্ষীর জ্বালের মত গাঢ় হয়।

বালক, তরুণ, কয়েকটি যুবা, ওরা স্থির বসে থাকে কুঞ্জে। স্তব্ধ দুপুরের কুব কুব দূরাগত পাখপাখালির ডাকের ভেতর স্নান করে। ওদের চিন্তা অনেক দূর অব্দি ব্যাপ্ত হয়। ওরা ভাবে, ভাবে। ভালো ফোনের কথা ভাবে। ভালো খাবারের কথা ভাবে।

ওদের চিন্তার ভেতরে খেলাধুলো, ময়লা আছে। ওদের চিন্তার ভেতর আশাআকাঙ্ক্ষা আছে। অনেক বিষয়ের পাশে পাশে নারীও আসে। নারী কী তা জানে না। মানে নারী অর্থে না। জানে মা মাসি কাকি। জানে বৌদি অব্দি। নিজেদের নারী, নাহ। ফুচকার তেঁতুলজল জানে, জানে লুকনো বিড়ির টান, সুখ।

ওদের চিন্তায় ফুটবল ক্রিকেট রাজাগজা সীমান্তের যুদ্ধও আছে। তবু যেন অনেকটা অবকাশ পড়ে আছে।

তারক মানিক বিকাশ আর বিধানের নানা বয়স। মন একইরকম। আলস্যের সময়ে ওরা রোদ্দুর দেখে। ওরা গাছ, ছায়া, আকাশ ঘুড়ি ইত্যাদি দেখে। ঘুড়ির লড়াই, মোরগের লড়াই এমনকি পোষা কুকুর লড়িয়ে দেওয়াটাও ওদের ভালো লাগা। চিন জাপান ভারত তিব্বত কাশ্মির যুদ্ধুযুদ্ধু খেলা এসব অনেক দূর থেকে ভেসে ভেসে আসে। ওয়াটস্যাপে আসে।

মানিকের বাবা টোটো চালায়। মানিক বাবা টোটো গ্যারেজ করলেই তা নিয়ে বেরুবে। বাবা ষাট হাজার ধার করে টোটো নিয়েছে। লাইন কিনেছে আরও এক লাখে। সে ধার শোধ হতে হতেই জেবন শেষ হবে। অথচ মানিক বাবাকে লুকিয়ে টোটো বের করে। একদিন নয়ানজুলিতে নেমে গিয়ে টোটোর ওপরে শৌখিন ফাঁদালো পেলাস্টিকের কাপড়ে ছ্যাঁদা ছেঁড়া ফাটা হয়েছে। সে কী কেচ্ছা।

এ বড় প্রবঞ্চক বয়স। ষোলর এধার ওধার।

বিধানদের চাষ আছে। বিধানের দাদা পড়ে ভালো। লেখাপড়ায় বাড়ির এক ছেলে লাগলেই হল। বাকিরা বাবা মায়ের কাজে হাত লাগাক। বোনটা অনেক কাজ করে বাড়ির। বিধান করে করে, আবার পালায়। কুঞ্জে এসে হাতেখড়ি দেয় দুষ্টুমির। বাবার মার অনেক খেয়েছে। তবু শেখে না। কাজ করে, মন উড়ে যায় ওর। এভাবে কতদিন আর উড়বে ও কে জানে। মা বলেছে পিঠে চ্যালাকাঠ ভাঙবে। কাজ এবার বেশি করতে হবে বিধানকে। কু অব্যেস কু সঙ্গ ছাড়তেই হবে।

বোন গায়ে গতরে বেড়ে উঠছে, মা ওকে ইশকুলে যেতে দিতে চায় না। আবার বলে মাঠে, ক্ষেতে, বাইরের কাজেও আর পাঠাবে না। যখন ছোট ছিল, বিধান আর তার বোন হাওয়াই চটি ফটফট করে দূর মাঠে বাবাকে খাবার দিতে যেত। এখন সে দায় বিধানের, তেতো খাওয়া মুখ করে বিধান সে কাজ করে, কারণ কন্যাশ্রীর সাইকেল আসার পর বোন ইশকুলেও যায়। যদিও বাড়িতে গোবর দিয়ে ঘুঁটে দেওয়া কাঠকুটো কুড়নো উনুন ধরানো সব খেলতে খেলতে শিখে গেছে বালিকা। তরু নাম তার। তারও স্মার্টফোন চাই বলেছে দাদাকে। দাদার যেটা আছে ওইটা নিয়ে বোন মাঝে মাঝে দেখে। দাদা আর বোনে চক্কান্তো করে বিধানকে কোনওদিন ফোন দেয়নি হাতে। হুঁহ্‌ বিধান কি আর জানে না, এসবের মানে। লেখাপড়া করোনি তাই তুমি একঘরে। ধোপানাপিত বন্দো।

বোন বলেছে দাদাকে, দাদা  চাকরি পেলে ওর নিজের জন্য ফোন নেবে। দাদা পড়ার প্রায় শেষ করেছে এদানী। কাছেই মফস্বলে যায়, টিউশন পড়াতে। বোনকে সন্ধেবেলা পড়ায়। বিধান মেজ তাই ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা। যেন ওর আর কিছু হবে না। ও মুখ্যু হয়ে থাকবে। বিধানও তাই আড্ডা দেয়। ঘুরেঘেরে বেড়ায়। কিচ্ছু ভালো লাগে না। বাবাকে খাবার দিতে ইস্টিলের টিপিন কৌটো নেয় যখন, রাগে গরগর করে। একদিন তো বাবার খাবার খুলে তাইতে এক দলা থুথুও দিয়েছিল। বোকা বাবাটা বুঝতেও পারেনি। খেয়ে নিয়েছে। পরে বিধানেরই গা গুলোচ্ছিল। বাবাটার জন্য কষ্ট হচ্ছিল। বাবার কাছে সবাই সমান ওরা। বরং বিধানকে ভালোবাসে বাবা। বাবাও তো বেশি পড়েলেখেনি।

আকাশ গাঢ় নীল। দূরে ইটভাঁটার ধোঁয়া দেখে ওরা। বলকে বলকে ধোঁয়া। আরও দূরে হাইরোডে উঠে পড়লে দেখা যাবে বড় কোম্পানির বড় কারখানার শেড, দেওয়াল। সেখানে মাঝে মাঝে সাদা আর মাঝে মাঝে কালো ধোঁয়া। সাদা ধোঁয়া কেমিকেলের ধোঁয়া।

নীল আকাশে তুলি বুলিয়ে এসব বড় চিমনি ছোট চিমনিরা দাঁড়িয়ে থাকে। দেখে দেখে বিকাশের হাসি পায়। বলে দেখ দেখ যেন ছোটকা আর বড়কা, লম্বা আর বাঁটকুল, বাস স্টপে দাঁইড়ে দাঁইড়ে সিগারেট ফুঁকছে।

আকাশের নীল নাকি এসব ধোয়াঁতে কালিপারা হয়ে যায়? ওরা ভয়ের গল্প শোনে, পড়ে। ওদের ভয় বাড়িয়ে দেয় পৃথিবীর খবর। কতরকম খবর সব আসে ফোনেতে। উত্তরমেরুর তিমিমাছ কেরালার হাতি। কোথায় সায়েবদের দেশে অজানা অসুখে মরে যাচ্ছে লোক ধপাধপ করে।

 

এ বড় প্রবঞ্চক সময়। সেই অজানা অসুখ পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে কেরমশ কেরমশ। হঠাৎ জানা গেল সে অসুখ নাকি আমাদের দেশেও এসেছে।

গাছের ছায়ায় বসে ছেলেরা কখনও কখনও নোংরা ভিডিও দেখে, মেয়েমানুষের ভিডিও, কুড়ি টাকা দিলে পানওলা দেবে চক কলোনির মোড়ের। ঘড়িঘরের কাছে রিকশ স্ট্যান্ডে রিকশকাকুদের একজন তারকের দাদার সঙ্গে বিড়ি খায় সেও বলেছে। কালবোশেখি, নারকেল গাছের মাথায় বাজ পড়ে গাছ জ্বলে যাওয়ার ভিডিও আর একটা মেয়ের কাপড় খুলে নেওয়ার ভিডিও সব দিয়েছে তারকের দাদার ফোনে। সেই ফোন নুক্কে নুক্কে নিয়ে এসেছে তারক আজ।

মুখোশ পরা সব লোকেদের দেখা যায়, ডাক্তারদের দেখা যায়, তারা বলে অসুখের গল্প। বলে তিন মাসে সারা পৃথিবীর অদ্ধেক লোক নাকি মরে যাবে যদি নীল নীল মুখোশ না পরো। কী কেলো! এসব অধর্মের ফল। বলেছে বিধানের ঠাকমা। বুড়ি শুয়ে পড়েছে কোমর ভেঙে আর সেই ইশতক গালির বন্যা, অভিশাপের তোড়। ধম্মে সইবে না, বুড়ি বলতে থাকে সব শুনে। বলেছে বিধানের কাকা নাকি অনেকদিন আগে বিধানের বাবার সঙ্গে তুলকালাম করে বাড়ি থেকে চলে গেসল মুম্বইতে কাজ করতে। সেই থেকে ঠাকমার মনে হয় একটা পাঁজরের হাড় নেই। সেই থেকে ঠাকমা ভাবে বিধানের মা বেটিই যত নষ্টের গোড়া, কাকাকে তাড়িয়েছে সে-ই।

কাকা গোল গোল হাতরুটি বানায়। বলের মত নরম, মাখন মাখন ময়দার তাল আকাশের উড়িয়ে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বানায় লম্বা লম্বা রুমাল রুটি। এইসব করে সে মুম্বইতে ভালো আছে। সব জেনেও বিধানের ঠাকমা গাল দেয় তার মাকে। শয়তানি, তোরা সব হড়পেছিস। আমার কোলের ছ্যেল্যেটাকে ঠকিয়েছিস।

মার্চের একদিন সেই অসুখটাকে তাড়ানোর যজ্ঞ হল মঠে। সবাই সেদিন থালা বাসন কাঁসর ঘন্টা বাজাতে বাজাতে মাঠে ঘুরল, ঘরের ভেতর থেকে বাইরে এল, উঠোনে দাঁড়াল। তারপর দিন হঠাৎ সরকার বলল, সে অসুখের জন্য সব বন্ধ। পেলেন টেরেন বাস।

কেউ আর পথে বেরুতে পারবে না। সবাই ঘরে থাকো।

রোগটার নাম করোনা। ফাগুন চোতের কড়কড়ে রোদ্দুরে কুঞ্জপথ ঝলসে থাকে। কেউ কেউ বলে রোদে করোনা মরে যায়। দাদা বলে ওসব ভুল কতা, আসলে  বীজাণু সব, গোল গোল মত। জলে ফোটালে মরে, কিন্তু গায়ে তো ফুটন্ত জল কেউ ঢালে না। অন্যথা এসব বীজ কিন্তু কেউ চোখে দেখতে পায় না। সবার হাতে হাতে নাকি সে ঘোরে তাই হাত ধুতে হবে। বাড়িতে সাবান একটাই, কোণে পড়ে থাকত। এখন বাবা তা নিয়ে টানাটানি করে। দাদা মাকেও বলে গরু ধরে হাত ধোবে, কুয়োপাড়ে অন্য বউমেয়েদের থেকে দূরে থাকবে, বারোয়ারি কলে, বালতিতে দড়িতে হাত দিলে হাত ধোবে।

শুধু জলে ধোবে না, সাবানে ধোবে।

মা সকাল সকাল আজ গোলারুটি বানাল। গেল বছর যে ধান উঠেছে। ঝাড়ার পরে যে খুদ হয়েছে। মা সেটা চিকিমিকিতে মুড়ে রাখে। মাঝে মাঝে জাউ করে। খিচুড়ির মত। মাঝে মাঝে নতুন চালের সেই খুদ, গুড় আর মুগের ডাল বেটে ভিজিয়ে রেখে দেয়, সকালে তেলপোঁছা করে মাটির সরায় গোলারুটি করে।

গোলারুটির গন্ধ কী সুন্দর। মা সবার হাতে হাতে গরম রুটি দিচ্ছে শালপাতায় করে। বোন ঘরের ভেতর কী যেন করছে। ডাকছে মা, তরু, ও তরু। খাবারটা নে যা।

তরু বেরচ্ছে না। দাদার খুব টান বোনের ওপর, দাদা দেখতে যাচ্ছে। কী হল রে তরু।

ইশকুল বন্ধ, আমার কী হবে। আমার তো আর পড়া হবে না দাদা, মা বাবা বে দিয়ে দেবে।

ধুর বোকা! ধুর! কী সব বলিস। ইশকুল বন্ধ তো কী। বাড়িতে পড়বি। আরে বোকা আমারও তো কলেজ বন্ধ। এই কদিন পরে খুলে যাবে দেখিস। সব ঠিক হয়ে যাবে তো।

গোলারুটিটা পাতায় মুড়ে কোনওমতে চটি গলিয়ে বিধান বেরিয়ে পড়ে। কুঞ্জবনে যায়।

খবর জানিস? ইশকুল বন্ধ কলেজ বন্ধ পরীক্ষা বন্ধ। অফিস বন্ধ। সব বন্ধ। জানিস?

সবাই সারাদিন এই নিয়ে কথা আজ। বিধান হেসে ফেলে। যাব্বাবা, দ্যাখ বিধান, এ রোগ বেশ ভালো রোগ কিন্তু। এবার তোর দাদার পড়ার গুমোর আর থাকবে না। কলেজ বন্ধ। দাদাকেও মাঠে কাজ করতে হবে। দাদা বোন সব তোর সমান হয়ে যাবে। কারুর কোনও কাজ নাই। সবাই ফ্যা ফ্যা করে ঘোর। সবার অবস্থাই তোর মতন।

 

কাকা এতদিন পরে ফোন করেছে।

মা গজগজ করছে। হুঁহ্‌ এতদিন ট্যাকাকড়ি কিচ্ছুর সঙ্গে খোঁজ নেই, এখন সমিস্যেয় পড়তেই দেখ, ঠিক দেশের কথা মনে পড়েছে। ওদিকে চাগরি গেছে বলে এখন এদিকপানে আসার মতলব বুঝি।

বাবা শান্ত হয়ে বসে আছে। সন্ধে ঘনাচ্ছে। বাবা বিড়ি টানছে আর টুকুল টুকুল করে মাকে দেখছে। ঠাকমা তক্তাপোষে শুয়ে শুয়ে ঘ্যান ঘ্যান করছে। ছোট ছেলের আসার কথায় বুড়ির মনে খুব আশা হয়েছে। দেখতে পাবে কোলেরটাকে। কাঁখেরটাকে।

বুড়ি চিরকালের বেইমান। বাবা বুড়িটাকে এতদিন দেখল। অথচ তার মন পড়ে আছে ছোটটার দিকে। যে তাকে পোঁছে না খোঁজে না। ঠিক মা যেমন তরুকে বেশি আদর দেয়। বিধানকে দেখতেই পায় না। তেমনি।

কাকা বলেছে ট্রেন নেই বাস নেই। তবু আসবে। হেঁটে আসবে। তালাবন্দি, লকডাউন। এসব শব্দ খুব চলছে বাজারে। সেদিন ঘড়িমোড়ে কারা যেন, পার্টির লোক, এসে চাল ডাল তেল নুন বিলি করেছে। শহরের গরিবদের অনেকের তো কাজ নেই। ফুচকাওলার কাজ নেই, চাওলা, রুটিডিমভাজাওলার কাজ নেই। পানের দোকান বন্ধ। সব কারখানা বন্ধ। ঘরে থাকো, ঘরে থাকো সবাই বলছে। এক মাস কেটে গেছে। দাদা কলেজে যায় না। তরু ইস্কুলে যায় না। সব বন্ধ।

অন্য পার্টির লোক খিচুড়ি বিলি করেছে। লাল পার্টি। সবুজ পার্টির ছেলেরা এসে বলেছে খিচুড়ি বিলি করতে দেবে না। বাবা এসবে নেই। বাবা বলেছে যতদিন ঘরের চাল থাকবে, ক্ষেতের অল্প সব্জি দিয়ে খাওয়া হবে। কিন্তু মা বলেছে র‍্যাশন নিতে যেতে। এবার ফিরিতে র‍্যাশন দেবে। কাকা ফিরে এলে মুখ একটা বাড়বে।

তারক, বিধান, বিকাশ ঘরে থাকো ঘরে থাকো শুনবে না। আবার কুঞ্জবনে গেছে। আকাশপাতাল ভেবে পাচ্ছে না ওরা। এসব খুব অবাক করা। নতুন নতুন। তারকের মামা নাকি হাঁটা দিয়েছে। রাঁচি থাকে মামা। মজুরের কাজে গেসল। জোগাড়ের কাজে। পুলিশকে এড়িয়ে, দালালকে টাকা দিয়ে মামা হেঁটে আসছে জঙ্গল পাহাড় পেরিয়ে। সে গল্প শুনেছে ওরা বড় বড় চোখ করে।

দাদার আজ সকাল থেকে মুখ ভার। দাদার ইস্মার্ট ফোন হাত থেকে পড়ে ইস্ক্রিন ভেঙে চুরচুর হয়ে গেছে। ওদিকে কলেজের স্যার বলেছে ফোন দিয়ে পড়া হবে এবার থেকে। ফোনের দোকান সব বন্ধ বাজারে। ঘড়িমোড়ে। কী করে সারাবে দাদা।

দাদাও যেমন, পেছিয়ে পড়বে ভেবে দাদার কী ভয়। অন্যেরা সব শিখে নেবে, স্যারেদের ক্লাসের থেকে। ফোন না থাকলে দাদা পারবে না শিখতে।

কাকা নাকি রওনা দিবে বলে স্টেশনে এসেছিল। যেইদিন লকডাউন ভাঙবে বলেছিল। দু লাখ লোক নাকি স্টেশনে এসেছিল টিকিট কেটে। হঠাৎ সরকার বলল, টেরেন চলবে না। লকডাউন বেড়ে যাবে।

কাকা হাঁটা লাগাবে নাকি। বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে বড় দল করে আসবে।

বড় গরম পড়েছে। বোশেখ মাস পড়ে গেল। পয়লা বোশেখ আগে কত মজা হত। ঘড়িমোড়ের দোকানে গিয়ে হাত পেতে ছোট বাক্সোতে মিষ্টি দুটো, মাঝে সাঝে কোল ডিরিং, পাওয়া যেত। পুরো চোত মাস পালা হত। কত গানবাজনা। ঘুরে ঘুরে সন্নিসি সেজে ভিক্ষে করতে আসত চড়কের সাধু। সব বন্ধ যে এবার।

বড় গরম। আকাশের সূর্য টনটন করছে। আগুন ঢেলে দিচ্ছে। উষ্ণতা বিলোতে বিলোতে বলছে, ঘরে থাক। মানুষ হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে ঘরে। বা সবুজের কানাতের তলায় কুঞ্জে, যতটা সম্ভব ছায়ান্তরা্লে।

বিধানের বাবার ফোনে কাকার নম্বরটা আছে। ফোন করে আর পাওয়া যাচ্ছে না কাকাকে। কাকা হয়ত বেরিয়ে পড়েছে। সূর্যকে উপেক্ষা করে পায়ে সস্তার চটি পরে, হাতে ছোট্ট বোতলে জল। ফোনের চার্জ নেই। হয়ত ফোনই নেই আর। টাকা নেই, ধার করেছে তাও। যেটুকু পেরেছে সম্বল একত্তর করেছে। পথ চলার জন্য চিঁড়ে গুড় নিয়েছে। হাইওয়ে ধরে হাঁটা দেবে। কোনও না কোনওদিন তো পৌঁছবেই।

বিধান আজকাল এসব শুনে দেখে কেমন ভেবলে যাচ্ছে। ভাবছে সে তো তার কাকার মত সাহসী না। আহা, কাকাদের ওই দলটা। কী সাহস তাদের। তার সূর্যের বিপরীতে কাজ করে। রাতে গাছের তলায় মানুষ আশ্রয় নেয়। স্বপ্ন দেখে।  মানুষের স্বপ্ন, প্রবঞ্চক এই সময়ে, তপ্ত আঁচে বসানো ক্ষীর জ্বালের মত গাঢ় হয়।

বিধানের দাদা সুরথ, ঝিমিয়ে পড়েছে তবু। ফোন না হলে কীভাবে আর পড়বে সে। একটা দড়ির ফাঁস তাকে আজকাল ডাকে। মাঝেমাঝেই চোখ যায় চালের বাতায়, মোটা লকড়িটার গায়ে যেখানে সে কাপড় ঝোলানোর আঙটা টাঙিয়েছে। নিজেই একদিন যদি ঝুলে পড়া যায়, ভাবে।

পৃথিবীর খবর টুকুস টাকুস করে আসছে না আর ফোনে। দিকে দিকে বরফের চাঁই ধসে পড়ছে কিনা, সাদা ভালুক না খেতে পেয়ে মরছে কিনা… সে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু যেন আওয়াজে মালুম পাচ্ছে।

হাইওয়েতে রক্তাক্ত পায়ের ছাপ। রেল লাইনে মরা মানুষের ছড়ানো আটার রুটি। পাশে চাঁদের ছবি। পূর্ণিমা ছিল সেদিন। বুদ্ধপূর্ণিমা। রবিঠাকুরের জন্মদিন গেছিল। সব ঠাকুরের মধ্যে নাকি সবচেয়ে জ্যান্ত দেবতা এই রবিঠাকুর। হা হা করে হাসি আসে বিধানের। সে যখন ছোট, তখন পাঠ্যবই বাংলা বই খুলে দুলে দুলে দাদা রবিঠাকুর পড়ে শোনাত। বাবা বিড়ি খেতে খেতে পায়ের ঘায়ে হাত বোলাত। মা তেল গরম করে এনে ঠকাশ করে নামাত বাবার কাছে। বলত নিজে পায়ে নাগ্যে নাও । আমার সময় নেই।

 

এ বড় প্রবঞ্চক ঋতু । এই বিশাল গরম কালটার ভেতরে জমাট বেঁধে উঠেছে হা হুতাশ। রাগের বাতাস। দমচাপা ঝগড়ার বাতাস যেন। বাড়িতে কত্তো দেখেছে।

দাদার মন খারাপের বাতাসের কাছাকাছি বিধান নেই। গেলেই ছোবল। ঝাপটা।

সেইরকম নাকি ঝাপটা আসবে একটা, সবাই বলাবলি করল। এক দুজনে দেখে এল টিবিতে। কত বড় করে বলছে। আসছে আসছে আসছে। কেউ বলে আম্পান কেউ বলে উম্পুন। ছাইকোলোন।

সেদিনের ঝড়ে তছনছ হয়ে গেল কুঞ্জবন বিধানদের। সব গেল। কত লোকের বাড়ি পড়ে গেল। ধুয়ে গেল ক্ষেত। ছাদের ঢেউটিন উড়ে উড়ে দিগবিদিক চলে গেল। ঢেউটিনের ধাক্কায় মাথায় রক্তপাত হয়ে মরে গেছে ও পাড়ার হারুকাকা। বাজারে দোকানে জল ঢুকে সব চাল গম ভিজে পোকা ধরে যাবে। তক্তপোষের ওপরে তুলে দিয়েছে সব জিনিস সবাই। যাদের তক্তপোষ আছে তারা। চাদ্দিকে চাট্টি করে ইঁট পেতে তার ওপর পুরনো সব পিচবোর্ড আর ভাঙ তক্তা জুড়ে করা খাটখানা ওদের। তার ওপরেও নামমাত্র জামাকাপড় চিলিমিলিতে বাঁধা।

দুপুর থেকে বিষ্টি। কী ভয়ানক বিষ্টি। ছাদ যেন ফুটো বালতি। সব জল ভেতরেবাইরে মিলিয়ে দিল ওদের। দুপুর থেকে মাইক বাজিয়ে বলে গেছে ঝড় আসছে, সবাই যেন ইস্কুলবাড়িতে আশ্রয় নিতে যায়। সেখেনে অনেক পরিবার এক ছাদের তলায়, মনের জোর অনেকটা পাবে। বাবা মা বোন দাদা সবাই চালান হয়ে গেল সেখানে। বিধান শুধু বাইরে ছুটে বেড়াচ্ছে। সিমেন্টের বস্তা মাথায় দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে এদিক ওদিক।

সারা সন্ধে উন্মাদের মত ঝাঁপাল, লাফাল ঝড়টা, গাছ পড়ার শব্দ আর হু হু বাতাসের কান্না মিলে সে এক অদ্ভুত আওয়াজ, দু ঘন্টা ঘরে। ফুটোফাটা পেলেই ঝাঁপিয়ে ভেঙেচুরে নিয়ে যাচ্ছে।

দু মিনিটের জন্য ভীষণ সাহসী হয়ে বাইরে বেরিয়েছিল বিধান। চোখের সামনে পর পর সার দেওয়া তালগাছ মাথা মুড়িয়ে পড়ে গেল। যেন কাটা সৈনিক।

বাড়ির একটা দিক পড়ে গেল। আর নষ্ট হয়ে গেল দাদার, বোনের পড়ার বই, খাতা।

ঝড় শেষ হয়ে গেল। পড়ে রইল দুর্ভোগ। গোটা অঞ্চলে ইলেকটিরি ফিরল না। বড়লোক গরিবলোক সমান হয়ে গেল। মরা কুকুর মরা গরুর লাশ পচে ফুলে উঠল। মরা আর ঝরা গাছের লাশ পড়ে আছে চারিদিকে। রাস্তা বন্ধ করে, কুয়োর মুখ বন্ধ করে, শুধু গাছ আর গাছ। উল্টানো মোটা গাছের তলে পিষে শেষ উৎপটাং বড়লোক হয়ে যাওয়া নিয়োগীদের স্কুটি। মুদির ব্যবসা করে লাল হয়ে যাওয়া ঘোষবাবুর গুষ্টির গাড়ির দু তিনটে মারুতি ভ্যানের মাথা চেপ্টে, মুখ থেঁতলে কাঁচ ভেঙে ফর্দাফাঁই। সার সার  ইলেকট্রিক থাম পোঁদ উল্টে পড়ে আছে।

বিধান বিকাশ তারকের এখন কাজ শুধু ঘুরে ঘুরে ধ্বংস দেখা। কত ক্যামেরা কাঁধে লোক এয়েচে। তাদের কত পোশ্ন। কত কথা। বিধান ভাবে সে এখন কেউকেটা। বাড়িতে দাদা আর বোনের আগে বোলবোলাও ছিল খুব। বইয়ের শোকে গতকাল বাড়ি ফিরে এসে বোনটার সে কি বুকফাটা কান্না। চিঁড়ে, জল খেয়ে থাকা দু দিন ওদের। উনুন নেই তো ধরাবে কী। সব জল, সব কাদা। তবু খাওয়ার শোক নেই বোনটার। শুধু বইয়ের শোক। দাদারও তাই। সুরথ এখন থম মেরে আছে। মাথার চুল মাঝে মাঝে খিমচে ধরছে শুধু।

মা আর বাবা ডেকে সারা। দুহাতে কেবল যেটুকু পারছে ঘরটা দাঁড় করাচ্ছে। লাঠিবাঁশ একত্তর করছে। বিধানকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না কোথাও। এক হাঁটু কাদা সাঁতরে সে নাবাল জমি থেকে উঠে গেছে, উঁচু বড় রাস্তার ওপরে গাড়ি দেখছে, রিপোর্টার দেখছে। মাইক দেখছে। ক্যামেরা দেখছে। বাবু, নেতা, আরও বড় বড় বোলবোলাওওয়ালা লোক দেখছে। সব্বাই এসেছে ওদের দুর্গতি দেখছে। অনেক টাকা পাবে ওরা। অনেক সুরাহা পাবে। ত্রাণ।

একটা গাড়ি থেকে এত্ত এত্ত জলের প্যাকেট আর খাবারের প্যাকেট দিল। বিধান গামছায় বাঁধল। সবাই নিল কাড়াকাড়ি করে। পায়ের তলায় কাদা। বাড়ি ফিরল বিজয়গর্বে। খাবারগুলো নামিয়ে রেখে দেখল বাবা মা দাদা মিলে কোনওমতে এক জায়গায় জড়ো করা বাঁশ এবার বাছাই করছে। আবার খুঁটি পুঁতবে। তেরপল দিচ্ছে ত্রাণে। সেই নিতে যেতে হবে। বিধান যা বাপু যা।

 

পার্টি নাকি সব টাকা নিয়ে নেছে। ত্রাণের আড়াই হাজার টাকা সবার নামে নামে এসেছে তার এক হাজার তাদের নগদ দেবে। বাকিটা পার্টির লোক নাকি পাবে।

বিধানরা আবার জটলায় বসে আছে। এক মাস ধরে সব বিজলি থাম উপড়ানো। তাদের ত নেইই। বড়লোকের, পঞ্চায়েত আপিসের, বিডিও আপিসের বিজলি নেই। ফোন চার্জ হয় না। সব ফোন মরে মরে আছে। কারুর রা সাড়া নেই।

পৃথিবীর কত জায়গায় এখন মেঘ করছে, বিষ্টি হচ্ছে। এভাবেই নাকি আরও ঝড় আসবে। আরও জল ফুঁসবে। আরও বাতাস কাটবে… আরও ধ্বংস হবে।

বিধান শুধু ওসব ভাববে না, দেখবে না। ও এখন ঘুরছে, আর পাত্তা লাগাচ্ছে। কোথায় গেলে পার্টির ভলান্টিয়ার হয়ে তেরান বিলি করা যায়।

দাদাকে ভ্যান করিয়ে দেবে বিধান। দেবেই। ওটাতে সব্জি সাজাবে দাদা। এ বাজারে তেরান আছে আর সবজি ফল আনাজ মাছের ব্যবসা আছে শুধু। আর কিসসুটি নেই। সবাই জানে, বলেছে।

সুরথকে বাড়ির সবাই টেনেটুনে তুলবে আবার। সুরথের ওপর আর রাগ নেই বিধানের। শুধু মায়া আছে। দাদাটা পেগলে না যায়। লোকে রাস্তায় দেখলে বলবে এই পাগলু। বিধানেরই তো বুকে লাগবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...