কলকাতা, নয়… –- ৯ম পর্ব

অশোককুমার মুখোপাধ্যায়

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

গুণ্ডাদর্পণ

এক বিকেলে চলেই গেলাম ওর কাছে।

–রডা কোম্পানির অস্ত্রলুঠ ও মলঙ্গার হাবু বইটি কিনতে চাই…
–কী করে জানলে বইটির কথা? কে পাঠিয়েছে?
–আজ্ঞে গৌরকিশোর ঘোষের কাছে শুনেছি, উনিই পাঠিয়েছেন…
–হুমম… তা কী করো তুমি?
–এই… ছোটখাট চাকরি করি… আর শখের লেখালেখি… ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বাঙালিদের বোমা বন্দুকের লড়াইয়ের কথা নিয়ে…
–অ… তা এই বই নিয়ে কী লিখবে?

ভদ্রলোকের সাদা গালপাট্টা, রুপোলি বাবরি চুল চৈত্রের হাওয়ায় উড়ছে। তীক্ষ্ণ দুটি চোখ কালো ফ্রেমের চশমার কাঁচের ওপার থেকে আমাকে আক্ষরিক অর্থে মেপে চলেছে, পা থেকে মাথা অবধি। যদি সেই দুটি জ্বলজ্বলে দৃষ্টির মন পড়বার ক্ষমতা থাকে, পড়ে নিচ্ছে তাও।

–আজ্ঞে বিপিনবিহারী গাঙ্গুলির কাজকর্ম নিয়ে একটু জানবার ইচ্ছে, আর অনুকূল মুখোপাধ্যায়কে নিয়েও…

এইবার দৃষ্টিতে নরম ছোঁয়া।

–বসো…

যেখানে বসতে বললেন, তা অতীতে একটি গাড়ির ব্যাটারির কাজ করেছে, এখন শুধুই খোল, তারই উল্টোদিকে চট পাতা, বসার ব্যবস্থা… যদি খেপে যান, ‘রডা কোম্পানি’ পাব না, অতএব বসে পড়লাম; বসতেই বুঝলাম হিন্দ সিনেমার পাশে, ফুটপাতের কোলে এই ব্যাটারি সারাবার দোকানের মালিক উনি। নজরে এল, ময়লা লুঙ্গি-ফতুয়া ভদ্রলোক গণেশ অ্যাভিনিউ পেরিয়ে মলঙ্গা লেনের দিকে যাচ্ছেন। সুবর্ণবণিক সমাজের বাড়ির দিক থেকে কমলা আলো গড়িয়ে এসে নির্মল চন্দ্র স্ট্রিটের ট্রামলাইন ধুয়ে দিচ্ছে। শব্দ উঠছে খটখট… খটখট…। আমার বাবার মতোও উনিও খড়ম পরেছেন (এ যখনকার কথা তখন অবশ্য বাবা আর খড়ম পরেন না)।

দোকানে পুরনো ব্যাটারির অকর্মণ্য সীসের পাতগুলি পালটে নতুন লাগান হয়, ফলে ব্যাটারির আয়ু বেড়ে যায় কিছুকাল। যদিও, রসায়ন পড়েছি বলেই জানি, খালি হাতে এইভাবে সীসা ঘাঁটাঘাঁটি করলে শরীর খারাপের সম্ভাবনা, কিন্তু আমি বললেই আর এরা শুনবে নাকি? তবু বলা দরকার—

এই যে…, ভদ্রলোক বই হাতে হাজির। প্রচ্ছদে হলুদ, বিকেলের রং! সত্যেন্দ্রপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদক। পাঁচ টাকা দিয়ে বই হাতে নিলাম। ব্যাটারির খোলে বসেই উলটে-পালটে দেখে নিলাম বইটি। স্রেফ মাথা খাটিয়ে কীভাবে রডা কোম্পানির এক গরুর গাড়ি বোঝাই অস্ত্র মলঙ্গা পাড়ায় চলে এল, তারপরে তা কেমনভাবে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ল, এ তার বিবরণী। যিনি সেদিনের নায়ক সেই হাবু, শ্রীশচন্দ্র মিত্র যে তারপরে কোথায় উধাও হয়ে গেলেন তার কোনও হদিশই পাওয়া গেল না! এর নেপথ্যের একজন, অস্ত্রলুঠ আর তার বিতরণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যাঁর, অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, তাঁর কথাও বলা আছে বইটিতে।

সব তো আর এখানে বসে পড়তে পারবে না। ভদ্রলোক একটি লোহার তারের চেয়ারে বসেছেন। ঠোঁটে হালকা হাসির আভাস।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা তো বটেই…। বইটি ব্যাগে ঢোকাবার পর হঠাৎ সাহস বেড়ে যায়। আচ্ছা, আপনি তো স্বাধীনতা সংগ্রামী অনুকূল মুখোপাধ্যায়ের ভাইপো গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। আপনাকে সবাই গুণ্ডা বলে চেনে, খারাপ লাগে না। ভদ্রলোক থমকে যান। চোখ বড়-বড় করে দেখেন। তেমন হলে সোজা দৌড় দেব। রাস্তা দেখে রেখেছি। কিন্তু সে সব কিছু করতে হয় না। উনি বেশ ধৈর্য ধরে বোঝান ১৯৪৬-এর দাঙ্গা এবং দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর কথা। ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেন কীভাবে তলোয়ার চালিয়ে খতম করেছিলেন ‘শত্রুপক্ষের’ লোকজন, বোঝান যে, উনি কীরকমভাবে পাড়ায় দাঙ্গা হতে দেন নি। বিশ্বাস করা বা না করা যে শুনছে তার ওপর, কিন্তু ওর কথা শেষ অবধি শুনতেই হবে, বলার এমন জাদু।

বুঝলে, আমাদের সময় মস্তান হতে গেলে গায়ের জোর লাগত, সাহস লাগত। তাগড়া ষাড়ের শিং ধরে তাকে রাস্তা থেকে হটিয়ে দূর করে দিতে হবে। আমাদের সেই গায়ের জোর ছিল। ষাঁড় হটাচ্ছি, এদিকে রাস্তায় গাড়ির লাইন লেগে গেছে।

প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট যেখানে ইডেন হসপিট্যাল রোডকে হাতছানি দিচ্ছে, তার ডানদিকেই ছিল ‘ভূতপূর্ব রাজবন্দি অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের’ পাঁঠার মাংসের দোকান, যার ভেতরেই কালীমূর্তি, রোজ পুজো হয়। ওই দোকানের জন্যই ভদ্রলোকের নাম হয়েছিল গোপাল পাঁঠা।

সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে বাবার সামনে এই উচ্চারণ করতেই বিরক্ত— ওর নাম গোপাল মুখোপাধ্যায়, পুরো নাম বল, গোপাল পাঁঠা আবার কি?

কালীমূর্তির জন্যই বোধহয় গোপালবাবুর দলের ছেলেদের হুমকিতেও থাকত ঠাকুরের কথা— মাসিমা ছেলেকে বাড়াবাড়ি করতে মানা করুন, না হলে মায়ের পায়ে বলি করে দেব…।

আর এক কালীভক্ত কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত, ওরফে ফাটাকেষ্ট। মারামারি করতে গিয়ে অনেকবার নাকি হাড়গোড় ভেঙেছিল, সেইজন্যই এই নাম, সর্বাঙ্গ ফাটা। গাট্টাগোট্টা, কৃষ্ণবর্ণ, মুখে বসন্তের দাগ। এক বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের বাড়িতে। স্নান করছিলেন বলে একটু অপেক্ষা করতে হল। ভালো জাতের মিহিদানা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছিল আমাদের। বন্ধুটি সেন্ট পলস কলেজে ভর্তি হবে, নম্বর কিছু কম আছে, তবে ‘কেষ্টাদা’ বললেই নাকি হয়ে যাবে। বিশ্বাস হয়নি। উনি সব শুনে বললেন, হ্যাঁ হয়ে যাবে, তারপর আমার বন্ধুটিকে ট্রেনিং দিলেন, কীভাবে প্রিন্সিপালের সঙ্গে ভদ্রভাবে বিনয়ী ভাব এনে কথা বলতে হবে।

–আরে আমি তো আছিই, কিন্তু তার আগে তোমায় তো নিজেকে ভালো ছেলে দেখাতে হবে, বলতে হবে আমি গরিব, কলেজে ভর্তি না হতে পারলে আমার আর পড়াশুনা হবে না…

ছেলেটার ভর্তি হয়ে গেল। নকশাল নিধনকারীর ওই একটি পুণ্যের কাজ যা আমি স্বচক্ষে দেখেছি।

অনেক গুণ্ডা-মস্তানের পৃষ্ঠপোষণায় আবার রাস্তা বন্ধ করে রাতভোর জলসার আসরও বসত। ক্রীক রো-তে হত ভানু বসু মানে ভানুগুণ্ডার জলসা। ভানু বসুও নাম কিনেছিলেন ওই ছেচল্লিশের দাঙ্গায়, ‘শত্রুদের’ কচুকাটা করে। ওর পক্ষে, শিল্পী জোগাড়ের দায়িত্ব নিতেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। ওইখানেই প্রথম শ্যামল মিত্র-সতীনাথ মুখোপাধ্যায়-উৎপলা সেনকে সামনে থেকে গান গাইতে দেখি, সে কী উত্তেজনার সময়।

মনে হয় সব গুণ্ডামস্তানই তখন গানবাজনার অনুষ্ঠান করাতে উৎসাহী। বোধহয় এই সহজ সত্যিটা বুঝেছিলেন, ‘কালচার ফালচার’ করলে বাঙালিরা নম্বর দেয়। সংস্কৃতি করলেই সাত খুন মাপ। শশীভূষণ দে স্ট্রিট যেখানে বউবাজার স্ট্রিটে (যার পোশাকি নাম বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট) পড়েছে সেই অঞ্চলে হত শতদলের জলসা। ওই রাতভোর জলসাতেই, গভীর রাতে দুটি বালিকাকে নাচতে দেখি— রুমকি-ঝুমকি— রেকর্ডের গানের সঙ্গে। এদেরই একজন কয়েক বছর পরে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী দেবশ্রী রায় হিসেবে পরিচিতি পাবে। এই জলসাতেই ঘটে সেই অত্যাশ্চার্য— হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গান করছেন, ওগো কাজল নয়না হরিণী…, হঠাৎ আওয়াজ উঠল ইয়া…, সঙ্গে হাততালি, দেখা গেল সবুজ পাগড়ি মাথায় এক শিখ তরুণ মঞ্চের পাশের সিড়ি বেয়ে গ্রিনরুমের যে আপাত আড়াল সেইখানে ঢুকছেন। কে এই লোকটা? লালটু বলল, জানিস না! অমৃক সিং অরোরা, ফাটাফাটি গায়…। কোনও রকমে গান শেষ করে, দু-হাত জুড়ে নমস্কার জানিয়ে শুভ্র-নির্মল হেমন্ত মুখোপাধ্যায় স্টেজ থেকে নেমে গেলেন। চোখের সামনে ঘটে গেল তাৎক্ষণিকের জয়! কী যে খারাপ লেগেছিল। ওই জলসাতেই রবি ঘোষ-ভোলা দত্তের কমিক যেমন শুনি, জহর রায়েরও। তখনই বোঝা গেল স্টেজে জহর রায় অমোঘ। তখনও রংমহল-বিশ্বরূপার মঞ্চে ওঁর ‘আমি মন্ত্রী হব’ কি ‘টাকার রং কালো’ দেখিনি।

মস্তানের নামটা আর লিখছি না, কারণ সে তেমন বিখ্যাত নয়। ঘটনাটা বলতে বাধা নেই। প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট যেখানে আমহার্স্ট স্ট্রিটে পড়েছে, সেই স্পর্শবিন্দুর ঠিক উল্টোদিকে কালীপুজো হত। ওই পুজোকে গজিয়ে উঠতে দেখেছি। হঠাৎ কী করে যেন ওদের পুজোর রমরমা খুব বেড়ে গেল। তুলনায় আমাদের পাড়ার পুজো, যা বহুদিনের পুরনো, পাত্তাই পায় না। আমরা ভিড় টানবার জন্য নানান ফিকির বের করতে থাকি। একবার এক গাঁজাখোরকে জোগাড় করা হল। সে কলকেতে দু-বার টান দিয়েই স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। ছেঁড়াফাটা জামা আর ধুতি পরে দাঁড়িয়ে থাকল লোকটি, গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়ে তলায় লিখে দেওয়া হল ‘ক্ষুদিরামের ফাঁসি’। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার অবিকল মাটির প্রতিরূপ যেন। এক ক্যাবলা ছেলে মাটির মূর্তি কীনা বোঝার জন্য সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে দিল, তবু লোকটি অনড়। ‘শো’ শেষে ছ্যাঁকা খাবার জন্য বেশি পয়সা দাবি করল সেই গাঁজাখোর। সহানুভূতি দেখিয়ে দিয়েও দিলাম আমরা। পরে জানা গেল ওই ক্যাবলা ছেলে মোটেই তা নয়, ও আসলে গাঁজাখোরের বন্ধু। পুরো ব্যাপারটা সাজানো। খোকা রেগে গিয়ে লোকটির কলার ধরে পেটাতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠান্ডা মাথার লোক সব পাড়াতেই থাকে। এমনই কেউ ওকে বোঝাল, ছেড়ে দে… ছেড়ে দে খোকা, পয়সা রোজগারের জন্য তো মানুষকে নানান ফন্দি-ফিকির বের করতে হয়, এ আর এমন কি, এইটা তো সত্যি যে, লোকটি ছ্যাঁকা খেয়েছে। এমন দার্শনিক যুক্তিতে আমরা গলে গেলাম।

এত কিছুর পরেও পাশের রাস্তায় সদ্য-গজান কালীপুজোর জাঁকজমক বেড়েই চলল। কী করে পারে? ওইটুকু এলাকায় কতই বা চাঁদা ওঠে ওদের? তবে কী অনেক বিজ্ঞাপন জোগাড় করে? ওদের সঙ্গে আমরা আর কিছুতেই পেরে উঠি না। শেষে একদিন বেলুন ফাটল। ওদের আর ভাসানই হয় না, এক সপ্তাহ হয়ে গেল তবু ঠাকুর পড়ে আছে। কী হল রে!

খোঁজ নিতে দেখা গেল, পুজোর পাণ্ডারা সব উধাও। কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু এইভাবে জয়নারায়ণ চন্দ্র লেনের মুখ তো বেশিদিন আটকে রাখা যায় না। বিরক্ত লোকজন অভিযোগ করল মুচিপাড়া থানায়। পুলিশ এসেও উদ্ধার করতে পারল না রহস্য। পুজো কমিটির সেক্রেটারি নিখোঁজ, প্রেসিডেন্ট অন্য রাজ্যে, তাড়াতাড়ি ফেরার সম্ভাবনা নেই। বেচারিরা কী আর করে। শেষকালে এল পুলিশের ট্রাক, যাতে জলপাই হেলমেট পরা পুলিশ বাহিনি বন্দুক হাতে ঘোরাফেরা করে। তাতেই সপারিষদ মুণ্ডমালিনীকে ওঠান হল, পুলিশের কাজ হল ভাসান দেওয়া।

পরে আমরাই উদ্ধার করেছিলাম রহস্য। চাঁদার টাকার একাংশ ঘোড়ার রেসে লাগাত পাণ্ডারা। প্রতিবারই জিতে এসেছে। কিছুটা নিজেদের পকেটে ঢোকাবার পরও যা থাকত তা দিয়ে হইচই-আলো-ব্যাণ্ড-নাচ মিলিয়ে জমকালো বিসর্জন করা যেত। এইভাবেই চলেছে গত দু-তিন বছর।

এইবারই ঘোড়ার মাঠে হেরেছে সবাই। অতএব পালাতেই হবে।

 

(ক্রমশ)

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...