কলকাতা, নয়… — ১১তম পর্ব

অশোককুমার মুখোপাধ্যায়

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

রংবেরঙের চিকিৎসা

গোল আটকাতে গিয়ে হাঁটু ছড়ে গেছে? দেখি কতটা? ওহ্… এ তো সামান্য, লাল ওষুধ লাগিয়ে নে ঠিক হয়ে যাবে। ও আচ্ছা, একটু বেশি কাটা? তাহলেই বা চিন্তা কীসের… ওই যে গাঢ় বাদামি ওষুধ আছে। একটু জ্বালা করবে এই যা! কালচে বাদামি ওষুধটাও তো লাগায় কেউ-কেউ, তবে এতে যে তুলো দিয়ে সাঁটিয়ে রাখবে, ছাড়ানো খুব ঝামেলার; নাকের জল না আসুক, চোখে জল আনবেই। গলা-বগলে বিতিকিচ্ছিরি ফোড়া? বেগুনি ওষুধ। ওষুধ-দোকানের কাঁচের তাকে ভল্যুমেট্রিক ফ্লাস্কের মধ্যে যে নীল ওষুধ ভর্তি— তাও তো কেউ বাড়ি নিয়ে যায়। ষাটের কলকাতায় আমাদের সামলাচ্ছে মাত্র এই তিন-চারটে রং। লাল— মারকিউরোক্রোম, গাঢ় বাদামি— টিঞ্চার আয়োডিন, কালচে বাদামি— টিঞ্চার বেনজয়েন, বেগুনি— জেনশিয়েন ভায়োলেট আর নীল— মেথিলিন ব্লু। আঙুল পোড়ায় হলুদ মলম, যা থাকে কালচে হলুদ টিউবের মধ্যে। তার হলুদ গায়ে গম্ভীর কালো হরফে লেখা বার্নল। গণ্ডগোলের ঢেকুর উঠলে যে হাতের নাগালে রাখা পাতলা চা-রঙা জোয়ানের আরক, অ্যাকোয়া টাইকোটিস, খেয়ে নিতে হয়, এও তো সবাই জানে। এ ছাড়া, বছরে একবার বসন্তোৎসব— করপোরেশনের লোক বাড়িতে এসে সবাইকে বাঁ-হাতের কব্জির ছ-ইঞ্চি তলায় দু-জায়গায় তিন-তিন ছটা আঁচড় কেটে যায়। কদিনের মধ্যেই ওই দু-জায়গা একটু ফুলে ওঠে, একটু চুলকোয়, তারপর একদিন শরীরে কোনও দাগ না রেখে মিলিয়েও যায়। এইবার গুটি বসন্ত আটকাতে শরীর তৈরি! এ ছাড়াও, বছরে একবার ইনজেকশন— টিএবিসি, যার কাজ নাকি টাইফয়েড, কলেরা সামলানো। সে এক বার্ষিক যন্ত্রণার উৎসব। খুব ঘটা হয় স্কট লেনের বাড়িতে। বেলেঘাটা থেকে গাড়ি চেপে ডাক্তার ডি এন গাঙ্গুলি এসে গেছেন। জামা-প্যান্ট-চুল-দাঁত সব ধপধপে সাদা। শুধু চশমার ফ্রেমটাই যা কালো। কপালের একদিকে টিউমার; ঘরে ঢুকেই বললেন কী দাদুভাইরা, সব ভালো তো? মা যতই তাদের ‘হাঁ-করা ছেলে’ বলুক, এইটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি আছে বালকদুটির যে, হাওয়া ভালো নয়। তবুও ভদ্রতা হিসেবে দুজনেই মাথা নাড়ায়, ভালো। চোখের সামনে পেটমোটা ব্যাগ খুলে যায়, এক-এক করে বেরুতে থাকে স্পিরিট, তুলো, ডাক্তারি ব্যবহারের জন্য শোধন করা শিশিভর্তি জল এবং ছুঁচহীন সিরিঞ্জ। ছুঁচের বাক্স খোলা হয়। সারিসারি স্টিলের ছুঁচ শুয়ে আছে। পছন্দসই ছুঁচটি বের করে সিরিঞ্জের ডগায় লাগান ডাক্তারবাবু। কী মনে করে একবার তাকিয়ে দেখেন বালকদুটিকে। তারা অবোধ কুকুরছানার চোখে তাকিয়ে! সিরিঞ্জ দিয়ে জল টেনে নেওয়া হয়, পরক্ষণেই তা পিস্টন চেপে ফেলেও দেওয়া হয়। প্রথমে বাবা। বাঁ-হাতের উপরের মাংসপেশিতে স্পিরিট ভেজানো তুলো ঘষা হল। সারা ঘর স্পিরিটের ডাক্তারি গন্ধে ভরে যায়। তারপরেই তরল টিকা সিরিঞ্জে টেনে নেওয়া। ডাক্তারবাবু হাসেন আমাদের দিকে তাকিয়ে— দেখ একদম লাগবে না। বাবাও হাসেন। ছুঁচ বাবার পেশি ফুঁড়ে ঢুকে পড়ে। জানি লাগছে খুবই, তবু বাবার মুখে চওড়া হাসি। মা ভেতরের ঘর থেকে উঁকি দেয়। এবার দুই বালককে নিয়ে পড়েন ডাক্তারবাবু। বয়সে যে বড় তাকেই প্রথমে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হবে; এই-ই নিয়ম। অতএব সেও হাসিমুখে বাঁ-হাতের কাঁধ যেখানে হাত ঝুলিয়ে দিয়েছে, মেলে ধরে, অন্যদিকে তাকায়। ছুঁচ ঢুকে পড়ে বীরত্ব ফলিয়ে। যতক্ষণ না তিনি রেহাই দিচ্ছেন দম আটকে ব্যথা সহ্য করতে হয়, বালকটি করে। এবং ডাক্তারবাবুর মুণ্ডপাত করতে-করতে ঠোঁটে হাসির রেখাও জিইয়ে রাখে। তারপরে তার ভাইও, একই কায়দা, একই অভিনয়। বরং মার হাতে ছুঁচ ঢুকলে শোনা যাবে উফফ… আঃ; তা দেখে বালকদুটির ঠোঁটে যন্ত্রণা দোল খায়। তারপরে ডাক্তারবাবুর যাওয়ার পালা। এই বার্ষিক অত্যাচারের শোধ নিতে একবার জুটে গেল আপাদমস্তক পাগল। যে, মনে হয়, জামাকাপড় সদ্য ত্যাগ করে পাগল হিসেবে দীক্ষা নিয়েই আনতাবড়ি স্কট লেনে ঢুকে পড়েছে। বেশ সার্কাস জানা উন্মাদ। তিড়িং বিড়িং করতে-করতে সে এক লাফে গাড়ির বনেটে। শুরু হয়ে গেল শিবনৃত্য। গাড়ি নেহাত পোড়খাওয়া ল্যাণ্ডমাস্টার, সে জন্যই প্রলয় নাচনে একটু-আধটু তুবড়ে যাওয়ার বেশি কিছু হল না। কিন্তু কেউ-ই ওর বেশি কাছে যেতে পারছে না, কারণ কারওই উদোম পাগলকে বশ করবার মন্ত্র জানা নেই। ডাক্তারবাবু পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে। এমনকী বাবাও হুশ হাশ আওয়াজ ছাড়া কিছুই করছেন না! একটানা নাচনকোঁদন কতক্ষণ আর করা যায়, একসময়ে নটরাজ তার নৃত্য থামালেন। এইবার সম্বিৎ ফিরে পেলেন ডাক্তারবাবু। মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে এগিয়ে গেলেন গাড়ির দিকে— এই নে বাবা, টাকা কটা রাখ, গাড়িটা ছেড়ে দে…। বালকটির তদ্দণ্ডেই মনে হল, টাকা নিয়ে রাখবে কোথায় লোকটি? ওর জামা-প্যান্টই নেই, ও-সব থাকলে তো পকেটের কথা! নটরাজস্যার ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে খুবই সঙ্গত উচ্চারণ করল— ফুঃ। বলেই আবার তিড়িং লাফে মাটিতে, একদিকের ওয়াইপার টেনে ছিঁড়ে ডান মুঠোয় নিয়ে তিনি মশাল-দৌড় লাগালেন বৈঠকখানা বাজারের দিকে। গাড়ি-অন্ত প্রাণ ডাক্তারবাবু পাঁজরের একটি হাড় উপড়ে নিল যেন কেউ! ওর ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করল শোকে জল মেশাতে, বাবাও কিছু-কিছু, কিন্তু কিছুতেই তাকে সান্ত্বনা দেওয়া গেল না। বিষণ্ণবদনে বিদায় নিলেন তিনি।

হলফ করে বলে দেওয়া যায়, রাধিকাকাকু, ডাক্তার রাধিকানাথ বসু, এ অবস্থায় পড়লে ঠিক সামলে দেবে। রাধিকাকাকু কখনও বাড়িতে আসে, কখনও যেতে হয় ওর শশীভূষণ দে স্ট্রিটের ডাক্তারখানায়। সেই বোসেস ক্লিনিক-এর শিশিভরা লাল মিক্সচার খেয়ে জ্বরজারি সেরে যাবে ঠিক। নাড়ি দেখবার, কি পিলে টেপবার সময় অথবা বুকে-পিঠে স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে ফুসফুসের সাঁ-সাঁ শোনবার মুহূর্তে কাকুর কপালে ভাঁজ পড়ে বেশ কয়েকটি; গুনে-গুনে ছটা সমান্তরাল রেখা! রাধিকাকাকু ইনজেকশনও দিয়েছে দু-একবার। ছুঁচ ঢোকাবার সময় এমন সব কথা বলত কাকু, ব্যথার কথা মনেই আসত না। একবার নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবার গল্প বলতে গিয়ে বলল, ‘জানিস তো আমার ক্লিনিকে রুগী দেখার যে পার্টিশান, তা আমার হাইজাম্প প্র্যাকটিস করবার কাঠের পোস্ট দুটি দিয়ে তৈরি… পাশ করেই ঠিক করে নিয়েছি ব্রিটিশের গোলামি করব না, নিজে প্র্যাকটিস করব, বাড়ির কেউ সাহায্য করল না, তাই যা-যা ছিল নিজের জিনিস, তা-ই সাজিয়ে বসে গেলাম… বুঝলি…’ শুনে যতক্ষণে ‘উরিব্বাস’ বলেছি, রাধিকাকাকুর ইনজেকশন দেওয়া শেষ, ওর কম্পাউন্ডার ছুঁচ ফোঁড়বার জায়গায় তুলো চেপে ধরে আছে। এই কাকুই একবার ওর ছেলেকে পাঠাল আমার সঙ্গে গল্প করবার জন্য, তার নাকি খুব একা-একা লাগে! ‘শোন তুই যেমন মজার-মজার ঘটনা বলিস, ওকেও এমন বলবি… বুঝলি…।’ ক্লাস সেভেনে পড়া এই বালকের যে অন্যকে আনন্দ দেবার মতো ক্ষমতা আছে, এ-কথা সে প্রথম জানল, আর সে-কথা ভেবেই কলার উঁচু! তো, সে ছেলে এল একদিন-দুদিন, তারপর আর নয়…। যার দুঃখ পেতে ভালো লাগে, তাকে আনন্দ দেওয়া শক্ত। এই পাকা মাথার কথা পরেও, সেই ১৯৬৮-তে, যখন সেভেন থেকে এইট-এ, তখনই বোঝা হয়ে গেছে। সে বছর টনসিল অপারেশন; ভর্তি করা হল সরকারি ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ-হাসপাতালের পেয়িং বেডে। একটি বড় ঘেরাটোপের মধ্যে ছটি কি আটটি বেড। ওয়ার্ডের পর্দা-ঢাকা যাওয়া-আসার দরজা থেকে বেরিয়েই ডানদিকে, মানে দক্ষিণদিকে কিছুটা হাঁটলে পৌঁছে যাবে জনতা-বাথরুম। সেই ত্যাগের মন্দির, প্রতিদিন সকালে ফিনাইল দিয়ে সাফাই হওয়া সত্ত্বেও, যেহেতু বহু বেআক্কেলে রুগী দায়িত্ব-ছুটের মতো ব্যবহার করে, বেশ ঘাঁটা অবস্থায় পাওয়া যেত। কিন্তু স্কট লেনের বৈঠকখানার সফল বাজার-করিয়ে হারবে কেন? সে ঠিক ফিনাইল-শুদ্ধিকরণেই পরেই পাশাপাশি চারটি বাথরুমের একটিতে সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ে ছোট-বড় সব কাজ চুকিয়ে বেরিয়ে আসে। অন্তত দিনের শুরুটা তো ভালোভাবে হোক! এরই পিঠে এই কথাটাও বলবার, সেই বড় কাজের জায়গাটিতে টিনের বালতি-মগ অটুট, সাবানও বেশ স্বাস্থ্যবান লাইফবয়, এবং জলের ধারা অবিরাম। ওয়ার্ডের মধ্যে একটি ভালভ-সেট রেডিও, দেওয়ালের তাকে বসানো। যা থেকে নির্গত খবর, এবং সবার যা পছন্দের সেই অনুরোধের আসরও শুনে থাকে রসিক রুগীরা। ভর্তির দিন সকালে খোপ-কাটা থালায় যে ভাত-ডাল-তরকারি-মাছ দিয়েছে, দিব্যি খাওয়া গেল। গত শতাব্দীর সেই আটষট্টি সালের ব্যবস্থা যদি এখনও বজায় থাকে সরকারি হাসপাতালে, কেতরে পড়লে ওইখানেই যাওয়া যাবে। সাত-দশ দিনের মেয়াদ কাটাবার পর হাসপাতাল ছেড়ে ঘরে ফিরতে মন কেমনও যে করেছে, তাও বলতে হয়। এর একটা বড় কারণ, আর একটি বালকও ছিল স্কট লেনের ছেলেটির উল্টোদিকের বেডে, তারও টনসিল কাটা পড়বে। তার মা চিতল মাছের বড়া খাওয়াল একদিন। মা যেমন সাত্ত্বিক অথচ স্বাদু তরল বানায়, এ তার থেকে অনেক গরগরে জিভ-মাতানো ঝাল! মার রান্না যদি ঊনিশশো পঁয়ষট্টির ‘গাইড’ সিনেমার শচীন দেববর্মন— ‘ওহা কৌন হ্যায় তেরা… মুসাফির…’, হাসপাতাল-বন্ধুর মা কলকাতার আধুনিক জগতে একাত্তরে প্রকাশিত রাহুল দেববর্মন— ‘মনে পড়ে রুবি রায়…।’ স্কট লেনের রুগীর ডানদিকে জানালার ধারে যে বেড, যেখানে এর কয়েক বছর আগে বালকটির ছোটভাই শুয়েছে ওই একই কাজে, সেই টনসিল ওপড়ানোর জন্য, সেই শয্যায় ভর্তি ক্লাস টেনে পড়া এক পাকামাথার ছেলে। সে ওস্তাদের কাজ ছিল উল্টোরথ, সিনেমা, প্রসাদ এই জাতীয় পত্রিকায় বেরুনো রসালো কোনও গল্প পড়তে দেওয়া। সে বেশ রোমাঞ্চকর অধ্যায়, শরীরে বড় হওয়া ভর করেছে। মনকেমনের আর একটি ছোট অথচ বলার মতো কারণ, সেই ওয়ার্ডের নার্স, যার নাম শুভ্রা। তার কী করে যেন পছন্দ হয়ে গেল স্কট লেনের কিশোরটিকে। সে ছুতোয়-নাতায় কিছু-না-কিছু খাইয়ে যায় তার আদরের ‘ভাইটি’কে। যা দেখে ওয়ার্ডের অন্য সিস্টার টুনুদি ঠাট্টা করলেও, সে দমে না। কিশোরটিও ছাড়া পাওয়ার পর, সরস্বতী পুজোর দিনে, ধুতি-পাঞ্জাবি পরে তার শুভ্রাদিকে দেখে এসেছে। অবশ্য ওই একবারই।

অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তার খাসনবিশ, যিনি কিশোরটির ছোটমামার মাস্টারমশাই, কর্তনের দায়িত্বে। ‘কী রে তোর কী হয়েছে?’ খাসনবিশের প্রশ্নের উত্তরে ছেলেটি জ্ঞান ফলাতে শুরু করল, ‘টনসিলের টকসিন শরীরে মিশে জ্বর, বমি…’ খাসনবিশ হাসলেন, ‘টনসিল! টকসিন!… তোর কী বায়োলজি আছে নাকি…’ উত্তর দেওয়ার আগেই ছেলেটির নাক-মুখ ঢেকে গেল পেল্লায় মাস্কে যার প্রান্তে মোটা নল; ওইখান দিয়েই গ্যাস ছেড়েছেন অজ্ঞান-ডাক্তার! কাটাকুটির শেষে ওয়ার্ডে কিশোরটির সদ্য জ্ঞান ফিরেছে; কিন্তু কী আশ্চর্য সে কথা বলতে পারছে না, চেষ্টা করেও। গলায় এক পাহাড় ব্যথা। জ্ঞান ফিরতেই, ঝাপসা দৃষ্টি স্বচ্ছ হতেই— মুখের ওপর ঝুঁকে মেজপিসি আর মার মুখ। এই তো বীরত্ব দেখাবার সময়; ছেলেটি তীব্র চেষ্টায় আকর্ণ হাসবার ভঙ্গি করল। ও মা, ঠোঁট নড়ল মাত্র কয়েক মিলিমিটার! তবু তারই মধ্যে ওষ্ঠ ফুটিয়ে তুলেছে হাসির রেখা, যা দেখে মেজপিসি চমৎকৃত। প্রতি-হাসি দিল না, কিন্তু বলল, ওই তো হাসছে! মার মুখেও হাসি নেই। কোনও কথা না বলে, তার হাঁ-করা ছেলের দিকে ছাই-মুখে তাকিয়ে রইল শুধু! কিশোরটি তখনই বুঝেছে, তার অভিনয় ফেল! পরের দিন হাততালি আদায় করতেই হবে।

কয়েকদিন আইসক্রিম খাওয়ার পর, গলা-ভাত-সেদ্ধ-ডিম খাওয়ার পর্যায় এসে গেল যখন, উল্টোদিকের কিশোরটিও সামলে উঠেছে। দুই কিশোরেরই কৌতূহল বাঁদরের মতো— সব কিছু নেড়েচেড়ে দেখতে হবে তাদের। এত কাণ্ড করে যে অপারেশন হল, গলার ভেতরটা দেখতে হবে না? দুটো ছোট আয়না জোগাড় করা হল। একটি আয়নার কাজ গলার ভেতরে প্রতিফলিত সূর্যের আলো পাঠান, অন্যটি ভেতরের কলকব্জা দেখায়। দেখা গেল, ভেতরে, জায়গার জিনিস জায়গায় আছে, কিন্তু আলজিভের দু-ধারে, যেখানে ফোলা টনসিল ছিল এতদিন, তা মিসিং! বদলে, সাদা-সাদা রেখা। পাশের বেডের পণ্ডিত বলল, ‘ও হল সেলাই, কেটে বের করে দেবে।’ এই আয়না-খেলায় বাকি বেডের বয়স্ক রুগীরা আমোদ পায়, একজন বাদে। তাঁর কানের ভেতরে পর্দার মেরামতি বা ওই জাতীয় কিছু হয়ে থাকবে এবং তাঁর ধারণা, যদিও শুনতে পাচ্ছেন, কিন্তু ঠিক যেন নয়, অর্থাৎ কান সারেনি। তিনি বিষাদ-রঙা মুখে আমাদের কাণ্ড দেখে যান— কিশোর দু’টি এই আইসক্রিম খাচ্ছে, এই রেডিওর নব ঘোরাচ্ছে, কখনও মন দিয়ে উল্টোরথ পড়ছে, আবার কখনও দৈনন্দিনের আয়না কেরামতিতে— হাসবার এমত বিচিত্র উপকরণ বিনা পয়সায় প্রতিদিন পাওয়ার পরেও তাঁর বিষাদ আর ছাড়ে না!

একদিন ভদ্রলোক স্কট লেনের কিশোর আর তার আয়না সহকারীকে বলে বসলেন, ‘অ্যাই তোমরা আমাকে কানের ভেতরটা দেখিয়ে দাও… ওই তোমরা যেমন করে দেখছ…’ বোঝো কাণ্ড! একটি আয়নায় কানের ফুটোয় আলো পাঠিয়ে, অন্য আয়নায় তা দেখাতে হবে মিস্টার বিষাদকে! কোনও জ্যামিতিতে তা সম্ভব নয়— এ-কথা তাকে বারেবারে বোঝান হল, কিন্তু তবু তাঁর সেই এক কথা— ‘এরা আমার কান খারাপ করে দিল, কী যে করেছে ভেতরে, একটু, একবার দেখাও তো…।’ ‘আনন্দ পাওয়া ওর ধাতে নেই’ বলেই ফেললেন এক নার্স।

–এইদিকে আয়, উল্টোদিকের ছেলেটা ডাকল।
–ওর মাথায় ক্র্যাক আছে, বেশি কাছে যাস না…
–অ্যাঁ, ক্র্যাক! তার মানে?
–অ্যাঁ নয় হ্যাঁ… বেশি কাছে যাস না, বেশি খেপে গেলে… মানে হঠাৎ যদি হেড আপিসের বড়বাবু হয়ে যায়? যদি কামড়ে দেয়?… সাবধান…

ক্র্যাক মানে যে মাথার ব্যামো তাও তো শেখা হল সেই আটষট্টি সালের শেষদিকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইয়ার-নোজ-থ্রোট ওয়ার্ডের পেয়িং বেডে।

 

(ক্রমশ)


কলকাতা, নয়…-এর সব পর্বের জন্য ক্লিক করুন: কলকাতা, নয়… — অশোককুমার মুখোপাধ্যায়

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. কলকাতা, নয়… — ১২তম পর্ব – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...