আফগানিস্তানের কতটুকু জানি?

শঙ্কর রায় 

 



প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক

 

 

 

আলিকজাইস, ইশাকজাইস। আমাদের কাছে এই শব্দ দুটি ‘হিং টিং ছট’-এর মতন। আফগানিস্তানে দুটি উপজাতির নাম, যারা প্রধানত হেলম্যান্ড প্রদেশের বাসিন্দা। কিন্তু আফগানিস্তানে স্বীকৃত ১৪টি উপজাতির বাইরে এরা। স্বীকৃত উপজাতিগুলি হল পাশতুন, তাজিক, হাজারা, উজবেক, তুর্কম্যান, বালুচ, পাচাই, নুরিস্তানি, আইমাক, আরব, কিরগিজ, কিজিলবাশ, গুজুর ও ব্রাহুই। কিন্তু আলিকজাইস ও ইশাকজাইসের মত আরও বেশ কিছু উপজাতিভুক্ত গ্রামীণ আফগান/পাঠান আছেন, যাদের কোনও স্বীকৃতি নেই। জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ পাশতুন, তাজিকরা প্রায় ২৫ শতাংশ, হাজারা এবং উজবেক ১০ শতাংশ। যতদূর জেনেছি, উপজাতীয়তা আফগানিস্তানের প্রতিটি নৃকুল গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য নয়, এদের সঙ্গে আমাদের দেশের আদিবাসীদেরও সাদৃশ্য নেই। এদের নমনীয়তা প্রায় নেই, বরং বলা যায় এরা প্রবল প্রকারের গোঁড়া, রক্ষণশীল। বলা বাহুল্য, সুদূর গ্রামাঞ্চলে প্রভাবশালী মধ্যযুগীয় ধারণালালনকারী বিত্তশালী মোড়লরা ইসলামের দোহাই দিয়ে গরিবগুর্বোদের মধ্যে রক্ষণশীলতা ও পশ্চাৎপদতা জিইয়ে রেখেছে। এ প্রসঙ্গে পরে আসব। আগেই জানিয়ে রাখি, এই কথাগুলি লিখলাম এটা জানাতে যে আমি সেই কলমচিদের মধ্যে একজন যারা জানে বা স্বীকার করে যে তারা আফগানিস্তান সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না। আমি তাদের মধ্যে পড়ি না, যাঁরা নিজেদের ‘গবেষক’ (অবশ্যই ব্যক্তিগত অর্থে, কারণ এরা কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নন) বলে নিজেদের পরিচিত বা জাহির করেন। আমি এক নিম্নস্তরের পড়ুয়ার চেয়ে বেশি কিছু নই।

ব্রিটেনের নাগরিক আফগান গবেষিকা মেত্রা কুত্ব (লন্ডন স্কুল অফ একনমিক্স-এর সঙ্গে যুক্ত) গত বছর লিখেছিলেন, আফগানিস্তান একটি বহু-জাতিগত এবং বহুভাষিক দেশ। কয়েক দশকের যুদ্ধের কারণে, এর জনসংখ্যার কোনও সঠিক আদমশুমারি হয়নি। তবে কোনও একটি উপজাতি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। পাশতুনরাই সর্বাধিক। আফগানিস্তানের সংবিধানে (২০০৪ সালে প্রবর্তিত) ১৪টি উপজাতি স্বীকৃত, কিন্তু আরও উপজাতি যে আছে তাও বলা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, আফগানিস্তানের ৯৯ শতাংশ মুসলিম, যাদের ৮৪ থেকে ৮৯ শতাংশ সুন্নি, ১০-১৫ শতাংশ শিয়া। এছাড়া আছে হিন্দু, শিখ এবং ইহুদি। আফগানিস্তানে মোট ৪৫টি ভাষায় মানুষ কথা বলে, যার বেশিরভাগই মৌখিক। সুতরাং আফগানিস্তান এক জটিল বিষয়। আফগানিস্তানের বিষয়ে প্রায় সবাই হাফজান্তা, কিন্তু সে কথাটা যে তারা বুঝতে পারছেন, তা মনে হচ্ছে না।

এ থেকে মনে হয়, আফগানিস্তানের বাইরের মানুষ (অ্যাকাডেমিয়াকে বাদ দিয়ে বলছি না) সে দেশ ও দেশের মানুষজনের কথা প্রায় জানেনই না, আমার মতো অভাজন তো দূরস্থান। ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ এবছর আগস্টের শেষে জেমস ডবিন্স লিখেছেন, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১১-র পরে আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ বুশ প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঠিকই, কেননা আমেরিকার মাটিতে আরেকটি বিপর্যয়কর আক্রমণ ঠেকাতে বদ্ধপরিকর হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। মার্কিন প্রশাসনের উদ্দেশ্য ছিল না আফগানিস্তানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য গ্যারিসনের মতো রাখা। তালিবানদের উদ্দেশ্য ছিল সেখানে গেঁড়ে বসা এবং দেশটিকে শাসন করা ও একই সঙ্গে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল করে তোলা। বুশ প্রশাসনের প্রথম ভুল ছিল আফগান পুনর্গঠন প্রচেষ্টার পথে ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা অনুধাবনে ব্যর্থতা। আর আফগানিস্তান আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে অন্যের থেকে বহুদূরে, সবদিক থেকে আলাদা, দেশটি স্থলবেষ্টিত এবং দুর্গম; ইরান, পাকিস্তান এবং নিকটবর্তী রাশিয়া সহ বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ও প্রভাব-বিস্তারেচ্ছু প্রতিবেশী দ্বারা বেষ্টিত। সেসব কারণেই বুশ-সৃষ্ট আফগানিস্তান অভিযানে গোড়া থেকেই চূড়ান্ত ব্যর্থতার বীজ উপ্ত হয়েছিল। ডবিন্সের এ এক বাস্তব স্বীকারোক্তি। বিশ বছরে ৭,৭৫,০০০ সৈন্য মোতায়েন, ড্রোন সহ অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার, ২,০০,০০,০০০ কোটি ডলার (আরও অনেক বেশি, হিসেব এখনও বাকি) ব্যয়, ১৭০০০ বেসরকারি ঠিকাদার, কয়েক ডজন এনজিওদের পোষণ করেও চূড়ান্ত ব্যর্থতা ছাড়া কিছুই পায়নি যুদ্ধবাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ আফগানিস্তান অভিযান শুরুর তিন বছর পরেই ভার্জিনিয়া মিলিটারি ইন্সটিট্যুটে কবুল করেছিলেন: “The history of military conflict in Afghanistan [has] been one of initial success, followed by long years of floundering and ultimate failure. We’re not going to repeat that mistake.”

আফগানিস্তান পশ্চিমি দেশগুলির সকল ব্যর্থতার সম্মিলন, প্রধানত সামরিক দিক থেকে। এটা অন্যত্রও সত্য। আমেরিকা কয়েক দশক ধরেই কোনও সশস্ত্র অভিযানে জিততে পারেনি, কারণ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সন্ত্রাসবাদের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। আফগানিস্তানে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে সৃষ্ট শাসনব্যবস্থাগুলি দুর্নীতিগ্রস্ত, যাকে আমরা বলি ক্লেপটোক্রেসি। আফগানিস্তানের অবস্থা যুদ্ধের আগের চেয়েও খারাপ, নারী ছাড়া, একমাত্র তাদের অবস্থার কিছু উন্নতি হয়েছে, অন্তত শহরে। কিন্তু তালিবানদের বাড়িতে থাকার চাপ গত মাসে বেড়েছে, সেই সঙ্গে নারী লেখক, সাংবাদিক, ডাক্তার এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে হুমকি (খুন না হলে নির্বাসনে বাধ্য করা), এবং মেয়েদের স্কুলে মারাত্মক হামলা। পাশ্চাত্যের ‘সভ্যতা মিশন’ আফগানিস্তানকে ক্লেপটোক্রেসি বলে অভিহিত করেছিল অনেক আগে।

ধরা যাক, জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা, যা সরকারিভাবে বিনামূল্যে লভ্য। কিন্তু ঘুষ ছাড়া জ্বরজারির চিকিৎসাও সম্ভব নয়। সেখানে রোগী বা তার পরিবারের জন্য চিকিৎসা গ্রহণের জন্য চিকিৎসককে ঘুষ প্রদান করা যেন এক গৃহীত প্রথা। মার্কিন সেনাবাহিনির অন্যতম উপদেষ্টা কর্নেল ক্রিস্টোফার কলেন্ডা ২০০৬ সালেই বলেছিলেন, “আমি ক্যান্সারের উপমা ব্যবহার করি। ক্ষুদ্র দুর্নীতি ত্বকের ক্যান্সারের মতো; এটি মোকাবিলা করার উপায় আছে। মন্ত্রণালয়, উচ্চস্তরের মধ্যে দুর্নীতি কোলন ক্যান্সারের মতো যা আরও খারাপ। ক্লেপটোক্রেসি অবশ্য মস্তিষ্কের ক্যান্সারের মতোই মারাত্মক।”

আমাদের অনুসন্ধিৎসার দিকনির্দেশ হওয়া উচিত আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে, যার বেশিরভাগই পাহাড়ি। সেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৬০ জন মানুষের বাস। ভারত ও পাকিস্তানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে যথাক্রমে ৪৬৪ ও ২৮৭ জনের বাস। সে দেশের মাত্র ১২ শতাংশ জমি কর্ষণযোগ্য। মাত্র ৪ শতাংশ জমিতে আফিম চাষ হয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুসারে, এই মুহূর্তে সে দেশে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি। তারা সবই গ্রামাঞ্চলের।

আফগানিস্তানে মোট জমির ৪৭ শতাংশের মালিক ২.২ শতাংশ মধ্যযুগীয় চিন্তাধারাচ্ছন্ন ও জীবনধারাপোষক সামন্তবাদী। আফগান গ্রামবাসীদের অন্তত ৪০ শতাংশ ভূমিহীন (১৯৬৭ সালের এক সমীক্ষা মতে)। যারা ভাগচাষ করে জীবন নির্বাহ করে, তারা উৎপন্ন ফসলের মাত্র ২০ শতাংশ পায়। প্রত্যেকে বিপুল ঋণভারে ন্যুব্জ। আশু প্রয়োজন ব্যাপক ভূমিসংস্কার, কারণ এক একজন ভূম্যধিকারী গড়ে ১০০০ হেক্টর জমি দখল করে আছে। অথচ নিরক্ষর ও দারিদ্রক্লিষ্ট কৃষক ভূমিসংস্কার বিরোধী, মোল্লারা ও মসজিদের ইমামরা তো ভূমিসংস্কারের প্রধান বিরোধী, তারা ইসলামের বিকৃত ব্যাখায় করে বোঝায় যে ভূমিসংস্কার আসলে ইসলাম বিরোধী। এ প্রসঙ্গে জরুরি পঠিতব্য ডেভিড গিবস-এর একটা গবেষণাপত্র— The Peasants are counter-revolutionary rural origins of the Afghan insurgency

অ্যাকাডেমিক বা বাঘা বাঘা সাংবাদিক/বিশ্লেষকদের কাউকে প্রশ্ন করতে দেখিনি, কেন আফগানিস্তানে কোনও কৃষক বিদ্রোহ ঘটেনি, অন্তত ইংরেজিতে বা ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত কোনও লেখায় আমি এর উল্লেখ দেখিনি। ন্যুইয়র্কার-এ (সেপ্টেম্বরের গোড়ায়) আনন্দ গোপালের একটি ১০০০০-এর বেশি শব্দে লেখা অতি প্রণিধানযোগ্য লেখায় জেনেছি, যখন কাবুলে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় ছিল তারা মেয়েদের (ছেলেদের তো বটেই) বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করতে প্রয়াসী হয়েছিল, এমনকি কোথাও কোথাও বন্দুক উঁচিয়ে মেয়েদের বিদ্যাক্ষেত্রে নিয়ে যেতে হয়েছিল, কারণ উপজাতি মোড়ল/অঞ্চলাধিকারীরা ও ধর্মীয় নেতারা এ কাজে প্রবল বাধা দিচ্ছিল। একবার দু-তিনটি স্কুল (বিদ্যাক্ষেত্রে)-এর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অপহরণ করে নৃশংসভাবে খুন করেছিল। কমিউনিস্ট সরকার ভূমিসংস্কার করতেও চেয়েছিল। কিন্তু বছর না ঘুরতেই পাকিস্তান, সিআইএ ও ভাড়াটে মুজাহিদ মিলে সে সমস্ত কাজ করতে প্রবল বাধা সৃষ্টি করে।

এ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানাই। তখন কমিউনিস্টদের নজিবুল্লা সরকারের অবস্থা কাহিল। সাংবাদিক বন্ধু সুমিত চক্রবর্তী মারফৎ আফগানিস্তানের এক ডেপুটি কন্সাল জেনারেল (দিল্লিতে কর্মরত) আমার সঙ্গে দেখা করেন নাখোদা মসজিদের পেছনে এক হোটেলে। তাঁর কাছে শুনেছিলাম নারী শিক্ষার (প্রথমে স্বাক্ষর করা) প্রয়াসের কথা। তখন নুর মহম্মদ আরাকি কমিউনিস্ট সরকারের প্রধান। যেখানে মহিলা শিক্ষক দেওয়া সম্ভব, সেখানে সরাসরি নিরক্ষর মেয়েদের কাছে যেতেন সেইসব শিক্ষিকারা। তারা অনেকেই বোরখা পড়ে যেতেন। আর অন্যত্র যেতেন পুরুষ শিক্ষকেরা, সেখানে মেয়েদের সামনে পরিবারের কোনও অগ্রজ পুরুষ বা তাদের স্বামীরা থাকতেন। ইতিমধ্যে তারাকি খুন হলেন একদা তাঁর হাতে গড়া কমরেড হাফিজুল্লা আমিনের হাতে, সে যে ইতিমধ্যে সিআইএ-র দিকে ঝুঁকে গেছে, তা আঁচ করতে পারেননি তারাকি। হাফিজুল্লার অনুগামীরা সেই সাক্ষরতা কর্মসূচি সাবোতাজ করল। তারা রটাতে শুরু করল, যে সাক্ষরতার আড়ালে চলছে অবৈধ প্রণয়। অপপ্রচারে বিভ্রান্ত পুরুষেরা তাদের স্ত্রীদের হত্যা করল ডজনে ডজনে। সে এক মর্মান্তিক পরিস্থিতি।

তালিবানরা শিয়া মতাবলম্বী হাজারাদের প্রতি নির্দয় ও বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসোদ্যত হয়েছিল অকারণে নয়। হাজারা অধ্যুষিত অঞ্চলে ছিল কমিউনিস্টদের প্রভাব। সেখানে প্রায় ৭০ জন পার্টি সদস্য (প্রধানত পারচাম গোষ্ঠীর) ছিলেন।

আফগানিস্তান নামটা একদা স্মরিয়ে দিত রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা, মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে। আজকের আফগানিস্তানে সেই মাধুর্য রক্তাক্ত হয়েছে তালিবানি প্রত্যাবর্তনে। আফগানিস্তানে আবার বিভীষিকাময় অনিশ্চয়তায়। মেয়েদের দাবিয়ে রাখা তো বটেই, ব্যক্তিস্বাধীনতা চূড়ান্ত রক্তাক্ত হবে। তালিবান কর্তারা বলেই দিয়েছে গণতান্ত্রিক বা সংসদীয় ব্যবস্থা নয়, শরিয়তি হুকুমত পুরোদমে কায়েম হবে, নির্মম পুরুষতন্ত্র, আমাদের দেশের বর্তমান সঙ্ঘী মনুবাদের অন্য ও কঠোরতর রূপ। মার্কিন সৈন্য অপসারণে খুশি হওয়া মানে তালিবানদের তুলনামূলকভাবে শ্রেয় মনে করাটা অযৌক্তিক। অনেকেই আফগান সরকারের দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়ে অতি সোচ্চার হয়েছেন বটে, কিন্তু আফগানিস্তানে যে নারী প্রগতি হয়েছিল, এটা ভুলে যাচ্ছেন।

এখন তালিবানদের বিরুদ্ধে সংহতি গড়ার সময়। সাধারণ আফগান জনগণকেই সেই দায় নিতে হবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...