আবার লকডাউন

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 



প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী

 

 

পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত সরকার কেরল, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, রাজস্থান, বিহারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আগামী পনেরো দিনের জন্য এরাজ্যেও লকডাউন জারি করলেন। সরকারি নির্দেশিকায় কথার মারপ্যাঁচ যাই থাকুক না কেন এটা আদতে পূর্ণ লকডাউন। হিসেব করে দেখতে পাচ্ছি কেন্দ্রীয়ভাবে দেশব্যাপী লকডাউন না থাকলেও দেশে এমুহূর্তে লকডাউনই চলছে। পশ্চিমবঙ্গে লকডাউন ঘোষণার মধ্যে দিয়ে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে লকডাউনের ভয়াবহতা এবং কেন তা আমাদের মত দেশে তা করা উচিত নয়, তা নিয়ে যে যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য রেখেছিলেন তা নিজেই ভঙ্গ করলেন। লকডাউন ঘোষণার পর থেকেই এর পক্ষে বিপক্ষে নানা তর্ক-বিতর্ক উঠে আসছে, এই নিবন্ধ সেই প্রতর্ককে ছুঁয়ে দেখার এক আন্তরিক প্রয়াস।

মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন। এই মুহূর্তে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় পরিস্থিতি ভয়াবহ। প্রত্যেক দিন দেশে কোভিড সংক্রমণের কারণে ৪০০০-এর বেশি লোক মারা যাচ্ছেন (পশ্চিমবঙ্গে গড় মৃত্যু দিনপ্রতি ১৪০-১৪৫), সংক্রমণের হার পূর্ববর্তী সমস্ত রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে। সরকারি পরিসংখ্যানে মৃত্যুর শতকরা হার দেখে যাঁরা কিছুটা নিশ্চিত বোধ করছেন তাঁদের সবিনয়ে জানাই এই তথ্য বাস্তব নয়। বেশিরভাগ মানুষ হয় কিটের অভাবে নয়তো অর্থের অভাবে টেস্ট করাচ্ছেন না, ফলে সংক্রমণের হার যা দেখানো হচ্ছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এই অন্তহীন মৃত্যুমিছিল সরকারি মৃত্যুর তালিকায় সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এই বিপন্ন সময়ে মানুষের জীবনের স্বার্থে কোভিড নিয়ন্ত্রণে সরকারি হস্তক্ষেপ, সিদ্ধান্ত জরুরি, কিন্তু একই সঙ্গে এটাও জরুরি যে বিজ্ঞানচেতনা ও যুক্তিবাদের আলোকে সরকারি সিদ্ধান্তকে মূল্যায়ণ করা।

আশাকরি এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হবেন যে, লকডাউনের নামে সমস্ত কাজকর্মকে স্তব্ধ করে দিলে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষ। এখন কোভিডের এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের আক্রমণ কেন আমাদের উপর এত বেশি করে পড়ছে! এ ব্যাপারে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় প্রকাশিত চিকিৎসক তথা বিজ্ঞানীদের যে বয়ানগুলি প্রকাশিত হয়েছে (ল্যান্সেট জার্নাল ও নেচার পত্রিকার প্রতিবেদনও দ্রষ্টব্য) তাতে প্রায় একসুরে বলা হয়েছে অতি সংক্রামক স্ট্রেনের সক্রিয়তা, টিকাকরণের ধীর গতি, সচেতনতার অভাব, একাধিক ধর্মীয় ও নির্বাচনী জমায়েতের জন্যই ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এ কথা এখনও পর্যন্ত কেউ অস্বীকার করেননি যে কোভিড ভাইরাসের সংক্রমণক্ষমতা প্রবল হলেও তার মারণক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। তাহলে এত মৃত্যু হচ্ছে কেন? এক ও একমাত্র উত্তর হল ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা। হাসপাতালে বেডের অভাব, পরিকাঠামোর অভাব, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপযুক্ত সুরক্ষার অভাব, ওষুধের আকাল, সর্বোপরি অক্সিজেনের অভাব গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলেছে। এই বিষয়টা যদি অন্যরকম হত তাহলে ছবিটা এত ভয়ঙ্কর হত না। এখানে আবার আমরা গত বছরের ছবিটা ফিরে দেখতে পারি। গত বছর পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়ঙ্কর লকডাউনের আগে বলা হয়েছিল যেহেতু আমাদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থা দুর্বল আর কোভিডের কোনও ভ্যকসিনও নেই, তাই জনগণের কষ্ট হলেও আমাদের বাধ্য হয়ে লকডাউনকে মেনে নিতে হবে। এর পর এক বছর অতিক্রান্ত, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে উন্নত করার যথেষ্ট সময় আমরা পেয়েছিলাম। শুধুমাত্র পিএম কেয়ার্সে ৩২,০০০ কোটি টাকা জমা ছিল। অথচ আমরা নতুন করে একটা অক্সিজেন প্ল্যান্ট পর্যন্ত বানাইনি। জানুয়ারি মাস (২০২১) থেকে বিভিন্ন এজেন্সির তরফে দ্বিতীয় ঢেউয়ের সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও সরকারি স্তরে আমরা কোনও উদ্যোগ দেখিনি। আন্তর্জাতিক বাজারে ৫টি ভ্যাকসিন আবিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও টিকার জোগানের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হয়নি। ইতিমধ্যে দেশে উৎপাদিত ভ্যাকসিনের ৩০ শতাংশ বিদেশে চলে গেছে আর এখানে কে বিনে পয়সায় ভ্যাকসিন দেবে তা নিয়ে নির্বাচনী মঞ্চে কাদাছোড়াছুড়ি চলছে। এই চরম নৈরাজ্যের যা পরিণতি হওয়ার ছিল, ঠিক তাই হচ্ছে। অবস্থা হাতের বাইরে চলে গেছে এবং বাঁচবার উপায় হিসাবে শাসকদের লকডাউনের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এই অবস্থার জন্য প্রধান দায় অবশ্যই কেন্দ্রীয় সরকারের কিন্তু রাজ্য সরকারগুলিও তাদের দায় এড়াতে পারে না।

এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল লকডাউন জারি করে কি সংক্রমণের শৃঙ্খলটিকে ছিন্ন করা যায়? যেহেতু সরকার ও চিকিৎসক মহলের একাংশ লকডাউনের যৌক্তিকতা প্রমাণে এটাকেই প্রধান দাবি হিসাবে উপস্থিত করেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর অভিজ্ঞতা হল গত বছরের লকডাউনের সময়।সেই সময় সারা দেশ জুড়ে লকডাউনের সময় সংক্রমণ তো কমেইনি বরং লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছিল। এ ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে নেই, কিন্তু কোনও সরকারি তথ্য নেই যা প্রমাণ করতে পারে যে লকডাউনের কারণে সংক্রমণের শৃঙ্খলকে ছিন্ন করা গিয়েছিল। বরং গতবার আলোচিত কয়েকটি কথা আমরা আবার বলতে পারি। প্রথমত জনস্বাস্থ্য ও অতিমারি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত চিকিৎসাশাস্ত্রের কোথাও ‘লকডাউন’ শব্দবন্ধের অস্তিত্ব নেই। দ্বিতীয়ত করোনা সংক্রান্ত যে কোনও ব্যবস্থাপত্র ঘোষণায় যাদের গুরুঠাকুর মানা হচ্ছে সেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) গতবছর ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক হেলথ এমারজেন্সি ঘোষণার ৫৫ দিন পর এবং অতিমারি ঘোষণার ১৫ দিন পরেও নিজে লকডাউনের প্রস্তাব করেনি। বরং জোর দেওয়া হয়েছে দ্রুত রোগ নির্ণয়, চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং বয়স্ক লোকেদের জন্য বিশেষ নজরদারি। তৃতীয়ত সমস্ত বিশেষজ্ঞ সংস্থাই গতবছর টেস্ট ও আইসোলেশনের উপর জোর দিয়েছিল। পরিষ্কারভাবে তারা বলেছিল লকডাউন কোনও সমাধান নয়। সেবার আমরা দেখেছিলাম ইতালিতে যখন ১০ লক্ষ মানুষ পিছু টেস্টের সংখ্যা ৫ হাজার, তখন ভারতে মাত্র ১৮। এবারও কিন্তু একটা ব্যবস্থাপত্রের কথা বলা হচ্ছে যার মধ্যে রয়েছে দ্রুত টিকাকরণের হার বৃদ্ধি, টেস্ট ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা, প্রয়োজন পড়লে যেখানে সংক্রমণের হার বেশি সেখানে কনটেনমেন্ট জোন তৈরি ইত্যাদি। কিন্তু সেই পথে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অযোগ্যতাকে ঢাকতে তারা লকডাউনের মতো ধ্বংসাত্মক ও এক অর্থে এক অকার্যকরী পথকে বেছে নিলেন।

এবারে লকডাউন সংক্রান্ত আলোচনায় কিভাবে লকডাউনের প্রয়োজনীয়তাকে জনমানসে নির্মাণ করা হল তা নিয়ে দু একটা কথা বোঝা দরকার। গত বছরে লকডাউনের নিদারুণ অভিজ্ঞতার পর জনমানসে বর্ধমান ক্ষোভকে সামাল দিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দল সাধারণভাবে একটা লকডাউন-বিরোধী অবস্থান নেয়। এক্ষেত্রে অর্থনীতির ভেঙে পড়া হালের কারণে কর্পোরেট লবির একটা চাপও সরকারগুলির উপর ছিল। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও বিভিন্ন বণিক সংস্থাগুলি জানুয়ারি মাসে বারবার লকডাউনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। কিন্তু মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে যখন বোঝা যেতে লাগল পরিস্থিতি এবারও হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে তখন লকডাউনের পক্ষে দেশ জুড়ে জনমত গঠনের চেষ্টা শুরু হল। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নির্বাচনের কারণে এই ন্যারেটিভটা একটু দেরিতে আসে। এখানে চতুর্থ দফার নির্বাচনের পর লকডাউনের দাবিটাকে পরিকল্পিতভাবে আলোচনার বৃত্তে আনা হয়। মোটের উপর ছকটা হল আইসিএমআর, এইমস প্রভৃতি চিকিৎসা সংক্রান্ত সংস্থাগুলোর কর্তাব্যক্তিরা লকডাউনের দাবি তুলবেন। তারপর চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপত্রকে প্রশ্নহীন আনুগত্যে সমর্থন করতে টিভি চ্যানেল ও খবরের কাগজে সুনামির মত আছড়ে পড়বে চিকিৎসকের দল। এঁদের মধ্যে কতজন জনস্বাস্থ্য, কমিউনিটি মেডিসিন, ভাইরোলজি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন সে প্রশ্ন আপাতত মুলতুবি রাখছি, কিন্তু যেটা দেখার মতো বিষয় তা হল এরা কেউ কিন্তু সরকারের সীমাহীন অপদার্থতাকে প্রশ্ন করছেন না। তাঁরা সুকৌশলে এটা বোঝাতে চাইছেন আমজনতা নির্বোধ, তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি বোঝেন না, তাই রোগটা ছড়াচ্ছে। আর এর থেকে বাঁচার উপর লকডাউন, আরও কড়া লকডাউন। এই প্রচারের সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করছেন সেই মানুষেরা যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, মাস মাইনের নিরাপত্তা আছে বা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের সুবিধাপ্রাপ্ত। এই অংশটা সংখ্যায় বেশি নয় কিন্তু মূলত মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত, এবং এঁরাই সোশাল মিডিয়ার, যে কোনও সামাজিক সংলাপে মুখ্য ব্যাখ্যাকর্তা। এদের সক্রিয়তার দরুন লকডাউন যে করোনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় তা ন্যায্যতা পাচ্ছে। অন্যদিকে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যাঁরা কাজ না করলে উপার্জন করতে পারেন না, তাঁরা আবারও নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবেন। গত বছর লকডাউনের কারণে গরীব মানুষের জীবনে কী বিপর্যয় ঘটেছিল সেই বিষয়টি বহু আলোচিত। শুধু একটা নতুন কথা যুক্ত করা প্রয়োজন যে সিএমআইই-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ফিরে আসা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন রাজ্যে যে আংশিক ও পূর্ণ লকডাউন শুরু হয়েছে তার ফলস্বরূপ আরও নতুন ২৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবেন। কোনও দ্বিধা না রেখেই বলা যায়, কোনওরকম আর্থিক রক্ষাকবচ ছাড়াই পশ্চিমবঙ্গের দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষকে লকডাউনের মধ্যে ঠেলে ফেলা হল। আর নতুন সরকারও প্রচলিত শাসকের রাজনীতির নকলই করলেন, কোনও বিকল্পের সন্ধান করার সাহস দেখালেন না।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...