দ্বিতীয় ঢেউ, ভেসে যাওয়া লাশ ও টিকা বাণিজ্যের আখ্যান

স্বপন ভট্টাচার্য

 



প্রাবন্ধিক, গদ্যকার, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

 

 

 

ভারতের ভ্যাক্সিন পলিসি মহাভারতের অ্যান্টি-হিরো কর্ণকে মনে পড়িয়ে দিচ্ছে সময় সময়। তবে এই প্রতিতুলনা একান্তই অর্বাচীন ভাবনা আমার। কেন না কর্ণ দানসাগর। নিজে মরবেন জেনেও কবচকুণ্ডল তুলে দিয়েছিলেন ছদ্মবেশী মৃত্যুর হাতে। আর আমাদের মহাপুরুষটি মৃত্যুকে সামলে নিয়েছেন ভেবে দুনিয়ার দানসাগর হতে গিয়েছিলেন চূড়ান্ত অজ্ঞানতার পরিচয় দিয়ে। এখন গভীর গাড্ডায় পড়ে আন্তর্জাতিকতা ভুলতে বাধ্য হয়েছেন বটে কিন্তু ততদিনে দেশবাসীকেও স্বখাতসলিলে এনে ফেলতে পেরেছেন মোটামুটি। বরং তুলনা দুর্যোধনের সঙ্গে করাটাই যুক্তিযুক্ত, নিজে ডুবছেন সঙ্গে নিয়ে এ পোড়া দেশের অষ্টাদশ অক্ষৌহিনী সেনা।

 

ভ্যাকসিন মৈত্রী

বিপর্যয়ের শুরু মোদির ভ্যাকসিন মৈত্রী কূটনীতি থেকে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসবার আগে পর্যন্ত ভারত রাষ্ট্রসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্বের দুই গোলার্ধ থেকেই প্রভূত পিঠ চাপড়ানি পেয়ে এসেছে কেন না ব্রিটেন, ইতালি, ফ্রান্স যখন দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রকোপে টাল খাচ্ছে তখন ভারত ঢাল হয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে টিকার যোগান দিয়ে। আন্তর্জাতিকতা বাঁকা চোখে দেখার বিষয় নয়। ভারত রাষ্ট্রসংঘের COVAX চুক্তিতে সায় দিয়েছিল তখন যখন আমেরিকা বা রাশিয়াও এই ভ্যাকসিন নীতি ও বণ্টন সংক্রান্ত বিষয়ে বিশ্বমানবতার কোনও দায় নিতে চায়নি। ভারতের ভ্যাকসিন মৈত্রী কূটনীতির পরাকাষ্ঠা বলে মনে হচ্ছিল এই বছরেরই জানুয়ারি মাসের ২৯ তারিখে। ওইদিন দাভোস ফোরামের বক্তৃতায় মোদি বলে দিলেন ভারত করোনাযুদ্ধে জিতে বসে আছে এবং শি হ্যাজ ওয়াকড দি টক— যা বলেছে করে দেখিয়েছে। কী দেখিয়েছে আমাদের যুদ্ধজয়ী সরকার ভ্যাকসিন মৈত্রীর স্বার্থে? নিজের দেশে টিকাকরণ  শুরু হয়েছে কি হয়নি, তার মধ্যেই উৎপাদনের একটা বড় অংশ, ৬.৬ কোটি ডোজ ৯৫টি দেশে রপ্তানি করেছি আমরা। এর মধ্যে এক কোটি ডোজ সহায়তা রূপে, দু কোটি ডোজ  COVAX চুক্তির দায়বদ্ধতা মেনে রাষ্ট্রসংঘের মাধ্যমে এবং বাকি ৩.৬ কোটি ডোজ বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানি করা হয়েছে। নিজের কাছা খুলে রেখে এমন দানধ্যান কোনও দেশই করেনি। চিন ৮ কোটি ডোজ রপ্তানি করেছে ৬০টি দেশে কিন্তু তা সে করেছে নিজের দেশের চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ করার পর। ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন রপ্তানি করেছে সাড়ে ১১ কোটি ডোজ, কিন্তু সে ইউনিয়ন তো ২৭টি দেশের সমন্বয়। সুতরাং এককভাবে কোনও দেশই এত বিরাট রপ্তানির দায় নেওয়ার কথা নয়, তা তারা নেয়ওনি। এছাড়া ভারত কোয়াড প্ল্যানের আওতাভুক্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির জন্য এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য একশো কোটিরও বেশি ডোজ রপ্তানি করার কসম খেয়ে রেখেছিল। এসব নিয়ে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ততদিনই ফুলে ফেঁপে ছিল যতদিন না করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে স্রেফ উলঙ্গ করে ছেড়েছে। ভারত আজ আমেরিকার পরেই বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বাধিক কোভিড আক্রান্ত দেশ। কাজে কাজেই আমেরিকার সঙ্গে তুলনা এসে যায়। তারা ডিফেন্স অ্যাক্ট এবং আপৎকালীন ব্যবস্থার আইন কার্যকর করে যুদ্ধকালীন তৎপরতা নিয়েছে বলে তাদের দেশে তৈরি হওয়া কোভিড ভ্যাকসিন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা বসিয়ে রেখেছে এখনও পর্যন্ত। প্রয়োজন এবং মজুতের মধ্যে সামঞ্জস্য না এনে তারা রপ্তানিতে আগ্রহী নয়। অর্থাৎ, তারা টিকা-জাতীয়তাবাদকে টিকা-আন্তর্জাতিকতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ফল হয়েছে এই যে, মে মাসের দশ তারিখ পর্যন্ত সে দেশে প্রায় পঁয়ত্রিশ শতাংশ মানুষের টিকাকরণ সম্পন্ন হতে পেরেছে আর ভারতে সে সংখ্যা মাত্র দেড় শতাংশের আশেপাশে।

হিরো টু জিরো

জানুয়ারি মাসের শেষাশেষি নরেন্দ্র মোদি ছিলেন বিশ্বের মডেল, নিজের দেশে কোভিড সামলানো হিরো, বাকি বিশ্বের কাছে সবচেয়ে বেশি ভ্যাকসিন উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান— ফলে তিনি বুক বাজিয়ে যখন বলেন ‘ওয়াকড দি টক’ তখন তার ব্যক্তিমর্যাদা বাড়ে বৈকি! সেই দেশ আর তার সেই রাষ্ট্রপ্রধান যে কয়েক মাসের মধ্যে সারা বিশ্বের লাফিং স্টক ও করুণার পাত্রে পরিণত হলেন তা তো অবিজ্ঞান ও অপরিণামদর্শিতার জন্য। আজ দেশে রোজকার সংক্রমণ সাড়ে তিন, চার লাখের আশেপাশে। রোজ ৪০০০-এর ওপর মৃত্যু, মানুষ মরছে মধ্যযুগের অসহায়তায় স্রেফ প্রশ্বাসবায়ুটুকু না পেয়ে, নদীতে ভেসে যাচ্ছে শত শত লাশ, জীবন বুঝি বা পরিত্যাজ্য, মৃত্যুও সম্ভ্রমহীন— সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে লজ্জা উন্মুক্ত করে নিজেকে স্রেফ ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে ভেসে চলেছে বেওয়ারিশ লাশের মত এই দেশ, ভারতবর্ষ। কেন এই অবস্থায় পড়তে হল ভারতবর্ষকে?

কুম্ভে ২৮ লাখ আর নির্বাচনে গোটা প্রশাসনকে দিল্লি থেকে চপারে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করানোর কথা বহুচর্চিত, সে না হয় ছেড়েই দিন কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সম্পর্কে কতটা হেলাফেলা আর অজ্ঞতা ছিল তার নজির বুঝতে চলুন কয়েকটা কম আলোচিত দিকে নজর ঘোরাই।

প্রথমত, ভারতে বৈদেশিক রাষ্ট্রপ্রতিনিধিদের আমন্ত্রণের লিস্ট। জানুয়ারিতে মোদির দাভোস দাদাগিরির পর এদেশে আমন্ত্রিত ছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সুগা এবং রোয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট কাগামে— সব বাতিল করতে হয়েছে। মে মাসের মধ্যে মোদির নিজের যাবার কথা ছিল পর্তুগাল ও ফ্রান্সে— সেও বাতিল  হয়েছে যদিও, ভোটের দিকে নজর রেখে বাংলাদেশ ঘুরে আসার সুযোগ তিনি ছাড়েননি। যে দেশ অতিমারির বিজ্ঞান ও ইতিহাস সম্পর্কে সামান্য ওয়াকিবহাল তাদের বিদেশনীতি নিজেদের অপ্রস্তুত অবস্থা দেখানোর জন্য বিদেশি অতিথিদের দাওয়াত দিয়ে বসবে না। এঁরা তা ছিলেন না বলেই ফাঁকা আত্মবিশ্বাস দেখাতে পেরেছিলেন। এইভাবে আত্মবিশ্বাস কথাটার অমর্যাদা করা উচিত হবে না, সুতরাং একে আত্মপ্রবঞ্চনা বলাই সঙ্গত।

দ্বিতীয়ত, টিকা মৈত্রীর সময়কাল। ভারতে টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু হওয়ার সময়েই ভারতের উৎপাদন যেতে শুরু করল বিদেশে। সাড়ে ৬ কোটি ডোজের বেশিরভাগই রপ্তানি হয়েছে ফেব্রুয়ারি মার্চে। এপ্রিল মাসের ১৬ তারিখেও উড়োজাহাজে সিরিয়া আর আলবানিয়ায় পৌঁছে গিয়েছে সেরাম ইন্সটিটিউটের টিকা। যদি চিন্তা করেন যে মধ্য জানুয়ারি থেকে এই মে মাসের এগারো তারিখ পর্যন্ত মাত্র ১৫ কোটি ডোজ দেশের মানুষকে দিয়ে ওঠা গেছে তাহলে আন্দাজ করতে পারবেন আরো সাড়ে ছয় কোটি ডোজ মজুত থাকলে অন্তত দেড়-দু মাস টিকাকরণ কর্মসূচি চলবে কিভাবে তা নিয়ে ভাবতে হত না! প্রশ্ন উঠতে পারে, এবং সঙ্গতভাবেই উঠতে পারে আমরা যদি না দিই অন্যেরা আমাদের দেবে কেন? এর জবাবে বলতে হয় টিকা এক্সপোর্টার থেকে টিকা ইম্পোর্টার আপনারা বনে গেলেন কীভাবে? এক বছর সময় পেয়েছিলেন, বাজেটে টিকাকরণে বরাদ্দ করেছিলেন ৩৫০০০ কোটি টাকা, সে টাকা উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করেননি কেন? অক্সিজেন, ওষুধ, ভেন্টিলেটর সবুই অপ্রতুল কেন? দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আগে দেশের ভ্যাকসিন উৎপাদন, বণ্টন, দাম সব কিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সামলে নেওয়ার কথা ভেবেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। তখনও তাদের ধারণা ছিল এটা একটা দমকা হাওয়ার মত এসে মিলিয়ে যাবে । কিছু রোগী বাড়বে, কিছু মৃত্যু বাড়বে কিন্তু সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাবে না। এপ্রিলের মাঝামাঝি এসে যখন বোঝা গেল দ্বিতীয় ঢেউ প্রবলতর (ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যেত সেটা হওয়াই স্বাভাবিক) তখন এরা যা করলেন তাকে বাংলা ভাষায় হাত ধুয়ে ফেলা বললেই চুকে যেত, কিন্তু তা বলা যাচ্ছে না কারণ এই পরিস্থিতিতে ধুঁকতে ধুঁকতেও কর্পোরেট পুঁজির বাড়বাড়ন্ত সুনিশ্চিত করার কাজে ত্রুটি রাখেনি আচ্ছে দিনের সরকার। দ্বিতীয় ঢেউ-পূর্বকালের প্রতিক্রিয়া যদি অকর্মণ্যতার নজির হয়, উত্তরপর্বে তা হয়ে দাঁড়াল অসংবেদনশীলতার এবং ধূর্ততার।

টিকা: প্রচার এবং অপপ্রচার

টিকা নিয়ে এত কথা বলার আগেই প্রশ্ন উঠতে পারে টিকা যে মানুষের মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলছে এমনটা কি বলা যাচ্ছে নিশ্চিতভাবে? এর উত্তর একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না। হ্যাঁ, কারণ সংখ্যাতত্ত্ব তাই বলছে। বিশ্বের যে সব দেশে টিকাকরণের কাজ অন্তত ৪০/৪৫ শতাংশ এগিয়েছে সেসব দেশে আক্রান্তের পরিসংখ্যান নিম্নমুখী। ইংল্যান্ডের কথাই ধরি— এগারোই মে পর্যন্ত সে দেশে ৫২ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ পেয়েছেন এবং ২৮ শতাংশ দুটি ডোজই নিয়ে ফেলেছেন। সমগ্র যুক্তরাজ্যে মে মাসের ৯ তারিখ থেকে কোনও কোভিড মৃত্যু নেই। তারা ১৭ই মে থেকে অফিস কাছারি রেস্টুরেন্ট খুলে দিতে আশাবাদী। যে দেশে টিকাকরণের কাজ  যত এগিয়েছে সে দেশ তত কোভিড প্রকোপ এড়াতে পারছে।

তাহলে একই সঙ্গে সংশয় প্রকাশ করছি কেন? নিশ্চিত প্রতিরোধক্ষমতা বলতে যা বোঝায় সেটা সম্পর্কে অসংশয়ী হবার জন্য যতদিনের ট্রায়াল এবং ফলাফল বিশ্লেষণ করা দরকার ছিল, ততটা সময় এই অতিমারি দেয়নি। অনাক্রম্যতা দীর্ঘমেয়াদি হয় তার স্মৃতির কারণে। টিকা দিয়ে শরীরকে জীবাণুর সঙ্গে পরিচিতি ঘটানোর কাজ সম্পন্ন করা যায় ঠিকই কিন্তু বায়োলজিক্যাল স্মৃতি দেহের বৈশিষ্ট্য। পরবর্তীকালে একই জীবাণু আক্রমণ করলে দেহ তাকে স্মৃতি থেকে চিনে নিয়ে নিষ্ক্রিয় করতে পারবে কিনা তা আমাদের রক্তের কিছু কোষের মর্জিনির্ভর। ভালো টিকা এই মর্জিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কম বেশি আজীবন, নিদেনপক্ষে অতি দীর্ঘদিন ধরে। কোভিডের টিকা কতদিনের স্মৃতি দেবে তা সময় বলবে তবে এতটাই মিউটেশনপ্রবণ এই ভাইরাস যে এই টিকার পরিণতিও ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকার মত হতে পারে যা বছর বছর নিতে হয় টাকা গুনে কিন্তু কাজ কতটা হয় তা বিতর্কের বাইরে যেতে পারল না কোনওদিন। তা সত্ত্বেও, কোভিডের জন্য টিকাকরণ নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেবার থেকে গ্রহণীয় সমাধান বলে মনে হয় না যাঁদের তাঁরা ছাড়া কেউই বিরোধিতা করবেন বলে মনে হয় না। এই একটা ব্যাপারে মোদি প্রত্যাশামাফিক কাজ করেছেন বলা যায়। গোবর-টোবর মেখে না বসে টিকা নিজে নিয়েছেন ক্যামেরার সামনে, দেশবাসীকে নিতে বলেছেন এবং নিতে বলে হাত ধুয়ে ফেলেছেন। যেটা গুরুত্বপূর্ণ, দেশবাসীর যে অংশ জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ সেই ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সিদের টিকাদানের দায়িত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মনে করিয়ে দিয়েছেন— আপনা হাত জগন্নাথ।

মুখোশে ঢাকা রাষ্ট্রের মুখ

দেশের ভ্যাকসিন পলিসি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নিদেনপক্ষে ভেক ধরে ছিল গত ১৯শে এপ্রিল পর্যন্ত, কিন্তু সে দিন থেকে তার সম্পূর্ণ উল্টো বাগে হাঁটা শুরু হল। বলা হল ১লা মে থেকে দেশের ভ্যাকসিন বণ্টন ব্যবস্থা হবে ডিসেন্ট্রালাইজড এবং একই সঙ্গে দেশের প্রতি ১৮ থেকে ৪৪ বয়সীদের সেদিন থেকে টিকা নেওয়ায় কোন বাধা থাকল না, অর্থাৎ প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের টিকা পাবার প্রয়োজন ও অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া হল। দেশের মাত্র দুটি সংস্থাকে আপৎকালীন লাইসেন্স দিয়ে টিকাকরণের কাজ চলছিল এবং তাদের সমস্ত উৎপাদনই কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে বিলি ব্যবস্থা হচ্ছিল। সেরাম ইন্সটিটিউট ও ভারত বায়োটেক যথাক্রমে কোভিশিল্ড ও কোভ্যাকসিনের জন্য ডোজপ্রতি ১৫০ টাকা করে দাম পাচ্ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে। কেন্দ্রই বিভিন্ন রাজ্য সরকারকে চাহিদার নিরিখে টিকা পাঠাচ্ছিল এবং সরকারি টিকাকরণ কেন্দ্রগুলি থেকে বিনামূল্যে তা দেওয়াও হচ্ছিল। বেসরকারি হাসপাতালগুলিতেও সরকার বণ্টিত টিকা একশো টাকা সার্ভিস চার্জ নিয়ে আড়াইশো টাকায় পাওয়া যাচ্ছিল। এই সমবণ্টন ও সমদাম নীতি থেকে হঠাৎ একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে বলা হল পয়লা মে থেকে এই দুটি সংস্থা ৫০ শতাংশ উৎপাদন বাজারে বিক্রি করতে পারবে। রাজ্য সরকারগুলোকেও কোং নির্ধারিত দামে সরাসরি তাদের কাছ থেকেই টিকা কিনতে হবে এবং কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই আগের মত ডোজপ্রতি ১৫০ টাকা দামে এই টিকা পাবে সরাসরি সেরাম ও ভারত বায়োটেক থেকে। সেরাম বাজারের জন্য দাম ধরল ৬০০ টাকা, যা পরে রাজ্য সরকারগুলির জন্য ৩০০ টাকায় বেঁধে দেওয়া হয়। ভারত বায়োটেক, যার কোভ্যাকসিনের পেটেন্ট হয়তো আমার আপনার টাকায় চলা সরকারি সংস্থা ICMR-এর হাতে, দাম ধার্য করল রাজ্য সরকারগুলোর জন্য ৬০০ টাকা করে আর প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর জন্য চোখ কপালে তোলা ১২০০ টাকা ডোজপ্রতি।

উপরন্তু, প্রাইভেট স্তরে টিকাদানের জন্য চার্জসহ কোনও ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হল না। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে  আজ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬০০ থেকে ২৪০০ টাকা যে যেমন চাইতে পারে দামে এই টিকা নিচ্ছে নবীন প্রজন্ম। এসব সত্ত্বেও টিকা এতটাই অপ্রতুল যে টিকাকরণ কেন্দ্রের সংখ্যা ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে যেখানে এক লক্ষের উপর ছিল সেখানে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সংখ্যাটা কমে ৬৫১৩৩-তে নেমে আসে। ওই ১৯শে এপ্রিলের ঘোষণাতেই আর একটা বড়সড় পরিবর্তন ঘটে দেশের ভ্যাকসিন সার্ব্বভৌমত্বে। বলা হয় পয়লা মে থেকেই বিদেশি ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি যেমন ফাইজার, মডার্না, রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি ভ্যাকসিন এদেশে উৎপাদন ও বন্টনে কোনও বাধা থাকবে না। সে ক্ষেত্রেও দাম নির্ধারণে সরকারের কোনও ভূমিকা থাকবে না বলেই মনে হয়। এই পলিসি ডিগবাজির অন্য আর একটিও নমুনা সারা বিশ্বে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। ধনবাদী রাষ্ট্রগুলিতেও টিকাকরণের কাজ চলছে রাষ্ট্রের দায়িত্বে পুরোপুরি না হলেও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। এখানে কী করে মোদি সরকার এতবড় বৈষম্যের নজির গড়তে পারল তা ভেবে বিস্মিত হলে তাদের কিছু বাড়তি মর্যাদা দেওয়া হয়ে যাবে, কেন না এ সরকার গত দশ বছরে কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষা করা ছাড়া বিশেষ কিছু করেনি। এবারও, সোজা কথায়, লাভ করার সুযোগ করে দিল সেরাম ও ভারত বায়োটেকের মত সংস্থাকে। অ্যাস্ট্রা জেনেকার টিকার লাইসেন্স কেবল সেরাম ইনস্টিটিউটকে দেওয়া না হয় মানা গেল কিন্তু কোভ্যাকসিন তো এ দেশে তৈরি টিকা এবং হয়ত ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চের হাতে আছে এর মেধাসত্ব। হয়ত বলছি কারণ এ ব্যাপারে এখনও অনেক ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এ দেশে দশ বারোটা আরও এমন ব্যক্তি ও সরকারি মালিকানার কারখানা আছে যাদের একটু উন্নতি ঘটিয়ে নিয়ে অনেকদিন আগে থেকেই কোভ্যাকসিন তৈরির কাজে লাগানো যেত। ভারত বায়োটেক আজও দিনে ষাট লক্ষ ডোজের বেশি টিকা বানাতে পারে না আর সেরামও দিনে এক কোটি ডোজে আটকে আছে। দিনপ্রতি এই এক কোটি ষাট লক্ষ ডোজ টিকা একশো ত্রিশ কোটি লোকের দেশে সাবালক জনসাধারণের দুটি করে ডোজের চাহিদার নিরিখে হাস্যকর রকমের অপ্রতুল। মোদির ‘ওয়াকড দি টক’ ছিল আসলে ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে হালকা ঠোনা, দেখো আমরা উদারহস্তে দিচ্ছি তোমরা চুপ কেন? অথচ দেখুন, পেটেন্ট ট্র্যান্সফার নিয়ে আমেরিকা ও ইওরোপিয়ান দেশগুলির কাছে কোভ্যাক্স নীতি মেনে দাবি জানিয়ে আসার পরেও ভারত বায়োটেকের কোভ্যাক্সিনের পেটেন্ট বা টেকনোলজি কোনও দেশীয় সংস্থাকেও দেওয়ার অভিপ্রায় হয়নি এপ্রিল মাসের আগে পর্যন্ত। ৩৫০০০ কোটি টাকার বাজেট সংস্থান দেশের সমস্ত বেকার বসে থাকা ভ্যাকসিন ম্যানুফ্যাকচারিং কেন্দ্রকে ব্যবহারযোগ্য করে এই দেশীয় টিকাটিকে বহুগুন বেশি পরিমানে উৎপাদন করা যেতে পার। তা না করে চূড়ান্ত অন্যায়ভাবে একটি সম্ভাব্য সরকারি মেধাসত্ত্বধারী প্রোডাক্ট নিয়ে প্রাইভেট কোম্পানিকে মোনোপলির সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। মজার কথা হল, রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি ওই বেকার পরিকাঠামোকেই এই দ্বিতীয় ঢেঊ আসার আগে থেকেই উন্নততর করে ফেলার তোড়জোড় করছিল কেন না তারা জানত কী ঘটতে চলেছে এবং এখন যখন বাজার উন্মুক্ত করা ছাড়া কোনও উপায় নেই তখন তারা বাণিজ্যের সু্যোগ পেয়ে তার সদ্ব্যবহার করবে ষোলো আনা, অথচ দেশীয় টিকা সমস্ত দেশীয় উৎপাদনকেন্দ্রে ঢোকার অনুমতি পেল না চাহিদা এবং দাবি থাকা সত্ত্বেও। অপরিণামদর্শিতা ও অদূরদর্শিতার তো বটেই কিন্তু একই সঙ্গে এটা ‘ব্যাড বিজনেস’ও বটে। বাতাসে টাকার গন্ধ শুঁকতে সক্ষম জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে এটা আশা করা যায় না।

ভ্যাকসিন ও কর্পোরেট

সরকারি টিকাকরণ কর্মসূচির সঙ্গে কর্পোরেটের এই সুসম্পর্ক আজকের নয়। ১৯৫০ এর আগে পর্যন্ত ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে টিকাকরন কর্মসূচির তেমন কোনও উল্লেখ করার মত তথ্য নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সারা বিশ্ব প্রভাবিত হল তিনটে বড় ঘটনায়- ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধ, ভারতসহ অন্যান্য উপনিবেশগুলোর স্বাধীনতা লাভ এবং জাতিসঙ্ঘের পত্তন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO হয়ে দাঁড়াল টিকাকরণ কর্মসূচির সেই সেতু যা পশ্চিমের বাইরে  নিয়ে এল সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য আবশ্যিক এই আয়ুধটিকে। অবশ্য বিশ্বায়নের প্রভাব থেকে টিকা উৎপাদনকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগলে রাখতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকেই পশ্চিমে টিকা তৈরির জন্য গবেষণা থেকে পুঁজির জোগান— সব কিছু থেকেই স্বতন্ত্রতার চিহ্ন মুছে যেতে শুরু করে। স্বতন্ত্রতা বলতে sovereignty-র কথা বলতে চাইছি আমরা। টিকা উৎপাদন ছিল জাতীয় কর্তব্য, জাতীয় উন্নয়নের গোত্রচিহ্ন। সেই জায়গা থেকে বাণিজ্যকরণ ঘটল তার। টিকাকরণ কর্মসূচির সর্বজনীনতায় যে বিপুল লাভের গন্ধ আছে তার থেকে কর্পোরেট জগতকে বিচ্ছিন্ন রাখার কথা বিশ্বায়নের ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলেই ধীরে ধীরে তা চলে গেল ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত সংস্থাগুলির হাতে। বস্তুত ব্রাজিলে পীত জ্বরের টিকা উৎপাদন ছাড়া আর কোথাও সরকারি স্তরে টিকা তৈরি হচ্ছিল না ষাটের দশক থেকেই। সুতরাং টিকাকরণ কর্মসূচি, যা ছিল জাত্যাভিমানের প্রতীক, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনক্রমেই বাজারের অঙ্গীভূত হয়ে গিয়েছিল মসৃণভাবেই। এই করোনাভাইরাসের হঠাৎ প্রকোপ স্বাস্থ্য-রাজনীতিকে আবার যেন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্রতার বা state sovereignty-র ময়দানে ডুয়েল লড়তে পাঠিয়ে দিয়েছে বলে মনে হলেও আদতে কর্পোরেটের প্রভাব একটুও কমেনি বরং বেড়েছে কেন না তারা রাষ্ট্রকে পেয়ে গেছে পাশে। পয়লা মে থেকে চালু হওয়া ভারতবর্ষের ভ্যাকসিন পলিসি তার একটা নগ্ন উদাহরণ হয়ে রইল। কোভিশিল্ডের কুড়ি কোটি ডোজ এবং কোভ্যাকসিনের নয় কোটি ডোজ ১৫০ টাকা ডোজপ্রতি দামে অর্ডার দিয়ে মোদি সরকার হাত ধুয়ে ফেলেছে। বাকি বোঝা রাজ্যের এবং ব্যক্তিমানুষের নিজের। তাদের জন্য বরাদ্দ দাম ভিন্ন ভিন্ন এবং তা জোগাড়ের দায়ও তাদের। ছিটেফোঁটা কল্যাণকামিতা আছে এমন কোনও রাষ্ট্রের পক্ষে মারির এই ভয়াবহতার সামনে দাড়িয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে গেলে চামড়া যতটা মোটা হতে হয় তার চেয়েও বেশি হলে মানুষ গণ্ডার হয়ে যায়। ইউজিন আয়োনেস্কো তাঁর ‘গণ্ডার’ নাটকে এদের চিনিয়ে দিয়েছেন। তবে এত কিছুর পরেও বিশ ত্রিশ হাজার কোটি টাকা খরচে প্রাসাদ বানানোর কথা তিনিও হয়তো পরাবাস্তব ভাবনা বলেই ভাবতেন। আমরা দেখছি মানুষ আপ্রাণ ভেসে থাকার চেষ্টা করছে যে নৌকায় তার কাণ্ডারি নিজেই সেটিকে ডোবাবার পণ করে বসে আছেন।

 

যে সব প্রশ্নের জবাব মিলছে না

জবাব মিলছে না অনেক কিছুর। যেমন জবাব মিলছে না কোভ্যাক্সিনের মেধাসত্ব কার— সরকার না ব্যক্তিমালিকানাধীন ভারত বায়োটেকের হাতে? এই ভ্যাকসিনের গবেষণার টাকা তো জুগিয়েছে দেশের মানুষ এবং পুনের ন্যাশানাল ইন্সটিটিউট অফ ভাইরোলজিতে আইসিএমআর-এর তত্ত্বাবধানে সেটি উৎপাদনের বায়োলজিক্যাল প্রযুক্তি অধিগত হয়েছে। এর জন্য কর্পোরেট টাকা ঢেলেছে কি? বোঝা মুশকিল কেন না এ ব্যাপারে চরম গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। তাহলে জানার উপায় নেই? আছে, তবে একটা ঘোরানো পথে। কোভ্যাকসিনের ট্রায়াল পর্যায়ে যে সব গবেষণা হয়েছে সেগুলো জার্নালে ছাপার জন্য জমা দিতে গেলে ফান্ডিং অথরিটির নাম ঘোষণা আবশ্যিক। এরকম ছখানা পেপার ছাপা হয়েছে এখনও যার পাঁচটারই সহ লেখক হলেন আইসিএমআর-এর ডিরেক্টর জেনারেল বলরাম ভার্গব এবং চারটিতে ফান্ডিং অথরিটি হিসাবে ভারত সরকার পরিষ্কারভাবে স্বীকৃত। গবেষণার জন্য কতটা টাকা বা গবেষণার কতটা অংশীদারিত্ব ভারত সরকারের তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও বোঝা যাচ্ছে যে পাবলিক মানি এই গবেষণায় ঢুকেছে এবং তা যতটাই হোক না কেন। যুক্তি বলছে মেধাসত্ব এর পরেও যদি সরকারের হাতে না থেকে থাকে তাহলে সেটা একটা বিরাট স্ক্যাম। আর যদি সরকারের হাতে থেকে থাকে তাহলে উৎপাদনের সর্বসত্ব ভারত বায়োটেক দ্বারা সংরক্ষিত ছিল কেন প্যাঁচে পড়ার আগে পর্যন্ত? কীভাবেই বা ভারত বায়োটেক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Ocugen সংস্থার সঙ্গে এককভাবে ১০০ মিলিয়ন ডোজ দেওয়ার চুক্তি করে ফেলতে পারল সরকারের কোনওরকম উল্লেখ ছাড়াই? এই বিদেশে বিক্রির লাভ থেকে সরকার কি বা কতটা শেয়ার পাবে তাও অজানা। তাহলে পাবলিকের টাকায় সম্পন্ন হওয়া একটা গবেষণা যা পাবলিকের টাকায় গড়ে ওঠা এবং পরিচালিত একটা গবেষণাগারে সরকারের তত্ত্বাবধানে ফলপ্রদ হতে পেরেছে তার মেধাসত্ব কি সরকার কর্পোরেটের হাতে তুলে দিয়েছে? এর কোনও উত্তর আজ অবধি নেই। কিন্তু এপ্রিল মাসের ১৭ তারিখে মুম্বাইয়ের হ্যাফকিন্স ইন্সটিটিউট সহ আরও তিনটি সংস্থাকে কোভ্যাক্সিন বানানোর লাইসেন্স দিয়েছে ভারত সরকার এবং সেখানে ভারত বায়োটেক যে যৌথ স্বাক্ষরকারী তাও নয়। সুতরাং অনুমান করা যায় মেধাসত্ত্ব ভারত সরকারের হাতেই আছে এবং না থাকলে সেটাও একটা স্ক্যাম। এ হেন কোভ্যাক্সিনের জন্য (অর্থাৎ যাকে সরকারি ভ্যাকসিন বলতে পারি আমরা) লাগামছাড়া দাম চাওয়া হচ্ছে ১৮-৪৪ বছর বয়সীদের জন্য। কার পকেটে যাচ্ছে এই টাকা বা টাকার লভ্যাংশ? উত্তর নেই।

সরকারি টাকায় কর্পোরেট থাবার উদাহরণ অক্সফোর্ডের টিকাও যা কোভিশিল্ড নামে এদেশে তৈরি করে বিক্রি করছে সেরাম ইন্সটিটিউট। এই টিকার গবেষণার  ৯৭ শতাংশ টাকা পাবলিক মানি এবং তা শুধু রানির টাকা নয়, ব্রিটেন, আমেরিকা ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বিভিন্ন গবেষণা সহায়ক ফান্ডিং এজেন্সি,  বিভিন্ন চ্যারিটি, মানবকল্যাণকামী সংস্থা অনেকে টাকা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় এই টিকা সব চাইতে আগে দিনের আলোর মুখ দেখেছে। তাদের একটাই শর্ত ছিল— ওপেন লাইসেন্সিং, অর্থাৎ মেধাসত্ব কারও একার হাতে থাকতে পারবে না। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি, এমন কি অক্সফোর্ডও না। উৎপাদনের সত্ব তারা এককভাবে দিল ব্রিটিশ-সুইডিশ ফার্ম অ্যাস্ট্রা জেনেকা-কে। ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে কোভিশিল্ড উৎপাদনের এক্সক্লুসিভ চুক্তি অ্যাস্ট্রা জেনেকার— অক্সফোর্ড সেখানে তিলমাত্র নেই। সুতরাং এই কোভিডের বাজারে কর্পোরেট- সরকার-প্রভাবশালী— সব মিলেমিশে স্ক্যাম দেশে দেশে এবং স্ক্যাম আন্তর্জাতিক। যারা মুনাফা করার তারা আগামী কত বছরের মুনাফা করে নিচ্ছে এ যাত্রায় সে প্রশ্নেরও উত্তর মিলবে না।

উত্তর মিলবে না এই প্রশ্নেরও, যে ঠিক কোন গবেষণায় কোভিশিল্ডের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের মধ্যেকার ব্যবধান বাড়িয়ে বারো থেকে ষোলো সপ্তাহ করা হল? ল্যান্সেটে প্রকাশিত প্রথম ট্রায়ালে ২৮ দিনের কথা বলা ছিল। পরে দেখা যায় ব্যবধান বাড়িয়ে ৪২ দিন থেকে ৬০ দিন করলে টিকার কার্যকারিতা কিছু বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই মর্মে একটি সদর্থক বিবৃতি দেয় এবং নির্দেশিকা জারি করে। কিন্তু ১৬ সপ্তাহ বা চার মাসের ব্যবধান নিয়ে এখনও কোনও গবেষণাপত্রের কথা শুনিনি অথবা অক্সফোর্ড বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এমন কোনও অনুমোদন দিয়েছে বলে জানা নেই। বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি, ইংল্যান্ডে গত মার্চে যে ব্যক্তি টিকা পেয়েছে তার পরের ডোজ নির্ধারিত ছিল ১২ সপ্তাহ পরে আর এই মে মাসে ১২ তারিখে যে টিকাকরণের চিঠি পেয়েছে তার পরের ডোজ ১০ সপ্তাহ পরে হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং উৎপাদন ও গবেষণার দেশে সময়সীমা যখন কমছে তখন এদেশে তা বেড়ে যাচ্ছে। এ কি প্যানিক বাটনে চাপ পড়ার পরে হাঁটু ঠকঠকানো প্রতিক্রিয়া? কম জোগান মোকাবিলা করতেই এই ব্যবস্থা? তা হলে আনুসঙ্গিক আর যে যে প্রশ্নগুলো আসে তা হল, এর ফলে টিকার কার্যকারিতা ঠিক থাকবে তো? যারা আটাশ দিনের ব্যবধানে নিয়েছিলেন তারা কি তাহলে এই মুহূর্তে সুরক্ষিত নন? তাদের কি তৃতীয় ডোজ দেবার ব্যবস্থা করছে সরকার? প্রশ্ন অনেক, উত্তরও পুরোপুরি অজানা নয় তবে এখনও পর্যন্ত উত্তরের সাদা খাতা অমলিন থেকে গেছে।

 

সূত্র:

  1. R Ramakumar (April 26 2021) https://scroll.in/article/993257/why-its-vital-for-indians-to-know-who-owns-intellectual-property-rights-to-bharat-biotechs-covaxin
  2. Suhasini Haidar (April 23 2021)https://www.thehindu.com/news/national/worldview-with-suhasini-haidar-what-went-wrong-with-indias-vaccine-diplomacy/article34394622.ece
  3. V Shridhar (May 21 Preprint 2021)https://frontline.thehindu.com/covid-19/india-coronavirus-covid19-vaccine-fiasco-sii-bharat-biotech-pricing/article34498928.ece
  4. Jamini N Rao (23 April 2021)https://www.newslaundry.com/2021/04/23/indias-covid-vaccination-policy-just-became-political-and-perverse
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3324 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. কী অসাধারণ তথ্যপূর্ণ লেখা। এত গুরত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ বহুদিন পড়িনি। অনেক ধন্যবাদ জানাই।

আপনার মতামত...