কয়েকটি কবিতা

রবের্তো হুয়াড়োস

 

ভূমিকা ও অনুবাদ — অনুপ সেনগুপ্ত

আর্হেন্তিনার কবি রবের্তো হুয়াড়োসের (Roberto Juarroz, ১৯২৫-১৯৯৫) প্রথম কবিতার বই Poesia Vertical (উল্লম্ব কাব্য) প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। এরপর যে তাঁর আরও চোদ্দটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, প্রতিটির নামই Poesia Vertical. শুধু Segunda (দ্বিতীয়), Tercera (তৃতীয়), Quinta Poesia Vertical (চতুর্থ উল্লম্ব কাব্য)… এইভাবে সংখ্যাপিত হয়েছে। শেষ কবিতার বই ‘পঞ্চদশ উল্লম্ব কাব্য’ কবির মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী লরা কাড়াতোর সম্পাদনায় প্রকাশ পায়। হুয়াড়োসের প্রতিটি কাব্যগ্রন্থে কবিতাগুলিরও কোনও শিরোনাম নেই। সংখ্যাক্রমে পৃথককৃত। প্রকৃতপ্রস্তাবে, কবির সব কবিতা মিলিয়ে যেন একটিই তরঙ্গ। আর প্রতিটি কবিতা সেই তরঙ্গের এক-একটি স্পন্দন। সারা জীবন ধরে তিনি একই শৈলীতে কবিতা লিখে গেছেন। তাঁর কবিতায় মিথ, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অনুসঙ্গ একেবারেই নেই। পরিবর্তে মানুষের অন্তর্গত রসাতলে নৈঃশব্দ্য ও সংগীত, চিন্তন ও স্বপ্ন, শূ্ন্যতা-পূ্র্ণতা, নিঃসঙ্গতা-অপরতা এবং অস্তিত্বের নানা সম্ভাবনার অন্বেষণে নিয়োজিত এই কবি। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কবিতার মর্মে এই বিশ্বাস রয়েছে যে বস্তুজগতের চেয়েও চিন্তন বেশি মূর্ত।’ এই বক্তব্যে তাঁর পাঠকের সংশয় থাকার কথা নয়। কেন তাঁর কবিতাবলি Vertical— উল্লম্ব? এর উত্তরে বলা যায়, এইসব বাকস্ফটিকে ভাবপ্রতিমার অনুভূমিক প্রবাহের পরিবর্তে দেখা যায় উল্লম্ব প্রবাহ। কখনও কখনও তিনি আবার অনুভূমিক প্রবাহকে নিশ্চল বা ফ্রিজ় করে দেন। আর সেইসঙ্গে বাঙ্ময় স্বতোবিরুদ্ধতা, সিলোজিজ়ম, বাক-ক্রীড়া এবং মূর্ত-বিমূর্তকে সমন্বায়ন করে গড়ে ওঠে হুয়াড়োসের কবিতা।

প্রথম উল্লম্ব কাব্য | কবিতা-ক্রম — ৩৪

মানুষ
রাত্রির হাতের পুতুল,
শূন্যতাকে ছুরি মারে।

কিন্তু একদিন
কোনও শূন্যতা তীব্র রাগে পাল্টা ছুরি মারে তাকে।

আর তারপর কিছু নেই
শুধু না-কোথাও-এর ঠিক মধ্যিখানে একটি ছুরি পড়ে থাকে।

 

প্রথম উল্লম্ব কাব্য | কবিতা-ক্রম — ৯

এই মুহূর্তে মনে হয়
জগতের কেউই হয়তো আমাকে নিয়ে ভাবছে না,
একমাত্র আমিই নিজেকে নিয়ে ভাবছি,
এখন যদি মরে যাই
কেউ, এমনকী আমিও, আর আমাকে নিয়ে ভাবার থাকছে না।

আর এখানেই রসাতল জেগে ওঠে,
যখন ঘুমোতে যাই।
আমিই নিজের অবলম্বন আর তা এখন কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিই।
ঘরের সবকিছুই অনস্তিত্বে সাজিয়ে তুলতে সাহায্য করি।

তাই হয়তো
তুমি যখন কাউকে নিয়ে ভাবো
তাকে আসলে রক্ষা করো।

 

পঞ্চম উল্লম্ব কাব্য | কবিতা-ক্রম — ৬

দিনের শূন্যতা
ঘনীভূত হয়ে একটা বিন্দু
ফোঁটার মতো ঝরে পড়ে নদীর বুকে।

দিনের পূর্ণতা
ঘনীভূত হয়ে এক সূক্ষ্ম রন্ধ্র
নদী থেকে সেই ফোঁটা
চুষে নেয়।

কতটা পূর্ণতা থেকে কতটা শূন্যতায়
কিংবা কতটা শূন্যতা থেকে কতটা পূর্ণতায়
বয়ে যায় নদী?

 

পঞ্চম উল্লম্ব কাব্য | কবিতা-ক্রম — ১১

সাদা সিলিং-এ চোখ আঁকে
একটা ছোট্ট কালো রেখা।
সিলিং চোখের বিভ্রম দখল করে
কালো হয়ে যায়।
তারপর রেখাটি নিজেকে মুছে ফ্যালে
চোখও বন্ধ হয়।

এভাবেই জন্ম নেয় একাকিত্ব।

 

পঞ্চম উল্লম্ব কাব্য | কবিতা-ক্রম — ১৭

প্রতিটি হাতই নিজের মেঘ
আলাদা আকাশে সাজায়।

কিন্তু একদিন নিজের মেঘ খুঁজে পায়
সকলের আকাশে।

শুধু তখনই তা ফের হতে পারে
এক টুকরো সব-পেয়েছির দেশ,
হাত হওয়ার আগে তো তা-ই ছিল।

শুধু তখনই মেঘ থেকে
বৃষ্টি পড়বে এর ওপর।

 

দশম উল্লম্ব কাব্য | কবিতা-ক্রম — ৪৪

আমি তোমার দিকে ফিরি,
শয্যায় বা জীবনে,
আর দেখি তুমি অসহনীয়।

তারপর নিজের দিকে ফিরি,
আর দেখি সেই একই ব্যাপার।

সুতরাং
আমরা যদিও সহনীয়কে ভালোবাসি,
তবু বাক্সবন্দি করে রাখি,
আর যাতে তা আগের মতো অসহনীয়র পথরোধ না করে,
অসহনীয় না হলে যে দুজনে একসঙ্গে চলাই যায় না।

(লরাকে আর একবার, দুজনে যখন কাছাকাছি)

 

একাদশ উল্লম্ব কাব্য | বিভাগ — চার | কবিতা-ক্রম — ৪৫

প্রতিটি শব্দই এক সংশয়,
প্রতিটি নৈঃশব্দ্য আরেক সংশয়।
যেভাবেই হোক,
এদের আলিঙ্গন
আমাদের শ্বাস নিতে দেয়।

সব ঘুমই এক নিমজ্জন,
সব জাগরণ আরেক নিমজ্জন।
যেভাবেই হোক,
এদের আলিঙ্গন
আমাদের আবার উঠে দাঁড়াতে দেয়।

সব জীবনই একরকম নিশ্চিহ্ন হওয়া,
সব মৃত্যু আরেকরকম।
যেভাবেই হোক,
এদের আলিঙ্গন
আমাদের চিহ্ন হয়ে থাকতে দেয় শূন্যতায়।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3384 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...